কেন হামাস রকেট ছোড়ে

2588 জন পড়েছেন

ইসরাইল গাজায় স্থল অভিযান শুরু করেছে। গিডিওন লেভি হারেৎজ পত্রিকায় একটি প্রশ্ন তুলেছেন। কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে গাজায় বোমা হামলা করে হত্যা করার? লাশের পাহাড় তো জমে উঠেছে। তার মধ্যে কমপক্ষে ২৪টি অবোধ শিশুকেও মেরে ফেলা হয়েছে। ইসরাইলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে যে তারা কামান দাগিয়ে আর যুদ্ধবিমানে করে গাজায় বোমা ফেলছে কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার ও কনফারেন্স রুমগুলোর ওপর- যেসব বাড়ি হামাসের আদেশ-নির্দেশ দেয়ার আর সভা করার জায়গা। এটা করতে গিয়ে তারা একটি হাসপাতাল আর একটি স্কুলও বোমা মেরে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এগুলো পটকা নয়, কিংবা সাউন্ড গ্রেনেডও নয়। এগুলো মারণাস্ত্র। বোমা। মানুষ মারার জন্য মারা হয়। মানুষ মরে। অতএব গাজাতেও মানুষ মরেছে, মরছে, আরও মরবে। বোমা হামলা চলছে আসলে নিরস্ত্র অসহায় উন্মূল উদ্বাস্তু ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের ওপর।



এত মারার পরেও ইসরাইল সন্তুষ্ট নয়। এখন স্থল অভিযান শুরু হয়েছে। আরও আরবকে মারা হবে। তো গিডিওন লেভি ঠিকই প্রশ্ন তুলেছেন, উদ্দেশ্য কী আসলে ইসরাইলের? তার সাফ উত্তর হচ্ছে একটাই। আরবদের মারা। সজ্ঞানে সচেতনভাবে হত্যাযজ্ঞ চালানো। যেন ভয়ে ফিলিস্তিনিরা কোনো প্রতিবাদ করতে না পারে। হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ মানে মাছি মারতে কামান দাগার মতো ব্যাপার। কিন্তু ইসরাইল হত্যার এই মাফিয়া নীতিটাই গ্রহণ করেছে। ইসরাইল যা করছে তা স্পষ্টতই মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের মধ্যে পড়ে। কিন্তু ইসরাইল সেই সবের তোয়াক্কা করে না। কারণ গিডিওন লেভির কথা হল, আরবদের খুন করাই তার নীতি। ইসরাইলস? রিয়েল পারপাস ইন গাজা অপারেশান? এই প্রশ্নের উত্তর খুবই সিম্পল। গিডিওন লেভি তার লেখার শিরোনামেই সেটা বলে দিয়েছেন। টু কিল আরবস। আরবদের খুন করা।



গিডিওন নিজে জন্মসূত্রে ইহুদি। বাবা ছিলেন সাবেক চেকোস্লোভাকিয়ার ইহুদি। থাকেন তেলআবিবে। তারও সন্তান আছে। আর হারেৎজ ইসরাইলের সবচেয়ে পুরনো ও বনেদি পত্রিকা। নামটাও হিব্রু ভাষায় : হাদাশৎ হারেৎজ। যার অর্থ ইসরাইলের ভূখণ্ড। এটা অনুমান করা যায় ইসরাইলের ইহুদিদের অধিকাংশই গিডিওনের লেখা কিংবা হারেৎজ পত্রিকার নীতি পছন্দ করে না। গিডিওন বলেন, তার নিজের ছেলেই নাকি তার লেখা পড়ে না। এবং তিনি যা লিখেন তার সঙ্গে তো একমত হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু আমরা কোনো ইসলামী বা আরবি উৎসের বরাতে আমাদের কথা বলব না। আমরা জন্মসূত্রে ইহুদিদের কথা দিয়েই বোঝাবো ইসরাইল আদতে কী জিনিস!

আরবদের পরিকল্পিতভাবে খুন করার এই নীতি কি সাম্প্রতিক? মোটেও তা নয়। লেভি বলছেন, ইসরাইলের এই মাফিয়া নীতি এখনকার নয় মোটেও। সেই ৩০ বছর আগের লেবানন যুদ্ধের সময় থেকেই ইসরাইল এই নীতি অনুসরণ করে আসছে। আর সেই নীতির অধীনেই এখন গাজায় অপারেশান প্রটেক্টিভ এজ চলছে। কেন এই হত্যাযজ্ঞ? ইসরাইলের কাছে এটা হত্যাযজ্ঞ নয়, এটা যুদ্ধ নীতি। ইসরাইল আসলেই মনে করে শত শত আরব খুন করে লাশের পাহাড় বানালে ফিলিস্তিনিরা ঠাণ্ডা হবে।

গিডিওন লিখছেন, হামাসের অস্ত্রের ভাণ্ডার ধ্বংস করা বেকার, কারণ তারা আবার হাতিয়ার জোগাড় করবে। সেটা অবশ্য এতদিনে প্রমাণিত হয়ে গেছে। হামাসকে ক্ষমতা থেকে টেনে নামিয়ে আনাও হবে অবাস্তব (এবং অবৈধ) কাজ। ইসরাইল সেটা চায়ও না। কারণ, হামাসের বিকল্প আরও বেকায়দার হতে পারে। তাহলে মিলিটারি অপারেশানের একটাই উদ্দেশ্য : আরবদের হত্যা করা, আর তার সঙ্গে মিলবে লোকজনের তালিয়া ও হর্ষধ্বনি ((Israel's real purpose in Gaza operation? To kill Arabs, HAARETZ ১৩ জুলাই ২০১৪)



তালিয়া বাজানো লোকজন কারা? শুধু কি ইসরাইলি? গিডিওন অবশ্য ইসরাইলিদেরই বুঝিয়েছেন। কিন্তু আমরা এর সঙ্গে যুক্ত করতে পারি তাদেরও যাদের চোখে হামাস একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। কিন্তু হোক হামাস সন্ত্রাসী তাতে গাজার উদ্বাস্তু ফিলিস্তিনিদের কি অপরাধ? তাদের অপরাধ তারা হামাসকে প্রচুর ভোটে ফিলিস্তিন পার্লামেন্টে বিজয়ী করেছিল। হামাসকেই নৈতিক ও রাজনৈতিক উভয় অর্থেই তারা তাদের বৈধ রাজনৈতিক প্রতিনিধি মনে করে। তো যারা হামাসকে ভোট দিয়েছে, সেই হারামজাদারা মরলে ক্ষতি কি?

হামাসের সমালোচনা হতে পারে। গিডিওন লেভি করেছেনও সেটা। ইরাকে ও সিরিয়ায় যুদ্ধক্ষেত্রের অধিবাসীরা শত্র“র পাল্টা আক্রমণের মুখে পালাতে পারে। কিন্তু গাজায় সেই সুযোগ নেই। গাজা একটি বন্দিশালা। তাহলে হামাস ইসরাইলের দিকে রকেট নিক্ষেপ করে আসলে তো ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তাকেই বিপন্ন করে তুলেছে। তাছাড়া তারাও তো অসামরিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর বোমা মারছে। কিন্তু গিডিওন লেভি তারপরও বলছেন, হামাস তো আসলে সেনাবাহিনীই না, অতএব ইসরাইলের দিক থেকে এই যুদ্ধকে দেখলে মনে হবে বিশাল একটি হাতি যুদ্ধ করতে নেমেছে তুচ্ছ মাছির বিরুদ্ধে। কিন্তু এটাই তো হওয়ার কথা। কারণ ইসরাইলি সেনাবাহিনী অন্য কোনো দেশের সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করে না, তারা যুদ্ধ করে সিভিলিয়ানদের বিরুদ্ধে। কেন করে? করে কারণ গিডিওন লেভির কথা মতো, তারা মনে করে, আরবরা পয়দা হয় শুধু অন্যদের মারবার আর নিজেরা মরবার জন্য, এটা তো সবাই জানে। তাদের জীবনে আর কোনো উদ্দেশ্য নেই, তো তাই ইসরাইলরা তাদের হত্যা করে।



আরবদের হত্যা করা ইসরাইলি নীতি- একজন ইসরাইলির কাছ থেকে এটা শোনা গুরুত্বপূর্ণ। লেভি একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিক হয়ে একটি ইসরাইলি পত্রিকায় এসব লিখেছেন। যারা রাষ্ট্রের সন্ত্রাস বাদ রেখে শুধু মজলুমের প্রতিরোধকে আগ বাড়িয়ে সন্ত্রাস বলে, তাদেরকে তাহলে কী বলা যায়? তাদের সন্ত্রাসী বলা কি যথেষ্ট? মোটেও না। কারণ তারা একসঙ্গে অনেকগুলো ঘৃণ্য অপরাধ করে। এক. মিথ্যা বলা, এরা মিথ্যাবাদী, শুরুতেই নৈতিক অপরাধে অপরাধী বলা যায় এদের; দুই. আসলে যারা সন্ত্রাসী তাদের তারা আড়াল করে, অর্থাৎ অপরাধ লুকায়; তিন. মজলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জালিমের পক্ষাবলম্বন করে এবং চার. সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের গণহত্যায় সহযোগী হয়ে ওঠে।



দুই.

এবার সামরিক পরিস্থিতির দিক থেকে বিচার করে দেখা যাক। সামরিক পরিস্থিতি ও সমর নীতি নিয়ে যারা গবেষণা করেন এবং ইন্টারনেটে যেসব খবর পাওয়া যায় তার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু বিষয় বোঝা দরকার। সমর নীতির দিক থেকে ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে ইসরাইলের এই হত্যাযজ্ঞকে মূল্যায়ন করব কীভাবে? স্ত্রাটফর একটি পরিচিত সমর ও গোয়েন্দা বিশ্লেষক। এই ওয়েবসাইটে জন্মসূত্রে ইহুদি জর্জ ফ্রিডমেন লিখছেন, বিশুদ্ধ সমরবিদ্যার দিক থেকে দেখলে হামাস একটা পথ খুঁজছে যাতে গাজার বিরুদ্ধে হামলা চালানো থেকে ইসরাইলকে নিরস্ত করা যায়। ২০০৮ সালের শুরু ও ২০০৯ সালের শেষের দিকে অপারেশান কাস্ট লিড গাজাকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর বড় ক্ষতিসাধন করার চেষ্টা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না। কিন্তু যতটুকু ক্ষতি তারা করেছে পরিমাণের দিক থেকে বিচার করলে তা ইসরাইলকে নিরস্ত করতে পারেনি (দেখুন, Gaza Situation Report, by George Friedmen)।

এখানে সারকথা হচ্ছে, আরবদের হত্যা করবার নীতির বিপরীতে হামাসের যুদ্ধ নীতি হচ্ছে ইসরাইলিরা যেন এই হত্যাযজ্ঞ থেকে নিরস্ত হয়, সেটা নিশ্চিত করা। সামরিক দিক থেকে সেটা কেবল তখনই সম্ভব যদি ইসরাইলি সৈন্যদের হামাস যথেষ্ট ক্ষতি করতে পারে। অপারেশান কাস্ট লিডে হামাসের হাতে ইসরাইলি সৈন্য মারা গিয়েছিল দশজন। ফ্রিডমেন বলতে চাইছেন ইসরাইলকে নিরস্ত করার জন্য এটা যথেষ্ট ছিল না। ইসরাইলিরা নারী ও শিশুসহ কমপক্ষে ১৩০০ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে। প্রায় চার হাজার বাড়িঘর ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছিল তারা। গাজায় কোনো ঘরবাড়ি অক্ষত ছিল না। কিন্তু তারপরও হামাস দমেনি।



হামাস এরপর থেকে তাদের রকেট বানানোর কৃৎকৌশল উন্নত করতে মনোযোগী হয়। স্বল্পপাল্লার রকেটের জায়গায় তারা এখন দূরপাল্লার রকেট বানাচ্ছে। ইসরাইলি সৈন্যদের ওপর বিস্তর ক্ষতি সাধনের ক্ষমতা অর্জন ছাড়া ইসরাইলিদের আরব হত্যা নীতি থেকে নিরস্ত করা সম্ভব নয়। ইসরাইল এই নীতিটা কার্যকর করছে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবার কথা বলে। ইসরাইল ও তাদের মিত্ররা দাবি করে, আন্তর্জাতিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার মধ্যে নিজেকে রক্ষা করার অধিকার ইসরাইলের আছে। কিন্তু বিপরীতে ইসরাইলের হাত থেকে মজলুমের নিজেকে রক্ষার অধিকার ইসরাইলের মিত্ররা স্বীকার করে না। আন্তর্জাতিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার এই অসম ক্ষমতা সম্পর্কের মধ্যে ফিলিস্তিনিরা যারপরনাই নিরাপত্তাহীন। ইসরাইলের হত্যা নীতির মুখে তাদের সামনে দুটো পথ মাত্র খোলা। এক. ইসরাইলের আরব হত্যা নীতির মুখে কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া, অথবা প্রাণপণ যুদ্ধ করা।



হামাস দ্বিতীয় পথটাই বেছে নিয়েছে। আর এই নীতিটাই ফিলিস্তিনিদের মধ্যে তাদের জনপ্রিয়তার কারণ। যারা এই বাস্তবতা না জেনে এবং ইসরাইলের যুদ্ধ নীতি সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান ছাড়া কেন হামাস রকেট ছোড়া বন্ধ করে না বলে হাঁসফাঁস করছেন, আশা করি তারা তাদের ভুল বুঝবেন। হামাসের প্রতিরোধ সমর্থন না করার অর্থ ইসরাইলের যুদ্ধ নীতি সমর্থন করা। এই অর্থে যে হাত পা না ছুঁড়ে ফিলিস্তিনিদের আত্মবিলুপ্তির পথ বেছে নিতে বলা। এই নীতি গ্রহণ করলে ইসরাইলিদের হাতে ক্রমাগত নিহত হতে হতে গাজার উদ্বাস্তুরা একদিন বিলুপ্ত হয়ে যাবে। যারা এভাবে ভাবছেন, আশা করি তারা তাদের ভুল বুঝবেন।



হামাস সম্প্রতিকালে যে রকেট বানাতে পারছে, সেটা ইসরাইলের ইহুদি বসতি অবধি পৌঁছাতে পারে। যেটা ত্রিভূজ নামে পরিচিত : জেরুজালেম, তেলআবিব ও হাইফা। ফ্রিডমেন বলছেন, এই সক্ষমতা সত্ত্বেও হামাসের এই অস্ত্রগুলো রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র নয়। ফলে সুনির্দিষ্টভাবে তারা টার্গেটে আঘাত করতে পারে না। কিন্তু তারপরও ফ্রিডম্যান বলছেন, এই রকেট তৈরির পেছনে হামাসের সামরিক উদ্দেশ্য হচ্ছে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর হামাস আঘাত করতে সক্ষম এই খবরটুকু অন্তত ইসরাইলিদের বুঝিয়ে দেয়া। আশা, এতে ইসরাইলিরা কিছুটা নিরস্ত হবে। হামাস ইসরাইলি সেনাবাহিনীকে বুঝিয়ে দিতে চায়, তারা যদি নিরীহ বেসামরিক নারী-পুরুষ ও শিশুদের হত্যা করে, তাহলে লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট করতে অক্ষম হলেও কাসেম ব্রিগেডের রকেট বেসামরিক জায়গাগুলোতে ঠিকই আঘাত করতে সক্ষম। আর যদি হামাস তা করতে বাধ্য হয়, তবে তার দায় দায়িত্ব ইসরাইলের।

এই পরিস্থিতিতে বিশুদ্ধ সামরিক দিক থেকে যদি বিচার করলে দেখা যায় ইসরাইলি সেনাবাহিনীকে হামাস বিপদে ফেলেছে শুধু দূর পাল্লার রকেটের অধিকারী হয়ে নয়, আসলে রকেটগুলো তারা কোথায় রেখেছে, কোথায় রাখে, তার তথ্য লুকিয়ে রাখার ক্ষমতা অর্জন করে। রকেট কোথায় আছে তার খুব কম তথ্যই ইসরাইলিদের জানা। জর্জ ফ্রিডমেনের সামরিক থিসিসের এটাই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। সেই সব রকেট কোথায় কিভাবে ছড়িয়ে আছে সেটা জানা না থাকলে হামাস কোন দিক থেকে কীভাবে আঘাত করবে, সেটা ইসরাইলি সৈন্যদের পক্ষে অনুমান করা কঠিন। অর্থাৎ গোয়েন্দা তথ্যের অপর্যাপ্ততা যেমন ইসরাইলের সামরিক দুর্বলতা, অন্যদিকে সেটাই আবার হামাসের শক্তি। এই শক্তি অক্ষুণ্ন রাখার জন্য হামাস গাজায় ইসরাইলি চরদের ব্যাপারে আগের চেয়েও অনেক বেশি সতর্ক হয়ে গেছে।



রকেট গাজায় স্থল অভিযান চালানোর ইসরাইলি সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ। রকেটগুলো খুঁজে বের করা ইসরাইলি সেনা অভিযানের লক্ষ্য হবে, এটা নিশ্চিত। আকাশ থেকে বোমা মেরে তাদের ধ্বংস করাটাই ছিল সবচেয়ে সুবিধার আর আরামের। কিছু হয়তো তথ্য থাকলে সম্ভব, কিন্তু খুঁজে বের করে ধ্বংস করা ছাড়া ইসরাইলের কাছে আর কোনো সামরিক কৌশল নেই। অতএব গাজায় একটি বড়সড় সামরিক অভিযানের সম্ভাবনা পুরামাত্রায় রয়েছে। কিন্তু সেটা ইসরাইলের জন্য খুব সুখের হবে না।

হামাস অপারেশন কাস্ট লিডের সময়ের চেয়ে এবার অনেক বেশি প্রস্তুত বলে বাইরে থেকে মনে হচ্ছে। ইসরাইলের মারকাভা ট্যাংক উড়িয়ে দেয়ার জন্য হামাসের হাতে অ্যান্টি-ট্যাংক মিসাইল রয়েছে। সামনাসামনি স্থল যুদ্ধে হামাসের সঙ্গে পেরে ওঠা দুঃসাধ্য। গাজার ফিলিস্তিনিদের কিছুই হারানোর নেই। তারা মরবে, কিন্তু মেরেই মরবে। আর এটাই ইসরাইলের জন্য বিপজ্জনক বার্তা। তাছাড়া স্থল অভিযান খুবই ব্যয়বহুল। এর পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় করাও সহজ নয়।



আরবদের হত্যাই ইসরাইলের যুদ্ধনীতি- এই পরিপ্রেক্ষিতে ইসরাইলের স্থল অভিযানের পরিণতি শেষমেশ কী দাঁড়াবে, আমরা এত দূর থেকে নিশ্চিত করে কিছুই বলতে পারি না। তবে এটা বলা যায়, বিশ্বব্যাপী ইসরাইলি নীতির বিরুদ্ধে যে জনমত গড়ে উঠেছে, তাতে হামাসেরই জয় হয়েছে। সেটা রাজনৈতিক দিক। কিন্তু যুদ্ধ ক্ষেত্রের ফলাফল বাইরের মতামত দিয়ে স্থির হবে না। আমাদের অপেক্ষা করে দেখতে হবে স্থল অভিযানের ফল কী দাঁড়ায়।

যারা রাজনীতিকে সমর নীতির দিক থেকে এবং সমর নীতিকে রাজনীতির পাল্লা দিয়ে মাপজোখ করতে পারেন, হামাসের রাজনীতি ও যুদ্ধনীতি থেকে তারা অনেক কিছুই শিখবেন। যদি নিরপেক্ষ জায়গা থেকে তারা বাস্তবতা বিচার করেন, তাহলে হামাসকে প্রশংসা না করে তারা পারবেন না।



চরম ও পরম শক্তিশালী একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মজলুমের পক্ষে দাঁড়িয়ে কীভাবে লড়তে হয়, হামাস তার দুর্দান্ত নজির স্থাপন করেছে। এটা স্বীকার না করে উপায় নেই। আর এটাই মানবেতিহাসে সব সময়ই ইতিহাসের চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। ছাই থেকে পাখা মেলে উড়াল দেবার মতো।

মানুষের ডানা নেই, কিন্তু তার স্বভাবের মধ্যে ডানা আছে। তার পালকগুলো নড়ে ওঠে প্রায়ই। মজলুমের লড়াই যেমন।

(পূর্ব প্রকাশিত যুগান্তর )

2588 জন পড়েছেন

Comments are closed.