‘কুসংস্কারের’ গর্তে নাস্তিকের শেষকৃত্য -বিনোদন

1787 জন পড়েছেন

[নোট: এই লেখাটি ২০১২ সালে ‘শেষকৃত্যের সত্য’ শিরোনামে প্রথম প্রিন্ট করি। আজ সেই লেখাটিকে কিছু পরিবর্তন ও সংক্ষিপ্ত করে এখানে দিচ্ছি। শিরোনাম থেকে অনেক কথা আঁচ করা যাবে। তবে ঘটনা এতটুকুই নয়, তাই পড়ে দেখতে পারেন।]

আমাদের সমাজের নাস্তিকগণ কয়েক ধরণের। কেউ প্রকাশ্যে, কেউ অপ্রকাশ্যে, গোপনে, কেই আবার গোপনের চেয়েও গোপনে। বলতে পারেন একদম ‘বাতেনী’ হাল। দ্বিতীয় শ্রেণীতে সার্বিকভাবে অনেক ঘাপটি-মারা অবস্থা রয়েছে। এই শ্রেণী প্রকাশ্যদের চাইতে অনেক ক্ষতিকর। তারা অপ্রকাশ্যে, ছায়ার মত কাজ করতে নিজেদের কৌশল দেখে থাকেন। কিন্তু এই কৌশল কখনো বিকল হয়, মুখোশ খশে পড়ে। কারণ, মানুষ সব সময় তার নিজেকে সম্পূর্ণ গোপন করতে পারে না। তার কথা, তার নীরবতা, তার আচরণ, অনেক কিছু অনায়াসে বের করে দিতে পারে অন্তরের অবস্থা।

আড়ালে

ভাষায় ব্যবহৃত শব্দ ও ধারণার উৎসস্থল রয়েছে। কেউ যখন মুসলমানদের ব্যাপারে সাধারণী রূপ টেনে মৌলবাদীগোষ্ঠী, সাম্প্রদায়িক, ধর্মীয় উগ্রবাদী, জঙ্গিগোষ্ঠী, মধ্যযুগীয় গোঁড়া ইত্যাদি আখ্যা (গালাগালি) দিতে থাকে এবং নিজের ব্যাপারে মুক্তচিন্তার লোক, প্রগতিবাদী, উদারপন্থী, সংস্কৃতিবান ইত্যাদি (প্রশংসাসূচক) শব্দাবলী তীরের মত ধনুক থেকে ঘন ঘন বের করতে থাকেন তখন তার লুকিয়ে থাকার স্থান কমিয়ে আসে। প্রচলিতভাবে, প্রগতিবাদ মার্ক্সবাদী ডায়েলেকটিকের ধারণায় বেশি জড়িত; এখানে অপরাপর শব্দমালার সম্পর্ক সংশ্লিষ্টতায় রয়েছে; তারপর উদারপন্থী শব্দের সাথে আলট্রা-সেক্যুলার ধর্মহীন মানবতাবাদ এবং এই সূত্রে অপরাপর শব্দের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তবে অনেক পরিভাষা অনেকে না-বুঝেও ব্যবহার করেন –সেই এলাউন্স রাখতে হবে। ঘন-ঘন ব্যবহারে মূল-ধারণার এবং ব্যবহারের প্রেক্ষিত থেকে বক্তার এমফেসিস ও এটিটিউড ধরা যায়। সে লুকিয়ে থাকতে পারে না। আর তার ব্যবহৃত শব্দমালার সাথে, (প্রেক্ষিতগত স্থান থেকেই) যদি  আবার স্বাধীনতার পক্ষের, চেতনার পক্ষের কথাগুলো একই নিরিখে হুড় হুড় করে চলে আসে তবে আপনি অনেকটা নিশ্চিত হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু এখানেই সব কথা নয়, সামনে অনেক কথা রয়েছে। এই ব্লগের শিরোনামের কথা স্মরণে রাখুন।

বলেছি, মুসলিম সমাজের ভিতরে থেকেই নাস্তিকতা গোপন করে নাস্তিক ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতা ‘অসাম্প্রদায়িক’ শব্দের প্রতারণায় চালিতে দিতে নিজেদেরকে চালাক ভাবেন। সমাজের সাধারণ লোক ক্রিটিক্যাল চিন্তায় সতত অভ্যস্ত নন বলে টেক্সচুয়াল এনালিসিসের মাধ্যমে টেক্সটের পিছনের সত্তা কোন ধারণায় তার টেক্সট নির্গত করছে সেই বিষয় সহজে ধরতে পারেন না -এজন্য ঘাপটি-মারা এই নাস্তিকগুলো ধাপ্পাবাজিতে পার পার পেয়ে যায়। আমি atheism per se নিয়ে কথা বলছি না, বরং একটি বিশেষ শ্রেণীর অপ্রকাশ্য কৌশল ও কর্মকাণ্ড নিয়ে বলছি, তাদের নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের বৈসাদৃশ্য ও বৈপরীত্য নিয়ে বলছি।

ইঙ্গিত হয়েছে যে গোপন কৌশলে ইসলামের বিপক্ষে যুদ্ধ করতে তাদের কিছু সুবিধা রয়েছে। এখানে নাম মুসলিম, মুসলিম সমাজে বসবাস, কাজ কর্মও এই সমাজের আষ্টেপৃষ্ঠে, তাই যেকোনো সুযোগে যখন “মৌলবাদীগোষ্ঠী, সাম্প্রদায়িকগোষ্ঠী, ধর্মীয় উগ্রবাদী, জঙ্গিগোষ্ঠী, মধ্যযুগীয় গোঁড়া” ইত্যাদি আওড়ায়ে সার্বিকভাবে ধার্মিকদের সেকেলে, নির্বোধ, অশিক্ষিত, অন্ধ আখ্যায় (গালিতে) কোণঠাসা করা হবে, তারপর এই শব্দশ্রেণীর মোকাবেলায় নিজেরকে “প্রগতিবাদী, উদারপন্থী, সংস্কৃতিবান, মুক্তচিন্তার লোক”  বলে তবলায় তেহাই দিয়ে ধ্বনি তোলা হবে, তখন the paradigm of superiority is brought home like  Hitler.

জঘন্য প্রকৃতি

এই শ্রেণী মূলত এক জঘন্য প্রকৃতির লোক, যদিও নিজেদেরকে চালাক ও শিক্ষিত ভাবে। তারা এক হীন উপায় ও পদ্ধতিতে us/them  ‘Otherness’-কে উগ্র-উপস্থাপন করে এবং এক discretionary discourse কে অসৎ ও হিংস্রভাবে সমাজ ধ্বংসের কাজে ব্যবহার করে। তারা সমাজের একটি অংশকে প্রতিদিন dehumanise করে। ফলশ্রুতি এই হয় যে তারা যে শ্রেণীকে বৈষম্যে-স্থাপন করে সেই শ্রেণীটি (the discriminated against/the dehumanised) এক সময় এমন আচরণ করতে বাধ্য হয় যা তাদের (নাস্তিকদের) expected সীমায় এসে ধরা দেয়। কথাটি আরও পরিষ্কার করি। আপনি কাউকে জন্তু ভেবে বারবার উসকাতে গেলে এক সময় সে জন্তুর আচরণই করে ফেলতে পারে। এটাকে সাইকোলজিতে  পিগম্যালিয়ন পরিণতি (Pygmalion effect) বলে উল্লেখ করা হয়, [কেউ তার স্ত্রীর সাথে চাকরানীর মত আচরণ করতে থাকলে এক সময় সে তার আচরণকে চাকরানীর আচরণে সাজিয়ে নিতে পারে; আবার চাকরানীর সাথে মর্যাদার ব্যবহার করলে সে আস্তে আস্তে ঐ ধরণের প্রত্যাশিত আচরণ প্রদর্শন করতে পারে]। উগ্রনাস্তিকগণ কোনো অশুভ ইঙ্গিতে একটি শ্রেণীকে আক্রমণ করে সমাজকে দ্বান্দ্বিকতায় দাড় করাতে চায়, যুদ্ধ বাধাতে চায়, কখনো নিরসন চায় না –‘ধর্ম-নির্মূল’, ‘মোল্লা-নির্মূল’ চায়, মিলেমিশে থাকতে নয়। কৃত্রিমভাবে সামাজিক দ্বান্দ্বিকতা সৃষ্টি করে নিজেরদের আদর্শ রূপায়ণের হীন উদ্দেশ্যে চায়। এই নীতি-দর্শন শুধু রাডিক্যাল মার্ক্সবাদেই নয়, বরং উগ্র-জায়নবাদী ধনতন্ত্রেও রয়েছে। আজকে মুসলিম সমাজকে আন্ডারডগ (underdog) করে রাখাই প্রধান উদ্দেশ্য। উগ্রনাস্তিকগণ ‘মুসলিম’ ‘ইসলাম’ শব্দতেই এলার্জিক, আলোচনা দূরে থাকুক।

Barking up the wrong tree

দেশের সামাজিক বাস্তবতা হচ্ছে এই যে ওখানে প্রতিনিয়ত ঘুষ, ধর্ষণ, রাহাজানি, ডাকাতি, গুম, সন্ত্রাস, রাষ্ট্রীয় সম্পদের হরিলুট চলছে –অনেক ক্ষেত্রে তারাও জড়িত, সেসব থেকে মুখ ফিরিয়ে কেবল চলছে ‘মোল্লা-আক্রমণ’, মাদ্রাসা আক্রমণ, নবীর বিয়ে, ৪ বিবাহ, হিজাব পরায় দেশ ধ্বংস!  কিন্তু দেশের জেলগুলো পরিদর্শন করলে দেখা যাবে সেখানে ইসলামী শিক্ষিতরা নয় বরং সেক্যুলার শিক্ষিতরাই বাস করছে।

কথা হচ্ছে এই: আপনি যে চিন্তা, যে স্বপ্ন দিনরাত মাথায় রাখবেন, আপনার মানসিকতাও সেভাবে গড়ে ওঠবে। মনের যুক্তিও সেভাবে সেজে আসবে, যুক্তি কোনো মূল্য-নিরপেক্ষ কার্যক্রম নয়। যে দাড়িওয়ালা টুপী-পরা লোকটি জঙ্গি, মৌলবাদী, অমানুষ হয়ে মনের ভিতরে ধারিত হয়ে আছে, সে কোনো কাজে দোষী না হলেও অসংখ্য কর্ম-চিহ্ন (behavioural symbols)  তাকে দোষী করে প্রত্যয়ে উদ্ভাসিত করবে (behaviours taken to symbolise and to confirm the prejudices held)। এই সমস্যা আজ জাতির রন্ধ্রে প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয়েছে। এখান থেকে মুক্তি নাই। মনে হয় সমস্যা আরও জটিল হবে।

ভয় না ভান?

মূল কথা হল যে ধর্মটি উগ্র, অন্ধ, যেটি গোঁড়া, সন্ত্রাসী আপনি কেন সেই ধর্মের আস্তিকের ভান করবেন? এখানে লুকায়িত জিনিসটি কি?

বাতেনীগণ কৌশল করে বলবেন, ‘কেউ মেরে ফেলতে পারে এজন্য।’ তো কি হল, নিজ আদর্শের জন্য মরতে পারবেন না কেন? কিন্তু কথা সেটা নয়। আহমদ শরীফকে কেউ মেরে ফেলে নি, মূর্খ-দার্শনিক আরজ আলীকেও কেউ মেরে ফেলে নি, চামচামিতে-বানানো-চিন্তাবিদ হুমায়ুন আজাদকেও কেউ ফেলে নি। জীবিত অনেক নাস্তিক আছেন যাদেরকে কোটি কোটি লোক চেনে কিন্তু কোনো মুসলমান তাদেরকে মারতে উদ্যত হয়নি; তারা নিছক নাস্তিক বলে তাদের বিপক্ষে কোনো যুদ্ধ চলছে না। যে কয়জন নাস্তিক জনতার ধাওয়া খেয়েছিল, তা ছিল তাদের সামাজিক রীতি ভঙ্গের কারণে,তাদের উগ্র-গোঁড়ামির কারণে।

