জার্মানির ২৫ হাজার মুসলিম বিদ্বেষীর বিরুদ্ধে এক কিশোরের ব্যতিক্রমী প্রতিবাদ 

2632 জন পড়েছেন

জার্মানির ২৫ হাজার মুসলিম বিদ্বেষীর বিরুদ্ধে এক কিশোরের ব্যতিক্রমী প্রতিবাদ <br /><br /><br /><br /><br />

বার্লিন, ২২ জানুয়ারি- গত মাসে, এমনকি সপ্তাহখানেক আগেও জার্মানিতে ব্যাপকভাবে ইসলামীকরণের (ইসলামাইজেশন) প্রতিবাদে দেশটির ড্রেসডেন শহরে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ র‌্যালি ও বিক্ষোভ প্রকাশ করে। এই র‌্যালি থেকে জার্মানিতে অতিরিক্ত অভিবাসনের প্রতিবাদ করা হয়। ২৫ হাজার জার্মানবাসীর এই র‌্যালীর এক ব্যাতিক্রমী প্রতিবাদ জানিয়েছেন এক মুসলিম তরুন। বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ্যে খোলা চিঠি লিখেছেন তিনি। পাঠকদের জন্য চিঠিটির অনুবাদ করা হল-

 

ড্রেসডেনের প্রিয় বিক্ষোভকারীরা,

আমি শুনলাম গত সপ্তাহে এবং গত মাসে আপনারা আমার ধর্ম এবং এর অনুসারীদের বিরুদ্ধে র‌্যালী করেছেন। আপনারা অভিবাসন এবং বিদেশীদের বিরুদ্ধেও র‌্যালী করেছেন। আমি আপনাদের ধর্মান্ধ বলবো না, আপনাদের অবজ্ঞাও করবো না, কিন্তু তারপরও আপনাদের এই র‌্যালীর বিরুদ্ধে আমার কিছু কথা আছে।

আপনারা এমন সব ব্যানার নিয়ে র‌্যালী করেছেন, যেগুলোতে লেখা ছিলো ড্রেসডেন শহরটি মুসলমানে ভর্তি হয়ে গেছে। কিন্তু ড্রেসডেনের মোট জনসংখ্যার মাত্র ০.১% মুসলিম। আপনারা আরও দাবী করেছেন, অভিবাসীর সন্তানদের কারনে আপনারা আপনাদের সন্তানদেরকে ঠিকমত স্কুলে ভর্তি করাতে পারছেন না। সন্তানদের পড়াশোনার জন্য অাপনাদের অনেক দূরে অন্য শহরে যেতে হয়। কিন্তু আপনারা জানেন, ড্রেসডেনের মাত্র ২.৫% হচ্ছে বিদেশি বংশোদ্ভুত?

র‌্যালি থেকে আরো দাবি করা হয়েছে, মুসলমানরা জার্মানিতে উপদ্রবে পরিণত হয়েছে। কিন্তু আসল সত্যটা হচ্ছে জার্মানীর মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ মুসলমান।

বলা হয়েছে, ইউরোপের দেশগুলোতে ব্যাপকভাবে ইসলামীকরণ করা হচ্ছে। কিন্তু গত শতাব্দিতে পর পর দুটি বিশ্বযুদ্ধ হয়েছে, ব্যাপকভাবে ঔপনিবেশিকতার অবসান হয়েছে, সমাজে অসংখ্যবার কোন্দলের ঘটনা ঘটেছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সশস্ত্র হস্তক্ষেপ হয়েছে, ব্যাপক মাত্রায় বিশ্বায়ন হয়েছ। অথচ এতোকিছুর পরও এখনো ইউরোপে মুসলমানরা খুবই সংখ্যালঘু। সমগ্র ইউরোপের মাত্র ৬ শতাংশ জনগন মুসলিম।

জার্মানবাসীর দাবি অনুযায়ী, প্রচুর সংখ্যক শরনার্থী জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করছে। কিন্তু জাতিসংঘ শরনার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৫২ কোটি শরনার্থী আছে। এর মাত্র ০.০১% জার্মানিতে আশ্রয় প্রার্থনা করেছে। এটা কি খুব বেশি? অথচ লেবাননের দিকে তাকান, সেখানে প্রতি চারজন মানুষের মধ্যে একজন সিরিয়ান শরনার্থী।

আচ্ছা, সমাজে কি তাহলে একটা বিভেদ বৈষম্য আছে? ব্যাপারটা একটু খোলাসা করা উচিত। আসলে, আপনারা মুসলমানদের এমন সব সমস্যার কথা সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে চান, আদতে সেসব সমস্যার কোনো অস্তিত্বই নেই। তাহলে মুসলমানদের প্রতি যেটা হচ্ছে, সেটা কি? এটা কি মুসলমানদের প্রতি আগে থেকেই পুষে রাখা খারাপ ধারণা? আগন্তুকের প্রতি ভয়? নাকি মিডিয়ার ভুল তথ্য?

দেখুন, লন্ডনে মোট জনসংখ্যার ৩৬.২ শতাংশ বিদেশি, যা ড্রেসডেনের বিদেশি জনসংখ্যার প্রায় ১৫ গুণ। এখানে বিভিন্ন ধর্ম, গোত্র ও বর্ণের মানুষ পাশাপাশি কাজ করে। এই আজকেও আমার সাথে এক নাস্তিকের কথা হয়েছে। কিন্ত আমি তো তাকে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করিনি। তার শিরশ্ছেদও করতে চাইনি। বরং তাকে বাস থেকে নামতে সাহায্য করেছি। ভদ্রলোকের বয়স ৭৪ বছর।

ইসলাম সম্পর্কে আপনার যাবতীয় জ্ঞান আপনার লিভিং রুমের ওই বাক্সকেন্দ্রিক। সেটার একতরফা ও অসংলগ্ন তথ্যের ভিত্তিতে আপনি ইসলাম সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন। শুধু আপনি কেন, আপনার মত যে কেউই একই কাজ করে থাকে।

আপনারা ইসলাম সম্পর্কে প্রচারের ক্ষেত্রে অনেক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করেন। আপনার প্রচার করেন, মুসলমানরা বর্বর, তারা নারীদের সম্মান দিতে জানে না, নিজেদের ধর্মবিশ্বাস তারা অন্যের উপর জোর করে চাপিয়ে দেয়। কিন্তু আপনারা এটা জানেন না যে, তুর্কি, ইন্দোনেশিয়া ও বাংলাদেশের মত মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোতে প্রচুরসংখ্যক মানুষ নারী নেতৃত্ব নির্বাচিত করেছে, যেটা উন্নত বিশ্বের প্রায় কোনো দেশেই নেই। তাহলে মুসলমানরা নারীর মূল্যায়ন করে না, আপনাদের এই কথাটা কতটুকু সত্য? এমনকি পবিত্র কোরআনেও ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করার কথা নিষেধ করা হয়েছে। ইসলামের শেষ নবী মুহাম্মদও (সা:) তাঁর উম্মতদের বলেছেন, যারা অমুসলিমদের মনে কষ্ট দেবে তারা কখনোই স্বর্গের (বেহেশত) স্বাদ পাবে না।

আপনারা কি জানেন, এই যে আপনার ইসলামের ভুল উপস্থাপণ এবং ভুল ব্যাখ্যা করেন, এতে সন্ত্রাসীরা উৎসাহিত হয়?

মুসলিম বলতে আসলে আপনারা কি বোঝেন? শুধু আরব? পৃথিবীর মোট মুসলমানের মাত্র ২০ শতাংশ আরব। ভারত ও পাকিস্তানে আছে আরো ২০ শতাংশ মুসলমান। তুর্কিতে আছে আরো ধরুন ৫ শতাংশ। কিন্তু বাকীরা? বাকী প্রায় ৫৫ শতাংশ মুসলমান কিভাবে তাদের পরিচয় দেবে?

এখন জার্মানদের ক্ষেত্রে কি হলো? তারা যেভাবে ইসলাম, মুসলমানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করল, সেটাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? বর্ণবাদ এবং নিজ দেশের মানুষের প্রতি অবজ্ঞা, এই দুটোর পার্থক্য করা সত্যিই মুশকিলের কাজ। আমি এই দুটির কোনোটিই জার্মানদের বলতে চাই না। আমি, শুধু বলতে চাই সঠিক জিনিসটা জানুন, শিক্ষিত হোন, সহ্যক্ষমতা বাড়ান এবং দয়ালু হোন।

সুত্র: হাফিংটন পোস্টে নিবন্ধটি এখানে দেখুন 

সৌজন্যে : দেশে বিদেশে

2632 জন পড়েছেন

উড়ন্ত পাখি

About উড়ন্ত পাখি

আমি কোন লেখক বা সাংবাদিক নই। অর্ন্তজালে ঘুরে বেড়াই আর যখন যা ভাল লাগে তা সবার সাথে শেয়ার করতে চাই।

Comments are closed.