পাকিস্তান ও শোষণের বক্তব্য

3570 জন পড়েছেন

ভূমিকা

১৯৪০ সালে লাহোর কনভেনশনের ভিত্তিতে মুসলিম ও হিন্দু অধ্যুষিত প্রধান প্রধান অঞ্চল নিয়ে কয়েকটি রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব ছিল। এই প্রেক্ষিতে পূর্ব ও পশ্চিম বাংলা মিলে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এতে বর্ণহিন্দু সম্প্রদায়ের একটি অংশ একমত ছিলেন না। তারা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের পরিবর্তে ভারতের সাথে একত্রে থাকতে চেয়েছিলেন। ১৯৪৬ সালে তাদের এই অভিপ্রায় চরমরূপে প্রকাশ পায়। মনে রাখা দরকার যে পূর্ববঙ্গের অনেক মুসলমানও তাদের ধারণায় প্রভাবিত ছিলেন, যে ধারাটি এখনো প্রবল না হলেও ভিতরে ভিতরের পরিচালিত ও পরিবাহিত। সেদিন উন্নত ও উদার চিত্তের অধিকারীদের এটাই একটা একটা আকাঙ্খা ছিল যে পূর্ব ও পশ্চিম বঙ্গ মিলে একটি আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু তাদের সেই আকাঙ্খা  বাস্তবায়িত হতে পারে নি।

বর্ণ-হিন্দুগণ ভারতের সাথে একত্রে থেকে যাওয়াতে তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক কারণ ছিল।  সব ধর্মের ভিতর এমন আদর্শ প্রায়ই থেকে থাকে। সেদিনের অবিভক্ত বঙ্গীয় আইন পরিষদের হিন্দু সদস্যগণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে আলাদা রাষ্ট্রের রূপায়ন দেখতে চান নি। কেননা, ওখানে, উভয়বঙ্গ মিলে, মুসলিমরা সংগরিষ্ঠ হয়ে পড়ে! তাই অবিভক্ত ভারতের সাথে থাকাই তাদের শ্রেয় মনে হয়েছিল,  তাই অবিভক্ত ভারতের পক্ষেই তাদের ভোট পড়েছিল। তারা সেদিন এই কাজটি না করলে দুই বঙ্গ একত্রিত থাকত, এবং  উভয় বঙ্গ মিলে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হত। পূর্ববাঙলাকে পাকিস্তানের সাথে যেতে হত না।

বলেছি, মুসলমানদের এক অংশও বর্ণহিন্দুদের সাথে ছিল। অবশেষে, পশ্চিম বঙ্গ ভারতের সাথে চলে গেলে, পূর্ববঙ্গের এই ক্ষুদ্র অংশ নিয়ে একটি আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে সমস্যা দেখা দেয়: এই ক্ষুদ্র রাষ্ট্র ‘অর্থবহ’ (meaningful/viable) স্বাধীন দেশ হিসেবে বেঁচে থাকতে পারবে বলে সেদিনের বাঙালী মুসলিম নেতারা মনে করেন নি। আর এটাই ছিল সেই হিন্দু সম্প্রদায়ের  কৌশল: পূর্ববঙ্গকে একটি কঠিন অবস্থানে ঠেলে দেয়া, যাতে এখানে অর্থবহ কোন রাষ্ট্র গড়ে ওঠতে না পারে। এই কৌশলের মোকাবেলায়  সেদিনের মুসলিম নেতারা পূর্ব-পশ্চিমের মাঝখানে ভারতকে স্যান্‌উইচের (sandwich) মত ভৌগলিকভাবে স্থাপন করে, দুই অঞ্চল মিলে, পাকিস্তান সৃষ্টি করেন। এটা ছিল স্ট্রাটেজিক কৌশল। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে সেই কৌশল দারুণ প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছিল। মনে রাখতে হবে, পশ্চিম পাকিস্তান এই অঞ্চলকে কোনোদিন ‘জোরে’ দখল করে নেয় নি। তাই পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের কলোনি ছিল -এমন ধারণা খুব একটা ঠিক নয়। এর সাথে অনেক  প্রোপাগান্ডা আছে।

