বিজয় দিবসের খোঁজে

2461 জন পড়েছেন

বিজয় শব্দ দিয়ে আলোচনা শুরু করা যাক। ‘বিজয়’ শব্দের ব্যবহার কয়েকভাবে হতে পারে। শব্দটি যেমন রূপক অর্থে আসতে পারে, তেমনি বাস্তব অর্থেও। তবে উভয় অর্থেই  বিজয়ের ভাবধারা কোন বস্তুর মোকাবেলায় হয়ে থাকবে: কোন সংগ্রামের, কোন যুদ্ধের বা কোন বিতর্কের। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর যে বিজয় এসেছিল, সেই বিজয় ছিল অন্যায় আক্রমণের মোকাবেলায়। এই অন্যায় পাকিস্তান রাষ্ট্রকে দ্বিখণ্ডিত করে এবং এখান থেকে একটি আলাদা রাষ্ট্র-সত্তা রূপ লাভ করে; এই ভূখণ্ড স্বাধীন হয়।  বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ড ১৯৪৭ সালে পশ্চিম-পাকিস্তানীরা কোন যুদ্ধের মাধ্যমে পরাধীন করে নি এবং তাৎপর্যের দিক থেকে এই ভূখণ্ড (পূর্ব-পাকিস্তান) প্রকৃত অর্থে কখনো পরাধীন ছিল না। বরং ১৯৪৭ সালে উভয় অঞ্চল নিজেদের পারস্পারিক সমঝোতা ও আলোচনার ভিত্তিতে ভারত থেকে আলাদা হয়ে একক দেশ হিসেবে আত্ম-প্রকাশ করে। কিন্তু পর্যায়ক্রমে, বিশেষ করে ১৯৫০ সালে আইয়ুব খানের সেনাপতি নিয়োগের পর থেকে, মিলিটারিজম পাকিস্তান রাষ্ট্রকে করায়ত্ত করে ফেলে এবং রাষ্ট্র-যন্ত্রের সিভিল সার্ভিসের অসাধু শ্রেণীর হাতে জনগণ বন্দী হয়ে পড়ে, যে বন্দী দশা উভয় অঞ্চলের জন্য এক অভিশাপ হয়ে ওঠে। কিন্তু যখন পূর্ব পাকিস্তানের কথা বলছি তখন একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে আর্থ-উন্নতির দিক দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান মাত্র দুই দশকেই অনেক উন্নত হয়েছিল। (দেখুন, পাকিস্তান ও শোষণের বক্তব্য)।

১৯৪৭ এর পরবর্তীতে অর্থাৎ ১৯৫০এর দশক ও ১৯৬০ এর দশকের রাজনীতি ধীরে ধীরে যে রূপ পরিগ্রহ করে এবং এতে যে সব জটিলতা আসে তা এই প্রবন্ধে আলোচনা করার মত নয়। তাই সেগুলো বাদ দিয়ে বলা যাক যে ১৯৭০ এর ডিসেম্বরে যে নির্বাচন হয় সেই নির্বাচনী প্রোপাগান্ডায় পশ্চিম-পাকিস্তানের প্রভাব-প্রতিপত্তির (influence) বক্তব্যকে শোষণের বক্তব্যে তুলে ধরা হয়। তবে ঘটনা যা'ই হোক মুজিবের দল জনমনে স্বতঃস্ফূর্ত আবেদন জাগিয়েছিল এবং আওয়ামী লীগকে বিপুল ভোটে, একচেটিয়াভাবে জয়যুক্ত করেছিল। আওয়ামী লীগ কী করতে পারত বা পারত না, সেই কথা বাদ দিয়ে জনগণকে দলটি কী স্বপ্ন দেখাতে পেরেছিল, সেটাই ছিল বড়। মানুষের মনে অর্থনৈতিক অসম বণ্টনের কৌশলগত জিঞ্জির থেকে মুক্তি লাভের ‘স্বপ্ন’ জাগেছিল। মানুষের ‘স্বপ্ন’ জাগেছিল বর্ধিত অর্থের সমতায়: অর্থনীতিতে, শিক্ষায়, কর্ম-সংস্থানে ও বিচার-ব্যবস্থায়। মানুষ ভেবেছিল এগুলোর বাস্তব প্রতিফলন ঘটবে এবং জাগ্রত আশায়ই ‘বিজয়’ বুঝেছিল। এতটুকু থাক এখানে, আপাতত অন্য আলোচনা করি।

বলেছি, সেদিন শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ বিপুলভাবে নির্বাচনে জয়যুক্ত হয় (সেদিনও আওয়ামী লীগ পেশি শক্তি এবং কারচুপির আশ্রয় নিয়েছিল, অভ্যাসগত কারণে, তবে এটা না করলেও তাদের বিজয় নিরঙ্কুশই হত, এতে সন্দেহ নেই)। কিন্তু পাকিস্তান সরকার এই বিজয়কে মিলিটারিজমের মাধ্যমে ব্যর্থ করে দিতে কূট-কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করে এবং নিজ দেশের জনগণের উপর অতর্কিত হামলা চালায়। তবে এ কথা মনে রাখতে হবে যে শেখ মুজিবের ৬ দফা রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব ও ঐক্যের ক্ষেত্রে অনেক সমস্যা বহুল ছিল, যেমন ৬ দফার এক দফায় ছিল পূর্ব পাকিস্তান আলাদা কারেন্সি বা মুদ্রার প্রচলন করবে অর্থাৎ দুই পাকিস্তানের দুই কারেন্সি তৈরি হবে এবং আরেকটি দফা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের বৈশ্বিক কূটনীতি আলাদা হবে, অর্থাৎ অন্যান্য দেশে পূর্ব পাকিস্তান আলাদা এম্বেসি সৃষ্টি করবে। এদিক থেকে একই দেশের দুই কারেন্সি, দুই কূটনৈতিক সম্পর্ক পলিসি (ধরুন লন্ডনে পূর্ব-পাকিস্তানের এক এম্বেসি এবং পশ্চিম পাকিস্তানের আরেক এম্বেসি) -এসব ক্ষেত্রে অগ্রেই যেন সংঘাতের উদ্দেশ্যে স্থাপিত ছিল। এসবের মধ্যে স্বায়ত্ত শাসনের কতটুকু ছিল তা আজও আলোচনার আগ্রহ বহন করে।  তবে সেদিনের শেষ বেলায় আলোচনা ব্যর্থ হলে এবং সংঘাত সৃষ্টি হলে স্বায়ত্ত-শাসনের কথা বাদ দিয়ে পূর্ণ-স্বাধীনতার বিষয় ওঠে আসে এবং এই ভূখণ্ডকে পাকিস্তান থেকে আলাদা বা ‘স্বাধীন’ ঘোষণা দিয়ে 'স্বাধীনতা-যুদ্ধ' শুরু হয়। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের পর ৩ ডিসেম্বর যুদ্ধের আরেক মোড় ভারত-যুদ্ধে পরিগ্রহ করে। ভারত অ পাকিস্তান যুদ্ধ বাধে। তারপর ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তান বাহিনী ভারতীয় পক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।

এই হচ্ছে ১৬ই ডিসেম্বর, বিজয়ের দিন। এই বিজয় ছিল সেই অন্যায় আক্রমণের  মোকাবেলায় ন্যায়ের বিজয়। হত্যা, ধর্ষণ ও জ্বালাও-পোড়ায়ের অবসান-কল্পের বিজয়। তাই কোনো অবস্থায় এই অমোঘ সত্য ও নীতি-কথাটি ভুললে চলবে না যার মোকাবেলায় বিজয় এসেছিল। অর্থাৎ সেই বিজয় এসেছিল অন্যায়ের অবসানে, ধর্ষণের অবসানে, হত্যার অবসানে, জ্বালাও-পোড়ায়ের অবসানে এবং ‘অসমতার’ অবসানে।

কিন্তু বিজয়ের ৪১ বৎসর পরেও [এই লেখাটি ২০১২ সালের] যদি দেখা যায় যে প্রতিদিন, প্রতি সপ্তাহ, প্রতি মাসে ধর্ষণ চলছে, হত্যা চলছে, যদি দেখা যায় মানুষ নির্যাতিত হচ্ছে, আর এগুলো হচ্ছে বৎসরে হাজারে হাজার, এবং যদি এও দেখা যায় যে এসবের নিঃশেষ-কল্পে কূলকিনারা নাই, তবে বুঝতে হবে বাস্তব ও সঠিক অর্থের বিজয় এখনও আসে নি। ১৯৭১ সালের মাসগুলোতে পাকিস্তানীরা ধর্ষণ করেছিল, হত্যা করেছিল, নির্যাতন করেছিল। কিন্তু বিগত ৪১ বৎসর ধরে সেই কাজগুলো বাঙালীরাই করে যাচ্ছে বাঙ্গালীর উপর। আর এতেই যদি আমরা এই ভেবে তৃপ্তিলাভ করে থাকি যে কাজগুলো তো পাকিস্তানীদের পরিবর্তে বাঙালীরাই করছে, তাহলে বুঝতে হবে আমাদের মনুষ্যত্ব চলে গিয়েছে, আমরা ‘মানুষ’ই থাকি নি, আর এরই প্রেক্ষিতে ‘বিজয়’ নামক কথাটি তার নিজ অর্থ-শুন্য হয়ে ধাপ্পাবাজের অর্থে পর্যবেশিত হয়। আমরা হয়ত এক শ্রেণীর লুটেরাদেরকে বহিষ্কার করে আরেক শ্রেণীর লুটেরা-গুণ্ডাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছি। আর এই দ্বিতীয় শ্রেণী তাদের দল ও মিডিয়া (রেডিও, টিভি, সংবাদ-পত্র) এর মাধ্যমে বৎসরের পর বৎসর আমাদের মগজ ঘোলাই করে যাচ্ছে, আমাদেরকে ‘বিজয়’ ও ‘স্বাধীনতার’ রঙ-তামাশা দেখাচ্ছে, আমাদেরকে সার্কাস দেখিয়ে তারাই ‘বরই’ খাচ্ছে: ব্যাঙ্ক লুটছে, বিমান লুটছে, ভূমি লুটছে, বন-সম্পদ লুটছে, মৎস্য-সম্পদ লুটছে, আর আমরা দল-বদ্ধ হয়ে দলের আবেগে ভাসিয়ে যাচ্ছি। ফলত, আমরা নিজ দলের চোর-ডাকুদেরকে দেখি না, বুঝি না, কেবল অপর দলের চোর-ডাকুদের কথা নিয়ে মগ্ন থাকি। আমাদেরকে তাদের মিডিয়া যে সার্কাস এনে দেয়, আমরা তাতেই মত্ত হয়ে পড়ি। ওরা যেসব সাজ-সজ্জার আয়োজন করে তাতেই জড়িয়ে পড়ি। ওরা সাংস্কৃতির নামে অনুষ্ঠান করে, দাওয়াত দেয়, আমরাও যাই, দাওয়াত খাই, গান শুনি, নৃত্য দেখি। আর যার খাই তার গুণ-গান গাই! প্রত্যেক দলের মিডিয়া ও তাদের নানান কর্মকাণ্ড আমাদেরকে ‘নৃত্য-তরঙ্গে’ আপ্লুত রাখে, আর আমরা দিশেহারা হয়ে মূল কথাগুলো ভুলে যাই, যে কথাগুলোর মোকাবেলায় ‘বিজয়’ এসেছিল!

আজকে যে মা-বোনেরা ধর্ষিতা হচ্ছেন সে দিকে খেয়াল নেই, ওরা বিগত দশকগুলো ব্যাপী ধর্ষিতা হচ্ছেন, সেদিকে খেয়াল নেই, কিন্তু চোর-গুণ্ডার দল কেবল একাত্তরের দিকে আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়ে দিয়েছে। আমাদের হাজার হাজার ভাই-বোন হত্যা হচ্ছে, তাদের সম্পদ লুট হচ্ছে, সেদিকে খেয়াল নেই। ওদের বিচার হচ্ছে না, সেদিকে খেয়াল নেই, আমাদের দৃষ্টি কৌশলে একাত্তরের হত্যাতেই বেঁধে দিয়েছে। এভাবে আপনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে হিসাব করে দেখুন, তখনই দেখতে পাবেন আপনার ‘বিজয়ের’প্রকৃত দশা কী হয়েছে।

