মিথ্যাচারের রাজনীতি এবং পূর্বাপর পরিণতি

1176 জন পড়েছেন

রাজনীতিতে মিথ্যা কথা বলা যাবে এবং প্রয়োজনে করা যাবে নিকৃষ্ট সব কর্ম এমনতরো বক্তব্যের প্রধান জনকের নাম ম্যাকিয়াভেলি। পুরো নাম নিক্কলো ডি বায়নারডো দেই ম্যাকিয়াভেলি। ইতালির ফ্লোরেন্সে তার জন্ম হয়েছিল ১৪৬৯ খ্রিষ্টাব্দে। আর মারা গিয়েছিলেন ১৫২৭ খ্রিষ্টাব্দে। দার্শনিক প্রকৃতির লোকটি নিয়মিত লেখালেখি করতেন এবং অনিয়মিতভাবে স্থানীয়পর্যায়ে রাজনীতি করতেন। তার লিখিত বই শাহজাদাকে (ঞযব চৎরহপব) অনুসরণ করার জন্য গত প্রায় ৬০০ বছর ধরে সারা দুনিয়ার শয়তান প্রকৃতির রাজনীতিবিদেরা করেনি এমন কুকর্ম নেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের কেউ একজন সফল হয়েছেন কিংবা সার্থক হয়েছেন এমন একটি উদাহরণ এই দুনিয়ায় নেই। তারপরও মানুষরূপী শয়তানের বাদশাহরা ম্যাকিয়াভেলিকে তাদের মানস পিতা মনে করে এবং তার দেয়া তত্ত্ব মতে নিজেদের রাজনীতি নিয়ে দিনরাত নোংরা কর্ম করে বেড়ায়। ম্যাকিয়াভেলির জন্মের প্রায় সাড়ে ১৭ শ’ বছর আগে ভারতবর্ষে চাণক্য নামের আরেক মহাপণ্ডিতের অভ্যুদয় হয়েছিল। চাণক্য শুধু পণ্ডিতই ছিলেন না- ছিলেন মস্ত বড় সেনাপতি এবং একজন সার্থক রাজনীতিবিদ। মূলত চাণক্যের পরামর্শ, সাহায্য ও সহযোগিতা নিয়ে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য প্রাচীন ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজবংশ এবং আলেকজান্ডারের এশিয়া অঞ্চলের প্রতিনিধি সেনাপতি সেলুকাসকে পরাজিত করে পৃথিবীর সর্বকালের শ্রেষ্ঠতর এবং বৃহত্তম সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। চাণক্য লিখিত কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র মানব ইতিহাসের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এই বইতে চাণক্য রাজনীতির বিভিন্ন কৌশলের কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু মিথ্যাচার, অনাচার, চক্রান্ত ইত্যাদির মাধ্যমে স্বার্থ সিদ্ধির মন্দ অপকৌশলের কথা বলেননি।প্রাচীন গ্রিসের সক্রেটিস, অ্যারিস্টটল কিংবা প্লেটোর কথা না হয় বাদই দিলাম। প্রাচ্যদেশের মহা মনীষী ইবনে খালদুন, কনফুসিয়াস কিংবা সন্ত্রাসী আকবরের নবরতœ উপাধি কিংবা আবুল ফজল তো কোনো দিন মন্দ রাজনীতির কথা আমাদেরকে বলে যাননি। একমাত্র ম্যাকিয়াভেলি ছাড়া প্রায় সব নামকরা দার্শনিক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রনায়ক কিংবা সমরনায়ক আমাদেরকে একটি আদর্শ রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখিয়ে গেছেন। হজরত ওমর রা:, হজরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ:সহ মানব ইতিহাসের হাজার হাজার সফল রাষ্ট্রনায়ক পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে হাজার হাজার ন্যায়নিষ্ঠ এবং কল্যাণময় আদর্শ রাষ্ট্র কায়েম করেছিলেন বিভিন্ন সময়ে। ইতিহাসের স্বর্ণ সিংহাসনে আসীন সেসব সিংহপুরুষকে স্মরণ না করে কিংবা তাদেরকে অনুসরণ না করে কেন আমরা ম্যাকিভয়াভেলিকে ধর্মপিতা মনে করছি তার জবাব আমি আজো খুঁজে পাইনি।ম্যাকিয়াভেলির শাহজাদা বইতে বর্ণিত রাজনীতির অপকৌশল প্রয়োগ হতে হতে বর্তমান জমানায় দেশ-বিদেশের রাজনীতি এতটাই নোংরা, নির্মম এবং নৃশংস হয়ে পড়েছে যে, কিছু কিছু জনপদ থেকে শয়তান পালানোর পথ পাচ্ছে না। কিছু কিছু এলাকার শয়তানেরা ইতোমধ্যেই নষ্ট রাজনীতির মহানায়ক-নায়িকাদের পদতলে শয়তানি বিসর্জন দিয়ে সাধু সন্ন্যাসীর খোঁজে অন্যত্র চলে গিয়েছে। অনেকে আবার শয়তানি পেশা পরিবর্তনের জন্য চিন্তা-ভাবনা করছে। তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা হলে প্রায়ই হাপিত্যেশ করে বলতে থাকে ওইসব নষ্ট রাজনীতিবিদের কারণে শয়তানিতে আর আগের মজা নেই বরং পেশাটি দিনকে দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে। কাজের চেয়ে বদনামির পরিমাণ বেড়ে গেছে। অনেক কুকর্ম অহরহ হচ্ছে যা কিনা কোনো শয়তানের পক্ষে করা তো দূরের কথা কল্পনা করাও সম্ভব নয় অথচ সেই কাজের জন্য ভুক্তভোগীরা শয়তানকে গালি দেয়। সেসব গালি শুনে শয়তানেরা নিজেদের ইজ্জত-আব্রু এবং সতীত্ব নিয়ে রীতিমতো শঙ্কিত হয়ে পড়েছে।চলমান বিশ্বের রাজনৈতিক দুরাচার স্থান-কাল-পাত্র ভেদে একেক রকম হয়ে থাকে। মরুভূমির রুক্ষ পরিবেশে দুরাচার প্রায়ই হানাহানিতে রূপ নেয়। অন্য দিকে শীতের দেশে কূটনামি, চোগলখুরি ও মোনাফেকি চলে বেশি মাত্রায়। বনজঙ্গলে চুরি-চামারি, ডাকাতি, ছিনতাই, মানবপাচার, মাদকপাচার প্রভৃতিকে কেন্দ্র করে রাজনীতি আবর্তিত হয়। আবার বাংলাদেশের মতো সমতল এবং নদ-নদী বেষ্টিত নরম মাটির দেশে রাজনীতির নামে বালখিল্যময় মিথ্যাচার, লোক হাসানো প্রভৃতির স্থলে বোকাসোকা টাউটারিমূলক চালাকি এবং তেলাপোকা মার্কা দাম্ভিকতা বেশ জনপ্রিয়। এ দেশের লোকেরা দুই মোরগের লড়াই ভীষণ পছন্দ করে এবং সময়-সুযোগ পেলে নিজেরা মোরগ-মুরগির মতো ককর ককর করতে করতে অন্তর্দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। এরা অন্য কারোর সাথে না পারলেও নিজেরা ঠোকরা-ঠুকরি করে একে অপরের লোম-চামড়া এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রতঙ্গের বারোটা বাজিয়ে ফেলে। এই অঞ্চলের লোকেরা মোরগ-মুরগির লড়াইয়ের পর সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে বলদ গরুর লড়াই। কাজেই বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে কেউ যদি বড় কোনো অনুসিদ্ধান্তে উপনীত হতে চায় তবে তার উচিত ইবনে বতুতা, ফা হিয়েন কিংবা হিউয়েন সাং এর মতো এ দেশের প্রকৃতির দিকে গভীর অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে তাকানো।বাংলাদেশের রাজনীতির হাল হকিকত বোঝানোর জন্য আমি একটি বাস্তব উদাহরণ পেশ করতে চাই। ধরুন স্বাধীনতার পর যেসব দল ক্ষমতায় ছিল সেসব দল থেকে শীর্ষ ১০০ জন নেতাকে বাছাই করা হলো এবং সেসব নেতার ছবি বিলবোর্ডে টানিয়ে দিয়ে নিচে লেখা হলো- উনারা মিথ্যা কথা বলেন না, ঘুষ-দুর্নীতির ধারে কাছেও যান না, হক কথা বলেন, হালাল উপার্জন করেন এবং কাজকর্ম ও চিন্তায় আল্লাহ-রাসূলকে অনুসরণ করেন। তারা জ্ঞানী, ধার্মিক, পরিশ্রমী, বিনয়ী, সৎ ও সাহসী। তারা শিক্ষিত, মার্জিত এবং ভদ্রলোক। তাদেরকে বিশ্বাস করা যায় এবং তাদের ওপর নির্ভর করে আপনার মূল্যবান সম্পদ তাদের কাছে গচ্ছিত রাখা যায়। আপনার পুত্র, কন্যা, স্ত্রী, ধনসম্পদ ইত্যাদি নিশ্চিন্তে এসব লোকের কাছে আমানত রাখলে তারা কোনো দিন খেয়ানতও করবে না।উপরিউক্ত বিলবোর্ডটি দেখার পর এ দেশের জনগণ কী মন্তব্য করবেন, সে ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে বরং আজকের প্রসঙ্গে চলে যাই। রাজনীতি করতে গিয়ে মিথ্যাচার করলে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র যে কত বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয় তার লাখো কোটি নজির তাবৎ দুনিয়ার পথ প্রান্তরে ছড়িয়ে আছে। তারপরও কেন যে রাজনীতিবিদেরা মিথ্যাচার করেন এবং জনগণকে ধোঁকা দেন তা নিয়ে দেশ-বিদেশে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। দেখা গেছে, সাধারণত বোকা প্রকৃতির কম জ্ঞানের লোক উঁচু পদ পদবিতে বসে গেলে কিংবা একই লোক উঁচু বংশে জন্ম নিলে তারা নিজেদের দুর্বলতা ঢাকার জন্য অপ্রয়োজনে মিথ্যাচার শুরু করে। এর বাইরে মানুষ মিথ্যাচার করে নিজেকে অধিকতর আকর্ষণীয়, ক্ষমতাবান এবং ঐশ্বর্যশালী হিসেবে প্রকাশ করার জন্য। নিজের কুকর্ম গোপন রাখার জন্য এবং অপরের সুকর্মগুলোকে ম্লান এবং বিকৃত করার জন্যও মানুষ মিথ্যাচার করতে থাকে। মিথ্যাবাদীরা সব সময় নিজেদেরকে অতি বুদ্ধিমান এবং সব শ্রোতাকে বেকুব মনে করে। তারা শতভাগ নিশ্চিত হয় এবং মনে মনে আত্মতৃপ্তি অনুভব করে এই ভেবে যে- বেকুব লোকগুলো কিছুতেই তাদের মিথ্যাচার বুঝতে পারবে না।কথায় বলে- কবি আর নেতা বিধাতার দান। স্বয়ং আল্লাহ কিছু মানুষকে কবিত্ব এবং নেতৃত্বের অনুপম গুণাবলি দিয়ে সৃষ্টি করেন। জমিনে তখনই বিপর্যয় দেখা দেয় যখন নেতৃত্বের সহজাত গুণাবলিহীন একজন মানুষ কোনো বিশেষ পরিস্থিতির সুযোগে কিংবা অন্য কোনো নেতার দয়া বা অনুকম্পায় হঠাৎ জনগণের ঘাড়ে নেতা হিসেবে চেপে বসে। এই বিপর্যয় আরো ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে যখন স্বঘোষিত নেতা বা নেত্রী নিজেকে স্বভাব কবি বা লেখকের পর্যায়ে উন্নীত করে জাতিকে জ্ঞান বিতরণের জন্য উঠে পড়ে লাগেন। আমাদের নরম মাটির গাঙ্গেয় বদ্বীপে হঠাৎ নেতা এবং হঠাৎ কবিদের উদ্ভব এত বেশি পরিমাণে হয় যে, সমাজ তা ধারণ করতে পারে না। ফলে নেতৃত্বের অসঙ্গত নির্দেশ এবং কবিত্বের ছন্দহীন অভিব্যক্তির দোলাচলে পুরো সমাজ রসাতলের অতলান্তে চলে যায় অবলীলায়।চলুন পুনরায় ফিরে যাই মিথ্যাচারের রাজনীতির প্রসঙ্গে। যেসব রাজনীতিবিদ মিথ্যার ওপর বসতভিটে বানিয়ে রাজনীতি করেন তাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পারিবারিক জীবন সব সময়ই অভিশপ্ত হয়। সব ক্ষমতা বিত্তবৈভব এবং বিলাসিতার কেন্দ্রস্থলে অবস্থান করার পরও মিথ্যাবাদী রাজনীতিবিদকে নিঃসঙ্গ, বন্ধুহীন এবং হাহাকার করা কাঙালের মতো জীবন যাপন করতে হয়। এ ধরনের মানুষের কাছে সময় অর্থাৎ বর্তমান কালকে সব সময় হিমালয়ের মতো ওজনদার, দুর্গম এবং বাসযোগ্যহীন বলে মনে হয়। তাদের কাছে একেকটি দিন এসে উপস্থিত হয় অনন্তকালের আজাব হিসেবে। অন্য দিকে অন্ধকার রাতের নিস্তব্ধতা তাদের কাছে কবরের মতো ভয়াবহ বলে মনে হয়।যদি প্রশ্ন করা হয়- মিথ্যাবাদী রাজনীতিবিদদের কেন এমন ভয়াবহ পরিণতি হয় যেখানে সমাজের সব পেশার এবং সব বয়সের সাধারণ নারী-পুরুষ অহরহ মিথ্যা বলছে? এ ব্যাপারে আমার মন্তব্য হলো- সাধারণ মানুষের মিথ্যাচার এবং রাজনৈতিক নেতার মিথ্যাচার এক নয়। সাধারণ মানুষের মিথ্যাচারে সাধারণত ব্যক্তিপর্যায়ে কিংবা বড়জোর পারিবারিক পর্যায়ে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। অন্য দিকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের মিথ্যাচারের দরুন পুরো দেশ এবং জাতি রসাতলে যায়। ফলে লাখো কোটি মানুষের অভিশাপে মিথ্যাবাদী রাজনীতিবিদদের জীবন তছনছ হয়ে যায়। মানুষের অভিশাপের বাইরে খোদায়ী গজবও এই শ্রেণীর মিথ্যাবাদীদেরকে পাকড়াও করে। কারণ আল্লাহ বিশেষ যোগ্যতা এবং অন্তর্নিহিত ক্ষমতা দিয়ে একজন মানুষকে নেতা হিসেবে পয়দা করেন। সে ক্ষেত্রে নেতৃত্বের গুণাবলিসম্পন্ন মানুষের জন্য ফরজ হয়ে দাঁড়ায় আল্লাহর হক এবং বান্দার হক আদায়ের জন্য সহজ সরল এবং হেদায়েতপ্রাপ্তদের পথ অনুসরণ করা। কোনো নাফরমান বান্দা এটা না করলে তার প্রতি খোদায়ী গজব এতই তীব্র আকার ধারণ করে যে, জমিনে তার কোনো আওলাদ থাকে না- অর্থাৎ সে নির্বংশ হয়ে যায়। আপনারা যদি মিসরে গিয়ে খোঁজখবর নেন তবে দেখবেন সেখানে ফেরাউনের কোনো বংশধর নেই, অন্য দিকে আরব বিশ্বে আবু জেহেলের কোনো বংশধর খুঁজে পাবেন না।আমাদের দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরনো। সেই মহা ভারতের যুগ অর্থাৎ কেরির-পাণ্ডবদের রাজত্বকালে এবং শ্রীকৃষ্ণের জীবৎকালেও বাংলাদেশে রাজা ছিল আর রাজার কারণে রাজনীতিও ছিল। আমাদের ইতিহাসের প্রথম রাজার নাম জনদত্ত। জনদত্ত মারা গেলেন কুরুক্ষেত্রে। তারপর কত শত রাজা এলেন এবং কত শত জন চলে গেলেন তার খোঁজখবর আমরা ক’জনেই বা জানি। তবে বিখ্যাত সব ভালো রাজাকে মানুষ যেরূপ মনে রেখেছে তদ্রুপ জমিনের ওপর দম্ভ করে বেড়ানো মিথ্যাবাদী রাজাকেও মানুষ ভোলেনি। বরং বেশি মনে রেখেছে নিত্যদিনের অভিশাপ এবং প্রাত্যহিক জীবনের বর্জ্য নিক্ষেপ করার জন্য।একটি মজার তথ্য বলে আজকের লেখা শেষ করব। চীন দেশের লোকেরা বাংলাদেশকে বলে মুঞ্জালা। মুঞ্জালা শব্দটি মান্ডারিন, ক্যান্টনিজ এবং সাংহাইয়্যানিজ এই তিন ভাষাতেই রয়েছে। সোজা বাংলায় এটির অর্থ হলো- সরল সোজা বোকাসোকাদের দেশ। বাংলাদেশের মানুষজন বাদ দিয়ে যদি বনের পশু এবং পাখিদের দিকে তাকান তাহলেও নির্বুদ্ধিতার কিংবদন্তিমূলক কিছু উপাখ্যান পেয়ে যাবেন। সুন্দরবনের হরিণগুলো নিজেদের পেটের গুড়গুড় শব্দ শুনে প্রায়ই ভয়ের চোটে লাফাতে থাকে। তাদেরকে কোনো হিংস্র প্রাণী তাড়া করলে হরিণগুলো খুবই দ্রুতবেগে ছুটতে আরম্ভ করে। তারপর বহুটা পথ পাড়ি দিয়ে সে হঠাৎ করে থেমে যায়। আশপাশের ঝোপঝাড়ের মধ্যে মুখটা লুকিয়ে চোখ বন্ধ করে থাকে এই বিশ্বাসে যে, আমি যেহেতু কাউকে দেখছি না- তেমনি আমাকেও কেউ দেখবে না।বাংলাদেশের কাকগুলোকে বলা হয় অতি চালাক। লোকজন তাদেরকে ঠাট্টা করে চালাক কাউয়া বলে ডাকে। তাদের নির্বুদ্ধির জন্য- বাংলা ব্যাকরণে এবং বাগধারায় তারা ইতোমধ্যেই জায়গা করে নিয়েছে। সেই অতি চালাক কাউয়াগুলোও কিন্তু ভুল করার ক্ষেত্রে সুন্দরবনের হরিণগুলোর চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকে। কাকেরা প্রায়ই খাদ্যদ্রব্য চুরি করে এবং দূরে কোথাও গিয়ে খড়ের গাদা কিংবা অন্য কোনো স্থানে সেগুলো লুকিয়ে রাখার সময় চোখ বুজে থাকে। উদ্দেশ্য একটাই- আমি দেখলাম না তো কেউই দেখলো না। হরিণ এবং কাকের কাহিনীর সাথে কোকিল-কাকের কাহিনীটিও বলা যেতে পারে। কোকিল সব সময় কাকের বাসায় ডিম পাড়ে। আর বোকা কাক কোকিলের ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফুটিয়ে থাকে।বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের মিথ্যাচারকে ইউরোপ-আমেরিকার রাজনীতিবিদদের মিথ্যাচারের সাথে তুলনা করা যাবে না। এ দেশের নেতারা মিথ্যা বলে মুঞ্জালাদের মতো করে যাতে একজন নাবালকও বুঝতে পারবে যে, বোকাসোকা লোকটি মিথ্যাচার করছে। অন্য দিকে তারা দুর্নীতি করে কাউয়ার মতো চোখ বন্ধ করে এবং কোকিলের মতো ডিম পাড়ে- লন্ডন, আমেরিকা, কানাডা, মালয়েশিয়া কিংবা সুইজারল্যান্ড গিয়ে। ফলে দিনশেষে তাদের অবস্থা হয় রবীন্দ্রনাথের সেই রাজার মতো যিনি কিনা পাত্রমিত্রদের স্তুতিবাক্যে অদৃশ্য কাপড় পরে উলঙ্গ হয়ে রাজপথে হাঁটছিলেন এবং মনের আনন্দে বগল বাজিয়ে অদৃশ্য এবং অস্পর্শযোগ্য বস্ত্রের আবরণে ধন্য হচ্ছিলেন।

পূর্ব প্রকাশিত  নয়া দিগন্ত |

1176 জন পড়েছেন

Comments are closed.