নব্য-ক্রুসেডের অন্তরালে নাস্তিক মিলিটেন্সি

1212 জন পড়েছেন

-এক-

নব্য ক্রুসেড ও কিছু প্রশ্ন

মুসলমানরা যে আল্লাহতে বিশ্বাস করেন সেই আল্লাহ বস্তুর অংশ নন এবং বস্তুর গুণে গুণান্বিত নন। আপনি এই আল্লাহর অস্তিত্বে অস্বীকার করেন। যদিও আপনার কোন দলিল প্রমাণ নেই কিন্তু মুসলিমদের বিপক্ষে আক্রমণমুখর। হয়ত আপনি নাস্তিকতার ছদ্মাবরণে ইসলাম বিদ্বেষী হিন্দু। ঐতিহাসিক হিংসা-বিদ্বেষ ও রেষারেষি বুকে নিয়ে এই যুদ্ধে নেমেছেন। আবার হয়ত নাস্তিকও হতে পারেন। ইউরোপের হাজার বছরের ক্রুসেড যুদ্ধে শরিক হয়েছেন। উদ্দেশ্যের মিল আছে বলে। অথবা আপনি হুজুগী নাস্তিক -বিষয়ের গভীরতায় না গিয়েই অপরের বৈশ্বিক যুদ্ধে নেমে পড়েছেন। আপনি যে বনের পাখি আর আপনার কণ্ঠের যে গান তা বেমানান হয়ে আছে।  আপনি হয়ত হেয়ালীভাবে নেমেছেন। না বরং “ভাইরাসে” আক্রান্ত হয়েছেন কিন্তু হয়ত তা চিন্তা করে দেখেন নি। এই ভাইরাসটা কি? জানা না থাকলে, একটু গুগ্লিং করে ভাইরাসের সংজ্ঞা ও তথ্য পাঠ করে নিন। তারপর ভাবুন, বায়োলজিক্যাল প্রেক্ষিতে এটা কি বিশ্বাসের সাথে সমন্বয়শীল কোন বস্তু বা ধারণা?  আপনার নিজ বিশ্বাসের সাথে তুলনা করুন। ‘বিশ্বাস’ কথাটি একটু বর্ধিত ধারণায় গৃহীত হোক। তারপর বিবেচনা করুন এই ভাইরাসের উপমা কি সঠিক উপমা? এটা কি “বৈজ্ঞানিক” অভিব্যক্তি (expression)? না এখানে ভাষার ধাপ্পাবাজি হচ্ছে? প্রচলিত অর্থের ভাইরাসের ধারণাকে পণ্য বিক্রির বিজ্ঞাপনী কায়দায় অন্য বস্তুর সমন্বয়-প্রলেপে ধাপ্পাবাজি সাজানো হয়েছে –তাই না? আপনি কি এই ভাইরাসে আক্রান্ত? যদি না হন, তবে কেন এই যুদ্ধে? এই যুদ্ধ কার? একটু প্রেক্ষিত নিয়ে চিন্তা করুন। এই ভাইরাস কি বাংলাদেশের, না এটা ‘মেইড ইন এমেরিকা’ (made in America)?

এবারে আসুন এই ভাইরাসের অঙ্গন ও উপমায়।  এখানে একটি বস্তুর আলোকে অন্য বস্তু বিবেচিত হচ্ছে; এখানে ভাষার ‘ব্যবহারিক’ একটি রূপ প্রকাশ পাচ্ছে। এই ধারায় ধর্ম সংযুক্ত করে আলোচনায় নামলে (অথবা ধর্মীয় অঙ্গন এক পাশে রাখে অন্য অঙ্গনে গেলেও) ভাষার প্রকৃতি আসবে, এবং দর্শনও আসতে পারে। ব্যবহারিক মারপ্যাঁচের বিষয় আসতে পারে। ভাষিক ব্যবহার কীভাবে সত্য মিথ্যাকে (engage করতে বা) জড়াতে পারে অথবা মিশ্রণের ‘ঘোলাট’ তৈরি করতে পারে –এমন বিষয়ও আসতে পারে। আপনি কি ভাষা দর্শন অধ্যয়ন করেছেন? ভাষায় যুক্তি কীভাবে কাজ করে সে বিষয় অধ্যয়ন করেছেন? উপমা কীভাবে যুক্তির মোড়কে স্থানচ্যুত করতে পারে সেসব বিষয়ে অবগত? তারপর যে যুদ্ধে নেমেছেন সেই যুদ্ধ কি ঐতিহাসিকতাশুন্য? ইতিহাস দর্শন সম্পর্কে জ্ঞাত? ইতিহাস কি নিছক অতীতের ঘটনা? অতীতের বাস্তবতা? ‘বাস্তবতা’ ও ‘ইতিহাসের’ মধ্যকার সম্পর্ক কী? ধর্মে ভাষা কীভাবে ব্যবহৃত হয়? সূর্য আল্লাহকে কীভাবে সেজদা করে? কীভাবে আরশের নিচে যায়? আরশ কোথায়? এই আসমান আর জমিন কীভাবে আল্লাহকে সেজদা করে? কীভাবে ভূ ও নভোমণ্ডলে যা কিছু আছে -সবকিছু:  সূর্য, চন্দ্র, তারকারাজি, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু তাকে সেজদা করে (২২:১৮)? সেজদার অর্থ ও তাৎপর্য জানেন? ধর্মতত্ত্ব নিয়ে পড়াশুনা করেছেন? ধর্ম ছাড়াও ভাষা কীভাবে বিভিন্ন অঙ্গনে কাজ করে, রূপায়িত হয় –তা জানেন? না শুধু ভাবছেন কোন বিদ্যালয় থেকে এক টুকরা ‘কাগজ’ হাতে পেয়ে সর্ববিদ্যায় “মহাপণ্ডিত” হয়ে গিয়েছেন? না ঘটনা এমন যে কেউ বিজ্ঞানের নামে মাথা ধোলাই করে দিয়েছে, তাই দিশেহারা? আপনি কার যুদ্ধ করছেন?

সমাজের সাধারণ মানুষের সাথে আপনার কীসের যুদ্ধ? যাদের সাথে আপনার যুদ্ধ হতে পারে, বিতর্কের কিছু থাকতে পারে, তাদের সাথে বিতর্ক করতে পেরেছেন, যুদ্ধ করতে পেরেছেন? আপনি কি লাদেনদের সাথে কখনো কথা বলতে পেরেছেন? আইসিসদের সাথে কথা বলতে পেরেছেন? বুকো-হারামের সাথে কথা বলেছেন? আপনি কি এসব আন্দোলনের রাজনৈতিক এবং আর্থ-সামাজিক কারণসমূহ অধ্যয়ন করেছেন? আপনি কি ঐতিহাসিক যুদ্ধের এনালিটিক্যাল (বিশ্লেষণাত্মক) পর্যবেক্ষণের পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখেন?

আপনি কেন সাধারণ মুসলিমের সাথে যুদ্ধে নেমেছেন? আপনি কেন ক্রুসেডারদের প্রশ্ন ও বক্তব্য কপি-প্যাস্ট করে সাধারণ মুসলমানদের সাথে বিবাদ সৃষ্টি করছেন? সাধারণ মুসলিমরা কি এসব প্রশ্ন ও বক্তব্যের উত্তর দেবার উপযুক্ত লোক? কেন এই বিভ্রান্তির এজেন্সি আপনার হাতে? কোন ‘স্বার্থে’ এই যুদ্ধ: বৈশ্বিক সূত্রে, না বাক-স্বাধীনতার হেয়ালীপনায়? আপনি কি কখনো চিন্তা করেছেন যে যেসব বক্তব্য ও প্রশ্ন আপনি ফেরি করে বেড়াচ্ছেন সেগুলো অন্য উৎসে উৎসারিত এবং অন্য উদ্দেশ্যে সজ্জিত? যুক্তি যুক্তি করে, কুযুক্তির মিথ্যাচারে সাধারণ মানুষের সমাজ বিপন্ন করার বিষয়টি কি চিন্তা করেছেন? এটি কার যুদ্ধ?

-দুই-

যুক্তি দর্শানো ছাড়া কি সত্যানুভূতি নেই?

মানুষের ধর্ম-কর্ম প্রধানত প্রায়োগিক (functional)। এটা জীবন পদ্ধতি-সদৃশ বা জীবন পদ্ধতি। যেমন কোন পরিবেশে মানুষ চাষবাস করে। এখানে একজন দা, কুড়ল, খুন্তি, লাঙল, জোয়াল, মই ইত্যাদির ব্যবহার শিখে। কোন্‌ মাসে কী কাজ করতে হয় তা শিখে। ফসলের রোপণ, পরিচর্যা থেকে ফসল তোলার জ্ঞান লাভ করে, এতেই তার জীবন। কিন্তু এসব বিষয়ের ঐতিহাসিকতা কী, কোন্‌ হাতিয়ার কালের আবর্তনে কীভাবে পরিবর্তিত/পরিবর্ধিত হয়েছে, অথবা জাতীয় জীবনে তার পরিবারের অবস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ায় তারা কোন্‌ স্থানে আছেন অথবা কোন্‌ ধরণের ভূমিকা (role) পালন করেন; অথবা তাদের শ্রেণির জীবন যাপনের দার্শনিক দিক কী অথবা অন্যান্য সমাজ ব্যবস্থার সাথে তাদের তুলনীয় রূপ কী –এসব বিষয় সে সুন্দর করে, যৌক্তিক ভাষায় বুঝিয়ে দেবার জ্ঞান হয়ত রাখবে না। বিষয়টি এভাবেই। কেননা এসব বিদ্যায় সে বছরের পর বছর কাটিয়ে সেই “ভাষা” আত্মস্থ করেনি। কিন্তু আপনার ‘ভাষায়’ ও আপনার ‘যুক্তিতে’ তার কথা সাজিয়ে ‘পটর-পটর’ করতে পারে নি বলে তার আক্কেল বুদ্ধির কোন কমতি আছে –এমনটা কি ভাবা যাবে?

কোন ব্যক্তি যে কাজ করে, দর্শন, যুক্তিতে তার কাজের ব্যাখ্যা কীভাবে হবে তা নিয়ে এক ভিন্ন ধরণের “লটর-পটর” করার সংস্কৃতি প্রায় আড়াই শো বছরের মত লক্ষ্য করা যায়। এই সংস্কৃতিতে সব কিছু ভাষিক (rationalising) ব্যাখ্যায় তোলে ধরতে পারাটাই একটা বড় বিষয় হয়ে গিয়েছে। কোন এক মহিলা কেন বিবাহ ছাড়াই ১০ পুরুষের সাথে দৈহিক সম্পর্ক রাখছেন অথবা একজন পুরুষ বিবাহিত হয়েও পরকীয়া সম্পর্কে জড়িত তা তারা সুন্দরভাবে সাইকো-সস্যিয়েল যুক্তিতে ও ভাষায় নৈপুণ্যের সাথে ব্যক্ত করতে পারাতে তাদের কথা শ্রবণ, বিবেচনা ও সভ্যতায় গ্রহণের শ্রেণী ও সংস্কৃতি সমাজে রূপলাভ করেছে। এখানে ইংরেজি প্রবচন gift of the gab  বা ‘মুখের জোর’ অত্যন্ত মূল্যবান বস্তু হয়েছে।

-তিন-

সাধারণ মানুষের ধর্ম নির্মূল করে কার মূল্যবোধ ও বিশ্বাস চাপানো হবে?

আমাদের ধর্মের বিষয়টি হচ্ছে আমল-কেন্দ্রিক (তবে প্রশস্ত অর্থে সকল ধর্মেরই); এখানে যুক্তি, দর্শনে ধর্ম-ব্যাখ্যায় পারদর্শী হওয়া জরুরি নয়। একজন আল্লাহতে বিশ্বাস করবে, পরকালে বিশ্বাস করবে, তার ভাল-মন্দ কাজের হিসাব নেয়া হবে –এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে সে জীবন সাজাবে। এটাই হচ্ছে ধর্ম জীবনের মূল বস্তু। যৌক্তিকতায় কী দেখাতে পারল বা কী পারল না, তাতে কিছুই যায় আসে না। প্রায়োগিক মূল্যই বড় মূল্য। এমনটাই বিশ্ব-মানবে স্থান কালের পরিক্রমায় পাওয়া যাবে –এটাই নানান ধর্ম ও সংস্কৃতিতে গড়ে-ওঠা এই মানবের এক বড় ঐতিহ্য। এতে কোন ভাইরাস নেই। এটা নিয়ে যুদ্ধেরও কিছু নেই, যদি না তাতে অর্থ-স্বার্থ ও আদর্শিক দ্বন্দ্ব থাকে। এখানে ভাইরাসের সংযুক্তি হবে “বিজ্ঞান মূর্খতা”।

আমাদের ধর্ম বিশ্বাসের মূল বস্তুর বর্ধিতরূপ আসে এভাবে: সে নামাজ পড়বে, রোজা রাখবে, জাকাত দেবে, হজ্জ করবে, হালাল রুজি করবে, দান-খয়রাত করবে, প্রয়োজনে অপরের সাহায্যে এগিয়ে যাবে, অপরের দোষ-ত্রুটি মার্জনার চোখে দেখবে, ছেলে-মেয়ে বড় হলে বিয়ে-শাদী দেবে, কেউ মারা গেলে দাফন কাফন করবে। এসব কাজের আরও বিবরণ/বিস্তৃতি আছে। এসবের মধ্যে সে, তার পরিবার, তার সমাজ সবই পারস্পারিকতায় সংযুক্ত। এখানে উল্লেখিত ধর্ম-কর্মে বিশেষ জ্ঞান, বিশেষ জিজ্ঞাসা, বিশেষ নিয়ম-কানুনের সন্নিবেশও রয়েছে। কিন্তু সকলকে সেই জ্ঞান অর্জনের দরকার হয় না। ‘কিছু লোক’ সেই জ্ঞান অধ্যয়ন করলেই বাকিদের জন্য সেই প্রায়োগিক প্রয়োজন পূরণ হয়ে যায়। এভাবেই কালীন প্রবাহে অনেক উত্তম প্রথা প্রবাহিত হয়।

-চার-

মুসলিম সমাজে মাদ্রাসার ঐতিহ্যগত প্রথা আসলে কি শিখায়?

বাংলাদেশের সাধারণ মাদ্রাসা শিক্ষার কার্যক্রম মূলত এই প্রায়োগিক বা functional বিষয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত। বিশ্বাস কী; আমল আখলাকের বিবরণ কী; বাচ্চাদেরকে কী কী পড়ানো দরকার; পবিত্রতা কী; ইবাদত বন্দেগী কী এবং এতে কীরূপ পবিত্রতার প্রয়োজন, নামাজ কীভাবে পড়তে হয়; অজু কীভাবে করতে হয়; মসজিদে ইমামতি কীভাবে করতে হয়; বিয়ে কীভাবে পড়াতে হয় এবং কীভাবে তা কার্যকর হয়; বিয়ে যদি সমস্যাবহুল হয় তবে তালাকের নিয়মকানুন কীভাবে কার্যকর হয়, এই ধারায় দৈনন্দিন জীবনে এবং যাবতীয় ক্ষেত্রে সকল হুকুম আহকাম পালনের প্রায়োগিক কাজ সমাধা করার উপযোগী লোক তৈরি করাই হয় এই ব্যবস্থার প্রধান কাজ। এখানে কাউকে তর্কবাগীশ বানানো হয় না। ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন, সমাজ বিজ্ঞান, রাষ্ট্র বিজ্ঞান ইত্যাদি পাঠ করে কোন আলোচনা যেসব শব্দ ও পরিভাষায় করা হয় তারা সেই ভাষা আত্মস্থ করে সেই ভঙ্গিতে বক্তব্য উপস্থাপনের স্কীল শিখে বের হন না। কারণ তাদের ধর্মীয় দৈনন্দিন জীবনের প্রায়োগিক উদ্দেশ্য ভিন্ন। কিন্তু এই ব্যবস্থা মানুষকে সৎলোক করে। সামাজিক ও পরকালমুখি করে। মানব উদ্দেশ্যকে ধারণ করে।

ধর্মহীন শিক্ষা ব্যবস্থা মানুষকে দারুণভাবে অসৎ ও জবাবদিহীতামুক্ত করতে পারে। আজকের বাংলাদেশের বড় বড় চুরি, ডাকাতি, গুম-রাহাজানি, হত্যা-চাঁদাবাজি, জাতীয় সম্পদের হরিলুট: ব্যাঙ্কলুট, ভূমিদস্যিপনা, নারী-ব্যবসা এই ধর্মহীন সেক্যুলার শিক্ষার লোকজনই করে আসছে। ১৯৭১ সালের হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন সেক্যুলার আদর্শে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেনাবাহিনী করেছে, (আপাতদৃষ্টে অনেকের মনে হতে পারে যে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ‘ইসলামী’ শিক্ষা, আদর্শ ও নৈতিকতায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাহিনী ছিল -এই ধারণা ভুল। ওরা ছিল ঐপনিবেশ আমলের সেক্যুলার শিক্ষা ও আদর্শে  প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং পাকিস্তানও ‘ইসলামী’ দেশ ছিলনা), যেভাবে তা ইরাকে, আফগানিস্তানে, প্যালেস্টাইনে এবং অপরাপর ভূখণ্ডে করা হয়েছে। ইউরোপীয় মিলিটারি ইতিহাসে তা রোমান ও রোমান-পূর্ব এথেনিয়ান যুগ পর্যন্ত পাওয়া যাবে। একাত্তরের বাংলাদেশে তা মাদ্রাসায় শিক্ষিতরা করে নি বরং গ্যাজেট-বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পূর্বপাকিস্তান সরকার সর্বসাধারণ থেকে (এখানেও আছে সেক্যুলার) যে রাজাকার বাহিনী তৈরি করেছিল তাদের সহযোগিতায় ঐ সেনাগণ করেছে,  এবং তারা (সেনারা) নিজেরাও সরাসরি করেছে কেননা তারা এই দেশের ভূ-পরিচিতিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেনাবাহিনী ছিল। তারপর স্থানভেদে দেশের মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব, পূর্ব-শত্রুতা, কলহ, হিংসা-বিদ্বেষ ও প্রতিশোধ প্রবণতাও কাজ করেছিল। এসবের মধ্যে আবার যুদ্ধকালীন বিচ্ছিন্ন ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও যে ছিল না –তা নয়। পরবর্তীতে স্বার্থান্বেষী, আলট্রা-সেক্যুলার এবং নাস্তিকমহল চেতনা-ব্যবসার প্রোপাগান্ডা-কৌশলে হত্যা-ধর্ষণে আলেম সমাজের নাম জড়িয়েছে এবং রেডিও, টিভি, গান, গল্প, নাটক, ছায়াছবি ইত্যাদিতে তাদেরকে কোণঠাসা করে সাধারণ মানুষের একাংশকে বিভ্রান্ত করেছে। এসবের পিছনে ছিল রাজনৈতিক ও আদর্শিক দ্বন্দ্ব, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বন্দ্ব। ‘আদর্শ’ ইতিহাস ও ঘটনাপ্রবাহের এক প্রধান ইন্টারপ্রিটার।

আজ ধনতান্ত্রিক বৈশ্বিক উদ্দেশ্য, ক্রুসেড ও যায়োনবাদী উদ্দেশ্য, ব্রাহ্মণ্যবাদী উদ্দেশ্য পারস্পারিক সংযুক্তি ও অধিক্রমণে এসেছে। আজ ইসলাম রাষ্ট্রশুন্য কিন্তু চতুর্দিক থেকে ইসলামের উপর আক্রমণ আসছে। এই আক্রমণ নানান ধারায় হচ্ছে। এসবের মধ্যে রয়েছে পেশিশক্তি, মিথ্যাচার, ইতরামি, মিডিয়া প্রোপাগান্ডা, রাষ্ট্রীয় আক্রমণ। বাংলাদেশে হাজার হাজার এনজিও কাজ করছে। অনেক লিস্টেড, অনেক আনলিস্টেড। সবার কাজ মানবতাবাদী হবে –এমনটি আশা করা যায় না। আবার যারা ‘বৈশ্বিক উদ্দেশে’ (new world order) সমাজ পরিবর্তনের কাজ করছেন এবং যারা বিদেশ থেকে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায়, ইরাকি এক্সপাট্রিয়টদের (expatriates) ন্যায়, সেই একই কাজ সেই সূত্রেই করছেন, তাদের নিজেদের দৃষ্টিতে নিজেদের কাজ ‘মানবতাবাদী’ হবে -সন্দেহ নেই। কিন্তু অন্য দৃষ্টিতে তা বিদেশি আদর্শ ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে সমাজ পরিবর্তের ষড়যন্ত্র। আজকের এই জটিল যুদ্ধ হচ্ছে নানান ভাঁওতাবাজিতে।

-পাঁচ-

ধনতান্ত্রিক নতুন বিশ্ব-ব্যবস্থা ও নব্য ক্রুসেড

আজকের বিশ্ব-ব্যবস্থার প্রধান চালিকা শক্তি হচ্ছে ধনতান্ত্রিক আদর্শ। এখানে একটি পণ্য বিক্রি করতে কতভাবে অসমন্বিত বিষয়ের সমন্বয় হয়, অসম্পর্কিত দূরের বিষয়ের সাথে সম্পর্ক জুড়া হয়, কখনো মিথ্যাচারও হয়। আজকের কর্পোরেট শক্তি ক্ষেত্র বিশেষে রাষ্ট্রেরও ঊর্ধ্বে।

যায়োনবাদী কব্জার রাষ্ট্র, শিক্ষা ও আইনি ব্যবস্থা হচ্ছে গোলামীর কারখানা। এর বৈশ্বিক অগ্রযাত্রার প্রধান শত্রু হিসেবে বিবেচিত হয়ে পড়েছে ইসলাম ধর্ম। এখানে সুদ হারাম। এটা এক বড় অন্তরায়। তাই মুসলিম বিশ্বের গ্রামে-গঞ্জেও সূদের বিস্তার ঘটানো হচ্ছে কেননা এরই মাধ্যমে ব্যক্তিকে গোলামীর জিঞ্জিরে আবদ্ধ করা যায়। ইসলাম আপাত সুখের ইউরোপীয় হেডোনিক (hedonic) প্রলোভন ও চাকচিক্যের জীবন পদ্ধতির বিপক্ষে। এই বস্তু ফেলে দিয়ে ঐ বস্তু কেনা, অযথা খরচ করা, অযথা অব্যবহারিক বস্তুতে ঘর ভরা –এসবের বিপক্ষে। জুয়া, জুয়া-ব্যবসার বিপক্ষে, ক্যাসিনোর বিপক্ষে, বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের বিপক্ষে; বিবাহিত ও অবিবাহিত নারী-পুরুষের স্বতঃপ্রবৃত্ত অবৈধ যৌন সংগম (sexual relations between consenting adults)  তথা যিনা-ব্যভিচারের বিপক্ষে, মদের বিপক্ষে, মাদকের বিপক্ষে, সার্বিকভাবে ইসরাফের (অপচয়ের) বিপক্ষে। বস্তুর প্রতি অত্যধিক আকৃষ্টির বিপক্ষে যা স্থানভেদে পৌত্তলিকতায় পৌঁছে। ধনতান্ত্রিক আদর্শের অনেক বাণিজ্যের রকমারি হের-ফেরে বেচা-কেনার বিপক্ষে। অতঃপর নানান প্রক্রিয়ার ধানাই আর পানাই, যেখানে যুক্তি নাই সেখানে যুক্তির অবতারণা, যেখানে মানুষের পরাধীনতা সেখানে স্বাধীনতার ধোঁয়া তোলার বিপক্ষে।

ইসলাম ‘আধুনিক ম্যাজিকের’ মুখোশ উন্মোচক। তাই ধনতান্ত্রিক যায়োনবাদী বিশ্ব-ব্যবস্থা ইসলামের নখ-দাঁত উপড়ে ফেলতে চায়, সমূলে নির্মূল করতে চায় অথবা খৃষ্টিয়ানিটির মত ‘আছে-আছে, নাই-নাই’ করে রাখতে চায়। এইসব কাজের জন্য দেশি দালালের দরকার। নারিকেলের দরকার (brown outside, white inside)। চঞ্চল-প্রকৃতিস্থ, বেপরোয়া, উচ্চাভিলাষী, ধনাঢ্যে প্রতিষ্ঠিতার স্বপ্ন বিলাসী লোকের দরকার যাদের মাধ্যমে ইসলামকে নানান নেতিবাচক ‘সমন্বয়ের প্রলেপের’ কাজ করানো যায়। এবারে ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ আর আমেরিকান বিলবোর্ডের ইসলাম বিদ্বেষী মিলিয়ন ডলারের বিজ্ঞাপনী বাস্তবতা চিন্তা করুন। হয়ত অমনিতেই অনেক বিষয়ের ষড়যন্ত্র অন্তর্দৃষ্টিতে এসে ধরা দেবে।

ধনতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থা এবং এর শিক্ষা ব্যবস্থা ব্যক্তিকে এমন মানসিকতায় গড়ে যাতে সে সহজে বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার মর্ম ভেদ করে দাঁড়াতে না পারে। তাকে চতুর্দিক থেকে বেষ্টন করা হয়। ব্যক্তি যখন £২০০,০০০ পাউন্ড সুদে ঘর কিনে তখন তার জীবন সুদীদের হাতে জমা দিয়ে আসে, এটা না করেও তার উপায় নেই, কেননা আর্থ-সামাজিক অবস্থা ধীরে ধীরে এই সীমায় সাজিয়ে আনা হয়েছে। তারপর তার রাতদিন পাত হয় এই ঋণ আদায়ে।  অন্য কোন চিন্তার সময় থাকে না। সুদী জনগোষ্ঠী কখনও বিপ্লবী চিন্তায় যেতে পারে না। এই কথাটি বুঝা অত্যন্ত জরুরি। সে তো এক সপ্তাই কাজ ছাড়া চলতে পারবে না। মাসের কিস্তি আদায় না হলে বিপদ! এরই সাথে তার মন মগজ ঘুলানো থাকে বিলাসী পণ্যের  ছোট বড় অনেক ঋণে। তার ঘরে অনেক আসবাবপত্র, বিলাসী উপকরণ -যেগুলোর এক দশমাংশও হয়ত সে রীতিমত ব্যবহার করে না। কিন্তু এগুলো তার থাকা চাই। এর পক্ষে তার ‘পর্যাপ্ত’ যুক্তি ও ভাষা আছে। কিন্তু এসবের পিছনেই যে তার জীবন নিঃশেষ হচ্ছে –সেটা চিন্তা করার সময় নেই, সেই প্রজ্ঞাও নেই। ধনতান্ত্রিক সেক্যুলার শিক্ষা তাকে অন্য মানসিকতায় গড়েছে। সে যে, ক্ষেত্র বিশেষে, ক্লাসিক্যাল যুগের ‘কেনা-গোলামের’ চেয়েও অধম, সেই দৃষ্টিও হারিয়েছে। কিন্তু ‘চটর-পটরের যুক্তি’ মাথা ভরে আছে। সে অনর্গল বলতে পারে। তার অশান্তিতেও ‘সুখের’ ভাণ করতে পারে। এই হচ্ছে ধনতান্ত্রিক ‘সভ্যতা’এবং ‘স্বাধীনতার’একটি রূপ। এর জন্যই যুদ্ধ। কত লাখ মরল সেটা কোন কথাই নয়। টিভি ক্যামেরা সেদিকে যাবে না। মোল্লার ‘অসভ্য’ দাড়ি আর সপ্তম শতকের ‘অসভ্য’ আবরণে বেষ্টিত নারীর দিকেই যাবে।