এখন আমাদের আলোচনার প্রথম অংশ এখানে শেষ করে দ্বিতীয় অংশে যাচ্ছি। বিজয় বাংলাদেশে যেমন এসেছিল তেমনি অনেক দেশে অনেক জাতিতে এসেছে। সব-কালেই এসেছে এবং আরও আসবে। কিন্তু সব বিজয়ের বড় বিজয় হয় অন্যায়ের মোকাবেলায় ন্যায়ের বিজয়, অসত্যের মোকাবেলায় সত্যের বিজয়। আর এমন এক বিজয় এসেছিল সপ্তম শতাব্দীর মক্কা শহরে, নবী মুহাম্মাদ (সা.) এঁর হাতে। সেদিনের পরাজিত পক্ষ ছিল মক্কাবাসী পৌত্তলিক সম্প্রদায়। এরা ছিল তাঁর জাতির লোক। এরা ছিল তাঁর গোত্রের লোক। তাঁর বংশের লোক। তাঁর দেশের লোক। এরাই তাঁর নব-দীক্ষিতদের উপর হামলা করেছিল। নির্যাতন করেছিল। মারধর করেছিল। চরম নিষ্ঠুরতা দেখিয়েছিল। তাঁকে ও তাঁর গোত্রকে অন্তরীণে পাঠিয়েছিল। তাঁকে এবং তাঁর অনুসারীদেরকে দেশ ছাড়া করেছিল। তারপর তাঁর বিপক্ষে যুদ্ধের পর যুদ্ধ চালিয়েছিল। এতে রক্ত ঝরেছিল, প্রাণহানি হয়েছিল। আর এগুলো হয়েছিল নিজ পরিবারের, নিজ গোত্রের, নিজ জাতির, নিজ দেশের লোকদের মধ্যে। অবশেষে ৬৩০ সালে সেই মক্কার বিজয় মুহাম্মদের (সা.) হাতেই সাধিত হয়। সেদিনের যুদ্ধ-রীতিতে এও ছিল যে পরাজিত পক্ষ শুধু পরাজিতই হবে না বরং তাদের জান-মাল হারাবে, বেঁচে থাকলে স্বাধীনতা হারাবে, অর্থাৎ বিজয়ী পক্ষের দাস-দাসীতে রূপান্তরিত হবে। ওরা চাইলে মেরে ফেলতে পারে, অথবা জীবিত রাখতে পারে অথবা মাফ করে মুক্তিও দিতে পারে। এই রীতিই সেকালের রোমান পারস্যদের মধ্যেও ছিল এবং অন্যত্রও ছিল, দাস-দাসীর পণ্য-বাজার ইসলাম-পূর্ব কাল থেকে এভাবেই প্রসারিত ছিল।

মক্কা বিজয়ের পর পরাজিত পক্ষ থেকে প্রতিশোধ নেয়া যেতে পারত, ওদেরকে দাস-দাসীতে রূপান্তরিত করা যেতে পারত, কিন্তু নবী মুহাম্মদ কোনটিই করেন নি। এটা করলে যুগের পর যুগ সেই জাতিতে যুদ্ধের সূত্র বপন করা হত। কেননা এই যুদ্ধ হয়েছিল একই জাতিতে, একই সমাজের মধ্যে। এতে পরিবার ছিল, গোত্র ছিল, রক্ত ছিল। মুহাম্মদ (সা.) তাই সবাইকে মাফ করে দেন। কেননা প্রতিশোধ কখনো শান্তি আনতে পারে না। শান্তি কেবল উদারতা ও মহত্ত্বই আনতে পারে। এই সোজা কথাটি জাহেলী যুগের পৌত্তলিক সমাজ ও গোত্র বুঝতে পারে নি বা পারলেও তার উপর আমল করতে পারে নি। তাই পৌত্তলিক গোত্রগুলো শত শত বর্ষ ব্যাপী প্রতিশোধ ও পালটা প্রতিশোধের যুদ্ধ করেছে।

মানুষের ইতিহাস ও তাদের মানসিকতার বৈশিষ্ট্য কালের দিগন্ত পাড়ি দিয়ে নানান স্থানে ও নানান দেশে অপরিবর্তনীয়রূপে দেখা যেতে পারে। বাংলার স্বাধীনতাত্তোর জাতিকে কালের সেই প্রতিশোধ-প্রবণতা আটকিয়ে দেয়। মুহাম্মদ (সা.) এর অনুসৃত নীতি অনুসরণ করতে পারলে জাতীয় বিভক্তি ও বিদ্বেষ অনেকাংশে লাঘব হতে পারত, কিন্তু দুইটি বিশেষ শ্রেণী সেই কাজটি হতে দেয় নি। এদের একটি হচ্ছে ইসলাম থেকে চলে যাওয়া একটি চরমপন্থি ইসলাম-বিদ্বেষী নাস্তিক পক্ষ এবং অন্যটি হচ্ছে ইসলাম বিদ্বেষী খাটি পৌত্তলিক পক্ষ। (মনে রাখতে হবে এখানে সব নাস্তিক ও সব পৌত্তলিক উদ্দেশ্য নয়, শুধু তারা যারা ইসলাম-বিদ্বেষী)। এদের সাথে আরেকটি সম্প্রদায়কে টানা যেতে পারে যারা সাংস্কৃতিক ও বিশ্বাসের দিক দিয়ে পৌত্তলিকতা প্রভাবিত। প্রথম ও দ্বিতীয় দল জাতীয় বিভক্তির বক্তব্য (discourse) জিয়ে রেখেছে আর তৃতীয় দল হচ্ছে ওদের অনুগত-শ্রেণী, ওদের কথাই এদের দলীল, সুতরাং এদের কথা বাদ দেয়া যেতে পারে। প্রথম ও দ্বিতীয় দলের কাছে একাত্তর হচ্ছে এক অতি শক্তিশালী কালীন-প্রতীক যেখানে এই বাংলায় মুসলমানরা মুসলমানদের সাথে মারামারি করেছে, যুদ্ধ করেছে। আর এই কালীন স্থানটি এমন যা মুসলমানদেরকে বিভক্ত করে একে অন্যের বিপক্ষে চালানো যেতে পারে, আলেম-ওলামাদেরকে বিষোদ্গার করা যেতে পারে, অশালীন কথা বলা যেতে পারে এবং একাত্তরের আড়ালে থেকেই আবার নিদেজেরকে রক্ষাও করা যেতে পারে। একাত্তর হচ্ছে ওদের একটি হাতিয়ার যাকে পদ্যে, গদ্যে, নাটকে, সিনেমায় ঢুকিয়ে সেই বিভক্তির সংগীত বাজানো যেতে পারে এবং এটাই তারা করে যাচ্ছে। এটা হচ্ছে এক ‘আত্মঘাতী’কৌশল। এখানে আমরা বিজয়ের স্মৃতি বা ইতিহাসের কথা বলছি না, বরং দ্বান্দ্বিক উপাদানের বীজ বপনের কথা বলছি।

