কলমের ভাঁওতাবাজিতে সামাজিক বিপর্যয়

1051 জন পড়েছেন

তোমাদের প্রত্যেকই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকই নিজ দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে (হাদিস)। যে কেউ এক অণু-পরিমাণ সৎকাজ করবে সে তা দেখতে পাবে; আর যে কেউ এক অণু-পরিমাণ মন্দ-কাজ করবে সেও তা দেখতে পাবে (কোরান, ৯৯:৭-৮)।

অসি না মসি? আসল কথা কী?
একটি প্রবাদরূপী কথা (cliché) দিয়ে শুরু করা যাক। আমরা সবাই ‘অসির মোকাবেলায় মসি’ –এমন কথা বলে থাকি। স্পষ্ট অর্থে -অসি হচ্ছে তলোয়ার বা হাতিয়ার, আর মসি হচ্ছে কলমের কালি তবে রূপকতায় কলম, এটাও হাতিয়ার। তবে মসি শব্দটি শুনতে নিরাপদ মানায়, তাই না? কিন্তু ঘটনা কী তাই? মসি-ধারীরা কি নিরাপদ? ওরা কি গ্রেফতার হয় না, নির্যাতিত হয় না, আদালতে উঠে না, জেলে যায় না, ফাঁসিতে ঝুলে না? যদি তাই হয়, তাহলে?
তাহলে তা চিন্তার বিষয়, বুঝার বিষয়, দায়িত্ব তো আছেই। এখানে কেউ নিজেকে ‘মসিধারী’ বললেই সে পরিকুলের কোন নাদুস-নুদুস, অথবা ফেরেশতাকুলের খালাত-মামাত কেউ, এমনটি ধারণা করা ঠিক নয়। আবার কেউ কাউকে অসিধারী আখ্যায়িত করে দিলেই সে নরকের পৈটা -এমন কিছু হয়ে যায় না। বাস্তব জগত এমন সাদা-সিধে হয়ে রূপায়িত হয় না।
হাতিয়ার
অসি-মসি উভয়ই মানুষের তৈরি। মানুষেরই হাতিয়ার (tools)। তার উদ্দেশ্য সাধনের বাহন। মানুষ যখন তার প্রতিপক্ষের মোকাবেলায় উদ্দেশ্য সাধন করতে যায়, সংঘর্ষে উপনীত হয়, তখন অসি-মসির আপাত পার্থক্য খুব একটা স্থির থাকে না, অনেকটা বিলীন হয়ে যায়। মসি অসিরূপে আসতে পারে। ঔষধের কাজ সুস্থ করা। কিন্তু এই ঔষধও বেশি পরিমাণ খাইয়ে কাউকে মেরে ফেলা যায়। এটা তখন হাতিয়ার (tool) হয়। আজকাল অনেক ধরণের ঔষধ নিয়ে বিমানে চড়া যায় না। ডাক্তারের ছাড়পত্র দেখাতে হয়। তা’ই কোন পক্ষের মসি প্রতীকী ও ব্যবহারে প্রতারিত হতে নেই।
অসি মসির পার্থক্য -কতটুকু ও কোথায়?
