সামাজিক অস্থিরতা, নিষ্ঠুরতা ও নৃশংসতা – কেনো এই অবস্থা?

1612 জন পড়েছেন

সারা দেশজুড়ে প্রতিদিন একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটছে, আর এ নিয়ে জনগণের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা, অসহায়ত্ব এবং চাপা ক্ষোভ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে একদিকে খুন, গুম, অপহরণ, ধর্ষণ, রাস্তা-ঘাটে পড়ে থাকা লাশ, নদ-নদী, খাল-বিলে ভেসে ওঠা লাশের সংখ্যা যেমন প্রবল হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্যদিকে এইসব হত্যাকাণ্ডের ধরনে নিষ্ঠুরতা, বর্বরতা, নৃশংসতা এবং পৈশাচিকতার মাত্রাও তেমনি অকল্পনীয়নভাবে বেড়ে চলেছে।

সম্প্রতি সিলেটে শিশু রাজনকে একটি খুঁটির সাথে বেঁধে, পিটিয়ে, খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে, জখম করে যেরকম নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং তারপর হত্যাকারীরাই আবার সেই হত্যাকাণ্ডের ভিডিও চিত্র সামাজিক গণমাধ্যমে প্রচার করেছে তা নজিরবিহীন। তার পরপরই খুলনায় আরেকটি শিশুর মলদ্বার দিয়ে কম্প্রেসরের সাহায্যে অনেকক্ষণ ধরে পেটে বাতাস ঢুকিয়ে পৈশাচিকভাবে হত্যা করার মতো লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে গেলো। তাছাড়া, যশোরে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের জের ধরে গুলাগুলিতে মাতৃগর্ভে শিশুর গুলিবদ্ধ হবার ঘটনা এবং গুলিবিদ্ধ মা ও শিশুকে বাঁচানোর জন্য হাসপাতালে প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা সংক্রান্ত খবর সারা জাতিকে বিমূঢ় করে দিয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে দেশের সর্বত্র এরকম আরো বেশ কয়েকটি পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড এবং অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।

এইসব ঘটনায় জনগণের আতঙ্ক ও অনিশচয়তা আরো বেড়ে যাবার একটি কারণ হলো এই যে, অপরাধীদেরকে গ্রেফতার করার জন্য পুলিশ ও আইন-শৃংখলাবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে তেমন কোনো তৎপরতা নেই এবং অপরাধের সাথে জড়িতরা বিনা বিচারে পার পেয়ে যাচ্ছে। অপরাধীদের অনেকেই ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন অঙ্গ-সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত থকার কারণে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তা’রা আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। তাছাড়া, বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর খুন ও অপরাধের ঘটনায় পুলিশ এবং র‍্যাবের অফিসার ও সদস্যদের প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকার প্রমাণ ও মিলেছে। ফলে, ভিকটমদের পরিবার এবং সমাজের নিরীহ সাধারণ মানুষদের মধ্যে আতঙ্ক, অনিশচয়তা এবং অসহায়ত্ববোধ এখন চরমে।

কিন্তু কেনো ইদানীং এতো, খুন, গুম, অপহরণ, ধর্ষণ, নৃশংসতা, বর্বরতা ও পৈশাচিকতা? হঠাৎ করে বিনা কারণেই কি সমাজে অপরাধপ্রবণতা এবং নিষ্ঠুরতা এমন ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়ে যেতে পারে? নাকি এই চরম সামাজিক অস্থিরতার পেছনে কোনো বিশেষ কারণ আছে? এরকম প্রশ্ন অনেক নাগরিকের মনেই এখন প্রতিনিয়ত ঘুরপাক খাচ্ছে। অনেকের ধারনা যে, দেশের দু’টি বৈরী রাজনৈতিক দলের মধ্যে বহুদিন ধরে যে চরম প্রতিহিংসার রাজনীতি চলে আসছে, তার ফলশ্রুতিতেই আজকের এই সামাজিক অস্থিরতা এবং নিষ্ঠুরতা।

দেশের দুটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের নেতিবাচক, প্রতিহিংসামূলক, সাংঘর্ষিক রাজনীতি সাধারণ মানুষকে নিষ্ঠুরতা ও হিংস্রতার পথে লেলিয়ে দিচ্ছে। নেতা-নেত্রীরা প্রতিনিয়ত তাদের আক্রমণাত্মক আচরণে ও ভাষণে যে বিষোদ্গারণ করে থাকেন সে বিষে সারা দেশের রাজনীতি ও মানুষের মন বিষাক্ত হয়ে ওঠছে। তাই শহরে এবং গ্রাম-গ্রামান্তরে রাজনৈতিক কারণে খুন, অপহরণ, ছিনতাই, লুন্ঠন, ধর্ষণ, ইত্যাদি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

জনগণের শেষ ভরসাস্থল যে আদালত তাকে সবসময় ক্ষমতাসীন দলের ইচ্ছা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করার প্রচেষ্টা চালানো হয়। ফলে শাসকচক্রের বাইরের কারো পক্ষে কোনো আদালতে ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে কিনা সেব্যাপারে জনগণের আশঙ্কা প্রচুর, বিশেষ করে সরকার যদি কোনো মামলায় একটি পক্ষে অবস্থান নিয়ে থাকে। ফলে নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে হাইকোর্ট, সুপ্রীমকোর্ট পর্যন্ত সকল আদালতের প্রতি মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলছে।

বিত্তবান ও প্রভাবশালীরা আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। বিত্তহীন সাধারণ লোকেরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিচারের দ্বারস্থ হবার সুযোগ পায় না। আর পেলেও সুবিচার পাবার আশা করতে পারেনা, এটাই যেনো নিয়ম হয়ে গেছে। মানুষের মনে বদ্ধমূল ধারণা হয়ে গেছে যে, ‘আইনের শাসন এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা’ একটা মন-ভোলানো রাজনৈতিক বুলি ছাড়া আর কিছুই নয়।

রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ – সরকারি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ – এখন অশুভ রাজনীতির ছোবলে ধ্বংসের মুখোমুখি। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের লেজুড়-ভিত্তিক ছাত্রসংগঠনের সদস্যরা লেখাপড়ার চেয়ে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ভর্তি-বাণিজ্য নিয়ে হানাহানি, মারামারি, খুনাখুনি, ইত্যাদিতেই বেশী ব্যস্ত।

ছাত্রদের মাস্তানি এবং সন্ত্রাসী কার্যকলাপের কারণে দেশের সর্বত্র কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায়শই ভাংচুরের ঘটনা ঘটে এবং সেই সাথে ছাত্রছাত্রীরা আহত, নিহত, ধর্ষিত হয়। এসব কারণে অনির্দিষ্ট কালের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে রাখা হয়। শিক্ষাঙ্গনে বিরাজমান এই পরিস্থিতিতে একদিকে লেখাপড়ায় আগ্রহী সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হয়, আর অন্যদিকে শিক্ষাখাতে গরীব দেশের বিপুল পরিমাণ জাতীয় সম্পদের অপচয় ঘটে।

এসব সামাজিক সমস্যার সাথে যোগ হয়েছে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং অযোগ্যদের প্রতি আনুকূল্য। দুর্নীতি, ঘুষ অথবা রাজনৈতিক প্রভাব ব্যতিরেকে কারো পক্ষেই শুধু ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে সরকারি, আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানে কিংবা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোথাও চাকরি এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা পাওয়া আজকাল অসম্ভব। এমনকি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীর ভর্তির ব্যাপারেও দলীয় ছত্রছায়ায় ছাত্রনেতারা এবং শিক্ষক-কর্মচারী নামধারী কিছু ব্যক্তিবর্গ সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেয়।

ধনী, প্রভাবশালী, দুর্নীতিবাজ ও সন্ত্রাসীদের সীমাহীন লোভ, লালসা ও দাপটে সমাজের বিত্তহীন, সৎ, বিবেকবান, শিক্ষিত, মেধাবী ব্যক্তিরা ভীষণভাবে নিষ্পেসিত এবং রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে দূরে। অন্যদিকে একশ্রেনীর শিক্ষিত, সুবিধাবাদী, চরিত্রহীন, চাটুকার বুদ্ধিজীবী-খেতাবধারী লোকেরা ব্যক্তিস্বার্থকে সামাজিক ও জাতীয় স্বার্থের উপরে প্রাধান্য দিয়ে দুর্নীতিবাজ এবং লুটেরা রাজনীতিকদের সাথে আঁতাত করে দেশের সাধারণ মানুষের জীবন আরো দুর্বিষহ, অসহায় করে তুলছে।

রাষ্ট্রের সংবিধান-প্রদত্ত অধিকার এবং ন্যায়বিচার থেকে গণমানুষ বঞ্চিত। তাই দেখা যায়, খুনীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়, আর তাদের অন্যায়ের শিকার নিহতের পরিবার আরো হয়রানির শিকারে পরিণত হয়। এমনকি কখনো কখনো এও পরিলক্ষিত হয় যে, আর্থিক প্রলোভনের কারণে কিংবা ক্ষমতাশীলদের রাজনৈতিক চাপের মুখে পুলিশ কর্তৃপক্ষ খুনের মামলা নথিবদ্ধ করতেও রাজী হয়না।

রাজনৈতিক মদদ পেয়ে দুর্বৃত্ত ও লম্পটদের দাপট ক্রমশ এমনভাবে বেড়েছে যে, আজকাল ঘরের ভেতরে, বাইরে, রাস্তায়, হাটবাজারে, শিক্ষাঙ্গনে কোথাও নারীর নিরাপত্তা নেই। এমনকি সহপাঠী এবং শিক্ষক কর্তৃক স্কুল-কলেজের ছাত্রীদের নির্দ্বিধায় শ্লীলতাহানি এবং ব্ল্যাকমেল করার ঘটনা অহরহ ঘটছে। কিন্তু এসব লম্পটদের রাজনৈতিক প্রভাব ও পেশী-শক্তির কারণে কর্তৃপক্ষ তা জেনেও না জানার ভান করে কিংবা দুষ্কৃতিকারীদেরকে আইন এড়িয়ে যেতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা দেয়।

সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত না হবার ফলে বর্তমান সরকারকে একেবারে অনির্বাচিত না বললেও আধা-নির্বাচিত আখ্যায়িত করা যেতে পারে। এরকম সরকার স্বাভাবিকভাবেই অনেকাংশে জনসমর্থনহীন অথবা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় সরকারকে বহুলাংশে নির্ভয় করতে হয় দলীয় ক্যাডার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর। ফলে, পুলিশ, র‍্যাব এবং দলীয় ক্যাডার সরকারের এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ব্যাপকপভাবে অবৈধ কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হবে এটাই স্বাভাবিক।

রাষ্ট্রীয় অপশাসন, রাজনৈতিক অনাচার, প্রশাসনিক দুর্নীতি ও দুরবস্থা এবং বিচার বিভাগের অকার্যকারিতা সমাজের সর্বস্তরে হতাশা, ক্ষোভ, অসহিষ্ণুতা, হিংসা, বিদ্বেষ, মারামারি, খুনাখুনি, নিষ্ঠুরতা, বর্বরতা ও নৃশংসতা অসহনীয় পর্যায়ে বৃদ্ধি করেছে। তাই দেখা যায়, একজন আরেকজনকে অতি সহজেই কুপিয়ে কিংবা জবাই করে হত্যা করতে দ্বিধাবোধ করে না। এসব বর্বর কাজ শুধু যে চোর, ডাকাত বা পেশাগত খুনিরাই করছে তা নয়। একই পরিবারের সদস্য কিংবা বন্ধুরাও লোভ-লালসা বা পরশ্রীকাতরতার বশবর্তী হয়ে একে অপরের সাথে এমন নৃশংস, বর্বরোচিত আচরণ করছে। সমাজে বিচারহীনতার প্রবণতা এবং ন্যায়বিচার না পাবার আশঙ্কা থেকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ বিচারের শরনাপন্ন না হয়ে বেপরোয়া হয়ে আইনকে নিজের হাতে তুলে নিতে উদ্যত হচ্ছে।

সরকারের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্নীতি ও জবাবদিহিতার অভাব এবং দলীয় ক্যাডারদের দ্বারা যত্রতত্র খুন, গুম, ধর্ষণ, অপহরণ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি জনগণকে একেবারে অতিষ্ঠ ও অস্থির করে তুলেছে। চরমভাবে কলুষিত রাজনীতির অশুভ প্রভাব সমাজের সর্বস্তরে আতঙ্ক ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। এই ভয়াবহ সামাজিক অস্থিরতা থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় হচ্ছে জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা করা, আইনের শাসন কার্যকর করা, অপরাধীদেরকে নির্মোহভাবে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত ও পেশীশক্তির প্রভাবমুক্ত আদালত ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।

1612 জন পড়েছেন

Comments are closed.