এবার আমাদের জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে কিছু বলি-

6594 জন পড়েছেন

যখন পত্র-পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানতে পারলাম আমাদের সরকার এবার স্বাধীনতা দিবস পালন কালে ৯০ কোটি টাকা খরচ করে ৩ লাখ মানুষ দিয়ে আমাদের জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে বিশ্বে ইতিহাস সৃষ্টির আয়োজন করেছেন। তখন থেকেই জাতীয় সঙ্গীত বিষয়ক নানা চিন্তা আমার মনে আকুপাকু করতে থাকে। নিচের টাইপ করা কথাগুলো তার প্রকাশ। তবে এই কর্ম করতে গিয়ে, নেটের যেখানে আমার কাঙ্ক্ষিত বিষয় পেয়েছি সেগুলো কপি-পেস্ট করে নিয়েছি।

এবার আমাদের জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে কিছু বলি-
১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ১ মার্চ গঠিত হয় স্বাধীন বাংলার কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদ। পরে ৩ মার্চ তারিখে ঢাকা শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভা শেষে ঘোষিত ইশতেহারে এই গানকে জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে এই গান প্রথম জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে গাওয়া হয়। এ গানের রচয়িতা ও সুরকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমার সোনার বাংলা গানটি ২৫ লাইনের, সে গান থেকে প্রথম ১০ লাইন আমাদের জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে নির্বাচিত করা হয়েছে।
পাঠকের পড়ার সুবিধার জন্য পুরো ২৫ লাইনের গানটি তোলে দিলাম- এর প্রতিটি ছত্র গভীর মনোযোগ সহকারে পড়ে যাবার জন্য, ২৫ লাইন না পড়লে ১০ লাইনের মর্মমূল আসল চিত্র অবয়ব বুঝা যায়না।

আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি॥

ও মা, ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে,
মরি হায়, হায় রে …..
ও মা, অঘ্রাণে তোর ভরা ক্ষেতে আমি কী দেখেছি মধুর হাসি॥

কী শোভা, কী ছায়া গো, কী স্নেহ, কী মায়া গো—
কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে।
মা, তোর মুখের বাণী আমার কানে লাগে সুধার মতো,
মরি হায়, হায় রে—
মা, তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা, আমি নয়নজলে ভাসি॥

বাকি ১৫ লাইন-
তোমার এই খেলাঘরে শিশুকাল কাটিল রে,
তোমারি ধুলামাটি অঙ্গে মাখি ধন্য জীবন মানি।
তুই দিন ফুরালে সন্ধ্যাকালে কী দীপ জ্বালিস ঘরে,
মরি হায়, হায় রে—
তখন খেলাধুলা সকল ফেলে, ও মা, তোমার কোলে ছুটে আসি॥

ধেনু-চরা তোমার মাঠে, পারে যাবার খেয়াঘাটে,
সারাদিন পাখি-ডাকা ছায়ায়-ঢাকা তোমার পল্লীবাটে,
তোমার ধানে-ভরা আঙিনাতে জীবনের দিন কাটে,
মরি হায়, হায় রে—
ও মা, আমার যে ভাই তারা সবাই, তোমার রাখাল তোমার চাষি॥

ও মা, তোর চরণেতে দিলেম এই মাথা পেতে—
দে গো তোর পায়ের ধূলা, সে যে আমার মাথার মানিক হবে।
ও মা, গরিবের ধন যা আছে তাই দিব চরণতলে,
মরি হায়, হায় রে—
আমি পরের ঘরে কিনব না আর, মা, তোর ভূষণ বলে গলার ফাঁসি॥

