আমাদের আরেকটি ভাষা আন্দোলন প্রয়োজন

3200 জন পড়েছেন

ফেব্র“য়ারি মাস এলেই বাংলাদেশে ভাষার মাস উদযাপন শুরু হয়ে যায়। ভাষার গানে মুখরিত হয় সারাদেশ। এখন এ ভাষার মাসের অঙ্গে আন্তর্জাতিকতার ছাপ এবং নতুন নামের অলংকার যুক্ত হয়েছে। ইউনেস্কোর কল্যাণে একুশে ফেব্র“য়ারি এখন আন্তর্জাতিক দিবস এবং তার নতুন নামকরণ হয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। কিন্তু ফেব্র“য়ারির ভাষা আন্দোলন একটি ভাষাভিত্তিক জাতীয় রাষ্ট্রের জš§দান এবং রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা আদায়ের পরও তার আবেগ ও আন্দোলনের গতি ক্রমশ হারিয়েছে এবং এখন একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে।
একুশের ভাষা আন্দোলনকে এক সময় বলা হতো শোকের তরবারি। ইস্পাতের তৈরি দুধারি তলোয়ার। এখন এটা সোনার দরবারি তরবারি। দরবারে ঝুলিয়ে রাখা যায়, ব্যবহার করা যায় না। বায়ান্নতে শোক থেকে তৈরি হয়েছে আন্দোলন। এখন শোক উৎসবে রূপান্তরিত হয়েছে। তার বিশ্বজনীনতা ঘটেছে। বিশ্বায়নের গুণে বাংলা ভাষারও বিশ্ব-বিস্তৃতি ঘটেছে, যা বাড়েনি তা হচ্ছে তার প্রকৃত ব্যবহার। না স্বদেশে, না বিদেশে।
অথচ ভাষা আন্দোলনের সেই শুরু থেকে শুনে আসছি সরকারি কাজে, শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলা ভাষার ব্যবহার চাই। চাই সরকারি-বেসরকারি সব কাজকর্মে, ব্যবসা-বাণিজ্যে বাংলা ভাষার ব্যবহার। এ দাবি আদায়ের জন্য বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ সেই পাকিস্তান আমলে সর্বত্র, বিশেষ করে ঢাকা শহরে দোকানপাটে ইংরেজি সাইনবোর্ড, নিওন সাইন ভেঙেছে। আর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তো বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা, সরকারি ভাষা এবং শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলা ভাষার উন্নয়নের জন্য বাংলা একাডেমী বহু কাজকর্ম করেছে। শব্দকোষ, অভিধান প্রকাশ করেছে। নানা গবেষণা চালাচ্ছে।
পৃথিবীর সর্বত্র বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। বাংলা বইপত্র, সংবাদপত্র বেরুচ্ছে। টিভি চলছে। কিন্তু বাংলা ভাষার ব্যবহার ও মর্যাদা বাড়েনি। বাংলাদেশে নিজের ভাষাকে প্রতিষ্ঠা দানের বদলে আমরা অন্য ভাষার বিরোধিতায় নিজেদের সময় ও শক্তির বেশি অপচয় করেছি। ভাষা আন্দোলনের মূল কথা ছিল, জাতীয় জীবনে মুখের ভাষা ও মাতৃভাষাকে প্রতিষ্ঠা দান। অন্য ভাষার উচ্ছেদ নয়, স্বাধীনতার পর নিজের ভাষাকে ব্যবহারোপযোগী করার আগেই ইংরেজির মতো সমৃদ্ধ ভাষাকে তাড়াতে গিয়ে আমরা উন্নত বহির্জগতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের জানালা বন্ধ করে ফেলি এবং একঘরে হয়ে পড়ি। ফলে তড়িঘড়ি করে আমরা আবার ইংরেজি ভাষাকে ফিরিয়ে আনি।
ততদিনে আন্তর্জাতিক শিক্ষাঙ্গনে, প্রযুক্তির ক্ষেত্রে, ব্যবসা-বাণিজ্যে আমরা ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকা থেকে পিছিয়ে পড়ার পর আবার এমনভাবে ইংরেজিকে আঁকড়ে ধরি যে, বাংলা ভাষা নামেমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে থেকে যায়, শুরু হয় সরকারি কাজকর্মে, বহু ক্ষেত্রে বেসরকারি ব্যবসা-বাণিজ্যেও একটি অনুন্নত ইংরেজি ভাষার ব্যবহার। এ ভাষার সাহায্যে উন্নত বিশ্বে বর্তমানের প্রবল প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যায় না। বাঙালির প্রচুর মেধা ও প্রতিভা থাকা সত্তে¡ও এ ভাষা বিভ্রাটে তারা উন্নত বিশ্বে শিক্ষা অর্জনে, কর্মসংস্থানে গিয়ে এশিয়ার অনেক সম্প্রদায়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না।
