ইসলামী মতাদর্শের আলোকে সামাজিক আন্দোলন: পর্ব- ১ — চলবে-

3475 জন পড়েছেন


ভূমিকা:
“প্রথমে ওরা এলো কমিউনিস্টদের ধরতে / আমি প্রতিবাদ করিনি / কেননা আমি কমিউনিস্ট ছিলাম না।
তারপর তারা সোস্যালিস্টদের ধরতে এসেছিল/ আমি প্রতিবাদ করিনি/ কারণ আমি সোস্যালিস্ট ছিলাম না।
তারপর তারা এলো ইহুদিদের ধরতে / আমি প্রতিবাদ করিনি / কারণ আমি ইহুদি ছিলাম না।
তারপর ওরা আমাকে ধরতে এলো / তখন আমার হয়ে প্রতিবাদ করার কেউ অবশিষ্ট ছিল না।”

নায়মোলার প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মান নৌবাহিনীর সাবমেরিনের ক্যাপ্টেন ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি হিটলারের সমালোচক হয়ে ওঠেন। জাতীয় বীর হওয়ার কারণে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে তাকে কারাগারে অন্তরীণ করে রাখা হয়। নায়মোলারের অনুশোচনার উপর্যুক্ত কথাগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি সামাজিক অসঙ্গতি এক পর্যায়ে ও কোনো না কোনোভাবে সবাইকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই দৃষ্টিতে সামাজিক আন্দোলনের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। সামাজিক আন্দোলন সাধারণত ইস্যুভিত্তিক হয় বা কোনো একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণের জন্যে হয়। আবার কোনো আদর্শ বাস্তবায়নের জন্যেও সামাজিক আন্দোলন হতে পারে।

বলাবাহুল্য ইসলামী আন্দোলন মূলত একটি সামাজিক আন্দোলন। এর একটি সুসামঞ্জস্যপূর্ণ তাত্ত্বিক দিক রয়েছে এবং ক্রমবিকাশের ধারায় রাজনৈতিকতা (polity) যার অনস্বীকার্য পরিণতি। ইসলামসহ সামাজিক আদর্শ মাত্রেরই তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক দিক বিবেচনা জরুরি।এর আলোকে ‘ইসলামী মতাদর্শের আলোকে সামাজিক আন্দোলন’-এর তত্ত্ব ও প্রয়োগযোগ্যতার প্রধান দিকগুলোর একটি সুসংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিয়ে এই উপস্থাপনা।
১.১: চিরন্তন জিজ্ঞাসা
প্রত্যেক মানুষের মনেই জীবন, জগৎ ও বাস্তবতা সম্পর্কিত কিছু মৌলিক প্রশ্ন থাকে। মানুষ সব সময় এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে ফিরে। এগুলো শুধু দার্শনিক সমস্যাই নয়, মানুষের জীবনের বাস্তব সমস্যার বিষয়ও বটে। নানা আদর্শ ও মতবাদ এগুলোর বিভিন্ন রকমের তত্ত্বগত সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করেছে, এখনো করছে। কেউ বলেছে, এ জগতের বাইরে কোনো জগৎ ছিল না এবং থাকবে না। আবার কেউ বলেছে, এ ধরনের জগৎ থাকবে, এমনকি মৃত্যুর পর মানুষের এ জগতে পুর্নজন্ম হবে। আর বাস্তবতা সম্পর্কে এসব মতাদর্শের বক্তব্য হলো, যে শক্তিমান সে-ই প্রতিনিধিত্ব কিম্বা প্রভুত্ব করবে, আর যে দুর্বল সে অধীনস্ত থাকবে। অবশ্য কোনো মতাদর্শ বলছে, সবাই সমান হবে। সেক্ষেত্রে সমান বলতে কী বুঝানো হবে, তা নিয়েও বিস্তর মতপার্থক্য রয়েছে।

কোনো কোনো আদর্শ মোটা দাগে এ বিষয়গুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। তাদের মতে, এগুলো কোনো মৌলিক ব্যাপারই নয়। এ ধরনের মতাদর্শ অন্তর্গতভাবে নৈরাজ্যবাদী (Anarchist) হলেও বাহ্যিকভাবে বিভিন্ন পরিশীলিত নামে পরিচিত। যেমন, অজ্ঞেয়বাদ (Agnosticism), সংশয়বাদ (Skepticism) ও নির্বিকারবাদ (Irrelevantism) ইত্যাদি।

১.২: ইসলাম হলো অন্যতম উত্তর
যা হোক, জীবন, জগৎ ও বাস্তবতা সম্পর্কিত এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর অন্যতম উত্তর হলো ইসলাম। তিরমিযী শরীফের একটা হাদীসে এ ব্যাপারে বলা হয়েছে,
عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ (رض) قَالَ اَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلّى اللهِ عَلَيْهِ وَسَلّمَ قَالَ اَلَا اَدُلُّكُمْ بِرَأسِ الْاَمْرِ وَعُمُودِه وَذَرْوَةِ سَنَامِه قُلْتُ بَلى يَا رَسُولَ اللهِ قَالَ رَأسُ الْاَمْرِ الْاِسْلَامُ وَعُمُوْدُه اَلصَّلوةُ وَذِرْوَةُ سَنَامِه اَلْجِهَادُ
অর্থ: মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন, আমি কি তোমাদেরকে বলবো সব কিছুর মূল রহস্য, এর ভিত্তি, এবং এর সর্বোচ্চ চূড়া কী? আমি বললাম, আপনি বলুন হে আল্লাহর রাসূল (সা)! তখন তিনি বললেন, সব কিছুর মূল হচ্ছে ইসলাম, এর ভিত্তি হচ্ছে নামাজ এবং এর সর্বোচ্চ হচ্ছে জিহাদ। [আহমদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ]
কিছু মতাদর্শকে ইসলাম আদতেই প্রত্যাখান করে, কিছু মতাদর্শকে ইসলাম নিজস্ব ছাঁচে গ্রহণ করে, আবার কিছু ‘মতাদর্শ’কে ইসলাম মূলত ব্যবহারিক টুল (working tool) হিসাবে গ্রহণ করে। ইসলাম এই অর্থে অনন্য নয় যে, অপরাপর কোনো ‘মতাদর্শে’র সাথে এর আদৌ কোনো সাযুজ্যতা নাই। বরং অপরাপর সব মতাদর্শের যৌক্তিক, ভালো ও কল্যাণমূলক সব দিকগুলোকে গ্রহণ করার সাথে সাথে সেসবের সংশ্লিষ্ট অসামঞ্জস্যতাসমূহকে দূর করে একটি পূর্ণ (total) প্রস্তাবনা উপস্থাপনার কারণে ইসলাম একটি অনন্য জীবনাদর্শ।

প্লাটোনিক ইউটোপিয়া হতে মতাদর্শ হিসেবে ইসলামের পার্থক্য হলো, ইসলাম উল্লেখযোগ্য সময়ের জন্য বাস্তবায়িত অবস্থায় ছিলো। এর ব্যাপকতর অংশ বিচ্ছিন্নভাবে এখনো বাস্তবে বিদ্যমান, যার পূর্ণ বাস্তবায়ন একবিংশ শতাব্দীতেও সম্ভবপর। সমস্যা হলো, পক্ষ-বিপক্ষ উভয় তরফ হতে ইসলাম নিয়ে প্রচলিত চিন্তাপদ্ধতিগত (paradigmatic) বিভ্রান্তি।

১.৩: কোন ইসলাম?
ইসলামের আবির্ভাবের সময় থেকে এ পর্যন্ত অর্থাৎ প্রায় দেড় হাজার বছরের ইতিহাস অনুযায়ী, ইসলাম বিভিন্ন স্থানে বিভিন্নভাবে আচরিত (practised) হয়েছে। ফলে ইসলামের বিভিন্ন ধরন, মতামত, ব্যাখ্যা ইত্যাদিও গড়ে উঠেছে। তাহলে ইসলামের ভিত্তিতে সামাজিক আন্দোলন সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে ইসলামকে কিভাবে দেখা হবে? এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
এ প্রশ্নের উত্তর হলো, কোরআন ও হাদীসের মতবিরোধহীন সুস্পষ্ট বর্ণাগুলোতে ইসলামের যে ধরন বা রূপ আছে, তাকেই বিবেচনায় নিতে হবে।
সূরা আলে ইমরানের ৭নং আয়াত অনুসারে কুরআনের আয়াতসমূহ দুই শ্রেণীর। যথা: (১) আয়াতে মুহকাম বা দ্ব্যর্থহীন আয়াত এবং (২) আয়াতে মুতাশাবিহ বা দ্ব্যর্থবোধক আয়াত। উক্ত আয়াতে বলা হয়েছে, মুহকাম আয়াতসমূহই ‘উম্মুল কুরআন’ তথা কুরআনের ভিত্তি। অর্থাৎ মানুষের অনুসরণের (হেদায়াত) জন্য পবিত্র কুরআনের দ্ব্যর্থহীন আয়াতসমূহ যথেষ্ট। বাদবাকী দ্ব্যর্থবোধক (রূপক) আয়াতগুলোর ওপর শুধুমাত্র বিশ্বাস পোষণ করতে হয়। দুনিয়ার এই জীবনের সাথে প্রায়োগিক দিক থেকে সংশ্লিষ্ট না হওয়ায় সেগুলোর গুঢ় তাৎপর্য অনুসন্ধান প্রচেষ্টাকে ‘ফিতনা’ বা বিপর্যয়ের কারণ বলা হয়েছে। সারকথা হলো, ইসলামের যে বিষয়গুলো কোরআন ও হাদীসে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, ইসলামকে সেগুলো দিয়েই সংজ্ঞায়িত করার বিকল্প নাই।

১.৪: ইসলামের ভাষ্য-পদ্ধতি (Methodology of Interpretation of Islam)
কেবল ইসলামই নয়, বরং যে কোনো আদর্শের অনুসারীরাই স্থান-কাল-পাত্রভেদে নিজেদের মতো করে সংশ্লিষ্ট আদর্শকে অনুসরণ করে।তাই ইসলামকে বুঝার জন্য বা ‘ইসলামী’ কোনোকিছুকে বুঝার জন্য ‘লোকজ ইসলামে’র গুরুত্ব ও বিবেচনা নিতান্তই প্রাসঙ্গিক (relevant)। কোরআন-হাদীসের মতো প্রামাণ্য ও মৌলিক পাঠ্যগ্রন্থ থাকায় কেবলমাত্র অনুসারীদের আচার-নির্ভর পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে ইসলামের মতো মতাদর্শ সম্পর্কে ধারণা করা যথোচিত নয়। তাই, ইসলাম সম্পর্কে ভাষ্যদানের ইতিহাসনির্ভর পদ্ধতির (historical approach) চেয়ে বিষয়নির্ভর পদ্ধতি (thematic approach) অধিকতর গ্রহণযোগ্য এবং গবেষণা-নৈতিকতার দাবি।

১.৫ ও ১.৬: ধর্ম ও রাজনীতি
ধর্ম ও রাজনীতি হলো দুটি নিতান্তই প্রাসঙ্গিক ও অতিসংবেদনশীল বিষয়। ঐতিহাসিকভাবে ইসলাম ‘ধর্ম’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ইসলামের ‘ধর্ম-পরিচিতি’র প্রেক্ষিত কিম্বা যৌক্তিকতা এই আলোচনার বিষয়বস্তু নয়। বরং উপর্যুক্ত বিষয়নির্ভর ব্যাখ্যা পদ্ধতির নিরিখে অতি সংক্ষেপে ধর্ম ও রাজনীতির দিক থেকে ইসলামকে বুঝার জন্য চেষ্টা করা হবে –
ধর্ম:
ধর্ম বলতে কী বুঝায়, তা নিয়ে একাডেমিক আলোচনা-পর্যালোচনা হতে পারে। ধর্মের সংজ্ঞা নির্ধারণ কিম্বা প্রচলিত সংজ্ঞাগুলো বিশ্লেষণের চেয়ে ধর্মের একটি বিশেষ পরিচিতিমূলক বৈশিষ্ট্য নিয়ে যদি আমরা ভাবি, তাহলে সবাই অন্তত এই একটি বিষয়ে একমত হবেন, ‘আধ্যাত্মিকতা’ই হলো ধর্মের মূল পরিচয়। বিশেষত নিরীশ্বরবাদী বৌদ্ধ ধর্মমতের কারণে ঈশ্বরতত্ত্বকে ধর্মের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য বা লক্ষণ হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। অথচ, বস্তজগতের পরিপূরক কিম্বা অতিবর্তী হিসেবে দেহাতিরিক্ত একটি সত্ত্বা এবং এর ‘মুক্তি’কে সব ধর্মেই বিবেচনা (address) করা হয়েছে। ইসলামের মধ্যে এই বস্তু-অতিবর্তী চিন্তা তথা আধ্যাত্মিকতার প্রসঙ্গ অপরিহার্যভাবে এসেছে। এর সাথে রয়েছে খোদার অস্তিত্ব, পরকাল, প্রার্থনা-পদ্ধতিসহ ধর্মের অপরাপর বৈশিষ্ট্যসমূহ। এই দৃষ্টিতে ইসলাম একটি ধর্ম বটে।
কিন্তু ইসলামের দিক থেকে অভিনব ব্যাপার হচ্ছে, ইসলামে ধর্মের কিছু সাধারণ (common) বিষয়কে অস্বীকার করা হয়েছে! পরম সত্ত্বা তথা ঈশ্বরের সাথে সসীম মানবের মধ্যস্থতাকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে সব ধর্মে যাজকতন্ত্রের স্বীকৃতি রয়েছে, অথচ ইসলাম তা অস্বীকার করেছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলছেন,

وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ- أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ
অর্থ: ‘আর, আমার বান্দারা যখন আমার সম্পর্কে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে; তখন তাদের বলে দাও, নিশ্চয় আমি অতি নিকটে। আমি আহ্বানকারীর আহ্বানে সাড়া দেই যখন সে আমাকে আহ্বান করে।’ [সূরা বাকারা : ১৮৬]

এর পাশাপাশি পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,
لَيْسَ الْبِرَّ أَنْ تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلَٰكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ وَآتَى الْمَالَ عَلَىٰ حُبِّهِ ذَوِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَالسَّائِلِينَ وَفِي الرِّقَابِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَالْمُوفُونَ بِعَهْدِهِمْ إِذَا عَاهَدُوا ۖ وَالصَّابِرِينَ فِي الْبَأْسَاءِ وَالضَّرَّاءِ وَحِينَ الْبَأْسِ ۗ أُولَٰئِكَ الَّذِينَ صَدَقُوا ۖ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
অর্থ: তোমাদের মুখ পূর্ব দিকে বা পশ্চিম দিকে ফিরাবার মধ্যে কোনো সওয়াব নেই। বরং সওয়াবের কাজ হচ্ছে এই যে, মানুষ আল্লাহ‌, কিয়ামতের দিন, ফেরেশতা, কিতাব ও নবীদেরকে মনে-প্রাণে মেনে নেবে এবং আল্লাহ‌র প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজের প্রাণপ্রিয় ধন-সম্পদ, আত্মীয়-স্বজন, এতীম, মিসকীন, মুসাফির, সাহায্য প্রার্থী ও ক্রীতদাসদের মুক্ত করার জন্য ব্যয় করবে। আর নামায কায়েম করবে এবং যাকাত দান করবে। যারা অঙ্গীকার করে তা পূর্ণ করবে এবং বিপদে-অনটনে ও হক-বাতিলের সংগ্রামে ধৈর্যধারণ করবে, তারাই সৎ ও সত্যাশ্রয়ী এবং তারাই মুত্তাকী। [সূরা বাকারা:১৭৭]

এই আয়াতে সওয়াব তথা কল্যাণজনক কাজের যে বর্ণনা দেয়া হয়েছে, তার সবগুলোই ব্যক্তির সামাজিক দায়িত্বের সাথে সংশ্লিষ্ট। কোরআন ও হাদীসে এমন বেশকিছু বর্ণনা পাওয়া যায়, যা দৃশ্যত ধর্ম-বিরোধী।

রাজনীতি:
‘‌ধর্মে’র বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে ইসলামে ধর্মের পক্ষে ও বিপক্ষে উপাদান বিদ্যমান। ইসলামে ধর্মবিরোধী অবস্থানের অন্যতম নিদর্শন হলো এতে রাজনৈতিক প্রসঙ্গের উপস্থিতি। বিবেচনার বিষয় হলো, ইসলামে রাজনীতির প্রসঙ্গ কি শুধুই প্রসঙ্গ নাকি মৌলিক? নিরপেক্ষ বিবেচনায় মানুষের কল্যাণের বিষয়টিকে ইসলামে সামগ্রিকভাবে দেখা হয়েছে। যার ফলে, সংশ্লিষ্ট সব তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক দিককে এখানে সমন্বয় করে একটি পূর্ণ, সামগ্রিক ও সুসামঞ্জস্য জীবন-পদ্ধতি হিসেবে একে উপস্থাপন করা হয়েছে।
ধরা যাক, কোনো তত্ত্ব বা আদর্শ বা ‘কোনো কিছু’ কী হলে ধর্ম হবে তা স্বাধীনভাবে ও গবেষণা দৃষ্টিকোণ হতে (from academic point of view) নির্ধারণ করা হলো। কী কী বৈশিষ্ট্য থাকলে ‘কোনো কিছু’ একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসেবে গণ্য হবে, তাও নির্ধারণ করা হলো। এই নির্ধারিত বৈশিষ্ট্যসমূহের আলোকে ইসলামকে যাচাই করলে দেখা যাবে ইসলামে ধর্ম কিম্বা রাজনীতির কোনোটিই কম গুরুত্ববহ নয়। ধর্ম, রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, সমাজসহ সব মানবিক বিষয়কেই ইসলামে স্ব স্ব ক্ষেত্রে সবিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। যদি তা-ই হয়, সেক্ষেত্রে ‘ইসলাম একটি অরাজনৈতিক ধর্ম’ কিম্বা ‘ইসলাম হলো রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট একটি ধর্ম’ কিম্বা ‘রাজনীতি হলো ইসলাম ধর্মের লক্ষ্য’– এই সব ধারণাই প্রান্তিক এবং ভুল। এর পাশাপাশি বিষয়নিষ্ঠভাবে না দেখে, ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার প্রেক্ষিতে ইসলামকে রাজনীতিতে ব্যবহারের একটা উদ্দেশ্য প্রণোদিত সাম্প্রতিক প্রবণতাও লক্ষ্যণীয়।
সারকথা হলো, ইসলাম একটি অনন্য মতাদর্শ যা নিজ নিজ অবস্থানে রেখে ধর্ম ও রাজনীতিসহ মানব জীবনের সবগুলো দিককে বাস্তবসম্মতভাবে সমন্বিত করেছে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেছেন,
وَلَقَدْ صَرَّفْنَا لِلنَّاسِ فِي هَٰذَا الْقُرْآنِ مِنْ كُلِّ مَثَلٍ
অর্থ: আমি এই কোরআনে মানুষদের জন্য প্রত্যেক বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছি। [সূরা বনী ইসরাইল : ৮৯]
— চলবে–

3475 জন পড়েছেন

Comments are closed.