বাংলাদেশ হচ্ছে কয়েকটি ভিন্নধর্মী ও সাংঘর্ষিক আদর্শের দেশ। এই সংঘর্ষের ক্ষেত্রগুলো মুক্তিযুদ্ধের আগে, যুদ্ধাবস্থায় এবং আজও রয়েছে। কিন্তু সবাই শান্তিতে থাকতে হলে অন্তত বিদ্বেষ ও প্রতিশোধ-প্রবণতা বর্জন করতে হবে। অন্যভাবে বলতে গেলে সবাইকে জাহেলী যুগের পৌত্তলিক প্রতিশোধ-প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। না হলে, জাহেলী যুগের বিদ্বেষী রেষ শতাব্দী-পরিক্রমায় চলতেই থাকবে। বিভক্তি ও বিদ্বেষের অবসান না হলে হত্যা চলবে, নির্যাতন চলবে, মা-বোনের ইজ্জত-হুরমতের নিরাপত্তা থাকবে না, ওদেরকে ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে নগ্নতায় টানা হবে, ধর্ষণ করা হবে এবং এতে অন্যায়ের মোকাবেলায় কখনো ‘বিজয়’ প্রতিষ্ঠিত হবে না এবং এই না-হওয়াতেই প্রথমোক্ত শ্রেণী ও দ্বিতীয়োক্ত শ্রেণীর দুই দলের স্বার্থই নিহিত দেখা যেতে পারে। বিজয় দিবসে আমাদের সকলের দৃষ্টি সজাগ ও প্রসারিত হোক –এটাই আমার প্রার্থনা।

Facebook Comments

2461 জন পড়েছেন

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতত্ত্ব, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক।

Comments

বিজয় দিবসের খোঁজে — ১২ Comments

    • আহমদ ভাই, সমাজে ন্যায় নীতি প্রতিষ্টা করতে হলে সমাজ ব্যবস্থা সাম্যতা,ও মানুষের আধিকার এবং সামাজিক শৃংখলা নিশ্চিত করা জরুরী। সামষ্টিক ইনসাফ সুনিশ্চিত করতে হবে।যা প্রতিষ্টা করতে একটি রাষ্ট্রকে গুরুত্বপুণ ভুমিকা (vital role)পালন করতে হবে।কারণ রাষ্ট্র মানুষের প্রতিটা ক্ষেত্রে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত করতেছে।
      আজকাল যে যুদ্ধাপরাধ বিচার কে নিরপেক্ষ এই বলে Valid প্রদান কারা যে কথোপকথন শুধু বিচায বিষয়ের structure and format কি রকম হবে সে বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে কিন্তু এর ফলাফল নিয়ে আলোচনা করা হয়নি।কিন্তু একটি ন্যায় ও নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থা অন্যতম নীতি হচ্ছে বিচারক বিচায বিষয় নিয়ে কারো সাথে আলোচনা করতে পারবে না।তাতে করে বিচারকের impartiality বজায় থাকে। এ ধরনের বিচার ব্যবস্থা কে ভ্যালিট প্রদান করা ক্ষেত্রে তাল গাছটি আমার প্রবাদ বাক্য প্রযোজ্য।নয়তো আইন সম্পকে অজ্ঞতা প্রকাশ করে।

