স্বাধীনতা –কিছু হাল্কা বাৎচিত

1075 জন পড়েছেন

আমি স্বাধীন –এই কথাটি কী সহজ-সোজা -মামুলী? না। মূলত স্বাধীনতার ধারণাটি বেশ জটিল। আপনি কীসের মোকাবেলায় বা পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীন? আপনি আগে কী করতে পারতেন না যা এখন পারেন? আপনার এই পারার সীমা কতটুকু? এটা কী সীমাহীন? যদি সীমা থাকে তবে সেই সীমা কোথায়? কীসের ভিত্তিতে সেই সীমা নির্ধারিত হয়? আমরা যদি স্বাধীনতার ধারণাকে এভাবে প্রশ্ন করতে থাকি তাহলে অনেক ভিন্ন ধারণায় উপনীত হতে পারি যা আগে কল্পনা করিনি।

স্বাধীনতার সাথে কী ক্ষমতা সম্পর্কিত? একটু চিন্তা করুন। এই স্বাধীনতা মূলত ব্যক্তির সাথে, না তার সামাজিক অবস্থানের সাথে, তার রাজনৈতিক অবস্থানের সাথে, তার ধনাঢ্যতার সাথে জড়িত, না সবগুলোর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত? বাংলাদেশে আপনার স্বাধীনতা ও হাসিনার স্বাধীনতা কী এক? যদি এক না হয়ে থাকে, তবে আপনার স্বাধীনতা কোথায় আর তার স্বাধীনতা কোথায়?

স্বাধীনতা তাহলে কী কম বেশি হতে পারে? কার জন্য সর্বনিম্ন মাত্রা হতে পারে? কেন তার জন্য সর্বনিম্ন হবে? ‘স্বাধীনতা’ কী এমন কিছু হতে পারে যার মাধ্যমে আপনাকে আমাকে ধোঁকা দিয়ে একদল লোক তাদের ‘উদ্দেশ্য’ হাসিল করতে পারে? ‘স্বাধীনতা’ ‘স্বাধীনতার’ ধোঁয়া তুলে কী একটি বিশেষ শ্রেণী তাদের নিজেরদের স্বার্থে বিপ্লব করে ক্ষমতা দখল করতে পারে? স্বাধীনতার দিগ্বিদিক কী অনেক রূপের হয় না? যারা স্বাধীনতার আওয়াজ তুলে সমাজকে কব্জা করে ‘স্বাধীন’ হয়, তখন গরীব ও ক্ষমতাহীনের স্বাধীনতার কী হয় যাদের সাহায্যে তারা ‘স্বাধীন’ হয়েছে?

আমি যদি বলি যে ‘স্বাধীনতা’ হচ্ছে বহুলাংশে ধাপ্পাবাজি কথা, তাহলে কেমন শোনাবে? আমাদের বিশ্ব-মানবতা এই শব্দটির ব্যবহার সবদিনই দেখেছে। তবে সপ্তদশ শতাব্দীর পর থেকে এবং বিশেষ করে ফরাসী বিপ্লবীদের হাতে এবং ইউরোপীয় আধুনিকতাবাদীদের হাতে এসে রাজনৈতিক ধাপ্পাবাজিতে পর্যবেশিত হয়েছে। শুধু এই শব্দ নয়। এর সাথে আরও অনেক শব্দের অপব্যবহার হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ অনেকদিন পরে দেখেছে যে স্বাধীনতার নামে তারা পূর্বের ‘স্বাধীনতা’বহুলাংশে হারিয়েছে, পরাধীনতার জিঞ্জিরে আবদ্ধ হয়েছে। কিন্তু তখন অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে। নতুন রাজনীতি ও বাস্তবতা থেকে ফিরার পথ নেই। তাই আবার স্বাধীন হওয়ার অন্য আওয়াজ এসেছে এবং দ্বিতীয় তৃতীয় প্রজন্ম সেই স্বাধীনতার পিছনে দৌড়ে গিয়ে আবারও তাদের পূর্ব-প্রজন্মের মত অন্য ধরণের পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়েছে এবং এখান থেকে স্বাধীনতা লাভের স্বপ্ন আবার দেখেছে। আর এভাবেই চলছে এক শ্রেণীর ধোঁকার রাজনীতি।

প্রকৃত স্বাধীনতার সাথে সার্বভৌমত্বের সম্পর্ক। আর বাদবাকি সব স্থানে আছে আপেক্ষিক ও সীমিত স্বাধীনতা। যে সত্তা চরম ক্ষমতার অধিকারী, যে আইনের ঊর্ধ্বে, যে নিজেই আইন তৈরি করতে পারে, যা খুশি করতে পারে, কেবল সেই বলতে পারে সার্বভৌম এবং স্বাধীন। মূল অর্থে কেবল আল্লাহই সার্বভৌম। কেবল তিনিই চরম ক্ষমতার অধিকারী, তিনি যা ইচ্ছে তাই করতে পারেন। অতি পুরাতন কালে কিছু কিছু সম্রাট ভাবত তারা তাদের দেশের একচ্ছত্র মালিক, রব। আর তা এই অর্থে যে নিজ দেশে যা ইচ্ছে তাই করতে পারত। ফিরাউনের সেই ধরণের সার্বভৌমত্বের ধারণা ছিল। মুসাকে (আ.) ফেরাউন বলেছিল, তোমার ধারণার সার্বভৌম সত্তা কে? সেদিনের ধারণায় তোমার ‘রব’ কে? মূলত মূসাকে (আ.) রাজনৈতিক প্যাচে ফেলার উদ্দেশ্য ছিল এই প্রশ্নে। মুসা (আ.) এই প্রাসাদে বড় হয়েছিলেন, এই শাসন ব্যবস্থার বিশ্বাস সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। তাই তিনি কথার ধারার পাশ কাটিয়ে বলেছিলেন, আমাদের রব তিনি, যিনি প্রত্যেক বস্তুকে তার (অস্তিত্বগত ও প্রকৃতিজাত) আকৃতি দান করেন, অতঃপর (তাদের উপযোগী) পথপ্রদর্শন করেন। এখানে আলোচনা একটু থামিয়ে আরেকটি কথা বলি। আমাদের দেশে একটি নব্য ফেরাউন-গোষ্ঠী এবং নাস্তিক-পৌত্তলিক ‘সাংস্কৃতিক-মুসলিম’ চক্র রাষ্ট্রীয় অঙ্গন থেকে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের বিশ্বাস উঠিয়ে দিয়ে আধুনিকতাবাদী সেক্যুলার বিশ্বাসকে ষোল-কলায় প্রতিষ্ঠিত রাখতে বদ্ধ পরিকর। তাদের দৌরাত্ম্যে বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডেরও মালিক আল্লাহ এমন বিশ্বাস পোষণ করে কোন মুসলিম দল রাজনীতি করতে পারবে না। শুধু এতটুকু নয়, এই সাংস্কৃতিক মুসলিমদের ধারণায় নাকি রাসূলের রাষ্ট্র কোরানের মাধ্যমে না হয়ে মদিনা-সনদ দিয়ে পরিচালিত হত। এরা ফেরাউনের নব্য ভার্সন। ফিরাউনের দৃষ্টিতে সে’ই জগতের মালিক –সেখানে তার আইন ছাড়া আর কারো আইনের প্রতি স্বীকৃতি ছিল না। আল্লাহই মালিক, ‘রব’: পালনকর্তা, প্রতিপালক –এমন বিশ্বাসে ফিরাউন স্বীকৃতি দিতে চায়নি।

আপনি ও আমি যদি স্বাধীন বলতে হয়, তবে কেন বলব? এতে লাভ কী? আপনি সত্যিই যা ইচ্ছে তাই বলতে ও করতে পারেন? আমার তো মনে হয় না। ইউরোপে অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে আধুনিকতাবাদী আলট্রা-সেক্যুলারিস্ট ও নাস্তিকরা সাধারণ মানুষকে বেকুব বানিয়ে তাদের সাহায্যে আধুনিকতার দর্শন ছড়াতে এই শব্দে আওয়াজ ছড়াচ্ছিল। এই যা। এটা আজও করা হচ্ছে। আর আলট্রা-সেক্যুলারিস্টদের সাথে মুসলিম-পৌত্তলিক পতঙ্গরা মশালের চতুর্দিকে ফোঁৎ ফোঁৎ করে উড়ে বেড়াচ্ছে।

ব্যক্তি স্বাধীনতার মাত্রা যখন ক্ষমতা সাপেক্ষে আপেক্ষিক এবং স্থানভেদে অতি সীমিত এবং এর ব্যবহার যেহেতু অলংকারিক তখন আমরা ধাপ্পাবাজদের ব্যাপারে কী করতে পারি? সতর্ক থাকতে পারি। ভৌগলিক স্বাধীনতার কথাটিও আনা যাক। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার মূলে দু’শো বৎসরের ক্ষমতা বিভাজনের চরম ব্যবধানে হিন্দু-প্রভাবিত বাস্তবতায় ইসলামী ও মুসলিম ঐতিহ্য বিকাশের পূর্ণ সম্ভাবনা প্রশ্নের মুখামুখি হলে এবং ক্ষমতা শেয়ারিং এর কোন মীমাংসা না হলে এর মোকাবেলায় স্বাধীন রাষ্ট্রের সন্ধান করা হয়। তখনকার অর্থনৈতিক অবকাঠামো ও পরিসরে হিন্দু প্রতিপত্তিও এক বৃহৎ বাস্তবতা ছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীনতার অর্থ ছিল সামষ্ঠিকভাবে ধর্মীয় এবং ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হিন্দু প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রচেষ্টা। (এখানে ১৯৪৭ সালের সফলতা/ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা অবকাশ নেই)।

এই প্রেক্ষিতে দেখা যাচ্ছে যে মুসলমানদের কাছে স্বাধীনতার প্রধান অর্থ ছিল ধর্মীয় ও ঐতিহ্যগত। এই উপাদানটি রাসূলের (সা.) মদিনায় প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রে দেখি। মাক্কী পরিবেশে ধর্মীয় স্বাধীনতার বিকাশ ঘটানো সম্ভব ছিল না। মদিনাতে সেই স্বাধীনতা অর্থবহ হয়েছিল। এই স্বাধীনতা যদি অর্থবহ না হয়, তবে আপনি কোন ভূখণ্ডে আছেন, সেটি আসল কথা নয়, যেখানে এই গোটা বিশ্বই আল্লাহর এবং ফাসাদী আদর্শ ও বিশ্বাসের বাস্তবতায় আপনি কোন্‌খানে ‘পরাধীন’ সে আলোচনার কী লাভ?

আমরা যদি বিশ্বাসের সাথে আদর্শকে ওতপ্রোতভাবে জড়িত দেখি তবে একথা বলা যাবে যে ইসলামের বিশ্বাস ও আদর্শে যদি সেই ‘স্বাধীনতা’ অর্থবহ দেখায়, তবে সেই একই ‘অর্থ’ অন্য আদর্শ ও বিশ্বাসের বেলায়ও অর্থবহ দেখাতে পারে। ইউরোপে যে স্বাধীনতার ব্যাপক প্রচারণা পায় তখন সেই প্রচারণার মূলে ছিল আধুনিকতাবাদী সেক্যুলার ও নাস্তিক বিশ্বাস রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে। সেই একই উদ্দেশ্য আমরা দেখি ফরাসী বিপ্লবে এবং রুশ বিপ্লবে। সেখানে ব্যক্তি স্বাধীনতা, বাক স্বাধীনতা ইত্যাদি ছিল কথার কথা। মূলে ছিল এক শ্রেণীর আদর্শবাদ ও তাদের বিশ্বাস।

১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার পর থেকে পুনরায় যারা ‘স্বাধীনতার’ জন্য কাজ শুরু করেন তাদের স্বাধীনতার ‘অর্থ’ কী ছিল এবং তারা কী কোন বিশ্বাস ও আদর্শের প্রচার প্রোপাগান্ডা ও প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সেই স্বাধীনতা চাচ্ছিল? নিশ্চয়। তবে ওঠা কী ইসলামী বিশ্বাস ও আদর্শ বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে ছিল? যদি না হয়ে থাকে, তবে এই শ্রেণীর আন্দোলন কী মুসলমানদের কোনো ব্যাপার ছিল? আল্লাহ কী ধর্ম-নিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য নবী পাঠিয়েছিলেন?

এই ধারার কথা আপাতত থাক, কেননা এটা চালিয়ে গেলে চলতেই থাকবে। আজ দেখতে হবে যে ‘স্বাধীনতা’ হচ্ছে একটি শ্রেণীর বিশ্বাস ও আদর্শ প্রচারের উপযোগী একটি হাতিয়ার। যে শ্রেণী তাদের আদর্শ ও বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটাতে ‘তাদের সামষ্টিক’ স্বাধীনতা অর্জন করেছে, তাদের সেই বিশ্বাস ও আদর্শে ধর্ম হচ্ছে ব্যক্তিগত ব্যাপার। তাই ফেরাউন যেভাবে আল্লাহর রবুবিয়াত ও সার্বভৌমত্বকে মানতে রাজি হয়নি এরাও সেটি করতে রাজি নয়। এই ‘স্বাধীনতা’ তাদের দৃষ্টিতে ‘তাদেরই’। এটি তাদের বিশ্বাস ও আদর্শ রূপায়নের হাতিয়ার। আপনাকে প্রতিহত করতে ৩০০ বছরের এই পুরানো অলংকারিক ব্যবহারকে কৌশল হিসেবে অবলম্বন করবে। আল্লাহর সার্বভৌমত্বের কথা বললে রাষ্ট্র-দ্রোহিতার ভয় দেখাবে। হেফাজতিরা ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন করতে হবে –এই কথাটি বললে রাষ্ট্র পক্ষের সাংস্কৃতিক নাস্তিক মুসলিম ও পৌত্তলিক মুসলিমরা তা শুধু উড়িয়েই দেয়নি বরং নিম্ন শ্রেণীর অত্যুৎসাহীরা এটাকে ‘অনৈসলামী’বলে উল্লেখ করে! তাদেরকে ট্রেনে চড়ে পাকিস্তানে নির্বাসনের কথা বলে। জামাতিদেরকে আগেই এটা বলা হয়েছে। খালেদাকেও পাকিস্তান যাবার কথা বলেছে। এ দেশের শাসনতন্ত্র আল্লাহর সার্বভৌমত্ব স্বীকার করবে, বিশ্বাসের ঘোষণা দেবে –এমন কথা বলার ‘স্বাধীনতা’ কী কারও থাকবে না? দেশের সর্বসাধারণ ‘স্বাধীনতা’ নামক বস্তুটির সাথে কোন মাত্রায় সম্পর্কিত? আমি আর আপনি কতটুকু স্বাধীন তা কী আমাদেরকে উল্লেখিত শ্রেণীর এজেন্টারা তাদের স্বার্থেই বুঝিয়ে দিতে হবে?

বি:দ্র: এ লিখাটি পূর্ব প্রকাশিত পাঠকদের মন্তব্য পড়তে এখানে ক্লিক করুন

 

1075 জন পড়েছেন

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতাত্ত্বিক, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক। বসবাস: বার্মিংহাম, ইউকে। দেশের বাড়ী: দেউলগ্রাম (উত্তর), বিয়ানী বাজার।
Monawwarahmed@aol.com

Comments are closed.