সমাজতন্ত্রের লাল দুনিয়ায় পুতিন-ওবামা-বাকশালী বাণিজ্য

2258 জন পড়েছেন

রাষ্ট্রের পরিচয় গণতন্ত্র না সমাজতন্ত্র, তা খুঁজতেই এ লেখা। কারণ, বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রের সর্বাঅঙ্গজুড়ে সমাজতন্ত্রের উপসর্গগুলো দৃশ্যমান। আমার দেখা সমাজতন্ত্র নিয়ে দু’টি কথা।
আমেরিকার মতো সর্বশ্রেষ্ঠ গণতন্ত্রের দেশে সম্প্রতি সোস্যালিজমের উত্থান উদ্বেগজনক। রেগান অ্যামনেস্টি পরবর্তীকালে, মার্কিন স্বপ্নের ভাগ নিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ল বিশেষ করে নির্যাতিত দেশের মানুষ। ফলে বড় অঙ্কের সংখ্যালঘুদের মধ্যে শ্রেণিবিভক্তিকে কেন্দ্র করে শ্রেণিশক্তি রূপ নিলো ভোটের শক্তিতে। রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষীরা শ্রেণিশক্তিকে দেখল ক্যাপিটাল হিল দখলের টোপ হিসেবে। সংখ্যালঘু যারা নিজের দেশে সংখ্যালঘুদের অধিকার তোয়াক্কা করে না, গণতন্ত্রের দেশে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অতিমাত্রায় অ্যাক্টিভিস্ট হয়ে উঠল। অতীতে যে দেশে যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বললেই গ্রেফতার (যে জন্য ড. কিংকে হত্যা), সেই দেশেই সোস্যালিস্টদের অভ্যুত্থানের প্রথম উপসর্গ, যুদ্ধবিরোধী ক্যাম্পেইন এবং সম্পদ সমবণ্টনের স্লোগান। সোস্যালিস্টেরা সমাজতান্ত্রিক চোখে দেখাতে শুরু করল আমেরিকাকে। শোনাল পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে ঠাণ্ডা যুদ্ধ। এভাবেই অভ্যুত্থান কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট এবং মাত্র এক টার্ম সিনেটর ওবামার চমক।
সমাজতান্ত্রিক দেশে মানবাধিকার বলে কোনো শব্দ নেই। বার্লিন দেয়াল ভেঙে ফেললেও বসে নেই মাওবাদীরা। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার প্রতিশোধ নিতে দৃঢ়প্রত্যয়ী পুতিন। যারা সরাসরি পারে না, লাল পোশাকের ওপরে গণতন্ত্রের পোশাক পরেন- যেমন ওবামা, বার্নি সেন্ডার্সসহ অনেকেই।
তবে নির্বাচনের আগে আদর্শ স্পষ্ট করেননি ওবামা। ইতিহাসের যুগসন্ধিক্ষণে ভোটারেরা সুদর্শন ওবামার বক্তব্য এবং ব্যক্তিত্বে আত্মহারা। কেনেডির পর এটা দ্বিতীয় চমক। কিন্তু সেটাই কি সব? এসেছিলেন বিভক্তি দূর করার কথা বলে, ছড়িয়ে দিলেন বিভক্তি। সাত বছর পর এজেন্ডা স্পষ্ট, প্রাধান্য পাচ্ছে সম্পদের সমবণ্টন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারসহ বর্ণবাদবান্ধব বক্তব্য। এই ধরনের নেতৃত্ব মার্কিন ইতিহাসে প্রথম, কিন্তু শেষ নয়। আমেরিকা-ইউরোপে মাথাচাড়া দিয়েছে সমাজতন্ত্রের কালো থাবা। আমার চোখে ৩৫ বছর আগের এবং পরের আমেরিকা একেবারেই ভিন্ন।
ওবামা যা মেনে নেননি। জনসংখ্যা ৩২ কোটি, মাথাপিছু আয় প্রায় ৪৮ হাজার ডলার, মাথাপিছু কর আদায় প্রায় ২২ হাজার ডলারের ৮০ শতাংশই আসে ফরচুন-৫০০ বিলিয়নিয়ারদের পকেট থেকে। সম্পদের সমবণ্টন অ্যাক্টিভিস্টদের কারণে ক্যাপিটল হিলের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন কেউ কেউ। বাস্তবে পুঁজিবাদের কারণেই মুক্তবাজার অর্থনীতি। তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনার দেশ, কমছে দারিদ্র্য, বাড়ছে ফ্রি-ট্রেড। সবচেয়ে বড় উদাহরণ একসময়ের রক্ষণশীল বাজারের চীন ও ভারত। আমেরিকার মতো পুঁজিবাদনির্ভর দেশে সমাজতন্ত্র অসম্ভব, ফলে বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা। যারাই সম্পদের সমান বণ্টনের স্লেøাগান দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, তাদের উচিত কিউবার দিকে তাকানো। কিউবার ৮০ শতাংশই সম্পদ রাষ্ট্রায়ত্ত এবং মাসিক আয় গড়ে ২০ ডলার। প্রাইভেট সেক্টরের ওপর পুলিশের খড়গ। কিউবানদের স্বপ্ন নেই, ভবিষ্যৎ নেই। এ জন্য দায়ী দুই ক্যাস্ট্রো ভাইয়ের ৫৬ বছরের স্টিমরোলার। সমাজতন্ত্রে প্রভাবিত ওবামা এবং বার্নি সেন্ডার্সকে প্রশ্ন, যারা নির্বাচনের জন্য মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার চাঁদা নেয়, এয়ারফোর্স-১এ ওঠার স্বপ্ন দেখে, তাদের মুখে সমাজতন্ত্র মানায়? এই ধরনের সুবিধাবাদীরা নতুন নয়। তবে হোয়াইট হাউজে সোস্যালিস্টদের জায়গা হচ্ছে না; কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সমাজতন্ত্র কিংবা সামাজিক গণতন্ত্র অভ্যুত্থানের জন্য দায়ী চীন-আমেরিকা-ভারতের মতো উপনিবেশবাদীদের ঠাণ্ডা যুদ্ধ।

নোবেল কমিটি উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানকেই শান্তির পদক দিয়ে মাওবাদীদের টনক নড়িয়ে দিলো। আমার চোখে এটি সতর্কবার্তা। স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে সুশীলসমাজের সুপরিকল্পিত অ্যাক্টিভিজমের কারণে তিউনেশিয়ার জেসমিন বসন্ত সাকসেসফুল। আমাদের সুশীলেরা ব্যর্থ হওয়ার কারণ- ১. কাপুরুষতা। ২. মাওবাদীদের অত্যাচার। তবে তিউনেশিয়ার নোবেল পাওয়া সংগঠনটি নতুন দরজা খুলতে পারে। যুগে যুগে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সাফল্যের একমাত্র হাতিয়ার আত্মদান। তিউনেশিয়াকে স্বৈরাচারমুক্ত করতে মোহাম্মদ ওয়াজিদি নামের এক ফেরিওয়ালা দিনের আলোয় নিজের শরীরে আগুন জ্বালিয়ে দেয়ার পরেই জ্বলে উঠল গণতন্ত্রের কূপ। পরবর্তী সময়ে আলোচনা এগিয়ে নিলো সুশীলসমাজ। আমাদেরও ঘরে ঘরে ওয়াজিদির প্রয়োজন। যুগে যুগে এরাই হিরো। যেমন, ৯০-এর নূর হোসেন, ৬৯-এর আসাদ, বর্তমানের মাহমুদুর রহমান…। আরো যাদের নাম বলা উচিত, বলব না; কারণ সম্পাদক তা প্রকাশ করবেন না। আওয়ামী লীগের হাতে কখনোই সমাজতন্ত্রমুক্ত নয় বাংলাদেশ, এখন চলছে কম গণতন্ত্র বেশি উন্নতির নামে নতুন ঘরানার সমাজতন্ত্র। গণতন্ত্র কবে ছটাক হিসেবে বিক্রি হয়, প্রশ্ন সুরঞ্জিত বাবুকে। তাকে চ্যালেঞ্জ, পাবলিককে দেখান, সংসদীয় গণতন্ত্রের কোন বাই-ল’তে বেশি উন্নতির জন্য কম গণতন্ত্রের বিধান আছে? কোথায় ক্যাঙ্গারু বিরোধী দলের বাই-ল?
আমেরিকাতে শ্রেণিবৈষম্য থাকলেও সামাজিক ন্যায়বিচারে শ্রেষ্ঠ। প্রতিটি মানুষেরই ১০০ শতাংশ বাক ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা। সুতরাং আমেরিকাতে সমাজতন্ত্র আনতে হলে প্রয়োজন সংবিধান সংশোধন, আর এই অসম্ভবকেই সম্ভব করল ৭ জুনের বাকশালীরা। যারা ইতিহাস অস্বীকার করে তারা মানবতার শত্র“। বাকশালীরা সেটাই, কারণ বাকশাল বিষয়ে মুখে তালা দিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করছে ৪১ বছর। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সমাজতন্ত্র কায়েম করেছিলেন মুজিব। কিউবা মডেলের ৭ জুনের শাসনতন্ত্র অস্বীকারের ক্ষমতা কার? মুজিবের সোস্যাল ডেমোক্র্যাসির প্রেমে পড়ে মার্কিন সাংবাদিক লিফসুলজ একাধিক প্রবন্ধও লিখেছিলেন। ওটাই দ্বিতীয় বিপ্লব এবং একদলীয় শাসন। বলছি, মুজিব নিজেও স্পষ্ট করেননি, তিনি কোন ঘরানার নেতা।
ওবামার সমাজতান্ত্রিক মনোভাবই নতুন করে সাদা-কালোদের সংঘর্ষ এবং ৯৯ শতাংশ বর্ণবাদী আন্দোলনের মূল। এই কারণেই ফারগুসনের মতো বর্ণবাদী দাঙ্গার ঘটনা বাড়ছে। সামনে নির্বাচন। একমাত্র টার্মলিমিটের কারণে এজেন্ডা পূরণ হবে না সোস্যালিস্টদের। মার্কিন গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অস্ত্র টার্মলিমিট। এমনকি ভগবানের বাচ্চা এলেও তৃতীয় টার্ম ক্ষমতা নয় এবং বাংলাদেশকেও বাঁচিয়ে দিতে পারে গণতন্ত্রের এই একটিমাত্র অস্ত্রটি। মাই গড! ১৭ কোটি মানুষের দেশে দুই ব্যক্তির বিকল্প নেই, বিশ্বাস করবে কেউ?
শুধু ঘরেই নয়, বাইরেও ওবামার মনোভাবের কারণে লণ্ডভণ্ড বিশ্ব। তার কারণেই সিরিয়ায় চীন-রাশিয়ার অভ্যুত্থান এবং আইসলকে কেন্দ্র করে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে বিশ্ব। তার হেলাফেলাতেই আমরা সাম্রাজ্যবাদী ভারতের পরিপূর্ণ দাস। টার্মলিমিট না থাকলে ওবামার তৃতীয় টার্ম অবধারিত। হলে পুতিনের সৃষ্টি হতো ওয়াশিংটনে। বাংলাদেশীরা গণতান্ত্রিক দেশে থেকেও কিছুই শিখল না বরং একই আওয়ামী-বিএনপি অসুরবৃত্তি।
কমিউনিস্টদের জন্য ৫ জানুয়ারি একটি ট্রেডমার্ক। ব্রিটিশরাজের ভূমিকায় সে দিন নির্বাচনের কলকাঠি নাড়ল ভারতরাজ। যেকোনো মূল্যে ২০৪১ সাল পর্যন্ত হাসিনাকেই ক্ষমতায় রাখতে বদ্ধপরিকর।

একমাত্র সোস্যালিস্ট দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরাই প্রতিদিন মিডিয়ায় লিড নিউজ হয়। বলছি, অ্যাক্টিভিজমের বিকল্প নেই। প্রতিটি প্রতিবাদই অ্যাক্টিভিজম। যখন কোনো নারী স্বামীর অত্যাচারমুক্ত হতে আত্মহত্যা করে, সেটাও অত্যাচারীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা। আত্মহত্যার মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় তুলে সামাজিক সতর্কতা ছড়ায়। কমিউনিস্টদের চোখে মানবাধিকার ও বিষ্ঠা সমান। অ্যাক্টিভিস্টদের জন্য তৈরি করে নতুন নতুন জেলখানা এবং ফায়ারিং স্কোয়াড। আমাদের দেশেও লাখ লাখ অ্যাক্টিভিস্ট এখন কয়েদি, যাদের ৯৯ শতাংশই বিরোধী দলের। নেত্রীরা নির্দোষ। কারণ, টার্মলিমিট আদায়ে ব্যর্থ চেতনাবাদী কাপুরুষগুলো। ঈশ্বর কি দুই নেত্রীকে হাজার বছরের জন্য পাঠিয়েছেন? ভাবুন ঠাণ্ডা মাথায়। মানুষ এখন ১০০ ভাগ প্রতিবাদহীন। পুলিশ যখন ক্রসফায়ার করে বিরোধী মারে, মানুষ দেখে ‘আইনশৃঙ্খলার’ উন্নতি। ছেলে যখন বাবাকে খুন করে, মানুষ দেখে সামাজিক কলহের জের। ‘অধিকার’ নামের সংগঠন থেকে ডেভিড বার্গম্যান… সাগর-রুনি থেকে মাহমুদুর রহমান… কমিউনিজমের হাত থেকে নিস্তার কার?

নির্বাচনের ১৮ মাস আগেই শুরু হয়েছে ভোট অ্যাক্টিভিজম। আমেরিকা ইমিগ্রান্টদের দেশ, তৈরি হচ্ছে ভোটব্লক। উদ্দেশ্য, কাকে পাঠাবে হোয়াইট হাউজে। যদিও বার্নি সেন্ডার্স আর হিলারি প্রায় সমানে সমানে কিন্তু এই দেশে সোস্যালিস্টদের জায়গা শেষ, ট্রাম্পের মতো অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জনপ্রিয়তা সেটাই বলে। দুই দলের পণ্ডিতেরাই যুক্তিতর্ক তুলে ধরছেন যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতার সাথে। কেন নয়? দুই পার্টিরই রয়েছে গর্ব করার মতো ইতিহাস। ওবামার সমবণ্টন এজেন্ডায় ত্যক্তবিরক্ত ওয়ালস্ট্রিট। সুপারপ্যাক অর্থাৎ বড় অঙ্কের চাঁদাদাতারা হিলারির পক্ষে দুই বিলিয়ন ডলার ব্যয় করবে। বলছি, আমাদের দেশেও ডায়নেস্টির বাইরে যোগ্য প্রার্থী নেই, বিশ্বাস করতে হবে?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ারের সতর্কবাণীটি সবচেয়ে প্রযোজ্য বাংলাদেশে। ক্ষমতায় থেকেই রুজভেল্ট টার্মলিমিটের প্রস্তাব দেন। আইজেন বলেছেন, ‘টার্মলিমিট না হলে গণতন্ত্রের জন্য সর্বনাশ।’ বাংলাদেশে প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ফলাফল হয়েছে সমাজতন্ত্র। আজকের সংবিধানের পরিকল্পনা ১৯৬৩ সালে রুশ-ভারত প্রভাবিত আগরতলা বৈঠকে। বরাবরই মুজিব সমাজতান্ত্রিক আদর্শের মানুষ, যে কথা তিনি সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টকেও বলেছিলেন (ইউটিউব)। হিলারি ও ওবামা দু’জনই গণতান্ত্রিক পার্টির কিন্তু তার মানে এই নয়, আদর্শ এক। ওবামা বিশ্বাস করেন তা, যা ক্যাস্ট্রো বিশ্বাস করেন। আমাদের সমস্যাও একই রকম। ডেমোক্র্যাট আর আওয়ামী লীগের অবস্থা এক। রিপাবলিকান আর বিএনপির অবস্থাও তাই। ওবামার নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগের সংখ্যা ইতিহাস সৃষ্টি করার কারণ, তিনিও আওয়ামী নেত্রীর মতোই জনবিচ্ছিন্ন। অতিমাত্রায় নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগের বিষয়টি আমেরিকানেরা ভালো চোখে দেখছে না। হিলারি ক্লিন্টন হয়তো হাতপাতা ভোটারদের হাত থেকে নিস্তার পাবেন না, তবে অবশ্যই তিনি সমাজতান্ত্রিক আদর্শের নন। তাকিয়ে আছি ২০১৬ সালের নির্বাচনের দিকে, গণতন্ত্রের প্রদীপ জ্বলে উঠেছে ১৮ মাস আগেই। টুঁ-শব্দটি ছাড়াই সরে যাবেন ওবামা। কিন্তু বাংলাদেশে ভোটের সময় এসব দানববৃত্তি কেন? নিশ্চয়ই আমরা জাহেলিয়া যুগের বাসিন্দা নই।

মন ভালো না থাকার কারণ অনেক। তবে নির্বাচনকে ঘিরে আনন্দের জোয়ার বইতে শুরু করেছে, মিডিয়ায় গণতন্ত্রের ফায়ারওয়ার্ক। সময় পেলেই টেলিভিশনের সামনে বসে পড়ি। প্রসঙ্গ একটাই, ভোট। যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য ডিবেটের পর ডিবেট… কয়েক মাস খুব ভালো কাটবে জানি। ডিবেট দেখে প্রায় ৩ থেকে ৪ কোটি আমেরিকান। চলছে ডিবেট পার্টি, টাউন হল মিটিং, মিডিয়ার সাথে মতবিনিময় ইত্যাদি। মুখোমুখি প্রায় দুই ডজন প্রার্থী এবং জনগণ। কিন্তু সেটাই কি সব? সব সত্ত্বেও আমি বাংলাদেশী। আমার লিভিং রুমের এক দিকে বাংলা, অন্য দিকে আমেরিকান টিভি একসঙ্গে চলে। ‘ক্যাপিটল হিল’ টেলিভিশনে আইন প্রণেতাদের প্রতিটি বক্তব্যই গুরুত্বপূর্ণ। আবার সংসদ টেলিভিশনে যখন একসঙ্গে ৩০০ কণ্ঠ ‘হ্যাঁ’ বলে কিংবা সব ক’টাই যখন টেবিল চাপড়ে কাউকে খুশি করতে থাকে… দম বন্ধ হয়ে আসে। যখন সুরঞ্জিত বাবুকে আইনের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে ব্যঙ্গ করতে শুনি, হৃৎপিণ্ডের শব্দ বুলেটের মতো বাজে। এসবই সমাজতন্ত্রের অসুখ।
কথায় কথায় আওয়ামী লীগ মার্কিন গণতন্ত্রের উদাহরণ দেয়। অথচ ক্যাপিটল হিলে একটি ‘কিন্তু’ শব্দের জন্য অভিশংসনের মুখোমুখি হতে পারেন কোনো আইন প্রণেতা। মাত্র ২০ মিনিট টেপের জন্য নিক্সনের পদত্যাগ। আমাদের আইন প্রণেতাদের কেউ ফেরারি (রানা), কেউ খুন করেও বিশেষ ব্যক্তির ছায়াতলে (ওসমান), ৮০ শতাংশই সংসদ সদস্যই ব্যবসায়ী (বেশির ভাগই গডফাদার)। যখন কোনো ব্যক্তি কিংবা ব্যক্তিরা, প্রতিদিনই একই বক্তব্য রাখে, প্রতিটি লিড নিউজেই থাকে, না থাকে মূল্য, না কেউ তা শোনে। এক কথায়- বাচাল। তাই তারা প্রতিদিনই ফালতু কার্যক্রম হলেও তৈরি করে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে দেখায়। সেখানকার মার্কিন টেলিভিশনে কদাচিৎ ওবামাকে দেখা যায়। সেখানকার মন্ত্রীদেরকে বেশির ভাগই চেনে না কারণ প্রয়োজন ছাড়া কেউ টেলিভিশনে আসেন না। তো দেখাই যায় না। বিশ্বাস না হলে দেখুন, আমাদের টকশোতে কিভাবে বাচালদের বাজার বসে। কী বলতে চায়, নিজেরাই জানে না; কিন্তু বলতেই থাকে। ব্যক্তি নয়, আমি কথার নেতৃত্বে বিশ্বাসী। সেই কবে প্যাট্রিক হেনরি বলেছিলেন, ‘হয় স্বাধীনতা – নয় মৃত্যু দাও…।’ ৬৪ সালে ড. কিং বলেছিলেন, ‘চামড়ার রঙে নয়, আমার সন্তানদের মূল্যায়ন হবে বুদ্ধির মাপে…।’ কেনেডি বলেছিলেন, ‘জিজ্ঞেস করো না দেশ তোমাকে কী দেবে, বরং জিজ্ঞেস করো দেশকে তুমি কী দেবে।’

বিরোধী দলের রাজনীতি যারা বাঁচিয়ে রাখবে, পাইকারি হারে খুন অথবা কারাগারে রেখে রাজনীতি থেকে নির্বাসন দেয় একমাত্র কমিউনিস্ট শাসকেরাই। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে লাখ লাখ বিরোধী কর্মী জেলে, আদালতে মামলার পাহাড়, প্রধান বিরোধী দলকে প্রায় কফিনে ঢোকানো শেষ। বিএনপি-জামায়েতের কপালে জঙ্গি সিল। সাংবাদিক মাহমুদুর রহমান থেকে রাজনীতিবিদ মাহমুদুর রহমান মান্না… আমার দেশ পত্রিকা থেকে দিগন্ত টিভি… ইটিভি চেয়ারম্যান থেকে ফালু… সাগর-রুনি হত্যা থেকে ইলিয়াস আলী গুম… সর্বত্রই কমিউনিজমের উপসর্গ। একমাত্র সমাজতান্ত্রিক দেশেগুলোই পাবলিক অনুষ্ঠানের জন্য সময় বেঁধে দেয়, বন্দুকধারী পুলিশ দিয়ে অনুষ্ঠান পাহারা, নিরাপত্তার অজুহাতে রেডফোর্ট কায়েম করে রাজপথে। সাত মার্ডারের বিচার হয় না, বিশ্বজিতের খুনিদের ফাঁসি হয় না… কিন্তু কাদের মোল্লাদের বেলায় বিচারকের অভাব নেই? ২০ দলের বিরুদ্ধে যে পরিমাণ অত্যাচার, একমাত্র কমিউনিজম গবেষকেরাই বুঝবেন বাংলাদেশের সাথে কিউবার পার্থক্য কী!
উচিত ছিল ৭১-এর আগেই এজেন্ডা স্পষ্ট করা। ৭ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত পাবলিককে গণতন্ত্রের কথা বলা হলেও ৭২-এর সংবিধানে লেখানো হলো ‘সমাজতন্ত্র’। যে সংবিধানে গণতন্ত্র সেই সংবিধানে ক্যাস্ট্রোর সমাজতন্ত্র অবাস্তব। অ্যাক্টিভিস্ট মুজিব সব সময় গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করেছেন, কখনোই বলেননি বাকশালের জন্য ৭১। তাহলে জাতি কি বুঝতে ভুল করছে? মুজিবের দ্বিতীয় বিপ্লব এবং হাসিনার ১৫তম সংশোধনী, দুইখানেই সমাজতন্ত্র। প্রথমটি সরব, দ্বিতীয়টি নীরব। ৭২-এর সংবিধানের ওই একটি শব্দই সব নষ্টের গোড়া।
সমাজতন্ত্র কী বিষ, জানে কিউবা-চীন-রাশিয়া-উত্তর কোরিয়ার মানুষ। অগণিতকাল ক্ষমতায় থাকতে ন্যায়বিচারের নামে দারিদ্র্য আর দুঃশাসনের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে মানুষ মারছে ক্যাস্ট্রো ভ্রাতৃদ্বয় এবং উং পরিবার। কমিউনিস্ট জ্যোতি বসুর পুত্র, হাতেগোনা ধনীদের অন্যতম। বাংলাদেশের সো-কলড রুশ-চীনপন্থীরা আগাগোড়াই নষ্ট, আমেরিকান ব্র্যান্ড ছাড়া চলে না। বলছি, ৭১-এর আগেই বলতে হতো, সমাজতন্ত্র নাকি গণতন্ত্রের জন্য মুক্তিযুদ্ধ। যা ৭৪ তাই ২০১০। ভারতের সহায়তায় মুজিব চেয়েছিলেন আজীবন রাষ্ট্রপতি, হাসিনা পাকাপোক্ত করেছেন ২০৪১ সাল পেরিয়ে ক্ষমতা। সুশীলদের উচিত, গণতন্ত্র না সমাজতন্ত্র- বিষয়টির সুরাহা করা। অন্যথায় ২০৪১ সাল পর্যন্ত একদলীয় শাসন গ্যারান্টি। যে ভ্রুণ নিষিক্ত হয়েছিল ৭২-এর সংবিধানে, এখন সে তরতাজা যুবক। এই দফায় ব্রিক্স ভিত্তিক কমিউনিস্ট ব্লকে অধিক জড়িয়ে পড়া আওয়ামী সভানেত্রীর উদ্দেশ্য স্পষ্ট। আওয়ামী লীগ না বোঝে গণতন্ত্র, না সমাজতন্ত্র। ভারতকে না ঠেকাতে পারলে, ২০৪১ সাল পর্যন্ত রওশনমার্কা ক্যাঙ্গারু পার্লামেন্ট বাস্তবতা।
সারমর্ম : ২০১৯ সালের কথা পরে। আগে জানতে হবে, কোন আদর্শে চলছে বাংলাদেশ। অন্যথায় অগণিতকাল চলবে ৫ জানুয়ারির ট্রেড-শো।
ইমেইল : farahmina@gmail.com
পুর্ব প্রকাশিত: নয়া দিগন্ত

2258 জন পড়েছেন

Comments are closed.