বাংলা ভাষা এখন সংস্কৃতি নয়, রাজনীতির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে – সিরাজুর রহমান

1270 জন পড়েছেন

অমর একুশে আবারো এলো আর গেল। এ তারিখটার কথা ভাবতেই এখনো মনটা আবেগে উদ্বেল হয়ে উঠতে চায়। অবশ্য আমার বয়সে আবেগ একটা অবাস্তব বিলাসিতা। তা ছাড়া ৬২ বছর ধরে সাংবাদিকতা করেছি। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে এ দেশের প্রতিটি গণ-আন্দোলনের সাথে দূরে বা কাছে থেকে সম্পৃক্ত থাকতে হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশ নিয়েছি, স্বাধীনতা রক্ষার এবং গণতন্ত্র কায়েম করার আন্দোলনে এখনো সক্রিয়ভাবে লড়ে যাচ্ছি। এত সব ঘাত-প্রতিঘাতে আবেগও বোধ করি ভোঁতা হয়ে আসে। আবেগকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। ইস্পাতও অতি ব্যবহারে ভোঁতা হয়ে যায়।  আগে একুশে এলেই কিছু করার, কিছু লেখার তাগিদ অনুভব করতাম। সেটাই স্বাভাবিক ছিল। এ কথা বলব না যে আমরা কিংবা আমাদের প্রজন্ম ভাষা আন্দোলন শুরু করেছিল। দেশ ভাগের আগে বাঙালি মাত্রই ধরে নিয়েছিল যে বাংলা গোটা পাকিস্তানের না হলেও পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে। সেটাই স্বাভাবিক ছিল, কেননা আমরা সবাই ধরে নিয়েছিলাম যে পাকিস্তান গণতান্ত্রিক দেশ হবে, আর প্রস্তাবিত পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল অত্যাসন্ন পাকিস্তান রাষ্ট্রের ৫২ শতাংশ।  পাকিস্তান সৃষ্টির আগে থেকেই, বিশেষ করে কলকাতায় পূর্ব পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। ১৯৪৬ সালে কলকাতার ওয়েলেসলি সেকে- লেনে পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় কবি কে হবেন সে সম্বন্ধে আলোচনা সভায় গিয়েছিলাম। দুই কবি জসিমউদ্‌দীন আর গোলাম মোস্তফার বিতর্ক বেশ উপভোগ্য হয়েছিল। তার বিস্তারিত বিবরণ আমার একাধিক বইতে আছে।  পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর দেখা গেল বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করারও ইচ্ছা নেই মুসলিম লীগ সরকারের। তখন পাকিস্তান ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ ও ধীরেন দত্ত এবং রাজনীতির ময়দানে মওলানা ভাসানী বাংলার দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন। অধুনালুপ্ত দৈনিক আজাদের মালিক মাওলানা আকরম খাঁ ঢাকায় বলে গিয়েছিলেন যে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য তিনি জিহাদ করবেন, কিন্তু করাচিতে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে তিনি উর্দু একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে প্রস্তাবে সই করে আসেন। মুকুল ফৌজ থেকে আমরা একেবারে মুখোমুখি আকরম খাঁর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলাম, ‘জেহাদি মাওলানা’ বলে নেচে নেচে স্লোগান দিয়েছিলাম।  মাওলানা তখন গোল টুলের ওপর বসে ঢাকেশ্বরী রোডে খাজা নাজিমুদ্দিনের সরকারের কাছ থেকে বিনামূল্যে পাওয়া জমিতে দৈনিক আজাদের বাড়ি তৈরি আর বিনাশুল্কে আমদানি করা যন্ত্রপাতি বসানো তদারক করছিলেন। সেদিন আমার সাথে আর যারা ছিলেন তাদের মধ্যে মাত্র প্রয়াত ক্যাপ্টেন (পাইলট) নাসির উদ্দিন সবুজ আর প্রয়াত মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ফজলে লোহানীর নাম মনে আছে।  এই হচ্ছে সমস্যা। অনেক স্মৃতি এখন ঝাপসা হয়ে আসছে। তা ছাড়া তখনকার সমকালীন যারা ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন তাদের অনেকেই এখন পরপারে চলে গেছেন। ফয়েজ আহমেদও চলে গেলেন এবারের শহীদ দিবসের মাত্র আগের দিন। একুশে ফেব্রুয়ারি এলেই আমার দুঃখ হয়। বাংলাদেশের আর সব ইতিহাসের মতো ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে অনেক তেলেসমাতি হয়েছে এবং হচ্ছে। ইতিহাস এখানেও বিকৃত করা হচ্ছে।  একটা আশার কথা, অনেকে এখনো মনে রেখেছেন যে সংগঠিতভাবে ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালে রমনা রেসকোর্সে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ভাষণের পর থেকে। কিন্তু এখানেও তারিখ নিয়ে নানা মুনির নানা মত। আমি নিজে সে সভায় উপস্থিত ছিলাম। আমি তখন ঢাকা কলেজের ছাত্র। আমার কলেজ আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে লিয়াজোঁ (সমন্বয়কারী) নির্বাচিত করেছিল। আমার কাছে যেসব তথ্য আছে তাতে দেখা যায় জিন্নাহ সে সভায় এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তন উৎসবে বক্তৃতা করেছিলেন ১৯৪৭ সালের ১১ মার্চ। আজকাল কিন্তু অনেকে ২১, ২২ কিংবা ২৪ মার্চ লিখে চলেছেন।  ইতিহাসের আরেকটা জলজ্যান্ত বিকৃতি ‘বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন’ শব্দ তিনটি। বিগত বিএনপি সরকারের আমলে ‘বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের’ স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়েছিল। এবারের আওয়ামী লীগ সরকার ‘বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের’ স্মারক টাকার নোট প্রকাশ করেছে। তাহলে আটচল্লিশ থেকে বায়ান্ন পর্যন্ত সময়ের ইতিহাস গেল কোথায়? অথচ অনেক কিছু ঘটে গেছে এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে। সব কলেজ ও স্কুলের ছাত্ররা প্রায়ই মিছিল করেছে ভাষার দাবিতে। পুলিশের স্বভাব তখনো খুব বেশি ভিন্ন ছিল না।  বিশেষ করে তারা প্রশিক্ষণ পেয়েছিল ব্রিটিশরাজের আমলে। প্রায়ই তারা আমাদের লাঠিপেটা করেছে। আমি নিজে এবং আমার সর্বপ্রাচীন বন্ধু আব্দুল মনিম একদিন তোপখানা রোডে বেধড়ক মার খেয়েছিলাম। কিন্তু তাতে আমরা মোটেই দমে যাইনি। একদিন আমরা পুলিশের সাথে লুকোচুরি খেলতে খেলতে সচিবালয়ে একেবারে মন্ত্রীদের ব্লকে ঢুকে পড়েছিলাম। মাত্র দু’জন মন্ত্রী- অর্থমন্ত্রী হামিদুল হক চৌধুরী আর শিক্ষামন্ত্রী মোয়াজ্জেম উদ্দিন হোসেন তখন অফিসে ছিলেন। আমরা তাদের কাছ থেকে লিখিয়ে নিয়েছিলাম যে তারা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে পদত্যাগ করছেন। চাপের মুখে সাদা কাগজে লেখা পদত্যাগ যে মূল্যহীন ততটা চিন্তা তখন আবেগের মুখে আমাদের মাথায় আসেনি।  পুলিশের ফেউরা তখনো আমাদের পেছনে লেগে থাকত। পরবর্তীকালে জেনেছি ভাষা আন্দোলনে জড়িত থাকায় অনেক ছাত্রের সরকারি বৃত্তি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, কারো কারো উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ওখানেই নিভে গিয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত এক ছাত্রের কথা মনে আছে, যিনি পাকিস্তান সুপিরিয়র সার্ভিস পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন; কিন্তু তার চাকরি হয়নি ভাষা আন্দোলনে জড়িত ছিলেন বলে। ১৯৫৯ সালের শেষার্ধে বিবিসিতে আমার চাকরি হয়, কিন্তু বিলেত যাওয়ার পাসপোর্ট পেতে আমাকে অনেক ধকল পোহাতে হয়েছিল। চার বছর ধরে এই যে এত লোকের এত ত্যাগ স্বীকার, সেটাকে মুছে ফেলা অমার্জনীয় হৃদয়হীনতা বলেই মনে করি আমি।  মুজিব ভাষা আন্দোলনের জনক নন শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে হঠাৎ করে প্রচার হতে লাগল যে ভাষা আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। মুজিব ভাইকে আমি কলকাতা থেকেই চিনতাম। আটচল্লিশ-ঊনপঞ্চাশে ভাষা আন্দোলনে তাকে আমি দেখিনি। বায়ান্ন সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মুজিব ভাই ও আওয়ামী লীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট মহিউদ্দিন আহমেদ ফরিদপুর সেন্ট্রাল জেলে আটক ছিলেন। দৈনিক মিল্লাতের বার্তা সম্পাদক হিসেবে সেটা আমি জানতাম। আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৯৪৯ সালের পলাশী দিবসে, ২৩ জুন। তার আগে ভাষা আন্দোলনে আওয়ামী লীগের ভূমিকার প্রশ্ন ওঠে কী করে? ‘বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন’ শব্দ তিনটির ব্যবহার শুরু হয়  ১৯৯৬ সাল থেকে। এ দাবি যারা করেন তারা প্রথম চার বছরের ইতিহাস মুছে ফেলতে চান। এ দাবি সম্পূর্ণই রাজনৈতিক দাবি।  প্রকৃত পরিস্থিতি এই যে ’৪৮ থেকে মিছিল এবং আন্দোলন করে ছাত্ররা ভাষা আন্দোলনকে জনপ্রিয় করে তোলে। তার ফলেই বায়ান্নর রক্তদান সম্ভব হয়েছিল। পঞ্চাশ সাল থেকে আওয়ামী লীগ ভাষার আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়। মুসলিম লীগের একমাত্র বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী লীগ খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল এবং এ দলের কোনো কোনো নেতা সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সদস্য হয়েছিলেন। ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি (শহীদ দিবসের আগের দিন) রাতে নবাবপুর রোডে আওয়ামী লীগ অফিসে সংগ্রাম পরিষদের বৈঠকে বিধানসভার সদস্য (এমএলএ) আনোয়ারা খাতুন ও খয়রাত হোসেন উপস্থিত ছিলেন।  সে সভায় আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিরা পরদিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার বিরুদ্ধে জোর আপত্তি তোলেন। স্থির হয় যে পরদিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে সভায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। সে সভায় সভাপতিত্ব করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক। তিনিও ছাত্রদের ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করতে উপদেশ দেন। তখন ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছিল শিগগিরই প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচন হবে এবং নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ জয়ী হবেই। আওয়ামী লীগ নেতারা ভয় করছিলেন যে ২১ ফেব্রুয়ারির মিছিলকে ঘিরে কোনো রকম অশান্তি সৃষ্টি হলে পাকিস্তান সরকার আইনসভার নির্বাচন হতে দেবে না। ছাত্ররা আওয়ামী লীগের আপত্তি সত্ত্বেও ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেছিলেন এবং শহীদ হয়েছিলেন। ভাষা আন্দোলনের জন্য আওয়ামী লীগের কৃতিত্ব দাবি করার কোনো অধিকার নেই।  হাসিনা জাতিকে বোকা বানাচ্ছেন তখন থেকে একুশে ফেব্রুয়ারিকে বলা হতো শহীদ দিবস এবং প্রতি বছর শহীদ দিবসই উদযাপিত হতো। অর্থাৎ প্রকৃত বিবরণ হচ্ছে, আটচল্লিশের ভাষা আন্দোলন ও বায়ান্নর শহীদ দিবস। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের বিবরণ চালু হয়েছে ৪৪ বছর পরে, শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের সময় থেকে। আরেকটা রাজনৈতিক ব্যাপার ঘটেছিল সে সরকারের সময়। কানাডায় শিক্ষারত দু’জন বাংলাদেশী ছাত্র জাতিসঙ্ঘের কাছে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার প্রস্তাব দেয়। জাতিসঙ্ঘ বাংলাদেশ সরকারের কাছে সে প্রস্তাবে সম্মতি চায়। কিন্তু আওয়ামী লীগের প্রচারযন্ত্রগুলো দাবি তোলে যে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস শেখ হাসিনার সরকারেরই কৃতিত্ব।  প্রধানমন্ত্রী এখন আবার বাংলাকে জাতিসঙ্ঘের দাফতরিক ভাষা করার দাবি তুলেছেন। এটা সম্পূর্ণই কিছু রাজনৈতিক পুঁজি সংগ্রহের ব্যর্থ চেষ্টা মাত্র। জাতিসঙ্ঘের দাফতরিক ভাষা মাত্র ছয়টি- ইংরেজি, ফরাসি, রুশ, চীনা, আরবি ও স্প্যানিশ। জার্মানি, জাপান ও ভারত প্রভাবশালী রাষ্ট্র হলেও তাদের ভাষা এখনো জাতিসঙ্ঘের দাফতরিক ভাষা হয়নি। শেখ হাসিনার সরকারের আন্তর্জাতিক মর্যাদা এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। এ সরকারের আমলে বাংলাকে দাফতরিক ভাষা করার প্রস্তাবে কোনো সমর্থন পাওয়া যাবে বলে আশা করা বাতুলতা ছাড়া আর কিছুই নয়।  ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছিল মাতৃভাষা এবং নিজেদের সংস্কৃতি নিয়ে গর্ব থেকে। কিন্তু ভাষা নিয়ে রাজনীতি করতে গিয়ে নিজেদের পায়ে আমরা কুড়াল মারছি মাত্র। লে. জে. এরশাদ তার সামরিক স্বৈরতন্ত্রকে জনপ্রিয় করার ব্যর্থ আশায় সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন করেন। এমনকি তিনি ইংরেজির ব্যবহার নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন। দোকানপাটের ইংরেজি সাইনবোর্ড ও গাড়ির নাম্বার প্লেট সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে দিতে হয়েছিল। এরশাদের অপচেষ্টার সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশে ইংরেজি শিক্ষা মার খেয়েছে, তার পরিণতিতে আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশীরা ক্রমেই পিছিয়ে যাচ্ছে। অথচ তাতে যে বাংলা ভাষার মান উন্নত হয়েছে তাও নয়।  সাত হাজার মাইল দূরে বসে যখন বাংলাদেশের বই কিংবা পত্রিকা পড়ি তখন প্রায়ই মনে হয় ভাষা আন্দোলনের আগে এর চেয়ে সাবলীল, সুললিত আর বলিষ্ঠ বাংলা গদ্য পড়তাম। রেডিও-টেলিভিশনে মন্ত্রীরা যখন বলেন, ‘আমি পুলিশকে নির্দেশ প্রদান করেছি’, তখন মনে হয় ‘নির্দেশ দিয়েছি’ বললেই বেশি সাবলীল হতো নাকি? ছোটবেলায় প্রায় অশিক্ষিত কোনো স্বভাবকবির লেখা পুঁথিতে পড়েছিলাম : ‘মুসা আলায়হে সাল্লামের লাঠি যখন মাটিতে পড়িয়া গেলেন তখন তাহা একটা সাপ হইয়া গেলেন!’ পুঁথিকার যেমন হজরত মুসা আ:-এর লাঠি এবং সেই লাঠি থেকে রূপান্তরিত সাপকে গৌরব দিতে চেয়েছিলেন; বর্তমান বাংলাদেশের কোনো কোনো মন্ত্রীও নিজেদের মিথ্যা গৌরব দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টায় আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষাকে গুরুচণ্ডালি করে ফেলছেন।  মিডিয়ার ভূমিকা ও অপসংস্কৃতি  আমার সহকর্মী মিডিয়ার লোকেরাও ভাষাকে দুর্বল করে ফেলছেন। ‘তিনি অভিযোগ করে বলেন’ বলতে গিয়ে সাংবাদিকেরা কি বলতে চান যে লোকটা আগে অভিযোগ করেছিলেন এবং তারপর বলেন? তার চেয়ে ‘তিনি অভিযোগ করেন’ বললে কি বেশি যথার্থ ও সাবলীল শোনাত না? বেতার-টেলিভিশনের সংবাদ পাঠক বলেন : ‘শুরুতেই জানিয়ে দিচ্ছি সংবাদ শিরোনাম’। সবিনয়ে বলছি কথাগুলো। তার চেয়ে একবার বলে দেখুন- ‘শুরুতেই সংবাদ শিরোনাম’। আমার মনে হয় অনেক ভালো শোনাবে।  হাইকোর্ট সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন রেডিও-টেলিভিশনে অশুদ্ধ বাংলা উচ্চারণ বন্ধ করতে হবে। খুবই ভালো কথা। কিন্তু কোন উচ্চারণটা শুদ্ধ? কয়েক বছর আগে জামিল চৌধুরী ‘ব্যবহারিক বাংলা উচ্চারণ অভিধান’ প্রকাশ করেছিলেন। বর্তমানের ব্রডকাস্টারেরা সেটা অনুসরণ করেন বলে মনে হয় না। বিলেতে বাংলাদেশীদের বিপুল গরিষ্ঠ অংশ বৃহত্তর সিলেটের লোক। তারা চ্যানেল এস (সিলেট) নামে একটা টেলিভিশন চ্যানেল চালু করেছেন, তাতে প্রায় অনুষ্ঠানই প্রচার হয় সিলেটের আঞ্চলিক উচ্চারণে। দেখাদেখি এ দেশে প্রচারিত অন্য চ্যানেলগুলোর অন্তত বিজ্ঞাপন ইত্যাদি প্রচার হয় সিলেটি উচ্চারণে। এসব বিভক্তি ও ভেদাভেদ বাংলাকে একীভূত ও শক্তিশালী করার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করছে।  বাংলা ভাষার মানের অবনতির জন্য আরো সক্রিয় ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার, হয়তো অজান্তে। এখন অনেক বেসরকারি টেলি-চ্যানেল হয়েছে বাংলাদেশে। তারা অবাধে এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভারতে তৈরী লাড়েলাপ্পা মার্কা হিন্দি অনুষ্ঠান দেখিয়ে যাচ্ছেন। সমপ্রতি এক উচ্চশিক্ষিত ও সমৃদ্ধ মহিলা বলছিলেন বাংলা টেলি অনুষ্ঠান তার ভালো লাগে না, হিন্দি অনুষ্ঠান তিনি বেশি দেখেন। এসবের ওপরে এখন আবার নাকি ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানি ও প্রদর্শনের ওপর সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়েছে। বাংলা ভাষা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর লোকভোলানো কথাবার্তা গাছের গোড়া কেটে আগায় পানি ঢালারই শামিল।  serajurrahman@btinternet.com [সূত্র : নয়া দিগন্ত-২৪/০২/২০১২]

1270 জন পড়েছেন

উড়ন্ত পাখি

About উড়ন্ত পাখি

আমি কোন লেখক বা সাংবাদিক নই।
অর্ন্তজালে ঘুরে বেড়াই
আর যখন যা ভাল লাগে
তা সবার সাথে শেয়ার করতে চাই।

Comments

বাংলা ভাষা এখন সংস্কৃতি নয়, রাজনীতির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে – সিরাজুর রহমান — ১ Comment

  1. Bangla language is no more cultural but became political by Mr. Serajur Rahman is a facts-breeding article. But I believe he missed to cite the contribution of Tamaddun Mazlis for the fight to uphold our Bangla language as a national language.
    Functions and purposes of any language are Interacting with other people when socializing, maintaining relationships, influencing people getting feedback, arguing, listening, expressing opinions expressing emotions, managing conversations
    to express our feelings and thoughts, acquire, learn and teach knowledge to sustain and live our lives utmost highest level.
    And for today’s century it is most important to teach and learn scientific and high-tech knowledge with the help of language.
    It is more than five decades; we are blessed with the right of our Bangla language as our national language. Particularly it is 40 years of our independence.
    Are we succeeded to develop our Bangla Language to meet our required standard. For example are there enough books available to learn laws necessary for practices from lower justice courts to highest supreme courts?
    Are there enough Bangla Books on medical and health that a students will be able to be a successful physician through Bangla language system?
    There so many questions regarding the development of Bangla language in Bangladesh.
    When we watch communicating language in political arena, It become clear that this is a language of cursing each other instead of blessing.
    In our cultural field; Bangla language is a “second class choice” in front of Hindi.
    In U.K the people of sylhet have chosen their sylheti Language as first language and second English! If any sylheti speak in Bangla they ostracize as BengaliDhakaia, It is sign of success or failure for Bangla as a national Language?
    Nurul Islam, Toronto, canada