আত্মহত্যা ও বিশ্বাস

1634 জন পড়েছেন

কোন মানুষ কেবল তখনই আত্মহত্যা করতে উদ্যোত হতে পারে যখন তার নিরাশা অত্যন্ত চরমে পৌঁছে, যখন আশার কোনো আলো তার হৃদয়ে অনুভূত হয় না, যখন তার অস্তিত্ব ও সত্তার কোন মূল্যবোধ অবশিষ্ট রয়েছে বলে অনুভূত হয়না, অর্থাৎ যেসব ‘মূল্যের’ ভিত্তিতে সে এতদিন অস্তিত্বে ছিল এবং যেসব ‘মূল্যের-বোধের’সাথে তার সত্তার পরিচিতি ছিল, সেই মূল্য-নির্ধারিত ‘পরিচিতি’এখন নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে, এখন তার বেঁচে থাকার কোন মানি নেই।

এই ছোট্ট প্রবন্ধটিতে ব্যক্তির প্রকৃতিজাত-স্পৃহা ও সামাজিক মূল্যবোধের মধ্যে যে পার্থক্য থাকে, সেই পার্থক্য ও আল্লাহতে বিশ্বাসের অভাবে মানুষ কেন আত্মহত্যার কিনারায় উপনীত হতে পারে -তা আলোচনা করব। প্রথমেই বলে রাখি ‘আশা’ হচ্ছে ঈমানের এক প্রধান অংশ (আল্লাহর অনুগ্রহের আশা, তাঁর উদ্ধারের আশা)।. আল্লাহ বলেন, ‘হে আমার বান্দাগণ যারা নিজেদের উপর যুলুম করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ (৩৯:৫৩)।. আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না।’ (৪:২৯) কেউ যখন আত্মহত্যা করে তখন সে ঈমানের পরিধীর বাইরে গিয়েই করে, অর্থাৎ সে ঈমানশুন্য হয়ে পড়ে। আত্মহত্যাকারী এক ব্যক্তির জানাযা নবী (সা.) পড়েন নি। এতেই ঈমানের সাথে বিষয়টির সম্পর্ক স্পষ্ট হয়। তবে জানাযা করার ফতোয়াও আছে।

বিশ্বাস  হচ্ছে মানুষকে হতাশা ও নিরাশা থেকে বাঁচানোর এক অতি মূল্যবান উপাদান। মানুষ সামাজিক জীব এবং সমাজবদ্ধ জীবনে তার কিছু পরিচিতি আসে। সমাজ কিছু মূল্যবোধের উপর গঠিত হয় এবং প্রত্যেক ব্যক্তি শৈশব থেকে সেই মূল্যবোধে প্রবেশ করতে থাকে। ভাষাই এর প্রধান মাধ্যম হয়। এই মাধ্যমে সম্ভবত আড়াই থেকে সাড়ে তিন বৎসর বয়সেই তার ‘আমিত্ব’ (I-ness), অর্থাৎ তার নিজ আলাদা-সত্তা অনুভব করতে শুরু করে: সে নিজ নামে অন্যদের থেকে আলাদা –এই সমঝ পেতে থাকে। কিন্তু এই আমিত্বটাও বহুলাংশে সামাজিক (সেটা দীর্ঘ আলোচনা বিধায় আপাতত এক পাশে রাখা যাক)।. সামাজিক সিস্টেমে পর্যায়ক্রমিকভাবে প্রবেশের সাথে সাথে সে সামাজিক মূল্যবোধকে আত্মস্থ করে।

