পার্থক্যের অস্তিত্বে মানুষ ও বিশ্বাস -১ম পর্ব

1288 জন পড়েছেন

পার্থক্যের বৈচিত্র্য

কতনা রঙ ও রূপের বৈচিত্র্যে রূপায়িত আমাদের এই জগত আর কতনা বৈচিত্র্যময় আমাদের নিজেদের অস্তিত্ব –আমাদের ধ্যান ও ধারণা। এই আলো-আঁধারের রাত-দিন, কতনা সৌন্দর্যে যে তা বিরাজে। কত কোলাহলে মেতে ওঠে আমাদের চারিধার। এই বিমল ধরার জলের কল কল, বৃষ্টির ঝির ঝির, এই সবুজে ঘেরা প্রাণবন্ত সৃষ্টির উচ্ছ্বাস, এই নানান কণ্ঠের নানান গান, নানান সুর, এই সুন্দরের ছড়াছড়ি -আমরা খুব কমই এসবের দিকে তাকাই; খুব কমই হৃদয়ের দোয়ার খোলে দিয়ে এই রূপের মহিমা ভিতরের দিকে টানি -অথবা এসবের ভিতরে নিহিত সেইসব পার্থক্য বুঝতে মনোনিবেশ করি যাদের বৈপরীত্যে বা মোকাবেলায় বিমলের রূপ অস্তিত্বে প্রকাশ পায়।

আমাদের ভিন্নতা আছে আমাদের গঠনে, মন ও মানসিকতায়। আছে প্রকৃতিতেও। আমাদের আগ্রহ, অনাগ্রহ ও বিগ্রহে এর কমতি নেই। এইসব হচ্ছে আবহমান কালের। সৃষ্টির মূল থেকেই। এই ধারাতেই আসা ও যাওয়া।  অর্থাৎ এই অস্তিত্বের স্ট্যাজে এসে যে পাখী যে গানে সুর ধরে, সে গান অনেক আগ থেকেই চলে আসা এবং সে চলে যাবার পরও সেই সংগীত চলতে থাকে। যে রাগের যে পরিধিতে (within the restraints of the raga) সে সুর তুলে, সেখানে এদিক সেদিক বিচরণের কিছু স্বাধীনতা থাকলেও, সে সেই রাগের সীমানা ধরেই ব্যঞ্জনায় মত্ত হতে হয়। তবে কেউ এই রাগে, কেউ সেই রাগে খানিক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। আমি কিন্তু রাগের কথা বলছি না। রাগ এখানে উপমা।

কোন পাঁচজন লোক বাগানে ঢুকলে নিজেদের ভিন্নতার আঙ্গিকেই বাস্তবতা দেখেন। পরের দিন গল্পে বসলে দেখা যাবে একজন যা দেখেছেন অন্যজন হয়ত তা পুরাপুরি দেখেন নি, বা দেখেনই নি। একটি কবিতা বা উপন্যাস পাঁচজনকে পাঠ করিয়ে দেখুন। এখানে এমন অনেক লোক পাবেন যারা কবিতা পাঠ করে তেমন কিছু দেখেন না। তবে কোন শিক্ষক বুঝিয়ে দিলে আপাত দৃষ্টের মামুলি কবিতায়ও অনেক অর্থের বৈচিত্র্য দেখে বিস্মিত হন।

এই জগতে আমরা যা কিছু সুন্দর বা অসুন্দর বলি তা সবই আমাদেরই বর্ণনা (description)। রঙধনু জানে না সে রঙধনু, আর গোলাপ জানে না সে গোলাপ। দুই আর দুইয়ে মিলে চার হয় কিন্তু বাগানের পূর্ব-পশ্চিমে গাছের সংখ্যা যে চার –একথা গাছেরা জানে না (হয়তবা জানে, তা’ইবা কে জানে?)। আমরা আমাদের ধারণাই বস্তু জগতে আরোপ করি, আর ‘বিজ্ঞান বিজ্ঞান’ করি। মূলত বস্তুজগতকে “কন্ট্রোল” করাই উদ্দেশ্য। অন্য অর্থে, আমাদের স্বার্থে প্রকৃতিকে কন্ট্রোল করতে যে অবিরাম সাধনা করি তার নির্যাসকে ‘(বি)জ্ঞান’ বলে উল্লেখ করি।

এই অস্তিত্ব: এক অদ্ভুত-বিস্ময় (awesome)

আমাদের চোখে যা কিছু সুন্দর/অসুন্দর হয়ে উদ্ভাসিত হয় তা বিপরীত ধর্মী বস্তুর  সমন্বয়েই। নিজেরাও বৈপরীত্যের সমন্বয়ে সুন্দরের রূপ দেই এবং তা করতে গিয়ে দীর্ঘ সাধনা করি।  সঙ্গীতে দেখুন সাতটি স্বরের পার্থক্যে কত ব্যঞ্জনা সৃষ্টি হয়। আর তা করতে গিয়ে কতনা আয়োজন। বাঁশবন থেকে কেটে এনে, উত্তপ্ত লোহায় পুড়ে, ছিদ্র করে, তবেই হয় বাঁশি, তারপর আসে সুর। এই বাঁশী ও সুরের অনেক অধ্যয়ন-অধ্যবসায় পরে আসে সুরের ব্যঞ্জনা ও সুরভী। বাঁশি হাতে নিয়ে ৫/১০ বার ফুঁৎকার করলেই বিদ্যা অর্জিত হয় না। সুরের সৌন্দর্য আসে না। যেকোনো বিদ্যার আদ্য-পাদ্য বুঝতে ও আত্মস্থ করতে অনেক, অনেক সময় লাগে। এটাই নিয়ম। তবে নাস্তিকদের কোরান পাঠে সময় লাগে না। মোল্লারা না বুঝে ২৫/৩০ বছর পড়ে। বৌদ্ধ-তপস্যায় শ্বাস-নিশ্বাসে শিষ্য বছরের পর বছর কাটায়। এসবের কীসের প্রয়োজন? নাস্তিকের বুদ্ধিতে এত ‘মামুলি’ বিষয় কোলায় না, কেননা সে “বৈজ্ঞানিক”! বুঝে হোক অথবা না বুঝে।

এই মহাবিশ্ব এক awesome বাস্তবতা। (awesome এর সঠিক বাংলা করতে পারছি না। এখানে বিশালতার বৈপরীত্য, অদ্ভুত-বিস্ময়, আতঙ্কদ্দীপক-সম্ভ্রম ইত্যাদির সমন্বয় আসছে)। এখানে কীযে এক ভাব: বিমল-ভয়ঙ্কর, অপরূপ-বিধ্বংসী! এই বিস্ময় হেয়ালী  যুক্তির বিষয় নয়। শুধু করুণার দৃষ্টিতে না দেখে এতে অকরুণের যে ছড়াছড়ি রয়েছে তার দিকেও তাকানো যেতে পারে। মানব-দৃষ্টি তো আপেক্ষিকই (relative)। দেখুন, কতনা কোটি প্রাণী এই অস্তিত্বের স্ট্যাজ থেকে বিলীন হয়েছে। কতনা গ্রহ-নক্ষত্র, আর তারকারাজি লক্ষ-কোটি বছরে সৌন্দর্যে সুশোভিত হয়েছে। তারপর এক আঘাতে জাহান্নামের অগ্নিসম বিস্ফুরিত হয়েছে, চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়েছে। এই বিধ্বংসী ভাঙা ও গড়ার ধারা অতি বৃহৎ থেকে অতি ক্ষুদ্র পরিসরে প্রতিনিয়ত ঘটে যাচ্ছে।

জাহান্নাম শুনেই থুবড়ে যাবেন না। আপনার আমার যুক্তি-বুদ্ধি আর বোধ-আবেগ দিয়ে এই সীমাহীন সৃষ্টি রচিত হয় নি। তবে হয়তবা কোন রহস্যজনিত কারণে জাহান্নাম শুনেই কেউ খোদা বিমুখ হয়ে আছে। হয়তবা এখানেই বৈপরীত্যের কোন এক প্রেক্ষিত নীরবে কাজ করে যাচ্ছে। অনেক সময় এভাবে হয় যে আপনি যাকে ঘৃণা করেন, দেখবেন, বেশি না হলেও, সেই ঘৃণার গুণগুলির কিছু না কিছু অংশ আপনাতেই যেন নিহিত। আপনার অন্তরাত্মা আপনাতেই তা বুঝে নিয়ে আতঙ্কিত হচ্ছে মাত্র। কেউ হয়ত এখনি জাহান্নামে –শুরুর পর্যায়ে। আগুণ তো হৃদয়েও থাকতে পারে। যার প্রকৃতির সংযুক্তি যেখানে সে হয়ত তার নিজ যুক্তিধারাই সে পথে হাঁটছে। তার ইচ্ছাও হয়ত পরিষ্কার। ইংরেজিতে একটি কথা আছে, ‘The road to Hell is paved with good intentions.’

সংগীত চলছে। আয়োজনও সুন্দর। কিন্তু স্ট্যাজের পিছনে যে গোস্ত উনুনে উৎরচ্ছে, সেই মৃত সত্তা কে? কার দেহ টুকরো টুকরো হয়ে এখন উত্তপ্ত হাড়িতে তুল্পাড় খাচ্ছে? সে কী কোন অবিশ্বাসের কারণে এই স্থানে নাজিল হয়েছে? তবে সে এখন এই সঙ্গীতের, এই আয়োজনের অংশ। আহা! সবকিছুই এই ব্যঞ্জনার দিগ্বিদিক।

মুরগী ভুনা খেয়ে সৌন্দর্যের চিন্তা আসতে পারে, সঙ্গীত উপলব্ধি হতে পারে, কবিতায় মন মুগ্ধ হতে পারে। কিন্তু নিষ্ঠুরতায় যে পেট ভরে আছে সেটা কী দেখার অংশ হতে পারে না? মানুষের দেখার সীমানাটা কী? তা সীমিত ও আপেক্ষিক। যার পেট আছে এবং কথা বলতে পারে, তার যুক্তিও আছে। কেননা, যুক্তি ভাষায় তৈরি হাতিয়ার। তাই তার দেহ-ভক্ষণেরও যুক্তি থাকবে -দেহধারী হোক মুরগী অথবা গাভী। তার যুক্তি তো তার নিজ-কেন্দ্রিক। মানব-অস্তিত্বের স্বার্থ ঘিরে। নাস্তিকের যুক্তির গান শুনে দৌড় দেবেন না, তার যুক্তির ভিত্তিও একই: পেট, উপভোগ, অবাধ-যৌনতার বিস্তার,  বেঁচে থাকা, এখানেই স্বর্গ –এসবের আঙ্গিকে ফুসফাস, এখানেই বিতণ্ডা: আল্লাহ নাই, রাসূল নাই, সব বুঝে ফেলেছি, জ্ঞান আর বিজ্ঞানে আত্মস্থ করে ফেলেছি এই বিশ্ব! “তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন শুক্রকীট থেকে, অথচ দেখো! সে একজন প্রকাশ্য বিতন্ডাকারী” (১৬:৪)।

পরিকল্পিত –অমনি অমনি নয়

ক্যানভাসের চিত্রের বিপরীতে যে ভিন্ন রঙগুলো রয়েছে, যেগুলোর আলোকেই চিত্র সুশোভিত হয়েছে, সেগুলো সুপরিকল্পিত। এই সৃষ্টিলোকও স্রষ্টার পরিকল্পিত। তিনি তার সৃষ্টি যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে সাজান। আগুন-পানি তৈরি করেন, ইতি-নেতির মূলনীতি বানান, আলো-আঁধার, রাত-দিন সৃষ্টি করেন। এভাবেই ইহকাল ও পরকার। জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি। বিপরীতের মোকাবেলায় উভয় (বস্তু) অস্তিত্বশীল, কেবল তিনি ব্যতীত। তিনি এক। তিনি অদ্বিতীয় –এখানেই তিনি সৃষ্টি জগত থেকে আলাদা। অনন্তে অনন্তে তিনি একা। তার মত কেউ নেই। তার কোন সাদৃশ্য নেই। তার কোন তুলনা নেই। তিনি বস্তুর অংশ নন, বস্তুর গুণে গুণান্বিত নন, তাই বস্তুর অনুসন্ধানে তাকে দেখা যাবে না, বুঝা যাবে না। তিনি আর এই সৃষ্টিলোক বিপুল পার্থক্যে বা ধারণাগত দূরত্বে। এই কথা আমরা নিজেদেরকে বার বার তার নাম উচ্চারণের সাথে সাথে স্মরণ করিয়ে দেই। বলি, ‘আল্লাহ সুবহানাহু ও তা’আলা’ অর্থাৎ আল্লাহ যাকে আমার সীমিত ধারণা যেভাবে ধারণ করে তিনি তার চাইতে পবিত্র, তিনি তার চেয়ে ঊর্ধ্বে, সুমহান। এই ধারণা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রার্থনায় কাজ করে। আমরা আল্লাহু আকবার, সুবহানা রাব্বি আল আ’লা, সুবহানা রাব্বি আল আযীম ইত্যাদি তাসবীহ যখন উচ্চারণ করি তখন সেই পবিত্রতার স্তুতি গেয়ে যাই, সেই পার্থক্যে এবং নিজেদের সীমাবদ্ধতার আঙ্গিকে। এভাবেই তাকে স্মরণ করি। এখানে বস্তু-কেন্দ্রিক শিরক থেকে তাওহীদের ধর্ম ও ধারণা সম্পূর্ণ আলাদা।

সাবধান

এই সৃষ্টিতে আছে ভাল-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, করুণ-অকরুণ, বিশ্বাস-অবিশ্বাস। আপনি এই বিপরীতের (binary অর্থে) কোন পার্শে? মনে রাখতে হবে, আগেও বলেছি,  এখানে সব যুক্তির বাহানা জীবনের প্রয়োজন ঘিরে ও জীবিকা নির্বাহের তাগিদে সৃষ্ট। নিজ সত্তা-কেন্দ্রিক-আপেক্ষিক (relative to the subject’s own interest)। ভাল-মন্দ, করুণ-অকরুণ, ন্যায়-অন্যায় সবই ‘মানব’ অস্তিত্বের রঙে রঞ্জিত, যুক্তিতে ধারিত। গরু যদি কথা বলতে পারত তবে বলত, ‘তোমার সঙ্গীতে আমার দেহ দান কেন হবে? একী নিষ্ঠুরতা! এমন নৈতিক সত্তার কথা কী কল্পণা করা যায়?’

এই জগত না ভক্ষকের আর না ভক্ষিতের যুক্তিতে রচিত। এটা কেবল আল্লাহর ইচ্ছায়ই রচিত। তিনি যা ইচ্ছা তাই করেন। তাই সাবধান! কাউকে আগুনের ইন্দন করেন, কাউকে শান্তির নিলয়ে বসিয়ে দেন। আর এতে তার না আছে কোন প্রাপ্তি আর না কোন ক্ষয়-ক্ষতি। তাকে কখনও আমাদের মত দেখতে নেই। তিনিই একমাত্রই তিনি। নিষ্ঠুর বলুন অথবা করুণাময় –তাতে তার কিছুই যায় আসে না। তবে বিশ্বাসীরা ভিন্ন। আমরা প্রার্থণায় তার উদ্দেশে বলি, ‘ওয়া নুসনি আলাইকাল খাইর –আমরা ভাল ও উত্তমের সমন্বয়ে আপনার স্তুতী জ্ঞাপন করি।’ আমরা কখনো বলি না, হে মন্দের স্রষ্টা, কেননা মন্দ আমাদের আপেক্ষিকতায় মন্দ, (it is only relative to us, human)।

জাহান্নাম শুনে কারো মনে বিব্রতি জাগে? যদি তাকে অস্বীকার করে মনের অবস্থা লাঘব হয়, তাহলে চিন্তা করুন তিনি এখনো আপনার মন জুড়ে আছেন, আপনার চিন্তা তার থেকে মুক্ত নয়। বিষয়টা শুধু রিভার্স। আপনি আলোচনাতেই আছেন তবে বিপরীত পক্ষে। আপনি ম্যাজিসিয়ানের পর্দার অন্তরালে, তার কব্জায়। যখন প্রয়োজন হবে তখন পর্দা উন্মোচিত হবে। এই মানবিক অস্তিত্বে যারাই এসে গিয়েছেন তাদের মুক্তি নেই। লোকাবার স্থান নেই। ম্যাজিসিয়ান যে স্ট্যাজ যে কালের জন্য স্থাপন করেছে, সে কালের সীমায় যাকে যেখানে রাখছে সে সেখানেই থাকতে হবে। অতঃপর পুণরুত্থান। এখানে “আমরা অথবা তোমরা সঠিক পথের উপর, অথবা নির্ঘাৎ পথভ্রষ্টতায়” (৩৪:২৪)।

__২য় পর্ব এখানে__

||আমার একাউন্ট পেজ এবং লেখাসমূহের তালিকা||

1288 জন পড়েছেন

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতাত্ত্বিক, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক।

Comments are closed.