আমার যেমন বেণী তেমনি রবে চুল ভেজাবো না!!

2415 জন পড়েছেন

এক শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি ‘এক চুলও নড়বেন না’। তিনি যেভাবে তাঁর অধীনে নির্বাচন করতে চান, সেভাবেই নির্বাচন হবে। তার ইচ্ছাই শেষ কথা। বলেছেন, কিভাবে হবে সেটা সংবিধানেই লেখা আছে। এরও সুনির্দিষ্ট অর্থ আছে। অর্থ হোল, তিনি যেভাবে সংবিধান সংশোধন করে রেখেছেন, সেই ভাবেই নির্বাচন হতে হবে। তিনি মতায় থাকবেন, সংসদ জারি থাকবে। থানা-পুলিশ-প্রশাসন তার আজ্ঞাবহ থাকবে, তাদের সহযোগিতা করবে যুবলীগ-ছাত্রলীগের কর্মীরা। এই পরিস্থিতি মেনে নিয়েই বিরোধী দলকে নির্বাচনে আসতে হবে। শুধু তা-ই নয়, নির্বাচন কমিশনের এখন যতটুকু মতা আছে সেই তলানিটুকুও নির্বাচন কমিশন স্বেচ্ছায় বিসর্জন দেবে। নির্বাচন কমিশন নামে থাকবে, কাজে থাকবে না।

নির্বাচন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিয়ন্ত্রণে ও শাসনের অধীনেই হতে হবে। কথাটা এই ভাবে সিধা সরল আরিক অর্থেই বুঝতে হবে। একটা আদর্শ পরিস্থিতি এমন হতে পারত যে নির্বাচনের সময় সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আবশ্যিক সকল নির্বাহী মতা ও তা বলবৎ করবার উপযুক্ত আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক শর্ত বাংলাদেশে বাস্তবে হাজির। তাহলে সংবিধানের অধীনেই নির্বাচন হবে কথাটার ইতিবাচক অর্থ দাঁড় করানো যেত। সাংবিধানিক ভাবে দেশে যা চলছে তা সাংবিধানিক একনায়কতন্ত্র। শেখ হাসিনা বলছেন তাঁর এই একনায়কী অবস্থান থেকে তিনি এক চুলও নড়বেন না। খালেদা জিয়া প্রত্যুত্তরে বলেছেন, আন্দোলনে সব চুলই নড়বে, উড়ে যাবে সব কিছুই। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন বিএনপি ও আঠারো-দলীয় জোট শেখ হাসিনাকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার মেনে নিতে বাধ্য করবে। সেটা যদি তিনি করতে চান তাহলে আন্দোলনের মাধ্যমেই করতে হবে। এখন অবধি যে রাজনৈতিক বাস্তবতা তাতে তার সম্ভাবনা দেখি না। বিএনপিতে যারা মতায় থেকে অঢেল টাকাপয়সা কামিয়েছে এবং সেই সুখ আরাম আয়েশের সঙ্গে ভোগ করে কাটাতে চায় তারা আন্দোলন করবে না। তারা আবার মতায় যাবার আলিঝালি সম্ভাবনা দেখলে একটু চাঙ্গা হয়ে ওঠে মাত্র।

এটা তো আমরা কয়েক বছর ধরেই দেখছি। বিডিআর বিদ্রোহ গেল, টিপাই মুখ গেল, তিস্তা গেল, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি গেল, হলমার্ক-ডেসটিনি গেল, পদ্মা সেতু গেল, বিশ্বজিৎ গেল, আলেম-ওলামা ও ইসলামপন্থিদের দমনপীড়ন হত্যাযজ্ঞ গেল বিএনপি কিছুই করতে পারে নি। তো এই বিএনপির  পক্ষে আন্দোলন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আদায় করা অসম্ভবই বলতে হবে। যারা আন্দোলন-সংগ্রাম করবে তাদের বড় অংশই ইসলামপন্থি। তারা তাদের আদর্শের জায়গা থেকে লড়াই করে, সে আদর্শ অনেকের অপছন্দ হতে পারে। ইসলামের প্রতি ঘৃণা বা বিদ্বেষ পোষণ না করেও বাংলাদেশের ইসলামপন্থি রাজনীতি অপছন্দ করবার অনেক সঙ্গত কারণ থাকতে পারে। কিন্তু কমবেশি গত এক দশকে দুই রাজনৈতিক দলের দুর্নীতি, লুটপাট, চরম দুর্বৃত্তপনা, অসহনশীলতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের নজির দেখে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ইসলামি রাজনীতির পক্ষে গণসমর্থন বেড়েছে। ইসলামপন্থি রাজনীতির বিভিন্ন ধারার সঙ্গে বিএনপির জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ঐক্য ও পার্থক্যের জায়গা সুস্পষ্ট না করে বিএনপির পক্ষে আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

ইসলামের বিভিন্ন আদর্শিক বয়ান এবং ইসলামপন্থি রাজনীতির সমর্থন বিএনপি এত দিন অনেকটা ফাও পেয়ে এসেছে। যেহেতু আওয়ামী লীগসহ চৌদ্দ দল উভয়েরই বিরোধী প হবার কারণে নির্বাচনী আঁতাত হিসাবে কৌশলগত সম্বন্ধ রা করে কাজ হয়েছে। কিন্তু গত চার বছরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ইসলামপন্থিদের প্রধান অংশের সঙ্গে বিরোধ তুঙ্গে উঠেছে। সেই বিরোধকে সুনির্দিষ্ট আদর্শিক জায়গা থেকে বিবেচনা ও মীমাংসা করতে ব্যর্থ হলে বিএনপি ক্রমশ বাংলাদেশের রাজনীতিতে গৌণ দলে পরিণত হয়ে পড়বেÑ যা টিকে থাকবে তা হচ্ছে ইসলামপন্থি এবং তাদের বিরোধীরা। আওয়ামী রাজনীতি ও ইসলামপন্থি রাজনীতির মাঝখানে ধরি মাছ না ছুঁই পানি জাতীয় অবস্থান নিয়ে বিএনপি এত দিন কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল, তা ক্রমশ অসম্ভব হয়ে উঠবে। বিশেষত জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে যে বৈরী সম্পর্ক আওয়ামী লীগ তৈরি করেছে, তার ফলে বাংলাদেশের রাজনীতি আর আগের জায়গায় নাই। একটা গুণগত বদল ঘটে গিয়েছে। তার পরিণতি বাংলাদেশের জন্য কী দাঁড়াবে আমরা এখনো জানি না। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিÑ বিশেষত মধ্যপ্রাচ্য এবং মিসরের চলমান ঘটনাবলি। যদি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়, বিএনপি জিতবে এতে বোধ হয় সন্দেহ নাই। কিন্তু বিএনপি যদি আন্দোলন করতে চায় তাহলে ইসলামপন্থিদের সঙ্গে নিয়েই করতে হবে। সেইেে ত্র ইসলামপন্থিরা রক্ত দেবে আর বিএনপি তাদের পুরানা দুর্বৃত্ত ও দুর্নীতিবাজদের নিয়ে মতায় আসবে, সেটা হবে না।

একটা আদর্শিক ঐক্যের জায়গায় বিএনপিকে যেমন আসতে হবে, একই সঙ্গে বাংলাদেশের এখনকার সুনির্দিষ্ট কর্তব্যগুলো কী, সেইেে ত্রও পরিষ্কার একটি জাতীয় ও গণমুখী কর্মসূচি দাঁড় করাতে হবে। কিন্তু ইসলামপন্থিদের নিয়ে একটি জাতীয় ও গণমুখী কর্মসূচি প্রণয়নের কথা বিএনপি ভাবছে না। এইেে ত্র বিএনপি ইসলামপন্থিদের অচ্ছুতের মতো তাদের কাছ থেকে দূরে সরিয়েই রাখতে চায়। বেগম খালেদা জিয়া এইেে ত্র ব্যক্তিগত ভাবে সংবেদনশীল বা দূরদর্শী হতে পারেন। কিন্তু বিএনপির যারা নীতিনির্ধারক ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, তারা রাজনীতির বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে। তাদের বেশির ভাগই সম্ভবত শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবার জন্যই উদগ্রীব হয়ে আছেন। দুর্বৃত্ত ও দুর্নীতিবাজদের হেদায়েত করা কঠিন। এখনকার রাজনৈতিক কর্তব্য নির্ণয়েরেে ত্র বিএনপির মধ্যে দোদুল্যমানতা পরিষ্কার। সেটা ইসলাম প্রশ্নে যেমন, তেমনি আন্দোলনেরেে ত্রও। অনেকটা ‘আমার যেমন বেণী তেমনি রবে চুল ভেজাবো না’ জাতীয় রাজনৈতিক অবস্থান। কিন্তু শেখ হাসিনার চুল নড়ুক বা উড়ুক, বিএনপিকে আন্দোলন-সংগ্রামে চুল ভেজাতে হবে। এর বিকল্প আছে মনে হয় না। এই বাস্তবতা যদি কেউ ভালো বোঝেন তবে তিনি শেখ হাসিনা। যে কারণে আমি বিভিন্ন সময় শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কৌশলের প্রশংসা করি। শেখ হাসিনা জানেন, বিএনপিকে যদি আন্দোলন করতে হয় তাহলে ইসলামপন্থিদের সঙ্গে এখন আর আগের মতো শুধু প্রচলিত জোটমূলক সম্পর্ক বজায় রাখলে কাজ হবে না। আরো ঘনিষ্ঠ হতে হবে। ঘনিষ্ঠ হতে গিয়ে বিএনপি নিজে মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক প্রমাণিত হবে, শেখ হাসিনা যা চান। অন্য দিকে অন্য যেকোনো দেশের মতো ইসলামপন্থি রাজনীতিও একাট্টা কিছু নয় বা ইসলামপন্থিরা একই আদর্শ, প্রবণতা ও দলেরও অন্তর্ভুক্ত নয়। তারা নানান দলে ও গ্রুপে বিভক্ত। শেখ হাসিনা মনে করেন, এদের এই বিভাজন ও বিভক্তি এখনো কার্যকর রাখা সম্ভব। তিনি তার চেষ্টাও করে যাচ্ছেন। তবে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে ইসলামপন্থিদের মধ্যে ঐক্যের একটি তাগিদ দেখা যাচ্ছে। নানান বিষয়ে ব্যাখ্যা বা বয়ান এবং আকিদার জায়গায় ফারাকের তর্ক প্রবল ভাবে থাকলেও ‘ইমান’-এরেে ত্র ঐক্যের জায়গাটা আরো মজবুত করতে ইসলামপন্থিরা আগের চেয়ে অনেক বেশি আগ্রহী। যারা ইসলামের জন্য রক্তাক্ত হচ্ছেন এবং শাহাদত বরণ করছেন তাদের ইমান নিয়ে প্রশ্ন তোলা যে তরিকারই হোক, এখন কেউই আর ভালো চোখে দেখে না।

তা ছাড়া রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের পার্থক্য বহাল রাখা যারা দরকারি মনে করেন তাঁদের মধ্যেও অনেকে বাংলাদেশে ইসলামের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভূমিকা থাকা জরুরি ও ন্যায্য মনে করেন। তারা বিশ্বাস করেন, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিম লের মধ্যে থেকে ইসলাম চর্চা সম্ভব। সামগ্রিক ভাবে বিচার করলে ইসলামপন্থি ও ইসলাম অনুরাগীদের সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি প্রবল। তবে জাতীয় রাজনীতিতে তার প্রকাশ কিভাবে ঘটবে সেটা এখনো সুনিশ্চিত নয়। তার অভিমুখ নির্ণয় করে দেওয়াই ছিল ইতিবাচক ‘জাতীয়তাবাদী’ রাজনীতির কাজ। কিন্তু বিএনপি সেই সামর্থ্য আগেও দেখাতে পারে নি, এখনো পারবে তার নিশ্চয়তা খুবই সামান্য। বিএনপির প্রতি শেখ হাসিনার নীতি হচ্ছে, বিএনপি জামায়াত-হেফাজতের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধা একটি মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক দল, এটা বারবার প্রমাণ করা। এর মধ্য দিয়ে বিএনপির মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারীদের তিনি বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিতে পারেন। সেই দিক থেকে শেখ হাসিনা খুবই সফল। আদর্শিক দেউলিয়াপনার কারণে বিএনপি ইসলামপন্থিদের সঙ্গে শুধু সুবিধাবাদী সম্পর্ক রচনা করতে সম, কিন্তু ইসলামের ইতিহাস ও চিন্তাধারাকে ইতিবাচক অর্থে ‘জাতীয়তাবাদী’ রাজনীতিতে আত্মস্থ করবার বুদ্ধিবৃত্তিক পরিশ্রম কিম্বা রাজনৈতিক বিচণতা বিএনপির নাই। বিএনপির বুদ্ধিজীবীদের লেখালিখি পড়লেই সেটা অনায়াসে টের পাওয়া যায়। শেখ হাসিনা চাইছেন আন্দোলনে ঠেলে দিয়ে বিএনপিকে ইসলামপন্থিদের আরো ঘনিষ্ঠ হতে বাধ্য করা। যাতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভাবে প্রচার করা সম্ভব হয় যে বিএনপি যদি আবার মতায় আসে তবে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা আগের মতো প্রশ্রয় পাবে এবং মাথাচাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াবে। ইতোমধ্যে ‘জঙ্গি’দের গ্রেফতার করা শুরু হয়েছে এবং ভারতীয় পত্রপত্রিকায় প্রচার চলছে কোনো ভাবেই বিএনপিকে মতায় আসতে দেয়া যাবে না।  শেখ হাসিনা সুস্পষ্ট ভাবে তাঁর অবস্থান থেকে ‘এক চুলও নড়বেন না’ বলায় বাংলাদেশে আগামি দিনে কী হতে যাচ্ছে তা নিয়ে জল্পনাকল্পনা শুরু হয়ে গিয়েছে। এতে শেখ হাসিনার পে ও বিপে উভয় দিকের বেশির ভাগের মধ্যে একটা আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। তাহলে কি বাংলাদেশ সংঘাতের দিকে যাচ্ছে? ঠিক যে এই সম্ভাবনা আগের চেয়েও এখন প্রবল। কিন্তু এই ধরনের সংঘাতের রাজনৈতিক পরিণতি কী হতে পারে তার উত্তর সম্ভবত নির্ভর করছে বিরোধী দলের ভূমিকার ওপর। আন্তর্জাতিক চাপে শেখ হাসিনা তাঁর অবস্থান বদলাবেন তার সম্ভাবনা এখন অনেক কম। সে চাপের শর্ত হিসাবে বিএনপিকে ডক্টর ইউনূস বা আন্তর্জাতিক ভাবে গ্রহণযোগ্য কোনো ব্যক্তির মধ্যস্থতা বা ভূমিকা মেনে নিতে হতে পারে। ডক্টর ইউনূস আদৌ এই ধরনের ভূমিকা পালন করতে চান কি না সেটা আগামি দিনেই বোঝা যাবে। অন্য দিকে বিএনপি যদি আন্দোলন করতে চায় তাহলে তাকে ইসলাম, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সংশ্লিষ্ট মতাদর্শিক প্রশ্নকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা ও পর্যালোচনা করতে হবে। সেইেে ত্র বাংলাদেশে বিরোধীদলীয় রাজনীতিকে যেসব বিষয় বিবেচনা করতে হবে সেই বিষয়ে আমরা কয়েকটি কিস্তিতে এখানে আলোচনা করব। দুই শুরুতেই মনে রাখতে হবে বাংলাদেশ কিন্তু সংঘাতের মধ্যেই আছে। রাজনৈতিক ‘সংঘর্ষ’, খুনোখুনি, একে ধরে নিয়ে যাওয়া, ওকে খুন করা, মানুষ গুম করে ফেলা কিন্তু চলছে। আইন, বিচারব্যবস্থা পুলিশি হয়রানি সব কিছু দিয়েই শেখ হাসিনা মতাসীন থাকার সুবিধা নিয়ে বিরোধীদের বিরুদ্ধে ঠিকই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এর একটা আইনি মোড়ক আছে। ফলে এই সংঘর্ষের নগ্ন দিকটা আড়াল করে রাখা সহজ হয়।

এই দিকটা মনে রাখলে যারা মতাসীনদের প,ে তারা সংঘর্ষের মধ্যে হাবুডুবু খেতে থাকলেও আবার সংঘর্ষের কথা বলেন কেন? মূলত আতঙ্কটা অন্যত্র। যে সশস্ত্র নিপীড়নের তারা অংশীদার, সেই নিপীড়কব্যবস্থার আইনি মোড়ক খসে যাবার ভয়। সেই পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে রাষ্ট্রের যে সশস্ত্র শক্তিকে মতাসীনেরা এখন সাংবিধানিক কিম্বা আইনি মোড়কের আড়ালে ব্যবহার করতে পারছে, সেটা আদৌ সম্ভব হবে কি না সেই আশঙ্কাতেই তারা তটস্থ হয়ে পড়েছে। বিরোধী পরে দমনপীড়নকে রাষ্ট্রের সুরার নামে আইনি চরিত্র দেয়া তখন কতটা সম্ভব হবে, সে আতঙ্ক তাদের লেখালিখিতে ফুটে উঠছে। লড়াই তখন চৌদ্দদলীয় জোট বনাম আঠারোদলীয় জোটের হবে কি না সেটাও সন্দেহ। সেটা হয়ে উঠতে পারে মতাসীন ও মতার বাইরে থাকা সব অগণতান্ত্রিক, গণবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের লড়াই। রাষ্ট্রের সশস্ত্র শক্তি যদি তখন শেখ হাসিনা সংবিধান ও আইনের দোহাই দিয়ে ব্যবহার করতে না পারেন, তখন সেই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে তার দল কতটা টিকে থাকতে পারবে সেটা সন্দেহের বিষয়। মতাসীনদের আতঙ্ক এখানেই। একই আতঙ্ক বিরোধী রাজনৈতিক দলের মধ্যেও আছে। তবে তার চরিত্র ভিন্ন। তাদের আশঙ্কা আন্দোলনের সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে। শেষাবধি বিএনপির অবস্থান কোথায় থাকবে, সে ব্যাপারে তারা নিশ্চিত নন। এ কারণে বিএনপির ভেতরে একটি শক্তিশালী অংশ সব সময়ই আন্দোলন-সংগ্রামের বিরোধিতা করবে। শেখ হাসিনা এটা জানেন না বা বোঝেন না তা নয়। দেখা যাচ্ছে আন্দোলনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করারেে ত্র দুটো কৌশল তিনি চর্চা করতে চাইছেন। সম্ভবত কৌশলগুলো যত না দলীয়, তার চেয়ে বেশি তার পরামর্শকদের। প্রথম কৌশলের নাম প্রপাগান্ডা। যেহেতু রাষ্ট্র ও রাজনীতির গোড়ার সঙ্কট অনুধাবন করতে তাঁর দল ও সমর্থকেরা সম্পূর্ণ ব্যর্থ, ফলে প্রপাগান্ডার মূল জায়গাটা হবে উন্নয়ন। তারা বোঝাতে চাইবেন যে অবিশ্বাস্য দুর্নীতি ও অকথ্য লুটতরাজের পরও তারা দেশের উন্নতি করেছেন।

তাদের আমলে কত কী উন্নয়ন হয়েছে তার ফিরিস্তি তারা প্রচার করবেন। করছেনও। হঠাৎ ঢাকার দিগন্ত ঈদের ছুটির হপ্তাখানেক আগে বিলবোর্ডের সৌন্দর্যে একাকার হয়ে গেল। বিলবোর্ডগুলো মতাসীনদের উন্নয়নের ফিরিস্তিতে ভরা। সরকারের যদি উন্নয়নেরেে ত্র সফলতা থাকে তবে তার প্রচার করা মোটেও দোষের কিছু নয়। সেই সফলতার খতিয়ান জানাটাও সবার শিণীয় হতে পারে। কিন্তু প্রপাগান্ডা আলাদা জিনিস। সেটা সত্যমিথ্যায় জড়ানো আর তার প্রধান উদ্দেশ্য মূল সমস্যা বা সঙ্কটকে আড়াল করা। বাংলাদেশের এখনকার সমস্যা রাজনৈতিকÑ উন্নয়নের নীতি কিম্বা তার সফলতা-বিফলতাও রাজনৈতিক সঙ্কটের অধীনেই এখন আলোচ্য বিষয়। কিভাবে সমাজের অর্থনৈতিক বাস্তবতা এখনকার রাজনৈতিক সঙ্কটের পেছনের কারণ, সে আলোচনার অবশ্যই দরকার আছে। সেই অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে সমাজের শ্রেণি ও শক্তির অবস্থান, সম্পর্ক ও মতার ভারসাম্য আমরা অর্থনীতির গোড়ায় গিয়ে বুঝতে পারি। কিন্তু উন্নয়নের প্রপাগান্ডা দিয়ে রাজনৈতিক সঙ্কট আড়াল করবার কৌশল সফল হবার সম্ভাবনা কম। ন্যূনতম কা জ্ঞান আছে এমন কোনো সাী সরকারপে খুঁজে পাওয়া কঠিন, যারা বোঝে না যে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তায় ধসের কারণ মতাসীনদের উন্নয়নের সফলতা প্রচারে ব্যর্থতা নয়। এর কারণ একান্তই রাজনৈতিক। অর্থনৈতিক মতাদর্শের দিক থেকে চৌদ্দ দল ও আঠারো দলের মধ্যে কোনোই বিরোধ নাই। ‘অবাধ বাজারব্যবস্থা’ বিএনপির অতি সাধের ঘরোয়া মতাদর্শ। গণমানুষের অর্থনৈতিক স্বার্থ আর রাজনীতির সঙ্গে বিএনপির এখানেই বিরোধ। বিএনপি ঘোষণা দিয়েই পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার স্থানীয় দালাল বা মুৎসুদ্দি হয়েছে। সেখানে কোনো কপটতা নাই। একটি রাজনৈতিক দল হিসাবে তার উত্থান ও টিকে থাকার এটাই প্রধান মতাদর্শিক কারণ। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও তাদের বামপন্থি লেজুড়রা করেন ‘সমাজতন্ত্র’।

এটা যে কী গৌরবের সমাজতন্ত্র সেটা বোঝা মুশকিল, কারণ তারাও এখন এই অবাধ বাজারব্যবস্থারই ধারক ও বাহক। গণমানুষের সঙ্গে তাদের দুশমনি অর্থনৈতিকেে ত্র শুধু নয়Ñ সেটা বিএনপির বিরুদ্ধে যেমন, তাদের বিরুদ্ধেও। উভয়কেই অবাধ বাজারব্যবস্থায় গড়ে ওঠা দুর্নীতিবাজ ও দুর্বৃত্তদের দল বলেই জনগণ চিহ্নিত করে; দুঃশাসনের এই দ্বিপীয় আয়তত্রে থেকে গণমানুষের মুক্তি চায়। কিন্তু এখন মূল লড়াই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকেে ত্র। এটা সুস্পষ্ট ভাবে বুঝতে হবে। শেখ হাসিনার দ্বিতীয় কৌশল হচ্ছে, ইসলামপন্থি আন্দোলনকে যথারীতি সন্ত্রাসী ও জঙ্গি বলে প্রতিষ্ঠা করা। সেইেে ত্র ইসলামপন্থিদের দাবিদাওয়া পেশ ও আন্দোলনের ধরন তাঁকে এই প্রচারে সহায়তা করে। ল করার বিষয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকেে ত্র ইসলামপন্থিদের আন্দোলন গণতন্ত্র এবং নাগরিক ও মানবিক অধিকারের দিক থেকেও বিচার করা সম্ভব। এই লড়াইয়ের প্রকাশ ঘটছে দুটো রূপ নিয়ে। প্রথমত নাগরিক ও মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই। একজন নাগরিকের রাজনৈতিক বিশ্বাস যা-ই হোকÑ জঙ্গি কি শান্তিবাদীÑ তার কিছু নাগরিক ও মানবিক অধিকার রয়েছে। নাগরিক ও মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই মূলত ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধেই লড়াই। সেই অধিকার আদায়ের লড়াই বিকশিত হলে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা রূপান্তরের লড়াই হিসাবে সেটা ক্রমশ হাজির হতে থাকবে। সেই দিকেই নাগরিক ও মানবিক অধিকার রার লড়াই ধাবিত হতে বাধ্য। বিরোধী দলের দিক থেকে ইসলামপন্থীদের সঙ্গে আদর্শিক সম্পর্ক রচনারেে ত্র এটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। দ্বিতীয় রূপ হচ্ছে, ইসলামবিদ্বেষ ও ইসলামি আতঙ্কের বিরুদ্ধে গণমানুষের সংগ্রাম। ইসলামবিদ্বেষ ও ইসলামি আতঙ্কের (ওংষধসড়ঢ়যড়নরধ) বিরুদ্ধে জনগণের বড় একটি অংশ তাদের লড়াইকে দেখছে ইমান-আকিদা ও ইসলামি সংস্কৃতি ও পরিচয় রার লড়াই হিসাবে। আধুনিকতা ও ধর্মনিরপেতায় বিশ্বাসীরা একে রাজনৈতিক ইসলামের দিক থেকে বিপজ্জনক হুমকি হিসাবে দেখছেন। অথচ এর মর্মে রয়েছে মানবিক মর্যাদার স্বীকৃতি পাবার গণতান্ত্রিক আকাক্সা। যারা প্রগতি, আধুনিকতা কিম্বা ধর্মনিরপেতায় বিশ্বাস করেন, তারা মুসলমানদের ইমান-আকিদার লড়াইকে সেভাবে বিচার করতে নারাজ। ইসলামপন্থিরাও তাঁদের দাবিদাওয়া নাগরিক অধিকার বা মানবিক মর্যাদার প্রশ্নের জায়গা থেকে হাজির করতে পারেন নি। অনেকে হাজির করতে চানও না।

পাশাপাশি ‘আধুনিকতা’, ‘প্রগতি’ ও ‘ধর্মনিরপেতার’ কঠোর পর্যালোচনা ছাড়া বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলা অসম্ভব। বিরোধী রাজনৈতিক ধারাগুলো শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলতে চাইলে পরস্পরের মধ্যে আদর্শিক ঐক্য গড়ে তুলবার জায়গাগুলো স্পষ্ট করতে হবে। এই বিষয়গুলো উপো করলে বাংলাদেশের পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের মতো রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধের পরিণতি করতে পারে। সে সম্ভাবনা অস্বীকার করার উপায় নাই। দাড়িওয়ালা টুপিওয়ালা বোরখা পরা মানুষ, মাদরাসার ছেলেমেয়ে ও আলেম-ওলামাদের প্রতি শিতি মধ্যবিত্ত শ্রেণির আচরণের মধ্যে মারাত্মক সমস্যা রয়েছে। এই আচরণের পেছনে আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থানের অসাম্য যেমন কাজ করে, তেমনি কাজ করে শ্রেণি ঘৃণা। সাম্প্রতিক কালে আলেম-ওলামা ও ইসলামপন্থিদের ‘দানবীয়’ শক্তি হিসাবে হাজির করা, তাদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত গণমাধ্যমে ঘৃণা, বিদ্বেষ ও হিংসা প্রচার এবং তাদের ওপর দমনপীড়ন, জেলজুলুম ও নির্বিচারে হত্যার কারণে প্রশ্ন উঠেছে যে রাজনীতি ও সংস্কৃতির পরিম লে এই পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে সেই রাজনীতি ও সংস্কৃতির অধীনে এই দেশের মানুষ নিরাপদ কি না। আরো গুরুতর প্রশ্ন, এই রাজনীতি ও সংস্কৃতির আধিপত্য বজায় রেখে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশকে টিকিয়ে রাখা আদৌ সম্ভব কি না। এই রাজনীতি ও সংস্কৃতি বাংলাদেশের প্রতিরাব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে এবং দিল্লির দাসত্ব মেনেই মতায় টিকে থাকতে চাইছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ নাগরিকদের মর্যাদা ুণœ করার কারণে তাদের পে দিল্লি ছাড়া পাশ্চাত্যের অন্যান্য দেশের সমর্থনও তাদের আর নাই। ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আছে প্রতিপরে। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা দাবি করলেও সেই জীবনে ইহলোকের জায়গা কম। অভিযোগ হচ্ছে ইসলামপন্থিরা মানুষের ইহলৌকিক জীবনের চেয়েও পারলৌকিক জীবনকে অধিক সত্য গণ্য করে; তারা ইসলামের শান্তি ও কল্যাণের কথা বললেও সাম্প্রদায়িক হয়ে যায়। ইসলাম কায়েমের চেয়ে ‘মুসলমান’ পরিচয় প্রধান করে অন্যান্য সম্প্রদায় ও ভিন্ন পরিচয় যারা ধারণ করে, তাদের রাজনৈতিক শত্রু গণ্য করতে শুরু করে, নারীর প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পশ্চাতপদ ইত্যাদি অনেক যুক্তি রয়েছে, যার বিরুদ্ধে ইসলামের আদর্শের দিক থেকেও কঠোর সমালোচনা করা সম্ভব। সেই সমালোচনা করবার জন্য নাস্তিক বা ধর্মনিরপে হবার দরকার পড়ে না। এর ফলে ইসলামবিরোধীরা মনে করেন ইসলাম রাজনীতির ল্য একটাই।

সেটা হোল, দুনিয়ায় শুধু মুসলমানরাই থাকবে আর কেউই থাকবে না, যদি কেউ থাকতে চায় তাহলে মুসলমানদের অধীনস্থতা মেনেই থাকতে হবে। জিজিয়া কর দিয়ে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বলা বাহুল্য, ইসলামপন্থিরা বলবেন এই অভিযোগগুলো ঠিক নয়। কিন্তু ঠিক কি বেঠিক সেই তর্ক এখানে এখন করব না। এই ধরনের কোনো ধারা বাংলাদেশে যদি থাকে সেটা ইসলামি আন্দোলনের মূল ধারা নয়, এই দাবি করলেও বাংলাদেশের জনসংখ্যার বিশাল একটা অংশ মেনে নেবে কি না সন্দেহ। এই কঠিন জায়গাগুলো অতিক্রম করবার একটাই পথ। সেটা হোল এক দিকে যেমন ‘আধুনিকতা’, ‘প্রগতি’, ‘সভ্যতা’ ইত্যাদি ধারণাগুলোর কঠোর পর্যালোচনা, অন্য দিকে এ কালে ইসলামের আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা কী হতে পারে তাকে শুধু বিশেষ সম্প্রদায়ের স্বার্থ কিম্বা ধর্মীয় বিষয় হিসাবে না দেখে সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রচিন্তার দিক থেকেও বিচার করতে শেখা। যদি আন্দোলন ছাড়া বিকল্প না থাকে তাহলে আন্দোলনকে ফলপ্রসূ করতে মতাদর্শিক তর্কবিতর্কেরও কোনো বিকল্প থাকতে পারে না। শেখ হাসিনার কৌশলের বিরুদ্ধে দুটি পথ বিরোধী দলগুলোর সামনে খোলা আছে। একটি পথ হচ্ছে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটছে এই প্রপাগান্ডার উপযুক্ত জবাব দেয়া; দ্বিতীয় পথ হচ্ছে যেকোনো মূল্যে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই দুটি দিকে তীè নজরদারি রেখে বাংলাদেশে ইসলাম প্রশ্নকে আন্তরিক ভাবে বিচার করবার প্রয়োজন আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি তীব্র হয়েছে। বাংলাদেশ আসন্ন ঝড় মোকাবিলা করতে পারবে কি না জানি না, কিন্তু চেষ্টা করতে হবে। (অসমাপ্ত) ২২ আগস্ট ২০১৩। ৭ ভাদ্র ১৪২০। শ্যামলী। কবি, কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

2415 জন পড়েছেন

Comments are closed.