বয়সের সাথে সাথে ব্যক্তির অস্তিত্বের অনুভূতি ও তার সামাজিক মূল্যবোধের অনুভূতি ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। এই মূল্যবোধেই তার নৈতিক-জীবন গড়ে, এর মধ্যে নিহিত আদর্শ তার আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে এবং এরই সাথে নিজের আত্মপলব্ধির সচেতনতা অনুভব করে; তার পরিচিত ব্যক্তিবর্গ তাকে তার সাথে সংশ্লিষ্ট বিশ্বাস ও কর্মের আদর্শেই চিনে। সমাজের সাথে সম্পর্কিত তার এই পরিচিতি তার সত্তাগত হয়। কিন্তু তার বায়োলজিক্যাল প্রকৃতি এবং সমাজে-সৃষ্ট-পরিচিতি (নৈতিকতা, মূল্যবোধ ইত্যাদি) এমনভাবে জড়িত নয় যেভাবে বীজের সাথে বীজের সত্ত্বার সম্পর্ক। ভাল মন্দের ব্যাপার হচ্ছে মূলত আপেক্ষিক। মানুষকে সমাজ জীবনে শৃঙ্খলে আনতে এবং ব্যক্তি ও সমাজের নিরাপত্তা বিধানে আল্লাহ মানুষকে নৈতিকতার এহসাস দান করেছেন: ভাল কাজ করতে এবং মন্দ থেকে দূরে থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। এটাই ভাল মন্দের রূপরেখা হয়েছে। আল্লাহর আদেশ নিষেধের আলোকে মানুষ ভাল-মন্দের বিষয়টিকে আরও প্রশস্ত করেছে। ভাল-মন্দের পিছনে বৈক্তিক ও সামাজিক ন্যায়-পরায়ণতা, সামাজিক সুশৃঙ্খলতা ও নিরাপত্তার বিষয় এসেছে। এসব জিনিসের কিছু বস্তু আপেক্ষিক এবং কিছু বস্তু চিরন্তন। চিরন্তন শুধু সেই অর্থে যে অর্থে আমাদের মানবতা জাগতিক অস্তিত্বে জড়িত। কিন্তু এখানে যে কথাটি বলা হচ্ছে তার  নির্যাস হল, ব্যক্তি যে আদর্শ ও মূল্যবোধের সত্ত্বায় নিজের সত্তা উপলব্ধি করে, সেই উপলব্ধি ও পরিচিতি তার বায়োলজিক্যাল ‘প্রকৃতি’ থেকে ভিন্ন। সে একটি সুন্দরী, গুণবতী মেয়ের সাথে হয়ত সম্পর্কিত হয়েছে, তার মন-প্রাণ এখন ঐ মেয়েটাকে পেতে চায়। বায়োলজিক্যালি তার প্রকৃতিতে এমন বস্তু রয়েছে যা তাকে ঐ মেয়েটির সাথে মিলিত হতে স্পৃহা জন্মাতে পারে, তার দেহ-প্রকৃতির প্রজননগত স্পৃহা তাকে সেদিকে নিতে পারে। কিন্তু তার পরিচিতি, বৈক্তিক-সামাজিক অবস্থান এবং ঐ মেয়েটির নিজ পরিচিত ও তার বৈক্তিক-সামাজিক অবস্থান তার ‘প্রকৃতিজাত-স্পৃহার’ অন্তরায় হবে। এভাবে তার মন অনেক জিনিস চাইতে পারে, যেগুলো ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিতে মন্দ এবং যেগুলো তার ‘পরিচিতির’ প্রতিকূলে। মানুষ এখানেই আটকা পড়ে। এখানেই মানবের জাতিগত (as a species)  সমস্যা। চুরি, বদমাশি, রাহাজানি, ডাকাতি: বড় পাপ, ছোট পাপ, গোপন পাপ, প্রকাশ্য পাপ ইত্যাদি।

মনে রাখতে হবে যে যে সত্তাগত-পরিচয়ে সে পরিচিত, এর মূল গভীরে রয়েছে কিছু ধারণা, কিছু বিশ্বাস, অর্থাৎ সে ঐ মেয়েটির সাথে গোপনে মিলিত না হলে, অথবা ব্যাঙ্কের টাকাটা না মারলে, তার পরিচিতি অবিকল থাকবে, এবং এই কাজগুলো না-করাতেই সেই সমাজে ও বিশ্বাসে ধারিত ‘ভাল’বস্তুটি নিহিত। আর এই ধারিত নৈতিকতায় তার সত্তার এহসাস জড়িত হয়ে, তার নিজ পরিচিতি প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু প্রবৃত্তির কাছে ঐ মেয়েটির সাথে শয়ন করা এবং টাকাটা লুট করার পক্ষে হয়ত প্রবণতার অধিক ঝোঁক, এটাই সেই প্রবৃত্তির মোকাবেলায় কাঙ্খিত, ‘ভাল’, যদি কেউ দেখতে না পায়, অর্থাৎ যদি সেটা ‘সামাজিক’ না হয়ে পড়ে!

এখানে তার ‘প্রকৃতিগত’ ও ‘সমাজগত’ অনুভূতির সংঘাত রয়েছে -যা বাস্তব এবং চিরন্তন। আর এর মধ্যে আরেকটি বস্তু জড়িত আছে। প্রথমত সে এক ‘দুর্বল’ সত্তা (‘মানুষকে দুর্বল অবস্থায় সৃষ্টি করা হয়েছে’, ৪:২৮) মানসিকভাবে তার চৈতন্য বা সজ্ঞা সব সময় একই অবস্থানে থাকে না। সকালে, বিকালে, দুপুরে, রাতে তার চিন্তা-চেতনা বিভিন্ন স্থানে বিচরণ করে। আবার তার শরীর ও চিন্তার যন্ত্র, মগজ, নরম বস্তু। তার শরীর ও মনে সবলতা, দুর্বলতা আসে যায়। সে সর্বদা একই চেতনায় নেই। তাই তার ঘটনা এমন হতে পারে, সে তার দুর্বল মুহূর্তে এমন-সব কাজ করতে পারে যা তার ব্যক্তি ও সামাজিক পরিচিতির সাথে সাংঘর্ষিক। এটা নানানভাবে ঘটতে পারে: জেনে-শোনে, বেখেয়াল-বশত, প্রবৃত্তির তাড়নায় ইত্যাদিতে।

সে যদি এমন কিছু নেতিবাচক কাজে জড়িয়ে পড়ে (যা অতি স্বাভাবিক) যা তার পরিচিতির সাথে সাংঘর্ষিক এবং সেই কাজ যদি তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলে এবং যদি সেই বিজড়ন ব্যাপক জটিলতার সৃষ্টি করে, তবে সে এক সময় নিজেকে উদ্ভূত পরিস্থিতির মোকাবেলায় ‘বন্দি’ দশায় দেখতে পাবে।

সে  জানে তার কাজ সমাজে প্রকাশ পেলে তার ‘পরিচিতি’ নিঃশেষ হবে। তখন তার চোখ যেদিকে যাবে সেদিকে হয়ত মুক্তির দরজা বন্ধ দেখতে পাবে। এখানে হয়ত কিছুকাল বিমর্ষ (depressed) থাকবে, তারপর কোনো এক চরম মূহুর্তে ‘আত্মহত্যা’ বিবেচনা করবে। এই পর্যায় হচ্ছে চরম ‘নিরাশার’পর্যায়। অর্থাৎ তার সামনে আশার কোন আলো নেই। সে যে সত্তা ছিল তা বিলীন হয়ে গিয়েছে, তাই মৃত্যুই তার কষ্ট থেকে নিবৃত্তির একমাত্র পথ। আত্মহত্যার মুহূর্তে মানুষ ঈমান-শূন্য থাকে।

ঈমানকে বুঝার অনেক স্থান রয়েছে এবং আত্মহত্যার স্থানটি হচ্ছে সেটি বুঝার এক সুস্পষ্ট স্থান। এখানে বিশ্বাসের আঙ্গিনায় জীবন-মৃত্যুর কোলাহল অতি নিকট থেকে দেখা যায় এবং ইতিবাচক বিশ্বাস ও নেতিবাচক বিশ্বাসকে তাদের উন্মূক্তরূপে দেখা যায়। এখানে বাস্তবতা চিত্রায়িত হয়।

বলেছি, আল্লাহতে বিশ্বাস যে কয়টি স্তম্ভে ধারিত দেখা যায় তার মধ্যে আশা অন্যতম। আল্লাহ উপর আশা রাখা, ভরসা করা, তার উপর চরম মুহূর্তেও আস্তায় ঠিকে থাকাই হচ্ছে ঈমান। আগুনে ঢুকে (মুসা [আ.]) ঈমানদার, পুত্রের গলায় ছুরিকা চালিয়েও (পিতা-পুত্র, ইব্রাহীম-ইসমাঈল [আ].) ঈমানদার। এভাবে, বড় বড় নবীদের এবং অনেক ঈমানদের জীবন কাহিনী ঈমানের দিগন্ত বুঝার প্রেক্ষিত বহণ করে। সব সময় এবং বিশেষ করে চরম মুহুর্ত্তে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করতে মু’মীনরা দোয়া করে যায়। এই মুহুর্ত্তে প্রয়াত কবি মতিউর রহমান মল্লিকের একটি ইসলামী গজলের প্রথম দুটি লাইন মনে পড়ছে:

আমাকে দাও সে ঈমান আল্লাহ মেহেরবান

যে ঈমান ফাঁসীর মঞ্চে ও সংকটে গায় জীবনে গান

আমাকে দাও সে ঈমান আল্লাহ মেহেরবান।।

বিশ্বাসের স্থান মানব প্রকৃতির মূল সমঝ থেকে এসেছে। বিশ্বাসের বই-পুস্তক যেহেতু সাধারণত দার্শনিক ভাষায়  ব্যক্ত হয়ে আসে না, (এবং বিশ্বাসের দিক থেকে এর একটা কারণও রয়েছে –সে আলোচনা ভিন্ন) তাই আমরা মানব প্রকৃতির আলোচনা সেই নিরিখে পাই না, পাই ধর্মীয় ভাষায়, আধ্যাত্মিকতার নিরিখে।

আল্লাহ মানুষকে বিশ্বাসের দিকে আহবানের সাথে সাথে তার সৃষ্টির মূলকথা বলেছেন -আদম সৃষ্টির কাহিনী বলেছেন।  আদম সৃষ্টির কাহিনীকে এমনভাবে ব্যাখ্যা-বর্ণনায় এনেছেন যাতে তার বিশ্বাস ও ধর্ম-জ্ঞান সমৃদ্ধ হয়, বায়োলজি বা অন্য কোনো বিজ্ঞান শিখানোর আকারে নয়। এই কাহিনী-বর্ণনাতে এসেছে আদমের ‘জ্ঞান’ ও তাঁর বিপুল জ্ঞান-সত্ত্বেও তাঁর দুর্বলতা (‘আমি ইতিপূর্বে আদমকে নির্দেশ দিয়েছিলাম। অতঃপর সে ভুলে গিয়েছিল এবং আমি তার মধ্যে দৃঢ়তা পাইনি।’ ২০:১১৫), তাঁর স্মৃতি বিস্মৃতি। তাঁকে যা না-করা উচিৎ ছিল তিনি তা করে ফেলার কাহিনী। তাঁর প্রকৃতির দুর্বলতা ও সবলতার কাহিনী। তাঁকে যখন বলা হল, তোমাকে যা না-করার নির্দেশ ছিল, তুমি তুমি করে ফেলেছো। তখন তিনি বিব্রত হয়ে পড়েন। তাঁর মনের শান্তি চলে যায়, তিনি অশান্ত, বিচলিত হয়ে ওঠেন, মনের জ্বালায় বিদগ্ধ হতে থাকেন। তাঁর ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া বাস্তবায়িত হয়ে পড়ে। কিন্তু এখন তিনি কী করবেন, তার যে দুর্বল তা সেই দূর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। আল্লাহ তাঁকে প্রথম জ্ঞানের পর এবারে দ্বিতীয় জ্ঞান দেন। তাঁর অশান্তি লাঘবের জন্য আল্লাহ তাঁকে প্রত্যাবর্তনের (তওবার) পথ নির্দেশ করেন। এখানে ভুলের প্রতিক্রিয়ায় পড়ে থাকলে হবে না, ভুল হয়েছে হোক, ভুলটাও প্রকৃতিজাত। আমি মানা করেছিলাম, তুমি ভুল করেছো, এখন আমার দিকে প্রত্যাবর্তন কর, আবার ভুল হোক, আমার ফিরে এসো, আবার ভুল হোক আবার ফিরে এসো, তারপর আবার –কিন্তু কখনো নিরাশ হয়ো না (কোরান)।. নিরাশ তো কেবল শয়তানই হয়। শয়তান শব্দের আরেকটি অর্থ হচ্ছে যে চরমভাবে নিরাশ হয়ে গিয়েছে। একমাত্র পথভ্রষ্টরাই আল্লাহর রহমাত থেকে নিরাশ হতে পারে। (১৫:৫৬) আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহর রহমত থেকে কাফের সম্প্রদায় ব্যতীত অন্য কেউ নিরাশ হয় না।’ (১২:৮৭)

আদম থেকে এবং আদমের কাহিনী থেকে আমাদের বিশ্বাসের শুরু। এই কাহিনীতে আমাদের ধর্মের সার-নির্যাস এসেছে। দর্শনে আমরা আজ পর্যন্ত যত বিদ্যা অর্জন করি তা যেভাবে প্রাচীন গ্রিক-দর্শনের, বিশেষ করে প্ল্যাটো/এরিস্টেটলিয়ান দর্শনের, অসংখ্য ফুট-নোট হিসেবে বিবেচনা করতে পারি, তেমনি সকল নবীর কাহিনী ও শিক্ষা আদমের কাহিনীর ফুট-নোটস হিসেবে দেখা যেতে পারে, যদিও অনেক পার্থক্যের স্থান রয়েছে।

আমরা আবার আগের স্থানে ফিরি। বিশ্বাসের সাথে আমরা নিজেদের সত্তার যে পরিচিতি ঘটাই তা সর্বদাই ‘জীবন’ দান করে, সর্বদাই আলো দিয়ে যায়, সর্বদাই ‘নিরাশা’ থেকে মুক্তির পথ দেখায়, প্রত্যহ প্রকৃতি-তাড়িত ভুল থেকে শুদ্ধের ধারণায় নিয়ে আসে। নামাজে যাওয়া বা নামাজ পড়াতে প্রত্যাবর্তন (তওবা) বুঝায়; এখানে এই অর্থ নিহিত: আদম তুমি ফিরে এসেছো, আবার এসো। তোমার প্রকