সৌহার্দপূর্ণ বিশ্বাস ও আচরণ সমাজের জন্য কল্যাণকর

1816 জন পড়েছেন

তোমাদের প্রত্যেকই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকই নিজ দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে (হাদিস)। যে কেউ এক অণু-পরিমাণ সৎকাজ করবে সে তা দেখতে পাবে; আর যে কেউ এক অণু-পরিমাণ মন্দ-কাজ করবে সেও তা দেখতে পাবে (কোরান, ৯৯:৭-৮)।

আমার হাতে মসি, আপনার হাতে অসি!

আপনার হাতে অসি না মসি? অসি হচ্ছে তলোয়ার , আর মসি হচ্ছে কলমের কালি, তবে রূপকতায় কলম। তবে উভয়ই হাতিয়ার হতে পারে, তাই কেউ কাউকে আক্রমণ করে কথাবলার দরকার নেই। আমরা কখনো অসিধারীকে গ্রেফতার হতে দেখা যায় আবার কখনো মসিধারীকেও। সুতরাং রূপকতা নিয়ে রেষারেষি ঠিক নয়।

সমাজ নানান উপাদানে গঠিত। তসবীর দানার মত সম্পর্কিত। এতে আছে বিভিন্ন বিশ্বাস, মূল্যবোধ, প্রথা, ঐতিহাসিকতা। এসবের সমন্বয় অটুট রাখার বাস্তবতা আবহমান কালের। কেউ যদি এই আবহমান কালের বিশ্বাস, প্রথা, মূল্যবোধ ধ্বংস করতে চায়, এবং এই কাজ করতে পারাতেই তার স্বাধীনতা দেখে, তার অধিকার দেখে, সভ্যতা দেখে, তবে এই সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে?

কেউ ব্যক্তি স্বাধীনতা, মসি, বিজ্ঞান, প্রগতি ইত্যাদি আওড়িয়ে গেলেই সভ্য হয়ে যায় না। আবার কেউ এগুলো না আওড়ালে সে অসভ্য হয়েও যায় না। দায়িত্বের দিকে তাকাতে হবে, সমাজের দিকে তাকাতে হবে। কেউ কখনো আইনকে নিজ হাতে তোলে নিতে নেই। আইনি ব্যবস্থায় অবিচল থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে আইনের বাইরে কোন সমাধান নেই।

কিন্তু এতেও আইন, আলোচনা ও সমঝোতা আসতে হবে। যারা ‘মসি-হাতে’ ফাঁকা বুলির আস্ফালন, গালমন্দ করেন তাদেরকে দায়িত্বের সমঝে আসতে হবে।

মসিওয়ালার দায়িত্ব কি? মসিওয়ালার দায়িত্ব হল কালি যেন চর্তুদিকে না ছড়ায়, অন্যের কাপড় যাতে নষ্ট না করে; ব্যক্তিক ও সামষ্টিক উপবেশনের স্থান কালিমাময় না করে। তারপর মসিকে যদি তীর ভাবা হয় তবে সেই তীর যেন অন্যের ঘাড়ে গিয়ে না পড়ে। তারপর লিখা ‘শিখতে’ হবে, দায়িত্ব বুঝতে হবে। লিখার প্রথায় সভ্য আচরণ আসতে হবে।
সামাজিক পরিবর্তন ও সাম্রাজ্যবাদ বলা হয় বাংলাদেশ হচ্ছে ৯০% মুসলমানের দেশ। এই ভূখণ্ড তিন দিক থেকে ভারত কর্তৃক বেষ্টিত (তবে শক্তির দিক থেকে বলতে গেলে চার দিকেই এই আবেষ্টন)। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতির প্রেক্ষিতে মুসলমানদের এই সংখ্যাটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং হয়ত এখানেই আপনা মাসে হরিণা বৈরী।

এই আলোকে একটু পিছনের দিকে তাকানো যেতে পারে। আজকের বাংলাদেশে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এক শ্রেণীর লোক জাতীয় সম্পদ লুট করেছে এবং করছেও। এতে রয়েছে ব্যাঙ্ক, বিমান, মৎস্য, বন, প্রকৃতি: ব্যাপক হরিলুট। ঘোষ তো আছেই। এদের ব্যবসা বাণিজ্য ও ব্যাঙ্ক একাউন্ট সাম্রাজ্যবাদীদের দেশে, তাদের নিরাপত্তায়। মনে রাখা দরকার, নব্য-সাম্রাজ্যবাদের বাহ্যিক রূপ আগের মত নয়। এই বিগত কয়েক দশকে যেসব দেশে বিপর্যয় হয়েছে এবং এক শ্রেণীর লোক জাতীয়সম্পদ হরিলুট করেছে, তাদের বিষয়টি পাঠ করা যেতে পারে। তাদের টাকা পয়সা কী নিজ দেশে রেখেছে না ইউরোপ আমেরিকায় সঞ্চয় ও নিয়োগ করেছে? এরা যে ডাকাত তা কি এই দেশগুলো জানে না? রাশিয়ার পরিচিত ডাকাত ব্রিটেনে এসে কীভাবে বড় আকারের ব্যবস্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়, সুযোগ পায়? এই রাশিয়া থেকে বাংলা, পাকিস্তান, আফগান, ইরাক সিরিয়া ইত্যাদি দেশের চোরগুলো কেবল বিগত ২০ বছরে যে টাকা লুট করেছে সেই টাকা এখন কোথায়? এদের ছেলেমেয়েরা কোন ভাষায় কথা বলে? এদের জীবন প্রণালী কীরূপ? এই সাম্রাজ্যবাদ কী আদর্শ ও সংস্কৃতি বিবর্জিত? এসব কী নিয়ন্ত্রণ ব্যতীত স্থাপিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়? এই সাম্রাজ্যবাদ ও ধনতন্ত্র কী ওতপ্রোত নয়? এই নিয়ন্ত্রণের বাজারে কী ক্যাপিটাল ইনভেস্ট করতে হয় না? লোকজন লাগে না? এখানে কী এই আদর্শ ও বিশ্বাসের শ্রেণী তৈরির প্রয়োজন হয় না? সব কিছু মিলিয়ে আজকের সমাজে অনেক জটিলতা এসেছে।
হেমলিনের বংশী সুরে মোহগ্রস্ত আজকের এই কন্ট্রোল, বাক-স্বাধীনতা, এই গণতন্ত্র, এই সন্ত্রাস –এসব যারা বুঝে নি বা বুঝার পরিসর ও বাস্তবতায় উপনীত হয় নি, তাদেরকে হেমলিনের বংশী দিয়ে পাগল করা হচ্ছে। বুঝে, না বুঝে সুরের পিছনে ছুটে চলেছে। উঠছে, পড়ছে, আর যাচ্ছেই। অপ্রয়োজনীয়ভাবে সংঘর্ষ সৃষ্টি করছে। যে যুদ্ধ তার নয়, সেই যুদ্ধও করছে। কিন্তু কেন এমন হবে? কেন মিথ্যাচারের মাধ্যমে যুবক-যুবতিদেরে এমন এক প্রোপাগান্ডা ‘ডিসকোর্সে’ ঢুকানো হবে যা বুঝার ক্ষমতা, জ্ঞান, পড়াশুনা তাদের অনেকের নেই? আজ বিশ্বের দিকে তাকিয়ে হয়ত অনেকের বলতে ইচ্ছে করছে: কেন একটি সর্বগ্রাসী বৈশ্বিক ব্যবস্থায় সমাজ উলট পালট হচ্ছে, ধ্বংস আর ক্ষয়-ক্ষতি হচ্ছে?

‘… যাহা আসে কই মুখে’
আমার কথাগুলো ঠিকভাবে বলতে পারছি কী না জানি না। চাচ্ছি সকল জটিলতাকে সামনে রেখে কিছু কথা বলতে।
এবারে অন্য একটি দিক আলোচনা করি। যে ভৌগলীক ভূখণ্ডের ‘খণ্ডিত-সুরে’ এখন নৃত্য চলছে, সেই ইউরোপের মিলিটারিজমের বিষয়টি দেখুন। এই মিলিটারিজমের ইতিহাস হচ্ছে হাজার হাজার বছরের ইতিহাস। এখানে সর্বদাই দুই ধরণের লেখা রয়েছে -একটা পাবলিকের জন্য আর অন্যটা ক্লাসিফাইড –গোপন, শাসকদের জন্য। তাও রাজকীয় লাইব্রেরী ভিন্ন।
এই মিলিটারিজমকে যদি কেবল খৃষ্টপূর্ব ষষ্ট শতকের ক্লাইস্তেনিস (Cleisthenes) থেকে শুরু করে আধুনিক কালের সাম্রাজ্যবাদ পর্যন্ত আসেন তবে চোখ ঘুলিয়ে যাবে। এখানে দেখা যাবে এই যে সেদিন থেকে অস্ত্র শানিত হচ্ছে, সেই শান এখনও দেয়া হচ্ছে। এখান থেকে বড় আকারের হিংস্র কাজ হয়ে যেতে পারে এবং যৌথভাবে (in corporation) করা হয়ে যেতে পারে। এই ধরণের কাজ সবাই করতে পারে না।

আজকে যারা হেমলিনের বংশী-সুরে নৃত্য করছে এই শ্রেণির দিকে তাকান। এদের বয়সের দিকে তাকান। এদের শিক্ষার প্রেক্ষিত দেখেন। বিগত কয়েক দশকে বাংলায় হরিলুটের মাধ্যমে যে সামাজিক পরিবর্তন এসেছে এবং এতে যে সামাজিক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে সেসবের সাথে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের বিষয় দেখুন। এখানে অনেক জটিলতা আছে। তারপর এসবের সাথে ভারতবেষ্টিত আঞ্চলিক অবস্থান দেখুন।

বিজ্ঞান ও মুসলিম বিশ্ব
ইসলাম ও মুসলিমগণ কী বিজ্ঞান বিরোধী? এই ধর্মে কী বিজ্ঞান পাঠ হারাম? না, তা নয়। কিন্তু কালের চক্রে তারা পিছনে পড়ে গিয়েছে।  তাই আজ অসি-মসির উপমা দিয়ে একদল আরেক দলকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা ঠিক নয়। আজ পারস্পারিক সাহায্য সহযোগীতার প্রয়োজন।

Facebook Comments

1816 জন পড়েছেন

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতত্ত্ব, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক।

মন্তব্য দেখুন