আবহমান কালের বাঙালীয়ানা – ধোঁয়াকুণ্ডের পিছনে কী?

3637 জন পড়েছেন

রাগ –পটমঞ্জরী

ভাব ণ হোই অভাব ণ যাই
আইস সংবোহেঁ কো পতিআই ||ধ্রু||
লুই ভণই বট দূলক্খ বিণাণা।
তিঅ ধাএ বিলসই উহ লাগে ণা ||ধ্রু||
জাহের বাণচিহ্ন রুব ণ জানি
সো কইসে আগম বেএঁ বখাণী ||ধ্রু||
কাহেরে কিষভণি মই দিবি পিরিচ্ছা
উদক চান্দ জিম সাচ ন মিচ্ছা ||ধ্রু||
লুই ভণই ভাবই কিয্
জা লই অচ্ছমতা হের উহ ণ দিস্ ||ধ্রু||

উপরের কবিতার মত যে লেখাটি দেখাচ্ছে আমি তা প্রিন্ট করে আমাদের এক সাহিত্য বৈঠকে নিয়ে যাই এবং সবাইকে একেক কপি দিয়ে জিজ্ঞেস করি কে কী বোঝেছেন। কেউ কিছুই বোঝেন নি। আমি জিজ্ঞেস করলাম এটা কি বাংলা? সবাই নির্দ্বিধায় বললেন ‘এটা বাংলা নয়’। অতঃপর আমি বিষয়টি কিছুটা ব্যাখ্যা করার পর, সকলের মধ্য থেকে একজন বলেছিলেন, ‘আমি এটাই ভেবেছিলাম।’ তিনি এটা বলতে পেরেছিলেন এজন্য যে এ বিষয়ে tতার অনেক আগে পড়াশুনা ছিল, তাই স্মৃতিতে সামান্য হলেও ভেসে এসেছে।

পাঠকগণ দ্রুত এটি পড়ে নিজেদের অভিমত নিজেদের মনেই আপাতত রাখতে পারেন।

চর্যাপদ

উপরে যে পদ বা গানটি দেখছেন সেটা চর্যাপদের একটি পদ। ১৯০৭ সালে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপাল নরেশের পুস্তক সংগ্রহে চর্যাপদ আবিষ্কার করেন এবং বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের পক্ষ থেকে ১৯১৬ সালে প্রকাশ করেন। এই চর্যাপদ বা চর্যাগীতিকে বাংলার সবচেয়ে প্রাচীন লেখা বলে ‘বিবেচনা’ করা হয়। চর্যাপদের রচনাকাল ৮/৯ শো বছর আগের ‘ধরা’ হয় (চর্যাগীতি)। আবার কেউ কেউ এই সময় সীমাকে ৮ শো থেকে ১২ শো বছরের ভিতর স্থাপন করেন। ((হালদার, গো. (১৯৮০) বাংলা সাহিত্যের রূপরেখা, ঢাকা: মুক্তধারা))। তবে, লেখকের ‘চর্যাপদের মূল পূঁথিখানি ১৪শো শতকের’ (প্রাগুক্ত ১৯৮০:১৮)। এ প্রসঙ্গে সকলের ধারণা আনুমানিক।

চর্যার রচনা-কাল সুনির্দিষ্ট নয়। এগুলো কোনো এক সিদ্ধাচার্যের নয়। বরং অনেকের। ‘সর্বমোট ৪৬/৪৭ চর্যায় ২৪ জন পদকের (সিদ্ধাচার্যের) নাম পাওয়া যায়। বাকীরা বিস্মৃত। অথবা এই ২৪ জনই তাদের তাদের পূর্ব সিদ্ধাচার্যদের পদ মৌখিকভাবে নিজেদের লেখায় স্থান দিয়েছেন। পূর্বেকার যুগে প্রথমত অনেক বাণী, শ্লোক ইত্যাদি মৌখিক পদ্ধতিতে গুরু থেকে শিষ্যে পরিবাহিত হত এবং এক পর্যায়ে তা লিখিত আকার ধারণ করত’ (প্রাগুক্ত)।

কিন্তু লেখাটি ৭/৮ শো বছরের হোক, অথবা কম/বেশ, তা যে তখনো ‘আমাদের’ বাংলার রূপ লাভ করেনি –একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। অর্থাৎ চর্যাপদকে ‘আমাদের’ বাংলা বলা যায় না। ভাষার সেই পর্যায় থেকে আমাদের পর্যায়ে উপনীত হতে, কমসে-কম, আরও দেড়-দুই শতকের প্রয়োজন ছিল বা তার চেয়েও বেশি। মূল কথা হল ৭/৮ শো বছর আগে আমাদের এই ‘বাংলা ভাষা’ ছিল না। এটা তখনও গঠিত হওয়ার পথে বা তখনও গঠিত হচ্ছে।

এবারে বিবেচনা করুন, ‘বাংলা ভাষা’ যদি জাতি সত্তার প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়, তবে তখনও এই দেশে কোনো বাঙ্গালী নেই। চৌদ্দ শতক থেকে ধরলে ‘আমাদের’ বাংলার বয়স হয় ৬ শো বছর। তবে যখন থেকেই ধরুন না কেন, মনে রাখতে হবে যে যে টেক্সট “বোধগম্য” নয়, যা বুঝিয়ে দিতে “অনুবাদ” করতে হয়, সেটা মূলত ‘আমাদের পর্যায়ের’ বাংলা নয়।

আবহমান কালের বাঙালীদেশ

এবারে আমাদের আবহমান কালের বাঙালী-সত্তা ও আমাদের একক দেশটি কোথায় তা দেখা যাক। হালদার (১৯৭৪: ৩-৪) বলেন, ‘যাঁরা বাঙলা দেশের অধিবাসী তাঁরা এই বাঙলা ভাষা বলতেন না, মূলত তাঁরা ‘হিন্দু-আর্য-ভাষী’ ছিলেন না।’ হালদার সাহেব একটু অগ্রসর হলে বলতে পারতেন, এটা ছিল দ্রাবিড়, অনার্য লোকের বসতি, কিন্তু তিনি সেদিকে যাননি। অতঃপর তিনি গারো, বডো, কোচ, মেছ, কাছারি, টিপরাই, চমকা প্রভৃতির নাম উল্লেখ করে বলেন, ‘ শুধু নানা ভাষাই যে এই বাঙলা দেশে প্রাচীনতম কালে চলত তা নয়, দেশটাও ছিল নানা জাতি-উপজাতির বাসভূমি: বাঙালী বলে একটা গোটা জাতও তাই তখনও পর্যন্ত জন্মায়নি। ‘রাঢ়’ ‘সুহ্ম’ ‘পুন্ড্র’ ‘বঙ্গ’ প্রভৃতি প্রাচীন শব্দগুলি প্রথম দিকে বুঝাত বিশেষ বিশেষ জাতি বা উপজাতিকে।’

‘ব্রিটিশ-পূর্বকালে আজকের বাংলাভাষী অঞ্চল কখনো একচ্ছত্র শাসনে ছিল বলে প্রমাণ নেই। কাজেই বাঙলার সার্বিক ধারণা কল্পনা-সম্ভব, বাস্তব নয়। আমরা যখন বাঙলার আদি ইতিহাসের কথা বলি, তখন আবেগবশে সত্যকে অতিক্রম করে যাই, কেননা, জানা তথ্য আমাদেরকে সে অধিকার দেয় না। পূর্বে যেমন রাঢ়, সুহ্ম, পুণ্ড্র, গৌড়, বঙ্গ, সমতট, হরিখেল প্রভৃতি নামে বিভিন্ন অঞ্চল পরিচিত ছিল, কোন একক নামে বা একক শাসনে গোটা আধুনিক বাঙলা কখনো অভিহিত বা প্রশাসিত ছিল না, তেমনি তুর্কী আমল থেকে ১৯০৫ সাল অবধি ‘সুবাহ বাঙলা’র প্রায়ই অপরিহার্য অঙ্গরূপে থাকত বিহার-ওড়িশ্যাও। … অতএব তুর্কী বিজয়ের অব্যবহিত পূর্বাবধি বাঙলার রাজনৈতিক ইতিহাসও কখনো নামসার, কখনো বা কঙ্কালসার। এই রাজারা কি দেশী? মৌর্য-কাম্ব-শুঙ্গ-গুপ্ত-পাল-সেনেরা ছিলেন বিদেশী’ ((শরীফ, আ.(১৯৯২). বাঙলা, বাঙালী ও বাঙালীত্ব। কলিকাতা: সাহিত্যলোক, পৃ.৫))

আমাদের বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে কেবল চৌদ্দ শতকেই তিনটি রাজ্য ছিল: লাউড়, গৌড় ও জৈন্তা। এর পিছনে গেলে আরও ভিন্ন চিত্র পাই। ((চৌধুরী, দেওয়ান নূরুল আনোয়ার হোসেন, (১৯৯৭). ঢাকা: বাংলা একাডেমী, পৃ.২))।

এখানে দেখা যাচ্ছে হাজার হাজার বছর আগে বাঙলা ভাষা ছিল না এবং বাঙালী জাতিও ছিল না, এই বৈশিষ্ট্য ও একক শাসনের দেশও ছিল না। তবে, এই অঞ্চলে জনবসতি ছিল এবং তারা বিভিন্ন জাত-উপজাতের লোক ছিলেন এবং তারা বিভিন্ন ভাষায় কথা বলতেন। সার্বিকভাবে, বর্ণ-হিন্দুদের বাদ দিয়ে, এই জনগোষ্ঠীর ছিল অনার্য শ্রেণীর –প্রধানত দ্রাবিড়। এরা বিভিন্ন অঞ্চলে প্রসারিত হয়েছিল, অপরাপর জাতি-উপজাতি ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়েছিল, কালের আবর্তে এবং ছিন্ন যোগাযোগের ফলে ভাষা, সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও আচার-আচার্যে বিভিন্নতা এসেছিল। ধরা হয় মগধ অঞ্চলের দ্রাবিড় সভ্যদের ভাষা ছিল প্রাকৃত যা খৃষ্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ থেকে চলে আসছিল (আনুমানিক) এবং অনেক পরবর্তীতে এটিই বাঙলার আদি উৎস হয়ে ওঠে। এর সাথে খৃষ্টপূর্ব আনুমানিক ৬০০ শো অব্দ থেকে, মতান্তরে ২০০ অব্দ থেকে চলে আসা পালি ভাষাকেও সংযুক্ত করা হয়। পালিতে সংস্কৃতের মিশ্রণ ছিল বলে ধারণা করা হয় এবং পরবর্তীতে উদ্ভূত সংস্কৃত-বিবর্জিত ভাষা ছিল বৌদ্ধদের। এই দু’ইয়ের সমন্বয়েই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠছিল বাংলা ভাষার ভিত্তি, যা উপরে আলোচিত হয়েছে। একটি নতুন ভাষা গড়ে ওঠতে যে অনেক সময়ের প্রয়োজন সে কথা না বললেই চলে।

কল্পনা প্রসূত ‘আবহমান’ ও ইতিহাস নিয়ে রাজনীতি

উল্লেখ হয়েছে যে ব্রিটিশ-পূর্বকালে আজকের বাংলাভাষী অঞ্চল কখনো একচ্ছত্র শাসনে ছিল বলে প্রমাণ নেই এবং বাঙলার সার্বিক ধারণা কল্পনা-সম্ভব, বাস্তব নয় (আহমদ শরীফ)। আমরা জানি যে কালের আবর্তনে বিভিন্ন ভূখণ্ডে মানুষের বিভিন্ন পরিচিতি ছিল। এসবে রয়েছে জাতি, গোষ্ঠী ও ধর্মের রূপ এবং কালের আবর্তনে এগুলোর পরিবর্তন-বিবর্তন। জয়-পরাজয়ে, প্রাকৃতিক তাণ্ডবে, সুযোগে-বিপর্যয়ে মানুষের স্থানান্তর, বসতির মিশ্রণ, নতুন ও ভিন্ন পরিচিতি ইত্যাদি হয়েছে। মানব জাতির ইতিহাস এভাবেই গড়ে ওঠেছে।

কিন্তু ধরুন আজকের কোনো এক ভূখণ্ডে কোনো এক জাতি আছে, তাই তাদের পরিচিতি ধরে, কালের আবর্তের চলে যাওয়া, অত্র অঞ্চলের গোটা মানব-গোষ্ঠীকে কি বর্তমানের পরিচয়ে চিহ্নিত করতে হবে? অর্থাৎ আজ বাংলার ভূখণ্ডে বাঙ্গালী আছে। তাই কালের প্রবাহে এই ভূখণ্ডে যারাই ছিল বা এসেছিল সবাইকে কি বাঙালী ধরা হবে? এমনটি কেন করা হবে? আপনি বাঙালী, তাই ‘আপনার’ নিজ ঐতিহাসিক দীর্ঘ-সূত্রিতা প্রতিষ্ঠার জন্য? আপনার “জাতীয়তাবাদের” ঢঙ সাজাতে অপর গোষ্ঠীকে টেনে এনে আপনার জাতীয়তা প্রমাণ করতে? ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করতে? এটা কি কোনো নৈতিক বিষয়? না, বরং যৌক্তিকতা অন্যত্র যা আমরা পরে বলছি।

যদি আপনি বলেন যে আপনি “আবহমান” কালের বাঙালি, তবে আপনাকে বলতে হবে, কোন কাল থেকে আপনার সেই “আবহমান” কাল। আপনার “বাঙালীত্বের” বৈশিষ্ট্য কি বা কি কি? না, ঘটনা কি এই যে কালের চক্রে যে’ই এই ভূখণ্ড অতিক্রম করে থাকবে তারাই বাঙালী? এটা নিশ্চয় যুক্তি নয়। তবে যুক্তি কোথায়?

ইতিহাস ও রাজনীতি 

আজকের বাস্তবতায় বাংলাভাষী এক জনগোষ্ঠী ‘বাঙালী’ নামে পরিচিত। আমরা এই বাস্তবতা অস্বীকার করতে পারি না। একটি দেশে বা জনপদে অনেক গোষ্ঠী, জাতি, উপজাতি এবং ভাষাও থাকতে পারে। আধুনিক ভৌগলিক জাতীয় রাষ্ট্রে (in modern territorial nation state) উল্লেখিত অনেক জাতি উপজাতি ভৌগলিক জাতীয়তার ভিত্তিতে বাস করেন। এই আঙ্গিকে বাংলাদেশের সকল নাগরিক, সকল জাতি উপজাতি, সকল ভাষিক লোকের পরিচিতি হচ্ছে ‘বাংলাদেশি’।

আজকের সমাজের প্রকৃতি হচ্ছে বহু সাম্প্রদায়িক সমাজ। এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠা হচ্ছে রাজনৈতিক কোন সকল নাগরিকের আর্থ-সামাজিক অবস্থা উন্নয়ন ঘটাতে পারবে এবং কারা মানুষের স্বাধীনতা, অধিকার ও ন্যায়-নিরাপত্তা বিধান করতে পারবে -এই ভিত্তির নিরিখে অধিক ভোট পেয়ে সরকার গঠন করবে এবং নিজেদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি  পরিপূরণ করবে। কিন্তু দেখা যায় কখন কখন কোন কোন কোন দল মানুষের আবেগকে ব্যবহার করে ক্ষমতা গ্রহণ করতে চায় -এটা ঠিক নয়। এই ধরনের রাজনীতি ইতিহাসকেও তাদের নিজেদের মত করে আবেগের বস্তু হিসাবে বানিয়ে ক্ষমতার ব্যবহার করতে চায়। এটা ঠিক নয়। 

পরিশেষে একথা দিয়েই শেষ করি: “আবহমান” কালের বাঙালী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের হাঁক-ডাক থাকতে পারে, কিন্তু তা যেন ভোটের রাজনীতির অংশ না হয় এবং এই হাঁক-ডাক দিয়ে এক সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়ের সাম্য, অধিকার ও স্বাধীনতার প্রিন্সিপলকে নস্যাৎ না করেন। 

Facebook Comments

3637 জন পড়েছেন

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতত্ত্ব, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক।

মন্তব্য দেখুন