সাঈদী কি নিষ্ঠুর রাজনীতির নির্মম শিকার হলেন?

1619 জন পড়েছেন

ব্লগার রাজীব হত্যা ব্যাকফায়ার করার পর শাহবাগের আন্দোলন উজ্জীবিত রাখার জন্য এবং ইসলামের বিরুদ্ধে ব্লগারদের অপকর্ম থেকে উদ্ভুদ পরিস্থিতি থেকে দৃষ্টি অন্যত্র সরানোর জন্য আর একটি কোরবানী অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। সাঈদী সাহেব এই কোরবাণীর একটি নিষ্ঠুর শিকার। সাঈদী সাহেবের পক্ষে-বিপক্ষে দেওয়া সকল সাক্ষীর প্রতিটি বক্তব্য আমি পড়েছি। সরকারী সাক্ষীদের বেশীর ভাগ ছিল ফকির-পাকড়া, চোর-বাটপার, ফেরিওয়ালা ইত্যাদি। সাঈদী সাহেবের বিরুদ্ধে মুক্তি যুদ্ধের সপক্ষে বা বিপক্ষে কোন প্রকার সংস্রব রয়েছে এই সকল সাক্ষীদের সাক্ষ্য থেকে আমি খুঁজে পাইনি। বিচারপতি নিজামুল হকের স্কাইপ সংলাপের মধ্যেও এই একই ধারনার প্রতিফলন রয়েছে। তিনি বলেছেন, “সাঈদী সাহেবের বিচার একটি গ্রামীন শালিস বই কিছু নয়।” ফাঁসী হওয়ার মতো অপরাধ কি গ্রাম্য শালিসে ফয়সালা হয়? হয় না। অধিকন্তু ‘দেল্লা রাজাকার’ আর ‘দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর’ পিতা যে একই ব্যক্তি ছিলেন তাও গ্রহনযোগ্য ভাবে প্রমানিত হয়নি। তাই ভেবে দেখা দরকার যে, নাটকে ভুল করে আব্বাসকে আক্কাস বানিয়ে মারামারির যে নাটক করা হয়েছে, এখানেও তা হয়েছে কিনা। একজন নিরপরাধ ব্যক্তির শাস্তি হোক এটা অবশ্যই আপনারা চান না। কিন্তু বলতে পারেন, বিশা বালীর ভাই সুখরঞ্জন বালীর কোর্টের দরজা থেকে গুম, ইব্রাহীম কুট্টির স্ত্রীর পুরনো মামলা, আর ১৫ জন সরকারী সাক্ষীর অনুপুস্থিতে তাদের পক্ষে তদন্তকারী অফিসারের সাক্ষী গ্রহনের মতো পরিস্থিতির পর কারো বিরুদ্ধে ফাঁসীর রায় হয় কিভাবে? প্রকৃতপক্ষে বিচারপতি নিজামুল হকের স্কাইপ কেলেঙ্কারী প্রকাশ হওয়ার পর ফাঁসিতো দুরের কথা, সাঈদী সাহেবের দু’চার দিনের জন্যও শাস্তি হওয়ার কথা ছিলনা। তবুও আটটি অভিযোগে তাকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে এবং সর্বোচ্চ শাস্তি মৃর্তু দন্ড দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের অভিযোগটি আমার কাছে হাস্যকর মনে হয়েছে। বিচারক নিজেই বলেছেন, সাঈদী সাহেব নাকি একজন সাধারন রাজাকার ছিলেন। রাজাকারদের কি তখন এমন ক্ষমতা ছিল যে তারা পাকিস্তানি সৈন্যদের খাদ্যে ভাগ বসাতে পারতো? পাকিস্তানি সৈন্যরা ছিল তখন ধর্ষনের মূখ্য খরিদ্দার। আর রাজাকারের অবস্থান ছিল তাদের চাকর-বাকরের মতো। মনিব তার মহামূল্যবান খাদ্য সামগ্রী চাকর-বাকর সহ ভাগ বাটোয়ারা করে খাবেন এমন মানষিকতা আর করো থাক না থাক পাকিস্তানী সৈন্যদের অবশ্যই ছিলনা। তবুও বলা হয়েছে ধর্ষন প্রমাণিত হয়েছে। তাই শাস্তি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শাস্তি দেওয়ার সময় এবিষয়টি কি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে যে, তখন স্থানীয় ভাবে সকল সাধারন রাজাকারদের জন্য একজন রাজাকার কমান্ডার ছিল। যদি থেকে থাকে, তাহলে কমান্ডার এবং তার অধিনস্ত অন্য সকলকে বাদ দিয়ে শুধু মাত্র একজন তথাকথিত রাজাকারের শাস্তি হয় কি ভাবে? আমার মনে হয়, শাস্তি সাব্যস্ত করার সময় পাকিস্তানী সৈন্যদের কথা ভূলে গিয়ে রাজাকারদেরকেই প্রকৃত পাকিস্তানী সৈন্য মনে করে শাস্তি সাব্যস্ত করা হয়েছে। বিচারপতি নিজামুল হক বলেছিলেন যে, সরকার একটা রায়ের জন্য পাগল হয়ে গিয়েছে। তাই এই পাগলামি থামানোর জন্য বিচারের এরকম রায় প্রদান করা হয়েছে কিনা তাও ভেবে দেখা দরকার। তবে মনে রাখবেন, বিচার পাগলা-পাগলি থামানোর মতো কোন কাজ নয়। বিচার একটি পবিত্র আমানত। ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যায়ের বিচার করে এই আমানত রক্ষা করতে হয়। অন্যায়ের সাথে কম্প্রমাইজ করে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা যায় না। আসলে শাহবাগের উত্তপ্ত চত্বর থেকে উত্থাপিত দাবি-দাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এই বিচারের জন্য মূলত কোন বিচারপতিই খুঁজে পাওয়া উচিত ছিলনা। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য রাজা রাজবল্লব, উমির চাঁদ, ঘষেটি বেগম, মোহাম্মদী বেগ, মীর জাফর আলী খাঁনের এই দেশে কোন কিছুরই যেন কমতি থাকতে নেই। না হয়, বিচারে যা’ই হোক, রায় হতে হবে ফাঁসী, এই শর্ত মেনে নিয়ে মানুষ বিচারকের দায়িত্ব গ্রহন করেন কি ভাবে। আসলে বিচারকের ঘাড়ে শাহবাগ বসিয়ে রাখার পরও যখন বিচারপতিগন বিচার কাছে বিব্রতবোধ করেন না তখন বুঝতে হবে ‘ডালমে কুঁচ কালা হায়।’ দুনিয়াতে বর্তমানে সাদার ছেয়ে কালো বেশী ক্ষমতাবান বলেই ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ বা বিচারিক খুঁন কথাটি জন্ম হয়েছে। তাই পৃথিবীর অনেক দেশেই অনেক নিরীহ মানুষ হচ্ছেন এই ‘বিচারিক খুঁনের’ নির্মম শিকার। কিন্তু ‘বিচারিক খুঁনের’এই মসিবতটি সাঈদী সাহেবের ঘাড়ে পড়লো কেন? – কারন রাজনীতি। বড় রকমের বার্গেনিং এর জন্য রড় সীপ দরকার। সাঈদী সাহেব একটি বড় সীপ। এই মুহুর্তে জমায়েতে ইসলাম ও সাঈদী সাহেবের চেয়ে বড় সীপ বাংলাদেশে নেই। জামায়াতে ইসলাম রাজনীতির ভারসাম্য রক্ষা করার ক্ষমতা রাখে; আর সাঈদী সাহেব পারেন মানুষের মনকে টেনে বের করে আনতে মনের ভিতর থেকে। সরকার হয়তো তাই নিজেদের পাহাড় পরিমান ব্যর্থতা আড়াল করার জন্য সাঈদী ও জামায়েত উভয়কেই তুরুপের তাস হিসাবে ব্যবহার করতে চাচ্ছেন। এতে হয়তো সরকার আশা করছেন তাদের নিম্ন লিখিত উদ্দেশ্য গুলো হাসিল হতে পারে: ১. নির্বাচনী ওয়াদার নামে রাজনৈতিক ফায়দা লাভ ২. জামাতকে নি®কৃয় করে আসন্ন নির্বাচনে বিজয় লাভের সম্ভাবনা তৈরী ৩. সম্ভব হলে প্রেসিডেন্সিয়াল পার্ডনের বিনিময়ে জামাতের বিএনপি ত্যাগের ব্যবস্থা ৪. উদ্ভুদ পরিস্থিতিকে মূলধন করে জামাতের রাজনীতি অবসান ৫. প্রয়োজন মত অন্যান্য ষ্টেটিজিক সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন ——    কিন্তু সাঈদী সাহেব এখন কি করবেন? সাঈদী সাহেবকে যে সকল অপরাধে মৃর্তুদন্ড দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম অপরাধ ‘ধর্ষন’। ধর্ষন জনিত অপরাধে ইউসুফ (আঃ) কে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। বাংলাদেশ সরকারের মতো তখনকার মিশরের কর্তৃপক্ষও জানতো যে ইউসুফ (আঃ) দোষী ছিলেন না। সাঈদী সাহেবও তাই। এক সময় কর্তৃপক্ষের রাষ্ট্রীয় একটি বড় সমস্যা সমাধানের জন্য  ইউসুফ (আঃ) কে মুক্তি দানের প্রয়োজন হয়েছিল। ইউসুফ (আঃ) তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কারন ধর্ষনের মতো একটি মিথ্যা অভিযোগ মাথায় রেখে মুক্ত থাকার চেয়ে কারাগারে থাকাটাকেই তিনি ভাল মনে করেছিলেন। ইউসুফ (আঃ) এর বয়স কম ছিল, তবুও তিনি তা তোয়াক্কা করেননি। কিন্তু সাঈদী সাহেবের বয়স ৭৩ বছর। আরো কয়েকটাদিন বেঁচে থাকার জন্য ধর্ষনের মতো একটি মিথ্যা অপবাদ মাথায় নিয়ে সরকারের পাতা ফাঁদে তিনি পা দিতে পারেন না। আর যদি তা’ই হয় তাহলে এই বিচারকে ঘিরে সরকারের নেওয়া অনেক ষ্টেটিজি বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। বিশেষ করে দন্ড কার্যকর করার দিন বগুড়ার মতো যদি সারা দেশের নারী-পুরুষ মিলে দেশের সকল পুলিশ ফাঁড়ী দখল করে ফেলে তাহলে পাকিস্তানী ও বিহারীরদের মতো বর্তমান সরকার ও সাহায্যকারী কারো জন্যই ভাল হবে না। জাতী বিরাট সংকটে নিপতিত হবে। মনে রাখবেন, আল্লাহ্ বলেছেন “তোমরা পরিকল্পনা কর, আমিও পরিকল্পনা করি; কিন্তু আমি সকল পরিকল্পনাকারীদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ পরিকল্পনা কারী।” – আল-কোর’আন।

 

1619 জন পড়েছেন

About ওয়াহিদুর রহমান

লেখক একজন কষ্ট এন্ড ম্যানেজমেন্ট একাউন্ট্যান্ট। ইসলামের মৌলিক বিধি-বিধানের উপর গবেষনা মূলক চিন্তা ভাবনা করে থাকেন। কম্পারেটিভ ধর্ম চর্চা লেখকের একটি পুরনো অভ্যাস। লেখকের গবেষনা মুলক গ্রন্থ ‘ইসলাম ও আমাদের দৈনন্দিন জীবন’ সমাপ্তির পথে। বইটি টরন্টস্থ বাংলা সাপ্তাহিক ‘দেশের আলো’ পত্রিকায় অনেকদিন থেকে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। লেখক টরন্টস্থ ’বৃহত্তর নোয়াখালী এসোসিয়েশন ওন্টারিও’ এর বর্তমান প্রেসিডেন্ট।

Comments

সাঈদী কি নিষ্ঠুর রাজনীতির নির্মম শিকার হলেন? — ২ Comments

  1. আরেকটি কথা সংযোগ করি। আজ আলেম ওলামারা মুসলিম ঐক্য ধরে রাখতে অতিতের যেকোন সময় থেকে বেশি যত্নবান দেখা যাচ্ছে। আজকে যে যেখানে আছেন সবাই সেই ঐক্য ধরে রাখতে চেষ্টা করতে হবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সবাই নিজেদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠন ছেড়ে দিয়ে তা করতে হবে। মানুষ যখন বিদ্বেষ ত্যাগ করতে শিখবে এবং বিদ্বেষীদের প্রতি সমর্থন ওঠাতে শিখবে, তখনই ঐক্যের বাস্তবতা আসবে। আমাদেরকে ধুরন্ধর শয়তানদের থেকে বেঁচে থাকতে হবে।

  2. আমি বিগত কয়েক বৎসর ধরে কাফির মুনাফিকগণকে বিভিন্ন ব্লগে যে অমানবিক প্রোপাগান্ডা, গালি-গালাজ এবং ফ্যাসিবাদী বিবৃতি-বর্ণনা চালিয়ে যেতে দেখে আসছি, এগুলো ছিল ফাঁসীর দাবীতে বিচার বহির্ভুত উগ্র-কর্মকান্ড। উগ্র ইসলাম বিদ্বেষী থাবা নাস্তিকের শহীদী প্রচারণার পক্ষের মুনাফিক ও রাজনীতিকদের হাতের ক্রীড়নক, রাত-দিন একত্রে এক চত্তরে কাটানো, উগ্র যুবক যুবতীর সার্কাসের দাবী পূরণ করে এসেছে সাঈদীর বিপক্ষে এই রায়। এগুলো একটা তামাশা।