বাংলাদেশে বিজেপির হিন্দুত্ব প্রচার অভিযান

3467 জন পড়েছেন

ভারত হিন্দুত্ববাদের যে জোয়ারে ভাসছে সেটা এখন উপচে বাংলাদেশে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এর থেকে বিপজ্জনক ব্যাপার আর কী হতে পারে। এ প্রসঙ্গে দৈনিক ইত্তেফাক ও প্রথম আলোর দুটি রিপোর্ট উল্লেখ করা দরকার।
ইত্তেফাকের রিপোর্ট অনুযায়ী ৩ জানুয়ারি ঢাকার কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে ‘বেদান্ত সংস্কৃতি মঞ্চ’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আয়োজিত ‘পূজা পুনর্মিলনী, বিশ্বজুড়ে বিশ্বময়ী’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সাবেক সভাপতি তথাগত রায় বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারকে সমর্থনের বিষয়টি বিজেপি সরকার উপলব্ধি করেছে। এ দেশের প্রতি বিজেপির পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। তাই এ দেশের হিন্দুদের আওয়ামী লীগ সরকারকে পূর্ণ সমর্থন দেওয়া উচিত।’ বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়কে আরও রাজনৈতিক সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নিজেদের স্বার্থের জন্যই আপনাদের সরকারকে সমর্থন জানাতে হবে।’ অনুষ্ঠানটিতে বিশেষ অতিথি ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তিনি বলেন, ‘বিজেপিকে সাম্প্রদায়িক দল মনে করি না। তারা যে হিন্দুত্ববাদে বিশ্বাস করে বা প্রচার করে, এটা তাদের রাজনৈতিক কৌশল (ইত্তেফাক, ৩.১.২০১৫)। এ ধরনের কথা শুনে চমৎকৃত না হয়ে উপায় নেই। কারণ তাহলে জামায়াতে ইসলামীকেও একটা চরম প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মীয় মৌলবাদী সংগঠন বলা যাবে কীভাবে? তাদের কর্মকা-কে যদি কেউ কৌশল হিসেবে আখ্যায়িত করে, তাহলে সুরঞ্জিত বাবুর মতো লোকদের বলার কী থাকতে পারে? এসব দ্বারা কি এখানে শুধু হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাই নয়, এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী শাসনতন্ত্র ইত্যাদি সংগঠনের ইসলামী রাষ্ট্রের আওয়াজকে জোরদার করে বাংলাদেশকে ধর্মের জোয়ারে ভাসিয়ে দেওয়ার শর্তই তৈরি হয় না?
এরপর হলো দৈনিক প্রথম আলোর রিপোর্ট। এতে বলা হয়, বেদান্ত সংস্কৃতি মঞ্চের অনুষ্ঠানে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য তথাগত রায় বাংলাদেশে বসবাসরত হিন্দুদের একজোট হয়ে আওয়ামী লীগকে সর্বশক্তি দিয়ে প্রকাশ্যে সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানান। তথাগত রায় বলেন, ‘আমি বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে এটা বলতে পারি না। আমরা একটি দেশের সঙ্গে, দেশের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করি। বাংলাদেশের বিষয়টা ভিন্ন। আপনাদের বোঝার জন্য (উপস্থিত শ্রোতাদের উদ্দেশে) বলছি, ভারত সরকার আওয়ামী লীগ সরকারকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে। ভারত সরকার উপলব্ধি করেছে, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার চেয়ে ভালো কোনো সরকার হতে পারে না। এখানকার হিন্দুদের জন্য এর চেয়ে ভালো কোনো সরকার হতে পারে না। এখানকার হিন্দুদের জন্য এর চেয়ে ভালো সরকার কি হতে পারে? তথাগত রায় বলেন, আমরা এটা মনে করি। আপনারা কি মনে করেন? এ দেশের হিন্দুদের নিরাপত্তার জন্য আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো সরকারের ওপর ভরসা করা যায়? ভাবুন, যদি অন্যদের ওপর ভরসা করা না যায়, তাহলে পুরো সমর্থন আওয়ামী লীগকে দিন। প্রকাশ্যে সমর্থন না দিলে আওয়ামী লীগ আপনাদের ব্যাপারে পুরোপুরি বুঝতে পারবে না’ (প্রথম আলো, ৪.১.২০১৫)। এই রিপোর্ট অনুযায়ী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, তিনি বিজেপিকে সাম্প্রদায়িক মনে করেন না। তারা কৌশলগত কারণেই হিন্দুত্বের কথা বলছে।
তথাগত রায় তার উপরোক্ত বক্তব্যে বাংলাদেশে বসবাসরত হিন্দুদের একজোট হয়ে আওয়ামী লীগকে সর্বশক্তি দিয়ে প্রকাশ্যে সমর্থন জানানোর কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘আমি বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে এটা বলতে পারি না। আমরা একটি দেশের সঙ্গে দেশের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করি। বাংলাদেশের বিষয়টা ভিন্ন।’ কেন ভিন্ন? ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছে, এই যুক্তিতে বাংলাদেশকে কি তারা নিজেদের উপনিবেশ বা মক্কেল রাষ্ট্র মনে করেন? তা না হলে যেখানে তারা অন্য কোনো দেশের সঙ্গে, দেশের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করার কথা বলেন, সেখানে বাংলাদেশ বা বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে সম্পর্কের কথা না বলে আওয়ামী লীগকে প্রকাশ্যে সমর্থন, এমনকি একজোট হয়ে সমর্থন করার কথা কীভাবে বলেন? একজোট হয়ে এ কাজ করার জন্য তো এক পার্টিতে সংগঠিত হওয়া ছাড়া উপায় নেই। তাহলে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা কি বাংলাদেশে এখন হিন্দুদের একটি স্বতন্ত্র দল গঠনের জন্য প্ররোচিত করছেন না? সুরঞ্জিত বাবু তথাগত রায়ের এই বক্তব্য এবং প্ররোচনাকে সাম্প্রদায়িক মনে না করলে তার নিজের অবস্থা কী দাঁড়ায়? এসব কর্মকা- কি ভারতের হিন্দুত্বের জোয়ার বাংলাদেশে উপচেপড়ার মতো ব্যাপার নয়? এভাবে হিন্দুত্বের জোয়ার বাংলাদেশে আমদানি করার জন্য এক ধরনের সাম্প্রদায়িক ও জনবিরোধী লোকজন যেভাবে এখন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী মাঠে নেমেছে এবং সরকারি নেতারা যেভাবে তাকে স্বাগত ও সমর্থন জানাচ্ছে, তার মধ্যে যে বড় রকমের সাম্প্রদায়িক বিপদসংকেত আছে, এটা কি কেউ অস্বীকার করতে পারে?
সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে খোলাখুলি ও জোরদার আন্দোলনের ফলে বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলমানসহ সব মানুষ ভারতের হিন্দু-মুসলমানের থেকে অনেক বেশি অসাম্প্রদায়িক। বর্তমান সরকারের আমলে এবং তার আগেও আওয়ামী লীগের মধ্যে হিন্দুদের একটা বড় অবস্থান ছিল। বরাবরই সেটা থেকেছে বলা চলে। কিন্তু তারা আওয়ামী লীগের মধ্য থেকে হিন্দুত্ব প্রচার করেননি। এখন সুরঞ্জিত বাবুর মতো লোকদের উৎসাহ ও সমর্থনে তাদের এই পথে নামানোর চেষ্টা আর কোনো গোপন ব্যাপার নয়। এটা ‘বেদান্ত সংস্কৃতি মঞ্চ’ নামে সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল একটি সংগঠন খাড়া করে তার মাধ্যমে শুরুর ব্যবস্থা হয়েছে। এই উদ্দেশ্যে ভারতের চরম সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল আইএসএসের অধীন সংঘ পরিবারের সব থেকে শক্তিশালী ও ক্ষমতাসীন দল বিজেপির লোক বাংলাদেশে আমদানি করে হিন্দুদের সরাসরি ও প্রকাশ্যে সাম্প্রদায়িকতার পথে ঠেলে দেওয়ার চক্রান্ত কার্যকরের চেষ্টা চলছে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ তাদের কেন্দ্রীয় নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও তার মতো অন্যদের কার্যকলাপকে কীভাবে দেখে সেটাই দেখার বিষয়। পাকিস্তান আমলে তৎকালীন সরকার বিহারিদের যেভাবে ব্যবহার করছিল, সেভাবে হিন্দুদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের চেষ্টা হিন্দু সম্প্রদায় ও দেশের সব জনগণের জন্যই যে এক মহাবিপজ্জনক ব্যাপার হবে, এতে সন্দেহ নেই।
ভারতে বিজেপি একটি সাম্প্রদায়িক দল হিসেবেই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। ক্ষমতায় আসার পর নতুনভাবে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে তারা সাম্প্রদায়িক প্রচার-প্রচারণা ব্যাপকভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। তারা গীতাকে ভারতের জাতীয় ধর্মগ্রন্থ হিসেবে ঘোষণা করেছে। ভারত হিন্দুদের দেশ এবং মুসলমানরা জোরপূর্বক এ দেশ শাসন করে হিন্দুদের শত শত বছর ধরে দাবিয়ে রেখেছেথ এ কথা বলে ভারতকে একটি সম্পূর্ণ হিন্দু দেশে পরিণত করার উদ্দেশ্যে মুসলমান ও খ্রিস্টানদের হিন্দুত্বে ফিরিয়ে আনার জন্য ধর্মান্তকরণ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এ অপকর্মের নেতৃত্বে আছে বিজেপি ও আরএসএসের সংঘ পরিবারের অন্যতম প্রধান দল বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ কয়েক সপ্তাহ আগে প্রথমবার কলকাতায় তাদের সম্মেলন অনুষ্ঠান করে ঘোষণা করেছে, ভারত হলো হিন্দুদের দেশ! নরেন্দ্র মোদি কৌশলগত কারণে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এসব নিয়ে অন্যদের তুলনায় সংযম দেখালেও হিন্দুত্ব কর্মসূচি কার্যকর করার জন্য তিনি নিজের দলের অন্যান্য নেতা-নেত্রী এবং সেই সঙ্গে তাদের সংঘ পরিবারের অন্য দলগুলোকে ব্যবহার করছেন। শুধু তাই নয়, তাদের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য তথাগত রায় ঢাকায় এসে সরকারের নাকের ডগায় এবং তাদের প্রথম সারির এক নেতার উপস্থিতিতে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার প্রচার যেভাবে করেছেন, তার থেকে এটা স্পষ্ট যে, নরেন্দ্র মোদি ও তার দক্ষিণ হস্ত বর্তমানে বিজেপির সভাপতি অসিত শাহের হিন্দুত্ব প্রচার অভিযান এখন আর শুধু ভারতেই সীমাবদ্ধ নেই। ভারতের সীমানা অতিক্রম করে তাকে বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ বেশ জোরেশোরেই শুরু হয়েছে। তাদের এই প্রচেষ্টায় বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। দেখা দেওয়ার কথাও নয়। কিন্তু হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা প্রচারের উদ্দেশ্যে বিজেপির এই তৎপরতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণ ও গণতান্ত্রিক মহল যদি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় না হয়, তাহলে নানাভাবে বিপদগ্রস্ত এই দেশে সাম্প্রদায়িকতার এক নতুন বিপদ দেশের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।

পূর্ব প্রকাশিত :সমকাল

3467 জন পড়েছেন

Comments are closed.