এই গান রচনার ইতিহাস সম্পর্কে যা জানা যায়-
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জমিদারি কাজকর্ম দেখ ভাল করতে মাঝে মধ্যে পূর্ব বাংলার শিলাইদহে আসতেন। সে সময়ে গগণ নামের এক ডাক পিয়নের সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিচয় হয়। গগণ ডাক পিয়ন হলেও তিনি মূলতঃ একজন বাউল ছিলেন। তাই রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে তাকে বাউল গান গেয়ে শুনাতে হতো। এই শুনানো বাউল গীতের মধ্যে একটি গীত ছিলো-
আমি কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যে রে –
হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে দেশ বিদেশে বেড়াই ঘুরে।
লাগি সেই হৃদয়শশী সদা প্রাণ হয় উদাসী
পেলে মন হত খুশি দেখতাম নয়ন ভরে।
আমি প্রেমানলে মরছি জ্বলে নিভাই অনল কেমন করে
মরি হায় হায় রে
ও তার বিচ্ছেদে প্রাণ কেমন করে
ওরে দেখ না তোরা হৃদয় চিরে।
দিব তার তুলনা কি যার প্রেমে জগৎ সুখী
হেরিলে জুড়ায় আঁখি সামান্যে কি দেখিতে পারে
তারে যে দেখেছে সেই মজেছে ছাই দিয়ে সংসারে।
মরি হায় হায় রে –
ও সে না জানি কি কুহক জানে
অলক্ষ্যে মন চুরি করে।
কুল মান সব গেল রে তবু না পেলাম তারে
প্রেমের লেশ নাই অন্তরে –
তাইতে মোরে দেয় না দেখা সে রে।
ও তার বসত কোথায় না জেনে তায় গগন ভেবে মরে
মরি হায় হায় রে –
ও সে মানুষের উদ্দিশ যদি জানুস কৃপা করে
আমার সুহৃদ হয়ে ব্যথায় ব্যথিত হয়ে
আমায় বলে দে রে।
গগন পিয়নের এই গানটি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “কথা নিতান্ত সহজ, কিন্তু সুরের যোগে এর অর্থ অপূর্ব জ্যোতিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। এই কথাটিই উপনিষদের ভাষায় শোনা গিয়েছে, “ত্বং বেদ্যং পুরুষং বেদ মা বো মৃত্যু পরিব্যথাঃ” – যাকে জানবার সেই পুরুষকেই জানো, নইলে যে মরণ-বেদনা। পণ্ডিতের মুখে এই কথাটিই শুনলুম, তাঁর গেঁয়ো সুরে, সহজ ভাষায় – যাঁকে সকলের চেয়ে জানবার তাঁকেই সকলের চেয়ে না-জানবার বেদনা – অন্ধকারে যাকে দেখতে পাচ্ছে না যে শিশু, তারই কান্নার সুর – তার কণ্ঠে বেজে উঠেছে। “অন্তরতর যদয়ামাত্মা” – উপনিষদের এই বাণী এদের মুখে যখন “মনের মানুষ” বলে শুনলুম, আমার মনে বড়ো বিস্ময় লেগেছিল।”
গগন পিয়নের এই গানটির সুর অবলম্বনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেছিলেন তাঁর বিখ্যাত গান “আমার সোনার বাংলা”। গানটি রচিত হয়েছিল ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে। গানটির আসল পাণ্ডুলিপি নাকি পাওয়া যায়নি, তাই এর সঠিক রচনাকাল জানা যায় না। সত্যেন রায়ের রচনা থেকে জানা যায়, ১৯০৫ সালের ৭ আগস্ট কলকাতার টাউন হলে আয়োজিত একটি প্রতিবাদ সভায় এই গানটি প্রথম গীত হয়েছিল। এই বছরই ৭ সেপ্টেম্বর (১৩১২ বঙ্গাব্দের ২২ ভাদ্র) সঞ্জীবনী পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের সাক্ষরে গানটি মুদ্রিত হয়। এই বছর বঙ্গদর্শন পত্রিকার আশ্বিন সংখ্যাতেও গানটি মুদ্রিত হয়েছিল। বিশিষ্ট রবীন্দ্রজীবনীকার প্রশান্তকুমার পালের মতে, গানটি ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ২৫ অগাস্ট কলকাতার টাউন হলে অবস্থা ও ব্যবস্থা প্রবন্ধ পাঠের আসরে প্রথম গীত হয়েছিল।
যাক এতক্ষণ উপরে গানের ইতিহাস উল্লেখ করে গেলাম। এবার আমি জাতীয় সঙ্গীত বলতে কি বুঝি- তা বয়ান করছি, কোন ভুল হলে ক্ষমা সুলভ দৃষ্টি দিয়ে আমার ভুল ধরিয়ে দিলে বাধিত থাকব।
জাতীয় সঙ্গীত হচ্ছে এমন একটি জাতিয় গান, জাতীয় স্তব, জাতীয় প্রশস্তি যা একটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ভাবে নির্বাচিত এবং স্বীকৃত। সে গানে সে জাতির সংস্কৃতি, আন্দোলন, সংগ্রাম এবং আত্মপরিচয় প্রকাশ করে এবং ঐ গান শুনে বা গাইলে সে জাতির মানুষজন দেশ এবং তার জাতির প্রতি গর্বিত এবং উদ্দীপ্ত হয়ে উঠে ।
এবার আমরা জাতীয় সঙ্গীতের উল্লেখিত ১০ লাইনের আরো কিছু লাইন আমার ভাবনা উল্লেখ করছি-
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি॥

