একটি শান্তিপূর্ণ স্থায়ী সমাধান চাই

1879 জন পড়েছেন

আমাদের দেশে আচার-অনুষ্ঠানের জন্য শীতকালকেই মানুষ বেছে নেয়। অন্য ঋতুগুলোতে অধিক গরম, ঝড়, বৃষ্টি, বন্যা, খরা, সেই সঙ্গে কর্মব্যস্ততা এবং বাচ্চাদের পড়াশোনা ইত্যাদি কারণে অনুষ্ঠানের জন্য শীতকাল বা শুষ্ক মৌসুমই মানুষের কাছে অধিক পছন্দের। অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে বিয়ে, জন্মদিন, ওয়াজ মাহফিল, বিভিন্ন দরবার শরিফে ওরস, ধর্মীয় সম্মেলন, মেলা, খেলাধুলার বিভিন্ন টুর্নামেন্ট, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, পুনর্মিলনী ইত্যাদি। যে কথাটি না বললেই নয় সেটি হচ্ছে, এ শুষ্ক মৌসুমে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও কর্মতৎপরতা ভিন্নমাত্রা পায়। লাগাতার আন্দোলন, মিছিল, সমাবেশ, হরতাল, অবরোধ ইত্যাদি রাজনৈতিক কর্মসূচির উৎকৃষ্ট মৌসুম হল শীতকাল।
ডিসেম্বর ২০১৪ থেকে জানুয়ারি ২০১৫ সময়টিতে উপরে যা বললাম এর প্রায় সবকিছুই হচ্ছে বা হতে যাচ্ছে। তার সঙ্গে অবশ্যম্ভাবীভাবেই যোগ হচ্ছে একটি রাজনৈতিক উৎকণ্ঠা। জানুয়ারির ৫ তারিখের আগ পর্যন্ত মাঠে-ময়দানে রাজনৈতিক গরম আন্দোলন শুরু হয়নি। সামনে কী হয় বলা মুশকিল। চারদিকে একটা গুমট ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। গভীর উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তা নিয়ে মানুষ অপেক্ষা করছে আগামী দিনগুলোর জন্য। গত এক-দুই মাস ধরে যত ধরনের অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছিলাম, সবখানে সবার মনে কিছু প্রশ্ন বারবার উঁকি দিচ্ছে। প্রশ্নগুলো হচ্ছে- ‘কী হতে যাচ্ছে?’, ‘কী হবে?’, ‘বিরোধী দল পারবে তো?’, ‘সরকার কি কোনো ছাড় দেবে?’ সরকারি শিবিরের কেউ কেউ বলছেন, সরকারও তো কিছু ভালো কাজ করছে, সরকারের প্রতি যথেষ্ট জনসমর্থন রয়েছে। অনেকে বলছেন, সরকার যেখানে আমেরিকাকেই কেয়ার করে না, সেখানে বিএনপিকে কেয়ার করার প্রশ্নই আসে না। আবার অনেকে বলছেন, ওস্তাদের মার শেষ রাতে। বিরোধী দল আর বসে থাকবে না- দেখিয়ে দেবে, ইত্যাদি।
বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় নির্বাচন কমিশন গঠিত। সাংবিধানিক সংস্থা হিসেবে নির্বাচন কমিশন কীভাবে চলবে তার জন্যও বিধান রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে দেশে স্থানীয় সরকার ও জাতীয় পর্যায়ের সব নির্বাচন পরিচালনা করা। নির্বাচন পরিচালনা এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য যে নিয়ম-কানুন আছে, সেগুলোর মধ্যে প্রথম উল্লেখযোগ্য আইন হচ্ছেÑ ১৯৭২ সালে জারি করা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা ইংরেজি পরিভাষায় রিপ্রেজেনটেশন অব পিপলস অর্ডার ১৯৭২, যাকে সংক্ষেপে আরপিও বলা হয়। আরপিওতে মাঝে মধ্যেই সংযোজন-বিয়োজন হয়েছে। সব ধরনের নিয়ম-কানুন মোতাবেক যে কোনো একটি নির্বাচনী আসনে এক বা একাধিক ব্যক্তি প্রার্থী হতে পারেন। ২০০৭ সালের আগ পর্যন্ত যে বিধানটি ছিল, সেই মোতাবেক যদি কোনো একটি আসনে মাত্র একজন প্রার্থী হতেন অথবা শুরুতে অনেক প্রার্থী হলেও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর বা প্রার্থিতা বাতিলের পর যদি মাত্র একজন টিকে যেতেন, তাহলে ওই একমাত্র প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, নির্বাচনের আগেই, বিজয়ী ঘোষিত হতেন। এ আসনে কোনো ভোটাভুটির প্রশ্ন আসত না। এ পদ্ধতিটি গণতন্ত্রের মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিধায় ২০০৭ সালে নির্বাচন কমিশন একটি বিধান চালু করে। সেটি ছিল ‘না’ ভোটের বিধান। পৃথিবীর অনেক দেশেই ‘না’ ভোটের বিধান রয়েছে, আবার অনেক দেশে নেই। আমাদের দেশে ‘না’ ভোটের প্রয়োজন কেন? নিচে তার
ব্যাখ্যা করছি।
বক্সিং একটি জনপ্রিয় খেলা। আমি ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের ছাত্র হিসেবে সবার সঙ্গে দীর্ঘদিন বক্সিং খেলেছি। খেলায় কোনোবার হেরেছি, কখনও জয়ী হয়েছি। কলেজে প্রাথমিক বক্সিং শেখানোর জন্য প্রশিক্ষক বা ওস্তাদ ছিলেন। তারা কৌশল শেখাতেন; কিন্তু প্র্যাকটিস বা অনুশীলনের জন্য একাধিক ব্যবস্থা অবলম্বন করা হতো। আমাদের কিশোরকালে বক্সিং অনুশীলনের জন্য ছিল শ্যাডো বক্সিং সিস্টেম। এক্ষেত্রে বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি লম্বা আকৃতির বালিশের মতো একটি বস্তু ঝুলিয়ে দেয়া হয়, বক্সাররা সেই বালিশকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে ওখানে বক্সিংয়ের বিশেষ ঘুষি মারার ও আক্রমণ করার অনুশীলন করেন। আবার বন্ধুসুলভ কোনো বক্সার অথবা অনেক সময় কোচও প্রতিপক্ষ সেজে বক্সিং অনুশীলনের সুযোগ করে দেন। বড় বা লম্বালম্বিভাবে স্থাপিত আয়নার সামনে দাঁড়িয়েও প্র্যাকটিস করতাম। সামনে একজন প্রতিপক্ষ আছে মনে করে শূন্যে বা হাওয়ায় আমরা আক্রমণ পরিচালনা করতাম। এর মাধ্যমে নিজেদের ভুলত্রুটিগুলো উঠে আসত।
রাজনৈতিক নির্বাচনে কোনো একটি আসনে একাধিক ব্যক্তি প্রার্থী হলে প্রার্থীরা প্রতিপক্ষকে যুক্তিতর্ক ও কৌশলের মাধ্যমে হারানোর চেষ্টা করেন। একাধিক প্রার্থীর যুক্তিতর্ক ও কৌশল পর্যালোচনা করে এবং প্রার্থীর মৌলিকত্ব মূল্যায়ন করে ভোটাররা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিন্তু যদি প্রার্থী মাত্র একজন হয়, তখন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় না। একমাত্র প্রার্থী কোনো যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না অথবা সুযোগও পান না। অতএব ভোটাররাও তাকে মূল্যায়নের সুযোগ পান না। ওই আসনে অন্য কোনো প্রার্থী নেই- এর মানে এই নয় যে, তিনি সবার পছন্দের প্রার্থী। এরূপ প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন ২০০৭-০৮ সালে ‘না’ ভোটের বিধান চালু করেছিল। ‘না’ ভোটের বিধান থাকলে একজন প্রার্থী তার নিজের দুর্বলতাগুলোর বিরুদ্ধে এবং সবলতাগুলোর অনুকূলে রাজনৈতিক যুদ্ধ করতে বাধ্য। কোনো আসনে একাধিক প্রার্থী থাকলে সেই একাধিক প্রার্থীর প্রত্যেকের মার্কা থাকে। ভোটাররা যে প্রার্থীকে পছন্দ করবেন, তার মার্কায় ভোট দিয়ে থাকেন। কিন্তু যদি একাধিক প্রার্থী না থাকে তাহলে তো মার্কারও প্রয়োজন নেই, ব্যালট পেপারেরও প্রয়োজন নেই। ওই আসনে যে প্রার্থী রয়েছেন, তিনি এমনিতেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে যান। কিন্তু এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, জনগণ যদি ওই প্রার্থীকে পছন্দ না করে, তাহলে তা প্রকাশ করার অধিকার তো জনগণ পাচ্ছে না। সুতরাং ভোটারদের অনিচ্ছা থাকলেও ওই প্রার্থী নির্বাচিত হয়ে যাচ্ছেন। এটা ভোটারদের অধিকার হরণেরই নামান্তর। এরূপ প্রেক্ষাপটেই ২০০৭ সালের নির্বাচন কমিশন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন করে সেখানে ‘না’ ভোটের বিধান চালু করেছিল।
তিন-সাড়ে তিন বছর আগে যখন সুপ্রিমকোর্টের রায়ের দোহাই দিয়ে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করা হচ্ছিল, ঠিক তখনই (বা তার অল্প আগে-পরে) নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে ‘না’ ভোটের বিধানটি বাতিল করে দেয়া হয়। সংবিধান পরিবর্তনের ডামাডোলে ‘না’ ভোটের বিধান বাতিলের খবরটি চাপা পড়ে যায়। বিষয়টি জনগণের কাছে অজানাই রয়ে যায়, যে কারণে এর বিরুদ্ধে কোনো জোরালো প্রতিবাদ হয়নি। ‘না’ ভোটের বিধান চালু হওয়ার পর সংসদ নির্বাচনে মাত্র একবারই এটি প্রয়োগ করা হয়েছিল। ফলে জনগণ ‘না’ ভোটের সঙ্গে তেমন একটা পরিচিত হতে পারেনি। ফলে ‘না’ ভোটের বিধান বাতিলের বিষয়টি জনগণের মাঝে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।
এবার আলোচনাকে একটু পেছনে নিয়ে যাই। ইংরেজি পরিভাষায় অ্যাডাল্ট ফ্রেঞ্চাইজ বা বাংলায় সার্বজনীন ভোটাধিকার বলতে এখন আমরা যত উদ্দীপনামূলক, উত্তেজনামূলক কর্মকাণ্ড বুঝি, ১৯৩৭ সালে কি তেমনটি ছিল? সম্মানিত পাঠক, ১৯৩৭ সাল অর্থাৎ এখন থেকে ৭৭ বছর আগে ভারত ছিল ইংল্যান্ডের উপনিবেশ। ইংল্যান্ডের রানীর প্রতিনিধি হিসেবে একজন ব্যক্তি, যাকে ভাইসরয় বলা হতো, তিনি ভারত শাসন করতেন। ভাইসরয়কে সাহায্য করার জন্য বিভিন্ন বন্দোবস্ত ছিল; কিন্তু সাংবিধানিকভাবে শাসনের দায়িত্ব অর্পিত ছিল তার ওপর। একটু একটু করে স্বাধীনতার দিকে হাঁটছিল তখনকার ভারতবর্ষ। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত ‘সংসদ’ চালু হয়েছিল রাজধানী দিল্লিতে এবং তখনকার প্রদেশগুলোর রাজধানীতে। আমি সংসদ শব্দটি ব্যবহার করলেও আসলে তখন সংসদ বলা হতো না, একে অন্য নামে অভিহিত করা হতো। যা হোক, প্রাদেশিক রাজধানীর সংখ্যা বেড়েছে, সংসদগুলোর আকৃতি বেড়েছে, নির্বাচনে মনোনয়নের প্রক্রিয়া বদলেছে, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগ হয়েছে। প্রাদেশিক পরিষদে ১৯৫৪ সালে নির্বাচন হয় এবং ১৯৯১-এর ফেব্র“য়ারিতেও নির্বাচন হয়- এসব কিছুর মাঝে গুণগত ও পরিসংখ্যানগত যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ১৯৩৭ সালে সাধারণ মানুষের মধ্যে নির্বাচন, ভোটাধিকার ইত্যাদি বিষয়ে যতটুকু ধারণা ছিল, সে তুলনায় এখন এসব বিষয়ে ধারণা-জ্ঞান বহুগুণ বেশি। এখন একজন কিশোরও নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত। কোনো একটি বিষয়কে সুপরিচিত, গ্রহণযোগ্য ও অভ্যাসে পরিণত করতে যথেষ্ট সুযোগ দিতে হয়। সেই সুযোগটি না দিয়েই বর্তমান সরকার তাদের কূটকৌশলের অংশ হিসেবে ‘না’ ভোটের বিধান বাতিল করিয়ে দেয়।
আমি সম্মানিত পাঠক ও চিন্তাশীল ব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি এই মর্মে যে, নির্বাচন ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি তত্ত্বের আবরণে সংবিধান অনির্বাচিত ব্যক্তিদের শাসনকে সমর্থন দিচ্ছে। উদাহরণ দিচ্ছি। বাংলাদেশের জনসংখ্যা যদি ১৫ বা ১৬ কোটি হয় এবং ঢাকা মহানগরীর জনসংখ্যা হয় দেড় কোটি, তাহলে মোট জনসংখ্যার ১০ বা ১১ শতাংশ ঢাকায় বসবাস করে। ঢাকা মহানগরীর মানুষের শাসিত হওয়ার কথা নির্বাচিত সিটি কর্পোরেশনের মাধ্যমে। আজ প্রায় তিন বছর ঢাকা মহানগরবাসী অনির্বাচিত প্রশাসক কর্তৃক শাসিত হচ্ছেন। আরেকটি উদাহরণ। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের তিনটি পার্বত্য জেলায় তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদ আছে এবং তিনটির ওপরে রাঙ্গামাটিতে অবস্থিত একটি আঞ্চলিক পরিষদ আছে। আজ ১২ বছরের অধিককাল এই তিনটি পার্বত্য পরিষদ ও একটি আঞ্চলিক পরিষদ অনির্বাচিত ব্যক্তিদের দ্বারা দখল ও কার্যকর করা হচ্ছে। তৃতীয় উদাহরণ। একটু বিস্তারিতভাবে আলোচনা করছি। বাংলাদেশে সংসদ সদস্যের সংখ্যা প্রাথমিকভাবে তিনশ’। এর মধ্যে ১৫৪টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৪ জনকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। যেহেতু জনগণ ভোট দেয়নি, অতএব ব্যাকরণগতভাবে বা রাজনৈতিক প্রক্রিয়াগতভাবে তাদের সঙ্গে নির্বাচিত শব্দটি ব্যবহার করা যাবে না। অতএব তারা দল কর্তৃক মনোনীত। তাদের প্রসঙ্গে ভোটাররা কোনো মতামত জানাতে পারেনি। তিনশ’র অর্ধেকের বেশি হচ্ছে ১৫৪। ৩০০ থেকে ১৫৪ বিয়োগ দিলে বাকি থাকে ১৪৬। এই ১৪৬টি আসনে নির্বাচন না হলেও অথবা নির্বাচন হওয়ার পর সবাই যদি বিরোধী শিবিরের হয়ে যায় তাহলেও ওই ১৫৪ জনের ভোটেই সরকার গঠন করা সম্ভব। অর্থাৎ জনগণ হ্যাঁও বলেননি, নাও বলেননি এমন ১৫৪ ব্যক্তি দেশ শাসন করছেন। এ প্রসঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের বক্তব্য হল, সংবিধানের প্রক্রিয়াতেই নির্বাচন হয়েছে। বাংলাদেশের যে কোনো সচেতন ব্যক্তি বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলে সম্ভবত আমার সঙ্গে একমত হবেন একটি বিষয়ে। তা হল, বাংলাদেশের সংবিধান অনির্বাচিত ব্যক্তিদের দ্বারা সরকার গঠন ও শাসন সমর্থন করে। আমি অন্তত এই মর্মে সংবিধানের সংশোধনী কামনা করি এবং নির্বাচনী বিধিতেও তার ফলাফল কামনা করি।
সংক্ষেপে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করছি। ৪-৫ দিন আগে টিভি সংবাদে হঠাৎ করে চোখে পড়ল আইন কমিশনের প্রেস বিফ্রিং। বর্তমান আইন কমিশনের সভাপতি হচ্ছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। ওই প্রেস ব্রিফিংয়ের সংবাদে টিভির পর্দায় বাংলাদেশের মানুষ দেখেছে, তিনি এবং তার একজন সহকর্মী অধ্যাপক শাহ আলম প্রচণ্ড মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছেন। যার ফলে বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক রাগ করে প্রেস ব্রিফিংয়ের মঞ্চ ত্যাগ করে চলে যান। টেলিভিশন ক্যামেরার বদৌলতে দেশবাসী জনাব খায়রুল হকের সঙ্গে তার সহকর্মীর মতবিরোধ দেখতে পেয়েছেন। তিন-সাড়ে তিন বছর আগে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল সংক্রান্ত রায় প্রদানের সময়, ওই আমলের সহকর্মীদের সঙ্গে তার মতপার্থক্য কতটুকু ছিল বা কতটুকু গভীর ছিল, সেটাও হয়তো কোনো না কোনো একদিন জানা যাবে।
যা হোক, সেই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ধারাবাহিকতা এখনও চলছে। ৭ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপিকে সমাবেশ করতে দেয়া হয়নি। ২৭ ডিসেম্বর গাজীপুরেও সমাবেশ করতে দেয়া হয়নি। এসবই পাঠক জানেন। ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যার পর মিডিয়ার মাধ্যমে জাতির উদ্দেশে খালেদা জিয়ার ভাষণের বিষয়টিও দেশবাসী জানেন। ক্ষমতা বা শক্তি থাকলেই সেটা প্রদর্শন করতে হবে, এটা প্রকৃতির নিয়ম নয়। তাই যদি হতো তাহলে বনে কোনো পশু-পাখি বাঁচতে পারত না। প্রকৃতিতে কোনো গাছপালাও বাঁচতে পারত না। প্রকৃতির সৃষ্টির সেরা জীব মানুষই শুধু এ নিয়মটি মানে না। বনের সর্বোচ্চ শক্তিশালী হাতি ইচ্ছা করলেই সব প্রাণী মেরে ফেলতে পারে। কিন্তু সে মারে না। বনের হিংস্র প্রাণীগুলো ইচ্ছা করলে সব প্রাণীই খেতে পারে। কিন্তু সে খায় না। কিন্তু মানুষ সেটা করতে চায়। সফল হোক বা বিফল হোক, শক্তিশালী কর্তৃক দুর্বলের প্রতি আক্রমণের যে প্রক্রিয়া- তার যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে সেটা একটি সভ্যতা, জনপদ এবং মানবগোষ্ঠীর আশা-আকাক্সক্ষাকে চুরমার করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। বাংলাদেশে ঠিক তাই হয়েছে। এ মুহূর্তে শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের নাম আওয়ামী লীগ। কারণ তারা রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারী। অপর শক্তিটির নাম হচ্ছে ২০ দলীয় জোট। কিন্তু তাদের শক্তি শুধু জনগণের শুভেচ্ছা ও দোয়া। এ দুই শক্তির মধ্যে যে অসমান প্রতিযোগিতা, তা কখনোই দেশ ও জাতির জন্য সুখকর কিছু বয়ে আনবে না। এ প্রতিযোগিতা দেশকে শুধু অরাজক পরিস্থিতির দিকেই নিয়ে যাবে, একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছতে দেবে না। জাতি কখনোই এটি কামনা করে না। আমরা চাই সর্বত্রই একটি ভারসাম্য ফিরে আসুক। আঁধার কেটে আলো ফিরে আসুক। আমরা সেই সুদিনের অপেক্ষায় থাকলাম।

পূর্ব প্রকাশিত শুক্রবার ৯ জানুয়ারি ২০১৫ তারিখ-এর যুগান্তর

1879 জন পড়েছেন

Comments are closed.