কেউ কলম দিয়ে লিখেন অথবা মুখ দিয়ে বলেন, তা যদি কোন বিশেষ পক্ষের আদর্শ ও উদ্দেশ্য নিধন-নির্মূলে হয়, তাহলে বিপদও আসতে পারে। সেদিন দেখলাম একজন ইমাম নাকি শেখ মুজিবের শানে উল্টা-পালটা কথা বলার কারণে গ্রেফতার হয়েছেন। এখন হয়ত তার নাকে গরম পানি ঢালা হতে পারে –রূপক অর্থে বলছি (তবে বাস্তব অর্থে হলেও আশ্চর্যের কিছু নেই)। মুজিব কন্যা হাসিনার শানে গত বছর দু-এক আগে ফেসবুকে কে কী বলেছিল এজন্য তাকে নাকি জেল খাটতেও হয়েছে। এদের কারও হাতে কিন্তু ‘চাপাতি’ ছিল না এবং এ জন্য গ্রেফতারও হয়নি।
আমি হাসিনা সরকারের উদাহরণ দিয়ে হয়তবা ভুল করলাম। যারা হাসিনা সরকারের পক্ষের লোক তারা হয়ত নাক উঁচু করতে পারেন। তাই হাসিনা সরকার বাদ দেন, ধর্মও বাদ দেন। উদাহরণের স্থান আরও রয়েছে।
রাজনৈতিক আদর্শ-যুদ্ধের ময়দান ও ইতিহাসের ধারাবাহিকতার দিকে তাকালে দেখা যাবে যে অসি-মসির পার্থক্য (distinction) সব সময় ধারিত নয়। কমিউনিজমের পক্ষে বিপক্ষে অসংখ্য মসিধারীকে প্রাণ দিতে হয়েছে, নির্যাতিত হতে হয়েছে। এসব উদাহরণ ইউরোপ, আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, আরব অনারব দেশগুলোতে বিপুল পরিমাণে পাওয়া যাবে। আবার সরকারকে বাদ দিয়ে, সামাজিক পর্যায়েও মারামারি হাতাহাতির ইতিহাস বিশ্ব জুড়ে বিপুল সম্ভারে পাওয়া যাবে। তাই ‘মসি-হাতে’ বললেই কারো উদ্দেশ্য মহান হয়ে যায় না। সে আগে কী নির্মূল করতে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে তা ভুলে গেলে চলবে না।
সবার কথা ভাবুন –মসি নয়, উদ্দেশ্য দেখুন
মানুষের উদ্দেশ্য-জগত অতিশয় বিপুল। এই বিপুল পরিসরে মসির স্থান রয়েছে বটে তবে তা উদ্দেশ্য জগতের অন্তর্ভুক্ত। উদ্দেশ্যই প্রধান। বাক, নির্বাক, ভাষিক, প্রতীকী, আকৃতি, ইঙ্গিতী: কাজ কতভাবে করা যায়। ধরুন কোন এক অশিষ্ট পক্ষ, সাংঘর্ষিক কারণে, তার নিজ সড়কে দাঁড়িয়ে বসন উন্মোচন করে, বিনা বাক্য-ব্যয়ে, প্রতিপক্ষকে একটা কিছু ‘বলে’ দিল। অথবা প্ল্যালেকার্ডে কিছু ইতরামি কথা লিখে ‘দেখিয়ে’ দিল। কিন্তু সে তখনো তার নিজ সড়কে দাঁড়িয়ে। হয়তবা তার বিবেক মোতাবেক নিজ ইচ্ছা ও কর্মের স্বাধীনতা ভাবছে। কিন্তু প্রতিপক্ষ যে সমাজ নিয়ে আছে, তার বসবাসের যে সংস্কৃতি, তার যে শালীনতা, সভ্যতা যা তার পূর্বপুরুষ থেকে প্রাপ্ত এবং তার পরবর্তী প্রজন্মে হস্তান্তর করতে আদিষ্ট এবং যা তার কাছে মূল্যবান, সে তো এই ‘অসভ্য’ আচরণে পীড়িত হবে। আবার ঘটনা যদি এই হয় যে, এই অশিষ্টের কোন ‘প্রাপ্ত’ মূল্যবোধ নেই, আবার অন্যের ক্রীড়নক –যাদের উদ্দেশ্য সংঘর্ষ টিকিয়ে রাখা, তাহলে এমন পরিস্থিতি ও পরিবেশে সন্তপ্ত (aggrieved) পক্ষ কী করবে?
বাস্তবতা বরং এভাবে হতে পারে যে একটি শ্রেণীতে হয়ত কয়েক প্রজন্ম ব্যাপী বিয়েশাদী, ধর্মীয় মূল্যবোধ, ঈমান-আমল হারিয়ে গিয়েছে। এখন তাদের মধ্যে বিয়েশাদির বাইরে যৌন-আচরণ ও সংস্কৃতি স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে। অন্য শ্রেণী হয়ত এখনো ধার্মিক, প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধ নিয়ে বেঁচে আছে; এখানে বা-বাপের মান-মর্যাদা, ধর্মীয় আচার-আচরণ, ধর্মীয় নৈতিকতা পালিত হচ্ছে। এখানে তাদের বিশ্বাসের সত্তা: আল্লাহ-রাসূল তাদের মা-বাপের চাইতেও অধিক সম্মানজনক। ওদের প্রতি তাদের ভালবাসা তাদের জীবনের চাইতেও অধিক মূল্যের। এখানে যদি আল্লাহ রাসূল নিয়ে ইতরি ভাষায় গালাগালি হয়, লেখালেখি হয়, আর বলা হয়, ‘আমরা মসি দিয়ে তোমাদের এই অন্ধ প্রথা ও বিশ্বাস দূর করে দেব, তোমাদেরকে সভ্য করব, বিজ্ঞান শেখাব, মানুষ বানাব, তাহলে কি হবে? এই পরিস্থিতিতে এখন সন্তপ্ত পক্ষ কি করবে? অথচ গণতান্ত্রিক দিক দিয়ে তাদের অবস্থান বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ!
