চার বিবাহ সমস্যা ও একটি মানহাজের অনুসন্ধান

217 জন পড়েছেন

ভূমিকা

ইসলামের চার বিবাহ নিয়ে অনেক কথাবার্তা। ইদানীং একজন আলেমের অতিরিক্ত দুটো মানবিক বিয়ে সামনে আসায় প্রাতিষ্ঠানিক প্রায় পনের-শো বছরের চার বিয়ের বিধান চ্যালেঞ্জ হতে দেখা যাচ্ছে। বলা হচ্ছে ইসলামে আদপে চার বিয়ের সার্বিক কোন বিধান নেই, যে চার বিয়ের কথা কোরানের ৪:৩ আয়াতে এসেছে, সেটি কেবল এতিম মেয়েদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। 

আমি যদিও বহু-বিবাহ প্রথার সমর্থক নই, কিন্তু এই চ্যালেঞ্জ যেভাবে ছুড়া হচ্ছে, সেটা আমার দৃষ্টিতে, যুক্তি, ভাষা ও প্রথাগত দিক থেকে সঠিক নয়। আমি তাদের অভিলক্ষ্যের প্রতি সংবেদনশীল, কিন্তু ব্যাখ্যার সুনির্দিষ্ট মানহাজের (methodology) অনুপস্থিতিতে বিচ্ছিন্ন ব্যাখ্যা গৃহীত হবে বলে মনে হয় না, কেননা পনের-শো বছরের প্রথাটি এতই নড়েবড়ে নয় যে কিছু একটা দাঁড় করালেই তা মোমের মত গলে যাবে।  বরং বলা যায়, যদি কোন মানহাজ (‘মিনহাজ’ লেখাও শুদ্ধ) বা স্ট্রাটেজির ভিত্তিতে ব্যাখ্যা আসে, যদি গ্রহণ-বর্জনের মূল-ভিত্তি বোঝা যায়, তবেই তা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। আমাদের এই লেখায় আয়াতটি কেন একান্তভাবে (exclusively) এতিম-কেন্দ্রিক নয়, সেটাই দেখাব এবং উদাহরণস্বরূপ একটি মানহাজের আলোচনাও করব।

আয়াতটির গঠন প্রণালী

চলুন প্রথমে আয়াতটি দেখি। কোরানের ৪:৩ আয়াতটি একটি শর্ত-বাক্য (conditional sentence)। এমন বাক্যের দুটো অংশ থাকে। একটিকে বলা হয় ‘শর্তাংশ’ (protasis) আর অপরটিকে বলা হয় ‘সিদ্ধান্ত-অংশ’ (বা সিদ্ধান্তাংশ apodosis)।

আয়াতের প্রথম অংশে বলা হচ্ছে: “তোমরা যদি ভয় কর যে ইয়াতিমদের ব্যাপারে ন্যায্যতা/সমতা বিধান করতে পারবে না” এবং দ্বিতীয় অংশে বলা হচ্ছে “তাহলে, নারীদের থেকে, তোমাদের পছন্দ মত, দুইজন, তিনজন বা চারজনকে বিয়ে করে নাও।”

এখানে আপাতদৃষ্টে কিছু সমস্যা বা অস্পষ্টতা (ambiguity) দেখা যেতে পারে। প্রথমাংশের এতিম মেয়েগণ ও দ্বিতীয়াংশের নারীগণ কি একই শ্রেণীর এতিম নারী? না, দ্বিতীয়াংশের নারীগণ মোটেই এতিম শ্রেণীর নন? কোরানের ভাষা অনেক স্থানে এভাবে, বা এর চেয়েও বেশি অস্পষ্টতায় পাওয়া যেতে পারে, এবং এজন্যই ধর্মের অঙ্গনে এক ব্যাখ্যা ইন্ডাস্ট্রির আবির্ভাব হতে হয়েছে (এবং এই বাস্তবতা শিক্ষণীয়-ধারায় প্রাতিষ্ঠানিক হয়েছে, তবে বলতে পারেন যে বিষয়টি যেহেতু ধর্মের, তাই ব্যাখ্যা পেতেই হবে, এবং এই প্রয়োজনের তাগিদেই একটি শ্রেণী ও তৎসংশ্লিষ্ট শিক্ষাঙ্গনের আবির্ভাব ―একটি অন্যটির সম্পূরক হিসেবে)। আর এজন্যই শত শত তফসির (ব্যাখ্যা) প্রণীত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। 

কিন্তু ঘটনা যাই হোক, আমাদেরকে আয়াতটিকে দেখতে হবে। এটি সত্যিই কি কেবল এতিম কেন্দ্রিক, না এতিম প্রসঙ্গে বহুবিবাহের শর্তগত নতুন আইনি বিধান। আমরা যদি এটিকে একান্তভাবে ইয়াতিম-কেন্দ্রিক ধরতে যাই, তাহলে এর অর্থ যেন এভাবে দাঁড়ায়:

“তোমরা যদি ভয় কর যে ইয়াতিমদের ব্যাপারে ন্যায্যতা/সমতা বিধান করতে পারবে না, তাহলে এতিমদের মধ্য থেকে দুইজন, তিনজন বা চারজনকে বিয়ে করে নাও ―তোমাদের পছন্দ মত।”

এখানে কি কোন যৌক্তিক সমস্যা দেখা যায়? হ্যাঁ, এখানে শর্ত-বাক্যের প্রথম অংশে (protasis) যা ভয়ের বিষয় বলে উল্লেখ হয়েছে, দ্বিতীয়াংশে সেটিই করতে বলা হচ্ছে। বিষয়টা যেন এভাবে: “তোমরা যদি শামুক-পোলাও খেতে ভয় পাও, তবে শামুক-পোলাও হাড়ি থেকে ইচ্ছেমত এক প্লেট, দুই প্লেট, তিন প্লেট বা চার প্লেট খেয়ে নাও।” কথাটি কি যৌক্তিক হয়? আমাদের দৃষ্টিতে নয়।

দেখাই যাচ্ছে এই বাক্যের অর্থ যৌক্তিকভাবে কেবল এতিমদের জন্য প্রযোজ্য হতে পারে না, কিন্তু বাক্যের গঠন প্রণালীতে আপাত যে সমস্যা অনুভূত হয়, সেটি হচ্ছে সেকালের রচনা কৌশল। এতে শর্তাংশ ও শর্ত-পরবর্তী অংশের মধ্যস্থলে একটি উহ্য বা নিহিত (محذوف) ধারণা রয়েছে এবং এই মধ্যবর্তিতায় যে ‘ফা’ (ف) ব্যবহৃত হয়েছে সেটি হচ্ছে ‘পুনগ্রাহী ফা’ (the resumptive fa/ الفاء الاستئنافية)। বাক্যের প্রথম অংশে যা এসেছে সেটা সেই সমাজের আলোচিত বিষয়। তাই এই অংশে যা উল্লেখ হয়েছে তা ইঙ্গিতেই সবাই বুঝে নেবে, ব্যাখ্যার প্রয়োজন হবে না। এই ইঙ্গিতবাহী স্থান থেকেই ‘ফা’-হরফ দিয়ে দ্বিতীয় অংশের সিদ্ধান্তমূলক সমাধান অংশে যাওয়া হয়েছে। এই ‘ফা’ (فاء) যেন আগের কথার ধারাবাহিকতায় ‘পরবর্তীতা’ বুঝাতে।

আমরা যদি এখন নিহিত কথাটি স্কয়ার ব্রাকেটে স্থাপন করে নেই, তবে বাক্যটিকে এভাবে আনতে পারি:

“তোমরা যদি ভয় কর যে ইয়াতিমদের ব্যাপারে ন্যায্যতা/সমতা বিধান করতে পারবে না, তাহলে, [এতিমদেরকে বাদ দিয়ে অন্য] নারীদের থেকে দুইজন, তিনজন বা চারজনকে বিয়ে করে নাও ―তোমাদের পছন্দ মত।”

আগের উদাহরণটাও এভাবে আসুক: “তোমরা যদি শামুক-পোলাও খেতে ভয় পাও, তবে [শামুক-পোলাও-হাড়ি বাদ দিয়ে অন্য] হাড়িগুলো থেকে ইচ্ছেমত এক প্লেট, দুই প্লেট, তিন প্লেট বা চার প্লেট খেয়ে নাও।”

কথাটি কি যৌক্তিক হল? হ্যাঁ, আমাদের দৃষ্টিতে যৌক্তিক, এবং এটিই হচ্ছে ক্লাসিক্যাল ব্যাখ্যা। আমরা এটা বলতে পারি না যে প্রায় পনের-শো বছর ব্যাপী এই বাক্যটি পণ্ডিতগণ ভাষিকভাবে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। মানুষ ধারণায় ভুল করতে পারে, তবে তাদের ভাষায় নয়। যেমন আমরা বলতে পারি, এক যুগে মানুষ পৃথিবীকে ফ্লাট বা চেপটা ধারণা করত, কিন্তু এটা বলতে পারি না যে তারা এই ফ্লাট অর্থের বাক্যটি বুঝতে ভুল করেছিল।

আয়াতটি এতিম-কেন্দ্রিক হতে অন্যান্য সমস্যা

ভাষিক উদাহরণের পরে, এই আয়াতটি এতিমদের জন্য একান্তভাবে প্রযোজ্য না হওয়ার ক্ষেত্রে আরও যৌক্তিক ও ধর্মীয় কারণ রয়েছে। এটি কেবল এতিমদের জন্য হয়ে থাকলে, বাক্যের উদ্দেশ্য যেন কোন এতিমখানার মালিকের জন্য প্রযোজ্য দেখায়, কেননা অন্যথায় আপনি কীভাবে দুই, তিন, চার এতিম মেয়ে পেতে পারেন? তাও আবার ইচ্ছেমত এক থেকে চার সংখ্যায়। আপনার কোন আত্মীয়ের বা পরিবারের কারো চারটি এতিম মেয়ে থাকলেও, এবং তাদের সকলের প্রতি আপনি সমতা দানের শক্তি রাখলেও, একের অধিক বিয়ে করতে পারবেন না, কেননা একই সাথে একের অধিক বোন বিয়ে শরিয়তে বৈধ নয় (৪:২৩)।

তৃতীয়ত, এবং সর্বপ্রধান সমস্যা হল যে এই বাক্য যদি একান্ত এতিম-কেন্দ্রিক হয়, তবে এতিমের বাইরে একজন মুসলিম পুরুষ যেকোনো সংখ্যক নারী বিয়ে করতে বাধা থাকে না, কেননা এই আয়াত ব্যতীত বিয়ের সংখ্যা সীমাবদ্ধ করে দেয়ার আর কোন আয়াত নেই। তাহলে? তাহলে, উপায় নাই গোলাম আলী, উপায় নাই।

সুতরাং দেখাই যাচ্ছে যে এই আয়াতখানি এতিম-কেন্দ্রিক হয়ে গেলে ইসলাম ধর্মে বহুবিবাহ যেকোনো সংখ্যায় বৈধ হয়ে যায়, এবং এই বৈধতার পারিভাষিক ন্যায্যতা (justification) দেবে আল-ইবাহাতুল আসলিয়্যাহ (the original permissibility or socially approved rules)। 

এখানে মনে রাখতে হবে যে টেক্সট কখনো কন্টেক্সটের (context) বাইরে হয় না। তাহলে বিষয়টিকে আরও সুস্পষ্ট করার জন্য আমাদেরকে কী করতে হবে? আমাদেরকে সেকালের সমাজকে বুঝতে হবে, প্রথা বা উরফ বুঝতে হবে ― কন্টেক্সট হিসেবে।

এর আগে আমরা বলতে চাই যে কেউ কোরানে বিশ্বাস করুন অথবা না’ই করুন, সপ্তম শতাব্দীর কোরানের প্রকৃত অর্থ বুঝতে হলে তাকে সেকালের প্রথা, রীতি ও সমস্যা বুঝতে হবে, যে প্রেক্ষিতে কোরান প্রকাশ পেয়েছিল (revealed)। তারপর, নতুন কোন অর্থ গঠন করতে হলেও, তাকে মানহায (ব্যাখ্যার মূলনীতি বা পদ্ধতি) আবিষ্কার করতে হবে ― নতুন করে হলেও। আমি এখানে আংশিকভাবে সেটার একটি রূপ দেখাতে প্রয়াস পাব, শুধু দেখার জন্য। চলুন আমরা প্রথমে সেই যুগের প্রথা, প্রয়োজন ও সমস্যা দেখি যার সমাধান ছিল এই আয়াত।

পটভূমি

আমরা যদি এই আয়াতের পটভূমি অনুসন্ধান করি, তাহলে দেখতে পাব যে সূরাহ নিসায় তৎকালীন সমাজ ও প্রথাগত আইনের পরিবর্তন ও সংশোধন আনা হয়েছিল। এতে ছিল সম্পদে নারীর উত্তরাধিকার, এতিমের অধিকার, বহু বিবাহের উপর সীমা-নির্দেশ ইত্যাদি। তখন সেকালের সমাজের প্রথাগত অনেক সমস্যার সমাধানের প্রয়োজন ছিল। সেদিন অনেক নারী পর্যাপ্ত শক্তির অভাবে, এবং প্রথাগত কারণে উত্তরাধিকার পেত না। পুরুষেরা অসংখ্য বিবাহ করত, কিন্তু সকলের প্রতি ন্যায্য আচরণ করত না। প্রেম, ভালবাসা, ভরন-পোষণ, রাত্রিযাপন ইত্যাদিতে সমতা দেখাত না, বা অধিক সংখ্যার কারণে সেটা করতেও পারত না। সাধারণত এতিমের সম্পদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করত বটে, কিন্তু প্রয়োজনে পারিবারিক সূত্রের এতিম মেয়েদের সম্পদ বুঝিয়ে দিত না। তার সম্পদের কারণে অন্যত্র বিবাহও দিত না, বরং চেষ্টা করত নিজেই বিয়ে করে সেই সম্পদ তার অধিকারে রাখতে। বিয়ে করলেও সমাজের চলতি হারের মহর দিত না। এই ধরনের প্রচলিত নিয়মের পরিবর্তন প্রয়োজন ছিল। সূরাহ নিসায় এমন কিছু সংশোধনী আইন এসেছে। ৪:৩ ও ৪:২৭ আয়াতও এই পর্যায়ের।

৪:৩ আয়াতে বলা হয়েছে যে এতিমের হক (পূর্ণ মহর, খাদ্য, পরিধেয়, বাসস্থান, অন্য স্ত্রীদের মোকাবেলায় সম-মর্যাদা, সার্বিক সমতা) সঠিকভাবে দিতে না পারলে, তাদেরকে বিয়ে করবে না, বরং তাদের সম্পদ বুঝিয়ে দেবে। এই পরিবর্তন  শুধু এতিম কেন্দ্রিকই  নয়, বরং এখন থেকে সাধারণ মহিলাদেরকেও আগের মত যেকোনো সংখ্যায় বিয়ে করতে পারবে না। পূর্ববর্তী সামাজিক আইনে সংশধনী এসেছে। এই আয়াতকে তাই আইনি-তসফিরে ‘নাসিস’ আয়াত বলে উল্লেখ হয়, কেননা এতে সংশোধনী রয়েছে এবং সংশোধন, পরিবর্তন, পরিবর্ধন ‘নাসখ’ ধারণার অন্তর্ভূক্ত। সুতরাং এখন থেকে, অবস্থা বিবেচনায়, এক থেকে চার সংখ্যার ভিতরেই থাকতে হবে। আবার অবস্থা বিবেচনায় এক স্ত্রী সামাল দিতে অক্ষম হলে, অধিকারভুক্ত দাসী নিয়েই চলবে। এতেই একাধিক বিবাহের সমস্যা ও এতিম বিবাহের সমস্যাগুলোর উপস্থিত সমাধান হয়, (এই পটভূমি ইমাম শাওকানি ও কুরতুবি থেকে গৃহীত)।

তবে, যেহেতু এই আয়াতে ব্যক্তির সম্পদ ও সামর্থ্যের সীমার ভিত্তিতে বিবাহের সংখ্যা এক থেকে চার করা হয়েছে, তাই যার সম্পদ ও সামর্থ্য রয়েছে, সেও কি চার সংখ্যায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে, না তার জন্য তার নিজ বিবেচনাই নির্ধারণী চয়েস (choice) থেকে যাবে ―এই সম্ভাবনা থেকেই যায়। আমরা অনেক সাহাবিকে চারের অধিক বিবাহ করার অনেক তথ্য পেয়ে থাকি [১]।

মানহাজ – একটি নমুনা

এখন পটভূমির আলোকে দেখা যাচ্ছে যে ৪:৩ ও ৪:২৭ এবং এমন আরও অনেক আয়াত সেকালের সামাজিক ও প্রথাগত সমস্যাদিকে নিয়ন্ত্রণের প্রেক্ষিতে গৃহীত, এবং সেগুলো যে তৎকালীন সমাজের তৎকালীন সমস্যার সমাধান, এটিও একান্তভাবে প্রতিভাত।

মানুষের যৌন-প্রবৃত্তি প্রকৃতিগতভাবে অপরাপর প্রাণীরই ন্যায়, তবে সামাজিকতার প্রয়োজনে তাদের যৌন-জীবনে কিছু নিয়ম পালিত হতে হয়। এই প্রয়োজনের সম্পর্ক তার কাল ও সমাজের সাথেও সম্পৃক্ত। এগুলো কাল-ভেদে পরিবর্তনশীলও। স্থান-কাল ভেদে মানুষের সমাজ, আর্থিক আয়-উন্নতি, সামাজিক ব্যবস্থাপনা ―সব কিছুর সার্বিক বিবেচনায় তাদের পারিবারিক গঠন নির্ণীত হয়। সুতরাং সার্বিক বিবেচনায় এটা বলা যায় না যে সপ্তম শতাব্দীর মরু-আরবের জীবন প্রণালীর ভিত্তিতে গৃহীত চার বিবাহ, স্থান-কাল নির্বিশেষে, সকল পুরুষের ‘চিরন্তন অধিকার’ হয়ে পড়েছে। আবার এটাও বলা যায় না যে কোন এক প্রাচীন সহস্রাব্দতে বা শতাব্দীতে সেকালের মানুষ যা করেছিল তা অনন্ত কাল ব্যাপী সকলের জন্য চিরন্তন হতে পারে। এটা কেবল জীবনের সমস্যাই বাড়াবে, কমাবে নয়।

তবে ইসলাম ও প্রাচীনতার যে সমস্যা এখন জটিলতা ধারণ করেছে সেটা হচ্ছে কালের সাথে ধর্ম প্রবর্তনের সংশ্লিষ্টতা (association)। যেহেতু ওই কালটি ছিল নবীর ধর্ম প্রবর্তনের কাল, এবং যেহেতু ওই কালের সামাজিক সমস্যার কিছু সমাধান এসেছিল, তাই ধর্ম যেন সেই কালের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়েছে। এই সংশ্লিষ্টতায় ধর্মবেত্তাগণ ধীরে ধীরে আবেগের সাথে কালীন বিষয়কে সকল কাল ও সকল স্থানের জন্য প্রযোজ্য করে ফেলেছেন।

এই চিরন্তনতার সাথে কাজ করে এই হাদিসটি: আমি তোমাদের মধ্যে দুটো জিনিস রেখে যাচ্ছি, একটি হল আল্লাহর কিতাব আর অপরটি তার রাসূলের সুন্নত। তোমরা যতদিন এই দুটোকে ধারণ করবে ততদিন পথভ্রষ্ট হবে না। শিয়াদের কাছে দ্বিতীয়টি হচ্ছে ‘আহলে বাইত’ অর্থাৎ নবীর পরিবারের অনুসরণ। বিদায় হজ্জে এক লক্ষ পয়ত্রিশ হাজার সাহাবি উপস্থিত থাকলে এটা মাত্র হাতে-গুণা দুই-তিন জন শোনার কথা নয়। অধিকন্তু এই কয়জনের বর্ণনাতেও আবার নানান কথা আছে। আমরা ক্ষমতাদ্বন্দ্ব, রাজনীতি, ধর্মীয় প্রেক্ষিতে হাদিস ‘তৈরির’ যেসব ইতিহাস পাই, তাতে এর কালীন প্রয়োজনীয়তা ও ইতিহাসের প্রেক্ষিতও দেখতে পাই। এই হাদিসটি এক পাশে রাখলে, যে ‘কালীনতা’ চিরন্তন হয়ে পড়েছে, এই লৌহ শিকল থেকে মুক্তির একটি পথ আসতে পারে।

মানহাজের পরিব্যাপ্তি

এবারে এটা দেখাই যাচ্ছে যে আলোচ্য আয়াতটি ছিল সেকালের সমস্যার একটি কালীন সমাধান, কিন্তু আজকের সমাজের গঠন প্রণালী সেকালের মত নয়। আজকের পুরুষ দুই-দুই, তিন-তিন, চার-চার নারী পছন্দমত নিয়ে নেবার সামাজিক আদর্শে নেই, নারীর অবস্থানও সেকালের মত নয়। এই ধারণাটিতে পুরুষতান্ত্রিকতা, তাদের অধিকার ও ক্ষমতা নিহিতভাবে কাজ করতে দেখা যায়, নারীরটা নয়, নারী উহ্য। আজকের আর্থ-সামাজিকতা, উৎপাদন ও প্রক্রিয়া ভিন্ন।  সার্বিকভাবে সবকিছু ভিন্ন। আজ সেকালের মাপে এই কালকে সাজাতে সেকালের টেক্সট নিয়ে যে প্রাণান্তকর ব্যাখ্যাবাজির সাধনা করতে হয়, এর চাইতে নিজেদের কালের হেদায়াত নিজেদের জ্ঞানবুদ্ধিতে পেয়ে যাওয়া অধিক সহজ ও প্রাক্টিক্যাল। আপনি যদি ১৯৭০ দশকের ফোর্ড কর্টিনা মার্ক ২ (Ford Cortina Mark II) গাড়িটিকে সকল যুগ ও কালের জন্য উপযোগী ভেবে নেন, তবে সমস্যা তো হবেই।

এখন আপনি বলতে পারেন আমরা যদি, এই পদ্ধতিতে, এভাবে আয়াত বিবেচনা করতে থাকি, তাহলে কোরানের যুদ্ধের আয়াত, আত্মসমর্পিত যুদ্ধ-বন্দীদের হত্যার আয়াত, ইয়াহুদী-নাসারাদেরকে জিযিয়া দানে বাধ্য করার আয়াত, নেতাদের নবুয়ত না মানার কারণে নিরপরাধ নারী-শিশু, বৃদ্ধ-পৌড় সবাইকে ম্যাসাকার করার আয়াত, পৌত্তলিক নির্মূলের আয়াত, অবিশ্বাসীদেরকে পশু, গর্দভ, বানর ইত্যাদি বা সার্বিকভাবে পশু-আখ্যায়নের (dehumanisation) আয়াত, নবীর পারিবারিক সমস্যা সংক্রান্ত আয়াত, অনেক আজগুবি গল্প-কাহিনী সম্বলিত আয়াত ইত্যাদি যাবতীয় আয়াত কালীন অবস্থার প্রেক্ষিতগত আয়াত হয়ে যায়, এবং এই নতুন মানহাজ (পদ্ধতি) অবলম্বন করতে গেলে, যেমন দেখাই যাচ্ছে, কোরানের একটি অংশ কালীন হয়ে পড়ে ―চিরন্তনতা হারায়! কিন্তু মৌলিক বিষয় অবশিষ্টই থাকে – যা ব্যক্তি, সমাজ ও মানবতার জন্য প্রেক্ষিতগত। এতে ঐক্যের ধর্মীয় রূপ লাভ হয়। মানুষ যদি ‘বিশ্বাস’, ‘ভাল কাজ’, সার্বিক মানবতাবোধ ইত্যাদিকে চিরন্তন বাণী হিসেবে পায়, তবে এটা কী প্রাচীন কালের সাথে সম্পৃক্ত অসমাধানীয় সমস্যা (irreconcilable problems) ও  আবহমান-কালীন বিতণ্ডার মোকাবেলায় একটি উত্তম পন্থা হতে পারেনা? কিন্তু এতেও অনেকের বুক ফাটার উপক্রম হতে পারে।

তবে এই বুক-ফাটা নিয়ে থাকলে চলবে না, কেননা আধুনিক সভ্যতা যেসব নিয়ম, যুক্তি ও ধ্যান-ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত, সেসবের মোকাবেলায় ক্লাসিক্যাল যুগের সমস্যাবহুল গল্প-কাহিনী, সাম্প্রদায়িক আচার-আচরণ, বিশ্বাসের ভিত্তিতে বৈষম্য, হিংসা-বিদ্বেষ, হত্যা, সন্ত্রাস ইত্যাদি ব্যাখ্যাবাজির মাধ্যমে চিরদিন চালিয়ে নেয়া অসম্ভব। এতে প্রচলিত ৭৩ ফেরকার সাথে আরও ১০টা সংযোগ করতে পারেন, কিন্তু বিতণ্ডা চলতেই থাকবে।

তবে বুকে সাহস ধারণ করলে দেখা যাবে যে ভয়ের কিছু নেই। যদি এই নতুন মানহাজের ভিত্তিতে আপনি ‘বিশ্বাস’ পান, ‘ভাল কাজের যুক্তি’ পান, যদি ন্যায়-পরায়ণতা, সাম্য-সুবিচারের স্থানগুলো স্পষ্ট করে পান, যদি এগুলোর ভিত্তিতে আধ্যাত্মিক জীবনের সূত্রও পান, তবে ভয় কীসের? আপনি তো ধার্মিক থাকছেনই। যদি হিংসা-বিদ্বেষ, যুদ্ধ-জেহাদ, বৈষম্য-অসাম্য চলেই যায়, তো যাক। জগতের সবাইকে নিয়ে শান্তিতে থাকতে পারলে এই বিশ্বলোকের মালিকের কী কোন অসুবিধে হবার কথা?

ধর্ম তো উত্তম জীবন-যাপনেরই জন্য, আর দীন হচ্ছে নসিহত। আমাদের দৃষ্টিতে ধর্ম আইন ও শাসন ব্যবস্থার সাথে জড়িয়ে পড়া এক সংকটময় বিষয়। ধর্ম তার বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতার আঙ্গিনায় সীমাবদ্ধ থাকবে, না হয় স্থানভেদে ধর্ম সন্ত্রাসী হতে বাধ্য, রক্তারক্তিতে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য। আইন ও শাসন ব্যবস্থা মানুষ নিজেরা নিজেদের স্থান, কাল ও অবস্থার প্রেক্ষিতে তৈরি করবে, এবং তা প্রয়োজনের ধারায় পরিবর্তিত হবে।

এখানে যা বলা হল, বা যে মানহাজ দেখানো হল, তা নিছক একটা উদাহরণ স্বরূপ। আপনি অন্য কোন উপায়েও অন্য ধরনের কোন মানহায চিন্তা করতে পারেন, যদি তা একালের মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি ও জীবন যাপনের সাথে খাপ খায়। কিন্তু এখানে এক-কথা, ওখানে আরেক-কথা ―এভাবে খণ্ড-নীতিতে কাজ হবে না, আয়াতে আয়াতে, হাদিসে হাদিসে, যার যার মত করে বিতণ্ডা চালিয়ে নেবে।

___________________________

নোট [১]: হযরত ওমরের ৯ বিবি, আবু বাকরের ৪, ওসমানের ৯ (২ জন মৃতসহ), আলীর ৯, (ফাতিমা-সহ), যোবায়ের বিন আওয়ামের ৯, আব্দুর রাহমান বিন আওফের ২০, সা’দ বিন মালিকের ১১, তালহার ৯ [Abdulkarīm, Kh. (1997), Al-Ṣaḥābah wa al-Ṣaḥābah (al-sifr al-thānī, 1st Ed.), Cairo: Sīnā li al-Nashr, pp. 359-365.] ― এভাবেই বড় বড় সাহাবিদের নারী সংখ্যা পাওয়া যায়। এই উল্লেখিতরা সবাই বেহেস্তের সংবাদপ্রাপ্ত। তারপর সেকালে লোকদের থাকত অনেক দাসী-বাঁদীও।

Facebook Comments

217 জন পড়েছেন

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতত্ত্ব, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক।

মন্তব্য দেখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *