ইত্তেফাকের সেই সাড়া জাগানো কলাম : মঞ্চে-নেপথ্যে

2908 জন পড়েছেন

“… আজ লিখিতে বসিয়া বিশিষ্ট লেখক শ্রী নির্মল সেনের একটা লেখার কথা মনে পড়িল। “বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ” শীর্ষক সেই লেখাটি আজ হইতে ঠিক এক বছর আগে এই দিনে (১৬ ই ডিসেম্বর, ১৯৭৪) প্রকাশিত হয়। নির্মল সেন নির্ভয়ে অনেক নির্মম সত্য কথা নিবন্ধে তুলে ধরেন।

তিনি বলেন যে, ‘মেহেরপুরের আম-বাগান’, ‘বালিগঞ্জের অভিজাত এলাকা’, ‘আগরতলার কয়েকটি ভবন’ এর গল্পই সব গল্প নয়। আছে আরো অনেক গল্প। সেই গল্প-বলাচ্ছলে তিনি তুলিয়া ধরেন ১৯৭২ সালে মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের চরিত্র হননের জন্য সেই ষড়যন্ত্রের আলেখ্যও।

তিনি বলেন, “সীমান্তের ওপারে যারা গিয়েছিল তারা সকলেই সৎ এবং সাধু ছিল এ দাবী কেউ করবেনা। অনেক নেতা এবং উপনেতাই সৎ এবং সাধু জীবনযাপন করেননি। এজন্য বিদেশে আমাদের মুখে কলংক লেপন করা হয়েছে। অনেকের জন্য মুখ দেখান ভার হয়েছে। অনেক নেতা ছিলেন যারা সুযোগ পেলে ইয়াহিয়া খানের কাছে এসে আত্মসমর্পণ করতেন। অনেক নেতাই ছিলেন যারা মানুষের দুর্গতির সুযোগ নিয়ে ভারতের ব্যংকে টাকা জমিয়েছেন। অনেক নেতাই ছিলেন যারা কোনদিন ফ্রন্টে না গিয়ে বাক্স কাধে নিয়ে ছবি তুলে কাগজে ছাপিয়েছেন। তারা আজও আছেন। আছেন বহাল তবিয়তে। কিন্তু তারা তো সব নয়। সব নয় ওরা যারা বাংলাদেশে এসে একগাল দাড়ি দেখিয়ে কাঁধ পর্যন্ত চুল ঝুলিয়ে মুক্তিবাহিনীর লোক সেজেছিল। ওরা সব নয় যারা বাংলাদেশের বুকে গাড়ী বাড়ী হাইজ্যক করেছিল। তাদের মধ্যে অধিকাংশ মুক্তিবাহিনীর শিবিরের কাছাকাছিও যায়নি। ওরা কলকাতা আর আগরতলার ‘নেতৃত্ব’ করেছে। ওরা ভাগাভাগির জন্য প্রতিযোগিতা করেছে। ওরা গ্রামের হাজার হাজার তরূণকে শত্রুর মুখে ঠেলে দিয়ে কলকাতা, আগরতলা, শিলং আর দিল্লীতে ভাষণ দিয়েছে আর সভা করেছে। “বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ”-এ সেই নেতাদের গল্প বলিয়াছেন নির্মল সেন।

….. সেই নেতা-উপনেতারা এবং লম্বা চুল আর বাবরিওয়ালা হাইজ্যকাররা ওখানেই থামেন নাই। নির্মল সেনের বক্তব্য অনুযায়ী, তারা ১৯৭২ সালের প্রথম দিন হইতেই খুব সুচতুরভাবে একটা গভীর ষড়যন্ত্র চালাইতেছিলেন প্রকৃত মুক্তিবাহিণীর চরিত্র-হননের উদ্দেশ্যে। তার ভাষায়, সেই ষড়যন্ত্রকারীরা মুজিবনগরে গিয়েছিল, কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম তারা সমর্থন করেনি। তারা জানত, মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা তাদের চেনে। তারা জানত মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা যদি বাংলাদেশে এসে সত্য কথা ফাঁস করে দেয় তাহলেই (‘নেতাদের’) রাজনৈতিক এবং সামাজিক অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। তাই এই নেতারা বাংলাদেশে এসেই ষড়যন্ত্র শুরু করেছিলেন। এমনকি যে নেতারা একদিন দালালদের হত্যার জন্য মুক্তিবাহিনীর তরণদের নির্দেশ দিয়েছিল তারাই আবার এই হত্যার জন্য মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা শুরু করল। … দিনের পর দিন হাজতে পুরে রাখা হয়েছে। জামিন পর্যন্ত দেয়া হয়নি। এ ঘটনা থেকে একান্তই পরিস্কার, শুধু সীমান্তের এপারে নয়, সীমান্তের ওপারেও যারা ছিলেন তাদের অনেকেই এই বাংলাদেশের স্বধীনতা চাননি। তারা মুক্তিবাহিনীকে বরদাশ্ত করতে পারেননি। তারা জানতেন যে, এই মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা যদি বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে তাদের এই কাহিনী জনসমক্ষে তুলে ধরতে পারে তাহলে তাদের রেহাই নেই। তাই দেখা গেছে, দেশ স্বাধীন হবার পর প্রতি জেলায় এমন একটি চক্র যে চক্রের নেতারা ওপারে ছিলেন। সারাদেশে অসংখ্য নকল মুক্তিবাহিনী সৃষ্টি করেছেন। পার্মিট-লাইসেন্স দিয়ে কিনতে চেষ্টা করেছেন মুক্তিবাহিনীর সৎ তরুনদের।

… একদল তরুন দেশের জন্য প্রাণ দিতে গিয়ে পরিচিত হয়েছে চোর বাটপার আর হাইজ্যকার হিসেবে আর তার ভিত্তিতে রচিত হচ্ছে আরেক ইতিহাস।

“বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ” নিবন্ধে নির্মল সেনের এক বছর আগেকার সেই বক্তব্য ছিল আরও দীর্ঘ। অব্যক্তও হয়ত রাখিয়া গিয়াছিল অনেক কিছু, অনেক নেতার অনেক কথা, অনেক কীর্তিমানের অনেক কীর্তিগাঁথা। বলিতে চাহিলেও হয়ত অনেক কথা তখন বলা যায় নাই। বলার উপায় ছিলনা। কারণ, কারোরই ঘাঁড়ের উপর দুইটা মাথা নাই। লেখক নিজেই আরেক প্রসঙ্গে অন্যত্র স্বীকার করিয়াছেন, ‘আমি একজন সাংবাদিক, কিন্তু স্টেনগানকে আমিও অস্বীকার করতে পারিনা’।

বস্তুতঃ গত চার বছরের ইতিহাসে একটা বড় অধ্যায়ই এই স্টেনগান, এল-এম-জি, এস-এল-আর এর শ্বেত সন্ত্রাসের ইতিহাস। শোনা যায় বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত চিত্র পরিচালক স্বাধীনতার কিছুদিন পর একদা অদ্ভূতভাবে স্বগৃহ হইতে অন্তর্হিত হন। সেই যে নিখোজ হইয়া গেলেন আর কোনদিন ফিরিলেন না। একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামকালে তিনিও ওপারে গিয়াছিলেন এবং টেপে ও ক্যামেরায় এমন অনেক বাস্তব আলেখ্য নাকি ধরিয়া আনিয়াছিলেন যাহা ডকুমেন্টারি চিত্রাকারে প্রকাশ পাইলে ‘কীর্তিমান নেতা-উপনেতা’দের রেহাই ছিলনা। হি নিউ অল দীজ ‘এফেয়ার্স’ টু মাচ। এবং সেই টু মাচ জানাটাই হইল তার কাল। অকস্মাৎ একদা তিনি নিখোজ হইলেন। আর কোনদিন ফিরিলেননা। “বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ” এর বিবরণের সাথে সেই প্রখ্যাত চিত্র পরিচালকের চির অন্তর্ধান ঘটনার কি অদ্ভূত মিল।

মাত্র চার বছরের স্বাধীনতা জীবনে বাংলাদেশও কম লাভ করে নাই। আর তাই শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক বন্ধু নির্মল সেনকেও (ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতিরূপে) গত বছর ২৫শে সেপ্টেম্বর বলিতে শুনিয়াছি, “হয় এই সরকার থাকবে , না হয় আমরা থাকবো। বিশ্বাসঘাতক আমরা নই, সরকারই বিশ্বাসঘাতক”।

… সেই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণিত হইয়াছে। ওরা নাই, আমরা আছি, আমরা থাকিবও। কিন্তু যাইবার আগে চারটা বছরের মধ্যে ওরা এই জাতির কী করিয়া গিয়াছে, আজ ১৬ই ডিসেম্বর তার একটা সালতামামি সমীক্ষা হওয়া দরকার। বিভিন্ন একাডেমির ‘নিরলস প্রচেষ্টার’ ইতিহাস লেখার নামে তৈলায়ন ও পৃষ্ঠকুন্ডলায়ন চার বছরে যথেষ্ট হইয়াছে। আর নয়। এবার সত্যিকার একটা হিসাব-নিকাশ হউক। একটি বিখ্যাত বৈদেশিক পত্রিকার প্রতিনিধির সহিত এক ‘গোপন সাক্ষাৎকার’ এদেশের জনৈক প্রবীণ বামপন্থী দলপতি দাবী করিয়াছেন যে, ‘পঁচিশ হাজারের অধিক দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক কর্মীকে সেই স্বৈরাচারী শাসনামলে নিধণ করা হইয়াছে’। কারও কারও মতে নিধন সংখ্যাটা আরো বৃহৎ। রাষ্ট্রীয় বা দলীয় পর্যায়ে যাহাদের সেই শাসনামলে ‘নির্মুল’ করা হইয়াছে, অনেকের মতে, তাহাদের সংখ্যা নিরূপণের জন্য পাঁচ মিনিটে কুলাইবেনা।

অনেকেই বলেন যে, সত্যিকার আদর্শপরায়ণ মুক্তিযোদ্ধারা – যাহারা বঞ্চনা ছাড়া আর কিছুই পায়নাই – স্বৈরশাসন আমলের শেষাংশে চূড়ান্তভাবে চিন্তাবিমুক্ত হইয়া মেহেরপুর, কালিগঞ্জ, থিয়েটার রোড, আগরতলা, শিলং প্রভৃতি স্থানে সংঘটিত নানা কেলেংকারিপূর্ণ ঘটনা ফাঁস করিতে থাকায় এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে আরম্ভ করায় তাহাদের অনেককেই ‘রাজনৈতিক ঘাতক দল’ বা ‘প্রাইভেট আর্মি’র শিকারে পরিণত হইতে হইয়াছে। তাহারা আর কোন দিন ফিরে নাই। প্রকাশ, তাহাদের অনেকের গলা কাটা, নাক-কাটা, চোখ-উপড়ানো, বিকৃত-ক্ষতবিক্ষত লাশ শ্মশ্মানঘাটে, কবরস্থানে, সেতুর নীচে, ঝাড়-জঙ্গলে, পথিপার্শ্বে পড়িয়া থাকিতে অথবা নদীর স্রোতে ভাসিয়া যাইতে দেখা গিয়াছে। জনৈক পদস্থ পুলিশ অফিসার (যিনি স্বয়ং একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন) সে আমলে ঐ ধরণের ঘাতকবাহিনীর অস্তিত্ব এবং বিশেষ বিশেষ কেটেগরির কর্মীদের নির্মূল করার ‘টপ মোস্ট সিক্রেট’ সরকারী নির্দেশের কথা আমার কাছে স্বীকার করেন। অতএব নির্মল সেন তাঁর মূল্যবান তথ্যপূর্ন নিবন্ধে প্রকৃত মুক্তিবাহিনীর আদর্শপরায়ণ ছেলেদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ‘মামলা ঠুকিয়া দেওয়া’ ও তাদের চরিত্র হননের যে সুচতুর ষড়যন্ত্রের কথা (যা তাঁর বক্তব্যানুযায়ী ১৯৭২ এর প্রথমদিন থেকেই শুরু হইয়াছিল) ব্যক্ত করিয়াছেন, তাহা অচিরেই সেই তরুণদের মিথ্যা মামলায় জড়ানো এবং চরিত্র হননের পর্যায়কেও বহুদুর অতিক্রম করিয়া যায়। উপরোক্ত উদ্দেশ্য সাধনের জন্য প্রাইভেট বাহিনীর হাতে প্রচুর অস্ত্র তুলিয়া দেওয়া হয়। এই আগুন লইয়া খেলার কি পরিণতি হইয়াছে সে কথা আজ বলা নিষ্প্রয়োজন।

নির্মল সেনের ভাষায়, একদল তরুণ (যারা) দেশের জন্য প্রাণ দিতে গিয়ে চোর, বাটপাড় আর হাইজ্যকার বলে চিত্রিত হইয়াছে, সুচতুরভাবে যাদের চরিত্র হনন করা হইয়াছে, এমন কি অনেকের মতে, যাদেরে ‘দুষ্কৃতিকারী’ আখ্যায়িত করিয়া একেবারেই নির্মূল করা হইয়াছে, আজ পঁচাত্তরের ১৬ই ডিসেম্বর তাদের কথা জাতির স্মরণ করা উচিৎ। তাদের মধ্যে যারা এখনও বঞ্চিত জীবনের গ্লাণি ও আশাভঙ্গের মনস্তাত্বিক প্রতিক্রিয়ার পসরা লইয়া কোনক্রমে টিকিয়া আছে,তাদের সন্ধান করা এবং মুক্তিযোদ্ধার প্রাপ্য মর্যাদাপূর্ণ জীবনে প্রতিষ্ঠিত করা উচিত। এই আবেগপ্রবণ তরুণদেরে আবার সেই ‘ভোগের স্রোতে গা-ভাসানো’, বিদেশী টাকা জমানো, একশ্রেণীর নেতা-উপনেতারা হাতছানি দিয়া যাতে বিভ্রান্ত করিতেও নিজেদের এডভেঞ্চারিজমের গুঁটি হিসাবে ব্যবহার করিতে না পারে, সেজন্য ঐ কীর্তিমান নেতা-উপনেতাদেরে তাদের আসল চেহারা মেলিয়া ধরা উচিত। আজিকার ১৬ই ডিসেম্বরের এটাই হইবে সবচেয়ে বড় কাজ। নির্মল সেনের একবছর আগেকার লেখা “বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ” ছিল সেই স্বৈরশাসনামলে সেপথে এক নির্ভীক পদক্ষেপ। স্বৈরশাসনের অবসান সেই পদক্ষেপকে সহজ নিষ্কন্টক করিয়া দিয়াছে। সত্যের ভিত্তিতে লেখা হউক মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস যার ধারা আজও চলিতেছে অবিরাম। আরও নতুন নতুন উপাদান মাল-মসলা ইতিমধ্যে প্রস্তুত। সত্যনিষ্ঠ ঐতিহাসিকরা আজ কোথায়?”

ইত্তেফাক উপসম্পাদকীয় – পৌষ ১, ১৩৮২

তথ্যসূত্র : বাংলাদেশ : বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর / সম্পাদনা : মুনিরউদ্দীন আহমদ ॥ [ নভেল পাবলিশিং হাউস – জানুয়ারি, ১৯৮৯ । পৃ: ১১৭-১২১ ]

2908 জন পড়েছেন

উড়ন্ত পাখি

About উড়ন্ত পাখি

আমি কোন লেখক বা সাংবাদিক নই। অর্ন্তজালে ঘুরে বেড়াই আর যখন যা ভাল লাগে তা সবার সাথে শেয়ার করতে চাই।

Comments are closed.