কবি এখানে চিরদিন প্রাণে বাজায় বাঁশি বলে দাবি করলেও এইটি একটি আবেগ সর্বস্ব বুলি ছাড়া আর কিছু নয় বলেই আমার মনে হয়। কারণ গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহ কালে কৃষাণ, মজুর, শ্রমিকদের জীবন জীবীকার অন্বেষণ কালে তৃষ্ণা পিপাসায় ছাতি ফেটে যাবার আবহ তৈরি হয়ে থাকে, সে সময় সেই সব লোকেরা দুর্বিষহ যন্ত্রণায় ছটফট করার সময় তাদের প্রাণে বাংলার আকাশ বাতাস কখনও কি বাঁশি বাজাতে পারে?
কিংবা মাঘের প্রচণ্ড শীতে বস্ত্রহীন মানুষেররা কুড়ে ঘরে, রেল স্টেশন, ফুটপাতে, বস্তিতে বাসরত মানুষ যখন ত্রাহি ত্রাহি করে কাপতে কাঁপতে নির্জীব হয়ে পড়ে তখন কি সময় তাদের প্রাণে বাংলার আকাশ বাতাস কখনও কি বাঁশি বাজাতে পারে?
কিংবা ঝড় তুফানে যাদের বাড়িঘর উড়ে যায়, রাস্তা কর্দমাক্ত হয়ে পড়ে সে পথ পাড়ি দিতে, চাল চুলা হীন লোক যারা বৃষ্টির পানিতে ভিজে কাক হয়ে পড়ে, সে সময় তাদের প্রাণে বাংলার আকাশ বাতাস কখনও কি বাঁশি বাজাতে পারে?

ও মা, ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে,

তাই? আচ্ছা ভাই যারা এই টাইপটি (লেখাটি) পড়ছেন তাদের মধ্যে কত জন আছেন যে আপনি আমের বন দেখেছেন? রাজশাহী ছাড়া বাংলাদেশের অন্যত্র আমের দু/একটি গাছ থাকলেও বন যে আছে তা আমার জানা নেই। যে গাছটি সর্বত্র নেই, যার ঘ্রাণ সর্ব সাধারণের ঘ্রাণানুভূতিতে ধরা পড়েনা সে ঘ্রাণে কেমন করে বাংলাদেশীরা পাগল হতে পারে?
ও মা, অঘ্রাণে তোর ভরা ক্ষেতে আমি কী দেখেছি মধুর হাসি॥

