আমেরিকায় মুসলিমদের শিকড়

1827 জন পড়েছেন

আমেরিকা মহাদেশে মুসলিমরা সর্বপ্রথম কখন পা রেখেছিল? এ প্রশ্ন আজ অনেকের। বিশেষ করে বর্তমান ইসলামফবিয়া গুষ্টি ও ডনাল্ড ট্রাম্পদের মত মুসলিম বিদ্বেষী উগ্র ডানপন্থীদের লক্ষ্য হচ্ছে এই বলে চিহ্নিত করা যে  মুসলিমরা আমেরিকায় এই সে দিনের এক বহিরাগত – immigrants । অর্থাৎ মুসলিমরা আমেরিকার সাগর তীরে জাহাজ থেকে সদ্য উঠে আসা (Fresh off the boat) এক বহিরাগত অভিবাসী। মুসলিম হেইটারদের যে কত গ্রুপ তার হিসাব নাই। এমনি এদের এক দলের লিডার হচ্ছে নিউ ইয়র্কের পামেলা Geller, চরম মুসলিম বিদ্বেষী এক মহিলা। তার আন্দোলনের নাম হচ্ছে “আমেরিকার ইসলামী-করণ বন্ধ কর -” Stop Islamization of America.” এরা এক দিকে বিল বোর্ডে বিভিন্ন ধরনের বিজ্ঞাপন দিয়ে ও তাদের ওয়েব সাইটের মুসলিমদের যত সব নেতিবাচক খবর সংগ্রহ করে ঘৃণা প্রচারে সদা ব্যস্ত! তাদের বুলি slogan হচ্ছে যেমন,  মুসলিমরা “অসভ্য” এরা আধুনিক সভ্য জগতকে ধ্বংস করতে যুদ্ধ লিপ্ত ইত্যাদি  অপপ্রচারের উন্মাদনা সৃষ্টি করে চলছে। অন্য দিকে তাদরে কথা হচ্ছে এ অঞ্চলে মুসলিমদের কোন ঐতিহাসিক শিকড় নাই।

কথাটা কি আসলেই তাই?

আসলেই কি আমেরিকা মহাদেশে মুসলিমদের কোন ঐতিহাসিক শিকড় নাই? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আজকের এ লিখা। যেহেতু মেইন স্ট্রিম ঐতিহাসিকেরা তাদের নিজেদের বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়নে অনেক তথ্য চেপে রাখেন তাই এ বিষয়ে জানতে হলে প্রচুর ঐতিহাসিক তথ্য ঘাটতে হবে। তবে আশার খবর হল এ বিষয়ে কত কয়েক বছর ধরে বেশ লেখালেখি ও প্রচুর গবেষণা হচ্ছে যার মাধ্যমে এখন সঠিক ইতিহাস বাহির হয়ে আসছে।  আমি এখানে অতি সংক্ষেপে কিছু বক্তব্য রাখব যাতে পাঠকের কাছে এ বিষয়ে একটি “বার্ডস আই ভিউ” পাওয়া সম্ভব হয়।

NYU থেকে ইংলিশ ও সাংস্কৃতিক তত্ত্বে পিএইচডি প্রাপ্ত লিন প্যরামোর – Lynn Parramore, অল্ট ন্যটের সম্পাদক, রিসেশন ওয়্যার ও নিউ ডীল 2.0 এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক এবং উনবিংশ শতাব্দীর সাহিত্য সংস্কৃতি প্রাচীন মিশর গ্রন্থের লেখক সম্প্রতি Anthony Janszoon van Salee সম্পর্কে এক নিবন্ধে লিখতে উল্লেখ করেন যে মুসলিম বিশ্বাস (ইসলাম) আমেরিকান ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

উত্তর আমেরিকার মুসলিম কমিউনিটিতে ইসলামি স্কলার ড: আব্দুল্লাহ হাকিম কুইকের নাম অপরিচিত নয়। তিনি নিজেও নর্থ আমেরিকায় মুসলিম রুটের ইতিহাস বিষয়ে প্রচুর গবেষণা করেছেন এবং এ বিষয়ে বিভিন্ন সেমিনারে বক্তৃতা/উপস্থাপনায় দিয়ে সঠিক ইতিহাস মানুষকে অবহিত করে যাচ্ছেন। সে দিন আমি উনার এ ধরণের এক বক্তৃতা শূনতে গিয়েছিলাম। তার সে  বক্তৃতা শুনে মূলত আজকের এই নিবন্ধটি লিখার অনুপ্রেরণা।

বিশ্বের সর্বত্র যে ইতিহাস শিক্ষা দেয়া হয় তা হচ্ছে  ক্রিস্টোফার কলম্বাস ১৪৯২ সালে প্রথম আমেরিকা আবিষ্কার করেন।  

পশ্চিমা সভ্যতার ইতিহাসে এটি একটি বিরাট গুরুত্বপূর্ণ pivotal বিষয়।

এমন কি কলম্বাস দিবসকে জাতীয় ছুটি পালন করা হয় আমেরিকাতে।  কিন্তু এ ইতিহাস আসলে যে সত্য নয় সেটা সাধারণ মানুষ জানেনা বা জানতে দেয়া হয় না স্কুল কলেজে। তাই মিথ্যা ইতিহাসই  হয়ে আছে প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস।প্রশ্ন হচ্ছে কেন এ প্রয়াস? এর উত্তর জানতে হলে বুঝতে হবে কি তাদের এজেন্ডা। আজ যদি কাউকে দেশ হিসাবে আমেরিকা বা কানাডার কথা বলা হয় তখন সবার মনে যে ছবি ভাসে তা হল যে এদেশগুলা হচ্ছে সাদা চামড়ার ইউরোপিয়ান সাহেবদের বসত বাড়ী এটা তাদেরই দেশ। কিন্তু এদেশটার আসল মালিক যে ছিল এদেশের নেটিভরা বা ফার্স্ট নেশন  আদি বাসীরা সে কথা কিন্তু কারো মনে আসবে না। চিন্তা করেন হলিউডের যত ফিল্ম তৈরি হয় তাতে কি কখনও দেখেছেন কালা চামড়ার কেউ হিরো আর যদি কোন মুসলিমের চরিত্র থাকে সেটা কিভাবে ডিপিক্ট করা হবে তা তো বুঝতেই পারছেন। মিডিয়া বা বই পুস্তক দিয়ে মানুষের চিন্তা চেতনাকে কন্ডিশনিং করা নতুন কিছু নয়। বিশ্বের কায়েমি স্বার্থবাদীরা তা যে দেশেই হউক এ কাজে কখনও পিছিয়ে থাকেনা। পশ্চিমা বিশ্বকে আমরা যতই ধর্মনিরপেক্ষ  সমাজ বলি না কেন কিন্তু তাদের অধিকাংশ মানুষের চিন্তা চেতনায় বিশ্ব সমাজে জুডিয় ক্রিশ্চান জাতীর আধিপত্য ও নিজেদেরকে একমাত্র সর্বোত্তম জাতী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার বাসনা সব সময় ছিল এখনও আছে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নাই। তাই সবকিছুকে করা হয়েছে ইউরো-সেন্ট্রিক আর সে উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত করার জন্যই অনেক সত্য ইতিহাসকে কবর দিয়ে চেপে রাখার প্রবণতা। একটি বিষয় নিশ্চয় লক্ষ্য করেছেন পুরা পশ্চিমা বিশ্ব যখন অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল যাকে বলা হয় Dark Age তখন কিন্তু মুসলিমদের ছিল স্বর্ণযুগ কিন্তু সে ইতিহাসের চর্চা করা হয়না সচরাচর। ইউরোপিয়ানদের ঔপনিবেশিক যুদ্ধে মুসলিম বিশ্ব পরাজিত হওয়ার পরে মুসলিম সভ্যতা বা ইসলামের গৌরব ও ইতিবাচক কোন ইতিহাস বা সফলতা বিশ্ব দরবারে প্রকাশ হওয়া সুযোগ হারিয়েছে।

সে কারণেই ক্রিস্টোফার কলম্বাসের ১৪৯২ আমেরিকা আবিষ্কারের অনেক আগেই যে মুসলিমরা এ মহাদেশে যে এসেছিলেন সে ইতিহাসও চেপে দেয়া হয়েছে! সে  প্রমাণ এখন সত্য অন্বেষণকারী ইতিহাসবিদেরাই খুঁজে পাচ্ছেন।

প্রথমেই ড: আব্দুল্লাহ হাকিমের নিচের ভিডিও লেকচারটা একটু সময় নিয়ে শুনা খুবই জরুরী। তাহলে এ আলোচনার প্রেক্ষাপট পরিষ্কার হবে।

 

PBSসম্প্রতি PBS.Org এর এক নিবন্ধে প্রকাশ, আজ অনেক ঐতিহাসিকদের দাবি করেছেন যে ১৪শ শতাপদ্ধীর আগেও মুসলিম নাবিকেরা আমেরিকা মহাদেশে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন।  অনেকের মতে ১৪ শতকের গোড়ার দিকে  আফ্রিকার Senegambia অঞ্চল থেকে মুসলিমরা এসেছেন। এটা বিশ্বাস করা হয় তারা  স্পেন থেকে বহিষ্কৃত মুর ছিলেন, যারা ক্যারিবিয়ান এবং সম্ভবত মেক্সিকো উপসাগর থেকে তাদের পথ তৈরি করে এদিকে পাড়ি জমান। ঐতিহাসিক তথ্যে এটাও জানা যায় যে যখন কলম্বাস আমেরিকার দিকে যাত্রা করেন তখন জাহাজের সমুদ্রে দিক নির্দেশনার জন্য তিনি ১২ শতাবদ্ধীর পর্তুগিজ মুসলমানদের লিখিত একটি বই  সঙ্গে নিয়েছিলেন। অনেক ঐতিহাসিকরা এটাও দাবী করেন যে ইস্তাফান নামের এক ব্যক্তি ১৬শ শতাব্দীতে অনেক স্প্যানিশ মুসলিমদেরকে সাথে নিয়ে নিউ মেক্সিকো হয়ে আরিজোনায় অভিযান চালান। তবে আফ্রিকানদেরকে ক্রীতদাস করে এ দেশে নিয়ে আসার সময়ই আমেরিকার মাটিতে এক সাথে অধিক সংখ্যক মুসলিমদের আগমন ঘটে। বলা হয় তাদের মধ্য ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ছিলেন মুসলিম যারা তাদের ঐতিহ্যগত পোশাক ও নাম বাঁচিয়ে গোপনে তাদের ধর্ম পালন করার চেষ্টা করতেন। জর্জিয়া উপকূলে মুসলিম আফ্রিকান-আমেরিকানদের একটি ছিটমহল ছিল যারা ২০শ শতাব্দীর প্রথম দিকের সময় পর্যন্ত তাদের বিশ্বাস বজায় রাখতে সক্ষম ছিল।

আমেরিকায় মুসলিম শিকড় নিয়ে কথা বলা অসমাপ্ত থেকে যাবে যদি আফ্রিকান আমেরিকানদের জিবন নিয়ে আলোচনা না করা হয়। কিভাবে মাদকাসক্ত ও বিভিন্ন হিংসাত্মক অপরাধে নিমগ্ন আফ্রিকান আমেরিকান সমাজকে ইসলাম নতুন জিবন ফিরিয়ে দিচ্ছে তার একটি সুন্দর বর্ণনা এসেছে নিচের ভিডিওতে।

 

 

Reference:

For further information on America’s Islamic roots, see Allan D. Austin’sAfrican Muslims in Antebellum America. Helpful articles include Michael Gomez’s “Muslims in Early America” published in theJournal of Southern Historyand Thomas Custis Parramore’s “Muslim Slave Aristocrats in North Carolina” published in theNorth Carolina Historical Review. I was aware of this history as a child because the last historian mentioned is my late father.

http://www.alternet.org/belief/right-wingers-would-be-shocked-learn-islam-has-been-part-american-history-its-founding

1827 জন পড়েছেন

Comments are closed.