নাগরিক সভ্যতা কী করবে?
এখানে দিকে না তাকিয়ে উপায় নেই। তবে আইন অবশই থাকতে হবে। আইনের সুস্থ আচরণ থাকতে হবে। তারপর এই অঙ্গন থেকে ‘বাক-স্বাধীনতা’ সংজ্ঞায়িত হতে হবে, সীমা নির্ধারিত হতে হবে, না হলে বিপদ আসন্ন। একটি অতি ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিদেশি কলোনাইজারদের সাহায্য-সহযোগিতায় সংখ্যাগরিষ্ঠদের আদর্শ ও মূল্যবোধের উপর আগ্রাসী হয়ে উঠতে দেয়া যেতে পারে না। মানুষ কেন সমাজ ও সরকার গড়ে? এখানে ইতর ভদ্র সবাই বাস করবে এবং কারো অধিকার যাতে খর্ব না হয় সেই ব্যবস্থাও থাকতে হবে। কিন্তু আইন অচল হলে সমাজ থাকবে না। আইন বেআইনি হলেও থাকবে না।
সমাজ নানান উপাদানে গঠিত। তসবীর দানার মত সম্পর্কিত। এতে আছে বিভিন্ন বিশ্বাস, মূল্যবোধ, প্রথা, ঐতিহাসিকতা। এসবের সমন্বয় অটুট রাখার বাস্তবতা আবহমান কালের। কেউ যদি এই আবহমান কালের বিশ্বাস, প্রথা, মূল্যবোধ ধ্বংস করতে চায়, এবং এই কাজ করতে পারাতেই তার স্বাধীনতা দেখে, তার অধিকার দেখে, সভ্যতা দেখে, তবে এই সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে?
কেউ ব্যক্তি স্বাধীনতা, মসি, বিজ্ঞান, প্রগতি ইত্যাদি আওড়িয়ে গেলেই সভ্য হয়ে যায় না। আবার কেউ এগুলো না আওড়ালে সে অসভ্য হয়েও যায় না। দায়িত্বের দিকে তাকাতে হবে, সমাজের দিকে তাকাতে হবে। কেউ কখনো আইনকে নিজ হাতে তোলে নিতে নেই। আইনি ব্যবস্থায় অবিচল থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে আইনের বাইরে কোন সমাধান নেই।
কিন্তু এতেও আইন, আলোচনা ও সমঝোতা আসতে হবে। যারা ‘মসি-হাতে’ ফাঁকা বুলির আস্ফালন, গালমন্দ করেন তাদেরকে দায়িত্বের সমঝে আসতে হবে।
মসিওয়ালার দায়িত্ব কি? মসিওয়ালার দায়িত্ব হল কালি যেন চর্তুদিকে না ছড়ায়, অন্যের কাপড় যাতে নষ্ট না করে; ব্যক্তিক ও সামষ্টিক উপবেশনের স্থান কালিমাময় না করে। তারপর মসিকে যদি তীর ভাবা হয় তবে সেই তীর যেন অন্যের ঘাড়ে গিয়ে না পড়ে। তারপর লিখা ‘শিখতে’ হবে, দায়িত্ব বুঝতে হবে। লিখার প্রথায় সভ্য আচরণ আসতে হবে।
সামাজিক পরিবর্তন ও সাম্রাজ্যবাদ
বলা হয় বাংলাদেশ হচ্ছে ৯০% মুসলমানের দেশ। এই ভূখণ্ড তিন দিক থেকে ভারত কর্তৃক বেষ্টিত (তবে শক্তির দিক থেকে বলতে গেলে চার দিকেই এই আবেষ্টন)। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতির প্রেক্ষিতে মুসলমানদের এই সংখ্যাটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং হয়ত এখানেই আপনা মাসে হরিণা বৈরী।
এই আলোকে একটু পিছনের দিকে তাকানো যেতে পারে। আজকের বাংলাদেশে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এক শ্রেণীর লোক জাতীয় সম্পদ লুট করেছে এবং করছেও। এতে রয়েছে ব্যাঙ্ক, বিমান, মৎস্য, বন, প্রকৃতি: ব্যাপক হরিলুট। ঘোষ তো আছেই। এদের ব্যবসা বাণিজ্য ও ব্যাঙ্ক একাউন্ট সাম্রাজ্যবাদীদের দেশে, তাদের নিরাপত্তায়। মনে রাখা দরকার, নব্য-সাম্রাজ্যবাদের বাহ্যিক রূপ আগের মত নয়। এই বিগত কয়েক দশকে যেসব দেশে বিপর্যয় হয়েছে এবং এক শ্রেণীর লোক জাতীয়সম্পদ হরিলুট করেছে, তাদের বিষয়টি পাঠ করা যেতে পারে। তাদের টাকা পয়সা কী নিজ দেশে রেখেছে না ইউরোপ আমেরিকায় সঞ্চয় ও নিয়োগ করেছে? এরা যে ডাকাত তা কি এই দেশগুলো জানে না? রাশিয়ার পরিচিত ডাকাত ব্রিটেনে এসে কীভাবে বড় আকারের ব্যবস্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়, সুযোগ পায়? এই রাশিয়া থেকে বাংলা, পাকিস্তান, আফগান, ইরাক সিরিয়া ইত্যাদি দেশের চোরগুলো কেবল বিগত ২০ বছরে যে টাকা লুট করেছে সেই টাকা এখন কোথায়? এদের ছেলেমেয়েরা কোন ভাষায় কথা বলে? এদের জীবন প্রণালী কীরূপ? এই সাম্রাজ্যবাদ কী আদর্শ ও সংস্কৃতি বিবর্জিত? এসব কী নিয়ন্ত্রণ ব্যতীত স্থাপিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়? এই সাম্রাজ্যবাদ ও ধনতন্ত্র কী ওতপ্রোত নয়? এই নিয়ন্ত্রণের বাজারে কী ক্যাপিটাল ইনভেস্ট করতে হয় না? লোকজন লাগে না? এখানে কী এই আদর্শ ও বিশ্বাসের শ্রেণী তৈরির প্রয়োজন হয় না? সব কিছু মিলিয়ে আজকের সমাজে অনেক জটিলতা এসেছে।
হেমলিনের বংশী সুরে মোহগ্রস্ত
আজকের এই কন্ট্রোল, বাক-স্বাধীনতা, এই গণতন্ত্র, এই সন্ত্রাস –এসব যারা বুঝে নি বা বুঝার পরিসর ও বাস্তবতায় উপনীত হয় নি, তাদেরকে হেমলিনের বংশী দিয়ে পাগল করা হচ্ছে। বুঝে, না বুঝে সুরের পিছনে ছুটে চলেছে। উঠছে, পড়ছে, আর যাচ্ছেই। অপ্রয়োজনীয়ভাবে সংঘর্ষ সৃষ্টি করছে। যে যুদ্ধ তার নয়, সেই যুদ্ধও করছে। কিন্তু কেন এমন হবে? কেন মিথ্যাচারের মাধ্যমে যুবক-যুবতিদেরে এমন এক প্রোপাগান্ডা ‘ডিসকোর্সে’ ঢুকানো হবে যা বুঝার ক্ষমতা, জ্ঞান, পড়াশুনা তাদের অনেকের নেই? আজ বিশ্বের দিকে তাকিয়ে হয়ত অনেকের বলতে ইচ্ছে করছে: কেন একটি সর্বগ্রাসী বৈশ্বিক ব্যবস্থায় সমাজ উলট পালট হচ্ছে, ধ্বংস আর ক্ষয়-ক্ষতি হচ্ছে?
