কী বোমা ফাটালেন বঙ্গতাজকন্যা!

2032 জন পড়েছেন

বইটি সম্পর্কে আমি প্রথম শুনলাম মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর কাছ থেকে। আমার সাথে ড. আসিফ নজরুলও ছিলেন। বাংলাভিশন টেলিভিশনের টকশো ফ্রন্ট লাইনের স্টুডিওতে ঢোকার আগে মতি ভাই বললেনÑ বইটির মধ্যে অসাধারণ চমকপ্রদ কিছু তথ্য আছে। তিনি সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না বইটির চুম্বক অংশগুলো ধারাবাহিকভাবে মানবজমিনে ছাপাবেন কি না? ড. আসিফ নজরুল ও আমি উভয়েই তাকে উৎসাহিত করলাম। পরদিন মানবজমিনে বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা শারমিন আহমদের লেখা বইয়ের কিছু অংশ প্রকাশিত হলে সারা দেশে হইচই পড়ে যায়। মরহুম তাজউদ্দীন আহমদের বড় মেয়েকে আমরা রিপি আপা বলেই ডাকি। তার ছোট বোন রিমি আপা যেমন সংসদে আমার সহকর্মী ছিলেন, তেমনি ছোট ভাই সোহেল আমার বন্ধুস্থানীয়।
রিপি আপুর বই নিয়ে অনেকের আগ্রহ থাকলেও আমার কিন্তু তেমনটি ছিল না। আমি মোটামুটি ধারণা করেছিলাম যে, তিনি বইতে কী কী বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন। আমার এই ধারণা বদ্ধমূল হয়েছিল তার সাক্ষাৎকারটি দেখার পর। তাজউদ্দীন আহমদ নেতা ও পিতা বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে তিনি যে বক্তব্য রেখেছিলেন, তার পুরোটাই ইউটিউবে আপলোড করা হয়েছিল। ফেসবুকের মাধ্যমে রিপি আপুর সেই বক্তব্য বহু জনে শেয়ার হতে হতে আমার ওয়ালেও চলে এলো। আমি দেখলাম তিনি বক্তব্য দিতে গিয়ে মাঝে মধ্যেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছেন। কখনো তার চোখ অশ্র“সিক্ত আবার কখনো কথা বলতে বলতে তিনি অভিমানে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ছেন। এরই মধ্যে আবার কণ্ঠনালী ও ঠোঁট শুকিয়ে যাচ্ছিল বেদনাহত হওয়ার কারণে। নিজের এই দুর্বলতা ঢাকার জন্য রিপি আপু ঘন ঘন ঢোক গিলছিলেন এবং জিহ্বা বের করে ঠোঁট সিক্ত করে নিচ্ছিলেন। আমার বুঝতে কোনো কষ্ট হচ্ছিল না যে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে শহীদ তাজউদ্দীন পরিবার যে কষ্ট, বেদনা আর অপমান বুকে ধারণ করে গুমরে গুমরে কাঁদছেন রিপি আপুর বইতে ওই সব বিষয়ই ফুটে উঠবে। আর এসব ঘটনাকে বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসের পূর্বাপর কিছু ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসবেন।
বইটি পড়ার পর মনে হলোÑ আমি যেরূপ ধারণা করেছিলাম, সেরূপভাবেই সব কিছু বর্ণনা করা হয়েছে। বইটি নিয়ে সর্বমহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হলো কিন্তু প্রতিক্রিয়া দেখাল না কেবল আওয়ামী লীগ। আমার মনে হয় আওয়ামী লীগ ঠিক কাজটিই করেছে। অন্য দিকে যারা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন তারা বেশির ভাগই সাময়িক উত্তেজনায় কোনো কিছু আগপাছ না ভেবেই মনের ভাব প্রকাশ করেছেন। কিছুসংখ্যক অবশ্য প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন কেবল রাজনৈতিক কারণেই। তাদের ধারণা আমরা তো আওয়ামী লীগকে কিছু করতে পারলাম নাÑ দেখি এবার তাজউদ্দীন কন্যার বই দিয়ে কিছু একটা করা যায় কি না। এ সম্পর্কে আমার মূল্যায়ন হলোÑ রিপি আপু বইতে এমন একটি বাক্যও সংযোজিত করতে পারেননি, যা ১৯৬৯ থেকে ১৯৭২ ও ১৯৭৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ-বিরোধীরা বলেননি বা লিখেননি। পার্থক্য কেবল এতটুকুই যে, কথাগুলো ইতঃপূর্বে বলতেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, ওলি আহাদ, আতাউর রহমান, আবুল মনসুর আহম্মদ, অ্যাডভোকেট আব্দুল হামিদ চৌধুরী, ফজুলল কাদের চৌধুরী, খান এ সবুর, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, হলিডের এনায়েত উল্লাহ খান, রয়টার্সের আতিকুল আলমসহ হাসানুল হক ইনু, আ স ম আবদুর রব, মেজর জলিল, সিরাজ শিকদার, মইনউদ্দিন খান বাদলসহ আরো অনেকে। আর ইদানীং বলছেন মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তি তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা আমার রিপি আপু।
এখন প্রশ্ন হলোÑ প্রায় ৪৫ বছর ধরে বঙ্গবন্ধুবিরোধীদের মুখের ভাষা এবং হাতের লেখা কেন রিপি আপু তার মুখে তুলে নিলেন এবং কলম আর কালির সাহায্যে তাতে প্রাণের সঞ্চার করলেন? এই প্রশ্নের উত্তরও তিনি আকারে-ইঙ্গিতে দিয়েছেন তার সাক্ষাৎকারে। কথাগুলো যখন বলছিলেন তখন তার গলা কেঁপে উঠছিল ও চোখগুলোও অশ্র“সিক্ত হয়ে পড়ছিল। মূলত অভিমান এবং দীর্ঘ দিনের তাচ্ছিল্য, অমূল্যায়ন এবং ইতিহাস থেকে তাজউদ্দীন আহমদকে মুছে ফেলার চেষ্টা দেখে রিপি আপু সাহস করে এগিয়ে এসেছেন। তিনি আবেগতাড়িত কণ্ঠে প্রশ্ন করেছেনÑ আজ মানুষ মেহেরপুরের মুজিবনগরে যায় অথচ নগরের রূপকারের নাম একবারের জন্যও উচ্চারণ করে না। স্বাধীনতা মানেই বঙ্গবন্ধুর নামে মোহময় শক্তিকে যেমন বুঝায়, তেমনি সেই শক্তি কোনো দিনই সফলতার মুখ দেখত না যদি না বঙ্গতাজের সুদৃঢ় নেতৃত্ব না থাকত। তিনি যুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুর মনোভাব, যুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের মধ্যকার আন্তঃবিরোধ, ভারত সরকারের দ্বিমুখী নীতি, মুজিববাহিনী গঠন ইত্যাদি বিষয়ে বেশ কিছু খোলামেলা বক্তব্য দিয়েছেন। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর সাথে তার পিতার দূরত্ব এবং দূরত্বের কারণ সম্পর্কে একেবারেই সাদামাটা কিছু তথ্য দিয়েছেন, যা পাঠক হিসেবে আমার মনের ক্ষুধা মেটাতে পারেনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার পরিচালনায় পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদের যে প্রচ- রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিকবিরোধী ছিল এবং সেই বিরোধে দৃশ্যত তাজউদ্দীন পরাজিত হয়েছেন এবং বঙ্গবন্ধু জয়ী হয়েছেন, সে ব্যাপারে লেখক কিছুই বলেননি।
আমার মনে হয়েছে, সাধারণ বাঙালি সমাজে গৃহকর্তা সাধারণত তার বেদনা ও হতাশার কথা প্রিয়তম স্ত্রীর কাছে বলেন ছেলেমেয়েদের সামনেই। বঙ্গতাজও বলতেন আর তার সহধর্মিণী সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন যেহেতু শিক্ষিতা, রাজনৈতিকভাবে পরিপক্ব ও সচেতন ছিলেন সেহেতু তৎকালীন রাজনীতি নিয়ে তাদের মধ্যে খোলামেলা আলোচনা হতো। বাঙালি সমাজের প্রতিটি পরিবারে যা হয় তাজউদ্দীনের পরিবারেও তা-ই হয়েছেÑ অর্থাৎ গৃহকর্তার কোনো দোষ নেই, সব দোষ প্রতিপক্ষের বা অন্য পক্ষের। ফলে পরিবারের মেয়েরা এবং শিশুসন্তানরা একধরনের একপেশে কথা শুনতে শুনতে যখন পরিণত বয়সে পদার্পণ করেন, তখন আর নতুন করে কোনো কিছু চিন্তাভাবনা করার মানসিকতা থাকে না বা বিকল্প চিন্তার চেষ্টাও করেন না। রিপি আপুর ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটেছে। তার পিতা যখন নেতা হলেন তখন ইন্দো-পাকিস্তান ও ইন্দো-ভারত রাজনৈতিক বলয়ে যে নতুন মেরুকরণ হলো সেই ১৯৬৮ সালে, ঠিক তখন থেকেই বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীন পাশাপাশি এবং একত্রে থাকলেও অনেকগুলো বিষয়ে তারা ছিলেন দুই মেরুর বাসিন্দা। এসব কথা যদি খোলামেলা আলোচনা করি তবে ইতিহাসের দুই মহানায়ক সম্পর্কেই মানুষ আশাহত হবে। যেহেতু রিপি আপু তুলেছেন, তাই কিছু বিষয় আলোচনা না করলেই নয়।
পাকিস্তান জাতির মা মাদার-ই-মিল্লাত মোহতারেমা ফাতেমা জিন্নাহ যখন ৭১ বছর বয়সে ১৯৬৫ সালে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হয়েছিলেন, তখন পূর্ব পাকিস্তানের সব দল সব নেতা মোহতারেমার পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দীনসহ সব আওয়ামী লীগ নেতার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সে দিন আড়াই লাখ লোক ঢাকার রাস্তায় মিছিল করেছিলেন। ফাতেমা জিন্নাহ যখন ফ্রিডম স্পেশাল ট্রেনে করে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম রওনা করলেন তখন রাস্তার দুই পাশে ২৯৩ মাইল লম্বা মানববন্ধনে ১০ লাখ লোক অংশ নিলেন। ফলে ট্রেনটি নির্ধারিত সময়ের ২২ ঘণ্টা পর চট্টগ্রাম পৌঁছাল। মাত্র ৮০ হাজার নির্ধারিত ভোটার যাদেরকে বলা হতো ব্যাসিক ডেমোক্র্যাট সংক্ষেপে বিডি মেম্বরÑ সেই খয়ের খাঁদের ভোটে ১৯৬৫ সালের ২ জানুয়ারি আইয়ুব খান প্রেসিডেন্ট হয়ে গেল। তখন পর্যন্ত ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তাদের এজেন্টদের নিয়োগ করা শুরু করেনি। তবে বাঙালি জাতির দুর্ভাগ্য যে, পূর্ব পাকিস্তানের যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতন এবং এ দেশের শিল্প কারখানা ধ্বংসের প্রথম নীলনকশার সফল বাস্তবায়নে সে দিন আদমজী পাটকলের শ্রমিকদের মধ্যে যে মারামারি বা দাঙ্গা হয়েছিল তার নেপথ্যে একসাথে যুগপৎভাবে কাজ করছিল ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এবং পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই।
১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা সামরিক শাসন জারি করেন। একই বছর ২৭ অক্টোবর জেনারেল আইয়ুব খান ইস্কান্দার মির্জাকে হটিয়ে দিয়ে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হলেন। এরপর ১৯৬৫ সালের ২ জানুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন। এর ঠিক তিন মাস পর অর্থাৎ এপ্রিল মাসে আইয়ুব খান ভারতের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। যুদ্ধ শেষ হয় সেপ্টেম্বর মাসে। এই যুদ্ধের পরই ভারত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে তাদের এজেন্ট নিয়োগ শুরু করে। বঙ্গবন্ধুর ঘোরশত্রুরাও বলতে পারবেন না যে, ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৮ অবধি তার সথে ‘র’ এর কোনো যোগাযোগ ছিল। অধিকন্তু ওই সময়ে বঙ্গবন্ধু মনেপ্রাণে প্রবল ভারতবিদ্বেষী ছিলেন। যদি প্রশ্ন করা হয় এ দেশে কারা কারা ভারতের প্রথম এজেন্ট হিসেবে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় ছিলেন এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছিলেনÑ তাহলে অনেকের চোখই বিস্ময়ে কপালে উঠে যেতে পারে নামগুলো শোনার পর। রিপি আপু তার বইতে এই বিষয়ে কিছুই বলেননি, কিছু ইঙ্গিতও করেননি। কিন্তু কেন! হয়তো ইচ্ছে করেই!
ইদানীং একটি প্রশ্ন ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছেÑ বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন কেন। তার অতীত কিন্তু বলে না যে তিনি ক্ষমতালোভী। ব্যক্তিগত দুর্নীতি, অন্যের ওপর প্রভুত্ব জাহির ইত্যাদি বদনামগুলোও তাকে স্পর্শ করেনি কোনো দিন। তবে তিনি তাজউদ্দীন আহমদকে সরিয়ে কেন রাতারাতি রাষ্ট্রপ্রধান থেকে সরকারপ্রধান হতে চাইলেন। এসব বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে যা জানা যায় তা আজ অনেকের জন্যই বিব্রতকর বলে প্রতিয়মান হবে। বিশেষ করে ওই সময় যারা কট্টরপন্থী ভাতরপ্রেমী ও মার্কিনপ্রেমী বলে চিহ্নিত হয়ে পড়েছিলেন তারা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি দিনকে অ ঘবি ফধু আখ্যায়িত করে নিত্যনতুন চক্রান্তে মেতে উঠেছিলেন। এটি সম্ভবত ১৯৭২ সালের ১২ বা ১৩ জানুয়ারির কথা। জনাব তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধুর হাতে একটি কাগজ ধরিয়ে দিলেন। বঙ্গবন্ধু সেটি পড়লেন। রাগ-ক্ষোভ-অভিমানে তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল, তিনি হুঙ্কার দিয়ে কাগজটি টুকরা টুকরা করে ফেললেন। অনেকেই জানেন সেই কাগজটি সম্পর্কেÑ এবং এও জানেন কী লেখা ছিল তাতে এবং তার চেয়েও ভালো করে জানেন কেন বঙ্গবন্ধু তার অসম বীর বিক্রমী প্রত্যয় দিয়ে সেটি ছিঁড়ে ফেলেছিলেন! কিন্তু আওয়ামী লীগের কোনো বীরপুরুষ কিংবা চেতনাদ-ধারী বুদ্ধিজীবীরা দাদাদের ভয়ে সে কথাটি একবারও বলেননি। আমার মতে সেই দিন থেকেই বঙ্গবন্ধুর সাথে জনাব তাজউদ্দীনের সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে।
বঙ্গবন্ধু ফিরে এলেন ১০ জানুয়ারি ১৯৭২। ইন্দিরা গান্ধীর সাথে প্রথম সাক্ষাতেই তিনি ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের সন, তারিখ ঠিক করে এলেন। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী কথা দিলেন বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন অর্থাৎ ১৭ মার্চে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার শুরু হবে। বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে পড়লেন উল্টো রথেÑ তার দলের বেশির ভাগ প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দ তাকে চাপ দিতে লাগলেন আরো কিছু দিন ভারতীয় সৈন্য রেখে দেয়ার জন্য। সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় হলোÑ মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসের সেই দুর্বিষহ দিনগুলোয় যারা কলকাতা-দিল্লি-আগরতলায় বসে পরস্পরের বিরুদ্ধে খিস্তিখেউড় করতেন এবং একে অপরের সর্বনাশ করার জন্য দিনরাত চেষ্টাতদবির করতেন, সেই অহি-নকুল বা দা-কুমড়া সম্পর্কের নেতৃবৃন্দ ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধভাবে বঙ্গবন্ধুকে চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। এই সময়টাতে আরো একবার বঙ্গবন্ধুর সাথে তাজউদ্দীন আহমদ, ফজলুল হক মনি ও আবদুর রাজ্জাকের সাথে সম্পর্কের টানাপড়েন শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু তার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন এবং ১৭ মার্চ থেকে সৈন্য প্রত্যাহার শুরু হয়ে যায়।
১৯৭৩ সালের জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু সর্বোচ্চ চেষ্টা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও মুসলিম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সাথে সাক্ষাৎ করে সদ্য স্বাধীন দেশটির পররাষ্ট্র ও কূটনৈতিক সম্পর্কের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাহায্যের হাত বাড়ানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ সফর করেন। বাংলাদেশের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের সাথে যে ঔদ্ধত্য ও অসৌজন্যতা দেখান, তা ব্যাংকটির ইতিহাসে কেউ কোনো দিন করেনি। আমাদের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাৎ পর্যন্ত করেননি। আজ আমার জানতে ইচ্ছে করে, জনাব তাজউদ্দীন আহমদ কি কাজটি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে করেছিলেন, নাকি অন্য কারো পরামর্শে! যদি অন্য কারো পরামর্শে করে থাকেন তবে তারা কারা? বঙ্গবন্ধু তার ব্যক্তিত্ব ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই জীবনে কোনো দিন একজনের কথা অন্যজনকে বলতেন না। যাকে যা কিছু বলার তা মুখের ওপরই বলে দিতেন। লোকজন বলত বঙ্গবন্ধু কানকথা শুনতেন। আসল কথা হলোÑ বড় বড় মানুষ কেবল অন্যের বিরুদ্ধে গিবত করার জন্য দিনের পর দিন ৩২ নম্বরের বাড়িতে বা গণভবনে বসে থাকতেন। ওই সব মানুষের কথা না শুনে কোনো উপায় ছিল না। ভদ্রতার খাতিরে তিনি সব কিছুই শুনতেন কিন্তু পারতপক্ষে কোনো মন্তব্য করতেন না। এমন কোনো দিন ছিল না যে, দিনে কমপক্ষে শ’খানেক লোক তাজউদ্দীনের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর কাছে বিষোদগার করেনি। অথচ উত্তরে বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দীন সাহেবের বিরুদ্ধে একটি টুঁ শব্দ করেছেন এমন প্রমাণ কেউ দিতে পারবে না। বঙ্গবন্ধু কিছু বলেননি বটে তবে অন্তরের অন্তস্তলে যে তার রক্তক্ষরণ হচ্ছিল তা তার আপনজনেরা সহেজই বঝুতে পারতেন।
মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং যুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে সব সময়ই আমরা আবেগতাড়িত আচরণ করি। যেখানে আবেগ খুবই প্রবল থাকে সেখানে যে বিবেকের দরজাটি বন্ধ থাকে, সে দিকে হয়তো আমরা নজরই দিই না। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশে কর্মরত বেসামরিক প্রশাসনের একটি বিরাট অংশ মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারকে সমর্থন দিয়ে সরাসরি যুদ্ধে নেমে পড়েন।
এসব কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেকে ছিলেন সচিব এবং জেলা প্রশাসক পদমর্যাদার। তারা তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সরকারি ট্রেজারির বিশাল অঙ্কের অর্থ বস্তা ভরে মুজিবনগর সরকারের কাছে পাঠিয়ে দেন। এই অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫০ কোটি টাকা। ফলে প্রবাসী সরকারকে কারো অনুদানে চলতে হয়নি। আমাদের অর্থেই আমাদের সরকার চলেছে। প্রবাসী সরকারের কর্মকর্তাদের বেতনভাতা, রণাঙ্গনের খরচ ইত্যাদি খাতের ব্যয়গুলো নিয়ে আজ অবধি কিন্তু কোনো অডিট হয়নি। অথচ অডিট হলে অনেক কিছুই জাতির কাছে স্পষ্ট হয়ে যেত।
তাজউদ্দীন আহমদকে যদি কেউ বঞ্চিত করে থাকেন বা অপমান করে থাকেন বা কষ্ট দিয়ে থাকেন, তবে বলতে হবে ভারত সরকারই তাকে বেশি নাজেহাল করেছে। কারণ প্রবাসী সরকার গঠন এবং তাকে প্রধনামন্ত্রী পদে নিয়োগ ভারতই দিয়েছিল। আবার তাকে অপমান বা নিয়ন্ত্রণ বা চাপ প্রয়োগ করার জন্য শেখ ফজুলল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক প্রমুখকে দিল্লিতে ডেকে নিয়ে মুজিব বাহিনীর গঠন ভারতই করেছিল। প্রবাসী সরকারের সামরিক-বেসামরিক শাখার সামন্তরালে সম্পূর্ণ স্বাধীন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে মুজিব বাহিনীর কর্মকা- ছিল তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন প্রবাসী সরকারের মুখে চপেটাঘাতের মতো। এত কিছুর পরও তাজউদ্দীন আহমদ মৃত্যুর পূর্বক্ষণ পর্যন্ত ভারত সরকারের প্রতি তার আস্থা ও বিশ্বাস হারাননি।
ভারতের দক্ষিণপন্থী গ্র“প দিনকে দিন বঙ্গবন্ধুর প্রতি ধৈর্য হারিয়ে ফেলছিলেন। বিশেষ করে ফারাক্কা ইস্যুতে বঙ্গবন্ধুর অনড় অবস্থানের কারণে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছিল। পররাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে ওই সময়ের বন্ধুরাষ্ট্রগুলো গালভরা বুলি দিয়ে আমাদেরকে সন্তুষ্টি করতে চাইত কিন্তু কাজের কাজ কিছুই করত না। ঘরে-বাইরের বহুমুখী চক্রান্তে বঙ্গবন্ধু প্রায় দিশেহারা। ভারত সরকার এবং তাদের এ দেশীয় এজেন্টরা চাচ্ছিল সব কিছুই ভারতের পরামর্শমতো করার জন্য। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনচেতা মানসিকতা এই অধীনতা বরদাশত করতে পারছিল না। ইসলামিয়া কলেজে পড়াকালীন বঙ্গবন্ধু মুসলিম ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে প্রায়ই কংগ্রেসের ছাত্রফ্রন্টের সাথে দ্বন্দ্বসক্সঘাতে জড়িয়ে পড়তেন। বাঙালি ছাত্রদের মধ্যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। পরবর্তীতে স্বাধীন পাকিস্তানে শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রামে অবতীর্ণ হলেও হুট করে তার পক্ষে ভারতপ্রেমী হওয়া সম্ভব ছিল না। এ নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর সাথে ভারতপ্রেমীদের স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল প্রথম থেকেই। কিন্তু ১৯৭৪ সালে এসে এটি বিস্ফোরিত হলো ওআইসি সম্মেলনকে কেন্দ্র করে।
১৯৭৪ সালের ২২ থেকে ২৪ ফেব্র“য়ারিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ওআইসি সম্মেলন। স্থান লাহোর, পাকিস্তান। সম্মেলনে যোগদানের আমন্ত্রণ পাওয়ার পর বঙ্গবন্ধু কথাপ্রসঙ্গে বলেছিলেন তার এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করা উচিত কি না। আর যায় কোথায়, সব ভারতপ্রেমীরা সমস্বরে বলে উঠলেন অবশ্যই যাওয়া ঠিক হবে না। ভারতের সবুজ সঙ্কেত বা অনুমোদন ছাড়া পাকিস্তানে যাওয়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে ঠিক হবে না। এই মুহূর্তে ভারতের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কিছু করা একদম ঠিক হবে না ইত্যাদি।
বঙ্গবন্ধু তার সহকর্মীদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন অবাক বিস্ময়ে। তারপর পাইপে তামাক ভরে তাতে আগুন ধরিয়ে লম্বা এক টান দিলেন। এরপর উঠে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বললেনÑ আমি ওআইসি সম্মেলনে যাবো। তার সহকর্মীরা কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি তার সচিবকে নির্দেশ দিলেন ভুট্টোকে টেলিফোনে সংযোগ দেয়ার জন্য। ভারতপ্রেমীদের মাথায় বাজ পড়ল। তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি শুরু করল, শেখ মুজিব আজ নিজের কবর নিজেই রচনা করলেন।
আজ আমার বড্ড জানতে ইচ্ছে করেÑ কোন প্রেক্ষাপটে খন্দকার মোশতাক প্রেসিডেন্ট হলেন। কোনোভাবেই তো তার প্রেসিডেন্ট হওয়ার কথা ছিল না। কেন-ই বা হঠাৎ করে জাতীয় চার নেতাকে জেলে পুরা হলো এটাও তো হওয়ার কথা ছিল না। ১৫ আগস্টের আগে পরে ঢাকায় ভারতীয় রাষ্ট্রদূত সমর সেন কোথায় ছিলেন? তাজউদ্দীন সাহেবদের জেলে রেখে কেনই বা তিনি তার বাসভবনে খন্দকার মোশতাককে সংবর্ধনা দিলেন। মোশতাক তো কোনোকালে ভারতপ্রেমী ছিলেন না। তিনি ছিলেন পাকিস্তান আমেরিকান লবির লোক। কার ভরসায় খালেদ মোশাররফ পাল্টা কু করলেন। এই সময়ে তো জাতীয় চার নেতার মুক্তি পাওয়ার কথা কিন্তু তা না হয়ে কেন তারা হত্যাকা-ের শিকার হলেন। ১৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের কোন কোন নেতা রাষ্ট্রপতি হতে চেয়েছিলেন বা ভারত কাদেরকে বঙ্গবন্ধুর রক্তের ওপর ক্ষমতায় বসাতে চেয়েছিলÑ এসব প্রশ্নের উত্তর যে দিন মিলবে সে দিনই হয়তো আমরা শহীদ তাজউদ্দীন আহমদকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারব।

-পূর্ব প্রকাশিত নয়াদিগন্ত

2032 জন পড়েছেন

Comments are closed.