এই দাসত্ব থেকে মুক্তি কোথায়? এই মুক্তি রয়েছে ইসলামের বিশ্বাস ও চিন্তা চেতনায়। ইসলাম মানুষকে সপ্তম শতকেও বের করে এনেছিল। সুদী সমাজ ব্যবস্থার ইন্দ্রজাল থেকে মুক্ত করেছিল। তাই বস্তুবাদী জাহেলী প্রথা ও সুদী ব্যবসায়ী ইয়াদীচক্র এটাকে গলাটিপে হত্যা করতে চেয়েছিল। আজকের যায়োনবাদী ব্যবস্থা ও আদর্শ সেই যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। ইসলাম-নির্মূলে বিপুল অর্থ নিয়োগ করছে; চক্রান্ত করছে; ইসলামের বিপক্ষে ‘বিউটি পার্লারের’ কাজ করিয়ে নিচ্ছে। কর্পোরেট ব্যবস্থায় বিজ্ঞাপন অঙ্গনে পণ্যকে যেভাবে অসাধু সংশ্লিষ্টতার সমন্বয়ে আনে এবং তাতে যে মনস্তাত্ত্বিক রূপ দান করে সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই ইসলামকে নানান নেতিবাচক ধারণার সংশ্লিষ্টতায় আনছে। ইতিহাসের দুর্বল বর্ণনা কেয়াফুলি সেলেক্ট করে এনে, তিলকে তাল করে, কোরান হাদিসের বাণী কোথাও বিকৃত করে, কোথাও প্রসঙ্গ কেটে মিথ্যা সংশ্লিষ্টতায় জুড়ে, কখনো বক্তব্যের খণ্ড চিত্র তৈরি করে ইসলামের নামে এক “সমন্বয় প্রলেপ” তৈরি করছে এবং এর পিছনে এক বিরাট জনগোষ্ঠীর নিয়োগ দিয়েছে। এরা মিডিয়া থেকে কালচার ইন্ডাস্ট্রি পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত।

ইসলামের প্রথম শতাব্দী থেকে যেসব দেশের লোকজন ইসলামের ছায়াতলে এসেছিল এবং এতে যেসব শাসক গোষ্ঠী নিজেদের ক্ষমতা গুটিয়ে নিতে হয়েছিল তাদের উত্তরসূরিরা তা এখনো ভুলতে পারে নি। সেই যুদ্ধ তারা নানান সময়, নানানভাবে জারি রেখেছে। ধারাবাহিকতায় ক্রুসেডের হাজার বছরের যুদ্ধ হচ্ছে অন্যতম। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এই যুদ্ধে যাদের কমন উদ্দেশ্য রয়েছে তারা হচ্ছে ইসলাম বিদ্বেষী ব্রাহ্মণ্য ও হিন্দু-চক্র এবং ইসলাম বিদ্বেষী মিলিটেন্ট নাস্তিক মহল, (আমার বক্তব্য যে specific আকারে ব্যক্ত করছি, সে আকারেই বুঝতে হবে, এটাকে generalise করা যাবে না)। বিভিন্ন ভাঁওতাবাজিতে তারা ইউরোপীয় ক্রুসেডের সাথে একাত্ম হয়ে এই যুদ্ধ করছে। আজকের মুক্তমনা, বিজ্ঞানমনষ্ক, বিশ্বাসের ভাইরাস ইত্যাদির অন্তরালেই চলছে নব্য ক্রুসেডের যুদ্ধ।

1212 জন পড়েছেন

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতাত্ত্বিক, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক। বসবাস: বার্মিংহাম, ইউকে। দেশের বাড়ী: দেউলগ্রাম (উত্তর), বিয়ানী বাজার। Monawwarahmed@aol.com

Comments are closed.