সমকালীন রাজনীতি:: সংলাপ ও আন্দোলন

1527 জন পড়েছেন

ফেসবুক রাজনীতি এবং সংলাপ
২৩ জানুয়ারি ২০১৫ প্রায় মধ্যরাতে, ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস পোস্ট করেছিলাম। শিরোনাম ছিল সংলাপের পক্ষে তিনটি যুক্তি। আমার ফেসবুক দেখতে হলে ইংরেজিতে general.smibrahim@yahoo.com এই ঠিকানায় যেতে পারেন। ফেসবুককে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম বলা হয়; কিন্তু এখানে পদ্ধতিটি সামাজিক হলেও কিন্তু সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-পারিবারিক ইত্যাদি সব রকমের কথাবার্তা চলে। চার বছর আগে উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়ায় যে গণ-আন্দোলন শুরু হয়েছিল; সেটি একটি ছোট্ট ঘটনাকে ফেসবুকে প্রচার করার মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল। বাংলাদেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন এই ফেসবুকের মাধ্যমেই প্রকাশ্যে মতবিনিময় করতে পারছেন। এটি ফেসবুকের পক্ষ থেকে একটি বড় উপকারিতা। যদিও বাংলাদেশে অতি সম্প্রতি ফেসবুকে লেখালেখিতে মানুষ অনেক সাবধান হয়ে গেছে। কারণ অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্যও বা অতি আগ্রহের কারণেও কোনো উল্টোপাল্টা কথা ফেসবুকে উপস্থাপনের জন্য নিশ্চিত শাস্তির কথা সবাই জানে। ফেসবুকের আরো উপকারিতা ও অপকারিতা আছে। ফেসবুকের মাধ্যমে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে পরিচয় এবং পরিচয় শেষে বিয়ে-শাদী যেমন হচ্ছে, তেমনি ফেসবুকের কারণে অনেক পরকীয়া সম্পর্ক সৃষ্টি হচ্ছে, যার পরিণতিতে অনেক পরিবারও ভেঙে যাচ্ছে। যা হোক, আমাদের দরকার মাধ্যমটির উপকারিতা গ্রহণ করা। আমার বক্তব্য উপস্থাপন করেছিলাম বাংলাদেশের এই মুহূর্তের পরিবেশকে খেয়াল রেখে। এ সম্পর্কে দু’টি অনুচ্ছেদ পরে আবারো বক্তব্য আছে।

জনাব কোকো এবং নেত্রী সমাচার
২৪ জানুয়ারি দুপুরে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে আরাফাত রহমান কোনো ইন্তেকাল করেন। তার পরিপ্রেেিত, ওই দিন রাত ৮টার কিছুণ পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গুলশানে খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। গেটটি খোলা হয়নি, পারস্পরিক সাাৎ হয়নি; ঘটনাটিকে অনেক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই বিশ্লেষণ করা যায়। কিন্তু আমি সে দিকে যাবো না। কারণ, অবিতর্কিত এবং বিতর্কিত একাধিক কারণের প্রোপটেই এরূপ হয়েছিল বলে সমঝদার ব্যক্তিরা মনে করেন। ইতোমধ্যে ২৫ জানুয়ারি বিকেলে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের বক্তব্যের মাধ্যমে পরিস্থিতি স্পষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে বা যে পরিবেশের কারণে আমি ফেসবুকে বক্তব্যটি উপস্থাপন করেছিলাম সেটি এখনো পরিবর্তন হয়নি।

সংলাপ নিয়ে পক্ষে -বিপক্ষে
বিগত ২০১৪ সালে অনেকবার অনেক বিএনপি নেতা এবং অনেক পেশাজীবী নেতা একটি আহ্বান উপস্থাপন করেছেন। আহ্বানটি হলো, সরকারি দল ও বিরোধী দল যেন পারস্পরিক সংলাপে বসে চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট থেকে উত্তরণ ঘটান। বিরোধী দল বলতে আমি অবশ্যই বিএনপি এবং ২০ দলীয় জোটকে বোঝাচ্ছি। ১ জানুয়ারি ২০১৫ সন্ধ্যায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া যে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন সেখানেও তিনি সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন। অপর দিকে, ২০১৪ সাল ধরেই মতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সম্মানিত জ্যেষ্ঠ নেতারা প্রায় একই সুরে সংলাপ নামক বস্তুকেই প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। প্রধানমন্ত্রী নিজেও অনেক রকমের ভাষায় সংলাপকে প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। ২০১৪ সালের জুলাই মাসে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, প্রধানমন্ত্রী প্রত্যভাবে শুধু সংলাপ প্রত্যাখ্যান করে বক্তব্য রাখেননি, বরং বিএনপিকে মারাত্মক অশোভন ভাষায় আক্রমণ করে সংলাপকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিন্তু গত ৫ জানুয়ারি থেকে আজ অবধি ঘটনার পরিপ্রেেিত বাংলাদেশের সচেতন নাগরিকদের প্রতিনিধিই বা সব প্রকার পেশাজীবী নেতাই দলমত নির্বিশেষে আহ্বান করেই যাচ্ছেন এই মর্মে যে, বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক সমস্যা মোকাবেলার জন্য প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ অবিলম্বে প্রয়োজন। সংলাপ হলেই যে সমস্যার সমাধান হবে তার কোনো গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু সংলাপ ব্যতীত পারস্পরিক মনোভাব জানার, পারস্পরিকভাবে ভদ্র ভাষায় উত্তর দেয়ার, প্রত্যভাবে কথা শোনার ও উত্তর দেয়ার অন্য কোনো পন্থা নেই। যারাই সংলাপ চাচ্ছেন তাদের মধ্যে অনেকেই বলছেন যে, শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া উভয়ের মধ্যে সংলাপ চাই। অন্য অনেকে বলছেন, আগে উভয় পরে জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে সংলাপ চাই, অতঃপর শীর্ষ নেতাদের মধ্যে চাই। উভয় পকে সংলাপে বসানোর জন্য অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিই বিভিন্ন পদপে নিচ্ছেন। ২৫ জানুয়ারি প্রখ্যাত সম্পাদকদের সাথে সরকারি নেতাদের বৈঠক হয়েছে। সেখানেও সহিংসতা বন্ধে যেমন আহ্বান জানানো হয়েছে, তেমনি জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে সংলাপ অনুষ্ঠানের জন্য। অপরপে সরকারি নেতারা বলেই যাচ্ছেন, ঘোষণা করেই যাচ্ছেন যে, সংলাপের প্রয়োজন নেই, কার সাথে সংলাপ হবে, বিএনপির সাথে সংলাপের প্রয়োজন কী, সংলাপে আসার জন্য বিএনপির কী যোগ্যতা আছে (ইংরেজি পরিভাষায় লোকাস স্ট্যান্ডি) ইত্যাদি। এই প্রোপটেই আমি আমার ফেসবুকে ওই অনুচ্ছেদটি উপস্থাপন করেছিলাম। ওই অনুচ্ছেদটির বক্তব্য কিঞ্চিত সম্প্রসারণ করে এখানে আবার উল্লেখ করছি।

সংলাপের পক্ষে তিনটি যুক্তি
‘একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে মাননীয় শেখ হাসিনা সংলাপের উপকারিতা সম্পর্কে সম্যক অবহিত বলেই আমি বিশ্বাস করি। তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহচরগণও এর উপকারিতা সম্পর্কে অবগত বলে আমি বিশ্বাস করি। সুতরাং মতাসীন রাজনৈতিক দল বা জোট এবং রাজনৈতিক অঙ্গনের বিরোধী দল বা জোট এর মধ্যে সংলাপ অনুষ্ঠানে উপকারিতা নিয়ে কারো মনে কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়। বিদ্যমান সমস্যায় উৎকণ্ঠিত এবং আবেগ তাড়িত হয়ে সংলাপ কামনা করা এক জিনিস এবং যুক্তির ওপর নির্ভর করে সংলাপ কামনা করা কিছুটা ভিন্ন জিনিস। আমি সংলাপ অনুষ্ঠানের অনুকূলে তিনটি ইতিহাসনির্ভর যুক্তি উপস্থাপন করছি।’
সংলাপের পে প্রথম যুক্তি। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক রমনা রেসকোর্সে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, সেটি এখন ইতিহাসের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। ওই সংপ্তি ভাষণে তৎকালীন মতাসীনদের উদ্দেশ করে অনেক কিছু বলা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর পে ওই আমলের জনসমর্থন এত প্রবল ছিল যে, তিনি বলতেই পারতেন এমনটা ‘আমাদের আন্দোলনের প্রেেিত তোমরা পাকিস্তানি জেনারেলগণ আমাদেরকে পার্লামেন্টে যাওয়ার রাস্তা করে দিতেই হবে। যতণ পার্লামেন্টের অধিবেশন না ডাকছো ততণ রাজনৈতিক আন্দোলন ও অসহযোগ চলতে থাকবে। তোমাদের সঙ্গে কোনো কথা নেই, পার্লামেন্ট অধিবেশন ডাকো তারপর কথা বলব।’ কিন্তু বঙ্গবন্ধু আন্দোলন সংগ্রামের পাশাপাশি সরকারের সাথে আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত রেখেছিলেন। তিনি প্রতিনিধি দল নিয়ে পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সাথে ঢাকা মহানগরে সংলাপে বসেছিলেন। বঙ্গবন্ধু অবশ্যই ওই আমলে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন এবং আওয়ামী লীগেরও প্রধান ছিলেন। আজ বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা না হলেও একই আওয়ামী লীগের প্রধান। তাই তিনি সংলাপে আসবেন, এটা আমি কামনা করি।
সংলাপের  পক্ষে দ্বিতীয় যুক্তি।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যে গণহত্য পরিচালিত হয়েছিল পাকবাহিনী কর্তৃক, তার জন্য যারা দায়ী ব্যক্তি ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলো তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক জ্যেষ্ঠতম অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান, তৎকালীন পাকিস্তান পিপলস পার্টি নামক রাজনৈতিক দলের চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো। অনেক গবেষক ও সমসাময়িক ভাষ্যকার বলেছেন, জুলফিকার আলী ভুট্টোর একগুঁয়েমির কারণেই, ক্ষমতালিপ্সার কারণেই, সামরিক জান্তা তাদের প্রদত্ত রাজনৈতিক ওয়াদা থেকে সরে এসেছিল। গণহত্যা পরিচালনার জন্য পাকিস্তানের সামরিক পরিকল্পনায় তাদের রাজনৈতিক উৎসাহ, পৃষ্ঠপোষকতা ও সমর্থন দিয়েছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এর দু’দিন পরই জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হয়ে গিয়েছিলেন। যেই ভুট্টোর কারণে লাখ লাখ বাঙালি প্রাণ দিলো, সেই জুলফিকার আলী ভুট্টোকে বঙ্গবন্ধু ঢাকা আসার রাজনৈতিক-কূটনৈতিক কিন্তু রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এবং জুলফিকার আলী ভুট্টো সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করে ঢাকা এসেছিলেন ১৯৭৪ সালে। বঙ্গবন্ধু ভুট্টোকে ঢাকায় স্বাগত জানিয়েছিলেন, কথা বলেছিলেন। ভুট্টো সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে গিয়েছিলেন এবং পুষ্পস্তবক অর্পণ করেছিলেন। আজকের মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ সে সময় বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব ছিলেন, মন্ত্রীর মর্যাদায়। তোফায়েল ভুট্টোর সাথে জাতীয় স্মৃতিসৌধে উপস্থিত ছিলেন। ভুট্টোকে দেয়া লাল গালিচা সংবর্ধনা, জাতীয় স্মৃতিসৌধে আনুষ্ঠানিকতা ও স্মৃতিসৌধে উপস্থিত ভুট্টোকে নিন্দাবাদ ও বঙ্গবন্ধুকে জিন্দাবাদ দেয়া জনগণের আওয়াজ শুনতে হলে বা দেখতে হলে ইউটিউব থেকে একটি ভিডিও দেখতে পারেন। ওই ভিডিওর লিংক ২৩ জানুয়ারি আমার ফেসবুকে স্ট্যাটাসে দেয়া আছে। বঙ্গবন্ধু এটুকু কেন করেছিলেন? সম্ভবত দেশ ও মানুষের জন্য মঙ্গলজনক মনে করে।

সংলাপের পক্ষে তৃতীয় যুক্তি।
১৯৭২ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি নামে একটি গোপন রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ওই দলের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ছিলেন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ও তার আপন ছোট ভাই জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা (যিনি এখন রাঙ্গামাটিতে অবস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান)। ১৯৭৩-৭৪-৭৫ সালে এই দলটি তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের কাছে তাদের কিছু দাবি-দাওয়া উপস্থাপন করেছিল কিন্তু ফল হয়নি। ১৯৭৩ সালে ওই দলটি তাদের গোপন সামরিক বা সশস্ত্র শাখা সৃষ্টি করেছিল; যার নাম ছিল ‘শান্তিবাহিনী’। ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বর থেকে এই শান্তিবাহিনীর মাধ্যমে ওই গোপন রাজনৈতিক দলটি বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে গেরিলাযুদ্ধে লিপ্ত হয়। ওই গেরিলা যুদ্ধ দমন বা মোকাবেলার নিমিত্তে অনেক পদপে গ্রহণ করা হয়েছে। ওই যুদ্ধের মাধ্যমে ‘শান্তিবাহিনী’ হাজার হাজার সাধারণ বাঙালিকে হত্যা করে। অনেক সেনাসদস্য, বিডিআর সদস্য, পুলিশ সদস্য, আনসার-ভিডিপির সদস্যও আক্রান্ত হয়েছেন এবং প্রাণ দিয়েছেন। যুদ্ধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীও অনেক কষ্ট পেয়েছেন, অনেক নিরীহ পাহাড়ি মানুষ মারা গেছেন এবং অনেক শান্তিবাহিনীর সদস্য মারা গেছেন। এতদসত্ত্বেও এরশাদ সরকার (১৯৮২-৯০) এবং বিএনপি সরকারের (১৯৯১-৯৬) প্রতিনিধিগণ, শান্তিবাহিনীর সাথে অনানুষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বা সংলাপে মিলিত হয়েছেন। আমি নিজেও একাধিকবার সরকারি প্রতিনিধি দলের প্রধান হিসেবে ওই সংলাপে অংশগ্রহণ করেছি। ওই সংলাপের ফলেই ১৯৮৮-৮৯ সালে শান্তি স্থাপনের প্রথম পর্যায় সমাপ্ত হয়েছিল। এরপর ১৯৯৬ সালের জুন মাসে আওয়ামী লীগ মতায় এসেছিল। তৎকালীন শান্তি বাহিনী তাৎণিকভাবেই আওয়ামী লীগের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং বলে যে, ‘আমাদের সঙ্গে সংলাপে আসুন।’ ১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগ সরকার প্রতিক্রিয়া দেখাতে বা প্রকাশ করতে দেরি করছিল। ওই দেরি করার প্রোপটে ১৯৯৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর শান্তিবাহিনী ২৬ জন বাঙালি কাঠুরিয়াকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল রাঙ্গামাটির উত্তরে গহিন জঙ্গলে। এর পর পরই তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার প্রতিক্রিয়ায় বলে, সংলাপ হবে। ওই সংলাপের শেষপর্যায়ে ২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে সরকার ও শান্তিবাহিনীর সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। এখন আমার উপস্থাপনা : ইয়াহিয়া খান, ভুট্টো অথবা শান্তিবাহিনীর সাথে যদি সংলাপ করা যায়, তাহলে কেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের অর্ধেকের নেতা বা নিয়ন্ত্রক বিএনপির সাথে সংলাপ করা যাবে না? সবচেয়ে বড় যুক্তি, সংলাপ থেকে উন্নততর অন্য কোনো মাধ্যম আমার চোখে পড়ছে না। তাই সংলাপই সমস্যা সমাধানের পথিকৃৎ।

ডিজিটাল যুগের আন্দোলন
প্রবাদবাক্য ধার করে বলতে চাই, ‘এখন সেই রামও নেই, সেই অযোধ্যাও নেই।’ অর্থাৎ উদাহরণস্বরূপ আমরা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের যুগে নেই, আমরা ১৯৬৯ সালের গণ-আন্দোলনের যুগেও নেই, আমরা বিগত আশির দশকের এরশাদবিরোধী আন্দোলনের যুগেও নেই। এমনকি আমরা ২০০৬ সালের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহের লগি-বৈঠার আক্রমণের দিনগুলোতেও নেই। ইতিহাস ও ভৌগোলিক স্থান মিলালে, আমরা ১৯৮৬ সালের ফেব্র“য়ারি মাসের ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় বাস করছি না যেখানে আন্দোলনের মুখে একনায়ক বা স্বৈরশাসক ফারদিনান্দ মার্কোস দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন সপরিবারে। আমরা ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর মাসের ঢাকা মহানগরেও বাস করছি না, যেখানে (এরশাদ সাহেবের ভাষায়) সামরিক বাহিনীর সমর্থন হারিয়ে প্রেসিডেন্ট এরশাদ পদত্যাগ করেছিলেন। বরং আমরা ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে আছি। একই শ্রোতামণ্ডলীর কাছে, যেকোনো একজন বক্তা, একই জোক বা একই কৌতুক যেমন দ্বিতীয়বার বা তৃতীয়বার বললে শ্রোতৃমণ্ডলী হাসবে না; তেমনি রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্য পদপেগুলোও অভিনব না হলে বা সময়োপযোগী না হলে, ফল দিলেও… গুরুত্বপূর্ণ ফল দেবে না। ঘোষিতভাবেই এখন ‘ডিজিটাল’ যুগ। অতএব সরকারকে রাজনৈতিক দাবি মানায় বাধ্য করার জন্য ডিজিটাল আন্দোলন প্রয়োজন!! ডিজিটাল আন্দোলন কত প্রকার ও কী কী, সেটা কোনো ডিকশনারি বা পাঠ্যবইয়ে নেই। তাই যারা রাজনৈতিকভাবে অভিজ্ঞ, মেধাবী, পরিশ্রমী, আগ্রহী তাদেরই এর রূপরেখা স্থাপন করতে হবে।

আন্দোলনের উপাত্তগুলো
ইংরেজি ‘ইনপুট’ শব্দের বাংলা অনুবাদ : উপাত্ত, অথবা ইংরেজি শব্দÑ জোড়া ‘কন্ট্রিবিউটিং ফ্যাক্টর’-এর বাংলা অনুবাদ : অবদানকারী উপাত্ত, এই কথা ধরে নিয়েই এই অনুচ্ছেদ লিখছি। আন্দোলন পরিচালনা করেণ রাজনৈতিক দলগুলো জনগণকে সাথে নিয়ে। এরূপ আন্দোলনে রাজনৈতিক দলগুলো বা রাজনৈতিক নেতারা বা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকেরা (১) কেউ শ্রম দেবেন (২) কেউ মেধা দেবেন (৩) কেউ সময় দেবেন, (৪) কেউ অর্থ দেবেন এবং (৫) কেউ লোকবল দেবেন। প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল বা প্রত্যেক রাজনৈতিক নেতা এই পাঁচটি উপাদানই সরবরাহ করতে পারবে না। কোনো কোনো উপাদান একদমই পারবে না। আমরা যারা তারুণ্য পার করে ফেলেছি, অথবা আমরা যারা ছোট রাজনৈতিক দলের কর্মী, আমাদের জন্য পাঁচটা উপাত্তই দেয়া সম্ভব নয়। একটি বা একাধিক উপাত্ত দেয়া সম্ভব এবং তাই দিচ্ছি। দিচ্ছি বলতে আমি বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির প থেকে বা আমাদেরই মতো সমমনা প্রায় একই প্রকারের সাংগঠনিক অবস্থানের দলগুলোর কথা বলছি। একটি উপাত্ত বা উপাদানের কথা বলব, যেটি চোখে দেখা যায় এমনভাবে সরবরাহ করা যায় না। সেই উপাদানটির নাম মনোবল বা মানসিক শক্তি। রাজনৈতিক আন্দোলনের কর্মীদের মনোবল উঁচু রাখার জন্য বিভিন্ন পদপে নিতে হয়। একটি পদপে হলো আন্দোলনের জন্য আর্থিক খরচ সামলানো, আরেকটি পদপে হলো আন্দোলনে তিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা প্রদান এবং অন্য আরেকটি পদপে হলো কর্মীদের সাথে যোগাযোগ। আমরা এই উপাদানটিতেও ভূমিকা রাখছি।

বর্তমান আন্দোলনের লক্ষ্য বস্তু
বর্তমান আন্দোলনের লক্ষ্য হচ্ছে সরকারকে জনগণের দাবি মানতে বাধ্য করা। দাবির সারমর্ম : জনমনে শান্তি, জনপদে শান্তি, জনগণের ভোটের অধিকার ফেরত পাওয়া। সংবিধানে বলা আছে, ‘জনগণই সকল মতার উৎস’ কিন্তু ২০১১ সালে পার্লামেন্ট কর্তৃক পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে জনগণের মতা খর্ব করা হয়েছে। জনগণের এই মতা পুনরুদ্ধার করা প্রয়োজন। তাই জনগণকে সম্পৃক্ত করে, জনগণের মনে ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে আস্থা সৃষ্টি করে, জনগণের মনোবল চাঙ্গা রেখে, জনগণের কষ্টের মাত্রা ন্যূনতমপর্যায়ে রেখে, রাজনৈতিক কর্মীদের কষ্টকেই সর্বোচ্চমাত্রায় স্থাপন করে… এই আন্দোলন করতে হবে। আন্দোলন ওই দিকেই এগোচ্ছে। আন্দোলনের বিরুদ্ধে বা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক প্রতিরোধ আসবে, তবুও আন্দোলন যেন শান্তিপূর্ণ হয় সেই চেষ্টা থাকবে।

আন্দোলনের পক্ষে-বিপক্ষে বর্ণনা
বিশদলীয় জোট কর্তৃক সূচনা করা আন্দোলনের একটি সুনির্দিষ্টপর্যায়ে এখন আমরা আছি। আন্দোলনে একটি প হচ্ছে ২০ দলীয় জোটের নেতৃত্বে জনগণ। প্রতিপ হচ্ছে সরকার এবং সরকারি রাজনৈতিক দল ও তাদের সমর্থকেরা। ২০ দলীয় জোটের সাথে আছে নিরস্ত্র কর্মী ও জনগণ। সরকারের সাথে আছে তিন প্রকারের আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনী যথা, বিজিবি, পুলিশ, আনসার-ভিডিপি। সরকারের সাথে আছে শক্তিশালী প্রতিবেশী দেশ ভারতের কিছু রাজনৈতিক অংশ ও কিছু গোয়েন্দা অংশ। সরকারের সাথে আছে, খুশিতে বা অখুশিতে, আমলাতন্ত্র। ২০ দলীয় জোটের দু’টি প্রধান শরিক হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। বাকি ১৮টি দলের মধ্যে দু’টি বা তিনটিকে মাঝারি সাইজের দল বা মধ্যমপর্যায়ের শরিক বলা যাবে। বাকিগুলো ছোট বা ক্ষুদ্র শরিক দল। বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি ক্ষুদ্র শরিকদের একটি। ছোট বা ক্ষুদ্র শরিক দলগুলো আন্দোলনে উচ্চমাত্রার দৃশ্যমান অবদান রাখতে পারে না। ওপরের অনুচ্ছেদে যেরূপ পাঁচটি উপাত্তের কথা উল্লেখ করেছি, সেই উপাত্তগুলোর মধ্যে একটি বা দু’টি বা তিনটি উপাত্ত দেয়া সম্ভব। ছোট শরিক বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি ওইটুকু চেষ্টা করছে। ২০ দলীয় জোটের আন্দোলনের ভেতরে যেমন শরিকদের প থেকে অবদান থাকে, তেমনি প্রত্যেকটি দলের ভেতরেও এরূপ উপাদান লাগে। ভবিষ্যতে একদিন এ প্রসঙ্গে আলোচনা করব।

শেষ দু’টি বক্তব্য
সংলাপের ফলাফল নিয়ে অনেক জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি সন্দিহান। ২৩ জানুয়ারি আমার ফেসবুকে উপস্থাপিত বক্তব্যের পরিপ্রেেিত তারা বলেন, সরকার সংলাপে সম্ভবত আসবে না অথবা এলেও অবহেলাপূর্ণ মানসিকতা নিয়ে আসবে। তারা সংেেপ কারণগুলোও ব্যাখ্যা করেন। অন্যতম কারণ হচ্ছে সরকারপ বিরোধীপকে অবমূল্যায়ন করেই যাচ্ছে। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে সরকার মনে করে যে, সংলাপ সফল হওয়া মানে তাদের মতায় থাকার পরিকল্পনায় আঘাত। তৃতীয় কারণ হচ্ছে সরকার এবং বিরোধী শিবিরের মধ্যে এত বেশি তিক্ততার সৃষ্টি হয়েছে তিলে তিলে ও ক্রমে ক্রমে যে, এরূপ তিক্ত পরিস্থিতিতে ‘চিনির শরবত’ আশা করা বাতুলতা। এত কিছুর পরও, আমার মতে সংলাপ কাম্য।
আজ মরহুম আরাফাত রহমান কোকোর রূহের মাগফিরাত কামনা করে কলাম শেষ করছি। শহীদ জিয়ার পরিবারের শোক, বাংলাদেশের জনগণের বৃহদংশের শোক। প্রার্থনা : এই শোক যেন শক্তিতে পরিণত হয়, যে শক্তি জনগণের কল্যাণের জন্য গণতান্ত্রিক পথে ব্যবহৃত হবে।

1527 জন পড়েছেন

Comments are closed.