২০০৯ সালে ‘আমাদের সময়ে’ শেখ হাসিনাকে সম্বোধন করে তসলিমা নাসরিনের একটি লেখা প্রকাশ পায়। সেখানে তাসলিমা নাসরিন নিজেই বলেছিলেন যে ‘মৌলবাদীদের’ সাথে তার কোনো বিরোধ নেই। তাকে বিএনপি সরকার রাজনৈতিক কারণে দেশান্তর করেছিল। তাই হাসিনা সরকার যেন তাকে ফিরিয়ে আনেন (হয়তবা তার ইচ্ছা ছিল লাল-গালিচা বিচিয়ে আনা)। যদিও ঐ লেখায় হাসিনা ও তার সরকারের ঢের প্রশংসা ছিল কিন্তু তাতে আবেগের বরফ গলেনি। অবশেষে কিছু না হওয়ায় তিনি হাসিনা সরকারকেও বিষোদগার করেন। কিন্তু তার লেখায় একটা সত্য প্রতিভাত হয়েছিল। আর তা হল তার দেশান্তরের কারণ ছিল সামাজিক বিধি-লঙণ বিষয়ক, যা রাজনৈতিক রূপ নিয়েছিল। সমাজ তো এমনই, এখানে একটি বিষয়ের সাথে অপরাপর বিষয়ের সম্পর্ক থাকে। তাসলিমা নাসরিন যে ‘রাজনৈতিক-চক্রের’ দাবার গুটি হয়ে অজ্ঞতাবশত: কোরানের বিপক্ষে এবং ইসলামী মূল্যবোধের বিপক্ষে কাজ করে যাচ্ছিলেন, সেটাই এক সময় বেক-ফায়ার করেছিল। অন্যথায় তার চেয়ে জ্ঞানী, শিক্ষিত, সুচতুর নাস্তিকরা রাজধানীর বুক চিড়ে খাচ্ছে, কেউ দেশান্তর হচ্ছে না।

গোপন-কৌশলীদের আরেকটি ব্যাপার বুঝা দরকার। প্রতিষ্ঠিত ধর্মমত অনুযায়ী ইসলাম বিসর্জনের সাথে সাথে বিবি তালাক হয়ে যায়। কেননা এই বিশ্বাসের ভিত্তিতেই বিয়ের আক্বদ হয়ে থাকে। ভিত্তি ভাঙ্গার পর পর সেই দড়িতে জড়িত বন্ধন ছিন্ন হয়ে যায়। এজন্য তারা ‘জাহিরে-নাস্তিক’ দেখানোতে নিজেদের মনে সামাজিক সমস্যা অনুভব করে থাকেন। তবে মুসলিম সমাজের মূল্যবোধ নিয়ে এমনটি হবার কথা তো ছিল না।

সামাজিকভাবে সবচেয়ে বড় অনৈতিক কাজটি হল এই: এক ব্যক্তি ইসলাম ধর্ম বা অন্য ধর্ম ত্যাগ করার পর, পরিত্যক্ত ধর্ম হয়ে পড়ে তার জন্য ‘পর-ধর্ম’। কিন্তু সে যখন ব্যক্তি-স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে ‘পরধর্ম’ আক্রমণ করে, তখন সমাজেরই সংহতি নষ্ট করে। সে একদিকে অপ্রকাশ্য নাস্তিক। অপর দিকে সামাজিক বিধিবদ্ধতা সংহারক। তার নিজ বিশ্বাসের স্বাধীনতা আছে বটে কিন্তু অন্যের বিশ্বাসকে আক্রমণ করে বা বিষোদগার করে নয়। এতে অন্যের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়। সামাজিক বিধি লঙিত হয়।

লাভ না ক্ষতি?

আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। তাদের অনেক প্রোপাগান্ডামূলক আচরণ এমন যা সামাজিক সংহতি বিঘ্নিত করে বটে কিন্তু ওসব কাজে নাস্তিকতার মূল উপপাদ্য এগিয়ে নেয়া হয় না। বেফজুল সংঘর্ষ বাধায়। নবী মুহাম্মদ (সা.) আয়েশাকে (রা.) বিয়ে করাতে, পালিতপুত্রের তালাক প্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করাতে, সশস্ত্র যুদ্ধ করাতে আল্লাহর অস্তিত্ব অনস্তিত্বের (নায়ূযুবিল্লাহ) কোনো সম্পর্ক নেই। এই সেদিন পর্যন্ত বিবাহ কেবল দৈহিক ও যৌন উদ্দেশ্যে হত না। এর পিছনে সামাজিক, রাজনৈতিক, বিত্ত-সম্পদ, দুই পরিবার/গোত্রের সম্মানের বন্ধন, ঐক্য-সংহতি ইত্যাদি অসংখ্য কারণও কাজ করত। এবং আজও ক্ষেত্র বিশেষ সে সবের উপস্থিতি রয়েছে। মানুষের মানুষে যুদ্ধ বাধলে, এক জন্তু আরেক জন্তুকে খেয়ে ফেললে, সুনামিতে ধ্বংস হলে –এসবের কোনোটি স্রষ্টার অস্তিত্ব না হওয়ার যুক্তি বহন করে না। “কোরান ‘আল্লাহর’ কিতাব নয়” –এই ‘থিসিসে’ আলোচনায় কোনো সমঝদার নাস্তিক নামতে পারে না। কেবল মূর্খ নাস্তিকই নামতে পারে কেননা সে এই প্রপোজিশনে কী রয়েছে তা জানে না।

উগ্র-নাস্তিকদের আলোচনার এক বিপুল অংশ ইয়াহুদী-খৃষ্টিয়ান উৎসে ইসলামের সমালোচনারূপে উৎসারিত যার প্রকৃতি হচ্ছে ধর্মীয়, নাস্তিক যুক্তি পরিবহনের অনুকূল নয়। কিন্তু এগুলোতে তারা দ্রুত জড়িয়ে পড়ায় তাদের অঙ্গনটি ‘ধর্মীয়’ প্রকৃতিতে অতি সহজে রূপায়িত হয়েছে।

দু’কুলের’ সম্মান

সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত, ঘাপটি-মারা নাস্তিকদের প্রধান প্রধান বিষয়ের আরেকটি হচ্ছে ‘দু’কুলের’ সম্মান নিয়ে বাঁচা ও মরা।  এটা হচ্ছে ধর্মীয় পরিভাষায় ‘মুনাফিকি’। এরা চাকুরী-বাকুরী করে, সভা-সমিতিতে উপস্থিত হয়, মঞ্চের প্রধান চেয়ার পায়, বক্তৃতা দেয়। ইসলাম ত্যাগ করেছে -এমন কথা প্রচারিত হলে ‘বাজার-মূল্য’ অনেকটা কমে যাবে, এই ভয়। তারপরের ভয় হচ্ছে মরে গেলে জানাযার কী হবে? হাজার হাজার লোকের সমারোহ ও সম্মানের কী হবে? তাই ঘাপটি মেরে মুসলিম সমাজে আড়াল হয়। সালাম ও আলাইকুম, ইনশাল্লাহ, মাশাল্লাহ, ‘স্রষ্টা চাইলে’ ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার করে। কেউ কেউ কয়েক বছর পর পর টুপী মাথায় দিয়ে ঈদের নামাজে হাজির হন। এগুলো হচ্ছে দুকূল বাঁচানো ও জানাযার নিশ্চয়তা বিধান।

দাফন  কাফন

কথা হচ্ছে যে মুহাম্মদের (সা.) সমালোচনায়  তার দিন রাত পাত হয়, সেই মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর জীবনকে বাজী রেখেই তাঁর বিশ্বাস ও আদর্শ প্রচার করেছিলেন। অপ্রকাশ্য নাস্তিক এই সবকটি কিন্তু তার দুশমনের কাছ থেকে নিতে পারত। কিন্তু নেয় নি।

বাতেনী নাস্তিক ভাল করেই জানে যে, মারা গেলে, তার পরিবার ভাইরাসে আক্রান্ত জঙ্গিগোষ্ঠীকে আহবান করবে, নবী মুহাম্মদের (সা.) তরিকায় গোসল দেয়া হবে, কাফন পরানো হবে, মৌলবাদী ইমাম ডাকা হবে, সন্ত্রাসীগোষ্ঠী একত্রিত হবে। কুসংস্কারের মাধ্যমে জানাযা হবে। সবই মুহাম্মদের (সা.) তরিকায়। থামুন, আরও রয়েছে। কবর খুদাই হবে এবং জানাযার পর উগ্র-সন্ত্রাসীরা মরদেহকে হাতে হাতে করে কবরে স্থাপন করবে। তাওহীদের কলেমা পঠিত হবে। মুখমণ্ডলকে কিবলামুখী (মক্কামুখী) করবে। এসবের মধ্যে সমস্বরে উচ্চারিত হবে বিসমিল্লাহি আ‘লা মিল্লাতি রাসূলিল্লাহ (আল্লাহর নামে [তোমাকে] রাসূলের অনুসারী মিল্লাতে) কবরস্থ করলাম। আহারে, কীয়ের মাঝে কী, আর পান্তা ভাতে ঘি!

যে লোকটি আল্লাহর রাসূলকে (সা.) অন্যায়ভাবে নিকৃষ্টতম অপবাদ দিত, তাঁর ধর্মকে অসত্য মনে করত, তাঁর প্রতি অমানবিক ভাষায় বিদ্বেষ প্রকাশ করত, তাঁর ধর্মকে নিশ্চিহ্ন করতে জীবন কাটাত, সেকি আজব কাণ্ড, আজ তারই মরদেহ চলে এসেছে রাসূলের মিল্লাতে! গোঁড়াদের দোয়ায়, তাদের প্রার্থনায়! এটা কেমন হল? এখানে কি চিন্তার কিছু নেই? এত যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানমনষ্ক, জ্ঞানের আধার, আলোর দেয়ালি এই লোকটি এখানে কেন? কেন “কুসংস্কারে” চিরশায়িত! ওরে বিনোদন, ‘প্রকৃতির একি প্রতারণা’!

প্রশ্ন হচ্ছে নাস্তিক বেটার মূল্যবোধ। তার দেমাগ। বিবেক। এক ব্যক্তি তার জীবিতাবস্থায় যা চরমভাবে অবজ্ঞা করবে, কিন্তু মৃত্যুতে সেই প্রথায় দাখিল হয়ে যাবে –এই বৈপরীত্য কেন? এই রথে চড়ে গর্তে প্রবেশ যদি ভাল দেখায়, যদি এই দোয়া দাফনে গোর-দাখিলে কল্যাণকর, সুন্দর ও সম্মানজনক অনুভূত হয়, তবে নিশ্চয় তাদের নাস্তিক্য বিশ্বাসে দুর্বলতা আছে। না হলে, নিজেরাই যখন জানেন তাদের জন্য এই জানাযা, এই দোয়া, এই দাফন এভাবে জায়েজ নয়, তবুও (অন্তত মানবতাবাদী হিসেবে), কেন মুসলমানদেরকে এই বিব্রতি থেকে বাঁচাতে কিছু বলবেন না, কিছু করবেন না?

এই বৈসাদৃশ্যের লোক ছড়িয়ে আছে রাষ্ট্রযন্ত্রে, মিডিয়ায়, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানাদিতে। তাদের কেউ মরলে এই সংস্থাগুলো কৌশলে কভার দিয়ে যায়। নাস্তিককে আস্তিকের দাফন দিতে সত্যকে ঢেকে দেয়, রেডিও টিভি ও মিডিয়াতে মিথ্যাচার করে। কোনো কোনো ঘটনাকে মুসলমানদের বিপক্ষে চালাতে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।কালোকে সাদা করে। মিডিয়া প্রধানত তাদের কব্জায়। এর ঐতিহাসিকতা আধিপত্যবাদে, সেক্যুলার শিক্ষা-সংস্কৃতিতে, বিদেশি এনজিওতে এবং অপরাপর বিদেশি সূত্রে।

অনেকে মরণের প্রাক্কালেও নিজেদের বিশ্বাসের ঘোষণাটি দিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু তাও করবেন না। কেন? এর একটি উত্তর হয়ত এই হতে পারে যে মরণকালে যখন দুনিয়াবি অনেক মূল্যবোধ ছিন্ন হয়ে পড়ে তখন জীবনের অনেক সত্যকে ভিন্ন আকারে দেখার অবকাশ আসে। তখন যা সত্য ও ভাল অনুভূত হয় তার পিছনে যৌক্তিক কিছু কারণও জাগ্রত হয়। তারপর কথা হতে পারে যে, যা মরণকালে সত্য, তা তো জীবনকালেও সত্য হওয়ার কথা ছিল। জীবনে নাস্তিক আর মরণে অন্ধ বিশ্বাসী আস্তিকের কাফন দাফন –এ কী বৈপরীত্য! তারা নাকি আবার যুক্তিবাদী, মুক্তমনের লোক, আধুনিক, কেবল বিজ্ঞান সম্মত কাজই করেন! হায় বিজ্ঞান, হায় যুক্তি!

শেষ কথা

এবারে মূল কথাতে যাই। মুসলিম সমাজ বিগত ১৪ শো বছর ধরে অপরাপর ধর্ম ও বিশ্বাসের লোক ও সমাজের সাথে উঠা বসা করে এসেছে। ধর্ম ও বিশ্বাসের ভিন্নতা এখানে নতুন কিছু নয়। যে নাস্তিক সে আবার মানুষ। কারও মরদেহের প্রতি অসম্মান দেখানো ইসলামে জায়েজ নয়। এটা উগ্রনাস্তিক ও অমুসলমানদেরকে করতে দেখা যায়। তাদেরকে মরদেহের কফিনে জুতা নিক্ষেপ করতেও দেখা গিয়েছে! মানবতা কোথায় নিহিত –এই সবক কেউ ইসলাম ধর্মকে শেখাতে হবে না। নিজেরাই শিখলে চলে।

আমরা মনে করি শেষকৃত্য যার যার বিশ্বাস ও আদর্শ অনুযায়ী হওয়া ভাল। এতেই তার প্রতি ও তার বিশ্বাসের প্রতি সম্মান দেখানো হয়। যে ব্যক্তি মুসলমান নয়, তার মরদেহে ইসলামী জানাযা দেয়াতে উলটো তার বিশ্বাসের প্রতি অসম্মান দেখানো হতে পারে। আমি নাস্তিকের বিশ্বাসকে অসত্য মনে করতে পারি কিন্তু তার মানবিক মর্যাদা কোনভাবে ক্ষুণ্ণ হোক তা চাই না। একটি সমাজ শান্ত হোক, সকলকে নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে চলুক, এটাই প্রত্যাশা করি।

1787 জন পড়েছেন

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতাত্ত্বিক, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক। বসবাস: বার্মিংহাম, ইউকে। দেশের বাড়ী: দেউলগ্রাম (উত্তর), বিয়ানী বাজার। Monawwarahmed@aol.com

Comments are closed.