সমস্যার শুরু

কিন্তু সেদিন যারা পূর্ববঙ্গে স্বাধীনতা চান নি, যারা ‘ভারত-মাতার’ সাথে থাকতে চেয়েছিলেন, এই জনগোষ্ঠীর কিছু লোক দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই সেটি ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা শুরু করেন। এই দেশ তাদের পছন্দ হয় নি। শেষ পর্যন্ত শোষণের কাহিনী তারা রচনা করতে থাকেন এবং এক সময় মানুষ তা মেনে নিতে শুরু করে।  এই প্রবন্ধটি সেই পরিপ্রেক্ষিত থেকে রচিত।

১৯৪০ দশকের কথা ওঠলেই ভারত বিভক্তির কথা আপনাতেই এসে যায়। তাই শুরু করার আগেই ভারত ভাঙ্গা নিয়ে দুটি কথা বলে ফেলি। সেদিনের সমাজে কেউ হিন্দু, কেউ মুসলিম ছিল। কিন্তু নিছক এই পার্থক্যের কারণে ভারত বিভক্ত হয়নি। ভারত বিভক্ত হওয়ার ঐতিহাসিক মানসিকতায় ছিল বর্ণহিন্দুদের ইংরেজদের মাধ্যমে ভারতে মুসলিম শাসনের পতন ঘটানো এবং ইংরেজগণ কর্তৃক বর্ণহিন্দুদের সাহায্যের স্বীকৃতি ও পুরস্কার হিসেবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তগুলো ওদের হাতে তুলে দেয়া এবং এরই ফলশ্রুতিতে ছয় শো বছরের মুসলিম সভ্যতা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার ধারাবাহিক পদদলনে। তারপর দুই শতক ব্যাপী মুসলমানদেরকে একপেশে করে, ইংরেজের সাথে মিতালী করে, রাষ্ট্রশক্তিতে বর্ণহিন্দুদের যে স্থান কব্জায়ত্ত্ব হয়েছিল, সেই কব্জাকে সামান্য ঢিলা করে মুসলিমদেরকে অনুপাতিক হারে সামান্য স্থান সংকুলান করে দিয়ে আলোচনায় বসতে ও প্রস্তাব বিবেচনা করতে তাদের ব্যর্থতার কারণে। হিন্দুদের আভিজাত্যপূর্ণ ভঙ্গিমা ও যুগ যুগ ধরে চলে-আসা প্রতাপী আচরণ তা হতে দেয় নি। শেষ পর্যন্ত ১৯৪০ এর দশকে আসে মুসলমানদের আলাদা হওয়ার চিন্তা এবং আলাদা হওয়ার ভিত্তি হিসেবে এসেছিল হিন্দু/মুসলিম দ্বিজাতীয় বিষয়। অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভাগ হওয়ার সমাধান আস্‌লেও দ্বিজাতি তত্ত্ব বিভক্তির “কারণ” ছিল না। ১৯৪৬ সালের বঙ্গভঙ্গতেও ছিল সেই একই অবস্থা। মুসলমানরা পশ্চিম বঙ্গকে ভারতে ঠেলে দেয়নি। হিন্দুরাই সেটা ভেঙ্গেছিল এবং যারা সেদিন পাকিস্তান চায়নি, বরং চেয়েছিল পূর্ববাংলা ভারতের সাথে থাকুক, তাদের একাংশ প্রথম দিন থেকেই পাকিস্তান ভাঙ্গার কাজে আত্মনিয়োগ করে।

পাকিস্তান ভাঙ্গা

১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভাঙ্গেছিল শোষণের বক্তব্যে উত্তেজিত জনতার ক্ষোভ ও আক্রোশের মুখে। একাত্তরে যদি যুদ্ধ না হত তবুও অন্য সময়ে তা ভেঙ্গে যেত।

শোষণের বক্তব্য

মানব সমাজে অবিচার হতে পারে, শোষণ হতে পারে, এই সম্ভাবনা কেউ বিনা বিবেচনায় উড়িয়ে দিতে পারে না। তবে কোথাও সত্যি তা হল, বা হল না, অথবা কিছু হল, এসব  দেখতে হলে অবশ্যই নিরপেক্ষ বিচার/বিবেচনার প্রয়োজন হয়। পাকিস্তান আমলের ঐ দুই দশকের উপর যেসব তথ্য রয়েছে তা যদি কেউ প্রোগ্রেসিভলি (progressively) এবং পটভূমিসহ (with background) তুলে ধরেন তবে সেই ধারণা স্পষ্ট হতে পারে।

শোষণ ও অবিচার দেখতে হলে ১৯৪৭ সালের আগে উভয় অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক অবস্থার একটা ব্যাপক (comprehensive) লিস্ট (inventory) তৈরি করার প্রয়োজন হবে। সেখানে উভয় অঞ্চলের শিল্প কারখানা, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানাদি, আর্থিক অব-কাঠামো, রাস্তাঘাট, বার্ষিক আয় ও ব্যয়ের উৎস ও প্রয়োজনাদি (demands) ইত্যাদির একটা পরিসংখ্যান তৈরি করতে হবে। তারপর এই পরিসংখ্যানের আলোকে দেখাতে হবে কারা কার কোন কোন সম্পদ চুরি (!) করে নিয়েছে, বা কার ধনমাল কি পরিমাণে শোষিত হয়েছে। সেই সর্বাঙ্গীণ হিসাব সামনে না এনে এখানে সেখানে অসম্পর্কিত পরিসংখ্যান তুললে তা ধোঁকাবাজির রূপ নিতে পারে।

আবার এও দেখতে হবে যে বিদেশী পণ্য আমদানি/রপ্তানির শিল্পজাত অস্তিত্ব ও পরিপ্রেক্ষিত আগে কার কীরূপ ছিল এবং ক্রমান্বয়ে (successively) তা কিভাবে বর্ধিত বা কমতে থাকলো। উভয় এলাকার বাণিজ্যিক পরিমণ্ডলের রূপ ও কেপাসিটি আগে কি ছিল এবং তুলনাকালে (at the time of comparison) উভয়ের পরিমণ্ডল ও কেপাসিটি কি ছিল। মনে রাখবে হবে যে পটভূমি বিবর্জিত পরিসংখ্যান দিয়ে কেবল সাধারণ পাবলিককে কিছু একটা দেখানো যায়, কিন্তু এর ভিত্তিতে অর্জিত পরিণতি কখনো ভাল হয় না। সেদিন এবং আজও যা স্পষ্টত দেখা যায় তা হল রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার সয়লাব।

এক্ষেত্রে আরেকটি কথা। এক এলাকার ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানাদি, অবকাটামো এবং বাজারের চাহিদা যদি অপর ভূখণ্ডের চেয়ে ভিন্ন হয়ে থাকে তবে সেই ভিন্নতার কারণে নানান পার্থক্য সূচিত হতে পারে। যেকোনো পার্থক্য দেখিয়ে শোষণের আওয়াজ তোলার আগে, সেই পরিমণ্ডলকে চিহ্নিত করতে হবে, দেখতে হবে। এবং সেই পার্থক্যের স্থানসমূহ নিরপেক্ষভাবে পরিসংখ্যান-ব্যাখ্যায় আনতে হবে। তারপরও এই বাস্তবতাও বিবেচনা করতে হবে যে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এসে অনেক ব্যবসায়ী পূর্ব-পাকিস্তানে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানাদি ও শিল্প-কারখানা তৈরি করে পূর্ব-পাকিস্তানের আর্থিক উন্নয়নে সহায়তা করছিলেন যা পূর্ব-পাকিস্তানের বাৎসরিক উন্নয়ন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল।

যে মুহুর্ত্তে পূর্ব বাঙলা ভারত থেকে আলাদা হয় তখন বাংলায় তেমন কোন শিল্প-কারখানা ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানের খুব কম লোক ব্রিটিশের আর্মফোর্সে ছিল। খুব কম লোক সিভিল সার্ভিসে ছিল। স্কুল, কলেজ ও ইউনিভার্সিটির সংখ্যা কম ছিল।

এটা ঐতিহাসিক সত্য যে সেদিন বাঙ্গালী মুসলিমদের চাইতে অবাঙ্গালী মুসলিমরা ব্রিটিশের পদ-পদবীতে বেশি নিযুক্ত ছিলো –অমনিতেই নয় বরং তাদের আপন যোগ্যতায়।  পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেই পূর্ব অবকাঠামো নিয়ে নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাজ শুরু হয়। তারপরও বাঙালিদের সকল স্তরে নিয়োগ ছিল চোখে পড়ার মত। আবারও মনে রাখতে হবে যে কোনো  দেশে ‘জাতীয়তার’ ভিত্তিতে লোকজন ধরে ধরে চাকুরীতে ঢুকানো কি ন্যায্য রাষ্ট্রীয় নীতি হতে পারে না।

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর, পূর্বপাকিস্তানে নিজেদের প্রাদেশিক সরকারও ছিল। প্রথম দিকে দক্ষ লোকের অভাবে বিভিন্ন সেকশনে ভারত থেকে হিজরত করা লোকদের পর্যন্ত নিয়োগ দিতে হয়েছিল। পূর্ব বাংলার ধনী হিন্দু জমিদার ও মহাজনেরা নিজেদের টাকা-পয়সাসহ পশ্চিম বাংলায় হিজরত করেছিল। পূর্ববাংলায় উৎপাদিত পাটের কলকারখানা পশ্চিম-বাংলাতেই ছিল। কিন্তু নানান প্রতিকূলতার ভিতর দিয়েও সেদিনের পূর্বপাকিস্তান মাত্র দুই দশকে শিল্প-বাণিজ্যে অনেক সমৃদ্ধ হয়েছিল।  এটাই হচ্ছে ঐতিহাসিক বাস্তবতা।

অন্য দিকে পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তান থেকে উন্নত ছিল। এটা আরও স্পষ্ট করলে ভাল হয় যে তাদের বিপুল সংখ্যক লোক (পাঞ্জাবের) ব্রিটিশ আর্মফোর্সে ছিল; বিপুল সংখ্যক লোক সিভিল সার্ভিসে ছিল। তাই সার্বিকভাবে এই দুই অসম পর্যায়ের দেশ এক হওয়াতে নানান সমস্যা ওঁত পেতে ছিল। প্রথম থেকেই সরকারী সকল সেক্টরে পশ্চিম পাকিস্তানের লোক অবস্থান নেয়ার পরিসর ছিল। এটাই ছিল natural disposition, সাধারণ বিন্যাস করণের অবস্থা। কিন্তু প্রথম দিনের উভয় দেশের সরকারী কর্মচারী সংখ্যা, মিলিটারি সংখ্যা, স্কুল কলেজ সংখ্যা ইত্যাদি দেখিয়ে শোষণের আওয়াজ তোলা যেতে পারতো, কিন্তু বিষয়টি চাক্ষুষ এবং নিত্য-বর্তমান থাকায় কেউ বিশ্বাস করতো না, তাই এই আওয়াজ তোলার জন্য কিছুকাল অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

পূর্ব-পাকিস্তানের শিল্প-কারখানা ও পাট-পণ্য নিয়ে মুনিম সিদ্দিকীর একটি লেখা থেকে উদ্ধৃত করছি যা শোষণের বক্তব্য অনেকটা স্পষ্ট করবে:

