‘পবিত্র কোরআন’ কি বিশদভাবে ব্যাখ্যাকৃত গ্রন্থ?

1924 জন পড়েছেন

পবিত্র কোরআনের (০৬১১৪) নং আয়াতের অনুবাদ করতে গিয়ে কেউ কেউ (مُفَصَّلاًالْكِتَابَ) “আল-কিতাবা মুফাচ্ছালান” এর অর্থ ‘বিশদভাবে ব্যাখ্যাকৃত গ্রন্থ’ হিসেবে করেছেন (এখানে দেখুন- 3. Fully Detailed Scripture ১)। এর কারণ হিসেবে বলা হয় যে, যেহেতু “তাফসীলুন” শব্দের অর্থ ‘বিস্তারিত বর্ণনা করা’, তাই “আল-কিতাবা মুফাচ্ছালান” এর অর্থ এমনই হবে। এই অযুহাতে অনেকে আবার আল-কোরআনের মৌল নিদর্শন বা তথ্য ও উপাত্তগুলোকেই বিশদ ব্যাখ্যা হিসেবে ভেবে নিয়ে আর কোন ধরণের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করার ব্যাপারে আপত্তি করেন। এমনকি কোন হাদিছকেও তারা গ্রহণ করতে চান না। এই যুক্তির পক্ষে তারা (৪৫:০৬) নং আয়াতটিও উল্লেখ করেন। অথচ আল-কোরআনে যে অনেক বিষয় সম্পর্কেই বিশদ ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

 

মূলত আল-কোরআন হলো লওহে মাহফুজে সংরক্ষিত ও মানুষের জন্য প্রেরিত মহান স্রষ্টা প্রদত্ত জীবনবিধান। সৃষ্টি থেকে শুরু কোরে কিয়ামত তথা পরকাল পর্যন্ত সকল খুঁটিনাটি জীবনঘনিষ্ট ও মানুষের জন্য জানা জরুরী বিষয়ের বর্ণনা পৃথক পৃথক পর্যায়ে নাযিল করা হয়েছিল। মহান স্রষ্টার ইংগিত ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর দিকনির্দেশনা অনুসারে বিভিন্ন অধ্যায়ে বিভক্ত কোরে এই ঐশী আয়াত অর্থাৎ নিদর্শনগুলো কিতাব আকারে সংকলিত করা হয়, যা “পবিত্র কোরআন শরীফ” হিসেবে আমাদের কাছে বিরাজ করছে।

 

বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে, পবিত্র কোরআনে সহজভাবে কোন বিষয় সম্পর্কে এক স্থানে বক্তব্য উপস্থাপন কোরে প্রথমে পাঠককে আকৃষ্ট করা হয়েছে। পরবর্তীতে সেই একই বিষয় সম্পর্কে ভিন্ন সময়ে ও ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায়ে নুতন নুতন তথ্য প্রদান করা হয়েছে। এভাবে ধাপে ধাপে বিভিন্ন পর্যায়ে বিবিধ বিষয় ভিত্তিক খুঁটিনাটি বর্ণনা দেয়া হয়েছে এবং নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র কোরে ভিন্ন পরিবেশ ও পরিস্থিতির পেক্ষাপটে পর্যায়ক্রমে নব নব তথ্য প্রদান করা হয়েছে। পাঠকের জ্ঞানবৃদ্ধি সহ হক-না-হক পৃথক করার মত অকাট্য সত্য নির্দেশ দিয়ে সঠিকভাবে বোঝানোর মাধ্যমে মূল বক্তব্যকে ধীরে ধীরে অন্তরে ধারণ ও বিশ্বাসকে পোক্ত করার জন্য যে পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে তা সত্যিই অতুলনীয়। মহান স্রষ্টা (০৬:১১৪) নং আয়াতে আল-কোরআনের বর্ণনা রীতি সক্রান্ত এই পদ্ধতির কথাও আমাদের সামনে অতি সংক্ষেপে ও স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে দিয়েছেন।

[(১২:১১১) নং আয়াতে (تَفْصِيلَ)- “তাফসীলুন” শব্দের অর্থ-  প্রকাশ করা, বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া, অধ্যায়ে বিভক্ত করা, বন্টন করা- (“আল-কাওসার”-আধুনিক আরবী-বাংলা অভিধান- মদীনা পাবলিকেশন্স)

এবং (০৬:১১৪) নং আয়াতে “মুফাসসালুন” শব্দের অর্থ “বর্ণিত”- (৩৩০ পৃষ্ঠা- “কোরআনের অভিধান”- মুনির উদ্দীন আহমদ)।

“তাফসীলুন” এবং “মুফাসসালুন” এর মূলশব্দ হলো (فَصَّل) “ফাসলুন” এবং এর অর্থ- “হক-না-হক পৃথক করার মত নির্দেশ, অকাট্য সত্য নির্দেশ, ফয়সালা করা, অধ্যায়ে বিভক্ত করা”- (“আল-কাওসার”-আধুনিক আরবী-বাংলা অভিধান- মদীনা পাবলিকেশন্স)। আবার (فَصَّل) “ফাসলুন” শব্দের অর্থ- “আলাদা করা, স্বতন্ত্র”- (২৭১ পৃষ্ঠা-“কোরআনের অভিধান”- মুনির উদ্দীন আহমদ)।

সুতরাং (১২:১১১) নং আয়াতে “তাফসীলুন” শব্দটি দ্বারা “প্রত্যেক বিষয়ের বিস্তারিত বর্ণনা” বলতে সকল বিষয়ের মধ্যকার হক-না-হক পৃথক করার মত অকাট্য নির্দেশ ও নিদর্শন প্রকাশ করা সংক্রান্ত বিস্তারিত বর্ণনা দেয়াকেই বোঝানো হয়েছে।

(১৬:৮৯) নং আয়াতে ‘তিবইয়ানুন’ এর অর্থ- স্পষ্ট প্রমাণ প্রকাশ করা – ১০৯ পৃষ্ঠা এবং এর মূলশব্দ ‘বায়ানুন’ এর অর্থ- স্পষ্ট, কথা, বর্ণনা, বয়ান – ১০২ পৃষ্ঠা (“কোরআনের অভিধান”- মুানর উদ্দীন আহমদ।)

আবার “তাফসীরুন” শব্দটির অর্থ- খুলে খুলে বর্ণনা করা, তফসীর বা ব্যাখ্যা করা- ১৩৭ পৃষ্ঠা (“কোরআনরে অভিধান”- মুনির উদ্দীন আহমদ)।

কিন্তু যেহেতু এই “তাফসীরুন” শব্দটি এখানে ব্যবহৃত হয়নি, তাই উপরে উল্লেখিত এই সবগুলো অর্থকে সামনে রেখে (০৬:১১৪) ও (১৬:৮৯) নং আয়াতের অনুবাদের ক্ষেত্রে “আল-কিতাবা মুফাচ্ছালান” এবং (১৬:৮৯) নং আয়াতের অনুবাদের ক্ষেত্রে “আল-কিতাবা তিবইয়ানান” এর অর্থ ‘বিশদভাবে ব্যাখ্যাকৃত গ্রন্থ’ হিসেবে করলে তা যথাযথ হবে না।]

 

সুতরাং উপরে উল্লেখিত এই অর্থগুলো অনুসারে (১২:১১১), (০৬:১‌১৪) ও (১৬:৮৯) নং আয়াতের অনুবাদ করলে দাঁড়ায়-

সূরা ইউসূফ (মক্কায় অবতীর্ণ)

(১২:১১১) অর্থ- বস্তুত তাদের কাহিনীতে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। এটা (কোরআন) কোন মনগড়া হাদিছ (কথা বা গল্প) নয়, কিন্তু এটি এর পূর্বেকার (কিতাবের) সমর্থন এবং এতে প্রত্যেক বিষয়ের (মধ্যকার হক-না-হক পৃথক করার মত অকাট্য সত্য নির্দেশ/ ফয়সালার) বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হয়েছে/ প্রকাশ করা হয়েছে এবং এটি পথনির্দেশ ও রহমত বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য।
সূরা আল- আনআম (মক্কায় অবতীর্ণ)

(০৬:১১৪) অর্থ- (বল) “তবে কি আমি আল্লাহকে ছেড়ে অন্য কোন শালিস বা বিচারক অনুসন্ধান করব? অথচ তিনিই তো তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ করেছেন (হক-না-হক পৃথক করার এবং ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যা, ভাল-মন্দের মাঝে ফয়সালা করার মত অকাট্য সত্য নির্দেশ সম্বলিত আলাদা আলাদা অধ্যায়ে বিভক্ত কোরে) বর্ণিত এ কিতাবটি।” এবং আমি যাদেরকে কিতাব প্রদান করেছি, তারা অবশ্যই জানে যে, এটি তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে সত্যসহ অবতীর্ণ হয়েছে। অতএব, তুমি সংশয়বাদীদের অন্তর্ভুক্ত হইও না।

(০৬:১১৫) অর্থ- এবং তোমাদের প্রতিপালকের প্রতিটি বাণী সত্য ও ন্যায় বিচারে পরিপূর্ণ; তাঁর বাণী সমূহের কোন পরিবর্তনকারী নেই এবং তিনি তো সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।

সূরা নাহল (মক্কায় অবতীর্ণ)

(১৬:৮৯) অর্থ- সেদিন প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে আমরা একজন সাক্ষী দাঁড় করাব তাদের বিপক্ষে তাদের মধ্য থেকেই এবং তাদের বিষয়ে তোমাকে সাক্ষী স্বরূপ উপস্থাপন করব। আমরা তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি প্রত্যেক বিষয়ের স্পষ্ট প্রমাণ প্রকাশকারী/ বর্ণনাকারী এই কিতাবটি, যা হেদায়েত, রহমত এবং মুসলিমদের জন্যে সুসংবাদ-স্বরূপ।

 

সুতরাং (০৬১১৪), (০৬:১১৫)ও (১৬:৮৯) নং আয়াত অনুসারে বিশ্বাসীদের জন্য শালিস বা বিচারক হিসেবে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও সিদ্ধান্ত মেনে নেয়ার সুযোগ নেই। কারণ আল্লাহতায়ালা বিশ্বাসীদের জন্য যে কিতাব অবতীর্ণ করেছেন তাতে তাঁর পক্ষ থেকে বিশেষ খুঁটিনাটি তথ্য ও উপাত্তের সন্নিবেশ ঘটেছে এবং ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যা, ভাল-মন্দের মাঝে পার্থ্ক্যকারী এবং প্রত্যেক বিষয়ের শুদ্ধতা নির্ণায়ক সুস্পষ্ট ও ন্যায়ানুগ সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়া হয়েছে। এই মৌল সিদ্ধান্তের কানরূপ পরিবর্তন গ্রহণযোগ্য নয় এবং এর বিরোধী কোন মতবাদ মেনে নিয়ে সংশয়বাদীদের অন্তর্ভূক্ত না হওয়ার জন্য বিশ্বাসীদেরকে বিশেষভাবে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

 

সূরা আল জাসিয়া (মক্কায় অবতীর্ণ)

(৪৫:০৬) অর্থ- এগুলো আল্লাহর আয়াত বা নিদর্শন, যা আমরা আবৃতি করে শুনাই তোমার কাছে সত্যতা সহকারে। অতএব, আল্লাহ ও তাঁর আয়াত বা নিদর্শনের পরে কোন্ হাদিছে (কথায় বা গল্পে) তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে?

পবিত্র কোরআনে উল্লেখিত সকল তথ্য ও উপাত্তই যে সঠিক ও সত্য তাতে কোনই সন্দেহ নেই। তবে এমন অনেক আয়াত রয়েছে যা সময়ের প্রেক্ষাপটে এখনও বিশদভাবে ব্যাখ্যার দাবি রাখে। বিশেষ কোরে বিজ্ঞান বিষয়ক আয়াতগুলোকে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জন সাপেক্ষে আমাদের বোধদয় ও কল্যাণের স্বার্থে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন রয়েছে। যেহেতু মহান আল্লাহ জ্ঞানী ও চিন্তাশীল সম্প্রদায়কে এই আয়াত অর্থাৎ নিদর্শনগুলো সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করার জন্য বার বার তাগিদ দিয়েছেন। তাই এগুলোর যথাযথ ও বিস্তারিত ব্যাখ্যার ব্যাপারে বিরোধ থাকা উচিত নয়, বরং উৎসাহ দেয়া যেতে পারে। তবে সব সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন কোন হাদিছ বা আয়াতের ব্যাখ্যার মূল বক্তব্য আল-কোরআনে উল্লেখিত মৌল নির্দেশ ও নীতির সাথে বিন্দুমাত্র সাংঘর্ষিক না হয় কিংবা মূল ভাবকে উপেক্ষা কোরে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা না হয়। যদি সাংঘর্ষিক অবস্থার সৃষ্টি হয় তাহলে বুঝতে হবে যে, সেই হাদিছ বা আয়াতের ব্যাখ্যা সঠিক নয়। সেক্ষেত্রে সেই হাদিছের সূত্র যেমনই হোক না কেন এবং উক্ত তফসিরবিদ যত বড় নামকরা ব্যক্তিত্বই হোক না কেন, তার সেই বক্তব্য বা ব্যাখ্যায় বিশ্বাস করার তো প্রশ্নই আসে না, বরং অবশ্যই পরিহার করতে হবে।

1924 জন পড়েছেন

Comments are closed.