ইসলামের দৃষ্টিতে মূর্তি বা ভাস্কর্য

367 জন পড়েছেন

যেদিন মহান রাব্বুল আলামীন হযরত আদম (আঃ) কে সৃষ্টি করে সমস্ত ফেরেশতাগণকে তাঁকে সেজদা করতে আদেশ করলেন, তখন একমাত্র আজাজিল ছাড়া আর সবাই আল্লাহর হুকুম পালন করলেন।

وَاِذۡ قُلۡنَا لِلۡمَلٰٓٮِٕكَةِ اسۡجُدُوۡا لِاٰدَمَ فَسَجَدُوۡۤا اِلَّاۤ اِبۡلِيۡسَ اَبٰى

(ওয়া ইয্‌ কুল্‌না লিল্‌মালাইকাতিস্‌ যুদু লিআদামা ফাসাযাদু ইল্লা ইব্‌লীসা আবা’)

আর স্মরণ করুন, যখন আমরা ফেরেশ্‌তাগণকে বললাম, ‘তোমরা আদমের প্রতি সেজদা করো,’ তখন ইব্‌লীস ছাড়া সবাই সেজদা করলো; সে অমান্য করলো। (সুরাহ ত্বহাঃ আয়াত ১১৬)    

 সেদিন থেকেই আজাজিল শয়তান উপাধী নিয়ে মানুষকে বিপথগামী করার কাজে আত্মনিয়োগ করলো। সে মানব জাতির আদি শত্রু। সে সর্ব প্রথম আমাদের আদি পিতা-মাতার সাথে শত্রুতা সাধন করেছে এবং নানা রকমের কৌশল, বাহানা ও শুভেচ্ছামূলক পরামর্শের জাল বিস্তার করে তাঁদেরকে পদস্খলিত করে দিয়েছে। এর ফলেই হযরত আদম-হাওয়া (আঃ) কে  চিরসুখী জান্নাত থেকে পৃথিবীতে অবতরণের নির্দেশ জারী হয় এবং জান্নাতী পোশাক ছিনিয়ে নেয়া হয়। তাই শয়তানী কুমন্ত্রণা থেকে মানব মাত্রেরই নিশ্চিন্ত হওয়া উচিত নয়। শয়তানী প্ররোচনা ও অপকৌশল থেকে আত্মরক্ষার জন্য প্রত্যেকেরই সচেষ্ট হওয়া উচিত। তার এই বিপথগামী করার মূল কৌশলই হলো আল্লাহর ইবাদতের মধ্যে শির্‌ক ঢুকিয়ে মানুষের ইবাদত নষ্ট করে দেয়া এবং আল্লাহর ক্রোধ বৃদ্ধি করা। তার সূক্ষ্ম প্রয়োগ হলো প্রতিমা। যখন কোন নবী বা রাসুল (আঃ) এর আগমন ঘটে  তখন তাঁকে ভুয়া বলে সবার কাছে প্রচার করে। তাঁর মৃত্যুর পর তিনি যে সত্যিকার একজন সাধু এবং আল্লাহর পেয়ারা ব্যক্তি ছিলেন তা শত মুখে প্রচার করে। জনগণ পাপী। তাদের প্রার্থনা আল্লাহ শুনবেন না। তখন সেই পেয়ারা ব্যক্তির প্রতিমূর্তি তৈরী করে তাকে ফুল-অর্ঘ দিয়ে পূজা করে তাঁর ওসিলা করে আল্লাহর কাছে নিজেদের প্রয়োজন আবেদন নিবেদন করে। এভাবেই মূর্তি  পূজা আদিম সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করে, যার ধারাবাহিকতা আজও সভ্য সমাজে নির্লজ্জভাবে সমাদৃত হচ্ছে। যখন এই সমাদরে একটু ভাটা পড়ে, তখন পুরোনো কাসুন্দিতে একটু রঙ লাগিয়ে আবার সেই পুরোনো মলকেই আতর হিসেবে জায়েজ করার প্রয়াস পায়।    

