শুভ্র হৃদয় ও অনন্ত জীবনের চুড়ান্ত সফলতা

2897 জন পড়েছেন

(Repost)

হৃদয় বা হার্ট (আরবিতে “ক্বল্ব বা বহুবচনে কুলুব” ) নিয়ে চিন্তা করতে গিয়ে মনে প্রশ্ন জাগলো মানব দেহের রুহ আসলে কি?  পবিত্র কোরআনে দেখি এ প্রশ্নের উত্তর জানতে আমাদের নবীজিকে যখন প্রশ্ন করা হয়েছিল তখন আল্লাহ পাক পরিস্কার জানিয়ে দেন,
“তারা আপনাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দিনঃ রূহ আমার পালনকর্তার আদেশ ঘটিত। এ বিষয়ে তোমাদেরকে সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে।” (সুরা ১৭:৮৫)

আধুনিক সেকুলার সভ্যতায় বিজ্ঞান অনেক কিছুর রহস্য জানতে পারলেও মানুষের মাঝে রুহের উৎপত্তি কিভাবে আসল বা রুহ আদৌ কি? সে ব্যাপারে মাথা ঘামাতে রাজি নয়। তাদের কথা হল স্রষ্টাকে যেহেতু দেখা যায় না তাই স্রষ্টার সৃষ্টি যাতে এমনিতেই হয়ে গিয়েছে সে বিষয়ে বিবর্তনবাদের মসলা দিয়ে থিওরি বানাতে হবে যাতে মানুষকে বিভ্রান্তিতে ফেলে শুধু বস্তুবাদী ভোগ বিলাসি এবং স্রষ্টা সর্ম্পকে  উদাসীন করা যায়। অবশ্য near death experience নিয়ে গবেষনা হয়। তবে অনেকে আত্মা বা soul বলে মানব দেহে অদৃশ্য কিছুর অস্তিত্ব আছে বলে স্বীকার করেন।

ইসলামী দর্শনে  রুহকে আত্মা  বলা যেতে পারে। রুহ বলতে যদি মানুষের প্রাণ বলা হয় তাহলে প্রশ্ন করা যায় মানব দেহে প্রাণ কয়টি? কারো মুখ থেকে যদি কিছু সেলাইভা নিয়ে ল্যবে পাঠানো হয় তাহলে দেখা যাবে অসংখ্য সেলের সমষ্টি এবং প্রতিটি সেলই জীবন্ত আলাদাভাবে। আমার এক বন্ধু ড:শরিফ যিনি টরন্টো জেনারেল রিচার্স ইন্সটিউটের একজন রিচার্স বিজ্ঞানী তাঁর সাথে সেদিন হার্ট নিয়ে আলাপ প্রসঙ্গে  জানতে পারলাম  তাঁদের ল্যবে মানুষের হার্ট নিয়ে গবেষনা করতে গিয়ে হার্টের কিছু সেলকে আলাদা করে দেখেন প্রতিটি  সেল বা কোষ নিজে নিজে পাম্প স্পন্দন করে যাচ্ছে! সুবহান্নাল্লাহ!

সে যাক রুহকে  বলা যেতে পারে আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো এনার্জি বা শক্তি। তবে স্বয়ং আল্লাহই যখন জানিয়ে দিয়েছেন এ বিষয়ে মানব জাতিকে সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে তাই রুহের কথা এখন বাদ দিয়ে লিখার মূল বিষয় হার্ট  বা “ ক্বল্ব” قلب নিয়ে আলাপ করতে চাই। 

সত্যি বলতে কি  গত সপ্তাহে  বাড়ির পাশে এক ইসলামী আলোচনায় জনৈক মিশরীয় ইসলামী চিন্তাবিদ, ড: হাসানের  (P. Eng., Ph. D., PMP, Associate Engineering Scientist) হার্ট সম্পর্কে তাঁর গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপিত অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য শুনার সুযোগ হয়। পাঠকদের খেদমতে আজকের এ ব্লগটি মুলত সে প্রেক্ষিতেই লিখা। 

হার্ট বা হৃদয় আসলে কি? 
এটা কি শুধু একটি মাংস পিণ্ড যার কাজ শুধু রক্ত চলাচল না অন্য কিছু? আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে  আধুনিক গবেষণালব্ধ নতুন তথ্য আবিষ্কারের মাধ্যমে এতদিন মেডিক্যাল সাইন্স হার্টের কাজ বা বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে যা জানত তা এখন পরিবর্তিত হতে যাচ্ছে। যত দিন যাচ্ছে বৈজ্ঞানিকেরা জানতে পারছেন যে হার্ট মানব দেহে ব্লাড পাম্প করা ছাড়াও আরো অনেক কাজ করে এবং হার্টের ভিতর ৪০ হাজার নিউরন যা সর্বদা ব্রেইনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রাখে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে হার্টের ম্যাগনেটিক এনার্জি ফিল্ড ব্রেইন থেকে ৫০০০ হাজার গুন বড়। 

এমনকি “হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট সম্পর্কিত মেমরি এবং চরিত্র বৈশিষ্ট্য বিনিময়ের রিভিউ রিসার্চে” এখন দেখা যায় হার্ট মানুষের স্মরণ শক্তিও ধরে রাখতে পারে। তাই দেখা যায় যে সব রুগী হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট করান তাদের রুচি ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন দেখা দেয় যার হার্ট ব্যবহার করা হচ্ছে তার রুচি ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মত। নিচের ভিডিওটা দেখলে এমেইজিং কিছু তথ্য পাবেন।  

 

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কোরআনে অনেক জায়গায় ক্বাল্ব বা হার্ট সম্পর্কে আমাদেরকে অবহিত করেছেন। যেমন ক্বাল্ব শব্দ কম পক্ষে ১৩৭ বার ব্যবহার করেছেন। বর্তমান বিজ্ঞানের আবিস্কারে হার্টের অতিরিক্ত কাজের যে সব বর্ণনা পাওয়া যায়  যেমন প্রেক্ষন ক্ষমতা (seeing and hearing) সে ব্যপারে  পবিত্র কোরআনে আল্লাহ  ইঙ্গিত করেছেন। সুরা ২২: ৪৬ আয়াতে আল্লাহ বলছেন “So have they not traveled through the earth and have hearts by which to reason and ears by which to hear? For indeed, it is not eyes that are blinded, but blinded are the hearts which are within the breasts. [Quran, 22: 46]  “তারা কি পৃথিবীর বুকে ভ্রমণ করেনি, যার ফলে তারা উপলব্ধিকারী হৃদয় ও শ্রবণকারী কানের অধিকারী হতো? আসল ব্যাপার হচ্ছে, চোখ অন্ধ হয় না বরং হৃদয় অন্ধ হয়ে যায়, যা বুকের মধ্যে আছে।” 

 আমাদের অন্তরে হার্টের অনেক রোগ জন্ম নেয় যেমন ঈর্ষা, দ্বেষ, লোভ, লালসা ও লোক দেখানো (রিয়া বা showing off) ইত্যাদি। তাই আমাদের লক্ষ্য হতে হবে হৃদয়কে পরিশুদ্ধ, কুলষমুক্ত তথা পবিত্র করা। অতএব একজন মুসলিম কোরআনের শিক্ষা সঠিকভাবে অনুধাবন করে থাকলে জানতে পারে তার হার্ট বা হৃদয়কে দিয়ে তার অনেক কাজ করাতে হয় এবং তাকে আল্লাহর দরবারে হাজির হতে হবে ক্লিয়ার বা স্বচ্ছ হার্ট নিয়ে। “The day that neither wealth nor sons will be of any benefit except for he who comes to Allah with a pure heart.”- Qur’an, 26:89 

কোরআনের বিভিন্ন আয়াত পড়লে দেখা যায় হার্ট বা হৃদয়ের কাজের পরিধি অনেক। নবিজী বলেন “মানব দেহের এ যন্ত্রটি যদি দূষিত বা অশুভ প্রবৃত্তিতে সংক্রামিত হয়ে যায় তাহলে তার পুরা দেহটাই দূষিত হয়ে যায়।” তখন সে মানুষটি বাহ্যত মানুষ দেখালেও তার মাঝে মনুষ্যত্ব থাকে না সে অধঃ:পতিত হয় পশুর স্তরে আর এ চরিত্রের লোকেরা যদি বসে যায় সমাজের কর্তৃত্বে তা হলে সে সমাজেও নেমে আসে দুর্দশা! তখন দেখা যাবে কারো পক্ষে হাবার্ডের মত উচ্চ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনের ডিগ্রী নিয়েও কাউকে বিনা বিচারে হত্যা করে “জাস্টিস ডান” বলতে অসুবিধা হবে না! আবার কেউ ক্ষমতার দাপটে নিজের দেশের প্রতিবাদী মানুষের কথা না শুনে রাতের অন্ধকারে নিরস্ত্র মানুষ হত্যা করে বেমালুম অস্বীকার করতে লজ্জা বোধ করবে না! কিংবা জায়নিষ্টদের হাতে প্যলেষ্টাইনের অসহায় জনসাধারণের উপর বোমা ফেলে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করাকে বলবে “কলাটরেল ডেমেজ”!

হার্ট এবং মাইন্ড

আমরা যখন কাউকে চিন্তা করতে বলি তখন আমরা মস্তিষ্কের দিকেই ইশারা করি এবং সম্ভবত কেউই হার্টের দিকে ইশারা করিনা? আল্লাহর নবী মোহাম্মদ (স:) যখন তাকওয়ার কথা বলেন তখন বুকের দিকে ইশারা করেন । The Messenger of Allaah sallallahu alayhi wa sallam said, “Taqwa is here,” and he pointed to his chest. [Muslim, at-Tirmidhi, Ahmad] হার্টের আরেকটি কাজ হল বোধশক্তি (“তাওয়াক্কুল”) । মহান আল্লাহ আমাদেরকে হৃদয় দিয়েছেন উপলব্ধি, অনুভব, বিবেচনা ও অনুধাবন করতে। ইবনে তায়ইমা (র:) বলেন, “যদিও অনেক ডাক্তার ও দার্শনিক ব্রেইনকে বলেন মন অতএব আমাদের চিন্তা ও বোধশক্তি ব্রেইন থেকে আসে হৃদয় থেকে নয়। কিন্তু দেহের কেন্দ্র হচ্ছে হৃদয় বা হার্ট।” ইবনে কাতির বলেন, “ The arrogant philosophers say that the mind is in the brain. [Tafsir ibn Kathir vol 4 p.508] তাই বলা যায় বিশ্বাস, বোধশক্তি, প্রশান্তি, অনুভব, অনুধাবন, মর্মগ্রহণ, হৃদয়ঙ্গম, বিবেচনা এবং অবিচল একাগ্রতা ও ভক্তি (খুশু) এ সবই আসে হৃদয় থেকে আর ব্রেইন হয়তো তা প্রসেস করে।

কোরআনে হার্টের বিভিন্ন নাম
পবিত্র কোরআনে হৃদয়কে ““ক্বল্ব, “ফুয়াদ” এবং “সদর” নামে উল্লেখ করা হয়েছে।

  •  “ক্বল্ববআরবিতে সাধারন অর্থে  হৃদয়  বুঝাতে ব্যবহার হয় যার মূল বা রুট মিনিং আসে, “যা কিছু ঘুরে যায় বা ঘুরানো সহজ” বুঝাতে।(সাব্বিত কলুবানা)। আল্লাহ যখন ঈমান ও অন্তরের রোগ বুঝান তখন তিনি ““ক্বল্ব, শব্দ ব্যবহার করেন।
  • ফুয়াদ” আসে  মূল অর্থ  জ্বলন্ত বা অগ্নিশিখা থেকে যখন হৃদয় আবেগে উদ্দীপ্ত হয়। যার উত্তম উদাহরণ, যখন আল্লাহ মুসা (আ:) এর মায়ের হৃদয়ের অবস্থার বর্ণনা দেন। যখন বলেন “But there came to be a void in the heart (fu’aad) of the mother of Musa.” [Quran, 28:10] চিন্তা করেন তার আবেগে আপ্লুত হৃদয়ের অবস্থা কি হতে পারে যখন তিনি তার নবজাত শিশুকে নদীতে ভাসিয়ে দেন।
  •  “সদর” অর্থ বক্ষস্থল। যখন মহান আল্লাহ গোপন উদ্দেশ্য বা মন্দ অভিপ্রায় বুঝান তখন “সদর (বহুবচনে সুদুর): ব্যববহার করেন যেমন সুরা নাসে “…….ফি সুদুর ইন নাস। The one who whispers in the hearts of Mankind. [Quran, 114: 5]

প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের হৃদয়কে দিয়ে আমরা কি করছি? 
আমাদের হৃদয়কে  কিসের সঙ্গে সংযুক্ত করে রেখেছি? এটা কি আমার বাড়ির সঙ্গে না অর্থের সাথে না আমার প্রিয় টিভি সিরিয়েলের সাথে সংযুক্ত অথবা দুনিয়াবী অন্য কিছুর সাথে না সেই বিশেষ মহুর্ত যা ব্যয় করা হয়  কোরআন অধ্যায়নে এবং রাসুল সম্পর্কে জানতে?  আল্লাহ বলেন, “ when the only one who will be saved is the one who comes before Allah with a heart devoted to Him. [Quran, 26:89]

তাহলে প্রশ্ন হল কীভাবে আমাদের হার্টকে প্রশিক্ষন দিতে পারি আল্লাহর প্রতি অনুগত, উৎসর্গীকৃত ও সুস্থ রাখতে? এ বিষয়ে নিম্নে কিছু নিদর্শন তালিকা দেয়া হল (Check List) যা হচ্ছে শুভ্র ও স্বচ্ছ হৃদয়ের লক্ষণ। তবে তার আগে প্রথমেই যে কাজটি করতে হবে তা হল কায়মনবাক্যে আল্লাহকে ডাকতে হবে তার সুন্দর নাম দিয়ে তার সাহায্য চাইতে হবে।
আল্লাহর নাম ওয়াহ্হাব্ব (প্রদানকারী)অতএব সুস্থ হৃদয় পেতে তারই কাছে চাইতে হবে।
তাঁর আরেক নাম ক্বারিব (অতি আপন ও কাছের স্বত্তা) অতএব হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি ভালবাসা  জন্মাতে আল্লাহের কাছেই চাইতে হবে।
“বস্তুতঃ আমি রয়েছি সন্নিকটে। যারা প্রার্থনা করে, তাদের প্রার্থনা কবুল করে নেই, যখন আমার কাছে প্রার্থনা করে।”[আল বাকারা:১৮৬]
“তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি সাড়া দেব।” [গাফির – ৬০]

এবার দেখা যাক সুস্থ বা নিবেদিত হৃদয়ের নির্দশন বা লক্ষণ কি?

  •   যে হৃদয়ে উপরে বর্নিত সে সব রোগ যেমন ঈর্ষা, দ্বেষ, লোভ, লালসা ইত্যাদি ও যেসব যখন দুনিয়াবী জিনিসের প্রতি  অতিরিক্ত সংযুক্ত হয়ে যায় তখন সে হৃদয়ে যদি অনুতাপ জাগে এবং আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ততা বড়াতে অব্যাহত প্রচেষ্টা বজায় রাখে। – “নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারী এবং অপবিত্রতা থেকে যারা বেঁচে থাকে তাদেরকে পছন্দ করেন।” [আল বাকারা:২২২]
  • যে হৃদয় আল্লাহর স্মরনে, তাঁর এবাদতে ক্লান্ত হয় না এবং বলে আমার প্রভু আল্লাহ  এবং উপরন্তু [তাতেই ] স্থির ও অবিচল থাকে।
  • যদি কোন এবাদত করতে না পারে বা ছুটে যায় তখন যে হৃদয় সে কর্তব্য অবহেলা ও ব্যর্থতায় অনুতাপ জাগে আর সে বেদনা তার কাছে অর্থ হারানোর চেয়ে বেশী কষ্টদায়ক মনে হয়।
  • যে হৃদয় তার খাদ্য ও পাণীয় স্বাদ ও মধুরতার চেয়ে এবাদতের স্বাদ ও প্রশান্তি, মধুরতা  বেশী মনে করে।
  • সে যখন সালাতে দাড়ায় তখন সে দুনিয়াবী চিন্তা ভাবনা পিছনে ফেলে রেখে তার মনে একগ্রতা থাকে তার প্রভুর প্রতি।
  • ভাল কাজ করতে এবং সে কাজটির চেয়ে কাজের নিয়ত,পদ্বতী কি নিখুত ও সঠিকভাবে সম্পাদন হচ্ছে ও আল্লাহর কাছে গৃহীত হচ্ছে সে জন্য তার মন সদা উদবিগ্ন থাকে
  • যে হৃদয় শুধু নিজ স্বার্থ আদায়ে ব্যস্ত না থেকে অন্য মানুষের দু:খ কষ্টে ব্যথিত হয়, অন্যকে তথা সমাজ ও দেশের জন্য সাহায্য করতে এবং মানুষকে ভালবাসতে এগিয়ে আসে এবং অন্যায়কে ঘৃণা করতে সাধ্যানুসারে প্রতিরোধ করতে সচেষ্ট ও সাহসী ভূমিকা রাখে একান্ত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে। “বল, আমার সলাত, আমার কুরবানী, আমার,জীবন ও আমার মরণ জগৎ সমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।”
    ( قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ ) (সূরা আল আনআম/১৬২)
  • সর্বোপরি যে হৃদয় শিক্ষা অর্জনে, জ্ঞান গবেষনা ও চিন্তা ভাবনা করে এবং “উলুল আলবাব” (man of understanding) হতে চায় ও সে বলে “রব্বানা মা খলাকতা হাযা বাতিলা সুবহানাকা ফাকিনা আযাবান নার” অর্থঃ হে আমাদের রব! তুমি এসব অনর্থক সৃষ্টি করনি। তুমি পবিত্র মহান, সুতরাং তুমি আমাদেরকে আগুনের আযাব থেকে রক্ষা কর।  (সুরা ৩:১৯১)

উপরের চেক লিস্টে যদি কারো হৃদয়ের অবস্থা না পড়ে তাহলে বুঝতে হবে হৃদয়ের অপব্যবহার হচ্ছে!

প্রশ্ন হচ্ছে এ দুনিয়ায় মানব হৃদয় কেন এত অস্থির ও অশান্তিতে নিমজ্জিত হয়? এর উত্তরে অনেক ইসলামী চিন্তাবিদকে বলতে শুনেছি, মানুষের রুহ বা আত্মা এসেছে শান্তির নীড় স্বর্গ থেকে যেখানে ছিল তার আসল বাসস্থান। তাই রুহের এ পৃথিবীতে মানব দেহে আগমন গৃহচ্যুত তথা ঘর ছাড়া উদ্বাস্তু জীবন। এখানে  সে সদা ব্যস্ত সুখ শান্তির খুঁজে, ছুটে চলেছে পৃথিবীর বিভিন্ন আকর্ষণের পিছনে। আর তা করতে মানুষ যখন স্রষ্টা প্রদত্ত রাস্তা ছেড়ে চলে ভিন্ন পথে তখন হিংসা বিদ্বেষ ও মানুষ হত্যা তার কাছে কোন ব্যাপারই নয়। পৃথিবী দখলের জন্য সে সৃষ্টি করে মারণাস্ত্র, গড়ে তুলে অস্ত্রের ফ্যক্টরী শুরু করে হাজারো কুকর্ম।  এ জন্য শুভ্র  হৃদয়ের বান্দাকে আল্লাহ বলবেন, “ইরজি ইলা রাব্বিকি ( ফিরে এসো তোমার প্রভুর পানে, …….প্রবেশ কর আমার জান্নাতে -সুরা ফজর )।

তবে বিশ্বাসীকে হতাশ হবার কারণ নাই সময় থাকতে পদক্ষেপ নিলে তার হৃদয়কে সে শুভ্র স্বচ্ছ হৃদয়ে রূপান্তরিত করতে পারে। শুধু প্রয়োজন সদিচ্ছার।
“হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর বাড়াবাড়ি করেছো তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না, নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেবেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও করুণাময়।”[আয-যুমারঃ ৫৩]
তবে আল্লাহ তাঁর রহমতের দরজা খুলে দিয়ে বান্দাহকে সর্তক করে দেন যাতে নিম্নে বর্নিত অবস্থায় পৌছার আগেই সে যেন আল্লাহর পথে ফিরে আসে।

কি সেই অবস্থা?
 সুরা জুমার আয়াত ৫৪ থেকে ৫৮ আয়াতে আল্লাহ তা জানিয়ে দিয়েছেন:

১) আজাবে পড়ার আগে:
وَأَنِيبُوا إِلَى رَبِّكُمْ وَأَسْلِمُوا لَهُ مِن قَبْلِ أَن يَأْتِيَكُمُ الْعَذَابُ ثُمَّ لَا تُنصَرُونَ
তোমরা তোমাদের পালনকর্তার অভিমুখী হও এবং তাঁর আজ্ঞাবহ হও তোমাদের কাছে আযাব আসার পূর্বে। এরপর তোমরা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না; (সুরা জুমার- আয়াত :54)
২) অজ্ঞাতসারে মৃত্যু আসার পূর্বে :
(আয়াত: وَاتَّبِعُوا أَحْسَنَ مَا أُنزِلَ إِلَيْكُم مِّن رَّبِّكُم مِّن قَبْلِ أَن يَأْتِيَكُمُ العَذَابُ بَغْتَةً وَأَنتُمْ لَا تَشْعُرُونَ (55
তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ উত্তম বিষয়ের অনুসরণ কর তোমাদের কাছে অতর্কিতে ও অজ্ঞাতসারে আযাব আসার পূর্বে,
৩) হায়, হায় কি করেছি বলে আফসুস করার আগে 
أَن تَقُولَ نَفْسٌ يَا حَسْرَتَى علَى مَا فَرَّطتُ فِي جَنبِ اللَّهِ وَإِن كُنتُ لَمِنَ السَّاخِرِينَ (56
যাতে কেউ না বলে, হায়, হায়, আল্লাহ সকাশে আমি কর্তব্যে অবহেলা করেছি এবং আমি ঠাট্টা-বিদ্রুপকারীদের অন্তর্ভূক্ত ছিলাম।
৪) যখন বলতে যাবে হায় আল্লাহ চাইলে আমি ধার্মিক হতে পারতাম:
أَوْ تَقُولَ لَوْ أَنَّ اللَّهَ هَدَانِي لَكُنتُ مِنَ الْمُتَّقِينَ (57
অথবা না বলে, আল্লাহ যদি আমাকে পথপ্রদর্শন করতেন, তবে অবশ্যই আমি পরহেযগারদের একজন হতাম।
৫) যখন বলবে হায় আমি যদি পুনরায় দুনিয়ায় ফেরত যেতে পারতাম:
أَوْ تَقُولَ حِينَ تَرَى الْعَذَابَ لَوْ أَنَّ لِي كَرَّةً فَأَكُونَ مِنَ الْمُحْسِنِينَ (58
অথবা আযাব প্রত্যক্ষ করার সময় না বলে, যদি কোনরূপে একবার ফিরে যেতে পারি, তবে আমি সৎকর্মপরায়ণ হয়ে যাব।

  শুভ্র হ্রদয়ের সফলতা:
শুভ্র হৃদয়ের চুড়ান্ত সফলতা অনুভব হবে একজন মানুষ যখন মৃত্যুর দ্বার প্রান্তে, এক দিকে ভীষণ মৃত্যু যন্ত্রণা সেই সাথে দুনিয়া ছেড়ে আজানার পথে চলে যাওযার  প্রচণ্ড  ভয়  ও ভীতির মূহুর্ত, আত্মীয় স্বজন ডাক্তার সবাই পাশে কিন্তু কেউ কোন সাহায্য করতে পারছে না!      

•       আর ঠিক সেই কঠিন মূহুর্তে  হঠাৎ তার পাশে ফেরেস্তারা এসে বলছেন , “হে আল্লাহর বান্দা তুমি ভয় করো না, চিন্তা করো না এবং তোমাকে দেয়া প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ শোন।

•       কে সেই সৌভাগ্যবান?

সে জবাব পবিত্র কোরআনে, মহান আল্লাহ বলেন,

এ ক্ষেত্রে যারা বলে, “আমাদের প্রভু আল্লাহ্‌ ”,এবং উপরন্তু [তাতেই ] স্থির ও অবিচল থাকে, তাদের নিকট [ সময়ে সময়ে ] ফেরেশতারা অবতীর্ণ হয়।
[ তারা বলে ] , ” তোমরা ভীত হয়ো না ,দুঃখিত হয়ো না। বরং সুসংবাদ গ্রহণ কর সে [ শান্তির ] বেহেশতের যার প্রতিশ্রুতি তোমাদের দেয়া হয়েছে। – (সুরা ৪১:৩

যারা পরলোকের অনন্ত জীবনে সাফল্য লাভে আগ্রহী , তারা এই শ্বাসত সত্যকে হৃদয়ঙ্গম করে যে আল্লাহ্‌-ই একমাত্র চিরন্তন সত্য। সুতারাং তারা তাদের পৃথিবীর শিক্ষানবীশ কালকে দৃঢ়তার সাথে ও অধ্যবসায়ের সাথে আল্লাহ্‌র আইনকে তাদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করে। এরাই মোমেন ব্যক্তি। এদের সম্বন্ধে এই আয়াতে সুসংবাদ দান করা হয়েছে। মোমেন ব্যক্তিদের সাথে থাকবে ফেরেশতা যারা তাদের বন্ধুরূপে রক্ষণাবেক্ষণ করবেন। এখানেই শুভ্র  হৃদয়ের সফলতা আর চিত্রটি পাপীদের চিত্রের ঠিক বিপরীত।পাপীরা সেদিন শয়তানের ভর্ৎসনা ব্যতীত আর কোন সাহায্যকারী বন্ধু বা রক্ষাকারী লাভ করবে না।

References:
http://www.amazon.com/The-Hearts-Code-Tapping-Wisdom/dp/0767900952
 Why is the Heart So Important in Islam? | Understand Quran

Facebook Comments

2897 জন পড়েছেন


মন্তব্য দেখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *