রাজনীতি- সেই হাসির অর্থ কি হবে?

2781 জন পড়েছেন

There is no such thing as apolitical-অরাজনৈতিক বলতে কিছু নেই, (It may have been George Orwell who said it).

মনে করুন কোন একটি সমাজ বা দেশে ক খ গ ঘ নামে ৪টি রাজনৈতিক ধারায় নাগরিকগণ বিভক্ত। কিন্তু সেই নাগরিক শ্রেণীতে আরেকটি মিশ্র সম্প্রদায় রয়েছেন, বলুন তারা ঙ, যারা বলেন, ‘আমরা রাজনীতি করি না।’ কিন্তু, নির্বাচনের সময় উল্লেখিত ৪টি দলের কোনো একটিকে ভোট দেন, যে ভোটাভোটির মৌলিক কর্মের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থাৎ তাদের সহযোগিতায় একটি দল ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়, এবং ঐ নির্বাচিত দল তাদের নিজেদের ‘বিশ্বাস’ ও ‘বিশ্বাস-উদ্ভূত-মূল্যবোধের’ ভিত্তিতে আইন প্রণয়ন ও সংশোধন করেন; শিক্ষা, সমাজ, ও সমাজ পরিচালনার উপযোগী নীতি নির্ধারণ করেন; সংস্কৃতিসহ কোন্‌ কোন্‌ খাতে জনগণের অর্থ ব্যয় করা হবে সেসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন; তারা আগামীকালের নাগরিক সমাজ ও নাগরিক মানস গড়ার চিন্তা করেন; নিজেদের আদর্শের দল যাতে ক্ষমতায় থাকতে পারে বা বার বার ফিরে আসতে পারে, সেই আদর্শের প্রচার, সম্প্রসার ও সেই মানসিকতার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেন। মোদ্দা-কথা, সার্বিকভাবে তাদের জীবন দর্শন, জীবন ব্যবস্থা, চিন্তা-চেতনা ইত্যাদির বাস্তবায়ন ঘটান এবং এসব কাজের মূলে থাকে সেই গণ-সমর্থন, সেই ভোট, যার মাধ্যমে তারা ‘রাজনৈতিকভাবে’ নির্বাচিত হয়ে এই কাজগুলো করে থাকেন।

এবারে বলুন ঙ-শ্রেণী সত্যিই কী তাদের দেশের ও সমাজের রাজনৈতিক পরিসর বহির্ভূত, রাজনীতিমুক্ত কোনো সম্প্রদায়? তারা কী তাদের ভোটে নির্বাচিত সরকার, ভাল হোক অথবা মন্দ, যা’ই করবে সেসবের দায়িত্বমুক্ত? সেই নির্বাচিত সরকার যদি এমন সামাজিক আইন ও নিয়ম প্রতিষ্ঠিত করে যার ফলশ্রুতিতে সমাজে হাজারও পাপ বৈধ হয় এবং মানুষ পাপের ধারায় অভ্যস্ত হয়, জীবন যাপনে প্রবেশ করে, তবে ঙ-শ্রেণী,  বলুন আমিও সেই শ্রেণীর একজন, আমরাও কী সেই accumulative পাপের অংশীদার হব, না কেবল তারাই হবে যাদেরকে ভোট দিয়ে সরকার গঠন করতে সহায়তা করেছিলাম?

এবারে অন্য দৃশ্য। আমরা যদি কোনো এক সময় ঘুম থেকে ওঠে দেখি যে যেসব আইন কানুন দেশে বিরাজ করছে, সমাজের শিক্ষাপীঠগুলো যে নিয়মনীতির ভিত্তিতে ধারাবাহিকভাবে চলছে, যে সকল লোক সামাজিক ব্যবস্থাপনা পরিচালনার দায়িত্বে বসে আছে তারা আমাদের শ্রেণীর বিশ্বাস ও বিশ্বাসে প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধে নেই –তখন আমরা কী করব? আমরা কী এই মর্মে একখানা লিস্ট তৈরি করব যাতে সেইসব বস্তু পরিবর্তন করে ফেলার প্রস্তাব থাকবে যেগুলো আমাদের বিশ্বাস ও বিশ্বাসে প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধের সাথে সামঞ্জস্যশীল নয়? ধরুন এটা ধরলাম এবং এই পথে কাজ শুরু করলাম। তারপর এই লিস্ট উত্থাপন ও তৎপরতা সৃষ্টির পর, এখন আমাদের অবস্থান কি –রাজনৈতিক, না অরাজনৈতিক? আমাদের অতীত অবস্থান ও বর্তমানের অবস্থানে কী কোনো পার্থক্য সূচিত হয়েছে? অর্থাৎ আমাদের কাজ এখন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ভিতরে না বাইরে? আমরা কী এবার রাজনীতিতে? (যেহেতু উপপ্রমেয়তে আমার নিজেকে ঙ-এর শ্রেণীতে সংযুক্ত করেছি, তাই বিতর্ক ঘনিভূত হলে এই শ্রেণীতে থেকেই আলোচনা করব। এই আলোচনা কেবল একটি উপপাদ্যকে প্রশস্ত করার জন্য rhetoric ব্যবহার করছে।)

বলেছি, আজকে যদি আমাদের সামাজিক, আইনি, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত বাস্তবতা আমাদের জীবনবোধ ও আদর্শ-বিশ্বাসের প্রতিকূলে স্থাপিত হয়, তবে সেই ধারাবাহিকতা কি? অন্যকথায়, আমাদের প্রস্তাবিত লিস্টের বিষয়বস্তু আজ সমাজে অনুপস্থিত বলেই তো প্রস্তাব উত্থাপন করছি, সুতরাং আমরা কী একই সাথে সেই অনুপস্থিতির কারণগুলোও অনুসন্ধান করতে যাব না? কেন আগে ঘুমিয়েছিলাম এবং এখন এসে চিৎকার করছি সেই কথা কী বুঝতে যাব না?

অষ্টাদশ, ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দী ব্যাপী ইউরোপীয় সমাজ ব্যবস্থা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ধর্মকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা থেকে সরিয়ে দিয়েছে। তাদের কলোনাইজ দেশগুলোর ধর্ম খৃষ্টিয়ানিটি না হলেও একই সুবাদে সেগুলো থেকেও ধর্ম আলাদা করে দিয়েছে। ধর্মীয় সমাজ থেকে ভোট আদায় করে তাদেরকে বুঝিয়ে দিয়েছে ধর্ম ‘ব্যক্তিগত’ ব্যাপার। এই সীমায় তারা থাকা উচিত। রাষ্ট্র বৈজ্ঞানিক-জ্ঞানবুদ্ধি-ভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করে চলবে, যেগুলোর সাথে ধর্ম-জ্ঞান সাংঘর্ষিক, তবে তাদের এই জ্ঞান ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকাতে কারও কোনো আপত্তি নেই, ক্ষতি নেই। আমরা যদি সেই চিন্তা মেনে নিয়ে থাকি, এবং স্বীকার করি যে আমরা রাজনীতির সাথে জড়িত নই, আমরা রাজনীতি করি না, তবে যখন আমরা রাজনীতিক ভাইদের হাতে উল্লেখিত সেই লিস্টখানা দিতে যাব,তখন তারা আমাদের দিকে তাকিয়ে যে মুচকি হাসি দেবে, সেই হাসির অর্থ কি হবে?

2781 জন পড়েছেন

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতাত্ত্বিক, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক।

Comments are closed.