  পৌত্তলিকতা হলো কোন একক বা একাধিক মূর্তির বা বস্তুর প্রতিকৃতির পূজা, যেমন মূর্তি, যাকে দেব-দেবী বা ঈশ্বরের   প্রতিনিধি হিসেবে পূজা করা হয়। সাধারণতঃ পৌত্তলিকতাকে একই অর্থে ব্যবহার করা হয়। স্বভাবতঃ পৌত্তলিকতাকে না- বোধক অর্থে ব্যবহার করা হয়। এটা এই বুঝায় যে, বাস্তবিক পক্ষে যে ঈশ্বরের পরিবর্তে এটা ব্যবহার হয় সেটা সঠিক নয় বরং ভুল এবং পাপে ভরা। যে ব্যক্তি এই পৌত্তলিকতার চর্চ্চা করে তাকে পৌত্তলিক বলা হয়। এর সুপ্রসিদ্ধ উদাহরণ হলো বাইবেলের সোনালী বাছুরের প্রতিকৃতির পূজার গল্প, যেখানে বলা আছে যে, হযরত মুসা (আঃ) যখন মহান আল্লাহর নিকট থেকে দশটি প্রত্যাদেশ আনার জন্য পর্বতে গিয়েছিলেন, তখন সামেরীর প্ররোচনায় তাঁর অনুসারীরা বাছুরের মূর্তি তৈরী করে তার পূজা শুরু করে দিয়েছিলো, যদিও এ পূজা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিলো।

  কোন কোন সময় কোন ধর্মীয় উপাসনা বা পূজার উপমা অর্থে মূর্তি ব্যবহার করা হয়। একেও পৌত্তলিকতা বলা হয়। সম্পদের অসীম আকাঙ্খাও এক ধরণের পৌত্তলিকতা। এটা সমালোচনা অর্থে ব্যবহার হয়। পৌত্তলিকতা সাধারণতঃ আলঙ্কারিক অর্থেও  কোন বিশেষ ব্যক্তিকে বুঝানোর জন্য ব্যবহার হয়, বিশেষতঃ বিখ্যাত সেলিব্রিটি যাকে কিছু লোক অত্যন্ত শ্রদ্ধা বা ভক্তি করে। এই ভক্তি এতটা বেড়ে যায় যে ধর্মীয় পূজার পর্যায়ে চলে যায়। তার অনুরাগীরা তাকে প্রতিমার পর্যায়ে নিয়ে যায়। অনেক লোক আছে যারা মূর্তি পূজা করে না ঠিক কিন্তু বস্তুগত লাভের পূজায় নিয়োজিত হয়ে যায়।

  সর্ব প্রথম রেকর্ড থেকে জানা যায় idolism শব্দটি ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম ভাগ থেকে এসেছে। শব্দটি গ্রীক শব্দ eidolon যার ইংরেজী “image,” অর্থ আকার বা গঠন। এর সাথে ism প্রত্যয় যোগ করে হয়েছে idolism যদিও এই শব্দ দ্বারা  পুতুল,  যাকে দেবতা হিসেবে পূজা করা হয়, তাকে প্রতীক স্বরূপ দেবতা হিসেবে তৈরী করা হয়। কোন কোন ধর্ম মত এরূপ দেবতা বা ধর্মীয় আকৃতিকে এক ধরণের পৌত্তলিকতা বলে নিষিদ্ধ করেছে।

 এখন দেখা যাক, মূর্তি এবং ভাস্কর্য এক না ভিন্ন। অনেকের কাছে উভয়ই সমার্থক। অন্য কথায় বলা যায় উভয়ই একে অন্যের সাথে জড়িত তবে সর্বতোভাবে এক নয়। মূর্তি হলো কোন ব্যক্তি বা জন্তুর ক্ষোদিত বা ছাঁচে ঢালা আকৃতি বিশিষ্ট। এটা যে ব্যক্তি বা জন্তুর মূর্তি হবে তার সম আকৃতির বা ছোট বড় হতে পারে। পক্ষান্তরে ভাস্কর্য হলো একটা শৈল্পিক আকৃতি  যা অঙ্কিত বা গলানো বা মর্দনকৃত কাদা, পাথর, ধাতু ইত্যাদি দ্বারা তৈরী প্রতিকৃতি।  উভয়ই কিন্তু আকৃতি বিশিষ্ট, কেবল গঠনের  দিক দিয়ে সামান্য পার্থক্য। মূর্তি ও ভাস্কর্যের মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো মূর্তি হবে সব সময় কোন ব্যক্তি বা কোন জন্তুর,  পক্ষান্তরে ভাস্কর্য হবে কোন মূর্ত বা বিমূর্ত আকৃতির। অর্থাৎ সব মূর্তিকে ভাস্কর্য বলা যাবে তবে সব ভাস্কর্য মূর্তি নয়। ভাস্কর্যের মাধ্যমে তৈরীকৃত মূর্তির উদাহরণ হলো – নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টি, মিশরের গিজার ফিনিক্স, রিও ডি জানিরোর রিডিমার খ্রীস্ট ইতাদি। প্রাক-ঐতিহাসিক যুগ থেকেই বিভিন্ন সংস্কৃতিতে মূর্তি তৈরীর প্রচলন চলে আসছে। যেমন – যীশু খ্রীস্টের মূর্তি, বুদ্ধের মূর্তি, হিন্দুদের বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তি ইত্যাদি।

এখন দেখা যাক ইসলামের দৃষ্টিতে মূর্তি বা ভাস্কর্য নির্মাণ কতখানি যৌক্তিক বা অযৌক্তিক –

  আমরা এ ব্যাপারে মূল বিষয়টিকে দুভাগে ভাগ করে নিই – ক) মূর্তি ও ভাস্কর্য বিষয়ে ইসলামের ফয়সালা খ) ভাস্কর্য সমর্থন কারীদের যুক্তির গ্রহণযোগ্যতা   

  ক) মূর্তি ও ভাস্কর্য বিষয়ে ইসলামের ফয়সালা – কোন প্রাণীর আকৃতি গড়া এবং এর যে কোন রকমের ব্যবহার ইসলামে নিষিদ্ধ ও হারাম। আল কুরআনে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন –

 أَمِ ٱتَّخَذُوٓا۟ ءَالِهَةًۭ مِّنَ ٱلْأَرْضِ هُمْ يُنشِرُونَ

(আমিত্‌ তাখাযু আলিহাতাম্‌ মিনাল্‌ আর্‌দি হুম্‌ ইউন্‌শিরুন)

  এরা জমীন থেকে যেগুলোকে মাবুদ হিসেবে গ্রহণ করেছে সেগুলো কি মৃতকে জীবিত করতে সক্ষম? (সূরাহ আম্বিয়াঃ আয়াত ২১)  

وَ قُلۡ جَآءَ الۡحَقُّ وَ زَہَقَ الۡبَاطِلُ ؕ اِنَّ الۡبَاطِلَ کَانَ زَہُوۡقًا

(ওয়া কুল্‌ যায়াল্‌ হাক্কু ওয়া যাবাকাল্‌ বাতিলু ইন্নাল্‌ বাতিলা কানা যাবুকা)

আর বলুন, ‘হক এসেছে ও বাতিল বিলুপ্ত হয়েছে;’ নিশ্চয় বাতিল বিলুপ্ত হওয়ারই ছিলো। (সূরাহ বনী ইসরাইলঃ আয়াত ৮১)

  এ আয়াতটি হিজরতের পর মক্কা বিজয়ের সময় রাসুলুল্লাহ (ﷺ) উচ্চারণ করেছিলেন। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন,  মক্কা বিজয়ের দিন রাসুলুল্লাহ (ﷺ) যখন মক্কায় প্রবেশ করেন, তখন বায়তুল্লাহর চতুর্পার্শে তিনশ’ ষাটটি মূর্তি বসনো ছিলো। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) যখন সেখানে পৌঁছেন, তখন তাঁর মুখে এ আয়াতটি উচ্চারিত হচ্ছিল এবং তিনি নিজের ছড়ি দিয়ে প্রত্যেকটি  মূর্তির বুকে আঘাত করে যাচ্ছিলেন। (সহিহ বুখারীঃ হাদীস নং ২৪৭৮ও ৪৭২০, সহিহ মুসলিমঃ হাদীস নং১৭৮১) সুতরাং সত্য প্রতিষ্ঠিত হলে মিথ্যা অপসারিত হবেই। আল্লাহ আরো বলেন, ‘আমি সত্য দ্বারা আঘাত হানি মিথ্যার উপর; ফলে তা মিথ্যাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় এবং তৎক্ষণাৎ মিথ্যা নিশ্চিহ্ন হিয়ে যায়। (সূরাহ আল আম্বিয়াঃ আয়াত ১৮) মহান আল্লাহ আরো বলেন, বলুন, ‘সত্য এসেছে এবং অসত্য না পারে নতুন কিছু সৃজন করতে, আর না পারে পুনরাবৃত্তি করতে।‘ (সূরাহ সাবাহঃ আয়াত ৪৯)।   

 আমরা সবাই আল্লাহর বান্দা। আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখার মধ্যেই আমাদেরকে অবস্থান করতে হবে। প্রাণীর আকৃতি দান করার অধিকার একমাত্র তাঁরই আছে যিনি তার মধ্যে জীবন সঞ্চার করতে পারেন। আমাদের পক্ষে কোন আকৃতির বা  প্রতিকৃতির মধ্যে জীবন দেয়া সম্ভব নয়, তাই আল্লাহ আমাদেক এটা নির্মাণের অনুমোদনও দেননি। তবুও এটা নির্মাণ করার অর্থ আল্লাহর সাথে মোকাবিলা করা। মানুষ ইচ্ছা করলে প্রাণহীন বস্তু বা জড়বস্তুর চিত্র বা প্রতিকৃতি নির্মাণ করতে পারে।  

 প্রাণীর চিত্র বা ভাস্কর্য সম্পর্কে মহানবী (ﷺ) হতে কিছু সহিহ হাদীস বর্ণিত রয়েছে, যেমন –

১) হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন — 

لَا تَدْخُلُ الْمَلَائِكَةُ بَيْتًا فِيهِ تَمَاثِيلُ أَوْ تَصَاوِيرُ

ফেরেশ্‌তারা ঐ ঘরে প্রবেশ করেন না, যে ঘরে ভাস্কর্য বা ছবি রয়েছে। (সহিহ মুসলিমঃ হাদীস নং ২১১২ শুআবুল ঈমান, বায়হাকীঃ হাদীস নং ৫৮৯৬)  

২) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (ﷺ) কে বলতে শুনেছি যে,

سَمِعْتُ مُحَمدًا صَلى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلمَ يَقُولُ: مَنْ صَورَ صُورَةً فِي الدنْيَا كُلِّفَ يَوْمَ القِيَامَةِ أَنْ يَنْفُخَ فِيهَا الروحَ، وَلَيْسَ بِنَافِخٍ

যে কেউ দুনিয়াতে কোন চিত্র-প্রতিকৃতি তৈরী করবে তাকে কেয়ামতের দিন বাধ্য করা হবে, যেন সে তাতে প্রাণ সঞ্চার  করে, অথচ সে তা করতে সক্ষম হবে না। (সহিহ বুখারীঃ হাদীস নং ৫৯৬৩ ও সহিহ মুসলিমঃ হাদীস নং২১১০) 

৩) হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন,

قَدِمَ رَسُولُ اللهِ صَلى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلمَ مِنْ سَفَرٍ، وَقَدْ سَتَرْتُ بِقِرَامٍ لِي عَلَى سَهْوَةٍ لِي فِيهَا تَمَاثِيلُ، فَلَما رَآهُ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلمَ هَتَكَهُ وَقَالَ: أَشَد الناسِ عَذَابًا يَوْمَ القِيَامَةِ الذِينَ يُضَاهُونَ بِخَلْقِ اللهِ، قَالَتْ : فَجَعَلْنَاهُ وِسَادَةً أَوْ وِسَادَتَيْنِ

  রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এক সফর থেকে ফিরে এলেন। আমি কক্ষের দরজায় একটি পর্দা ঝুলিয়ে রেখেছিলাম, তাতে তামাছিল বা ছবি অঙ্কিত ছিলো। তিনি তা খুলে ফেললেন এবং বললেন, কেয়ামতের দিন তাদেরকে কঠিন আযাব দেয়া হবে, যারা আল্লাহর সৃষ্টি-বৈশিষ্ট্যের সাদৃশ্য গ্রহণ করে। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, তখন আমরা তা কেটে ফেললাম এবং একটি বা দুটি বালিশ বানালাম। (সহিহ বুখারীঃ হাদীস নং ৫৯৫৪ ও সহিহ মুসলিমঃ হাদীস নং২১০৭) 

৪) উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, মহানবী এর অসুস্থতার সময় তাঁর এক স্ত্রী একটি গীর্জার কথা উল্লেখ করলেন। গীর্জাটির নাম ছিলো মারিয়া। উম্মে সালমা ও উম্মে হাবীবা ইতোপূর্বে হাবশায় গিয়েছিলেন। তাঁরা গীর্জাটির কারুকাজ ও তাতে বিদ্যমান প্রতিকৃতিসমূহের কথা আলোচনা করলেন। নবী (ﷺ) বিছানা থেকে মাথা তুলে বললেন –  

 أُولَئِكِ إِذَا مَاتَ مِنْهُمُ الرجُلُ الصالِحُ بَنَوْا عَلَى قَبْرِهِ مَسْجِدًا، ثُم صَوَّرُوا فِيهِ تِلْكَ الصورَةَ، أُولَئِكِ شِرَارُ الخَلْقِ عِنْدَ اللهِ

 তাদের কোন পূণ্যবান লোক মারা গেলে তারা তার কবরের উপর ইবাদতখানা নির্মাণ করতো এবং তাতে প্রতিকৃতি স্থাপন করতো। এরা হচ্ছে আল্লাহর সৃষ্টির মাঝে সবচেয়ে নিকৃষ্ট (সহিহ বুখারীঃ হাদীস নং ১৩৪১ ও সহিহ মুসলিমঃ হাদীস নং ৫২৮)।   এ হাদীস থেকে জানা যায় প্রাণীর প্রতিকৃতি আগের শরীয়তেও হারাম ছিলো।  

  বাইবেলে (বিকৃতির পরও) এখনও পর্যন্ত প্রাণীর চিত্র বা প্রতিকৃতি তৈরীর অবৈধতা বিদ্যমান আছে। বলা হয়েছে — 

  ‘Do not make for yourselves images of anything in heaven or on earth or in the water under the earth.’ (Holy Bible: Good news Bible) p.80, The Bible Society of India.    

ভাস্কর্য সমর্থনকারী কিছু উলামা দাবী করেন, ভাস্কর্য আর মূর্তি এক নয়। ভাস্কর্য একটা শিল্প, যা নগরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। আর মূর্তি বানানো হয় ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে পূজা করার জন্য। এক্ষেত্রে কু্রআন ও হাদীসের বিধান অতীব স্পষ্ট; যে উদ্দেশ্যেই হোক না কেন কোন প্রাণীর প্রতিকৃতি বা মূর্তি তৈরী বা অঙ্কন সর্বতোভাবে হারাম। যেমন কাবা শরীফ থেকে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) মূর্তিগুলো ভেঙ্গেছেন, তেমনি দেয়ালে ও স্তম্ভে অঙ্কিত চিত্রগুলোও মুছে দিয়েছেন এবং বলেছেন –

قَاتَلَ اللهُ قَوْمًا يُصَوِّرُونَ مَا لَا يَخْلُقُونَ

  আল্লাহ ঐগোষ্ঠীকে ধ্বংস করুন, যারা এমন প্রতিকৃতি নির্মাণ করে, যা তারা সৃষ্টি করে না। (শুআবুল ঈমান, বায়হাকীঃ হাদীস নং ৫৯০৩)

  পবিত্র কুরআনের সূরা সাবার ১৩ নং আয়াতে ভাস্কর্য নির্মাণের কথা বলা হয়েছে এবং এখান থেকে ভাস্কর্য নির্মাণের পক্ষে ফতোয়া বের করা হয়েছে। আসলে ঐ আয়াতের অর্থ হলো ‘উহারা সুলাইমানের ইচ্ছানুযায়ী প্রাসাদ, ভাস্কর্যসদৃশ বৃহদাকার পাত্র ও সুদৃঢ়ভাবে স্থাপিত ডেক নির্মাণ করতো। আমি বলেছিলাম, হে দাউদ-পরিবার, কৃতজ্ঞতার সাথে তোমরা কাজ করতে থাকো। আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পই কৃতজ্ঞ।‘ এখানে ঐ পাত্রের গায়ে বিভিন্ন জড় বস্তু ও লতা-পাতার নকশা অঙ্কিত ছিলো। তাফসীরকারগণের সর্বোসম্মত ভাষ্য অনুযায়ী ওগুলো কোন জীবের প্রতিকৃতি ছিলো না।

  কুরআন ও হাদীসের ভাষা থেকে এটা পরিষ্কার যে, প্রাণীর ছবি মাত্রই তা নিষিদ্ধ। সেটা কাপড়ে, কাগজে, মাটিতে বা দেয়ালে আঁকানো হোক বা কাঠ, পাথর বা ইট-সিমেন্ট-বালু-রড বা এজাতীয় অন্য পদার্থ দিয়ে দেহ-কাঠামো গড়ে হোক। প্রাণীর ছবি বা প্রতিকৃতি হওয়ায় সর্বাবস্থায় তা হারাম। পূজার উদ্দেশ্যে হলে তো আরো হারাম এবং ঘৃণিত। তবে সখের জন্য বা সৌন্দর্যের জন্য গাছপালা বা জড় বস্তুর ছবি কাপড়ে, দেয়ালে, মাটিতে অঙ্কিত বা তৈরীকৃত হলে বা ভাস্কর্য হলে তাতে  দোষের কিছু নেই। কিন্তু পূজার উদ্দেশ্যে হলে তা হারাম। কোন্‌ দেশে প্রতিকৃতি আছে কোন্‌ দেশে নাই, কোন্‌ আলেম কোন্‌ ফতোয়া দিল, এটা জায়েজ করার কোন শর্ত নয়; দেখতে হবে কুরআন ও হাদীস কি বলে। ইসলামে যদি মূর্তি বা প্রতিকৃতি বা ভাস্কর্য বৈধ হতো, শিক্ষিত অশিক্ষিত নির্বিশেষে প্রতিটি মুসলমানের বাড়ীতে যেমন কুরআন সম্মানের সাথে সংরক্ষিত থাকে, তেমনি  প্রতিটি বাড়ীর প্রতিটি ঘরে এমন কি পকেটে মহানবী সহ সাহাবায়ে কেরামদের মূর্তি বা প্রতিকৃতি বা ভাস্কর্য বা ছবি সাদরে শোভা পেতো। তাঁদের চাইতে আমরা কি বেশী শ্রদ্ধার?

টরোন্টো, কানাডা 

367 জন পড়েছেন


মন্তব্য দেখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *