একটি সম্মেলন ও কিছু কথা

1212 জন পড়েছেন

মুসলিম জাতি হিসাবে আজ আমাদের অবস্থার দিকে তাকালে আমরা পরিবর্তনের আশা করি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে তা কিভাবে সম্ভব?

গত সপ্তাহে কানাডার টরন্টো শহরে অনুষ্ঠিত ৩ দিনের রিভাইবিং ইসলামী স্পিরিট কনভেনশনের ১৪তম বার্ষিক সম্মেলনে যোগদান করার সুযোগ হয়েছিল সেখানে স্কলাররা সে পরিবর্তনের লক্ষ্যেই বক্তব্য রেখেছেন। সবার কথায় যা প্রকাশ পেল তা হচ্ছে পরিবর্তনের জন্য যোগোপযুগী প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে এবং সে প্রচেষ্টা হতে হবে সব ক্ষেত্রে সব কিছুতে।

ইসলামকে বিজয়ী করার দরকার শুধু মুসলিমদের জন্য নয় বরং বিশ্বের সকল মানুষের কল্যাণে এবং তা আজ সময়ের দাবী। বর্তমান সভ্যতাকে বাঁচাতে এর বিকল্প নাই। অর্থাৎ ইসলামের আদর্শে সমাজ জীবন পরিচালিত হলে তা আমাদের সবার জন্য মঙ্গল।

আমরা যারা মুসলিম তারা বিশ্বাস করি যে এ পৃথিবীতে যদি সর্বশ্রেষ্ঠ কোন আদম সন্তান পদচারণ করে থাকেন তা হলে তিনিই হচ্ছেন আল্লাহর প্রেরিত শেষ রাসুল, মোহাম্মদ (স:)। অতএব নবীর জীবন অনুসরণ করলে দেখা যায় তিনি তিনি কখনও মানুষের প্রতি নির্দয় কিংবা সন্ত্রাসীর ভূমিকা রাখেন নাই । মহান আল্লাহর নবী মোহাম্মদ (স:)এর জীবনী পড়লে দেখা যায় নবীর ছিলনা বিশ্রাম নেবার সময় সর্বদা ব্যস্ত থাকতেন মানুষের কল্যাণে, মগ্ন থাকতেন গভীর চিন্তায়। অযথা কিংবা অপ্রয়োজনিয় কথা বলার অভ্যাস ছিলনা প্রিয় নবীর। বেশ কিছুক্ষণ নীরব থাকতেন তারপর বাক্যালাপ শুরু ও শেষ করতেন যা হত স্পষ্ট এবং স্বতন্ত্র। তাঁর কথাগুলা উচ্চারিত হত এমনভাবে যাতে ছিল মহত্ত্ব অথচ থাকতনা কোন অযাচিত বাহাদুরি বা অতিরিক্ততা বা অতিরঞ্জিত। নবী মোহাম্মদ (স:) প্রতিটি কাজ ছিল সুষম ও মধ্যম পন্থী। তিনি কখনও কারো সাথে অসূক্ষ্ম বা অমার্জিত ও কর্কশ আচরণ করতেন না। তিনি ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক, ভদ্র ও মার্জিত এক মহান ব্যক্তিত্ব। মানুষের প্রতি দরদ, সহমর্মিতার ও করুণার ভাণ্ডার। মহান আল্লাহ কোরআনে স্পষ্ট বলেছেন যে নবী মোহম্মদ (স:)কে পাঠানো হয়েছে সারা বিশ্বের সবার জন্য রহমত হিসাবে তথা রাহমাতুল্লিল আল্ আমিন। “And We have sent you (O Muhammad ) not but as a mercy for the Aalameen (mankind, jinns and all that exists)” [al-Anbiya’ 21:107]
যে আল্লাহর বানী পৃথিবীতে প্রচার করার দায়িত্ব তার উপর অর্পিত হয়েছিল সেখানে মূল নীতি ছিল “লা ইকরা ফিদ্ দ্বীন” ধর্মের ব্যাপারে কোন বল প্রয়াগ নাই। অবশ্য এর অর্থ এ নয় যে কোন সমাজে প্রচলিত মানবতা বিরোধী কোন অশুভ পদ্ধতি বা শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শক্তি ব্যবহার করা যাবে না। (বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখানে শুনতে পারেন) ।

ইসলাম একটি জীবন ব্যবস্থা তাই ইসলামের কথা বলতে আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধতা, আখলাক,পরস্পারিক সম্পর্ক, সামাজিক ন্যায়নীতি, একে অন্যের সঙ্গের লেনদেন তথা শোষনহীন অর্থনীতির কথা আসবে, সততার ও ন্যায়পরতার রাজনীতি আসবে, আল্লাহর সৃষ্টিকে বুঝতে প্রকৃতিকে জানতে জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চা আসবে, মানবদেহ সুস্থ রাখতে বিভিন্ন ব্যাধির চিকিৎসা জ্ঞানের চর্চা আসবে। এক কথায় একজন বিশ্বাসীর জীবনের সকল ক্ষেত্রে ও চাহিদাতে ইসলামী আদর্শকে মেনে চলার নামই হচ্ছে ইসলাম। আর এ আদর্শ অনুসরণ করে এক সময় মুসলিমরা সক্ষম হয়েছিল প্রতিষ্ঠা করতে এক ইসলামী সভ্যতা।

কিন্তু যে কারণেই হউক ইসলামী সভ্যতার সে আদর্শ থেকে বর্তমান বিশ্ব চলে এসেছে অনেক দূরে। বর্তমান সভ্যতার লক্ষ্য হচ্ছে ধর্ম বিমুখ সম্পূর্ণ বস্তুতান্ত্রিক সেকুলার সভ্যতার একমাত্র “এক বিশ্ব ব্যবস্থা” (One world order) কায়েম করা যার কেন্দ্রে থাকবে গুটি কয়েক ধনী গুষ্টির বিশেষ একটি গুপ্ত দল যাদের পরিকল্পনায় চলবে বিশ্বের অর্থব্যবস্থা, শাসনব্যবস্থা ও তথাকথিত আধুনিকতার সংস্কৃতি যার মূল ভিত্তি হবে মুক্তচিন্তার নামে মানুষকে ধর্ম বিমুখ করা, চরম ব্যক্তি কেন্দ্রিক (self centered), পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার চিরস্থায়ী দাসে পরিণত করা। অবশ্য এর আলামত এবং দাবানল ইতিমধ্যে পৃথিবী ব্যাপী দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে বলে অনেকেই মনে করেন। আর এ সভ্যতা আজ মানুষকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তা সচেতন ও বিবেক সম্পন্ন প্রতিটি মানুষ বুঝতে পারছেন।

তাই আজ আমাদের কর্তব্য হচ্ছে আমাদেরকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে চরম দুর্দশাপূর্ণ এ পৃথিবীর বুকে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সকল অত্যাচার ও অন্যায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। তবে এ কাজ করতে হলে জাতী ধর্ম নির্বিশেষে প্রতিটি শান্তিকামী ও ন্যায়পরায়ণ মানুষকে নিয়ে জোট গড়তে হবে।

এবারের সম্মেলনের মুল থিম ছিল Alliance of Vitrue – Joining hands for peace । সম্মেলনে উপস্থিত প্রায় ২৫হাজার শ্রোতাদের অধিকাংশরা যেহেতু ছিল পশ্চিমা দেশের যুব সমাজ তাই পাশ্চাত্যের ধর্ম বিমুখ বস্তুতান্ত্রিক জীবন ব্যবস্থার এই সমাজে কিভাবে নিজেদের ইসলামী ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতিকে সমুন্নত রেখে একজন সফলকাম মুসলিম হিসাবে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করা যায় সে সব বিষয়ে বাস্তব ভিত্তিক বিভিন্ন পদক্ষেপ ও কর্মসূচির প্রস্তাবনা এসেছে স্বকলারদের কাছ থেকে।
মুসলিম বিশ্বের চলমান অন্যায় যুদ্ধের পিছনে পশ্চিমা দেশের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেন একাধিক বক্তা। শেখ যায়েদ শাখের আমেরিকার যুদ্ধ ব্যবসা ও অস্ত্র ব্যবসার সমালোচনা করেন। তিনি জানান গত ২০১৪ সালে আমেরিকা ১.২ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রয়ের চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল মধ্য প্রাচ্যের দেশের সাথে। গত বৎসর কেবল দুই মাসে কুর্দিস্তান ও সিরিয়াতে প্রক্সি যুদ্ধ চালিয়ে শত শত টন বোমা বর্ষনের অর্থের হিসাব করলেই বুঝা যায় কি পরিমান অর্থের ব্যবসা পম্চিমা দেশের অস্ত্র শিল্পের মালিকেরা কামাই করছে। যুদ্ধে মানুষ মরলে তাদের কি যায় আসে! তাদের মুনাফা ঠিকমত অর্জিত হচ্ছে এটাই আসল ব্যাপার!

“ইসলাম একটি ভায়লেন্ট ধর্ম” বলে যে অপপ্রচার ইসলামোফবিয়ারা করে তার জবাবে প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ আমেরিকান নাগরিক শেখ হামজা ইউসুফ অসাধারণ বক্তব্য রেখেছেন। রাসুল (স:) এর ২৩ বছরের মিশনে ২৯টি অভিযানে লিপ্ত হয়েছিলেন যার মধ্যে একমাত্র ১১টি ছিল সামরিক অভিযান যার হতাহতের সংখ্যা ছিল সামান্য বর্তমানের তুলনায় অর্থাৎ রাসুল (স:) ২৩ বছরের তখনকার সকল যুদ্ধের হতাহতের সংখ্যা যা ছিল তা বর্তমান এক দিনের যুদ্ধের সমান হবে না ।
শুধু আমেরিকার ইতিহাস ঘাটলেই দেখা যায় এদেশের জন্ম লগ্ন থেকে প্রথম একশত বছরেই ৬৮৩,০০০ এর মৃত্যু হয় বিভিন্ন যুদ্ধে। In its first 100 years of existence, over 683,000 Americans lost their lives, with the Civil War accounting for 623,026 of that total (91.2%)। (সূত্র এখানে)
ইসলামোফবিয়া ও নাস্তিকদের প্রোপাগান্ডা হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধে যত মানুষ হত্যা হয়েছে তার কারণ হল ধর্ম অথচ তাদেরকে যদি প্রশ্ন করা হয় বিগত শত শত বছর থেকে যে সব যুদ্ধ চলে আসছে এর কয়টা যুদ্ধ হয়েছে ধর্মের কারণে? প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ বলেন আর ২য় বিশ্ব যুদ্ধ কি কোন ধর্ম রক্ষার যুদ্ধ ছিল?
তথাকথিত আধুনিক সেকুল্যার সভ্যতার বিশ্বব্যাপী অন্যতম বড় ব্যবসা হচ্ছে “যুদ্ধ ও অস্ত্র ব্যবসা” হিসাব নিলে দেখা যায় ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যবসা। It is estimated that yearly, over 1.5 trillion United States dollars are spent on military expenditures worldwide (সূত্র এখানে)
কেবল বিংশ শতাব্দীতেই এক শত ৬০ মিলিয়ন মানুষ যুদ্ধে মারা গিয়েছে। (160 million people died in wars during the 20th century – যুদ্ধে মানুষ হত্যার পরিসংখ্যান জানতে এখানে পড়তে পারেন। )

ইসলাম ও সন্ত্রাসবাদ

ইসলামকে যারা সন্ত্রাসী কর্ম কাণ্ডের সাথে জড়িত করে কলঙ্কিত করতে চায় সে ব্যাপারে অত্যন্ত বলিষ্ঠ কণ্ঠে প্রতিবাদ করা হয়েছে সম্মেলনে। শেখ হামজা ইউসুফ তথাকথিত সিরিয়ার সন্ত্রাসী সংঘটন আইসিসের কড়া সমালোচনা করেন এবং এদের হীন উদ্দেশ্যের মুখোশ উন্মোছন করেন প্রায় সোয়া এক ঘণ্টার অডিও ভিডিও তথ্যের উপস্থাপনায়। ইসলামের নামে বর্বর হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে এরা কাদের স্বার্থে কাজ করে যাচ্ছে ইসলাম ও মুসলিমদেরকে কলঙ্কিত করতে তা কোরআন হাদিসের আলোকে উপস্থিত শ্রোতাদেরকে অবহিত করেন।

সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা

আমার কাছে সব চেয়ে ভাল লেগেছে লিন্ডা সারসুরের কথাগুলা । পশ্চিমা সমাজে বসবাসরত মুসলিমদের উদ্দেশ্যে তার ভাষণ এতই অনুপ্রেরণীয় বা প্রেরণাদায়ক (motivational) ছিল যে উপস্থিত হল ভর্তি হাজার হাজার মানুষ সবাই দাড়িয়ে করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন। লিন্ডা তাঁর নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে কথায় ও কাজে যে জিনিসটা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন তা হল মুসলিমদেরকে বর্তমান বিশ্বে নিজেদের অবস্থানকে শুধু কথা দিয়ে নয় কাজে প্রমাণ করতে হবে । প্রত্যেকে নিজেদের অবস্থান থেকে সমাজে কাজ করে দেখাতে হবে কীভাবে তারা সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেন।

আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধতা।
শেখ মোখতার মাগরাউয়ি তাঁর বক্তৃতায় আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধতার জন্য এবং পাপ থেকে মুক্ত থাকতে আমাদের হৃদয়কে আল্লাহ স্মরণে যুক্ত করার গুরুত্ব সম্পর্কে অত্যন্ত আবেগময় বকৃক্তা রাখেন। যুগে যুগে মানুষ তাদের হৃদয়কে আল্লাহ স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে বা আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে কিভাবে পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত হয়েছে সে বর্ণন দেন। পরিশেষে আল্লাহ তা’য়ালার ক্ষমা ও রহমতের প্রত্যাশায় এক আবেগময় প্রার্থনা করেন তখন উপস্থিত অনেকেরই দুনয়নে অশ্রু ঝরেছে।

1212 জন পড়েছেন

Comments are closed.