অঘ্রাণে ভরা ক্ষেতে কবি মধুর হাসি দেখতে পেলেও আজো আমাদের গ্রাম বাংলার কৃষক কূল ভরা ক্ষেত দেখেও তাদের মধুর হাসি তো দুরের কথা দুঃখের হাসিও হাসেনা।
মরি হায়, হায় রে—
জাতীয় সঙ্গীতের এই লাইন যখন পড়ি তখন এই লাইকে বিলাপ জনিত আর্তি বলেই মনে হয়।
আমার কাছে এই গানটিতে কবি দেশকে মাতৃরূপে সংস্থাপন করে কবি তার সমকালীন বাংলার রূপের চিত্রকল্প অংকন করে গেছেন। পৃথিবীতে কোন কিছু চিরন্তন নয়, ঠিক কবি এই গানে যে চিত্রকল্প অংকন করেছিলেন তাও চিরন্তন ছিলোনা। সে চিত্রকল্পে দেশের প্রতি মমত্ববোধ ভালোবাসার প্রকাশ পাচ্ছে ঠিক কিন্তু যখন , “মরি হায়, হায় রে ও মা”- বাক্যগুলো আমার কাছে বিলাপিত আর্তি বলেই মনে হয়। অবশ্য এই বাক্যের ইংরেজি অনুবাদ করা হয়েছে- Ah, what a thrill! বলে!!! আমি বুঝতে পারছিনা “মরি হায়, হায় রে” কেমন করে তার ভাব অনুবাদ Ah, what a thrill! হলো!! আমি জানিনা তদান্তিন পূর্ববাংলার মানুষ কোন কিছুতে চরম রোমাঞ্চিত হয়ে এই ভাবে “মরি হায়, হায় রে” বলে সে রোমাঞ্চের অনুভূতি প্রকাশ করতেন কিনা? এই যুগে আমার জীবত কালে তো আমি শুনিনি!
এবার যদি পাঠক গগনের যে গীতের সুরে অনুপ্রাণিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ এই গানটি সুরাপিত করেছিলেন সে গীতটি খেয়াল করে পড়েন থাকেন, তাহলে বুঝতে পারবেন এই সুর হচ্ছে চরম বিরহের সুর, বন্ধুর সাথে মিলন না হওয়ার বেদনার সুর। গীতটির প্রতিটি বাক্যে ছড়িয়ে আছে সে বিলাপিত আর্তনাদের সুর। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও এই গীতের ব্যাখ্যায় তা উল্লেখ করে গেছেন। পরাধীন ভারতে বংগ-মাতার অঙ্গ বিচ্ছেদে রবীন্দ্রনাথ যখন ব্যকুল হয়ে উঠেছিলেন তখন তিনি তার সোনার বাংলা গানে সে বিলাপিত সুর সংযোজন করেছিলেন।
আমি আবারও উল্লেখ করছি- জাতীয় সঙ্গীত বলতে আমি কি বুঝি-
জাতীয় সঙ্গীত হচ্ছে এমন একটি জাতিয় গান, জাতীয় স্তব, জাতীয় প্রশস্তি যা একটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ভাবে নির্বাচিত এবং স্বীকৃত। সে গানে সে জাতির সংস্কৃতি, আন্দোলন, সংগ্রাম এবং আত্মপরিচয় প্রকাশ করে এবং ঐ গান শুনে বা গাইলে সে জাতির মানুষজন দেশ এবং তার জাতির প্রতি গর্বিত এবং উদ্দীপ্ত হয়ে উঠে ।
আমার উপরে বর্ণিত বক্তব্যকে যাচাই বাচাই করতে চাইলে ভিন্ন দেশের জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশণরত ভিডিও চিত্র দেখার অনুরোধ জানাচ্ছি। দেখুন ঐ সব জাতীয় সংগীত পরিবেশনরত মানুষগুলো বডিল্যাঙ্গুয়েজ কেমন দেখায় আর আমাদের জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন কালে আমাদের বডিল্যাঙ্গুয়েজ কেমন দেখায়। যারা এই নিয়ে বেশি ঘাটাঘাটি করতে সময় পাবেন না তাদেরকে বলছি টি টুয়ান্টি ক্রিকেটে শুরু প্রথমে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়, সেগুলো দেখে আমার কথা যুক্তিযুক্ত কি অসার তা পরিমাপ করে দেখতে পারেন।

