যে চিন্তার সংস্কার: কোথায়, কেন ও কিভাবে

3329 জন পড়েছেন

ড. তারিক রমাদানের বিখ্যাত বই ‘Radical Reform: Islamic Ethics and Liberation’ এর উপর Review—
ইসলামের ব্যাপারে যখন সংস্কার কথাটি বলা হয়, তখন নিষ্ঠাবান মুসলমানেরা চিন্তিত হয়ে পড়েন। এর কারণ তিনটি- (১) ইসলামের সংস্কার বলতে ইসলামের আমূল পরিবর্তন মনে হওয়া; (২) মনে হতে পারে যে, সংস্কারের কথা যারা বলেন তারা আসলে পশ্চিমা চিন্তা ও সংস্কৃতির বিভিন্ন (অনৈসলামী) উপাদান ইসলামের মধ্যে সংযোজন করতে চান; (৩) আল্লাহ প্রদত্ত সার্বজনীন ও কালোত্তীর্ণ জীবন বিধান ইসলামের ব্যাপারে ‘সংস্কার’ কথাটি স্ববিরোধী। এই ধরনের উদ্বেগের ফলে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মধ্যে দৃশ্যত সংস্কার বিরোধী মনোভাব সৃষ্টি হয়।
Radical Reform

সংস্কার কোথায় ও কেন?
সংস্কারবাদীরা যেসব বিষয়ে কথা বলছেন সে সবের দিকে লক্ষ্য করলে সহজেই বুঝা যায়, উপর্যুক্ত উদ্বেগগুলোর কোনোটিই সংস্কারের কুফল নয়। বরং কথিত সংস্কারবাদীগণ এমন কিছু জায়গায় সংস্কারের কথা বলছেন যা উপর্যুক্ত ঈমানী চেতনার সাথে শুধু সংগতিপূর্ণই নয়, বরং অনুরূপ সংস্কারকার্য এহেন চেতনার জন্য অপরিহার্য দাবি।
এ ক্ষেত্রে ‘বৃষ্টি ও ছাতা’র উদাহরনটি বিবেচ্য। বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য মাথার উপর ছাতা ধরা হয়; কোনো সময় বৃষ্টির পানি যদি খাড়াভাবে না পড়ে তীর্যকভাবে পড়ে, আর তখনও ছাতাটি বৃষ্টির অবস্থা বুঝে হেলিয়ে না ধরে মাথার উপর খাড়াভাবেই ধরে রাখলে ছাতা ব্যবহারের উদ্দেশ্যটিই ব্যর্থ হবে। বৃষ্টির অবস্থা বুঝে ছাতার এই দিক পরিবর্তনের সাথে ছাতার নিজস্ব গঠন-প্রকৃতিতে কোনো পরিবর্তন হয় না।
ইসলামের নয়, ইসলাম ও জগত সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী সম্পর্কে মুসলিম মানসের পরিবর্তন
সংস্কার প্রস্তাবনামাত্রই ইসলামের চিরন্তন কাঠামোর সংস্কার নয়; বরং ইসলামের প্রকৃতরূপ অনুধাবন করে মানব জীবনের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ইসলামের অধিকতর উপযোগিতা প্রমাণ করার জন্য মুসলিম মানসের পরিবর্তন। মুসলমানদের চিন্তার মধ্যে এক পদ্ধতিগত পরিবর্তন প্রত্যাশা করা হয় এই সংস্কারের মাধ্যমে। কোরআন-সুন্নাহর চিরন্তন সত্য ও সুন্দরের অনুসন্ধানে কোনো প্রকার কুসংস্কার (prejudice) ও স্থবিরতা (stagnancy) যেন ইসলামের প্রকৃতরূপ তুলে ধরার পথে কোনো বাধার কারণ হতে না পারে। যে নদীর স্রোত সতত প্রবাহমান সে স্রোত যেন থেমে না যায়।
ইসলাম হলো জীবন সমস্যার সমাধান। জীবন এগিয়ে চলছে। জীবনের সমস্যাগুলোও ক্রমে রূপান্তরিত হচ্ছে। এমন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ইসলামকে জাগতিক যোগ্যতা ও প্রশ্নাতীত সক্ষমতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। চিরন্তন ইসলামের আধুনিক প্রয়োগ উপস্থাপন করার দায়িত্ব এর অনুসারীদের ওপরই বর্তায়।
খেলাফতের দায়িত্ব কেবল বিধিবদ্ধ ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জীবনের নানা দিক ও বিভাগ খোদা অনর্থক সৃষ্টি করেন নাই। তাই আল্লাহর পছন্দের এক মানব সভ্যতা গড়ে তোলাও খেলাফতের দায়িত্বের অন্তর্ভূক্ত। কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের মর্মার্থ এ দায়িত্বের কথাই বলে, যেমন জ্ঞানের অধিকারী হওয়া, জমিনের বুকে ছড়িয়ে পড়া, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি। এটাও মনে রাখতে হবে যে, কাউকে গোমরাহ বলে দূরে সরিয়ে দিলে, কেবল নিজের লোক ও পরিবেশের মাঝে বিচরণ সীমাবদ্ধ রাখলে, যে কারো চিন্তা সংকুচিত হয়ে আসবে। এর বিপরীতে যখন মনে করা হয় যে, ইসলাম নিয়ে ঐ ‘গোমরাহ’ লোকদের কাছেও যেতে হবে, কেবল তখনই সংশ্লিষ্টদের মধ্যে এক প্রাণান্তকর চেষ্টা চালু হবে- কিভাবে সেই বিভ্রান্ত ব্যক্তির কাছে পৌঁছা যায়; ফলে তাকে বুঝার জন্য, তার জগতে প্রবেশ করার জন্য, তাকে জয় করার জন্য দাওয়াত দানকারী ও সংশোধন প্রচেষ্টায় নিয়োজিতদের চিন্তায় নমনীয়তা ও বিকল্প-চিন্তা আসতে থাকবে। এটি হলো innovative thought।
ইসলাম ও ইসলামী চিন্তা যখন কতক আনুষ্ঠানিক ইবাদত ও আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে এবং জীবনের বৃহত্তর অংশে যখন ইসলামের বলার কিছু নাই মনে করা হয়, তখন সহজেই বুঝা যায় যে মুসলিম মানসের কোথায় সংস্কারের প্রয়োজন। যে জিনিস ইসলামকে বাধাগ্রস্থ করেছে জীবনের সকল ক্ষেত্রে আলো প্রদান করা থেকে তার সংস্কার জরুরি। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী বলেন, ‘প্রবাহমান স্রোতস্বিনী নিস্তব্ধ উপত্যকায় হঠাৎ গতি রুদ্ধ হয়ে যেন ক্ষুদ্র সরেবরে পরিণত হয়ে গেল।’ এই অচলায়তন ও স্থবিরতাকে প্রগতির স্রোতে পরিণত করাই ইসলাম প্রসঙ্গে চলমান ও সম্ভাব্য সংস্কারের লক্ষ্য।
স্পষ্টতই এ ধরনের সংস্কারকে ইসলামের সংস্কার না বলে মুসলিম চিন্তা ও মননের সংস্কার বলাই শ্রেয়। কারণ ইসলাম বা যে কোনো মতাদর্শের অনুসারীদের চিন্তা ও চরিত্রের মধ্যে বিচ্যুতি থাকা অসম্ভব নয়। যেমন একজন মার্কসবাদীর চিন্তা কার্ল মার্কস থেকে ভিন্ন (চিন্তার পরবর্তী বিবর্তনের কারণে) হওয়া সত্ত্বেও তার চিন্তাকে মার্কসবাদী চিন্তাই বলা হয়। তেমনিভাবে ইসলাম হলো তাই যা এর অনুসারী তথা মুসলমানেরা তুলে ধরে (portrait) থাকে। কাগজের পৃষ্ঠার কালো অক্ষরগুলো তো আর কথা বলে না, কথা বলে মানুষ। বস্তু থেকে বস্তুর রং যৌক্তিকভাবে আলাদা করে চিন্তা করা যায়, কিন্তু বাস্তবে আলাদা করা যায় না। তেমনই সম্পর্ক ইসলাম ও মুসলিম চিন্তার মধ্যে।
মনে করুন, কোনো ঈমানদেরকে বর্তমান সময়ে ইসলাম সম্মত জীবনের রূপ কেমন হবে মর্মে প্রশ্ন করা হলো। তিনি বুঝালেন যে, এটি হবে p1। অন্য আরেক জন ঈমানদারকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন P2 হবে। আমরা ধরে নিচ্ছি যে, এ দুজনই কোরআন-সুন্নাহর টেক্সট থেকে জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাদের জবাব একই লাইনের অর্থাৎ P কাঠামোর মধ্যকার হলেও এতদুভয়ের গুণগত পার্থক্য লক্ষনীয়। যেমন একজন বলেছে P1 ও P2 । এ পার্থক্য কোরআন-সুন্নাহর পার্থক্য নয়; পাঠকের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার পার্থক্যের কারণেই একই উৎস অনুসরণ করা সত্ত্বেও জবাব ভিন্ন হয়েছে। একই কোরআন-হাদীস পড়ে কোনো কোনো আলেম বলেছিলেন যে, রাজনীতি হারাম, আবার কোনো কোনো আলেম বলেছিলেন যে, এটি ফরজ। এক সময় ওলামাগণ মনে করতেন যে, ইজতিহাদের দরজা বন্ধ। আবার শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলোভীর চিন্তার প্রভাবে এখনকার ওলামাগণ মনে করেন যে, ইজতিহাদের দরজা খোলা। এভাবে সূফীবাদ ও সূফীবাদ বিরোধী কথাও আমরা এই প্রেক্ষিতে বিবেচনা করতে পারি।
উত্তর নয়, প্রশ্নই প্রথমত জরুরি
যা হোক, কোরআন-সুন্নাহর মতো প্রত্যাদিষ্ট (revealed) টেক্সটসমূহ সীমিত অক্ষরের মাঝে সীমাহীন ভাব, জ্ঞানের বহুমাত্রা এবং চেতনার অসীম শক্তি ধারণ করে থাকে। পাঠক তার সামর্থানুসারে, তাঁর জীবনবোধ অনুসারে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশিকা ঐ পাঠ্য থেকে গ্রহণ করে থাকে। মানুষের জীবনবোধের পরিবর্তনের সাথে সাথে কোরআন-সুন্নাহ থেকে আহরিত জিনিসও ভিন্ন রকম হয়। জীবন সম্বন্ধে সব মানুষের জিজ্ঞাস্য বিষয় এক রকম নয়। তাই জীবন সম্বন্ধে সঠিক প্রশ্ন উপলব্ধি করাটাই সবচেয়ে বড় জ্ঞান। হাজারো পরিবর্তনের মাঝে কোনটি সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু তা অনুধাবন করতে আমাদের গবেষণা যেন কোনো কিছুর দ্বারাই সীমাবদ্ধ হয়ে না যায়।
এ প্রসঙ্গে ড. তারিক রমাদান বলেন, আমাদের খুঁজে বের করতে হবে আমাদের জীবনের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য কোনটি যথার্থ জিজ্ঞাস্য বিষয় (what is the right question about our present and future.)। বর্তমান ও ভবিষ্যতের কোন্ প্রশ্নটি আগে চিন্তা করতে হবে তা অনুধাবন করাটা কেবল নিরলস বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক প্রচেষ্টার মাধ্যমেই সম্ভব হতে পারে। এভাবে সমস্যার কেন্দ্র চিহ্নিত করতে না পারলে এর সমাধানও ফলপ্রসূ হবে না। যে ধরনের প্রশ্ন নিয়ে অগ্রসর হবেন কোরআন তাঁকে সে প্রশ্নেরই জবাব সরবরাহ করবে।
গানের সুরের যেমন শেষ নাই, তেমনি জীবনের সমস্যারও অন্ত নাই। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘লাকাদ খালাকনাল ইনছানা ফি কাবাদ’, অর্থাৎ আমরা মানুষকে সৃষ্টি করে ছেড়ে দিয়েছি সমস্যার মধ্যে। জীবন সমস্যার যেমন শেষ নাই, কোরআনের সমাধান প্রদানের ক্ষমতারও তেমন শেষ নাই। তাই সেখানেই সংস্কার দরকার যেখানে মুসলিম-মানস থেমে যেতে চায়। নিয়ত যতই সহীহ হোক না কেন, চলমান জীবনকে থামিয়ে দেওয়াটা সৎকাজ হতে পারে না, বরং এক দৃষ্টিতে তা একটি অপরাধ। কোরআন শরীফে আছে, ‘ক্বাদ আফলাহা মান যাক্কাহা ওয়াক্বাদ খা-বা মান দাছ্ছাহা’, অর্থাৎ, যে প্রবৃত্তিকে পবিত্র করল সে সফল হলো, আর যে দমন করল সে নিজেকে ধ্বংস করল।
কোরআন পাঠের পদ্ধতি
অতএব, একজন মুসলমানের দৃষ্টিতে কোরআনের স্থায়িত্ব প্রশ্নাতীত হলেও তাঁর এবং অপরাপর মানুষের জীবন সমস্যার সমাধানে স্থবিরতা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এই দিক-নির্দেশনা দানকারী সঠিক চেতনা নিয়ে কোরআন না পড়লে উল্টো ‘গোমরাহ’ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কিন্তু কে বলবে কার পাঠ সঠিক চেতনাভিত্তিক? এখন তো নবী নাই, সাহাবী নাই, তাই এ ব্যাপারে কেউই চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ নয়। এহেন পরিস্থিতিতে মুসলিম চিন্তাবিদগণকে ক্রিটিক্যাল ডায়ালগের মাধ্যমে অগ্রসর হতে হবে। ‘ডায়ালগ’ একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক পদ যার কথা দার্শনিক সক্রেটিস বলেছিলেন এবং বর্তমান জামানায় দার্শনিক রিচার্ড রর্টি বলছেন। ‘ডায়ালগ’ বা ‘কনভার্সেশন’ এর যৌক্তিক ভিত্তি হলো, কোনো মানুষই জ্ঞানের দিক থেকে পূর্ণাঙ্গ নয়; এমনকি একই বিষয়ে দুজন মানুষের জ্ঞান এক রকম হয় না। আবার একই বিষয়ের উপর বহু দৃষ্টিভঙ্গি বহুভাবে দেখলেও খোদার সৃষ্টির রহস্য শেষ হবার নয়। এমতাবস্থায় মুসলিম চিন্তাবিদগণ ডায়ালগের মাধ্যমে অগ্রসর হলে উভয় পক্ষই প্রান্তিকতা থেকে বেঁচে যাবে। এভাবে মুসলিম মানসের যে বিকাশ হবে তাকে তারিক রমাদানের ভাষায় ‘more soul’ বলা হয়। ডায়ালগের তাগিদ হাদিসেও আছে। যেমন: ‘জ্ঞান হলো জ্ঞানী লোকের হারানো ধন, যেখানেই তা পাওয়া যাবে সে তার অধিকারী হবে।’
সংস্কার কিভাবে?
এখন আরো সুনির্দিষ্ট করে বলতে চাই যে এ ধরনের সংস্কার মুসলিম চিন্তার কোথায় ও কিভাবে সম্ভব হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, এক ব্যক্তি একটি ফতোয়া জিজ্ঞাসা করতে চায় বা একটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে চায়। আমরা যদি কোনো প্রকার সংস্কারের ধারণা গ্রহণ না করি, তাহলে প্রচলিত নিয়ম অনুসারে আমরা কোনো এক মাদ্রাসার কম্পাউন্ডে যাবো এবং জেনে নেবো এই মাদ্রাসার মুফতি কে। তখন তাঁর কাছে গিয়ে প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইবো। অপরপক্ষে, আমাদের যদি সংস্কারের ধারণা পরিস্কার থাকে তাহলে আমাদের ফতোয়া সম্বন্ধে প্রথম বিবেচ্য হবে যে, এই সমস্যাটি জীবনের কোন দিক বা বিভাগের মধ্যে পড়ে। অর্থাৎ এটা কি ইবাদত সম্বন্ধে, না মুয়ামালাত বা সামাজিক আচরণের কোনো দিক সম্বন্ধে। যদি ইবাদতের মধ্যে পড়ে, ধরুন ইসতিস্কার নামাযের নিয়ম সংক্রান্ত কোনো প্রশ্ন হয়, তবে আমরা ঐ মুফতির কাছে যাবো যিনি ইবাদতের নিয়ম কানুন (rituals) সম্বন্ধে বিশেষজ্ঞ। কিন্তু আমার জিজ্ঞাস্য বিষয়টি যদি হয় ব্যাংকিংয়ের কোনো জটিলতা সম্বন্ধে, তাহলে আমরা এমন এক ব্যক্তির কাছে যাবোো যিনি মানুষের অর্থনৈতিক লেনদেন সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশগুলো যেমন জানেন ও মানেন, তেমনি ব্যাংকিংয়ের বিষয়েও তিনি বিশেষজ্ঞ। ব্যাংকিংয়ের জ্ঞান তাকে সমস্যার সঠিক বিশ্লেষণ করতে সাহায্য করবে এবং কোরআন-সুন্নাহর জ্ঞান তাকে ঐ সমস্যার এমন সমাধান বের করতে সাহায্য করবে ।
Knowledge of text এবং Knowledge of context
ড. তারিক রমাদানের ভাষায় এ দু’প্রকার জ্ঞান হলো Knowledge of text (কোরআন ও সুন্নাতি রাসূলিল্লাহ) এবং Knowledge of context (জীবন ও জগতের বাস্তব অবস্থার জ্ঞান)। যেমন, কমার্স ও ব্যাংকিং, সমাজ ও সমাজবিজ্ঞান, মানুষ ও মানববিদ্যা, প্রকৃতি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইত্যাদি। Knowledge of text যদি ঔষুধ হয়, তাহলে Knowledge of context হলো রোগের বিশ্লেষণ। রোগের বিশ্লেষণ ছাড়া কোনো ঔষুধই প্রয়োগ করা যায় না। কমার্স ও ব্যাংকিং, সমাজ ও সমাজবিজ্ঞান, মানুষ ও মানববিদ্যা, প্রকৃতি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইত্যাদি হলো জীবন ঘনিষ্ঠ সমস্যার জায়গা। অতএব উক্ত ফতোয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকিংয়ের জ্ঞান সমস্যার সঠিক বিশ্লেষণে সাহায্য করবে এবং কোরআন-সুন্নাহর জ্ঞান সমস্যার সবোর্ত্তম সমাধানে উপনিত হতে সাহায্য করবে।
এখানে আরো একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য। অর্থনীতি বা সংস্কৃতির জ্ঞান গতিশীল বা পরিবর্তনশীল। কারণ সমস্যার প্রকৃতি যুগে যুগে পরিবর্তনশীল। তবে সমস্যার প্রকৃতি পরিবর্তনশীল হলেও নতুন রূপে আগত সমস্যার সমাধানও কোরআনের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে। এ বিষয়ে তারিক রমাদান বলেন, সমস্যার প্রকৃতির পুনঃপুন বদলের সাথে কোরআনের পুনঃপুন পাঠোদ্ধারই (repeated reading) যুগের প্রয়োজন মেটাবে। প্রতিটি পরিবর্তনের সময় পরিবর্তিত অবস্থাকে মনের মধ্যে নিয়ে কোরআনের পাতায় নজর দিলে, পাঠক অনুধাবন করবে যে কোরআন তাঁর সমস্যারই সমাধান উপস্থাপন করেছে, যা কিনা অবস্থা পরিবর্তনের আগে ও বর্তমান পাঠের পূর্বে তাঁর কাছে অনুধাবনযোগ্য ছিল না। এটাই আল-কোরআনের অন্যতম চিরন্তন মুজিজা। সংশ্লিষ্ট যে কোনো সমস্যা সমাধানে কোরআনের এরূপ বহুমূখী যোগ্যতা সম্বন্ধে অনেকেই অবগত নয়। এই অজ্ঞতার এরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছে যে, পাশ্চাত্যে কোনো নতুন জ্ঞান আবিষ্কৃত হলে মুসলমানদের একটা অংশ এ কথা বলে বসে যে, কোরআনে বহু আগেই তা বলা হয়েছে! তাহলে কোরআন সদা-সর্বদা কুরআন তেলাওয়াতকারী মুসলমানেরা স্বতঃপ্রণোদিতভাবে সেই আবিষ্কার আগেভাগেই কেন করতে পারলো না? হর-হামেশাই দাবি করা হয় যে, অমুক অমুক বা সব বিশেষায়িত জ্ঞান ইতোমধ্যেই কোরআনে আছে। যদিও মুসলমানেরা সেটি বুঝে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পাশ্চাত্য পন্ডিতদের ব্যাখা-বিশ্লেষণের পরেই!
স্পষ্টতই মুসলমানেরা কোরআনকে সেইভাবে পড়ে না যেভাবে পড়লে তারা ঐ জ্ঞানের সন্ধান আগে-ভাগেই পেতো। তারিক রমাদান তাই বলেন যে, text ও context এর একটিকে অপরটির সম-মূল্যায়ন করে অগ্রসর হলে তাঁরা মৌলিক ও নব নব জ্ঞানের সন্ধান পাবে। অন্যভাবে বলা যায়, কোরআনের মূল পাঠ ও প্রেক্ষিত-বিবেচনা– এর জ্ঞানসমৃদ্ধ ব্যক্তি আধ্যাত্মিকতা হোক, অর্থনীতি হোক, প্রকৃতি বিজ্ঞান হোক কিম্বা মানবীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্য যে কোনো শাখাই হোক না কেন, যিনি যে জ্ঞানে বিশেষজ্ঞ তিনিই হবেন ঐ বিষয়ের ইসলামী সমাধান প্রদানের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ (competent authority)। অতএব, Knowledge of context এর ক্ষেত্রে যদি কেউ innovative expertise-এর সাথে সাথে Knowledge of revealed text এর ক্ষেত্রেও প্রজ্ঞাবান হয়, তাহলেই শুধুমাত্র মুসলমানেরা ‘কোরআনের আলোকে’ নতুন নতুন সমস্যার সমাধান দিয়ে বিশ্বের মাঝে জ্ঞান ও কর্মের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব প্রদান করতে সক্ষম হবেন। গড়ে উঠবে শক্তিশালী ইসলামী সভ্যতা, যার কথা কোরআনে বলা হয়েছে: ‘তিনিই সেই সত্ত্বা যিনি নবী (সা) কে পাঠিয়েছেন বাস্তবসম্মত দ্বীন ও পথ-নির্দেশসহ যাতে সেটি অন্য সকল দ্বীনের ওপর বিজয়ী হয়’।
‘উসুলুল ফিকাহ’রও সংস্কার
এ ধরনের সংস্কারের ব্যাপারে খোদ সনাতনী ফিকাহর কিতাবগুলো তাগিদ দিয়ে থাকে। ‘ইসলাহ’ ও ‘তাজদীদ’ শব্দ দুটি কোনো নতুন কথা নয়। প্রথমটি ইসলাম অনুসারে জীবন ও সমাজকে সংশোধন করার কথা বলে। দ্বিতীয়টি খোদ ইসলাম সম্পর্কিত চিন্তার সংশোধনকে বুঝায়। যেমন শাহ ওলিউল্লাহ (র) ইজতিহাদের বন্ধ দরজা খুলে দেওয়ার মাধ্যমে চিন্তার সংশোধনের কথা বলেছেন।
ইবাদতের পদ্ধতি জানার জন্য কেবল Knowledge of the text-ই যথেষ্ট, কিন্তু ইবাদতের তাৎপর্য (হাকিকত) ও উদ্দেশ্য (মাকাসিদে শরিয়াহ) জানার জন্য Knowledge of the context-ও দরকার। যেমন, যার কোরআন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান উভয়েরই জ্ঞান আছে তিনি হজ্বের তাৎপর্য অধিকতর ভালোভাবে বুঝবেন ঐ ব্যক্তির চেয়ে, যার জ্ঞান কেবল কোরআনের আক্ষরিক ও ফিক্বহী পাঠের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তেমনিভাবে যাকাতের সাথে অর্থনীতির, নামাজের সাথে সংস্কৃতির, আক্বীদার সাথে দর্শনের অনুরূপ ধরনের সম্পর্ক বিদ্যমান।
রাসূল (সা) এর জীবনে ইবাদতের সাথে Knowledge of context-এর সম্পর্ক
রাসূল (সা) একটি পর্যায় পর্যন্ত পবিত্র ক্বাবার ভিতরে মূর্তি থাকা সত্ত্বেও সেটিকে সামনে রেখে নামায পড়েছেন, রমজানের রাতে স্ত্রী সহবাসের উপর থেকে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন মানুষের অবস্থা বিবেচনা করে, হজ্ব করতে এসেও রাসূলুল্লাহ (সা) হজ্ব না করে সন্ধি করে ফিরে যান অবস্থার কারণে, হুদায়বিয়ার সন্ধিতে নবীজির নাম থেকে ‘রাসূলুল্লাহ’ শব্দটি বাদ দেন অবস্থার কারণে। এ ধরনের বহু উদাহরণ রাসূলুল্লাহ (সা) এর পুরো জিন্দেগীতে দেখা যায়। ইবাদতের ক্ষেত্রে অবস্থা বিবেচনা করে রুখসাতের (ছাড় দেওয়া) প্রশ্ন গ্রহণযোগ্য। যদিও ইবাদতের নির্দিষ্ট পদ্ধতিসমূহের সব ক’টিকে বাতিল করা বা এসবের মধ্যে মৌলিক পরিবর্তন আনার কোনো সুযোগ নাই। যেমন পরিস্থিতির কারণে মূর্তি সামনে রেখে নামায পড়েছিলেন নবীজি। কিন্তু এটি নামাযের নিয়ম হিসাবে গণ্য হয়নি। তুরস্কে বহু বছর পর্যন্ত আরবী ভাষায় আযান দেয়ার ওপর রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা ছিল। তখন মানুষ তাদের পরিস্থিতি মোতাবেকই আমল করেছে। কিন্তু এতে আযানের নিয়মের কোনো পরিবর্তন হবে না।
এখানে আরো একটি জিনিস বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। তা হলো ইবাদতের সাথে মুয়ামালাতের সম্পর্ক। যেমন, রোজার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে যে ব্যক্তি রোজা রাখলো কিন্তু মিথ্যা ছাড়তে পারলো না তার উপোষ থাকা খোদার কোনো দরকার নাই। নামাযের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে যে নামায ফাহেশা ও মুনকার কাজ থেকে মানুষকে দূরে রাখে। এখানে মুনকার বলতে সকল প্রকার অন্যায়-অবিচারকে বুঝায়। নামাযের মধ্যে মানুষ যেভাবে রুকু সিজদার মাধ্যমে আল্লাহর আনুগত্য প্রকাশ করে বাস্তব জীবনেও সে রকম আনুগত্যের ভাবধারার মধ্যে মানুষ থাকবে সেটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে যদি সে খোদার বিদ্রোহী হয় তাহলে তার আনুষ্ঠানিক আনুগত্যের কি মূল্য থাকে? কারণ বাস্তব আচরণ আনুষ্ঠানিক আচরণের সত্যায়ন বলে পরিগণিত হয়। বিপরীত পক্ষে, আনুষ্ঠানিক আচরণ বিশেষ (formal behavior), বাস্তব আচরণের (practical or real behavior) সত্যায়ন নয়। বাস্তব আনুগত্য না থাকলে আনুষ্ঠানিক আনুগত্য কতটুকু অর্থপূর্ণ? ইবাদত মানুষের মনে আল্লাহর আনুগত্যের ভাবধারা সৃষ্টি করে। আর বাস্তব জীবন সেই আনুগত্যেরই প্রকাশ ও প্রমাণ।
আধ্যাত্মিকতা ও কর্ম-তৎপরতা
এভাবে spiritualism ও activism অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। আত্মা যদি পরিশুদ্ধ হয় তাহলে তার প্রভাব কর্মের উপর অবশ্যই পড়বে। আত্মা দূষিত হলে সেটিও কর্মের মধ্যে প্রকাশ পায়। যে ব্যক্তি রুকু-সিজদার মাধ্যমে কেবল আল্লাহরই আনুগত্য প্রকাশ করে এবং কেবল তাকেই ভয় করে সে যদি বাস্তব জীবনেও কেবল আল্লাহরই আনুগত্য করে, কেবল তাঁকেই ভয় করে, বিপদে কেবল তার উপরেই ভরসা রাখে, ফলে অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যেতে তার কোনো দ্বিধা থাকে না, তাঁর আত্মিক পরিশুদ্ধি প্রমাণিত হলো। আর তা যদি না হয় তাহলে বুঝতে হবে তার আধ্যাত্মিক সাধনা তথা তার ইবাদত, যিকির, নামায তার অন্তরকে মানুষের ভয় থেকে পরিশুদ্ধ করতে পারে নাই; অন্যের আনুগত্যের মোহ থেকে পরিশুদ্ধ করতে পারে নাই। তাই তারিক রমাদান বলেন, If you are not spiritually strong, you cannot be politically courageous. অতএব, প্রকৃত ইবাদত বা আধ্যাত্মিকতার যেমন রয়েছে বাস্তব প্রকাশ তেমনি বাস্তব জীবনের সফলতা নির্ভর করে আধ্যাত্মিকতার উপর।
এ পর্যন্ত যে সব আলোচনা করা হলো তা মূলত আত্ম-সমালোচনামূলক কথা বা critical thinking। এরূপ আত্ম-সমালোচনামূলক চিন্তা একেক জনের জন্য একেক রকম। জীবনের নানাবিধ কর্মযজ্ঞে কে কি ধরনের দায়িত্বপালন করেন, তার উপর এটি নির্ভর করে। একজন কৃষক আর একজন ফকিহ সমান নয়। তাঁদের আত্ম-সমালোচনার বিষয়ও সমান নয়। যদিও কৃষক ও কৃষি কাজ, ফকিহ ও ফিকাহ, গবেষক ও গবেষণা পদ্ধতি কেউই বা কিছুই আত্ম-সমালোচনা ও সংস্কারের ঊর্ধ্বে নয়।
Outward looking knowledge এবং inward looking knowledge
এই বিষয়টিকে স্টিফেন টুলমিন এভাবে বলেন যে, মানুষের জ্ঞান ও চিন্তা-পদ্ধতি দুইটি ধারার সমন্বয়ের মাধ্যমে অগ্রসর হয়। এই ধারা দুটি হলো outward looking knowledge এবং inward looking knowledge। প্রথম প্রকার জ্ঞানের বিষয়বস্তু হলো জীবন ও জগত (objects-out-there), আর দ্বিতীয় প্রকার জ্ঞানের বিষয়বস্তু হলো জ্ঞানের কর্তা ও জ্ঞানের পদ্ধতি (subjects and methods of knowledge)। এতদুভয়ের একটি বহির্মূখী চিন্তা অপরটি অন্তর্মূখী চিন্তা। প্রথমটি জ্ঞানের ব্যাপ্তি ঘটায়, দ্বিতীয়টি জ্ঞানের গভীরতা সৃষ্টি করে। জ্ঞানের ব্যাপ্তিতে নতুন কিছু যুক্ত হলে তা জ্ঞানের গভীরতার ক্ষেত্রে নতুন জিজ্ঞাসার সূচনা করে। আবার জ্ঞানের গভীরতার ক্ষেত্রে নতুন কিছু যুক্ত হলে তা ব্যাপ্তির ক্ষেত্রেও নতুন জিজ্ঞাসার সূচনা করে। এভাবে পারস্পরিক প্রভাবের দ্বারা একে অন্যের মধ্যে পরিবর্তন নিয়ে আসে। এভাবে জ্ঞান সৃষ্ট ও বিকশিত হয় ।
জ্ঞানের আধিক্যের সাথে যথার্থতার ভারসাম্য
জ্ঞান আহরণ বা উৎপাদনের সাথে সাথে এর বৃদ্ধি ও পরিমার্জন একটি অন্তহীন চলমান প্রক্রিয়া। জ্ঞানের ক্ষেত্রে ‘সঠিকতা’ বিনা ‘অধিকতা’ বিপদজনক! অধিক জ্ঞান কাম্য নয় যদি তা সঠিক না হয়। এটি ইসলামের জন্য সর্বাধিক প্রযোজ্য। কোরআনে আছে, ‘ইউজিললু বিহি কাছিরান, ওয়া ইয়াহদি বিহি কাছিরা’, অর্থাৎ একই পাঠ অনেককে বিভ্রান্ত (গোমরাহ) করতে পারে আবার অনেকে সঠিক পথেও (হেদায়েত) আসতে পারে। তাই আত্ম-সমালোচনা তথা সংস্কারমূলক চিন্তা ইসলামী চিন্তাবিদদের জন্য সর্বাধিক ও সার্বক্ষণিক প্রয়োজন।
কার্ল পপার’র trial and error method
একই কথা ভিন্নভাবে বলেছেন দার্শনিক কার্ল পপার। তিনি বলেন যে, মানুষের জ্ঞান trial and error method এর মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়। পুরাতন ধারণার ত্রুটি অনুসন্ধান করে তা পরিহার করতে হবে এবং তদস্থলে নতুন জ্ঞান উপস্থাপন করতে হবে। এই নতুনের মাঝে যদি পূর্বেকার মতো ত্রুটি বের হয় তাহলে আরো নতুন জ্ঞান উপস্থাপন করতে হবে। এভাবে পুনঃপুন ‘সংশোধন’র মধ্য দিয়ে জ্ঞানের ‘বৃদ্ধি’ এবং ভ্রান্তি নিরসন ঘটবে।
একটি trial এভাবে হতে পারে– ধারণা করা হলো যে, খোদার ওয়াদা অনুসারে যারা যথাযথ ঈমান অর্জন করবেন তাদেরকে তিনি খেলাফত প্রদান করবেন। দেখা যাচ্ছে, মুসলমানেরা ঈমানের দাবি করছে অথচ তাদের কাছে খেলাফত নাই। এমতাবস্থায় আত্মসমালোচনা করে দেখতে হবে, তাদের ঈমানের মধ্যে কোথায় এবং কী error আছে। সেই error-কে সংশোধন করে আবারও trial করতে হবে যে, ঈমানের ফলে তাঁরা খেলাফতের দিকে এগুচ্ছি কিনা। যদি হয় তবে তাদের ঈমান ও ইলম আপাতত ফলপ্রসূ। আরো দেখতে হবে, ভবিষ্যতের কতদূর পর্যন্ত এই জ্ঞান ও কর্ম-প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ। ভবিষ্যতে যেখানে এটিতে বন্ধ্যাত্ব সৃষ্টি হবে সেখানেই আবার সংস্কারের প্রসঙ্গকে নতুন আঙ্গিকে ভাবতে (incorporate) হবে। এক কথায়, ইসলামসহ যে কোনো সমাজ-আন্দোলনের ক্ষেত্রে সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া।
ইসলামের মধ্যে বাধ্যবাধকতা ও স্বাধীনতার সীমা-রেখা
এ পর্যায়ে, ইসলামের মধ্যে বাধ্যবাধকতা ও স্বাধীনতার সীমা-রেখা বুঝতে হবে। বিষয়টি সংস্কার ও সংরক্ষণশীলতার দ্বন্দ্ব হিসাবে প্রতীয়মান। কোন্ বিষয়ে সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা আছে আর কোন্ বিষয়ে সংস্কারের স্বাধীনতা আছে, তা বুঝতে হবে। ইসলাম মানুষের জন্য হেদায়েত স্বরূপ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্য কতক মৌলনীতি প্রদান করেছে যার ভিত্তিতে জীবন ও সভ্যতা গড়ে তোলার দায়িত্ব মানুষের। যেমন, মানুষের অর্থনীতির ব্যাপারে খোদা কেবল কয়েকটি কথা মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছেন; যথা, যাকাত, সুদ, মজুতদারি, হালাল, হারাম, আল্লাহ সম্পদের মালিক আর মানুষ তার আমানতদার ইত্যাদি হাতেগোনা কয়েকটি মৌলনীতি। এসব হলো বাধ্যবাধকতা, আর এরই ভিত্তিতে কোনো দেশের অর্থনীতি কিভাবে গড়ে তুলতে হবে তা বিবেচনা করার স্বাধীনতা সংশ্লিষ্টদের থাকবে। বিষয়টি বুঝার ক্ষেত্রে ফুটবল খেলার উদাহরণ দেখা যেতে পারে- একজন ফুটবলারকে কিছু বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হয়। যেমন, দাগের বাহিরে যাবে না, হাত বলে লাগবে না ইত্যাদি। এই কয়েকটি বাধ্যবাধকতা মেনে চলা সাপেক্ষে একজন খেলোয়াড় মাঠে স্বাধীনভাবে খেলতে পারেন। তাই দেখা যায়, একেক জন খেলোয়াড় একেক রকম খেলে। তাদের সফলতা তাদের প্রচেষ্টার উপর নির্ভর করে।
একই ধরণ বা প্যাটার্ন ইসলামের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ইসলাম কেবল মৌলনীতির দ্বারা একটি চৌহদ্দি নির্ধারণ করে দেয়, আর সেই সীমারেখার ভিতরে থেকে বাকি সকল কাজের ক্ষেত্রে মানুষ স্বাধীন। মানুষের সফলতাও তার যোগ্যতার উপর নির্ভর করে। দ্বিতীয় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ফুটবল যিনি খেলেন তার জন্যই ফুটবলের নিয়মগুলো প্রযোজ্য। যিনি খেলেন না তার জন্য নয়। তেমনি কোরআনে আধ্যাত্মিকতা, সমাজ, রাষ্ট্র ইত্যাদি সম্বন্ধে খোদার মৌলনীতি ঘোষণা করা হয়েছে শুধুমাত্র তাদের জন্য যারা নিজেদের সাথে সাথে সমাজ ও রাষ্ট্রকে গড়ে তোলার জন্য দায়িত্ব পালনে অঙ্গীকারাবদ্ধ। এই দায়িত্বের জন্যই মানুষকে আল্লাহর খলিফা বলা হয়। (খেলাফতের) এই দায়িত্ব কোনো ইচ্ছাধীন ব্যাপার নয়। আল্লাহ মানুষকে স্বাধীন চিন্তা ও কর্মের ক্ষমতা দিয়েছেন এই দায়িত্ব পালন করার জন্যই। ইবাদতের সাথে সাথে খেলাফতের এ দায়িত্ব অবশ্য পালনীয়।
সংস্কারের উল্লেখযোগ্য দিকসমূহ
১. কোরআন-সুন্নাহ’র জ্ঞান ব্যতিরেকে অন্য কোনো প্রকারের জ্ঞানকে চিরস্থায়ী মনে না করা।
২. ফিকাহসহ জ্ঞানের অন্য সকল শাখার জ্ঞান, জ্ঞানের কর্তা ও জ্ঞানের পদ্ধতিকে পর্যালোচনামূলক অনুধাবনের (critical understanding) অর্ন্তর্ভুক্ত মনে করা।
৩. ইসলামী জ্ঞানের ক্ষেত্রে text ও context-কে সমগুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা।
৪. Spiritualism ও activism-কে পরস্পরের সম্পূরক হিসেবে গ্রহণ করা।
৫. পরিবর্তিত অবস্থার প্রেক্ষিতে কোরআনের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝার জন্য পুনঃপুন পাঠ অব্যাহত রাখা।
৬. নতুন সভ্যতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে কর্মের সাথে সাথে জ্ঞানের ক্ষেত্রেও নেতৃত্ব দানের যোগ্যতা অর্জনের জন্য সচেষ্ট হওয়া। বিশেষ করে সৃজনশীল চিন্তা ও মানব উন্নয়নের লক্ষ্যকে সমুন্নত রাখা আবশ্যক।
৭. মুসলমানদের সাধনা হতে হবে সকল মতের ও পথের মানুষের কল্যাণ চিন্তা ও নীতি। নিছক কৌশল হিসেবে গ্রহণ না করে এ ব্যাপারে আন্তরিক হতে হবে।
৮. সকল প্রকারের প্রান্তিকতাকে পরিহার করে ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার নীতিকে গ্রহণ করতে হবে

3329 জন পড়েছেন

Comments are closed.