গাজা যুদ্ধের ডায়েরি: ইসরাইলি বাহিনীর নারকীয় কর্মকাণ্ডের প্রামাণ্য (পর্ব ০১)

1995 জন পড়েছেন

পশ্চিমা মিডিয়ায় গাজাতে ইসরাইলি হামলার ঘটনা কি আসলেই সঠিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে? এই প্রশ্নে অনেকেই দ্বিধাবিভক্ত। ইসরাইলের নারকীয় হামলা এবং ফিলিস্তিনিদের মানবিক বির্পযয়ের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে অনেক স্থানীয় ফিলিস্তিনি সামাজিক গণমাধ্যমে প্রকাশ করছেন প্রকৃত অবস্থা। তেমনই একজন ফিলিস্তিন নারী 'রাশা এন আবুশাবান', তিনি ফিলিস্তিনে একটি আর্ন্তজাতিক উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত। ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি আর স্থানীয় অদেখা বিষয় নিয়ে তিনি ধারাবাহিকভাবে লিখে চলেছেন। অষ্ট্রেলিয়ান গবেষণা এবং ডায়ালগভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আলোচনা.কম-এর তথ্য সহায়তায় প্রিয়.কম-এর পাঠকদের জন্য ‘রাশা এন আবুশাবান’-এর ডায়েরি অনুবাদ করেছেন আব্দুল্লাহ আল সাফি। ৯ জুলাই ২০১৪ আজ যুদ্ধের প্রথম দিন, 'প্রটেকটিভ এইজ' নামে নতুন এক অপারেশন শুরু করেছে ইসরাইলি বাহিনী। গাজায় বসতি স্থাপনকারী স্থানীয় তিন ইসরাইলি অপহরণ এবং পরে তাদের মৃতদেহ ওয়েস্ট ব্যাংক এলাকায় পাওয়ার পর হতেই ইসরাইলি বাহিনী নতুন করে যুদ্ধের হুমকি দিয়ে আসছিল। ইসরাইলিরা হামাসকে ওই ঘটনার জন্য দায়ী করলেও হামাস ওই ঘটনার সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেনি। ওই অপহরণের ঘটনার পরপরই ইসরাইলি বাহিনী ওয়েস্ট ব্যাংক এলাকায় হামাস নেতাদের বাড়ি-ঘর গুড়িয়ে দেয় এবং শতাধিক ফিলিস্তিনিকে বিনা কারণে গ্রেফতার করে। গত সপ্তাহে এক ফিলিস্তিনি কিশোর (জেরুজালেমের বাসিন্দা) বসতি স্থাপনকারী ইসরাইলিদের হাতে নিহত হয়; অনেকে এটাকে ওই তিন ইসরাইলির মৃত্যুর প্রতিশোধ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন। যদিও গাজার বাসিন্দারা আশা করছিল যে, ইসরাইলি বাহিনীর মাঝে বিষয়টি নিয়ে বেড়ে চলা উত্তেজনা প্রশমনে কাজ করবে। সেই সাথে ইসরাইলি বাহিনী প্রথম দিন থেকেই সাধারণ জনগণের উপর যে নারকীয় হামলা করে আসছে তাতে আমরা গাজার মানুষরা চিন্তিত ও ব্যথিত। সে যাই হোক, যা হবার তা হতে শুরু করেছে; আমরা প্রাণ এবং সম্পদ দুটোই হারাতে শুরু করেছি।

বিমান হামলার আঘাতে এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বোমার শব্দে আমাদের শরীর কেঁপে উঠছে।

ইসরাইলি বাহিনীর প্রতিটি বিমান হামলার আঘাতে এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বোমার শব্দে আমাদের শরীর কেঁপে উঠছে আর প্রতিনিয়ত মনের মধ্যে তৈরি হচ্ছে প্রচণ্ড চাপ। এখন যুদ্ধ শুরু হয়েছে, গাজার ৩৬৫ বর্গ কি.মি. এলাকার প্রায় ১.৭ মিলিয়ন ফিলিস্তিনিদের উপর হাজার হাজার রকেট শেল নিক্ষেপ করে যাচ্ছে ইসরাইলি বাহিনী। আমরা এই অবস্থায় অনুমান করার চেষ্টা করছি, কবে এই হামলা বন্ধ হতে পারে। ২০০৮-২০০৯ সালে 'কাষ্ট লীড অপারেশন' হামলা ২৩ দিন স্থায়ী ছিল, ২০১২ সালে 'পিলার অব ডিফেন্স' অপারেশন ৮ দিন ছিল, এবার কি বেশি নাকি কম? সে যাই হোক, আজকে কেবল একদিন। গতরাতে আমি ঘুমাতে পারি নাই, এক ঘণ্টার জন্যও না। যুদ্ধবিমানের অসহ্য শব্দ আর ড্রোনের মরণঘাতি শীষ প্রত্যক্ষ করতে করতে সারারাত পার করে দিয়েছি। পবিত্র রমজান মাস চলছে, ভোর হওয়ার একটু আগে আমি সেহেরি খেয়েছি। রাত নামার সাথে সাথে বোমা হামলার তীব্রতা বেড়েই চলছিল, আমি খবর পেয়েছিলাম যে ইসরাইলি বাহিনী শুধু সেনা স্থাপনা এবং কৃষি ক্ষেত্রগুলোতে হামলা চালাচ্ছে। সকালের দিকে ঘুমিয়ে পরার আগ পর্যন্ত আমি ওই খবরের দিকে নজর রাখছিলাম। এরপর ক্লান্ত শরীরের প্রচণ্ড বোমা হামলার মাঝেও মাত্র কয়েক ঘন্টার জন্য ঘুমিয়ে পরেছিলাম। প্রতিজ্ঞা করে বলছি, আসলেই সেটা কয়েক ঘণ্টার ঘুম ছিল কারণ যখন বোমা হামলার প্রচণ্ডতায় আমার বিছানা এবং পুরো বাড়ি ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠলো, তখন আমি জেগে উঠলাম। মনে হচ্ছিল আমার হার্টবিট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আমি কয়েক মুহূর্তের জন্য নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না। ঘুম থেকে জেগেই ১০ ফিলিস্তিনির মৃত্যুর খবর পেলাম। আহতও হয়েছে অনেকে, বাড়িঘর ধ্বংসের সাথে সাথে রক্ষা পায়নি মসজিদও। উত্তর গাজা স্ট্রিপ এলাকার বাসিন্দা আবু কাওআরা পরিবারের কয়েকজন একসাথে নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেক শিশু রয়েছে। বিমান হামলার সময় ওই পরিবারের সদস্যরা বাড়ির ছাদে একত্রিত হয়ে হামলাকারীদের দৃষ্টি আর্কষণ করার চেষ্টা করছিলেন যে, তারা সাধারন জনগণ। কিন্তু শত্রু বিমান যুদ্ধের আইন ও মানবতা কোনো কিছুই পাত্তা না দিয়ে সরাসরি ওখানে হামলা করে বসে। ওই হামলায় পরিবারের প্রায় সবাই মারা যায়।

ধ্বংস হয়ে যাওয়া কাওআরা পরিবারের বাড়ি

সেইসময় আমি রেডিওতে শুনতে পেলাম, ইসরাইলি সেনাবাহিনী স্থানীয় রেডিও স্টেশনগুলো দখলে নিয়ে তাদের রেকর্ড করা বার্তা প্রচার করছে। সেই বার্তায় তারা আমাদের বাড়িঘর খালি করতে বলছে এবং আমাদের নিজ ভূমি থেকে নিরাপদে পালিয়ে যেতে বলছে। এও কি সম্ভব? নিরাপদে পালিয়ে যাব আমরা? কিভাবে? যেখানে গাজার সমুদ্র উপকূলে যুদ্ধজাহাজ দাঁড়িয়ে আছে; সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে এবং একবার সীমান্ত পাড়ি দিলে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না; ইসরাইলি সেনাবাহিনী প্রতিটি এলাকায় তল্লাশি ও অমানবিক অত্যাচার করছে; আমাদের আকাশে ইসরাইলি যুদ্ধবিমান; সেই অবস্থায়? ঘটনাবহুল দিন শেষে ইফতারের সময় হয়ে এসেছিল। রেডিও বন্ধ করে ঘরের মধ্যে কিছুটা নিরবতা আনার চেষ্টা করলাম। কিন্তু সেটা কি সম্ভব? আমি চাইলেই কি বাইরের বিমান হামলা এবং বোমা বিস্ফোরণের শব্দ বন্ধ করতে পারবো? সে চেষ্টা বাদ দিয়ে আজানের অপেক্ষায় রইলাম। সৃষ্টিকর্তার কাছে কান্নাভেজা চোখে ও ভারাক্রান্ত হ্নদয়ে দু'হাত তুলে প্রার্থনা করতে লাগলাম সেইসব ফিলিস্তিনি ভাইবোনদের জন্য যারা এই অল্পসময় আগেই তাদের প্রিয়জনদের হারিয়েছেন, হারিয়েছেন বাড়িঘর এবং নারকীয় সময় পার করেছেন। বারবার শুধু এটাই মনে আসছিল যে, আজকে কেবল 'প্রথম দিন', যদিও জানি না ইসরাইলি এই উন্মাদনা কবে-কখন শেষ হবে।

ঘটনাবহুল দিনশেষে ইফতারের সময় হয়ে এসেছিল, বাইরে বিমান হামলা এবং বোমা বিস্ফোরণ

দিনের বেলায় একটি খবর কানে এসেছে, ফিলিস্তিনি আল-কাশেম ব্রিগেড তাদের স্থানীয়ভাবে তৈরি রকেট দিয়ে দক্ষিণ ইসরাইলের নৌঘাটিতে আঘাত হেনেছে। ওই হামলার ফলে ইসরা্লের ভেতরে কিছুটা হলেও ভয় তৈরি হয়েছে। এটা আমাদের কিছুটা হলেও প্রেরণা দিচ্ছিল এইজন্য যে, স্থানীয় যোদ্ধারা ইসরাইলের অমানবিক কর্মকাণ্ডের কিছুটা হলেও প্রতিবাদ করতে পেরেছে, যেখানে আর্ন্তজাতিক মহল একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি। আমরা জানি আমাদের ছোঁড়া ওই রকেট ইসরাইলের খুব একটা ক্ষতি করতে পারবে না। সাথে সাথে এও জানি, ইসরাইল আমাদের রকেটের জবাবে হাজার হাজার প্রাণঘাতি বোমা হামলা করবে। কিন্তু তারপরেও আমরা ঘাতক ইসরাইলসহ নিরব বিশ্বকে এই বার্তা দিতে চাই যে, আমরা আরব বা মুসলিম বিশ্বের সাহায্যের আশ্বাস না পেয়ে অপেক্ষা করিনি, আমরা প্রতিরোধ গড়েছি। কারণ আমরা এখনও বিশ্বাস করি আমরা ন্যায্যতার প্রশ্নে অটল এবং যুদ্ধ-সহ্য করেই আমাদের ন্যায্য দাবি ও ভূমি ফিরে পেতে হবে। যুদ্ধের প্রথম দিনের ২৪ ঘন্টা শেষ। এখন পর্যন্ত ২২ জন নিহত এবং প্রায় ১২৫ জন আহত, যদিও প্রতি মুহূর্তে আহতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। যারা গাজার বাইরে আছেন তাদের কাছে ওই সংখ্যাগুলো নিছকই পরিসংখ্যান মনে হতে পারে। কিন্তু আমরা যারা গাজাতে আছি তাদের জন্য ওগুলো ব্যাথা এবং টেনশন এই ভেবে যে, কে কিছু সময় পরে মৃত্যুবরণ করে ওই সংখ্যা বৃদ্ধি করবো। এই মুর্হুতে আমরা শুধু সৃষ্টিকর্তার কাছে ওই পরিস্থিতি উন্নতির জন্য দোয়া চাইতে পারি, চাইতে পারি পরিস্থিতি সহ্য করার জন্য র্ধৈয্য-শক্তি। আমরা ক্লান্ত-অসহায়, আমাদের একটু বিশ্রাম প্রয়োজন; যাতে করে আমরা যুদ্ধের আরেকটি দিনের ভয়াবহতা মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত হতে পারি। – 

পূর্ব প্রকাশিত প্রিয় ডট কম

1995 জন পড়েছেন

Comments are closed.