6594 জন পড়েছেন

মুনিম সিদ্দিকী

About মুনিম সিদ্দিকী

ব্লগে দেখছি অন্য সহ ব্লগাররা তাদের আত্মপরিচয় তুলে ধরেছেন নিজ নিজ ব্লগে! কুঁজো লোকের যেমন চিৎ হয়ে শোয়ার ইচ্ছা জাগে তেমন করে আমারও ইচ্ছা জাগে আমি আমার আত্মপরিচয় তুলে ধরি! কিন্তু সত্য যে কথা তা হচ্ছে শুধু জন্মদাতা পিতা কর্তৃক আমার নাম আর পরিবারের পদবী ছাড়া আমার পরিচয় দেবার মত কিছু নেই! আমি এক বন্ধ্যা মাটি যেখানে কোন চাষবাস হয় নাই। যাক আমি একটি গান শুনিয়ে আত্মপ্রতারণা বর্ণনা শেষ করছি- কত শহর বন্দরও পেরিয়ে চলেছি অজানা পথে - কালেরও নিঠুর টানে- আমার চলার শেষ কোন সাগরে তা তো জানা নাই! ধন্যবাদ।

Comments

এবার আমাদের জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে কিছু বলি- — ১ Comment

  1. রবীন্দ্রনাথের এ গানে ভাব আছে, ভাষা আছে, ছন্দও আছে। কিন্তু এর বাইরেও এমন কিছু আছে যা একজন মুসলমানের ঈমানের সাথে সাংঘর্ষিক। এ গানে তিনি বন্দনা গেয়েছেন বাংলার ভূমির,এবং সে ভূমির আলো-বাতাস,নদীর কূল,ধানের ক্ষেত,আমবাগান ও বটমূলের। কিন্তু যে মহান আল্লাহতায়ালা সেগুলির স্রষ্টা,সমগ্র গানে একটি বারের ���ন্যও তাঁর বন্দনা দূরে থাক তাঁর নামের উল্লেখ পর্যন্ত নাই।একজন পৌত্তলিকের জন্য এটিই স্বভাবজাত। পৌত্তলিকের এখানেই মূল সমস্যা। এখানে পৌত্তলিকের ভয়ানক অপরাধটি হলো নানা দেবদেবী ও নানা সৃষ্টির নানা রূপ বন্দনার মাঝে মহান আল্লাহকে ভূলিয়ে দেয়ার। এটিই তার শিরক। এবং এজন্যই সে মুশরিক। মহান আল্লাহর বান্দার বহু বড় বড় গোনাহ মাফ করে দিবেন কিন্তু শিরকের গুনাহ কখনই মাফ করবেন না। নবীজী (সাঃ) সে হুশিয়ারিটি বহুবার শুনিয়েছেন। পৌত্তলিক ব্যক্তিটি তার মনের গহীন অন্ধকারের কারণে এ পৃথিবীপৃষ্ঠে অসংখ্য সৃষ্টি দেখতে পেলেও সে সৃষ্টিকূলের মহান স্রষ্টাকে খুঁজে পায় না। রবীন্দ্রনাথও সে সীমাবদ্ধতার উর্দ্ধে উঠতে পারেননি। তাছাড়া গদ্য,পদ্য কবিতা ও গানের মধ্য দিয়ে ব্যক্তির মুখ বা জিহবা কথা বলে না বরং কথা বলে তার চেতনা বা বিশ্বাস। ফলে সে কবিতা ও গানে ব্যক্তির আক্বিদা বা ধর্মীয় বিশ্বাস ধরা পড়ে। তাই “আমার সোনার বাংলা” গানে যে চেতনাটির প্রকাশ ঘটেছে সেটি পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের। কোন মুসলমানের নয়। গানে ইসলামী চেতনার প্রকাশের সামর্থ থাকলে তো রবীন্দ্রনাথ মুসলমান হয়ে যেতেন। পৌত্তলিক চেতনা নিয়েই একজন পৌত্তলিক কবি কবিতা ও গান লিখবেন বা সাহিত্যচর্চা করবেন সেটিই তো স্বাভাবিক। এমন একটি চেতনার কারণেই পৌত্তলিক ব্যক্তি শাপ-শকুন,গরু, বানর-হনুমান,নদ-নদী,বৃক্ষ,পাহাড়-পর্বতকে উপাস্য রূপে মেনে নেয় এবং তার বন্দনাও গায়।এ গানের ছত্রে ছত্রে তেমন একটি পৌত্তলিক চেতনারই প্রবল প্রকাশ ঘটেছে রবীন্দ্রনাথের কলমে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে তাঁর নিজ চেতনার সাথে আদৌ গাদ্দারি করেননি। কিন্তু ইসলামি চেতনার সাথে একজন মুসলমানের গাদ্দারি তখনই শুরু হয় যখন পৌত্তলিক চেতনার এ গানকে মনের মাধুরি মিশিয়ে সে গাওয়া শুরু করে।