বাংলাদেশেও শিক্ষিত বাঙালির মুখে ইংরেজি ও বাংলা মিশ্রিত একটি অদ্ভুত ভাষার উৎপত্তি ঘটেছে। ঠাট্টা করে যার নাম দেয়া হয়েছে বাংরেজি। সাহিত্যে, নাটকে, চলচ্চিত্রে, এমনকি সাংবাদিকতায়ও এ বাংরেজির প্রাধান্য প্রকটভাবে দেখা যায়। ব্রিটিশ আমলে আমরা কলকাতাভিত্তিক একটি স্ট্যান্ডার্ড বাংলা ভাষা ও তার কথন পদ্ধতি গড়ে তুলেছিলাম। তা যে পূর্ববঙ্গের মানুষের কাছে সর্বতোভাবে গ্রহণযোগ্য হয়েছিল, তা নয়। কিন্তু আমরা তা ব্যবহার করেছি। ঈশ্বরচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র থেকে রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী পর্যন্ত অনেকে এ ভাষায় শুদ্ধ ও কথ্য দুই প্রকরণের উন্নয়নেই অবদান রেখেছেন।
সাতচল্লিশ সালে ভারত ভাগ হওয়ার পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ঢাকাভিত্তিক একটি আলাদা স্ট্যান্ডার্ড বাংলা ভাষা তৈরির সজ্ঞান অথবা অজ্ঞান প্রচেষ্টা শুরু হয়। মাঝখানে একদল ‘তমদ্দুনি’ বাঙালি লেখক বাংলা ভাষায় এন্তার উর্দু ফার্সি আরবি শব্দ ঢুকিয়ে বাংলাকে তথাকথিত ইসলামী ভাষা করার চেষ্টা করেছিলেন। তাদের চেষ্টা অথবা অপচেষ্টা সফল হয়নি। তারপর শুরু হয়, আঞ্চলিক কথ্য ভাষার মিশ্রণে ঢাকাভিত্তিক স্ট্যান্ডার্ড বাংলা, এমনকি সাহিত্যের ভাষা তৈরির চেষ্টা। এ ভাষায় পরে বিকৃত, অবিকৃত ইংরেজি শব্দের যোগ শুরু হয়। যা এখন অধিকাংশ নাটক, নভেল এবং শহরবাসী মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্তেরও ভাষা। এটাকে এক সময় নাম দেয়া হয়েছিল বাংরেজি।
এ বাংরেজির দৌরাÍ্য কাটতে না কাটতেই বিশ্বায়নের খোলা দরোজার সুযোগে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ওপর শুরু হয়েছে উত্তর ভারতের হিন্দি ভাষার দৌরাÍ্য। অবাধ ইলেকট্রনিক মিডিয়ার যুগে এ দৌরাÍ্য বাঙালি তরুণ সমাজের শিকড় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। আমি এবার যখন ঢাকায় ছিলাম তখন এক বন্ধু দুঃখ করে বলেছেন, আপনি বাংরেজি ভাষার কথা ভুলে যান, এখন বাংলাদেশে যে ভাষা তৈরি হবে বলে আশংকা হচ্ছে সে ভাষার নাম হবে ‘বান্দি ভাষা’। অর্থাৎ বাংলা ও হিন্দির সহযোগে বান্দি ভাষা।
হয়তো আমার বন্ধুর বক্তব্য একটু অতিরঞ্জিত। কিন্তু একথা সত্য, বিশ্বায়নের দরোজাটা বাংলাদেশে পশ্চিমা সংস্কৃতির (অথবা তার অপসংস্কৃতির অংশ) প্রভাব বাড়ালেও হিন্দি ভাষা কালচারের প্রভাব বিস্তারের তুলনায় অধিক লক্ষ্যযোগ্য। বাংলাদেশে হিন্দি টিভি সিরিয়ালের (ভালো-মন্দ নির্বিশেষে) ব্যাপক প্রচলনে জনজীবনের একেবারে নিচের স্তর পর্যন্ত ভাষায় চলনে, বলনে, কথনে তার ব্যাপক কুপ্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ভাষা দিবস বা বাংলা নববর্ষ দিবস ছাড়া শাড়ি পরিহিতা নারী ঢাকা শহরেও দেখা যায় খুব কম।
