বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোরের অন্য তাৎপর্য

2693 জন পড়েছেন

হঠাৎ করেই বাংলাদেশ-চায়না-ইন্ডিয়া-মিয়ানমার (বিসিআইএম) অর্থনৈতিক করিডোর গঠনের ব্যাপারে উদ্যোগ আয়োজন বিশেষ গতি পেয়েছে। ১৯৯৯ সালে এই ফোরাম গঠনের উদ্যোগ নেয়া হলেও এটি নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার আগ্রহ ভারতের খুব বেশি দেখা যায়নি। চীন বরাবরই এ ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহ দেখালেও বাংলাদেশের উৎসাহ বা অনাগ্রহ কোনোটাই দেখা যায়নি। কিন্তু বাংলাদেশের একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠান ও অন্য কিছু ইস্যু নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে ভারতের মতপার্থক্য দেখা দিলে বিসিআইএম নিয়ে বিশেষ আগ্রহ প্রদর্শন শুরু করে নয়াদিল্লি। নয়াদিল্লির মনোভাবে ইতিবাচকতা দেখার পর ঢাকাও উদ্যোগী হয়ে ওঠে এ নিয়ে। বেসরকারি নীতিগবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির উদ্যোগ থেকে সরকারি উদ্যোগে রূপ লাভ করে এটি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত ৬ ফেব্রুয়ারি এ বিষয় নিয়ে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করে। এ সভায় বিসিআইএম নিয়ে বাংলাদেশ কিভাবে এগোবে তার ধারণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। পরের সপ্তাহে বিসিআইএমের যৌথ সমীক্ষা গ্রুপের প্রথম সভার প্রতিবেদনে অগ্রগতির রূপরেখা উপস্থাপন করে ভারত। এই রূপরেখার শীর্ষে রাখা হয় বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোর গঠনের বিষয়টিকে।

বিসিআইএম করিডোর
১৯৯৯ সালে চীনের ইউনানে চার দেশের সরকারি-বেসরকারি চার সংস্থার বৈঠকে বিসিআইএম ফোরাম গঠন করা হয়। এই ফোরামে বাংলাদেশের সিপিডি, ভারতের সিপিআই, ইউনানের অ্যাকাডেমি অব সোশ্যাল সায়েন্স এবং মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সীমান্তবাণিজ্য শাখা অংশ নেয়। এই বৈঠকে ইউনান সরকার মূলত বিসিআইএম গঠনের ধারণা ব্যক্ত করে। এ সময় মূল চিন্তা ছিল পূর্বাঞ্চলীয় চীন, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ভারত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে এ উদ্যোগের সাথে সম্পৃক্ত করে অনগ্রসর অর্থনৈতিক এই অঞ্চলকে উন্নয়ন কেন্দ্রে রূপান্তর করা। এ ব্যাপারে প্রথম বড় ধরনের অগ্রগতি হয় ২০০৩ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ির চীন সফর এবং এরপর ২০০৫ ও ২০০৬ সালে চীনা নেতা ওয়েন জিয়াবাও এবং হু জিন তাওয়ের ভারত সফরের সময়। এর আগে বিষয়টি সরকারি-বেসরকারি থিংকট্যাংক-পর্যায়ে থাকলেও এ সময় এটি দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের সফরের পর প্রকাশিত যৌথ ইশতেহারে স্থান পায়। আর এই উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে ভারতের কলকাতা থেকে চীনের কুনমিং পর্যন্ত একটি কার-র‌্যালি করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এ কার-র‌্যালি অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ২০ মে ২০১৩ সালে চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংয়ের ভারত সফরের সময় এই অঞ্চলের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও জনগণপর্যায়ে যোগসূত্র স্থাপনের জন্য বিসিআইএম ফোরামকে ইকোনমিক করিডোরে রূপান্তর করার কথা বলা হয়। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ২০০২, ২০০৭ ও ২০১৩ সালে তিনবার বিসিআইএম নিয়ে সম্মেলন হয়েছে। প্রতিবারই এর আয়োজন করেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডি। ২০১৩ সালে এই উদ্যোগের বাস্তবায়নপর্যায়ে সরকার বিশেষভাবে যুক্ত হয়। এ ব্যাপারে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করে করণীয় নির্ধারণ করা হয়। গত বছরের শেষ দিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে ডা: দীপু মণি চীনা ডেইলিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইকোনমিক করিডোর স্থাপনের প্রস্তাব বাস্তবায়নে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আগ্রহের কথা জানান।
২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে যে কার-র‌্যালি হয় সেটিকে ইকোনমিক করিডোরের রুট হিসেবে এখন গ্রহণ করা হচ্ছে। এই রুটে রয়েছে ভারতের কলকাতা ও পেট্রাপোল, বাংলাদেশের বেনাপোল, যশোর, ঢাকা, সিলেট ও সুতারকান্দি, আবার ভারতের সুতারকান্দি, সিলচর ও মোরেহ, মিয়ানমারের তামু, কা লে, মানদালে ও মোসে এবং চীনের রুইলি, তেং চং, ডালি ও কুনমিং। কলকাতা থেকে কুনমিং পর্যন্ত এ র‌্যালির দূরত্ব ছিল দুই হাজার ৫৭৮ কিলোমিটার। ভারত এই রুটটিকে এশিয়ান হাইওয়ের রুট হিসেবে প্রস্তাব দিয়েছিল। এর বাইরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি অতিরিক্ত সংযোগ সড়কের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল ঢাকা কক্সবাজার গুনদুম প্যাংবারো মানদালে পর্যন্ত। এখানে টাংগাবারো থেকে মানদালের কিছু পূর্ব পর্যন্ত সড়কে মিসিং লিংক রয়েছে।

ভবিষ্যৎ রুটম্যাপ
২০১৪ সাল হলো বিসিআইএম করিডোর বাস্তবায়নের একটি তাৎপর্যপূর্ণ বছর। এ সময় বিসিআইএমের সদস্য প্রতিটি দেশ তার নিজ দেশের খসড়া রিপোর্ট শেষ করে প্রস্তাব বাস্তবায়নের কাজ শুরু করবে। রুটম্যাপ অনুসারে আগামী জুনের শেষ নাগাদ চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হবে যৌথ সমীক্ষা গ্রুপের দ্বিতীয় সভা। এই সভায় বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশের খসড়া রিপোর্টগুলো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে একটি ঐকমত্য দলিল তৈরি করবে। জুলাইয়ের শেষ নাগাদ এই ঐকমত্যের দলিলের ভিত্তিতে কাজ ভাগ করে দেয়া হবে। সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ সমন্বিত রিপোর্ট চূড়ান্ত করে স্ব স্ব সরকারের অনুমোদনের জন্য পেশ করা হবে। ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ ভারতে যৌথ সমীক্ষা গ্রুপের তৃতীয় বৈঠকে বিসিআইএমের চূড়ান্ত রিপোর্ট পাস করা হবে এবং এ ব্যাপারে আন্তঃসরকার সহযোগিতার কাঠামো স্বাক্ষর করা হবে। কর্ম কাঠামোর এই বিষয়গুলো চূড়ান্ত করা হয় গত ১৮ ও ১৯ ডিসেম্বর ইউনানের কুংমিংয়ে অনুষ্ঠিত যৌথ সমীক্ষা গ্রুপের প্রথম বৈঠকে।

সাউদার্ন সিল্ক রুট
