ভাষাসৈনিকের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও সমসাময়িক রাজনৈতিক চিন্তা

1262 জন পড়েছেন

আজ বুধবার, ১৮ ফেব্র“য়ারি। মহান একুশে ফেব্র“য়ারি দরজার সামনে কড়া নাড়ছে। দিবসটিকে উদযাপন ও পালন করতে উন্মুখ হয়ে আছে বাংলাদেশের সর্বত্র এবং পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাঙালিরা। শহীদ মিনারে ফুল দিতে যাবে লাখ লাখ মানুষ, প্রত্যেক নগরে, শহরে, বন্দরে। অপর দিকে, দেশের রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে অবনতি হয়ে অনিশ্চিত অবস্থা সৃষ্টির কারণে, মানুষের মনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বেড়েই চলেছে। জনগণের নিরাপত্তা বিঘিœত হচ্ছে। ঢাকা মহানগরের সাথে অন্যান্য জেলা শহর ও জনপদের যোগাযোগের জন্য আংশিকভাবে রেলপথ এবং পূর্ণভাবে নৌপথ খোলা আছে। সড়কপথে যানবাহন চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘিœত। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেই এত কিছু হচ্ছে। তাই আজকের কলামে প্রথমে রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রোপট বা কারণ অতি সংক্ষেপে বিশ্লেষণ করতে চাই। অতঃপর ভাষার মাসে, সব ভাষাসৈনিকের প্রতি প্রতীকী অর্থে দু’জন নির্দিষ্ট ভাষাসেনিকের উদ্দেশে দুই-কলম সম্মান জানাতে চাই।
প্রথম বিষয় তথা রাজনৈতিক বিষয়টি জটিল বিধায় আমার সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নিচ্ছি এবং সহজভাবে উপস্থাপনের আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। সম্মানিত পাঠক, আজকের কলামের বিষয়টি নিজ মেধা ও উদারতায় গ্রহণ করবেন বলে আশা রাখি। আজকের কলামের অতিরিক্ত, একই প্রসঙ্গে আরো কিছু কথা আগামী সপ্তাহের কলামে ইনশাআল্লাহ লিখব।

মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের একটি রায় প্রসঙ্গে
কোনো একজন ব্যক্তি এখন থেকে আট-দশ বছর আগে, মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট-আবেদন দাখিল করেছিলেন (পিটিশন নম্বর ৪১১২ অব ১৯৯৯)। পিটিশনের বা মামলার সারবস্তু হলো এই যে, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি বাংলাদেশের সংবিধানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কি না।’ ৪ আগস্ট ২০০৪ হাইকোর্ট বিভাগ এই রিট আবেদনের ওপর রায় দিয়েছিলেন। অতঃপর এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে। আপিলের দীর্ঘ সময় পর, আদালতীয় সময়ে শুনানি ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানির সময় অনেক প ছিল। আদালত আটজন প্রখ্যাত জ্যেষ্ঠ আইনজীবীকে আদালতের বন্ধু (অর্থাৎ এমিকাস কিউরি) হিসেবে নিয়োগ দেয়। আর তারা এ বিষয়ে বক্তব্যও রেখেছিলেন। ১০ মে ২০১১, মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এই মামলার রায় দেন। সুপ্রিম কোর্টের রেওয়াজ মোতাবেক এই তারিখে প্রদত্ত রায়টি অতি সংপ্তি ছিল। রায় দেয়ার সাত-আট দিন পর প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক অবসরে চলে যান। কম-বেশি ষোলো মাস পর, একই মামলার দীর্ঘ বা পূর্ণাঙ্গ লিখিত রায় প্রকাশ করা হয়।
২০১১ সালের মে-জুন মাসে, বাংলাদেশের পার্লামেন্ট, সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি বাতিল করে দেয়। তখন হাজারো ব্যক্তি, হাজারো জায়গায় জোরগলায় অথবা ইনিয়ে-বিনিয়ে বলেছিলেন, সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতিকে অবৈধ ঘোষণা করেছে, অতএব পার্লামেন্ট আইন করে সেটা বাতিল করতে বাধ্য। আমি নবীন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে বারবার চিন্তা করছি, বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কটের উৎস কোথায়? আমার মতে, মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের রায় এবং পার্লামেন্টের কর্মকাণ্ডের মধ্যে একটি শুভঙ্করের ফাঁকি বিদ্যমান। এ নিয়ে আজকের কলামে প্রথমে আমি শুধু সংপ্তি রায়টিকে পুরোপুরি উদ্ধৃত করতে চাই। সংপ্তি রায়টি ইংরেজি ভাষায় দেয়া। আমি সেই ইংরেজি সংপ্তি রায়ের হুবহু ইংরেজি উদ্ধৃত করছি এবং নিজে বাংলা অনুবাদ বা ভাবানুবাদ করে দিচ্ছি।
It is hereby declared :
The appeal is allowed by majority without any order as to costs.
The Constitution (Thirteenth amendment) Act, 1996 (Act 1 of 1996) is prospectively declared void and ultra vires the Constitution.
The election of the Tenth and the Eleventh Parliament may be held under the provisions of the above mentioned Thirteenth Amendment on the age old principles, namely, quod alias non est licitum, necedditas licitum facit (That which otherwise is not lawful, necessity makes lawful), Salus Populi Est Suprema Lex (Safety of the people is the supreme law) Ges Salus Republicae Est Suprema Lex (Safety of the State is the Supreme law).
The parliament, however, in the meantime, is at liberty to bring necessary amendments excluding the provisions of making the former Chief Justices of Bangladesh or the Judges of the Appellate Division as the head of the Non-Party care-taker Government.
The Judgment in detail would follow.
The connected Civil Petition for leave to appeal No. 596 of 2005 is accordingly disposted of.”

বাংলা অনুবাদ :
এতদ্বারা ঘোষণা করা হচ্ছে যে,
(১) আপিলটি সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্তে মঞ্জুর করা হলো, খরচাপাতি সম্বন্ধে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়া।
(২) সংবিধান (ত্রয়োদশ সংশোধনী) আইন, ১৯৯৬ (১৯৯৬ সালের ১ নম্বর আইন) প্রত্যাশিতভাবে বা ভবিষ্যতের জন্য অসাংবিধানিক (তথা সংবিধানের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ) এবং অবৈধ (তথা বৈধ কোনো কর্মের সমর্থনে প্রয়োগযোগ্য নয়)।
(৩) দশম এবং এগারোতম পার্লামেন্টের নির্বাচন, উপরে উল্লেখিত ত্রয়োদশ সংশোধনীর বিধান বা বক্তব্য মোতাবেকই অনুষ্ঠিত করা যেতে পারে তিনটি যুগ-যুগান্তরের পুরনো নীতির ওপর ভিত্তি করে। প্রথম নীতি, সাধারণত যা আইনগত বা আইনগত নয় বা বৈধ নয়, সেটাই প্রয়োজনের কারণে বৈধ হয়। দ্বিতীয় নীতি, জনগণের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ বা চূড়ান্ত আইন। তৃতীয় নীতি, রাষ্ট্রের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ আইন।
তবে, ইতোমধ্যে বাংলাদেশের পার্লামেন্ট নিজ বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে পারেন, একটি শর্ত বাদ দিয়ে। বাদ দিতে হবে যেই শর্ত সেটা হলো এই যে, বাংলাদেশের কোনো সাবেক প্রধান বিচারপতি বা আপিল বিভাগের কোনো বিচারপতি, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হবেন না। বিস্তারিত রায় যথাসময়ে আসবে। এতদ্বারা, সংশ্লিষ্ট সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল নম্বর ৫৯৬ অব ২০০৫-এর বিহিত করা হলো। অনুবাদ শেষ
এই সংপ্তি রায়ের বিশ্লেষণ
প্রথম পয়েন্ট। রায়ে বলা আছে যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতিটি, সংবিধানের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ, অতএব ভবিষ্যতের জন্য বাতিলযোগ্য। দ্বিতীয় পয়েন্ট। রায়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়া হয়নি যে, এখনই বাতিল করা হোক। তৃতীয় পয়েন্ট। ভবিষ্যতে বাতিলযোগ্য হলেও, এবং বর্তমানে (২০১১ সাল) সংবিধানের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ হলেও, তিনটি প্রাচীন সর্বজনগ্রাহ্য নীতির কারণে আমাদের বক্তব্য হলো এই যে, ত্রয়োদশ সংশোধনীতে দেয়া পদ্ধতির অধীনে আগামী দু’টি পার্লামেন্টের নির্বাচন করা যেতে পারে। চতুর্থ পয়েন্ট। আগামী দু’টি পার্লামেন্ট নির্বাচন এই পদ্ধতির অধীনে করার জন্য, ত্রয়োদশ সংশোধনী অর্থাৎ ওই আইনটি, পার্লামেন্ট কর্তৃক সংশোধন করা যেতে পারে। পঞ্চম পয়েন্ট। কতটুকু সংশোধন করবেন বা করবেন না সেটার এখতিয়ার হচ্ছে পার্লামেন্টের, অর্থাৎ পার্লামেন্টের বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেয়া হলো। ষষ্ঠ পয়েন্ট। পার্লামেন্ট যখন ত্রয়োদশ সংশোধনীর বিধান বা বক্তব্য সংশোধন করবে (এই রায়ের পরে), তখন অবশ্যই একটি সংশোধন বাধ্যতামূলকভাবে করবে। বাধ্যতামূলকভাবে করণীয় সংশোধনীটি হলো এই যে, মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের কোনো অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির সাথে সংশ্লিষ্ট হতে পারবেন না।
দু’টি পার্লামেন্ট নির্বাচন করার পে মত দেয়ার কারণ
সংপ্তি রায়ে তিনটি নীতির কথা উল্লেখ করা আছে। বাংলা অনুবাদ বা ভাবানুবাদ, এই কলামেই একটু ওপরে দেয়া আছে। কিন্তু মাননীয় প্রধান বিচারপতি আর কোনো ব্যাখ্যা দেননি। হয়তোবা, সংপ্তি রায়ে ব্যাখ্যা দেয়ার জায়গা ছিল না। কতটুকু সংপ্তি হবে বা হবে না এটার এখতিয়ার একান্তভাবেই রায় প্রদানকারী বিচারপতির। কিন্তু আনুমানিক ষোলো মাস পর, যখন পূর্ণাঙ্গ লিখিত রায় প্রদান বা প্রকাশ করা হয়, তখন দেখা গেল যে, মাননীয় প্রধান বিচারপতি ব্যাখ্যা করেছেন, কেন তিনি দু’টি পার্লামেন্ট নির্বাচন করার জন্য সুপারিশ করেছিলেন। দীর্ঘ বা পূর্ণাঙ্গ লিখিত রায়ের অনুচ্ছেদ নম্বর ১১৮৫ এবং ১১৮৬ দ্রষ্টব্য। ১১৮৫-তে, প্রধান বিচারপতি যা বলেছিলেন সেটা হুবহু এখানে তুলে দিলাম।
লিখিত রায়ের উদ্ধৃতি
উদ্ধৃতি শুরু। ‘অনুচ্ছেদ ১১৮৫। বিজ্ঞ এমিকাস কিউরিগণ সকলেই এই আদালতের সিনিয়র এডভোকেট। তাঁহাদের সুগভীর জ্ঞান, প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা এবং দেশের প্রতি তাঁহাদের দায়িত্ববোধ প্রশ্নাতীত। সংখ্যাগরিষ্ঠ এমিকাস কিউরিগণ কোনো-না-কোনো আকারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বজায় রাখিবার পে মত প্রকাশ করিয়াছেন। তাঁহাদের আশঙ্কা নির্বাচনকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে দেশে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হইতে পারে। তাঁহারা সকলেই দায়িত্বশীল ব্যক্তি। তাঁহাদের আশঙ্কা আমরা একেবারে অবহেলা করিতে পারি না। যদিও তর্কিত সংবিধান (ত্রয়োদশ সংশোধন) আইন, ১৯৯৬, কে অসাংবিধানিক ও অবৈধ ঘোষণা করা হইয়াছে এবং ইহা অবশ্যই অবৈধ। তবুও এইরূপ আশঙ্কার কারণে সহস্র বছরের পুরাতন ল্যাটিন ম্যাক্সিম, যেমন, ইড কোড এলিয়াস নন-ইস্ট লিসিটাম, নেসেসিটাস লিসিটাম ফেসিট (দ্যট হুইচ আদারওয়াইজ ইজ নট লফুল, নেসেসিটি মেকস লফুল), সেলাস পপুলি ইস্ট সুপ্রিমা লেক্স (সেইফটি অব দি পিপল ইজ দি সুপ্রিম ল) এবং সেলাস রিপাবলিক্য ইস্ট সুপ্রিমা লেক্স (সেইফটি অব দি স্টেইট ইজ দি সুপ্রিম ল)… ইহার সহায়তা লইতে হইল। অনুচ্ছেদ ১১৮৬। উপরিউক্ত নীতিগুলোর আলোকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সাময়িকভাবে শুধুমাত্র পরবর্তী দু’টি সাধারণ নির্বাচনের েেত্র থাকিবে কি থাকিবে না, সে সম্বন্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শুধু জনগণের প্রতিনিধি জাতীয় সংসদ লইতে পারে। অনুচ্ছেদ ১১৮৭। উক্ত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সকলেই নিজ নিজ কর্তব্য সঠিকরূপে পালন করিতে সম্পূর্ণ সজাগ ও পরিপূর্ণ দায়িত্বশীল হইবেন বলিয়া আশা করা যায়।’ উদ্ধৃতি শেষ।
পার্লামেন্ট কী করল?
প্রথম পয়েন্ট। ২০১১ সালের মে-জুন-জুলাই মাসে বাংলাদেশে পার্লামেন্ট আইন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি বাতিল করে দিলো। দ্বিতীয় পয়েন্ট। যেই কারণগুলোর ভিত্তিতে প্রধান বিচারপতি মহোদয় আরো দু’টি নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুপারিশ করেছিলেন, পার্লামেন্ট সেই কারণগুলোকে অবহেলা করলেন। তৃতীয় পয়েন্ট। মেজরিটি সংখ্যক এমিকাস কিউরি (আন-অফিসিয়ালি জানামতে আটজন এমিকাস কিউরির মধ্যে সাত জনই) যেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন এবং যেই আশঙ্কাকে প্রধান বিচারপতি অবহেলা করেননি, পার্লামেন্ট কিন্তু অবহেলা করলেন। চতুর্থ পয়েন্ট। সংপ্তি রায়ের ওপর ভিত্তি করে, কোনো মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির েেত্র মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় না। অনুরূপ ন্যায় বিচার, ন্যায় চিন্তা এবং সততার দাবি হলো পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার আগে সংপ্তি রায়ের ওপর ভিত্তি করে কোনো আইনকেও মৃত্যুপথে ঠেলে না দেয়া। অর্থাৎ পার্লামেন্ট সংপ্তি রায়ের ওপর ভিত্তি করে ত্রয়োদশ সংশোধনীকে ফাঁসি দিয়ে দিলো।
দায়দায়িত্ব ও করণীয়
আমার মতে, বর্তমান অরাজক অশান্তিপূর্ণ বিশৃঙ্খল রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য দায়দায়িত্ব বর্তায় ২০১১ সালের পার্লামেন্টের ওপরে। সেই পার্লামেন্টের লিডার অব দ্য হাউজ ছিলেন শেখ হাসিনা। তাহলে দায়দায়িত্বের চূড়ান্ত অবস্থান হলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর। যদি ২০১১ সালের পার্লামেন্ট পূর্ণাঙ্গ লিখিত রায়ের জন্য অপো করতেন তাহলে তৎকালীন রাজনৈতিক সরকার, লিখিত রায় থেকে দিকনির্দেশনা পেতেন। সংপ্তি রায়ে এবং দীর্ঘ পূর্ণাঙ্গ লিখিত রায়ে, মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট পার্লামেন্টের ওপরেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব দিয়ে দিয়েছিলেন। পার্লামেন্ট, সাদা-কালো-সবুজ-লাল-হলুদ ইত্যাদি যে কোনো রঙের সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন এবং একটি রঙের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পার্লামেন্ট, গরম-ঠাণ্ডা-বাষ্পীয়-বরফীয়-শীতল-নাতিশীতোষ্ণ যেকোনো তাপমাত্রার সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন এবং একটি সুনির্দিষ্ট তাপমাত্রার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তের ফলাফলের জন্য পার্লামেন্টকেই দায়িত্ব নিতে হবে। অতএব ২০১২-১৩-১৪ এবং ২০১৫ সালের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং রাজনৈতিক গোলযোগের জন্য পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তই দায়ী। এরূপ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের সহজ এবং সরল পথ হলো, পার্লামেন্ট কর্তৃক গৃহীত আরেকটি ভিন্ন গঠনমূলক বা সংশোধনমূলক সিদ্ধান্ত।
সমস্যার রূপ ও সমাধান
কেউ বলছেন সমস্যাটি আইনশৃঙ্খলাজনিত। কেউ বলছেন সমস্যাটি রাজনৈতিক। আমার মতে, সমস্যার উৎপত্তি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত থেকে। ২০১১ সালের মে-জুন-জুলাই মাসের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তটি বা ২০১৩ সালের ডিসেম্বর-১৪ সালের জানুয়ারির সিদ্ধান্তগুলো অপরিণামদর্শী বলে প্রমাণিত হচ্ছে। রাজনৈতিক সমস্যা থেকেই আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যার উৎপত্তি হচ্ছে। সমাজ দেশ ও মানুষকে বাঁচাতে হলে, সমস্যার উৎপত্তিস্থলে যেতে হবে। উৎপত্তিস্থল পার্লামেন্ট এবং আইন। তবে যুগপৎ চিকিৎসাও চলে। অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের জন্য যেমন চেষ্টা করতে হবে সরকারকে, তেমনি রোগের উৎপত্তিস্থলের চিকিৎসার জন্যও পার্লামেন্টকে চেষ্টা করতে হবে। জনগণের বা নাগরিকগণের সচেতন অংশ, বিভিন্ন মাত্রায় বা আঙ্গিকে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করতে পারেন। বাংলাদেশের প্রতি বা বাংলাদেশের মানুষের প্রতি শুভেচ্ছা রাখেন, এমন ব্যক্তি বা সংস্থাও অনুঘটকের ভূমিকা পালন করতে পারেন।
বেঙ্গল রেজিমেন্টের দু’জনের প্রতি শ্রদ্ধানিবেদন
১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান আলাদাভাবে স্বাধীন হওয়ার সময় ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীকে দু’টি অংশে ভাগ করা হয়েছিল, যার একটি অংশ ভারত পায় এবং আরেকটি অংশ পাকিস্তান পায়। অতঃপর তাদের নাম হয় যথাক্রমে ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনী। সেই নতুন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে পদাতিক কোর বা পদাতিক বাহিনীতে বাঙালিদের অংশগ্রহণ ছিল না বললেই হয়। অথচ সেনাবাহিনী একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সংস্থা। তাই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পদাতিক কোরে বাঙালিদের জন্য স্বতন্ত্র একটি রেজিমেন্ট স্থাপন করতে উগগ্রীব হয়ে ওঠেন কিছু সচেতন বাঙালি অফিসার। এরকম দু’জন অফিসারের মধ্যে প্রথমজন হলেন মেজর আব্দুল গণি, সচরাচর শুধু মেজর গণি বলে পরিচিত। দ্বিতীয়জন হলেন মেজর মহম্মদ তহম্মল হোসেন, সমসাময়িকগণের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন মেজর এম টি হোসেন নামে। উভয়েই মরহুম। মেজর গণিকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা প্রাণপুরুষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রথম ইউনিট বা দলটিকে বলা হয় ‘ফার্স্ট ব্যাটালিয়ন, দি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট’। সংেেপ এটাকে বলা হয় প্রথম বেঙ্গল রেজিমেন্ট বা আরো সংেেপ, ফার্স্ট বেঙ্গল। এই ব্যাটালিয়নের আনুষ্ঠানিক জন্ম ১৫ ফেব্র“য়ারি ১৯৪৮ সালে।
বর্তমানে যেটাকে ঢাকা সেনানিবাস বলা হয়, তার সবচেয়ে উত্তরের অংশকে বলা হয় কুর্মিটোলা। ঢাকা সেনানিবাসে যেই অতি উচ্চমানের বিখ্যাত গলফ কাব আছে, সেই গলফ কাবের নাম কুর্মিটোলা গলফ কাব। কুর্মিটোলা নামে ভৌগোলিক এলাকাটি এখন বাংলাদেশ বিমানবাহিনী কর্তৃক ব্যবহৃত এবং স্বনামধন্য একটি বিমানবাহিনী ঘাঁটি বা বেইজ। ১৯৪৭-৪৮ সালে এখানে বিমানবাহিনীর স্থাপনা ছিল ন্যূনতম। এই কুর্মিটোলাতেই প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সংগঠিত হয় ও জন্ম লাভ করে। প্রতিষ্ঠা ও সংগঠনের প্রক্রিয়া কয়েক মাস চলার পর, আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের তারিখ ঠিক হয়েছিল ১৫ ফেব্র“য়ারি ১৯৪৮। প্রধান অতিথি ছিলেন তখনকার আমলের পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর স্যার ফ্রেডারিক ব্রেবর্ন। আরো উপস্থিত ছিলেন খাজা নাজিমউদ্দিন, নূরুল আমিন, প্রাদেশিক মন্ত্রিসভার অন্যান্য মন্ত্রী, ওই আমলের পূর্ব পাকিস্তানে নিয়োজিত জিওসি ব্রিগেডিয়ার আইয়ুব খান। অবশ্যই আরো সামরিক অফিসার, জুনিয়র কমিশনড অফিসারসহ, প্রথম বেঙ্গল রেজিমেন্টের সবাই উপস্থিত ছিলেন। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর, চা-চক্র শেষে, বিবিধ বিষয়ে আলাপ করার সময় ব্রিগেডিয়ার আইয়ুব খান ইংরেজি ভাষায় বলেন, ‘ফ্রম নাউ অন ওয়ার্ডস বেঙ্গলি সোলজার্স উইল স্পিক ইন উর্দু অ্যান্ড নট ইন বেঙ্গলি।’ এতে প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের নবনিযুক্ত উপ-অধিনায়ক মেজর এমটি হোসেন ুব্ধ হয়ে প্রতিবাদ করে ইংরেজি ভাষায় বলেন, ‘এক্সকিউজ মি স্যার। ইন ওয়েস্ট পাকিস্তান পাঠান সোলজার্স হ্যাভ বিন এলাউড টু স্পিক ইন পশতু। সিমিলারলি আউয়ার বেঙ্গলি সোলজার্স শুড বি অ্যালাউড টু স্পিক ইন বেঙ্গলি অ্যান্ড উর্দু।’ রাগান্বিত হয়ে ব্রিগেডিয়ার আইয়ুব খান ইংরেজিতে বলেন, ‘ননসেন্স। অ্যাবসার্ড। সিট ডাউন।’ এরূপ ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় আত্মসম্মানে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে, মেজর গণি যুগপৎ ুব্ধ ও আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠেন। তিনি ইংরেজিতে বলেন, ‘এক্সকিউজ মি স্যার। হোয়াটএভার মেজর এমটি হোসেন হ্যাজ সেইড ইজ নট কারেক্ট। উই বেঙ্গলি সোলজার্স উইল নেভার স্পিক ইন উর্দু, বাট ইন আওয়ার মাদার টাংগ বেঙ্গলি।’ মেজর গণির এরূপ শক্তিশালী বক্তব্যে, ব্রিগেডিয়ার আইয়ুব খান অধিকতর রাগান্বিত হয়ে বলেন, ‘শাটআপ। সিট ডাউন।’ কিছু দিন পরই তৎকালীন জিওসি আইয়ুব খান হুকুম জারি করেন যে, কোনো বাঙালি সৈনিক জেসিও এবং অফিসার বাংলায় কথা বলতে পারবে না। মেজর গণি ও মেজর হোসেন প্রথম হুকুম অমান্য করে এর প্রতিবাদ জানান। এর প্রতিক্রিয়ায় এই দু’জন অফিসারকেই নির্যাতন সহ্য করতে হয় এবং কিছু দিনের মধ্যেই ব্যাটালিয়ন হতে অন্যত্র বদলি করে দেয়া হয়। ভাষার মাস ফেব্র“য়ারিতে, আমরা মেজর গণি এবং মেজর এমটি হোসেনের প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধানিবেদন করছি। মেজর এমটি হোসেনের পরিবারের সাথে আমাদের যোগাযোগ নেই; মেজর গণির পরিবারের সাথে আছে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মেজর গণির সম্মানিত স্ত্রী, বেঙ্গল রেজিমেন্টের বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ ফাংশনে দাওয়াত পেতেন। মেজর গণি ইন্তেকালের সময় তার বড় ছেলে তাজুল ইসলাম গণি এবং ছোট ছেলে খালেদ গণির বয়স ছিল যথাক্রমে ছয় বছর এবং ছয় মাস। উভয়েই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ছিলেন, যথাক্রমে অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল এবং অবসরপ্রাপ্ত মেজর। জনাব তাজ, দেশ-বিখ্যাত ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের ছাত্র হিসেবে আমার থেকে দুই বছর ছোট। মাতৃভাষার জন্য উদ্দীপ্ত হওয়া দুই সৈনিক হোসেন এবং গণির সম্মানিত পরিবারবর্গ যেখানেই থাকুন না কেন, তাদের প্রতি অভিনন্দন। মরহুম মেজর আব্দুল গণির জ্যেষ্ঠ সন্তান, তার পিতার জীবনী লেখার নিমিত্তে এখন গবেষণা করছেন। ওই গবেষণা থেকেই ধার করে আমি ওপরের কথাগুলো তুলে ধরেছি। জ্যেষ্ঠ সন্তানের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।

(পূর্ব প্রকাশিত ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ তারিখে নয়া দিগন্ত পত্রিকায়)

 

1262 জন পড়েছেন

Comments are closed.