    “আমার সোনার বাংলা” গানের প্রেক্ষাপট

    “আমার সোনার বাংলা” গানটি রচনার একটি ঐতিহাসিক পেক্ষাপট আছে। গানটি রচিত হয়েছিল ১৯০৫ সালের পর। বাংলা দ্বিখণ্ডিত হয় ১৯০৫ সালে। পশ্চিম বঙ্গের তুলনায় অর্থনীতি ও শিক্ষাদীক্ষায় অতি পশ্চাদপদ ছিল পূর্ব বঙ্গ। পূর্ববঙ্গের সম্পদে দ্রুত শ্রীবৃদ্ধি ঘটছিল কোলকাতার। শুধু প্রশাসনই নয়,শিক্ষা ও শিল্প গড়ে উঠছিল শুধু কোলকাতাকে কেন্দ্র করে। মুসলমানদের দাবী ছিল বাংলাকে বিভক্ত করা হোক এবং পূর্ববঙ্গের রাজধানি করা হোক ঢাকাকে। সে দাবীর ভিত্তিতে ভারতের তৎকালীন ভাইস রয় লর্ড কার্জন পূর্ব বঙ্গ ও আসামকে নিযে একটি আলাদা প্রদেশ গঠিত করেন। এ নতুন প্রদেশের রাজধানী রূপে গৃহীত হয় ঢাকা নগরী। শহরটি রাতারাতি জেলা শহর থেকে রাজধানী শহরে পরিণত হয়। তখন ঢাকায় কার্জন হলসহ বেশ কিছু নতুন প্রশাসনিক ইমারত এবং হাই কোর্ট ভবন নির্মিত হয়। নির্মিত হয় কিছু প্রশস্ত রাজপথ। প্রদেশটি ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। বাংলার এবং সে সাথে আসামের মুসলমানদের মাঝে আসে নতুন রাজনৈতিক প্রত্যয়। ১৯০৬ সালে গঠিত হয় মুসলিম লীগ যা শুধু বাংলার মুসলমানদের জন্যই নয়, সমগ্র ভারতীয় মুসলমানদের মাঝে সৃষ্টি করে নতুন আত্মবিশ্বাস ও রাজনৈতিক চেতনা। মুসলমানদের এ রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং কোলকাতাকে ছেড়ে ঢাকার এ মর্যাদা-বৃদ্ধি কোলকাতার বাঙালী বাবুদের ভাল লাগেনি।কবি রবীন্দ্রনাথেরও ভাল লাগেনি। পূর্ব বাংলা পশ্চাদপদ মুসলমানদের প্রতি অগ্রসর বাঙালী হিন্দুদের কোন দরদ না থাকলেও খণ্ডিত বাংলার প্রতি তখন তাদের দরদ উপচিয়ে পড়ে। বাংলার মাঠঘাট,আলোবাতাস,জলবায়ু,বৃক্ষরাজী ও ফলমূলের প্রতি আবেগ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লেখেন এ গান। তাই এ গানের একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল। সেটি বাংলার বিভক্তির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা। বাঙালী হিন্দুরা তখন অখণ্ড বঙ্গের দাবী নিয়ে রাজপথে নামে। ১৯১১ সালে ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জ ভারত ভ্রমনে আসেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভারত উপলক্ষে “জনগণ মনোঅধিনায়ক ভারত ভাগ্যবিধাতা” নামে কবিতা লেখেন। ভারতের সেটিই আজ জাতীয় সঙ্গিত।

    রবীন্দ্রনাথ ও বাঙালী হিন্দুদের সে দাবী রাজা পঞ্চম জর্জ মেনে নেন এবং আবার বাংলা একীভূত হয়। প্রচণ্ড ক্ষোভ ও হতাশা নেমে আসে পূর্ব বঙ্গের মুসলমানদের মাঝে। বিক্ষুদ্ধ এ মুসলমানদের শান্ত করতে ভারতের ব্রিটিশ সরকার তখন ঢাকাতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেয়।কিন্তু সেটিও কোলকাতার বাঙালী বাবুদের ভাল লাগেনি। তার মধ্যেও তারা কোলকাতার শ্রীহানীর কারণ খুঁজে পায়। ফলে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধেও বাঙালী বাবুগণ তখন রাজপথে নামেন। খোদ রবীন্দ্রনাথে মিছিলে নেমেছিলেন কোলকাতার সড়কে। এই হলো রবীন্দ্র মানস। সে সাথে বাঙালী হিন্দুর মানস। আর সে মানসকে নিয়ে রচিত সঙ্গিত এখন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত।

    আজকের শতকরা ৯১ ভাগ মুসলমানের বাংলাদেশ রবীন্দ্রনাথের আমলের অবিভক্ত বাংলা যেমন নয়,তেমনি দেশটি ভারতভূক্তও নয়। রবীন্দ্রনাথের অবিভক্ত বাংলায় মুসলমানদের সংখ্যা শতকরা ৫৫ ভাগের বেশী ছিল না। সে আমলের বাংলা ঢাকাকেন্দ্রীকও ছিল না। এখন এটি এক ভিন্ন চরিত্রের বাংলাদেশ -যে দেশে রবীন্দ্রনাথ একদিনের জন্যও বাস করেননি। কোনদিনও তিনি এদেশের নাগরিক ছিলেন না। এদেশের স্বাধীনতার কথা তিনি যেমন শোনেননি,তেমনি এ দেশের শতকরা ৯১ ভাগ মুসলমানদের নিয়ে তিনি কোন স্বপ্নও দেখেননি। ফলে বাংলাদেশের মানুষের চাওয়া-পাওয়া,স্বাধীনতা বা স্বপ্নের প্রতিনিধিত্ব করা কি তাঁর পক্ষে সম্ভব? তাছাড়া এ সঙ্গিতটি সে উদ্দেশ্যে লেখাও হয়নি। জাতীয় সঙ্গিত নির্বাচনের বিষয়টি দোকান থেকে ‘রেডিমেড’ সার্ট কেনার ন্যায় নয়। এটিকে বরং বিশেষ রুচী,বিশেষ আকাঙ্খা,বিশেষ প্রয়োজন মেটাতে অতি বিশেষ গুণের ‘tailor made’ হতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত নির্বাচনের ক্ষেত্রে সে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়নি। বরং এখানে গুরুত্ব পেয়েছে রবীন্দ্রভক্তি ও রবীন্দ্রপুঁজার মানসিকতা।

    বড় ব্যর্থতা ও বড় বিদ্রোহ

    বাংলাদেশের মুসলমানদের বড় ব্যর্থতা এবং সে সাথে মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহটি শুধু এ নয় যে,তারা রাষ্ট্রের বুকে সূদী ব্যাংক,পতিতাপল্লি,মদের দোকান,অশ্লিল ছায়াছবি এবং দেশের আদালতে কুফরি আইনকে আইনগত বৈধতা দিয়েছে এবং মেনে নিয়েছে। আরেক বড় ব্যর্থতা এবং মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে আরেক বড় বিদ্রোহ হলো জাতীয় সঙ্গিত রূপে গেয়ে চলেছে রবীন্দ্রনাথের পৌত্তলিক চেতনাপুষ্ট এ গানটিকে। যারা বেঈমান ও বিদ্রোহী হয় তাদের সে বেঈমানী ও বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে জীবনের সর্বক্ষেত্রেই। সেটি যেমন দেশের আইন-আদালতে কুফরি আইন অনুসরণে এবং রাষ্ট্রে পতিতাপল্লি ও সূদী ব্যংক বহাল রাখার মধ্যে,তেমনি মনের আবেগ ও মাধুারি মিশিয়ে জাতীয় সঙ্গিত রূপে পৌত্তলিক চেতনা সমৃদ্ধ গান গাওয়াতেও। মহান আল্লাহর সাথে তাদের সে বেঈমান-সুলভ গাদ্দারিটা তখন শুধু রাজনীতিতে সীমিত থাকে না,বরং সর্বক্ষেত্রেই সেটি ধরা পড়ে। মুসলিম সংহতির বুকে কুড়াল মারা এবং মুসলিম রাষ্ট্রের বিনাশের ন্যায় হারাম কাজটিও তখন এমন বিদ্রোহীদের কাছে উৎসবে পরিণত হয়। তাছাড়া বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত রূপে এ গানটিকে যে শেখ মুজিব ও তাঁর দলবল নির্বাচন করেছিলেন ইসলামে সাথে তাদের গাদ্দারি কি কম পরিচিত? বাংলাদেশে ইসলামের নামে দলবদ্ধ হওয়া এবং ইসলামের শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠার রাজনীতিকে মুজিব সাংবিধানিক ভাবে নিষিদ্ধ করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রামে কোরআনের আয়াত এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ইসলাম ও মুসলিম শব্দগুলি তাঁর কাছে বরদাশত হয় হয়নি। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম থেকে যেমন কোরআনের আয়াতকে সরিয়েছেন,তেমনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম থেকে ইসলাম ও মুসলিম শব্দগুলিও সরিয়েছেন। তাই তাঁর হাতে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল হয়ে যায় সলিমুল্লাহ হল। জাহিঙ্গরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে যায় জাহ্ঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং নজরুল ইসলাম কলেজ হয় নজরুল কলেজ। মুজিবের কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ পেয়েছিল ভারতকে খুশি করা,আল্লাহকে খুশি করা নয়।

    ইসলামের বিরুদ্ধে মুজিবের শুরু করা সে যুদ্ধটি এখন চালিয়ে যাচ্ছে তার কন্যা শেখ হাসিনা ও দলীয় কর্মীরা। এক্ষেত্রে ব্রিটিশ বা ভারতের হিন্দু কাফেরদের থেকেও তারা বেশী ইসলাম বিদ্বেষী। ব্রিটিশ ও হিন্দু ভারতে মুসলমানদের উপর ইসলামের নামে দল গড়ায় নিষেদ্ধাজ্ঞা কোন কালেই ছিল না এবং আজও নাই। মুসলিম লীগ, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ, জামায়াতে ইসলামীসহ বহু মুসলিম প্রতিষ্ঠান ভারতে আজও বেঁচে আছে মুসলিম নাম নিয়ে।অথচ মুজিব বেঁচে থাকতে সে অধিকার বাংলাদেশের মুসলমানদের তিনি দেননি। মুজিব ও তাঁর অনুসারিদের চেতনা যে সিক্ত ছিল রবীন্দ্রনাথের পৌত্তলিক চেতনায় -সেটি কি এ গানের নির্বাচন থেকেই সুস্পষ্ট নয়?

    বস্তুতঃ বাংলাদেশে সাহিত্য এবং সে সাথে জাতীয় সঙ্গিত পরিনত হয়েছে ঈমান ধ্বংসের এক নীরব হাতিয়ারে। ফলে পথভ্রষ্টতা বাড়ছে শুধু ধর্মপালনে নয়,বরং দেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি, আইন-আদালত ও প্রশাসনে।বাঙালী মুসলমানের জীবনে এভাবেই বাড়ছে মহাসংকট। দিন দিন বাড়ছে নবীজী (সাঃ)র আমলের সনাতন ইসলামের সাথে সাধারণ মানুষের দুরুত্���। সে সাথে প্রবলতর হচ্ছে রাজনীতি,সংস্কৃতি ও প্রশাসনসহ দেশের সর্বত্র ইসলামের শত্রু পক্ষের অধিকৃতি।ফলে দেশ গড়ছে দূর্নীতিতে বিশ্ব রেকর্ড।বাড়ছে দুনিয়াব্যাপী দুর্নাম ও অপমান।