ভারত বিরোধী বা ভারতপন্থী হবার দরকার নাই

3820 জন পড়েছেন

সামাজিক মিডিয়ায় অনেকে আজ লিখতে দেখি পৃথিবীর কোন ঘটনাই কাকতালীয়ভাবে ঘটছে না। কথাটা ঠিক এর পেছনে কাজ করে অনেকের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ও বৃহৎ উদ্দেশ্য যা অনেকই বুঝতে চায় না। আসলে এসব নাটকের যারা নায়ক তারা তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছে পৃথিবীর সর্বত্র। বর্তমান পাক-ভারতের আঞ্চলিক রাজনীতি বুঝতে হলে ভারতের হিন্দুদের জীবনদর্শন বুঝতে হবে। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভূটান ইত্যাদি ছোট ছোট নতুন দেশ সৃষ্টি হয়েছিল এসব অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন ও রাম রাজ্যের হিন্দুদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে। সে সব ইতিহাস তথা এক সময়ের বৃহত্তর ভারত ভাগ হওয়া তা ভারতের প্রভাবশালী হিন্দুরা ও তাদের চিন্তাবিদরা ভাল করেই জানে। তাই হিন্দুদের মূল লক্ষ্য হল এই ভারতীয় উপমহাদেশকে পুনরায় অখণ্ড হিন্দু ভারতে পরিণত করা। আর এ দর্শনের উপর ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাদের পররাষ্ট্রনীতি ও তাদের সংবিধান । তাই তো ইংরেজ আমলে বাংলা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কৃত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বঙ্গ বিভাগের পর মনের দু:খে “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি” গানটি লিখেছিলেন। যদিও হিদ্দু জমিদারদের অত্যাচার ও শোষন খেকে মুক্তি পেতে তথা পূর্ব বাংলার নির্যাতিত মুসলিমদের অধিকার অর্জনে সে বিভক্তি সে সময়কার সামাজিক বাস্তবতায় একান্ত প্রয়োজন ছিল কিন্তু সেটা রবি ঠাকুরের বিবেচনার বিষয় ছিল না। একজন জমিদার ও হিন্দু ধর্মীয় জীবনদর্শন বিশ্বাসীর কাছে ভারত মাতার বুকে কোন চিড় পড়তে দেখলে তার বুকে চাকু লাগারই কথা। তাই আজ অনেকের মতে পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টি করতে ভারত এগিয়ে আসার পিছনে কাজ করেছে উপমহাদেশকে পুনরায় অখণ্ড হিন্দু ভারতে পরিণত করার দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা। এমন কি ভারত মাতার সন্তানদের প্রাণ প্রিয় যে  গানটি হয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত এ সবই হচ্ছে বৃহত্তর ভারত সৃষ্টির পরিকল্পনার এক একটি মাইল ফলক যা মাত্র কয়েক দশকে পরিষ্কার হয়ে যাবে।

বাংলাদেশের জন্মের পর থেকেই এদেশের রাজনীতি কেন স্থিতিশীল হতে পারে নাই তা বুঝতে হবে। আজ আমরা দেখছি তথাকথিত সেক্যুলার ধর্মনিরপেক্ষতার দাবীদার ভারত কীভাবে সেক্যুলার ধর্মনিরপেক্ষতা ছেড়ে একটি হিন্দু মৌলবাদী ও হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হতে যাচ্ছে। আজ বাংলাদেশের প্রশাসনে যে ভাবে পরিবর্তন এসেছে এবং এ দেশের যুব সমাজকে ইসলাম বিমুখ করার জন্য যে ভাবে শিক্ষা ব্যবস্থা ও মিডিয়া পরিচালনা করা হচ্ছে এ সবই সে লক্ষ্যে পৌছার অলামত! তবে বাংলাদেশের মুসলিমদের দুর্ভাগ্য তাদের দেশের রাজনীতি আজ যাদের হাতে জিম্মি হয়েছে তারাই মনে হচ্ছে সেই এজেন্ডার ক্রীড়নক! কেননা বাংলাদেশের রাজনীতিতেও অভূতপূর্ব পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভারতপন্থী দলসমূহ জন-বিচ্ছিন্ন হলেও তারা ক্ষমতার মসনদে বসে প্রশাসন, বিচার বিভাগ সহ প্রতিটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছে। তাই আজ দেশের পুলিশ বাহিনীকে পরিণত করা হয়েছে দলীয় ক্যাডারে, বিচারের রায় লিখা হয় সরকারের ইচ্ছা মাফিক। তারা ক্ষমতাধর থেকে আরো ক্ষমতাধর হয়ে উঠছে। আমরা দেখছি এদেশে ভারতীয় মিডিয়ার আগ্রাসন সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, বাণিজ্যিক আগ্রাসন। বাংলাদেশের ক্ষমতায় কে থাকবে কে থাকতে পারবেনা সে সিদ্ধান্তেও ভারতের আগ্রাসন। দেশে ক্ষমতাসীনদের গণতান্ত্রিক আচরণের প্রকাশ্য লঙ্ঘন, ভোট জালিয়াতি, বিরোধী দলের মানুষকে হত্যা, খুন, গুম, অন্যায় অবিচার, অর্থের লুটপাট, নেই কোন জবাবদিহিতা! আজীব এক মগের মুল্লুক! আসুন আগে আমরা মানুষ হই, মানবাধিকার কাকে বলে তা শিখি, দেশকে ভালবাসতে শিখি, আল্লাহকে মানি, ষড়যন্ত্র থেকে দেশকে বাঁচাতে সবাই সর্তক হই। নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির অপচেষ্টায় দেশের বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা ও ন্যায় বিচারকে কবর দিয়ে পুরা দেশটাকে ধ্বংসের দিকে ফেলে দিচ্ছে তাদেরকে রুখতে হবে।

একটা প্রকল্পিত (hypothetical) প্রশ্ন, মনে করেন বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বর্তমান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি রায় শুনার অপেক্ষা করছেন সবাই, “যে ভারত ভেঙ্গে পূর্ব পাকিস্তান হওয়াটা ছিল একটি রাজনৈতিক অপরাধ।” বলেন তো আওয়ামী সরকারের আপিল বিভাগ কি রায় দিবে? তবে এ রায় একদিন হবে চিন্তার কারণ নাই। শুধু সময়ের ব্যপার। দেরী হচ্ছে এজন্য যে ৭১ ও ৪৭ একই সুতায় গাতা। শুধু একাত্তরের পুকুরে আরো কিছুটা দিন সাতার কাটতে হবে যাতে ৪৭ সূতাটা পুরাপুরি পচে যায়। পাঠ্য পুস্তক থেকে বাদ পড়েছে এখন বাকি শুধু চেতনার আলো দিয়ে আরেকটি প্রজন্ম গড়ার। একটু সময় তো লাগবেই।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে কিংবা একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন দিয়ে সকল দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে বাধা কোথায়? তাহলে ভারত-পন্থী লবির এত ভয় কিসের?

আসলে বৃহত্তর ভারত সৃষ্টির পরিকল্পনার বাংলাদেশে বর্তমানের একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চালু রাখাটাই যে হতে যাচ্ছে আরো একটি মাইল ফলক তা ওরা বুঝলেও বাংলাদেশীরা বুঝতে পারেন কি না সন্দেহ হয়!

আগেই বলেছি দেশের রাজনীতি আজ যাদের হাতে জিম্মি হয়েছে তারাই ক্রীড়নক হয়ে দেশের সকল সেক্টর উনমুক্ত করে দিয়েছে সেই এজেন্ডার বাস্তবায়নে।

অতএব আজ আমাদেরকে ভারত বিরোধী বা ভারতপন্থী হবার দরকার নাই প্রয়োজন শুধু নিজেকে চিনার ও বাংলাদেশপন্থী হওয়ার।

 

Facebook Comments

3820 জন পড়েছেন


Comments

ভারত বিরোধী বা ভারতপন্থী হবার দরকার নাই — ২ Comments

  1. আসলেই শুধু আবেগ তাড়িত না হয়ে বাস্তবতাকে নির্মোহভাবে বিচার বিশ্লেষণ করলে মিথ্যাচারীদের সনাক্ত করতে না পারার কারণ দেখিনা।
    আপনার সুদীর্ঘ মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ আহমেদ ভাই। আপনার প্রদত্ত লিংকগুলার বক্তব্য পড়লে পৈতাধারীপক্ষ নিজেদের রাজনৈতিক ও ভারতি আধিপত্যবাদী স্বার্থে অবৈধ পন্থায় শুধু মাত্র নিজেদের ক্ষমতা আঁখরে ধরার লোভে যে চক্রান্তে লিপ্ত তা দিবালোকের মত পরিষ্কার।

  2. মহি ভাই, সালাম। আপনি অপূর্ব একটা লেখা দিয়েছেন যা কালের বাস্তবতাকে নির্মোহভাবে উপস্থাপন করে।  এটা ঠিক যে “পৃথিবীর কোন ঘটনাই কাকতালীয়ভাবে ঘটছে না। [বরং] … এর পেছনে কাজ করে অনেকের [অনেক পক্ষের] দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ও বৃহৎ উদ্দেশ্য যা অনেকই বুঝতে চায় না।” এসব নিয়ে বই-পুস্তকের পাশে পাশে শত শত প্রবন্ধ রয়েছে। এক্ষেত্রে এই লেখাটিও প্রণিধানযোগ্য, “হায়দ্রাবাদ থেকে সিকিম হয়ে বাংলাদেশঃ নেহেরু ডকট্রিন ও আজকের বাস্তবতা”

    মুসলিম প্রজা নির্যাতক ব্রাহ্মণ জমিদার কবির বঙ্গভঙ্গ-রদের তথা দুই বঙ্গকে একত্র করার  রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা সঙ্গীত “স্বাধীন” (!) বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হওয়া কি কাঁকতলিয় ছিল? প্রশ্ন বটে। ১৯৪৭ সালে কাদের আত্মায় ঘা পড়েছিল, এবং কারা সেই সম্প্রদায় ছিল যারা ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা চায় নি? এরাই পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম দিন থেকে বিরোধিতা শুরু করে। কিছুই কাঁকতলিয় নয়।

    ইতিহাসের অমোঘ সত্যের এটিও একটি যে এই দেশের জনগণই পাকিস্তান ‘স্বাধীন’ করেছিল, তারা কখনো পশ্চিম পাকিস্তানের পরাধীন ছিল না, কখনো “শোষিত” হয়  নি, বরং রাজস্বের নামে যেসব মিথ্যাচার আর প্রোপাগান্ডা হয়েছিল সেই রাজস্বের একটি প্রধান অংশ এদেশে আসা পাকিস্তানী ব্যবসা থেকে উদ্ভূত ছিল। অধিকন্তু মাত্র দুই দশকে দেশের অনেক উন্নয়ন সাধিত হয়েছিল। এ ব্যাপারে অনেকের অনেক লেখা রয়েছে। আমারও একটি ব্লগ এখানে দেখা যেতে পারে, “পাকিস্তান ও শোষণের বক্তব্য” । পূর্ব পাকিস্তান লুটে পশ্চিম পাকিস্তানের করাচী শহরের রাস্তাঘাট কখনো ‘সোনা দিয়ে মুড়ে দেয়া হয় নি।’ এসব ছিল নির্ঘাত মিথ্যাচার এবং গণবিভ্রান্তি, কেবল মিথ্যাবাদীরাই এসব কথা বলতে পারে। কিন্তু এসবও কাঁকতলিয় ছিল না। মাত্র ১০/১৫ বছরের ভিতরেই ভারতীয় সূত্রে প্রোথিত ডাকাতদের লোলুপ দৃষ্টি; ভারতীয় সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা, পাকিস্তানী তাড়িয়ে মার্কেট ভারতী দখলে আনা সবই ছিল পরিকল্পিত। “স্বাধীনতা” –এটি কি? কার স্বাধীনতা? কীসের স্বাধীনতা? এই জিনিসটি কোথায় এবং কীভাবে প্রয়োগ ও মূল্যায়িত হয়? (এ প্রসঙ্গে এই লেখাটি দেখা যেতে পারে)। আজ একদল মাফিয়া ডাকাত দেশ লুট করছে, উজাড় করছে। আর ভারত, তার নিজ পরিকল্পনায় কাজ করে যাচ্ছে। তাদের স্বার্থ অত্যন্ত গভীরে। তারা ১৭ কোটি লোকের ভূখণ্ডে আধিপত্য ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করে আছে। এই কাজে তাদের গোয়েন্দা সংস্থা ও তৎসংশ্লিষ্ট সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক ও বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে গড়ে দিয়েছে একাত্তরের স্বাধীনতা সার্কাস আর যুদ্ধাপরাধের নাটক। তারা জানে আবেগ তাড়িত হুজুগী লোক সার্কাস ও নাটকে আটকে থাকবে। “ভারত অবশ্যম্ভাবীভাবে তার আধিপত্য বিস্তার করবে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারত হবে সব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। ছোট জাতিরাষ্ট্রগুলোর সর্বনাশ ঘটবে। তার সাংস্কৃতিকভাবে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন থাকবে না” -নেহেরু। অতঃপর আপনি বলেছেন, “বাংলাদেশের জন্মের পর থেকেই এদেশের রাজনীতি কেন স্থিতিশীল হতে পারে নাই।” এর পর আর কী বলা হবে?

মন্তব্য দেখুন