‘… যাহা আসে কই মুখে’
আমার কথাগুলো ঠিকভাবে বলতে পারছি কী না জানি না। চাচ্ছি সকল জটিলতাকে সামনে রেখে কিছু কথা বলতে।
এবারে অন্য একটি দিক আলোচনা করি। যে ভৌগলীক ভূখণ্ডের ‘খণ্ডিত-সুরে’ এখন নৃত্য চলছে, সেই ইউরোপের মিলিটারিজমের বিষয়টি দেখুন। এই মিলিটারিজমের ইতিহাস হচ্ছে হাজার হাজার বছরের ইতিহাস। এখানে সর্বদাই দুই ধরণের লেখা রয়েছে -একটা পাবলিকের জন্য আর অন্যটা ক্লাসিফাইড –গোপন, শাসকদের জন্য। তাও রাজকীয় লাইব্রেরী ভিন্ন।
এই মিলিটারিজমকে যদি কেবল খৃষ্টপূর্ব ষষ্ট শতকের ক্লাইস্তেনিস (Cleisthenes) থেকে শুরু করে আধুনিক কালের সাম্রাজ্যবাদ পর্যন্ত আসেন তবে চোখ ঘুলিয়ে যাবে। এখানে দেখা যাবে এই যে সেদিন থেকে অস্ত্র শানিত হচ্ছে, সেই শান এখনও দেয়া হচ্ছে। এখান থেকে বড় আকারের হিংস্র কাজ হয়ে যেতে পারে এবং যৌথভাবে (in corporation) করা হয়ে যেতে পারে। এই ধরণের কাজ সবাই করতে পারে না। আধুনিক বিজ্ঞানের মূলনীতি মুসলমানদের কাছে মধ্যযুগ থেকে থাকলেও তারা এই হিংস্রতা এবং প্রকৃতি-বিপর্যয়ের মাধ্যমে, বেপরোয়াভাবে, যৌথ উদ্যোগ সহকারে নিতে পারেনি, তাই সেই জ্ঞান মাটির লেভেল থেকে উঠতে পারে নি। হিরোসীমা নাগাসাকীর ঘটনা মুসলমানদের পক্ষে সম্ভবই হত না। গান-পাউডার পেলেও মাস-মার্ডারের বন্দুক তৈরির চিন্তা আসত না। এই মানসিকতার লোক আমেরিকায় গিয়ে সেখানকার জনবসতিকে কীভাবে নিশ্চিহ্ন করেছিল এবং খেলার উদ্দেশ্য কীভাবে গরু, মহিষ, পশু পাখী নিধন করেছিল তা এখনো শুনতে লোমহর্ষ হয়।
এই মিলিটারিজমে যে বিপুল ‘প্রোপাগান্ডা’, মিথ্যাচার জড়িত –এসবেরও সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এগুলো সঠিক পথে অনেক বৎসর অধ্যয়ন না করলে কেউ বুঝতে পারবে না।
চিন্তা করুন, যে গৃহে একটি আলোচনা দুই মাস ধরে চলছে, আপনি সেই ঘরে ঢুকে কী সহসা সেই আলোচনা বুঝে ফেলবেন? কোন পক্ষ কোন কথা কোন কারণে এবং কোন উদ্দেশ্যে বলছে তা বুঝতে পারবেন না। কিন্তু যে আলোচনা হাজার বছর ধরে চলে আসছে সেই আলোচনা আপনি পদার্থ বিজ্ঞান বা রসায়ন বিজ্ঞান পড়েই কী বুঝে ফেলবেন? এই সমস্যাই হচ্ছে আজকের নব্য উগ্র বঙ্গাল নাস্তিকদের। আজকে অপরের যুদ্ধে বিজ্ঞানের নামে হেয়ালীভাবে ঢুকে পড়ছে। আর এতে ধনতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদী আদর্শের গ্রাউন্ড-ওয়ার্ক তাদের মাধ্যমেই হয়ে যাচ্ছে। তাদেরকে ‘ক’এর যুক্তি দেখিয়ে ‘খ’-এর বক্সে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে।
আজকে যারা হেমলিনের বংশী-সুরে নৃত্য করছে এই শ্রেণির দিকে তাকান। এদের বয়সের দিকে তাকান। এদের শিক্ষার প্রেক্ষিত দেখেন। বিগত কয়েক দশকে বাংলায় হরিলুটের মাধ্যমে যে সামাজিক পরিবর্তন এসেছে এবং এতে যে সামাজিক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে সেসবের সাথে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের বিষয় দেখুন। এখানে অনেক জটিলতা আছে। তারপর এসবের সাথে ভারতবেষ্টিত আঞ্চলিক অবস্থান দেখুন। তারপর ইসলাম বিদ্বেষী প্রোপাগান্ডা সাহিত্যের দিকে তাকান এবং নিজেকে প্রশ্ন করুন মুসলমানরা কী সত্যিই বিজ্ঞান বিমুখ? সত্যিই কী বিজ্ঞান ও মুসলমান এবং বিজ্ঞান ও ইসলামের মধ্যে এমন কোন বিরোধ বিরাজমান যে কেউ বিজ্ঞান চর্চা করতে গেলে মুসলিমরা সন্ত্রাসী হয়ে উঠবে? যদি এমন কিছু না থাকে, তবে কেন খামাখা বিবাদের ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করা হবে? কেন অন্যের ধর্ম ও মূল্যবোধের উপর আঘাতের আন্দোলন সৃষ্টির প্রয়োজন হবে? কেন এসবের মাধ্যমে প্রাণহানি হবে? প্রাণ যারই হোক না কেন। একটি প্রাণের সাথে আরও কত প্রাণ জড়িত, পরিবার জড়িত, একটি সমাজ জড়িত –এসব কী দায়িত্বের সাথে বিবেচনা করা হবে না? আল্লাহর ওয়াস্তে শান্তি ও সমঝোতার ভাষা আসুক, প্রজ্ঞার উদয় হোক।
বিজ্ঞান ও মুসলিম বিশ্ব
ইসলাম ও মুসলিমগণ কী বিজ্ঞান বিরোধী? এই ধর্মে কী বিজ্ঞান পাঠ হারাম ঘোষিত? ইসলাম তো ‘পাঠের’ অনুজ্ঞায় শুরু হয়েছে। ‘লেখার’ মাধ্যমে মানুষ যে অগ্রগতি লাভ করেছে সেই লেখার প্রথাকে স্বীকৃতি দিয়েই এসেছে; আল্লাহ নিজেই বলেছেন তিনিই মানব মনে লেখার উপায় জাগ্রত করেছেন, কলমের প্রথা বা লেখা শিখিয়ে দিয়েছেন। প্রথম দিনের অহীর বাক্যাবলী এভাবেই ছিল: “পাঠ করুন (হে মুহাম্মাদ, জিব্রাইল যা বলেন তা আপনি তা পাঠ করুন এবং বিশ্বাসীদেরকে তা পাঠ করান)। আপনার পালনকর্তার নামে (পাঠ করুন) যিনি সৃষ্টি করেছেন। যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাট রক্ত থেকে। পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা অতিশয় মহান। যিনি মানুষকে কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন, যা সে জানত না। নিশ্চয় মানুষ সীমালঙ্ঘন করে থাকে, কারণ সে নিজেকে স্বয়ংসমৃদ্ধ দেখে” (৯৬:১-৬)।
জ্ঞানীদেরকে আল্লাহ মর্যাদা দান করেছেন। জ্ঞানের পক্ষে অসংখ্য আয়াত ও হাদিস বিবৃত রয়েছে এবং এই জ্ঞানের পথে মুসলিম উম্মাহ বিগত ১৪ শো বছর ধরে হেঁটে চলেছেন। ইউরোপ যখন অন্ধকারের যুগে, তখন মুসলিমরা জগতে জ্ঞানের আলো উজ্জ্বল করছেন এবং এখনো তারা জ্ঞান বিজ্ঞানের সপক্ষে। একটি বার চোখ বন্ধ করে চিন্তা করুন, সত্যিই কি ইউরোপ মসিধারী আর ইসলাম অসিধারী? এখন যেসব দেশে যুদ্ধ চলছে এগুলোর উৎপত্তি কোথায়? কারণ কি?
এবারে আপনি ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ও সিলেবাস দেখুন। তারপর মুসলিম বিশ্বের ইউনিভারসিটি ও কলেজগুলোর দিকে তাকান। দেখবেন পদার্থ বিজ্ঞান হোক অথবা রসায়ন, সমাজবিজ্ঞান হোক অথবা রাষ্ট্রবিজ্ঞান –সবগুলোই মুসলমানরা অধ্যয়ন করছে। দানের টাকায় প্রতিষ্ঠিত ইসলামী মাদ্রাসাগুলো পরিদর্শন করে দেখুন। সেখানেও দেখবেন যতটুকু বিজ্ঞান পড়ানো তাদের কেপাসিটির ভিতরে রয়েছে ততটুকু পড়ানো হচ্ছে। তারা সব বিজ্ঞান পড়ানোর জন্য সরকারী সাহায্য নিতেও প্রস্তুত যদি সে সাহায্য তাদের মাদ্রাসা কন্ট্রোলভুক্ত করতে না হয়। খামাখা একটি শ্রেণির প্রতি বিদ্বেষী, আক্রোশি হওয়াতে বিজ্ঞান বর্ধিত হয় না, এতে বরং সমাজ বিভক্ত হয়, যা সাম্রাজ্যবাদের পক্ষের বিষয় হয়।
বিজ্ঞান পড়া হারাম –এমন ফতোয়া কী ইসলামী বিশ্বে আছে? যদি না থাকে, তাহলে এই ছেলেমেয়েদেরকে নাস্তিকতায় কারা উগ্র বানাচ্ছে? আজ ইসলাম বিদ্বেষী ইউরোপীয়/জায়নবাদী প্রোপাগান্ডা সাহিত্যের মাধ্যমে যাদের মাথা ধোলাই দেয়া হচ্ছে, সেই সাহিত্যের ঐতিহাসিকতা কী? এগুলো কী জানার দরকার নেই? আজকে যাদেরকে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও বিজ্ঞানের নামে পরধর্ম অসহিষ্ণু করে তোলা হচ্ছে –এর মূলের রহস্য কী, কারণ কী? এই আন্দোলন ও উগ্রতার সাথে কী সাম্রাজ্যবাদী আদর্শ ও শিক্ষা সংস্কৃতির সম্পর্ক নেই? আমি ইউরোপের সবকিছু মন্দ বলছি না। সব সমাজে ভাল-মন্দ থাকে। সব সমাজ থেকে কিছু না কিছু শেখার থাকে। আমি মন্দের বিপক্ষে বলছি। ইউরোপেও এই সাম্রাজ্যবাদী ধনতান্ত্রিক আদর্শের বিপক্ষে বলিষ্ঠ আওয়াজ রয়েছে। আমি নতুন কিছু বলছি না।
কোন বিজ্ঞানীর আবিষ্কারে বাধা পড়ল?
বিজ্ঞানের নামে যেসব ছেলেমেয়েদের মাথা ধোলাই দেয়া হয়েছে এবং সাম্রাজ্যবাদের অনুকূলে লিখিত ইসলাম বিদ্বেষী সাহিত্য দিয়ে ইসলাম ও মুসলিম আক্রমণমুখী করে তোলা হয়েছে তাদের দিকে আরেকটু লক্ষ্য করুন। এরা কোন পর্যায়ের বিজ্ঞানী? তাদের আবিষ্কার কী? বিজ্ঞানে স্মর্তব্য অবদান কী? তারা কেন এত আক্রোশি-বিদ্বেষী হয়ে উঠল? তারা মানব জাতির কল্যাণের উদ্দেশ্যে কোন কোন আবিষ্কার করতে গিয়েছিল আর মধ্যযুগে পড়া-থাকা মুসলমানদের বাধার কারণে মানবজাতি সেই কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল? এমন কি কোন নজির আছে? যদি না থাকে তবে কেন এত বিবাদ, কেন এত চিল্লাচিল্লি?
মূল কথা হচ্ছে ইসলাম ও মুসলমানগণ বিজ্ঞানের বিরোধী নয়। বরং ঝোপ-জঙ্গলে যে হৈচৈ হচ্ছে তা করছে বানদের দল –এক ডাল থেকে অন্য ডালে লম্ফ-ঝম্প দিচ্ছে আর বিকট শব্দ করছে। এখানে বিজ্ঞান নয় বরং মুসলিম বিশ্ব বিবর্তনবাদে সাড়া দিচ্ছে না, যে কয়জন সাড়া দিয়েছে তারা প্রাণখোলে সাড়া দেয় নি। কেবল মিন মিন করে ‘হ্যাঁ’ বলেছে আর ‘সন্দেহ’ও প্রকাশ করেছে। কিন্তু নাস্তিকতা গিলে নি। আর এতে বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদের ধনতান্ত্রিক আদর্শের মোকাবেলায় ইসলাম ‘খাড়া’ থেকে যায়। শেষ হয় না। কিন্তু হাজার বছরের প্রজেক্ট এই ধর্মের মোকাবেলায় আটকে যেতে পারে না, এটাকে ধরাশায়ী করতে হবে। এখানেই হয়ত ‘বিজ্ঞান বিমুখীতার’ আওয়াজ। ওয়াল্লাহু আ’লাম।

1051 জন পড়েছেন

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতাত্ত্বিক, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক। বসবাস: বার্মিংহাম, ইউকে। দেশের বাড়ী: দেউলগ্রাম (উত্তর), বিয়ানী বাজার। Monawwarahmed@aol.com

Comments are closed.