আমি ভাষা ও সংস্কৃতির সমন্বয়ে দেয়া-নেয়ায় বিশ্বাস করি। অবশ্যই তার ভালো দিক আছে। কিন্তু কোন ভাষা ও সংস্কৃতি যখন আধিপত্যবাদী রূপ নেয় তখন তা অন্য একটি ভাষা ও ভাষাগোষ্ঠীর স্বাতন্ত্র, স্বাধীনতা ও বিকাশের জন্য বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পাকিস্তান আমলে বাঙালির সংগ্রাম উর্দু ভাষার বিরুদ্ধে ছিল না। ছিল উর্দু ভাষার আধিপত্যবাদী ও ঔপনিবেশিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে। পাকিস্তানের অবাঙালি শাসকরা চেয়েছিল এ ভাষা ও তাদের নিæমানের সংস্কৃতি বাঙালির ওপর চাপিয়ে দিয়ে তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও স্বতন্ত্র অস্তিত্বের বিকাশ সাধন করা। এ চক্রান্তের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তৎকালীন পাকিস্তানের বাঙালিরা জয়ী হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এ বিজয় লাভের পর স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলা ভাষা ও তার হাজার বছরের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি কি আবার হিন্দির আধিপত্যবাদী গ্রাসে অস্তিত্বের সংকটে পড়বে? পশ্চিমবঙ্গে হিন্দির এ গ্রাস অত্যন্ত প্রকট। ইদানীং উর্দুরও। মমতা ব্যানার্জির শাসক তৃণমূল কংগ্রেস ভোটের লোভে কলকাতার উর্দু ভাষী অবাঙালিদের তোল্লা দিতে শুরু করেছে। প্রশাসনে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের হটিয়ে এখন উর্দু ভাষী অবাঙালিদেরই প্রবল প্রতাপ বাড়ছে।
বাংলাদেশ স্বাধীন। এখানে হিন্দির সরাসরি রাজত্ব প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। কিন্তু আধুনিক বিশ্বায়নের সুযোগ নিয়ে তথ্যযুগের নবপ্রযুক্তির বিস্ময়কর বিস্তারের বদৌলতে বাংলাদেশে সবার অলক্ষ্যে কুমিরের পুঁটিমাছ ভক্ষণের মতো হিন্দি ভাষা ও কালচারের বাংলা ভাষা কালচারকে গ্রাসের নিঃশব্দ আয়োজন চলছে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘দেবে আর নেবে মেলাবে মিলিবে যাবে না ফিরে’। কিন্তু বাংলাদেশে আগ্রাসী হিন্দি ভাষা ও কালচারের দেয়া-নেয়ার প্রশ্ন নেই। অর্থাৎ সমন্বয় মিলনের শুভ উদ্যোগ নেই। কেবল তার একতরফা আগ্রাসন বাড়ছে। এটা চলতে থাকলে পাকিস্তান আমলে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি যতটা বিপন্ন হয়েছিল, তার চেয়ে বেশি বিপন্ন হবে স্বাধীন বাংলাদেশে। যদি উত্তর ভারতের রাজ্য অনুগ্রহপুষ্ট হিন্দি ভাষা ও সংস্কৃতির মিত্রবেশী আগ্রাসন আমরা ঠেকাতে না পারি তাহলে দিল্লির অর্থনৈতিক প্রভুত্বের সঙ্গে সাংস্কৃতিক প্রভুত্বের কাছেও আমাদের মাথা নোয়াতে হবে।
এজন্যই আমার মনে হয়, রাষ্ট্রীয় উৎসব ও আনুষ্ঠানিকতার নিগড় ভেঙে বাংলাদেশে আবার একটি ভাষা আন্দোলন প্রয়োজন। এ আন্দোলন উঠতি মধ্যবিত্তের চাকরি-বাকরি বা রাষ্ট্র পরিচালনায় সুযোগ-সুবিধা লাভের আন্দোলন হবে না, হবে প্রকৃত গণআন্দোলন। সব আধিপত্যবাদী ও আগ্রাসনের মুখে গণভাষারূপে সব কৃত্রিমতা বর্জন করে বাংলা ভাষার পুনর্নির্মাণ, তাকে ব্যবহারিক ভাষা করে তোলা এবং আন্তর্জাতিক উন্নত ভাষাগুলোর সমকক্ষ করে তোলার আন্দোলন।
এ আন্দোলন এককালে চসারের নেতৃত্বে ইংল্যান্ডে ইংরেজি ভাষার জন্য হয়েছে। এককালে পারস্যে ফেরদৌসির নেতৃত্বে ফার্সি ভাষার জন্য হয়েছে। এখন বাংলাদেশেও হওয়া প্রয়োজন। অন্য কোন ভাষাকে উচ্ছেদের জন্য নয়, নিজের ভাষার স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠার জন্যই এ আন্দোলন অথবা সংগ্রাম শুরু করা জরুরি দরকার।
(যুগান্তর, ০৪/০২/২০১৩)

3200 জন পড়েছেন

Comments are closed.