[ভারত ভাঙ্গার আগে] ১৮৫৫ সাল থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত দীর্ঘ ৯২ বছরের এই পাটের টাকা কোথায় যেত এই পাট বিক্রির টাকায় তখন আমাদের কৃষক কি দুই বেলা খেতে পেরেছিল? এই পাটের টাকায় কি পূর্ব বাংলার রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হয়েছিল না স্কুল কলেজ হাসপাতাল হয়েছিল? পৃথিবীর সব চেয়ে ভাল মানের পাট এই পূর্ব বাংলায় ফলন হত। অখণ্ড ভারতের ৮০ ভাগ পাট আমাদের কৃষক উৎপাদন করতেন। আর ২০ ভাগ পাট পশ্চিম বাংলায় উৎপাদন হত। কিন্তু সব কটি জুটমিল স্থাপন করা হয়েছিল পশ্চিম বাংলার কলকাতা নগরীর হুগলী নদীর দুই পাশে। জুট মিল থেকে যারা লাভবান হতেন তারা ছিলেন কলকাতার লোকজন। এই পূর্ব বাংলার জূটের টাকায় কলিকাতা নগরী রাস্তাঘাটের জৌলুষ বৃদ্ধি পেয়েছিল। ১৯৩৯ সালের এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় যে, ঐ সময় কলকাতাতে ৬৮৩৭৭টি লুমস পাটের পণ্য উৎপাদন করে চলছিল।কিন্তু তাঁর একটিও পূর্ব বাংলায় ছিলনা। আমরা ছিলাম শুধু পশ্চিম বাংলা কাচা পাটের যোগানদার আবার সেই পাট তৈরি পণ্যের ক্রেতা! দেশ ভাগের পর এই পশ্চিম বাংলার হিন্দু ভাইয়েরা আমাদের প্রাপ্য আমাদের ভাগের একটি টাকাও ফেরত দেন নাই। আমাদের দেশের সরকারী কর্মচারীদের বেতন দেবার মত কোন টাকা আমাদের ব্যাংকে রেখে যায় নাই। দেশ ভাগের প্রথম কয়েক মাসের বেতন ইস্পাহানী কোম্পানী চালিয়ে নিয়েছিল।

ভারত ভাগ হবার পর ১৯৫০ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত মাত্র ২০ বছরে পূর্ব পাকিস্তানে ৭৬টি পাটকল স্থাপিত হয়েছিল যার ফলে এই দেশের হাজার হাজার মানুষের কৃষিখাতের বাইরে শিল্পখাতে কর্মের সংস্থান হতে পেরেছিল। … এই ৭৬টি শিল্প প্রতিষ্ঠা করার মত তখন পূর্ব বাংলা কোন মুসলিম বাঙ্গালীর মূলধন যোগানোর মত ক্ষমতা ছিলনা। … পশ্চিম পাকিস্তানের কিছু লোক যারা তাদের নিজেদের অর্থ দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এই ৭৬টি শিল্প প্রতিষ্ঠান [১]। মুনিম সিদ্দিকী (২০১২). অর্বাচীনের সংলাপ -১. সদালাপ [অনলাইন]. প্রাপ্তব্যস্থান http://www.shodalap.org/munim/17068

দুই দশক পরে যখন শুরুর প্রাথমিক বিষয়াদি অনেকের দৃষ্টির অগোচর হয়, এবং কারো কাছে বিস্মৃত হয় এবং বিশেষ করে তরুণ সমাজ প্রোপাগান্ডার মারপ্যাঁচ বুঝার অবস্থানে নেই তখন শোষণের আওয়াজ তোলা হয় এবং শোষণ-বিবৃতিতে বাস্তবতা যেন বীভৎস হয়ে ওঠে।

কিন্তু আসল কথা হচ্ছে প্রোপাগান্ডা সকল সমাজে কেবল অশান্তিই আনে। আপনি রাশিয়ার অক্টোবর বিপ্লব দেখুন (১৯১৭), তার পরের লেনিনের প্রোপাগান্ডা দেখুন, নৃশংস মৃত্যু, অত্যাচার দেখুন, হাহাকার দেখুন। বাংলায় ১৯৭২-৭৫ এর আর্থ-সামাজিক দুর্যোগ, দুরবস্থা দেখুন, পরের শোষণ, ধর্ষণ, লুট, ডাকাতি, এসব দেখুন। মিথ্যা মিথ্যার জন্ম দেয়।

দুই একটি কথা বাকী রয়েছে। তাই এই অংশের সারাংশের টানি। বলেছি, শোষণের বিষয় বিবেচনা করতে হলে পাকিস্তানের তুলনায়, সেই সময় পূর্ব পাকিস্তানের যাবতীয় কিছু, (আর্থ-সামাজিক, শিক্ষা, শিল্প ইত্যাদি) বিবেচনায় আনতে হবে। আমরা মাত্র দুই দশক নিয়ে আলোচনা করছি। বলিনি, বাজেটের ব্যাপারে দেখতে হবে ১৯৪৭ সালের আগে পশ্চিম পাকিস্তানের ইনফ্রা-স্ট্রাকচার কিরূপ ছিল এবং পূর্ব পাকিস্তানে কিরূপ ছিল। সেই অঞ্চলের স্ট্রাকচার ও ডিমান্ড মোতাবেক কি পরিমাণ বাজেটের প্রয়োজন ছিল এবং বাংলাদেশে কোন ধরণের স্ট্রাকচার ছিল এবং সেই স্ট্রাকচার ও ডিমান্ডের ভিত্তিতে কি পরিমাণ বাজেটের প্রয়োজন ছিল। কেবল জনসংখ্যার ভিত্তিতে বাজেট নির্ণয়/নিরূপণ হয় না। এই বাংলাদেশেও কোন্ জেলায় লোক বেশি -এই ভিত্তিতে বাজেট তৈরি হয় না। উভয় পাকিস্তানের আয়ের উৎস ও ব্যয়ের ডিমান্ড ইত্যাদি বিবেচনায় আনতে হয়। না হলে, অর্থাৎ এগুলোর প্রকৃত বিচার/বিবেচনা ছাড়া শুধু প্রোপাগান্ডাই করা যেতে পারে। আমাদের গ্রামে কোনো ডাক্তার নেই, আপনাদের গ্রামে ডাক্তার সংখ্যা ৫ জন –এটা শোষণের বক্তব্য হয় না। এভাবে দুই এলাকার জনসংখ্যা, ডাক্তার সংখ্যা, সেবাকেন্দ্র ইত্যাদি তাদের ঐতিহাসিক অবস্থান ও পটভূমি ছাড়া শোষণের কথা প্রমাণ করে না। এগুলোতে অনেক ফ্যাক্টর কাজ করে। আগ-পরের অবস্থা কাজ করে। মনে রাখতে এখানে শোষণের বক্তব্য বস্তুনিষ্ঠ নয়। বস্তুনিষ্ঠ তথ্য দিয়ে প্রোপাগান্ডা হয় না।

প্রোপাগান্ডা করার জন্য নানান পার্থক্য দুই জেলায়, দুই উপজেলায় দেখানো যাতে পারে।। কিন্তু তাতে কি হবে? সিলেট জেলার অনেক লোক বঞ্চিত ভাবেন। তাহলে এখন কী হবে? বাঙ্গালী জাতীয়তা শোষণের বিষয় হবে?

দুই অসম দেশ একত্রিত হওয়া

সেই মুহুর্ত্তের কথা স্মরণ করুন যখন দেশ ভারত থেকে আলাদা হয়। বাংলার নেতারা এই হতদরিদ্র, শক্তিহীন দেশের স্বাধীনতা অর্থবহ (meaningful) মনে করেন নি। তাই ‘অর্থ’ খুঁজতে পাকিস্তানের সাথে সংযুক্ত হতে হয়েছিল, কেউ কারো উপর জবরদস্তি করে নি। আজ একথা বলারও অবকাশ আছে যে সেদিন পাকিস্তানের সাথে মিলিত হওয়ার বেসিস (basis) ছিল না এবং যখন তা হয়েছিল তখন একত্রিভূত হওয়ার বেসিস (basis) নিয়ে সঠিক কোন আলাপ আলোচনাও হয় নি। এগুলো হঠাৎ করে হয়ে গিয়েছিল। দুই অসম অঞ্চল একতাবদ্ধ হওয়াতে ‘অসম’ আওয়াজ তোলার স্থান ও প্রেক্ষিত প্রথম থেকেই ওঁত পেতেছিল এবং আওয়াজ উঠার পর যা হবার তাই হয়ে গিয়েছে।

মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়
শোষণের সাথে উগ্রপন্থিরা ভাষার বিষয় জড়িত করে। বরং বলা যায় মিথ্যাচার করে।  সস্তা প্রোপাগান্ডায় মূর্খতাও কাজ করে। পাকিস্তানিরা নাকি বাঙালীর মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চাচ্ছিল! গায়কী কথাও তাদের প্রোপাগান্ডার বিষয় হয়, তাদের ‘সত্যে’ পরিণত হয়।
আমরা ১৯৪০ দশকের মধ্য থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্র-ভাষা নিয়ে যেসব আলোচনা ও আন্দোলন দেখা যায় তাতে অমনিতেই বুঝা যায় যে উর্দু ও বাংলা উভয়ই রাষ্ট্র-ভাষা হতেই যাচ্ছে। তাছাড়া ১৯৪৮ সালে রেসকোর্সের ময়দানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তার ভাষণে বলেছিলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কোন বিশেষ অঞ্চলের ভাষা হওয়া উচিত হবে না। তাই রাষ্ট্র ভাষা উর্দু হবে কিন্তু প্রদেশের ভাষা নির্ধারণ করবে ঐ প্রদেশের জনগণ। ফলে পূর্ব বাংলায় প্রাদেশিক সরকার ১৯৪৮ সালের ৮ই এপ্রিল প্রদেশের সরকারি ভাষা, আদালতের ভাষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভাষা বাংলা হবে বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই সিদ্ধান্ত কার্যকরি করার পর, ১৯৪৮ সাল হতে ১৯৫২ পর্যন্ত, ভাষা নিয়ে তেমন বড় কিছু ঘটতে দেখা যায় না।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের বিষয়টি ফিরে আসে খাজা নাজিমুদ্দিনের পল্টনের ঘোষণার মাধ্যমে। তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত ছিল। কয়েক মাস আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান একজন আত্মঘাতকের হাতে নিহত হন। মস্কো ও ওয়াশিংটন শক্তির টানাপোনের সূত্র এর ছিল। এই জের ধরে পাকিস্তানের কমিউনিস্টপন্থিদের বিপ্লবী কর্মতৎপরতা ও উত্তেজনা কার্যকর ছিল। ভারতের সাথে সম্পর্ক ভাল যাচ্ছিল না। এসব রাজনৈতিক সমস্যা সামাল দিতে সরকারের ব্যর্থতা দেখা যায়। এই পর্যায়ে আসে খাজা নাজিমুদ্দিনের রাষ্ট্র ভাষার বক্তব্য। তবে তমদ্দুন মাজলিসের অবস্থান ও কার্যক্রমের দিকে তাকালে আপনাতেই বুঝা যায় যে নাজিমুদ্দিনের উস্কানিপূর্ণ বক্তব্যকে ২১শে ফেব্রুয়ারির ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রক্তারক্তি মাধ্যমে মোকাবেলা করার প্রয়োজন ছিল না। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন কমিটিসহ তখন যে অবস্থান বিরাজ করছিল তার মোকাবেলায় বাংলার দাবী নস্যাৎ হবার মত ছিল না।

সেদিন উর্দুকে নিয়ে যে আলোচনার সূত্রপাত হয়েছিল তা ১৯৩০ এর দশক থেকে হিন্দির মোকাবেলায় চলে আসছিল। এর প্রেক্ষিত ছিল অখণ্ড ভারতে রাষ্ট্রভাষা কোনটি হবে। কিন্তু দেশ ভাগ হয়ে যাওয়ায়, হঠাৎ-সৃষ্ট নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্রে সেই আলোচনা দ্রুতই হাজির হইয়ে পড়ে। রাষ্ট্র-যন্ত্রের সাথে জড়িত শ্রেণীর অধিকের ভাষা উর্দু ছিল। এটা অতি স্বাভাবিক ও মানবিক বিষয় যে আপনার এলাকার লোক যদি সরকারের বিভিন্ন সেক্টরে থাকে তবে আপনার এলাকার কিছু প্রয়োজনাদি তাদের কাছে প্রাধান্য পাবে। এভাবে মূল থেকে রাষ্ট্র-যন্ত্রে জড়িত উর্দুভাষীদের চিন্তার প্রাধান্য উর্দুতে পড়ে এবং সাথে সাথে বাংলা উর্দুর তাত্ত্বিক আলোচনাও তাৎপর্যের বিভিন্ন উন্মোচন করে। একটি দেশে এমন সাংঘর্ষিক বিষয় উঠতে পারে এবং বিশেষ করে তাও দেখতে হবে, দেশটি ছিল নতুন, অনেক সমস্যাও ছিল নতুন।

ভাষার বিকাশ ও উন্নয়ন রাষ্ট্রের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকলেও ভাষার একটি সত্তাগত রূপ ও বাস্তবতা রয়েছে (reality of language) এবং তার অনেক কিছু মানুষের তকদীরের মতই যা কেবল রাষ্ট্রই নির্ধারণ করে না শেষ করে দিতে পারে না। বাংলাভাষার জন্মের অতি প্রাথমিক স্থরে এই ভাষা আরেকটি রাষ্ট্র ভাষার অধীনেই তথা ফার্সির অধিনে বিকাশ লাভ করে। অন্য কথায় কোন রাষ্ট্রভাষা বাংলা  ভাষার জন্ম দেয় নি, এবং এদিক থেকে যে জিনিসকে রাষ্ট্র জন্ম দেয় নি সেই জিনিসকে রাষ্ট্র তুলে নিতেও পারত না -ভাষা মানুষের মুখের বস্তু, ব্যবহারের বস্তু। এটা বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয় যে বাংলার বিকাশলগ্নে এক সময় ফারসি রাষ্ট্র ভাষা ছিল রাষ্ট্র ভাষা, অন্যদিকে এবং পরের পর্যায়ে, ইংরেজি ছিল রাষ্ট্র ভাষা। এগুলো থাকাতেও বাংলা বিলীন হয় নি, বরং এগুলোর পাশে অবস্থান করে বাংলা বিকশিত হতে পেরেছিল। উর্দু যদি সেদিন একান্ত রাষ্ট্র ভাষা হয়েই যেত, তাহলেই কি বাংলা ভাষা বিলীন হয়ে যেত? আমি মনে করি না, (তবে আগেই বলেছি, বাংলাকে মোটেই সরানো যেত না)। আজ বাংলা ভাষার উপর যারা ২১ ফ্রেব্রুয়ারিতে সিরাজুদ্দৌলা নাটকের কায়দায় বক্তৃতা দেন তাদের অনেকের ছেলে মেয়েরা শুদ্ধ উচ্চারণে বাংলা বলতেই পারে না, ইংরেজি এক্সেন্ট লক্ষ্য করা যায়। অনেকের ছেলেমেয়েরা আদৌ বাংলা জানে না।

[নোট: ভারত বিভক্তি উপর জয়া চ্যাটার্জীর (২০০৩) বাঙলা ভাগ হল, ঢাকা: দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, অনুবাদে, আবু জাফর, একটি অনন্য গবেষণা। আলোচ্য বিষয় তার গবেষণায় বিস্তারিতভাবে স্থান পেয়েছে।]

Facebook Comments

3570 জন পড়েছেন

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতত্ত্ব, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক।

Comments

পাকিস্তান ও শোষণের বক্তব্য — ১ Comment

মন্তব্য দেখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *