বিলাতে ‘ব্রিটিশ বাংলাদেশি’ কম্যুনিটির অভ্যুদয় – আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী

1365 জন পড়েছেন


বিলাতে আমি বাস করছি আজ আটত্রিশ বছর ধরে। বলতে গেলে প্রায় চার দশক পুরো হতে চলেছে। যে লন্ডন শহরে আমি পা দিয়েছিলাম, সেই লন্ডন শহর কি আগের মতোই আছে? যে সব আত্মীয়, বন্ধু, পরিচিত স্বজনের সান্নিধ্যে এসে প্রবাসে বসবাসের বেদনা ভুলেছিলাম, তারা সকলেই কি এই শহরে এখনো আছেন? আমি নিজেও কি আগের মানুষটি আছি? এই প্রশ্নটা নিজের মনের কাছেই নিজে মাঝে মাঝে করি।

এই প্রশ্নের জবাবগুলো মনে আনন্দের চাইতেও বেদনা বেশি জাগায়। এখনকার লন্ডন অনেক সুন্দর ও সমৃদ্ধ। কিন্তু সেই আগের কালচারাল গ্রেট সিটি আর নেই। কমার্শিয়ালিজমের দ্রুত বিস্তার তাকে গ্রাস করেছে। নিজের কম্যুনিটির এবং অন্য কম্যুনিটির যে সব মানুষের সান্নিধ্যে এসেছিলাম, তাদের অধিকাংশই আজ নেই। বেশির ভাগ পরপারে চলে গেছেন। কেউ কেউ স্বদেশে ফিরে গেছেন। কেউ কেউ অথর্ব ও বৃদ্ধ হয়ে ঘরের চার দেয়ালে বন্দি। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ কালে ভদ্রে হয়।

জেও কি আমি কম বদলেছি? লন্ডনে এসেছিলাম মধ্য বয়সী যুবক, মাথায় কালো চুলের বাহার নিয়ে। কবে সেই চুল সাদা হয়ে ঝরে পড়ে গেছে। মাথা ভর্তি টাক। হাঁটুতে আর্থরাইটিস। হাঁটতে পারি না। হাতে লাঠি। চোখে চশমা। মাঝে মাঝেই রোগগ্রস্ত হই। ওয়ার্নিং। তোমারও যাবার বেলা এলো বলে। লন্ডন যৌবনের শহর। বার্ধক্যের নয়। এই সত্যটা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাই।

আমাদের বাংলাদেশি কম্যুনিটির সংখ্যা লন্ডনে কেন, সারা ব্রিটেনে দ্রুত বেড়েছে। তাদের চাল চলন কালচার দ্রুত পাল্টাচ্ছে। এখন তারা কেবল বাঙালি নয়, তারা ‘ব্রিটিশ বাঙালি’। বর্তমানে সারা পশ্চিমা জগতের মতো ব্রিটেনেও চলেছে ঘোর অর্থনৈতিক মন্দা। তার কালো ছায়া ব্রিটিশ বাঙালিদের জীবনেও ছায়া ফেলেছে। যদি ব্রিটিশ অর্থনীতিতে সুদিন আসে, তাহলে তাদের জীবনেও সুদিন আসবে। ব্রিটিশ আর্থ-সামাজিক জীবনের সঙ্গে বাংলাদেশি কম্যুনিটি দ্রুত ইনট্রিগ্রেটেড হচ্ছে। একটা নতুন ‘ব্রিটিশ-বাংলাদেশি’ সমাজ বিলাতে দ্রুত গড়ে উঠছে। গত আটত্রিশ বছর ধরে আমি এই সমাজের সূচনা, বিকাশ, সংগ্রাম, সাধনা, সাফল্য, ব্যর্থতা সব কিছু নিজের চোখের সামনে ঘটতে দেখেছি। ইচ্ছে আছে, যদি সময় ও সুযোগ পাই এই বিচিত্র জীবন ধারা নিয়ে একটি উপন্যাস লিখবো।

আমি যখনই বাংলাদেশে যাই, তখনই অনেকের কাছ থেকে একটা প্রশ্নের সম্মুখীন হই, বিলাতে বাঙালিরা কেমন আছে? বিলাতের বাঙালির নতুন প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা কি বাংলাদেশের ছেলেমেদের চাইতে বেশি স্মার্ট? এই প্রশ্নটি শুনলে প্রায় পঁচিশ-ত্রিশ বছর আগের একটি ঘটনা আমার মনে পড়ে। আমি তখন ব্রিটিশ সরকারের শিক্ষা বিভাগের অধীনস্থ একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা “দি বাংলাদেশিজ এডুকেশনাল নীডস্ ইন টাওয়ার হ্যামলেটসে” (বেন্থ) চাকুরি করি। পূর্ব লন্ডনের হ্যানবরি স্ট্রিটে ব্রাডি সেন্টারে ছিল বেন্থের অফিস। আমি এই অফিসে রোজ বসতাম।

এ সময় আমি ট্যাবলয়েড দৈনিক ‘মিরর’ রোজ কিনতাম। আকর্ষণ ছিলো পেট্রিক ওয়াকার নামক এক জ্যেতিষীর ‘ইওর স্টার’ কলামটি। তাতে তিনি বিভিন্ন রাশির জাতকের ওই দিনটি কেমন যাবে, তা লিখতেন। আমি এই ধরনের ভাগ্য গননায় বিশ্বাস করি না। কিন্তু পেট্রিক ওয়াকারের কলামটি পড়তাম এজন্যে যে, তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন এবং তার অনেক কথা অনেক সময় ফলে যেতো। এই পেট্রিক ওয়াকারও এখন নেই। বহু বছর হয় তিনি মারা গেছেন।

পুরনো কথায় ফিরে যাই। ব্রাডি সেন্টারে নিজের অফিস কক্ষে বসে যখন ‘মিরর’ কাগজটি পড়তাম, তখন নাসিমা বানু নামে একটি সতেরো-আটারো বছরের বাংলাদেশি মেয়ে এসে আমার সামনে বসতো। কিছুক্ষণ আড়ষ্ট হয়ে থাকলেও কিছুক্ষণ পর লজ্জা ঝেড়ে বলতো, “আঙ্কল, দেখুন তো, আমার রাশি ফলে আজ কি বলেছে?” আমার কাছ থেকে কাজ আদায় করার জন্য সে আমার জন্য এক কাপ চা বানিয়ে টেবিলে এনে রাখতো।

নাসিমা ছিলো স্কুলের উপরের ক্লাশের ছাত্রী। একটা ভলান্টিয়ার সংস্থায় সপ্তাহে দু’দিন কাজ করতো। তাদের অফিস কক্ষ ছিলো আমার অফিসের পাশেই। সুতরাং নাসিমার ইচ্ছেমতো আমার অফিস কক্ষে আসা যাওয়ার অসুবিধা ছিলো না। সে জানতো, আমি পত্রিকায় দৈনিক রাশিফলের কলামটি নিয়মিত পড়ি। সেও তার নিজের ভাগ্য জানার জন্য ধীরে ধীরে আগ্রহী হয়ে ওঠে এবং সুযোগ পেলেই আমার কাছে আসতে শুরু করে।

নাসিমা বানু সম্পর্কে যেটুকু জানতাম, সে বৃহত্তর সিলেটের এক সধারণ শিক্ষিত নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। নয় দশ বছর বয়সে বাবা মায়ের সঙ্গে লন্ডনে চলে আসে। থাকে বাঙালি অধ্যুষিত পূর্বে লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস্ বরোতেই। লেখপড়ার সঙ্গে সোস্যাল ওয়ার্কার হিসেবেও কাজ করে। ইংরেজিতে স্বচ্ছন্দে কথা বলতে পারে, লিখতে ততোটা পটু নয়। বাংলাটা তেমন শেখেনি।

একদিন ব্রাডি সেন্টারে আমার অফিসে একাই বসে আছি, নাসিমা বানু চায়ের কাপ হাতে ঢুকলো। আমাকে কাগজ পড়তে দেখে বললো, “আঙ্কল, আমার ‘টুডেজ স্টারে’ বিয়ে সংক্রান্ত কোনো কথাবার্তা আছে?” বলেই সে লজ্জায় মাথা নত করলো। কার বিয়ের? তোমার? সে ঘাড় নাড়লো, কথা বললো না। বিষ্মিত হয়ে বলেছি, বিয়ের কথা কেন জিগ্যেস করছো, তুমি কি বিয়ে করতে চাও? নাসিমা মাথা নিচু করেই বললো, তার বাবা মা তাকে বিয়ের জন্য বেশি চাপ দিচ্ছে। সে জানতে চায়, ভাগ্য কি বলে,তাকে কি এখন বিয়ে করতে হবেই?

