মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার কম্বোডিয়া এবং বাংলাদেশের একটা তুলনা

2253 জন পড়েছেন


মাস কয়েক আগে, বিধানদার সাথে  কথা হচ্ছিল, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আর শাহবাগ নিয়ে একটা লেখা নিয়ে। আমরা নতুন কিছু চিন্তা করছিলাম। উনি বললেন যে, নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের সাথে তুলনা করে কিছু লেখা যায় কিনা। আমার কাছে মনে হয়েছে, নুরেমবার্গের সাথে আমাদের তুলনাটা রেফারেন্স করা মুশকিল কারণ, নুরেমবার্গ অনেক গুলো দেশের প্রাতিষ্ঠানিক বাহিনীদের মধ্যে ঘটা একটা মহাযুদ্ধের  ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু আমাদেরটা  ট্রাইব্যুনাল লোকাল।দেশের সীমানার মধ্যে ঘটা একটা অপরাধের ট্রাইব্যুনাল। যদিও যুদ্ধটায় কয় একটা দেশ জড়িত ছিল।

 

 বর্তমান সময়ে, গণহত্যার অপরাধে এই ধরনের একটা লোকাল ট্রাইব্যুনাল চলছে, আমার জানা মতে কম্বোডিয়াতে।

বিধানদাকে বললাম,সেইটা নিয়েই একটু তুলনা করে দেখি। বিধানদা অতীব উত্সাহী হইলেন। উনার উত্সাহে আমিও একটু পড়াশোনা করে,একটা আর্টিকেল লিখেছি-যা উনার কাছে জমা আছে।লেখাটা আগামী কিছু দিনের মধ্যে একটা বইয়ে ছাপা হবে।

গতকাল কম্বোডিয়ার মানবতা বিরোধী ট্রায়ালের প্রথম রায় হয়েছে। এই রায়ে, খেমাররুজদের শীর্ষ নেতা পল পটের খিউ সাম্পান (৮৩) এবং নুয়ান চিয়া (৮৮)কে যাবত জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। নুয়ান চান ছিল, পল  পটের শীর্ষ সহযোগী এবং খিউ সাম্পান ছিল, তৎকালীন কম্বোডিয়ার  প্রধান। শীর্ষ দুই নেতার এই রায়ের পরে,  বিধানদাকে অনুমতি, ঐ লেখাটার আলোকে এই লেখা। 

 

এই আলোচনাটা করার একটা কারণ আছে।যুদ্ধাপরাধের বিচার আমাদের দেশে অত্যন্ত আলোচিত, ভালবাসিত এবং বিতর্কিত একটা ইস্যু। এই খানে, ভিন্ন ধরনের একটা আলোচনা আনতে গেলেই, এখন প্রশ্ন আসবে, আচ্ছা, তোমার এই আলোচনার করার গোল টা কি ? বিতর্কিত করতে চাইছ নাকি?  এই জন্যে, আমি আগেই বলে রাখছি, চাহিবা মাত্রই দিতে বাধ্য থাকবেন যে গালাগাল তা বিধানদার প্রাপ্য। আমি নিমিত্ত মাত্র। 

 

গণহত্যার অপরাধে নিজের দেশের নাগরিককে , কয় এক দশক পরে, একটা ইন্টারনাল ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার করার যে তুলনা, কম্বোডিয়ার সাথে আমাদের প্রধান অমিলের জায়গায় হইলো, কম্বোডিয়া ট্রাইব্যুনালে যাদেরকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল, তাদের মূল অপরাধের ক্ষেত্রটা আলাদা।  

 

তাই, আমি একটু তাড়াতাড়ি বলে নেই, কম্বোডিয়াতে কি হয়েছিল।

 

দীর্ঘ কয় এক দশকের গেরিলা অপারেশন, সশস্ত্র সংগ্রাম এবং আন্দোলনের পরে কমিউনিস্ট খেমাররুজ গেরিলারা ১৯৭৫ সালে কম্বোডিয়ার ক্ষমতা দখল করে। এই ক্ষমতা দখলের স্নায়ু যুদ্ধের সময়কার আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট আছে। ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসনের একটা অংশ হিসেবে, কম্বোডিয়াতেও মার্কিনীরা বোমা বর্ষণ করে, তাতে কয় এক লক্ষ কম্বোডিয়ান নিহত হয়। ফলে  ক্ষুব্ধ কম্বোডিয়ানরা দলে দলে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেয়। যার শীর্ষ নেতা ছিল, প্যারিসে উচ্চ শিক্ষিত পলপট।  

 

খেমাররুজ গেরিলাদের হাতে সরকার পতনের পরে, খেমাররুজরা  মাওবাদের অত্যন্ত কঠোর একটা  একটা ভার্শন  চালু করে।  তারা বলে, তারা এমন একটা সমাজ তৈরি  করবে যেই খানে,   কোন উঁচু নিচু থাকবেনা। ফলে, শহর অঞ্চলের মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত সহ সম্পূর্ণ শহুরে জনগণকে গ্রামে পাঠানো হয়। অর্থ ব্যবস্থা, ব্যক্তিগত সম্পদ, ধর্ম, স্কুল, কালচার সব কিছুকেই তারা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। প্রতিটা নাগরিককে, সুনির্দিষ্ট পরিমাণ কৃষি উৎপাদনের টার্গেট দেয়া হয়।  

 

কৃষি ভিত্তিক সমাজতন্ত্রের সাথে চরমপন্থি খেমার জাতীয়তাবাদীর মিশ্রণ ঘটায়। তারা বিশ্বাস করত,খেমার জাতি এশিয়ানদের মধ্যে সব চেয়ে উন্নত। তাছাড়া কম্বোডিয়া ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে ভিয়েতনামি এবং চাইনিজ দখলদারিত্বের ভেতরে ছিল, ফলে কম্বোডিয়ান জাতি একটা অস্তিত্বের সংকটে আছে-এই ধারনাটা তারা সব সময় প্রচার করত।  ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৭৯ এই চার বছরে, খেমারুজ গেরিলারা কম্বোডিয়াতে কৃষি ভিত্তিক সমাজ তন্ত্র প্রতিষ্ঠার নাম পুরো দেশে একটা ব্যাপক দমন অভিযান চালায় এবং শহরের অধিবাসীদেরকে জোর করে গ্রামে স্থানান্তর করে। সকলকে একটা কাল কাপড় পরতে বাধ্য করা হয়। এই পুরো সময়ে চার বছরে প্রায় ১৭ লক্ষ মানুষ মারা যায় যাদের অনেকেকেই বিভিন্ন শহরে গণহত্যা করা হয় , বিভিন্ন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বা লেবার ক্যাম্পে জোর করে কাজ করা এবং না খাইয়ে মারা হয়। ২১A নামের একটা জেল খানায় ১৪০০০ বন্দিদের মধ্যে মাত্র ৭ জন জীবিত ফিরে আসে। এই সময়ে কম্বোডিয়ার ২৫% জনগণ মারা যায় এবং এখন পর্যন্ত প্রায় ২০,০০০ গণকবর আবিষ্কৃত হয়েছে এবং নিয়মিত হচ্ছে। এই সময়ে কম্বোডিয়া কম্পুচিয়া নাম পরিচিত ছিল।  ১৯৭৯ সালে ভিয়েতনামের সামরিক বাহিনী কম্বোডিয়া আক্রমণ করে, খেমাররুজদের পরাজিত করে এবং ছায়া সরকার স্থাপন করে। এবং তারা নিজেরাও ১০ বছর কম্বোডিয়াতে দখল বজায় রাখে, এবং ১৯৮৯ সালে কম্বোডিয়া থেকে তারা সৈন্য সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।  ১৯৯৬ সালে খেমাররুজ গেরিলাদেরকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয় এবং একই সালে খেমাররুজরা দলের নাম পরিবর্তন করে, ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল ইউনিয়ন মুভমেন্ট গঠন করে। এবং ১৯৯৯ সালে খেমাররুজকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে। 

 

এই হলো, এই আলোচনার সাপেক্ষে যতটুকু জানা প্রয়োজন ততটুকুর ইতিহাস। 

 

এই টুকু ইতিহাস থেকে আমরা কম্বোডিয়ার সাথে আমাদের ইতিহাসের প্রধান মিল এবং অমিল গুলো দেখি। 

 

উভয় বিচারই ছিল গণহত্যায় এবং মানবতা বিরোধী অপরাধের শাস্তির জন্যে। যদিও, আমাদের বিচারের ইস্যুটা আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রামের সময়ে ঘটে যাওয়া অত্যাচার এবং টর্চার এবং গণহত্যার বিচার চেয়ে। আর কম্বোডিয়ার টা, তাদের নিজের দেশের একটা শাসনের সময়ের শাসকদের বিচার- কিন্তু, ,অপরাধের ধরনটা অনেক ক্ষেত্রেই একই।  আমাদের দেশের গণহত্যার মূল দায় আমরা দেই পাকি বাহিনীকে এবং জামাতে ইসলামকে আমরা পাকিস্তানি সেনা বাহিনীর সহযোগী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করি এবং এও বলি অনেক ক্ষেত্রে তারা নিজেই নেতৃত্ব দিয়েছে। কিন্তু কম্বোডিয়া খেমাররুজ বাহিনীকে সরাসরি অভিযুক্ত করে তাদেরকে কোন সাপোর্ট বাহিনী হিসেবে চিহ্নিত করা হয় নাই। তারা সরাসরি, অপরাধের জন্যে চিহ্নিত হয়েছে।  

 

দুইটা গণহত্যার আদর্শিক জায়গাটা আলাদা।

 

একটায় এই দেশের মানুষের স্বাধিকারের ইচ্ছাটাকে দমন করার জন্যে শাসকেরা গণহত্যা চালাইছে। এবং এই দেশ থেকে হিন্দু নির্মূল করাও তাদের কার্যক্রমের একটা উদ্দেশ্য ছিল।  অন্যদিকে কম্বোডিয়ার গণহত্যা হইছে একটা আদর্শিক জায়গা থেকে,মাওবাদের একটা চরমপন্থি আইডিয়া দেশের মানুষের উপর চাপাতে গিয়ে একটা সিস্টেমেটিক দমন নীতি, যার প্রেক্ষাপটে দেশের বেশ কিছু অঞ্চলে গণহত্যা চালানো হয়।  ইতিহাস যদি কমিউনিস্টরা লিখতো এবং কম্বোডিয়ার জনগণ যদি মেনে নিত বা এর সুফল পেত- একে হয়ত গণহত্যা বলাও হতো না। ফলে, কম্বোডিয়ার জনগণের ২৫% এর ম্রত্যু গোলমেলে একটা সময়ের ঘটনা, যেই খানে স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের পক্ষ বিপক্ষ আলোচনায় অনেক আর্গুমেন্ট কাউন্টার আর্গুমেন্ট করা সম্ভব, কিন্তু সেইটা এই আলোচনার উদ্দেশ্য নয়।  কিন্তু, আমাদের দেশে যে গণহত্যা হইছে, তার বাংলাদেশ পক্ষের নেরেটিভ টা খুব ক্লিয়ার। এই দেশে জায়গায় জায়গায় ৩০ লক্ষ মানুষকে  হত্যা হইছিল মুক্তিকামী জনগণের মুক্তির বাসনাকে দমন করার জন্যে। সেই খানে যারা যারা মারা গ্যাছে তাদের নিয়ে,  হয়ত প্রপার সার্ভে হয় নাই, কিন্তু একটা বিশাল জনগোষ্ঠীকে হত্যা করা হইছে। ফলে, এই হত্যায় যারা অংশ গ্রহণ করছে, তাদের অপরাধটা নিয়ে তেমন সন্দেহ নাই।

 

এখন কে করছে কে করে নাই, কে দায়ী কে দায়ী না, বিচারক কি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হচ্ছে কিনা, কিছু লোককে রাজনৈতিক কারণে ফাঁসানো হইতাছে কিনা এইটা নিয়ে পক্ষ বিপক্ষ অনেকে আর্গুমেন্ট আছে। কিন্তু মূল ঘটনা , পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে জামাতে ইসলামীর সহযোগে একটা যে গণহত্যা হইছে সেইটা যে অন্যায় হইছে এবং যার বিচার হওয়া উচিত তা নিয়ে আমাদের ইস্যুটাতে তেমন কোন সন্দেহ নাই।

 

ফলে, আওয়ামী লিগ যে বিচারটা করছে সেইটা একটা প্রয়োজনীয় বিচার এবং এর জন্যে আওয়ামী লিগ দল হিসেবে প্রশংসা দাবী  করে।  

 

কম্বোডিয়ার উদাহরণটা আমি এই জন্যে টানলাম। আমরা যেন দেখতে পাই, মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার আমরাও করলাম, কম্বোডিয়া করলো – মিল, অমিল কোথায়।  

আমরা একটু দেখি কম্বোডিয়া বিচার কি ভাবে করছে ?  ১৯৯৭ সালে কম্বোডিয়ান সরকার ইউএনকে চিঠি দিয়ে জানায় তাদের গণহত্যার এই ঘটনার বিচার প্রসেসে হেল্প করার জন্যে। ২০০৬ সালে ইউএন এর সাথে কম্বোডিয়ার চুক্তি সাক্ষরিত হয় এবং এর ভিত্তিতে গঠন কর হয় Extraordinary Chambers in the Courts of Cambodia বা ইসিসিসি। এই চুক্তির ভিত্তিতে কম্বোডিয়া এই বিচার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে ইউএনের কাছে ফান্ডিং নিছে।

কম্বোডিয়ান আইনে দুই ধরনের চেম্বার করা হয়। একটা চেম্বারে জজরাই ইনভেস্টিগেশন করে। আর একটা চেম্বার যেইটাকে বলা হয়েছে, সুপ্রিম চেম্বার হচ্ছে মূল বিচার।  প্রি ট্রায়াল চেম্বার যারা ইনভেস্টিগেট করছে, তাদের মধ্যে ৩ জন রাখা হইছে দেশী জজ আর দুই জন রাখা হইছে বিদেশী জজ।  আর সুপ্রিম চেম্বারে ৪ জন রাখা হইছে দেশী আর তিন জন বিদেশী জজ।  আমরা এখন কুইকলি দেখি মিল এবং অমিলের জায়গা জায়গা হচ্ছে। মিলের জায়গা হচ্ছে কম্বোডিয়ান বিচারটা করা হয়েছে, কম্বোডিয়ার লোকাল আইনে এবং লোকাল প্রসেসে।  এবং এই খানেই আমার হিসেব মিলের শুরু এবং মিলের শেষ।

 

যেই খানে অমিল, সেই খানে আমরা একটু দেখি

 

কম্বোডিয়ান সরকার পুরো প্রসেসটার নিরপেক্ষতার ব্যাপারে অন্ত্যন্ত সতর্ক ছিল। তারা এই বিচারের সম্পূর্ণ দায় এবং ক্রেডিট নিজের ঘাড়ে নিতে চায় নাই। এই জন্যে তারা ইউএনকে ইনভলভ করছে। ফলে যেইটা হইছে। কোন ভাবে এই বিচারের ভুল ত্রুটি এবং সাফল্য কম্বোডিয়ান সরকারের কাছে আসে নাই।  আমাদের বিচারের কার্যকরী প্রক্রিয়া শুরু হয়, ২০০৯ সালের জুলাই মাসে যখন সরকার  ICT Act of 1973 কে সংশোধন করে। এবং ২০১০ সালের মার্চে তিন জনের ট্রাইব্যুনাল, ৭ জনের ইনভেস্টিগেশন টিম এবং ১২ জনের প্রস্কিকিউশান টিম করে। আমাদের দেশে  পুরো প্রক্রিয়াতে কোন বিদেশী শক্তি বা ইউ এন এর সহায়তা নেয়া হয় নাই।  সরকারের যুক্তি ছিল, এইটা একটা দেশীয় অপরাধ এইটার দেশী বিচার হবে।

তাতে কোন সমস্যা ছিলনা যদি না ,যদিনা আমাদের জাতীয় খাসলতের মধ্যে, স্বজনপ্রীতি,রাজনৈতিক প্যাঁচ এবং স্বেচ্ছাচারিতার উদাহরণ না থাকতো এবং বিচার বিভাগ ঐতিহাসিক ভাবে  স্বনির্ভর এবং স্বাধীন হতো।

 

আমরা দেখেছি, সরকারের ইচ্ছা অনিচ্ছা, আমাদের বিচার প্রক্রিয়ার সাথে পদে পদে যুক্ত ছিল।

 

এর ফলে আমরা দেখেছি, স্কাইপ ক্যালেঙ্কারিতে যেই সব প্রশ্ন লজ্জাজনক ইস্যু এসেছে গালি দেয়া বাদে, প্রপার উত্তর সরকারের কাছ  থেকে আসে নাই।  স্কাইপে শোনা গ্যাছে- সাক্ষী কি ভাবে কি কি বলবে, বিচারপতি সেইটা শিখিয়ে দিচ্ছেন। শোনা গ্যাছে, বিচারপতি সাহেব নিজের মুখে বলছেন,  রায় দেয়ার বিনিময়ে,আপিল বিভাগে প্রমোশন দেয়া হবে প্রতিশ্রুতি পেয়েছে বিচারক, কিংবা, শোনা গ্যাছে চিফ প্রসিকিউটর বিচারপতির রুমে গিয়ে বলছেন, “আমি দাড়াই যাবো, আপনি আমাকে বসায় দিবেন। লোকে দেখুক, আমাদের মাঝে কোন খাতির নাই।“

 

এই সব লজ্জা জনক ঘটনাগুলো একটা  আন্তর্জাতিক ট্রায়াল হলে কোন মতেই হতো না। সেই খানে, একটু হলেও মান নিয়ন্ত্রণ হতো। যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে, বিগত ২০ বছরে বাংলাদেশে এতো রাজনীতি এবং মুভমেন্ট হইছে। এর পরে, আমরা জাতি হিসেবে সত্যি ডিজারভ করেছিলাম, একটা ট্রায়াল যেইটাতে এই ধরনের লজ্জা জনক অভিযোগ উঠবেনা।

 

কারন এই বিচার, আমাদের জন্মের ইতিহাসের বিচার। বাংলাদেশের এই জাতির জন্ম যেই যুদ্ধের মাধ্যমে হয়েছে, যে যুদ্ধে ৩০ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে- তার বিচারে রাজনৈতিক গোল দেয়ার জন্যে এই ধরনের অসততার আশ্রয় নেয়া- আমাদের জাতির জন্যে কত বড় কলঙ্কজনক উদাহরণ হিসেবে রয়ে  গেলো সেইটা সহস্র বছর ,লক্ষ বছর পরেও রয়ে যাবে।   

 

কিন্তু, কম্বোডিয়া এই সব অভিযোগ ওঠে নাই।  এর আরেকটা কারন, কম্বোডিয়াতে একটা ওপেন ট্রায়াল করা হয়। 

 

এই বিচার যাতে জনগণের চোখের সামনে হয়, তার জন্যে ভিডিও ক্যামেরার মাধ্যমে পুরো বিচার লাইভ টেলি-কাস্ট করা হইছে। এইটা বাদেও কম্বোডিয়ান সরকার তাদের ল স্টুডেন্টদের জন্যে বিশেষ একটা প্রোগ্রাম করে, যাতে তারা বিচার প্রক্রিয়া ঘনিষ্ঠ ভাবে দেখতে পারে। কম্বোডিয়ান সরকারের প্ল্যান ছিল, এই বিচার প্রক্রিয়া যদি সুষ্ঠু ভাবে জনসম্মুখে করা যায়, তাহলে এর ফলে কম্বোডিয়ার বিচার বিভাগ এর সংহত হবে।

 

ভিকটিম সাপোর্ট সেকশন কম্বোডিয়ান গণহত্যায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদেরকে বিচার প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসার জন্যে এই সেকশনটি করা হয়। এদের দায়িত্ব ছিল, যারা এই বিচারে অভিযোগ করবে, তাদের অধিকার এবং তাদের অভিযোগগুলোকে আমলে বিচার তাদেরকে লিগাল সহায়তা দেয়া। এই খানে জনগণকে অভিযোগ দায়েরের সুযোগ করে দেয় হয়।  বিচারটা করার সময়ে কম্বোডিয়া ব্যাপক জন সংযোগ করে। উন্মুক্ত বিচার হওয়াতে, কম্বোডিয়ার অনেক লোক বিচারের বিভিন্ন সেশনে পার্টিসিপেট করে। 

 

১৯৯৬ সালে কম্বোডিয়া খেমারুজদেরকে বিশ্বাস ক্ষমা প্রদান করে। কিন্তু এই বিশেষ ক্ষমার একটা অংশই ছিল,খেমাররুজদের সিনিয়র নেতারা যারা যারা গণহত্যার সাথে জড়িত ছিল, তাদের মধ্যে মোট ৯ জনকে আসামী করা হয়। এর মধ্যে আছে, পল পটের ডান হাত নুয়ান চিয়া, খেক কেক লিউ – নাম গুলো আর দিবনা। কারণ, আমরা এদের চিনবোনা –তাই আমরা জেনে রাখি মোট ৯ জনকে আসামী করা হয়।

 

কম্বোডিয়ান ইসিসিসি জনগণের সাথে সংযোগ করার জন্যে ব্যাপক কার্যক্রম চালায়।

 

ওপেন কোর্টে প্রায় ৩ থেকে ৫ লক্ষ মানুষ বিভিন্ন সময়ে ট্রায়ালের হেয়ারিং শুনতে অংশ গ্রহণ করে। কিছু কিছু বিচার প্রায় 200 দিনের উপরে পর্যন্ত চলে।

ফলে, কম্বোডিয়ান জনগন এই পুরো প্রক্রিয়াতে ব্যাপক ভাবে অংশগ্রহন করে। বিশেষত, গ্রামের দিকের মানুষের ব্যাপক অংশ গ্রহণ দেখায় যায়, ইসিসিসি এর বিচারের কার্যক্রমে।

এইটা ছাড়াও ইসিসিসি বিচার কার্যক্রম লাইভ ভিডিওতে বিচার প্রচার করে থাকে, যা এই লিঙ্কে দেখতে পাবেন।  http://www.eccc.gov.kh/en/live-stream

 

এই নিচের লিঙ্কে গেলে দেখবেন, কম্বোডিয়ান স্কুলের এবং কলেজের ছাত্রদের দলগত ভাবে বিচার কার্যরকম দেখার জন্যে,যোগাযোগ করার কন্টাক্ট নাম্বার দেয়া আছে। কম্বোডিয়া চেয়েছে, তাদের ইতিহাস যেন আগামী প্রজন্ম ভুলে না যায়, এই জন্যে বিভিন্ন স্কুলের ছাত্রদের জন্যে এই বিচার কার্যক্রম দেখার সুযোগ করে দেয় তারা।

http://www.eccc.gov.kh/en/media-center/activities-outreach 

 

এই ইসিসিসি যা মূলত আমাদের ট্রাইবুনাল তার বিভিন্ন ধরনের আউট রিচ প্রোগ্রাম আছে, যার মাধ্যমে ইসিসিসি জনগনের সাথে সংযোগ করে। নিচের লিঙ্কে দেখবেন, প্রত্যেক সপ্তাহে ইসিসিসি বিভিন্ন ধরনের রেডিও প্রোগ্রাম করে যাচ্ছে।  http://www.eccc.gov.kh/en/media-center/weekly-radio

কম্বোডিয়া যেই ভাবে বিচার করলো এবং আমরা যেই ভাবে করলাম এবং করছি, তার থেকে বোঝা যায়, একটা জরুরী কাজ এবং ভালো কাজ করার যদি আপনি খারাপ ভাবে কারন, এবং সেইটা করতে গিয়ে যদি আপনি  অন্যায় করেন, তাতে আপনার পুরো প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

 

আমাদের দেশে প্রকাশ্যে এবং গোপনে যা হয়েছে তাতে আমরা দেখি, এই বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া যেই ভাবে সরকারের বিভিন্ন ধরনের ইচ্ছা বাস্তবায়ন হয়েছে, তাতে কোর্টের ইন্টেগ্রিটি কোন মতেই থাকেনা। ফলে প্রকৃত যারা বিচার বিরোধী তারা, এও বলার সুযোগ পেয়েছে, যে এরা অপরাধী না।

 

বাস্তবতা হচ্ছে, যেসব যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হচ্ছে, তারা প্রকৃতই অপরাধী ছিল। এবং আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে গণহত্যার সাথে বিভিন্ন ভাবে সংযুক্ত ছিল।কিন্তু, এও ঠিক অভিযুক্তদের মধ্যে কেউ কেউ মিসটেকেন আইডেন্টিটির শক্ত ডিফেন্স দিয়েছেন এবং সেইটা কোর্ট আমলে নিচ্ছে নাকি সরকারের ইচ্ছায়,আগাচ্ছে সেইটা বোঝার কোন উপায় সাধারণ পাবলিকের থাকছেনা। বাস্তবতা হচ্ছে, সেইটা সাধারণ পাবলিকের কাজও না। কিন্তু,  কোর্ট সম্পূর্ণ ভাবে প্রভাবমুক্ত না হওয়াতে বাংলাদেশের পাবলিক সম্পূর্ণ ভাবে কনউজড হয়েছে এবং যে যে নিজের মত জাজমেন্ট ফর্ম করছে। কারন, কোর্টের জাজমেন্টের উপরে নিরধিধায় আস্থা রাখার জায়গা সরকারি হস্তক্ষেপে বন্ধ হয়ে গ্যাছে।

 

ফলে দেশের জনমত বিভক্ত হচ্ছে। এবং এতো সেনসিটিভ ইস্যুতে জনমত বিভক্ত হওয়াটা জাতির মানসে, আরও একটা কানেক্টিভ ক্ষত তৈরি করছে। এবং দেশের জনগণ উভয় পক্ষে রাডিকালাইজড হচ্ছে। শাহবাগ থেকে হেফাজত এবং সেই সময়ের এবং পরবর্তী ঘটনা সেই বিভেদের ইঙ্গিত দেয়।

 

এবং যারা এই প্রক্রিয়াকে নিয়ে প্রশ্ন করছে, তাদেরকে বিচার বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বলা হইছে,  হয় তুমি বিচারের পক্ষে নয় তুমি পক্ষে। মাঝে কিছু নাই। কিন্তু, কেউ যদি বলে আমি চাই এই সব ঘাতক দালালদের শাস্তি হোক কিন্তু, কিন্তু, বিচার বিভাগকে সরকারি ইচ্ছা অনুসারে টেম্পার করার প্রক্রিয়ার পক্ষে না। তুমি রাজাকার ছাগু। এবং যারা বিচারের বিপক্ষে তারাও এখন বলছে, “আওয়ামী ক্যাংগারু কোর্ট প্রমাণিত, এবং মুক্তিযুদ্ধের সময়ে কিছুই হয় নাই।“ সেইটা এখন অনেকে বিশ্বাস করছে। কারন,এই বিচারকে ব্যুবহার করে ক্ষমতায় জাওয়ার জন্যে,আওয়ামি লিগ এত সচেষ্ট ছিল যে সকল ধরনের অন্যায় কে তারা বলেছে বিচার বন্ধের ষড়যন্ত্র। 

 

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না হওয়া বাংলাদেশের জাতির মানসে অনেক গভীরে দাগ রেখে যাওয়া একটা ক্ষত। সরকারের প্রভাবমুক্ত একটা  বিচার সেই ক্ষতটাকে একটা প্রলেপ দিতে পারতো। আমরা জাতি হিসেবে এগিয়ে যেতে পারতাম। এইটা কম্বোডিয়া সফল ভাবে করেছে। তারা তাদের নিকট অতীতের কিছু গণহত্যা যেই খানে, তাদের ২৫% জনগোষ্ঠী হারিয়ে গ্যাছে- সেইটার একটা বিচার করেছে,তাতে পুরো জাতি আরও ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।

 

কম্বোডিয়ান সরকার বিচারটা যেই ভাবে পরিচালনা করেছে, তাতে তাদের দেশের বিভক্ত জনগণকে, ইউনাইট করার একটা প্রচেষ্টা ছিল।

 

এবং এই জন্যে সরকার সম্পূর্ণ ভাবে ট্রান্সপারেন্সির ব্যাপারে সচেতন ছিল। এবং এই বিচার থেকে যাতে সম্পূর্ণ বিচার বিভাগ শিখতে পারে, এবং এর ফলে যাতে কম্বোডিয়ান বিচার ব্যবস্থা সংহত হয়, এই ব্যাপারে সরকারের নজর ছিল। এবং একই সাথে কম্বোডিয়ান জনগণ যেন, এই বিচার প্রক্রিয়া থেকে, তাদের দেশের অত্যন্ত পেইনফুল একটা পর্যায় পার হয়ে যেতে পারে, সেই ব্যাপারেও তাদের সচেতনতা এবং সংবেদনশীলতা তারা সব সময় প্রকাশ করছে।ভিকটিমদের পরিবারের জন্যে সাইকলজিস্ট নিয়োগ দেয়া হয়েছে। গত দিন রায় হওয়ার পরে, কম্বোডিয়াতে টেলিভিশন স্ক্রিনের সামনে অসংখ্য মানুষ কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছে।  যেন তাদের ট্রমা থেকে হিল হওয়ার পথে, ,এইটা তাদের জন্যে বড় একটা প্রাপ্তি। দেখবেন, কম্বোডিয়া সামনে এগিয়ে যাবে।

 

আমাদেরও একই চাওয়া ছিল। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ করে, এই ট্রমা টাকে হীল করা ।

 

এবং সেই ক্ষত থেকে ইন্সপিরেশন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত যে  চেতনা, মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, দেশের প্রতিটা মানুষের মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠা, সমাজে  মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা –যাতে, আমরা আগামীতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিংশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এগিয়ে যেতে পারি। কিন্তু, আওয়ামী সরকারের সাফল্য হচ্ছে, এমন ভাবে এই বিচারটা করেছে, তাতে এই জাতির ভেতরে এমন ভাবে বিভেদের বীজ রচনা করে গ্যাছে, যাতে এই জাতি আর কখনোই ঐক্য বধ্য হতে না পারে।

আমি মনে করি, আওয়ামী লীগ এই কাজে ১০০% সফল হইছে।

 

2253 জন পড়েছেন

জিয়া হাসান

About জিয়া হাসান

লেখক: প্রাবন্ধিক। প্রকাশিত গ্রন্থ : শাহবাগ থেকে হেফাজত: রাজসাক্ষীর জবানবন্দি -

Comments are closed.