স্থিতিশীল রাষ্ট্র গঠনে ইসলামী বিশ্বের চ্যালেঞ্জ

780 জন পড়েছেন

মুসলিম বিশ্বে তৎপর, ইসলামি আন্দোলনের প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য হচ্ছে দেশগুলোর নীতি ও নেতৃত্ব পরিবর্তন করে সেগুলোকে ইসলামের আলোকে গড়ে তোলা। আর যেকোনো রাষ্ট্রের অগ্রগতি-উন্নতির অন্যতম প্রধান শর্ত হচ্ছে, সে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা। যদি ইসলামের আলোকে গড়ে ওঠা রাষ্ট্র স্থিতিশীল না হয়, অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও বিভাজন সক্রিয় থাকে, তাহলে সে রাষ্ট্র দুর্বল হতে বাধ্য। তদুপরি সক্রিয় জনমত ও মিডিয়ার বর্তমান যুগে নিছক শক্তি প্রয়োগ করে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আনাও প্রায় অসম্ভব। কাজেই অভ্যন্তরীণ বিভাজনগুলোর শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া শান্তিপূর্ণ সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়। বর্তমান যুগে ইসলামি আন্দোলন পরিচালনা এবং ইসলামি রাষ্ট্র গঠনের পথে অভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ এমন রয়েছে, যেগুলোর কার্যকর সমাধান ছাড়া রাজনৈতিক সফলতা দুরূহ হয়ে পড়তে পারে। এসব সমস্যা ও
চ্যালেঞ্জের মধ্যে নিম্নের চারটি বিষয় সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ :

বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিরোধের সমাধান :
মুসলমানেরা ধর্মের দিক দিয়ে এক হলেও কালের ব্যবধানে তাদের মধ্যে বিভিন্ন ফেরকা, মাজহাব, ধর্মীয় উপদলীয় বিভিন্ন গোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটেছে। ফলে সবাই এক উম্মাহর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ দিক থেকে উম্মাহর মধ্যে নানা ধরনের ধর্মীয় বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে। এক ফেরকার লোকেরা অন্য ফেরকার লোকদেরকে বিভ্রান্ত, গোমরাহ বলে আখ্যায়িত করে থাকে। আবার একই ফেরকার অন্তর্গত এক মাজহাবের লোকেরা অন্য মাজহাবের লোকদের গোমরাহ না বললেও তাদের সম্পর্ক খুব একটা মধুর নয় তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক পর্যন্ত অনেক সময় সম্ভব হয় না। এক ফেরকার লোকেরা যখন কোনো দেশে বা অঞ্চলে সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকে, তখন অন্য সংখ্যালঘু ফেরকার লোকেরা সেখানে খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারে না। অনেক সময় সংখ্যালঘু ফেরকার লোকেরা বঞ্চনা এবং কোথাও কোথাও প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য হয়রানি ও চাপের সম্মুখীন হয়। বিশেষ করে যদি সংখ্যাগুরু ফেরকার মধ্যে ধর্মীয় উদ্দীপনা বৃদ্ধি পায়, তাদের মধ্যে ইসলামি আন্দোলন শক্তিশালী হয়, তখন সংখ্যালঘু ফেরকার পরিস্থিতি সাধারণত আরো মন্দ হতে থাকে। বর্তমান মুসলিম বিশ্বের দিকে তাকালেই এর সত্যতা প্রমাণিত হবে।
ইরানের জনসংখ্যার ৯০-৯৫ শতাংশ শিয়া (ইসনা আশারিয়া), সুন্নির সংখ্যা ৫-১০ শতাংশ। সেখানে ইসলামি বিপ্লবের আগে শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে ধার্মিক লোকদের জীবন দুর্বিষহ ছিল। শাহর আমলে শিয়া-সুন্নি বিভেদ ছিল অনেকটা ঐতিহ্যগত কারণে। সেখানে শিয়া ফেরকাকেই শ্রেষ্ঠ প্রমাণের বা সুন্নি ফেরকাকে নিকৃষ্ট প্রমাণের সচেতন রাষ্ট্রীয় প্রয়াস ছিল না। ইসলামি বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পর শিয়া ফেরকার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের একটা প্রয়াস শুরু হয়ে যায় এবং ইরানের সুন্নিদের মসজিদ, শিক্ষালয় ইত্যাদির ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণ শুরু হয়। সুন্নি স্বাতন্ত্র্য ক্ষুণœ করার চেষ্টা চলে। ফলে ইসলামি ইরানে সুন্নি ওলামাগণ চাপের মুখে থাকেন; তাদের মনে অনেক অভিযোগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। কার্যত সেসব অভিযোগের কোনো প্রতিকারও হয়নি। অন্য দিকে তালেবান আমলে আফগানিস্তানে শিয়াদের প্রতি চলে চরম বৈষম্যমূলক আচরণ। প্রতিক্রিয়ায় শিয়া সম্প্রদায় প্রচণ্ডভাবে তালেবানবিরোধী হয়ে পড়ে। ইরাকের অভিজ্ঞতাও ভিন্ন কিছু নয়। সেখানে শিয়ারা সংখ্যাগুরু (৬০%) হওয়া সত্ত্বেও সংখ্যালঘু সুন্নিরা সাদ্দাম হোসেনের সময় প্রায় সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছিল। অন্য দিকে শিয়াদের ওপর বিশেষ করে ধার্মিক শিয়াদের ওপর চলেছিল অত্যাচার-নির্যাতন। আবার যখন সাদ্দামের পর ইরাকে শিয়ারা ক্ষমতায় বসে, তখন সুন্নিদের প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দেয়া হয়। সিরিয়ার মাত্র ১০ শতাংশ শিয়া ফেরকার নুসাইরিয়া উপসম্প্রদায়ের লোক। বাথ পার্টির আড়ালে নুসাইরিয়া সম্প্রদায় সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে সংখ্যাগুরু সুন্নি সম্প্রদায়ের, বিশেষ করে ধার্মিক ও ইসলামি আন্দোলনকারী সুিন্ন জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন চালিয়ে আসছে। এমনকি বর্তমান ইরান পর্যন্ত সেখানকার ইসলামি আন্দোলনকে দমনকারী বাথ সরকারকে অব্যাহত সমর্থন ও সহযোগিতা করে আসছে। সৌদি আরবে জনসংখ্যার প্রায় ১০ ভাগ শিয়া জনগোষ্ঠী। সৌদি সরকার কখনো সেখানে শিয়াদের স্বাতন্ত্র্যকে শিকার করে না। সেখানকার শিয়া সম্প্রদায় অনেকটা চাপের মুখে আছে। ইয়েমেনে বিপুলসংখ্যক (৩৫-৪০%) লোক শিয়া (জায়েদিয়া) সম্প্রদায়ভুক্ত। কিন্তু সৌদিপ্রভাবিত সরকার তাদের ন্যায্য অধিকার দিচ্ছে না। ফলে শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত বিদ্রোহী হুতি/হাওসিরা আক্রমণ চালিয়ে রাজধানী সানা দখল করে নেয় এবং দেশের প্রেসিডেন্টকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে। এর সূত্র ধরে এখন সৌদি আরব ‘সুন্নি জোটের’ পক্ষ থেকে অব্যাহত বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এ দিকে কট্টরপন্থী সুন্নিগোষ্ঠী আলকায়েদা শিয়াবিরোধী যুদ্ধে লিপ্ত। ইরাক ও সিরিয়ায় এখন কট্টর শিয়াবিরোধী চরমপন্থী ‘ইসলামিক স্টেট’ গ্রুপের উত্থান ঘটেছে। তারা নির্বিচারে তাদের যারা বিরোধী তাদের ধ্বংস করছে। অন্য দিকে সিরীয় সরকারের সহায়তায় রাশিয়া এবং ইরাক সরকারের সহায়তায় আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ অব্যাহত বিমান হামলা চালিয়ে তাদের ধ্বংস করার চেষ্টা চলছে। আর সিরিয়ায় শিয়া-নুসাইরিয়া সরকারের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধ অব্যাহত রয়েছেই। পাকিস্তানে সুন্নিরা সংখ্যাগুরু হলেও প্রায় ১৫ শতাংশ লোক শিয়া। সেখানে বিভিন্ন সুন্নি ওলামাগোষ্ঠী, চরমপন্থী তাহরিকে তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) অব্যাহতভাবে শিয়া ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, মসজিদ ইত্যাদিতে বোমা নিক্ষেপ করে মানুষ হত্যা করেছে। অন্য দিকে এসবের প্রতিক্রিয়ায় শিয়াদের কোনো কোনো চরমপন্থী গোষ্ঠীও সুন্নি মসজিদগুলোতে আক্রমণ চালাচ্ছে। বাহরাইনের সংখ্যাগুরু জনসংখ্যা ইমামি শিয়া, অথচ শাসকগোষ্ঠী সুন্নি সম্প্রদায়ভুক্ত। ফলে শিয়ারা নানা বঞ্চনার শিকার। তাদের মধ্যে বিরাজ করছে বিভিন্ন ক্ষোভ। তুরস্কে প্রায় ১০-১৫ শতাংশ লোক শিয়া আলাভী সম্প্রদায়ের লোক। সেখানকার আলাভীরা সাধারণভাবে সুন্নি ইসলামপ্রভাবিত রাষ্ট্র বা সমাজ ও ইসলামের প্রতি আনুগত্যপরায়ণ নেতৃত্বকে মোটেই গ্রহণ করতে পারছে না। তারা নিজেদের বঞ্চিত মনে করছে। তাদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। আর সেকুলার লোকেরা এগুলো ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। ওমানে খারেজি সম্প্রদায়ের ইবাদি উপসম্প্রদায়ের লোকেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। শাসকগোষ্ঠীও ইবাদি। সুন্নিরা সেখানে সংখ্যালঘু। তবে শাসকদের নীতি সাম্প্রদায়িক না হওয়ার কারণে সেখানে সাম্প্রদায়িক ক্ষোভ উল্লেখযোগ্য নয়। মোটকথা আরব বিশ্ব, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার সর্বত্রই আজ শিয়া-সুন্নি সঙ্ঘাত দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে। ইসলামি আন্দোলনগুলো এসব সমস্যার কার্যকর কোনো সমাধান বের করতে পারছে না, বরং তারাও কোনো কোনো গোষ্ঠীর পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে বা নীরব থাকছে। এ অবস্থায় একটি কল্যাণমূলক স্থিতিশীল ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বাস্তবতা প্রশ্নের সম্মুখীন হবেই।

মনে রাখা প্রয়োজন, বর্তমান মুসলিম বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ (৪৫টি) সুন্নি সংখ্যাগুরু হলেও অনেক দেশেই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিয়া জনগোষ্ঠী রয়েছে। কমপক্ষে পাঁচটি দেশ, যেমনÑ ইরান, ইরাক, আজারবাইজান, বাহরাইন ও লেবানন শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ। অন্য দিকে ইয়েমেন (৩৫-৪০ শতাংশ শিয়া), কুয়েত (২০-২৫ শতাংশ শিয়া), আফগানিস্তান (১০-১৫ শতাংশ শিয়া),আরব আমিরাত (১০ শতাংশ শিয়া), সিরিয়া (১০-১৫ শতাংশ শিয়া), সৌদি আরব (১০-১৫ শতাংশ শিয়া), তুরস্ক (১০-১৫ শতাংশ শিয়া), পাকিস্তান (১০-১৫ শতাংশ শিয়া), কাতার (১০ শতাংশ শিয়া), আলবেনিয়ায় (৫ শতাংশ শিয়া) এসব দেশ সুন্নি দেশ হলেও বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত। বস্তুত সুন্নি শাসনে শিয়ারা অসন্তুষ্ট; আবার শিয়া শাসনে সুন্নিরা অসন্তুষ্ট। এ অবস্থায় ফেরকাগত সমস্যার সমাধান না হলে এক উম্মাহ গঠনের স্বপ্ন পূরণ হবে না। মুসলিম বিশ্বে বর্তমানে মাজহাবি বিরোধ তেমন উল্লেখযোগ্য না হলেও এক মাজহাবের লোকেরা অন্য মাজহাবের পরিবেশে তেমন একটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। তদুপরি মুসলিম সমাজে একই মাজহাবের ভেতরে থেকেই বিভিন্ন ধর্মীয় মতভেদের উদ্ভব ঘটেছে। এগুলোর মধ্যে আছে প্রচণ্ড বিরোধ ও দ্বন্দ্ব বিশেষত বেরেলবি-দেওবন্দি বা ওহাবি দ্বন্দ্ব, সালাফি ও সুফি দ্বন্দ্ব ইত্যাদি। মোটকথা মুসলিম বিশে^র শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব, মাজহাব, মসলক, সুফি-সালাফি মতবিরোধ ইত্যাদির কার্যকর সমাধান খুবই জরুরি। চূড়ান্ত পর্যায়ে ‘বিশ^ খেলাফত’ কায়েম করতে চাইলে অবশ্যই এ সমস্যার সমাধান করতে হবে।

অমুসলিম জনসংখ্যার ক্ষোভের সমাধান:
মুসলিম বিশ্বের ২৩টি দেশেই অনেক অমুসলিম জনগোষ্ঠী বাস করে। বিশেষ করে নাইজেরিয়া (৪৯.৬ শতাংশ অমুসলিম), ব্রুনাই (৪৮.১ শতাংশ অমুসলিম), কাজাখস্তান (৪৫.৬ শতাংশ অমুসলিম), শাদ (৪৪.৭ শতাংশ অমুসলিম), লেবানন (৩৯.৩ শতাংশ অমুসলিম), মালয়েশিয়া (৩৮.৬ শতাংশ অমুসলিম), সিয়েরালিওন (২৮.৫ শতাংশ অমুসলিম), আরব আমিরাত (২৪ শতাংশ অমুসলিম), কাতার (২২.৫ শতাংশ অমুসলিম), বাহরাইন (১৮.৭ শতাংশ অমুসলিম), আলবেনিয়া (১৭.৯ শতাংশ অমুসলিম), গিনি (১৫.৮ শতাংশ অমুসলিম), কুয়েত (১৩.৬ শতাংশ অমুসলিম), ওমান (১২.৩ শতাংশ অমুসলিম), ইন্দোনেশিয়া (১২ শতাংশ অমুসলিম), কিরঘিজস্তান (১১.২ শতাংশ অমুসলিম), উত্তর সাইপ্রাস (১০.৪ শতাংশ অমুসলিম), বাংলাদেশ (৯.৬ শতাংশ অমুসলিম), কসোভো (৮.৩ শতাংশ অমুসলিম), মালি (৭.৮ শতাংশ অমুসলিম), সিরিয়া (৭.২ শতাংশ অমুসলিম), তুর্কমেনিস্তান (৬.৮ শতাংশ অমুসলিম) ও মিসরে (৫.৩ শতাংশ অমুসলিম) বিপুলসংখ্যক অমুসলিম জনগোষ্ঠী রয়েছে। ওইসব দেশে স্বাভাবিকভাবেই অমুসলিমরা ইসলামি শাসন বা ইসলামি লোকদের শাসনকে ভয় পায়। অমুসলমানেরা মনে করে, ইসলামি রাষ্ট্রে তারা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত হবে এবং তাদের অধিকার সীমিত হয়ে পড়বে। তখন তারা রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে নিগৃহীত হবে। কাজেই তারা মুসলমানদের সেকুলার অংশের সাথে মিলে ইসলামি রাষ্ট্র গঠনের পথে প্রচণ্ড বাধা সৃষ্টি করবে। আর সাম্রাজ্যবাদীরা একে ইসলামি আন্দোলন দমনের অজুহাত হিসেবে দেখবে। কাজেই ইসলামি আন্দোলনকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুর সমস্যার কার্যকর সমাধান বের করতে হবেÑ তাদের ধর্মীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করতে হবে। তা নাহলে ইসলামি রাষ্ট্রকে পীড়নকারী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। এটা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ আদর্শিক চ্যালেঞ্জ, যা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

নারী অধিকার ও ক্ষমতায়ন :
সাধারণভাবে যেকোনো দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। অতীতে নারীকে নানাভাবেই দমিয়ে রাখা হতো। তাদের স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বেরও স্বীকৃতি দেয়া হতো না। তাদের কোনো অধিকার আছে বলে স্বীকার করা হতো না। সেই অধঃপতিত অবস্থা থেকে ইসলাম নারী জাতিকে উদ্ধার করেছে; তাদের অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে এবং কার্যত অধিকার আদায়ের ব্যবস্থাও করেছে। কিন্তু খ্রিষ্টান অধ্যুষিত পাশ্চাত্যে নারী নির্যাতনের প্রতিক্রিয়ায় বিগত ১০০ বছরে নারীসমাজকে তাদের অধিকার পাওয়ার জন্য অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। বিশেষ করে সম্পত্তির অধিকার, শিক্ষার অধিকার, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি ও পেশায় নিয়োজিত হওয়ার অধিকার, ভোটাধিকার, রাজনীতি করা ও রাজনৈতিক দায়িত্ব গ্রহণের অধিকার ইত্যাদি। শেষ পর্যন্ত তারা পশ্চিমা দেশগুলোতে তা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। ইসলাম অতীতে যেসব মানবিক ও সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করেছিল পশ্চিমা প্রভাবে আজ মুসলিম নারীরাও তাতে সন্তুষ্ট নয়। বিশেষ করে চাকরি পেশায় নিয়োজিত হওয়া, রাজনীতি করা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেয়ার অধিকার ইত্যাদি বিষয়ে নারীরা জোর দাবি তুলছে। ইতোমধ্যে তারা অনেকটা অর্জন করতেও সক্ষম হয়েছে। এমন অবস্থায় ইসলামি আন্দোলনগুলো তাদের এসব সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার কিভাবে দেবে, এসব বিষয়ে দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য দিতে পারছে না। এমনকি তাদের একটি অংশ নারীদের এসব অধিকার বিশেষত রাজনৈতিক অধিকার দিতে প্রস্তুত নয়। তাই সাধারণভাবে ইসলামি আন্দোলনকে নারীসমাজের স্বার্থের জন্য খুব একটা ইতিবাচক মনে করা হয় না। অথচ নারীসমাজকে বাদ দিয়ে বা তাদের ভূমিকাকে খাটো করে কোনো আন্দোলনই সফল হতে পারে না। কাজেই ইসলামি দলগুলোকে নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়নের বিষয়টির গ্রহণযোগ্য সমাধান করতে হবে।

ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতার প্রশ্নটির মীমাংসা :
সাধারণভাবে কোনো ইসলামি গোষ্ঠী ক্ষমতায় বসতে পারলে তাদের সাথে ভিন্নমত পোষণকারী গোষ্ঠীগুলোকে শত্রু ভাবতে শুরু করে। এমনকি রাষ্ট্রীয় ব্যাপারেও কেউ ভিন্নমত পেশ বা পোষণ করলে তা সহ্য করতে বা সহনশীল হতে পারছে না। নবী সা: ছাড়া অন্য যে কারো সাথে মতভেদ পোষণ করা যায় সে বিষয়টি তারা ভুলে বসেন। তাদের সিদ্ধান্ত যেন নবী সা:-এর সিদ্ধান্তের মতো বলে তারা মনে করে থাকেন। তারা কোনো ভিন্নমতই সহ্য করতে চান না। ফলে তাদের মধ্যে একধরনের স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাবের সৃষ্টি হয়। এতে দেশ, জাতি ও ইসলাম বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তাই ভিন্নমতকে সহ্য করা, পারস্পরিক মতবিরোধের সীমা নির্ধারণ, কাউকে ভিন্নমতের কারণে দমন-নিপীড়ন না করা ইত্যাদি বিষয় স্পষ্ট করতে হবে। অধিকন্তু যারা আদর্শিকভাবে ভিন্নমতের ধারক ও সক্রিয়ভাবে তৎপর যেমনÑ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী ও কমিউনিস্ট; তাদের অধিকার থাকবে কি না, থাকলে কিভাবে থাকবে ইত্যাদি বিষয়গুলোরও মীমাংসা হওয়া প্রয়োজন।
মোটকথা, ইসলামি নীতির প্রতি অনুগত থেকে ইসলামি আন্দোলনকে উপরিউক্ত এ চারটি সমস্যার উপযুক্ত ও বাস্তব সমাধান বের করতে হবে। তা না হলে একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র গঠন দুরূহ হয়ে পড়বে।

পূর্বপ্রকাশিত: নয়াদিগন্ত

780 জন পড়েছেন

Comments are closed.