এশিয়ার বৃহত্তর অংশজুড়ে এবং ইউরোপ ও আফ্রিকার অংশবিশেষ নিয়ে একসময়ের সিল্কবাণিজ্য রুটটিকে নতুন করে তৈরির ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহ রয়েছে চীনের। ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের স্থলভাগে সড়ক ও রেল অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি মেরিটাইম বা সামুদ্রিক সিল্ক রুট প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাকে এর সাথে যুক্ত করা হয়েছে। এই নেটওয়ার্ক তৈরির জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংককে সম্পৃক্ত করে এর আগেই এশিয়ান হাইওয়ে এবং ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্ক তৈরির পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়। বিভিন্ন দেশে এর আওতায় সড়ক নেটওয়ার্ক তৈরির কাজও শুরু করা হয়। বেইজিং তার প্রতিবেশী দেশগুলোকে বিভিন্ন আঞ্চলিক সহযোগিতা উদ্যোগের মাধ্যমে অভিন্ন নেটওয়ার্কে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে আগ্রহ প্রকাশ করছে। এ ব্যাপারে ইতোমধ্যে মিয়ানমার-থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের সাথে ভারতকে সংযুক্ত করে মেকং-ইন্ডিয়া ইকোনমিক করিডোর গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর সাথে বিসিআইএমকে সংযুক্ত করা গেলে এটি হবে বৃহত্তর একটি অর্থনৈতিক সহযোগিতা নেটওয়ার্ক। এ ক্ষেত্রে যে ধারণাকে সামনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তা হলো বিশ্বে বড় দেশগুলো যেখানে এশিয়ার এই অঞ্চলে অনাহরিত সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য আগ্রহী হয়ে উঠছে, সেখানে কেন এ অঞ্চলের দেশগুলো নিজেরা এগিয়ে আসবে না।
বিসিআইএম অঞ্চলে অর্থনৈতিক করিডোর স্থাপনের একটি ঐতিহাসিক ভিত্তিও ইতোমধ্যে আবিষ্কার করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, এই অঞ্চলে প্রাচীন আমলে একটি সিল্ক রুট সক্রিয় ছিল। উয়ারী বটেশ্বর, পাহাড়পুর, সোনারগাঁও, বিক্রমপুর, ভিটাগড়, মহাস্থানগড়ে যে সভ্যতার নিদর্শনগুলো পাওয়া যাচ্ছে তার সাথে এই সিল্ক রুটের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। মোগল যুগে শেরশাহ সুরি দিল্লি থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত সুবিস্তৃত গ্র্যান্ড ট্রাংক রোড নামে যে মহাসড়ক তৈরি করেছিলেন, সেটিও এই সিল্কবাণিজ্য রুটের একটি অংশ ছিল। সেই ঐতিহাসিক সিল্ক রোডকে পুনর্নির্মাণ ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন অর্থনৈতিক করিডোর করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা বলা হচ্ছে। এটি সম্পন্ন হলে আফ্রোএশিয়ান সিল্ক রোডের মাধ্যমে পূর্ব ও দক্ষিণ এবং পশ্চিম এশিয়ার সাথে ভূমধ্যসাগর ও ইউরোপ সংযুক্ত হবে। একই সাথে উত্তর ও পূর্ব আফ্রিকার একটি অংশের সাথেও এর সংযুক্তি ঘটবে। এই সিল্ক রুটের সাথে সিরিয়া, তুরস্ক, ইরান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরঘিজস্তান, পাকিস্তান ও চীন অন্তর্ভুক্ত থাকবে। বস্তুত সিল্ক রোডকে চার হাজার মাইল সম্প্রসারণ করে চীনের হান রাজবংশের শাসনামলের (খ্রিষ্টপূর্ব ২০৬ থেকে ২২০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত) চীনা সিল্কবাণিজ্যের রুটকে সিল্ক রোড নামে পুনর্বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। চীনা দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে এটি হবে একটি সমন্বিত বাণিজ্য যোগাযোগব্যবস্থা, যার সাথে সড়ক, রেল এবং সমুদ্রপথে সংযোগ ও সুসমন্বয় থাকবে। দক্ষিণ-পশ্চিমের যে সিল্ক রোডের কথা বলা হচ্ছে, সেখানকার গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বেসিনে গত দুই সহস্রাব্দ ধরে আন্তর্জাতিক বণিক ও বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি পড়ে আসছিল। এই অঞ্চলে ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপনের পেছনে এ আগ্রহই বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।
দক্ষিণাঞ্চলীয় সিল্ক রোড নির্মাণের ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু নির্মাণ উদ্যোগ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে নিতে হবে। করিডোর সংশ্লিষ্ট এখানকার বেশির ভাগ সড়কের অবস্থা সন্তোষজনক। কিছু ক্ষেত্রে মিসিং লিঙ্ক নির্মাণ করতে হবে আর কিছু ক্ষেত্রে বিদ্যমান সড়কের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ডংফেংয়ে ২.৭ কিলোমিটার রাস্তা সম্প্রসারণ করতে হবে। দ্বিতীয় ইস্টার্ন রিং রোড করতে হবে ২.৩ কিলোমিটার। দ্বিতীয় আন্তঃপ্রদেশ হাইওয়ে ক্রসডোর নির্মাণ করতে হবে ৮ কিলোমিটার। কুনমিং-অ্যানিং এক্সপ্রেসওয়ে তৈরি করতে হবে ২২.৪ কিলোমিটার। অ্যানিং-চুক্সিয়ং এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করতে হবে ১২৯.৯০ কিলোমিটার। চুক্সিয়ং-ডালি এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করতে হবে ১৭৯.২ কিলোমিটার। ডালি-বাউসান এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করতে হবে ১৬৫.৮ কিলোমিটার। বাউসান-লুক্সি-রুইলি ন্যাশনাল হাইওয়ে নির্মাণ করতে হবে ২৬৩ কিলোমিটার। এসব অবকাঠামো নির্মাণে এডিবির মতো আঞ্চলিক অবকাঠামো তহবিলের সহায়তা নেয়ার কথা বলা হয়েছে।
অর্থনৈতিক সুবিধা কার কতটা
বিসিআইএম ইকোনমিক করিডোর বাস্তবায়নের সাথে যুক্ত দেশগুলো কম-বেশি অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে ভারত। এই অঞ্চলকে পুরোপুরি উদারীকরণ, মাঝারি ধরনের উদারীকরণ এবং আংশিক উদারীকরণে প্রভাবের মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন হবে। মাত্রাভেদে এই উদারীকরণের পদক্ষেপ থেকে ভারত সর্বোচ্চ ২৬৮ মিলিয়ন, ১৯৭ মিলিয়ন ও ১৩৯ মিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে। বাংলাদেশ পাবে যথাক্রমে ৭০ মিলিয়ন, ৫১ মিলিয়ন ও ৩৭ মিলিয়ন ডলারের সুবিধা। চীন পাবে ৬৮ মিলিয়ন, ৩১ মিলিয়ন ও ১৫ মিলিয়ন ডলারের সুবিধা। আর মিয়ানমার পাবে ৫ মিলিয়ন, ২.৩ মিলিয়ন এবং ২ মিলিয়ন ডলারের সুবিধা। বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে যে দেশের অর্থনীতি যত অগ্রসর সে দেশের বাণিজ্যসুবিধা হয় তত বেশি। উদারীকরণের ফলে বাণিজ্য বৃদ্ধিতে বেশি লাভবান হবে ভারত ও চীন। আর আনুপাতিকভাবে বেশি ট্যারিফ হারাতে হবে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে।
অর্থনৈতিক করিডোরের পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে এর প্রতিক্রিয়া হবে আরো সুদূরপ্রসারী। এ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে, এর চার দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিত করে রাজনৈতিক ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা, রাজস্ব ইউনিয়ন করা, অভিন্ন মুদ্রা ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা, কমন মার্কেট তৈরি করা, কাস্টম ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা, মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল কায়েম, অগ্রাধিকার বাণিজ্য এলাকা তৈরি এবং স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা। এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন অনেক দীর্ঘ সময় ধরে করতে হবে এবং সরকারগুলোকে নিয়ে আসতে হবে একই ধ্যানধারণার মধ্যে।

কৌশলগত স্বার্থের সংশ্লেষ
বিসিআইএমের উদ্যোগ হঠাৎ চাঙ্গা হওয়ার পেছনে কৌশলগত স্বার্থের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বিশেষভাবে। আগামী দশকগুলোতে বিশ্ব অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে চীন। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার আগ থেকেই দেশটি পৃথিবীতে সরকারি বিনিয়োগ সক্ষম সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছে। দেশটির জন্য ২০২০ সাল নাগাদ অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শক্তি অর্জন সুসংহত করার সময়। এ সময়ের মধ্যে চীন তার জন্য কৌশলগত স্বার্থ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলোতে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবকে সুসংহত করতে চায়। এর অংশ হিসেবে এশীয় অঞ্চলে তার নেটওয়ার্ক বিস্তারের ক্ষেত্রে সুপ্ত প্রধান বাধা হলো পশ্চিমা প্রভাব ও আধিপত্য। এই প্রভাবকে মোকাবেলার ক্ষেত্রে এশিয়ার শক্তিগুলোর সাথে যত বৈরিতাই থাকুক না কেন, একটি অর্থনৈতিক সম্পর্কের কাঠামোগত বন্ধন তৈরি করতে চায় দেশটি। এর অংশ হিসেবে এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে চীন সমুদ্রবন্দর নির্মাণে বিনিয়োগ করেছে। সামুদ্রিক সিল্ক রুট তৈরির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে আরো দু’টি সমুদ্রবন্দর নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করছে চীন। মিয়ানমারের রাজনৈতিক উদারীকরণ প্রক্রিয়ায় পশ্চিমা করপোরেট বিনিয়োগ প্রবেশের পর বঙ্গোপসাগর এলাকা দেশটির জন্য হয়ে পড়েছে অতিব গুরুত্বপূর্ণ। এই এলাকায় পশ্চিমা প্রভাব বা আধিপত্য একতরফা হতে দিতে চায় না চীন।
অন্য দিকে ভারতের কৌশলগত লক্ষ্যমাত্রায় মাঝে মধ্যে পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। দেশটি বহু দশক ধরে ছিল সোভিয়েত বলয়ে। স্নায়ুযুদ্ধ অবসানের পর নয়াদিল্লি যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সাথে বেশখানিকটা কৌশলগত সম্পর্ক তৈরির উদ্যোগ নেয়। আফগানিস্তানে পশ্চিমের সাথে ভারতের সহায়ক ভূমিকা এটাকে আরো সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের একপর্যায়ে স্বাক্ষর হয় পরমাণু সহায়তা চুক্তি। আমেরিকা ভারতকে দক্ষিণ এশিয়ার মোড়ল হিসেবে মেনে নেয়ার ঘোষণাও দেয়। কিন্তু ভারতের সাড়া মেলেনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা অনুযায়ী। দেশটি আবার সাবেক সোভিয়েত বলয়ের সাথে ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টির দিকে অগ্রসর হয়। আমেরিকা যেখানে চীনের প্রভাব ঠেকানোর জন্য ভারতকে কাছে পাবে বলে প্রত্যাশা করেছিল, সেখানে ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় নিজের প্রভাব একচেটিয়া করার কাজে নানা ক্ষেত্রে চীনের সাথে সমঝোতা করে এগিয়ে যায়। এই বাস্তবতা ভারতের সম্পর্ককে নতুনভাবে বিন্যাস করার ভাবনা তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশে। বিসিআইএমের উদ্যোগে হঠাৎ প্রাণস্পন্দন হওয়ার পেছনে এই কৌশলগত স্বার্থের বাস্তবতার রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এ ছাড়া নেহরু ডকট্রিনের অংশ হিসেবে দক্ষিণ এশিয়াকে ভারতের সর্বাত্মক রাডার প্রভাবের আওতায় রাখার যে লক্ষ্য রয়েছে, তাতে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ট্রানজিট করিডোর পাওয়ার বিশেষ স্বার্থসংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে চীনের অনাপত্তি ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাজনৈতিক ও সীমান্ত বিরোধগুলোকে দূরে ঠেলে রেখে অর্থনৈতিক করিডোরের আওতায় এই সুবিধাটি কার্যকর করা গেলে এতে আর কোনো সময় ব্যত্যয় ঘটার আশঙ্কা থাকে না।

নতুন ইকুয়েশন আওয়ামী লীগের
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ২০০৮ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকলেও বিসিআইএমের ব্যাপারে কোনো আগ্রহ সেভাবে দেখায়নি। ২০১৩ সালে এসে এ ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহী হওয়ার পেছনেও রয়েছে রাজনৈতিক কৌশলগত স্বার্থ। ২০১৩ সালের শুরু থেকে আওয়ামী লীগ চেষ্টা করেছে একটি একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে আরেক মেয়াদে ক্ষমতায় যাওয়া নিশ্চিত করতে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো কার্যকর গণতন্ত্র চর্চার বাইরে এ ধরনের প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি। এ ব্যাপারে নয়াদিল্লির পক্ষ থেকেও বারবার পশ্চিমা দেশগুলোকে প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়েছে। পশ্চিমা সমর্থন লাভের বিকল্প হিসেবে পাল্টা বলয় তৈরির কৌশলকে আওয়ামী লীগ উপযুক্ত মনে করেছে। এর অংশ হিসেবে রাশিয়ার সাথে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, জঙ্গিবিমান ক্রয় এবং জ্বালানি খাতের কাজ দেয়ার মাধ্যমে স্বাধীনতা-উত্তর বিশেষ সম্পর্ক ঝালাই করা হয়। এর পাশাপাশি অর্থনৈতিক সমর্থন দেয়ার জন্য চীনের সাথে একধরনের কৌশলগত সম্পর্ক নির্মাণের উদ্যোগও নেয়া হয়। এর অংশ হিসেবে বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোর বা সহযোগিতা বলয় সৃষ্টির এই বিশেষ উদ্যোগকে চাঙ্গা করছে নতুন সরকার। এ ব্যাপারে সম্প্রতি ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিব শঙ্কর মেনন এবং তার চীনা প্রতিপক্ষের সাথে বিশেষ বৈঠক হয় বেইজিংয়ে। সেখানে চীনের সামুদ্রিক সিল্ক রুটে ভারতের যোগ দেয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক আলোচনা হয়। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার মনে করছে, পশ্চিমা দেশগুলোকে চাপে রেখে সমর্থন আদায় করতে হলে ভারত-চীনের সাথে আঞ্চলিক সহযোগিতার মোড়কে হলেও একটি শক্তিশালী সম্পর্কের বাতাবরণ তৈরি করতে হবে। যার পেছনে থাকবে রাশিয়ার বিশেষ সমর্থন। এ ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলো চাইলেও একতরফা নির্বাচনের অজুহাতে বাংলাদেশে শাসন পরিবর্তনে কোনো সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারবে না। এ হিসাব অবশ্য শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হবে, সেটি নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। কারণ, বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য বিশেষত রফতানিবাণিজ্য এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রগুলো রয়েছে পশ্চিমা দেশে এবং সেসব দেশের প্রভাব বলয়ে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মত উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোতেও রয়েছে পশ্চিমের বিশেষ নীতি নিয়ন্ত্রণকারী প্রভাব
(নয়া দিগন্ত, ২৮/০২/২০১৪)

2693 জন পড়েছেন

Comments are closed.