আমি কাগজটা নেড়ে চেড়ে বললাম, না, তোমার বিয়ে সম্পর্কে আজ কোনো কথা নেই। তারপর জিগ্যেস করলাম, কেন, তোমার কি এখন বিয়ে করতে অমত? সে মাথা নেড়ে বলনো, অমত নয়; কিন্তু তার বাবা দুবাইতে কাজ করে এমন এক আত্মীয়ের যে ছেলেকে পছন্দ করেছে, তাকে তার পছন্দ নয়। জিগ্যাসা করেছি, তাহলে বাংলাদেশি অন্য কোনো ছেলে কি তোমার পছন্দ নয়। “তারা একবারেই “ক্ষেত”। (নাসিমার কাছে একেবারেই গ্রাম্য।)

তার মনের ভাব বুঝে বলেছি, তাহলে এদেশেই বড় হয়েছে এমন কোনো স্মার্ট বাংলাদেশি ছেলেকে পছন্দ করে বাবা মাকে বলোনা কেন? নাসিমা মুখ-ভার করে বলেছে, তারা আবার অতি স্মার্ট। শাদা গার্ল ফ্রেন্ডদের সঙ্গে মিশে মিশে তারাও চায়, আমরাও শাদা মেয়েদের মতো চলি, পার্টিতে গিয়ে নাচি, ড্রিঙ্ক করি। এসব না পারলে ওরা আমাদের মনে করে “ক্ষেত”। নাসিমা বানুর সমস্যাটা সেদিন বুঝেছিলাম, কিন্তু কোনো সমাধান তাকে বলতে পারিনি। আমার এক বুদ্ধিজীবী বাঙালি বন্ধুকে নাসিমার সমস্যাটা বলতেই তিনি বলেছেন, “This is nothing but the conflict between two cultures” (এটা দুই কালচারের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছাড়া আর কিছু নয়)। বাংলাদেশি নতুন প্রজন্ম এই কালচারাল দ্বন্ধের মধ্যে বাস করছে।”

এটা পঁচিশ ত্রিশ বছর আগের কথা। তারপর টেমস নদী দিয়ে বহু জোয়ার ভাঁটার জল গড়িয়েছে। বিলাতের বাঙালি- তথা বাংলদেশি কম্যুনিটিও আর একস্থানে দাঁড়িয়ে নেই। ত্রিশ বছর আগে বিলাতে বাংলাদেশিরা কেমন আছে জিগ্যাসা করা হলে তখন যে জবাব দিতাম, তা এখন দেয়ার উপায় নেই। বর্তমান প্রজন্মেয় বাংলাদেশি নাসিমা বানুরা এখন দ্বিধা ভরা ও আড়ষ্ট হাফ-স্মার্ট তরুণী নয়। তারা অধিকাংশই শিক্ষিত, শাদা সমবয়সী মেয়েদের মতো স্মার্ট, রূপচর্চা ও আধুনিক ফ্যাশন তাদের নখদর্পনে, সর্বোপরি তাদের অধিকাংশের বিয়ে শাদি হয় নিজের ইচ্ছায়। বাবা-মা বা পরিবারের ইচ্ছায় যে হয় না, তা নয়। সেক্ষেত্রেও তাদের সম্মতি গ্রহণ জরুরি। বাংলাদেশ থেকে যে এখানো বর বা কনে খুঁজে আনা হয় না, তা নয়। কিন্তু তার সংখ্যা দ্রুত কমছে। ইন্টার রেসিয়াল ম্যারেজের হার বাড়ছে।

বিভিন্ন পেশায় এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশিরা পিছিয়ে নেই। বিলাতের অতি সফল ও ধণাঢ্য ব্যক্তিদের মধ্যে এখন বাংলাদেশিদের নাম আছে। ম্যানচেস্টারের ইকবাল আহমদ তাদের মধ্যে একজন। ব্রিটেনের পার্লামেন্টের দুই কক্ষেই (হাউস অব লর্ডস এবং হাউস সব কমন্স) বাংলাদেশি সদস্য আছেন। এমপি রোশনারা লেবার দলের ছায়া মন্ত্রিসভার সদস্য। ভবিষ্যতে নির্বাচনে জয়ী হয়ে লেবার পার্টি সরকার গঠন করলে রোশনারা মন্ত্রিসভায় স্থান পাবেন।

লন্ডনে এখন বিরাট বাঙালি পাড়া প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। পূর্ব লন্ডনের ব্রিক লেন এখন অক্সফোর্ড সার্কাসের সঙ্গে পাল্লা দেয়। তার নাম বাংলা টাউন। প্রায় গোটা হোয়াইট চ্যাপেল এলাকাকে লন্ডনের দৈনিকগুলোতেও উল্লেখ করা হয় ‘বেঙ্গলি ডিস্ট্রিক্ট’ হিসেবে। বাংলা টাউনের অধিকাংশ দোকান পাটের সাইনবোর্ড বাংলায় লেখা। আগে রাস্তায় শাদা সাহেবদের দেখলে বাঙালিরা অতি সম্ভ্রম দেখিয়ে মাথা নুইয়ে বলতো ‘গুড মর্নিং’ কিংবা ‘গুড ইভনিং স্যার’। এখন শাদা সাহেব ও মেম সাহেবরা বাংলাদেশি দেখলে আগ বাড়িয়ে বলেন, সালাম আলায়কুম। বিশেষ করে নির্বাচন কালে বিভিন্ন দলের অধিকাংশ শ্বেতাঙ্গ প্রার্থী এই কাজটি করেন। ভাঙা ভাঙা বাংলায় কথা বলেন। বাংলাদেশি তরুণেরা চুটিয়ে শাদা মেয়েদের সঙ্গে ডেটিং করে। আগের মতো “টু সী, নট্ টু টাচ” এর নীতি অনুসরণ করে না।

ব্রিটেনে বর্ণদাঙ্গা এখন নেই বললেই চলে। মাঝে মাঝে ছোটখাটো দু’একটি যা হয়, তা কালো ও শাদাদের মধ্যেই বেশি সীমাবদ্ধ থাকে। থাকে। এশিয়ানেরা তাতে জড়িত হয় খুব কম। আঠারো বছর আগে স্টিফেন লরেন্স নামের এক তরুণকে শাদা বর্ণবাদীরা হত্যা করে। আঠারো বছর পর সেই ঘাতকেরা পুনর্বিচারে দন্ডিত হওয়ায় ‘ব্রিটিশ জাস্টিসের’ প্রতি এথনিক মাইনরিটি কম্যুনিটিগুলোর আস্থা ও বিশ্বাস ফিরে এসেছে। ত্রিশ-চলিশ বছর আগে পূর্ব লন্ডনে বাংলাদেশিদের বসতিও দোকান পাটের উপর শাদা বর্ণবাদীদের দল ‘ন্যাশনাল ফ্রন্ট ও ব্রিটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির (বিএনপি) হামলা ছিলো প্রায় নিত্য নৈমিত্তিক। এই হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলতে গিয়ে প্রাণ দেন ব্লেয়ার পীচ নামে এক শাদা যুবক। তারপর থেকে লন্ডনের বেঙ্গলি ডিস্ট্রিক্টকে প্রায় বর্ণ হামলা মুক্ত এলাকা বলা চলে। ছোটখাটো দু’একটি ঘটনা যা ঘটে, তা নগণ্য। টাওয়ার হ্যামলেটস বরো কাউন্সিলের প্রথম নির্বাচত মেয়রও এখন একজন বাংলাদেশি।

তবু কালচারাল কনফ্রন্টেশন ও কনফ্লিক্ট থেকে বিলাতের বাংলাদেশিরা কি এখন সম্পূর্ণ মুক্ত? মোটেই নয়। এখন তাদের মধ্যে এক নতুন দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছে। আগে দ্বিতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ছিল ওয়েস্টার্ন কালচারের অন্ধ অনুকরণ প্রবৃত্তি। ফলে এক সময় মনে হয়েছিলো এরা বুঝি নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি সব ভুলে গিয়ে ওয়েস্টার্ন রীতি-নীতি আচার-আচরণ, খাদ্যভাস ও পোশাক পরিচ্ছদে অনুকরণ-সর্বস্ব শিকড়হীন কম্যুনিটি (Rootless) হয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত তা হয়নি।

বিলেতে আশির দশক থেকে বাংলাদেশি কম্যুনিটির মধ্যে মাতৃভাষা শিক্ষার আন্দোলন জোরদার হওয়ায় এবং অসংখ্য কম্যুনিটি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় নব প্রজন্মের বাংলাদেশি কম্যুনিটি শিকড়হীন হয়নি। বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় ও ধর্মীয় দিবস পালন, যেমন: বাংলা নববর্ষ উৎসব, একুশে ফেব্রুয়ারি, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের জন্মদিবস, দুই ঈদ, পূজা ইত্যাদি এই কম্যুনিটিকে শিকড়হীন হতে দেয়নি।

এর পরে নম্বইয়ের দশকের সূচনার কিছু আগে থেকে বাংলাদেশি তরুণদের এক উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যে দেখা দেয় পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রতি বিমুখতা এবং ইসলামী সংস্কৃতির নামে মধ্যপ্রাচ্যের ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রতি আনুগত্য। বহু তরুণ-তরুণী পশ্চিমা পোষাক বর্জন করে হিজাব সহ ধর্মীয় বিধান সম্মত পোষাক পরিধান করতে শুরু করেন। তরুণদের মধ্যেও অনুরূপ প্রবণতা দেখা দেয়।

অনেকে মনে করেন এটা সউদি আরব থেকে বিপুল অর্থব্যয়ে পশ্চিমা দেশ-গুলোতে মুসলমান তরুণ-তরুণীদের ক্রিশ্চান ও পশ্চিমা কালচারের প্রভাব থেকে মুক্ত করার যে গোপন ও প্রকাশ্য অভিযান শুরু করা হয়, তার ফল। এরপর ইরানও শুরু করে একই অভিযান। ফলে এই অভিযানে সউদি আরব ও ইরানীদের ধর্মীয় ও কালচারাল দ্বন্দ্বেরও প্রভাব পড়ে। বিলাতে বাংলাদেশি কম্যুনিটির মধ্যে দুই দ্বিধা দ্বন্দ্বের অনুপ্রবেশ ঘটতেও দেখা গেছে।

তবে যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই পাশ্চাৎমুখি সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে বিশেষভাবে সউদি ও তাদের অনুসারীরা ব্যবহার করতে চেয়েছিলো, তা সর্বতোভাবে সফল হয়নি। অন্যান্য অনেক এথনিক কম্যুনিটির মতো বিলাতের বাংলাদেশি কম্যুনিটির বর্তমান প্রজন্ম পশ্চিমা শিক্ষা ও আধুনিকতা দ্বারাও প্রভাবিত। ফলে ইস্টার্ন ও ওয়েস্টার্ন কালচারের সমন্বয়ের তাদের মধ্যে যে মিশ্র লাইফ-স্টাইল তৈরি হচ্ছে তাতে শেষ পর্যন্ত তারা মধ্যপ্রাচ্যের পশ্চাৎমুখি সাংস্কৃতিক ধারায় সম্পূর্ণ প্রভাবিত থাকবে তা কেউ মনে করেন না।

আমার পরিচিত হিজাবধারী এক বাংলাদেশি তরুণী সম্প্রতি পশ্চিমা কায়দায় প্রেম করে বিয়ে করেছেন। বিয়ের আসরে উপস্থিত হয়ে দেখি, তরুণ বরও দাঁড়ি-টুপি শোভিত এবং প্রচন্ডভাবে পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রতি বিমুখ। আমি তাদের জিজ্ঞাসা করেছি, আগে তোমরা কেউ কারো সঙ্গে দেখা করোনি, দেখা হয়নি তাহলে প্রেম হলো কিভাবে? দু’জনেই হেসে জবাব দিয়েছেন- ইন্টারনেটের মাধ্যমে।

আমার ধারণা, বিজ্ঞান এবং বিস্ময়কর নবপ্রযুক্তি একদিন মানুষের সকল ধর্ম, সংস্কৃতি, জাতীয়তার সমন্বয় ঘটিয়ে এক বিশ্ব মানবতার জন্ম দেবে। তার প্রভাব থেকে সকল দেশের মানুষের মতো দেশের ও বিদেশের বাংলাদেশিরাও মুক্ত থাকবে না। বিলাতেও তার সূচনা দেখতে পাচ্ছি।
[সূত্র : www.sylhetbarta.com]
[www.sylhetbarta.com -এর বিশেষ প্রকাশনা ‘সিলেটের চোখ’ এ প্রকাশিত

1365 জন পড়েছেন

উড়ন্ত পাখি

About উড়ন্ত পাখি

আমি কোন লেখক বা সাংবাদিক নই।
অর্ন্তজালে ঘুরে বেড়াই
আর যখন যা ভাল লাগে
তা সবার সাথে শেয়ার করতে চাই।

Comments are closed.