  1. ভাই সুন্দর মন্তব্য করেছেন। ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠা না হলে সামাজিক জীবন বিঘ্নিত হয়। এজন্য ইসলামের মূলকথা হয় ন্যায় বা ইনসাফ প্রতিষ্ঠা। এই কথাটি প্রত্যেক জুমার খুতবায় শুনে থাকবেন, ‘ইন্নাল্লাহা ইয়া’মুরুকুম বিল আদলি ওয়াল ইহসান’ অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদেরকে ‘আদল’ (ন্যায় বিচার) ও ইহসান (বিচারের সৌষ্ঠব, সৌন্দর্য এবং যাবতীয় কর্মে শুধু ‘সম্পাদনই’ নয় বরং তার ঊর্ধ্বে ওঠে কর্মকে সুন্দরে রূপায়িত করা) প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। এই স্থানটি হচ্ছে সামাজিক জীবনের ‘প্রাণ’।. সমাজ যদি ন্যায়-নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে, তবে রিকশা চালানো, দারোয়ান হওয়া, চা বিক্রি -এগুলো মন্দ কিছু হবে না। সকল পেশাই জীবন ধারণের জন্য ভাল এবং এগুলো সমতার দৃষ্টিতে দেখা উচিৎ হবে। আমাদের সমাজ পেশাসমূহকে উচু-নীচু করে সামাজিক বৈষম্যের যে রূপ দিয়েছে তা আপনাদেরকে দূর করার জন্য সংগ্রাম করতে হবে।

    অপরাধীর বিচারের বিষয়টিকে গ্রামীণ সুবিচারের নীতিতে দেখা যেতে পারে। আমাদের গ্রামে-গঞ্জে নিজ ঘরে সমস্যা বাধলে যখন নিজ ঘরের বিচার কেউ মানে না তখন আমরা কী করি? আমরা আশে-পাশের মুরব্বি ডাকি। অর্থাৎ বিচারকে ঘরের বাইরে নিয়ে যাই, নিরপেক্ষ লোকের মাধ্যমে সুবিচার প্রত্যাশা করি।

    এই যুদ্ধাপরাধের বিচার নিজ ঘরে হবার মত নয়। এর জন্য হয় অভিযুক্তদেরকে হেইগে পাঠিয়ে দিতে হবে, আর না হয় আন্তর্যাতিক খ্যাতিমান কিছু বিচারককে বাংলাদেশে ডেকে সেই বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। তখন তা সকল পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। মামলাকারী পক্ষ যদি judge, jury and executioner হয়ে পড়েন তবে বিচার দেখতে ‘বিচার’ মানাবে না। আপনার আদালত নিরপেক্ষ হবার কথা থাকলেও, তারা নিরপেক্ষ থাকতে পারেন না। বিচার-কেলেঙ্কারিতে তা প্রমাণিত হয়েছে। এই কথাগুলো আমরা অনেক আগ থেকে বলে আসছি। তাছাড়া আরেকটি পথ ছিল, সে কথা দীর্ঘ, তাই বাদ দিলাম।

    পাঠ ও মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

  2. আহমদ ভাই, এই বাস্তবধর্মী লেখাটির জন্য ধন্যবাদ জানাই। একটি জাতির বিজয়ের বয়স বাড়ার সাথে সাথে ঐ জাতির উন্নতি, অগ্রগতির বিষয়ের দায় ভারও বাড়তে থাকে। কিন্তু সেই দায়িত্ব-সচেতনতার অভাবের বিজয়ের সৈনিকেরা আজ বৃদ্ধ বয়সে রিকশা চালান, ভিক্ষা করেন, পরের বাড়িতে দারোয়ান হোন, চা বিক্রি করেন, নিজের ঘর বাড়িহীন সহায় সম্বলহীনভাবে অসহায় জীবন যাপন করেন। আর স্বাধীনতাকে ব্যবহার করে চলছে লুটপাট, হলমাক, ডেস্টিনি, শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারির মত ঘটনাসমূহ। সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা যে এই স্বাধীন দেশে আজ অস্থিতিশীল রাজনীতির কারণে ছোট শিশুও নিরাপদ নয়। প্রকাশ্যে পিটিয়ে মানুষ হত্যা, অপহরণ, টেন্ডার বাজি, দুনীতি, জমি দখল, এসবের কোনটাই বাদ যাচ্ছে না। এমন কি ক্ষমতার লোভে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে রাজনীতিকরন করতে দ্বিধা বোধ করেনি। এটাই হল আমাদের বিজয়ে ৪১ বছরে অর্জন! আজ আমরা সেই মধ্যযুগেই পড়ে আছি।

    • @ sami23:

      “একটি জাতির বিজয়ের বয়স বাড়ার সাথে সাথে ঐ জাতির উন্নতি, অগ্রগতির বিষয়ের দায় ভারও বাড়তে থাকে।”

      সহমত ১০০% কিন্তু সে দায়িত্ববোধ, ম্যচ্যুরিটি, সহনশীলতা, ধৈর্য্য, ভদ্রতা, আইনের শাসন ও ন্যয় বিচার প্রতিষ্ঠার বিবেক বিচ্যুত হয়ে ফ্যসিষ্ট মানসিকতার একটি হিংশ্র ও বর্বর জাতীতে পরিনত হওয়ার পিছনে কারন কি বলেন তো?

      • মহিউদ্দিন ভাই, সমাজে যখন নৈতিক মূল্যবোধের বিকৃতি ঘটে তখন সে সমাজে স্বার্থপরতা, ঔদ্ধত্য, নিষ্ঠুরতার জন্ম হয়। এসব কারণ হল মানুষের স্বার্থান্ধ-বৃত্তি এবং লোভের ফসল। এছাড়া জাতির জীবনের কোন আদর্শ, দিক নির্দেশনা না থাকার দরুন এসব সমস্যার উদ্ভব ঘটে। কিসের ভিত্তিতে জাতি চলবে কোন আদর্শ অনুসারে চলবে,তার দিক নির্দেশনার অভাব। সমাজে যারা সচেতন, চিন্তাশীল, মানুষেরা নিজেদের অবস্থা, অবস্থানকে পর্যালোচনা না করে দিক নির্দেশনা খুঁজে না বের করেছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত এসব উপাদানগুলো বিদ্যমান থাকবে। কেননা যে জাতি তার আত্ম-সমালোচনা এবং নিজের অবস্থান পর্যালোচনা করতে পারে না, সে জাতির মধ্যে হিংস্রতার ও বর্বরতার পরিমাণ দিনে দিনে বাড়তে থাকে। আরেক কথা বলতে হয়, চেতনার অভাব, চেতনার কারণে অনেক প্রতিক্রিয়ার অভাব লক্ষ্য করা যায়।

  3. কতকগুলো ধ্রুব সত্য কথা (ক্রুএল ফ্যাক্ট) আসিফ সাহেব আজ তুলে ধরেছেন:

    (১) “বিশ্বজিত বশির বা বায়েজিদ হয়ে জন্ম নেয়নি, নিলে নির্ঘাত বিশ্বজিতকে জামায়াত-শিবির বানিয়ে দেওয়া হত”; (২) খুনিদের ঘাবড়ানোর কিছু নেই একদিন যখন আরোও বিশ্বজিত খুন হবে,আরও ভয়াবহ তান্ডব নিয়ে সাংবাদিকরা হাজির হবেন এবং সবার অলক্ষ্যে খুনিরা জামিন পেযে যাবে এবং সর্বশেষ রাষ্ট্রপতির ক্ষমাও পেয়ে যাবে; (৩) খুনিদের আত্মীয় স্বজন কারা কবে মাদ্রাসায় গিয়েছে সেই হিসাব আসছে খোদ প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় থেকে (৪) ছাত্র রাজনীতি শেখায়: হলে ছিট দখল করা, নেত্রী বন্দনা, টেন্ডার-বাজি, চাঁদা-বাজি, লুট, হত্যা এবং আরও অনেক অপকর্ম।”

    অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে লেখক এই সত্য কথাগুলো বলার জন্য তাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি । শুধু ভয় হয় আর একজন অকুতভয় সাংবাদিক মাহমুদুর রহমান তার বিবেকের তাড়নায় স্কাইপের তথ্য ফাঁস করে আবার কাশিমপুর জেলে যাওয়ার পথে । প্রত্যক্ষ উস্কানির জন্য এই হত্যাকান্ডের মূল আসামী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন আলমগীর যেন আইনের ঊর্ধ্বে না থেকে যায় এটাই আমাদের প্রার্থনা ।

  4. পুরো দেশের মানসিকতা, জনমত ও রাজনৈতিক পরিবেশ এখন কলুষিত ও পোলারাইজড হয়ে গিয়েছে। এখানে কোন ভাল কথা, ক্ষমার কথা, জাতীয় ঐক্য এসবের কোন আবেদন আছে বলে মনে হয় না। তবে একজন মুসলিম হিসাবে আমাদের ঈমানী দায়ীত্ব চেষ্টা করা এবং সে হিসাবে আপনার এ লিখাটা প্রশংসার দাবী রাখে যদিও ফ্যসিষ্ট মানসিকতার কাছে এ সব কথা বলা মানে তাদের কাছে অপরাধী হওয়া।

    • একাত্তরের মূল ১৯৫ জন অপরাধীকে যেকোনো কারণেই হোক ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এর পরের শ্রেণীর যেসব অপরাধ রয়েছে, সেগুলোর কোন identified এবং established criminals স্পষ্ট নয়। সুতরাং এখানে কোন এক পক্ষ অপর কোন পক্ষকে অপরধী ভাবার স্থান নেই। বর্তমানে যা হচ্ছে তা হিংসা-বিদ্বেষ ও রাজনীতি। লেখাটি এই অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসার উপর একটি গদ্য কবিতা।

  5. প্রতিটি দেশে, সেটি বাংলাদেশ হোক বা অন্য দেশ, সেখানে কিন্তু ফৌজদারী অপরাধ ঘটে থাকে। তবে সেগুলো এক বর্ণ অন্য বর্ণের মানুষকে বা এক ধর্মী অন্য ধর্মের মানুষকে বা এক জাতি অন্য জাতির সাথে যদি এই রূপ ঘটনা ঘটে তখন তা অন্য রকম হয়ে যায়, আমাদের দেশে ৭১ এ সেইভাবে হয়েছিল এবং তা প্রকাশ্যে হয়েছিল, ব্যাপক ভাবে হয়েছিল। কাজেই ৭১ এর অপরাধের মাত্রা আর এখন দেশে ঘটা ফৌজদারী ঘটনা এক মাত্রার নয়।

    আর রাসুল সাঃ সেই সময় ক্ষমা করলেও সবাইকে কিন্তু ক্ষমা করেন নাই। রাসুল সাঃ এত ছাড় দেবার পরও কিন্তু যারা অপরাধী তাদের দমিত করে রাখলেও তাদের ভিতর বদলাতে পারেন নাই। তাঁর প্রমাণ রাসুল সাঃ উফাতের পর তারা আবার তাদের স্বরূপে আভির্ভুত হয়েছিল। তবে আপনার লেখাটি ভাল হয়েছে। ধন্যবাদ।

    • ঠিক আছে, তবে নবী (স.) যে ৪ জনকে (মতান্তরে ৬ জনকে)শান্তির নির্দেশ দিয়েছেন তাদের analogy একাত্তরে টানলে ওরা হবেন সেই ১৯৫ জন যাদেরকে আপনারা ছেড়ে দিয়েছেন। যাদেরকে আপনারা এখন আটকিয়ে ফাঁসি দিতে চাচ্ছেন বায়াত্তরে/তেহাত্তরে তাদের নাম যুদ্ধাপরাধে নির্ণিত হয়নি। আরা তা হয় নি যখন সব কিছু তরতাজা ছিল। গত ৪ দশকে তাদের বিরুদ্ধে কোন ফৌজদারী মামলাও হয়নি। বর্তমানের বিচার হচ্ছে ঘাদানির নাস্তিকদের এমন একটি খেলা যার মাধ্যমে সিস্টেমেটিকভাবে যারা ইসলাম প্রতিষ্ঠার রাজনীতি করছে তাদের নেতাদের ফাঁসি দেয়া এবং দলটিকে ছত্রভঙ্গ করা। ইকোনোমিস্টের revelation এ যা প্রকাশ পেল তা হল গোটা বিষয়টি একটা ‘সার্কাস’ এবং এটি চালিয়ে নিচ্ছিল ঘাদানির সেই ‘ক্যাঙ্গারো-কোর্টের’ লোকগুলো এবং বামপন্থিদের একটি বিশেষ চক্র। ইকোনোমিস্টের revelation-এ এও রয়েছে যে এদের সম্পর্ক জায়োনিস্টদের সাথে এবং ইসরাঈলী চক্রে। এদের সাথে কট্টর নাস্তিকরাও জড়িত। এই সূত্র ভাল করে দেখুন http://www.bdictunveiled.com/ এতে ব্লগ জগতের অনেকের সূত্র দেখতে পাবেন যাদের ব্লগ আপনারা/আমরা পড়েছি।

      আমার এই প্রবন্ধটি argumentative নয়। এটা একটি গদ্য কবিতার মত। এটা বরং আমার এই কবিতার http://songlapblog.com/3403 বর্ধিত গদ্য ভার্সন।

মন্তব্য দেখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *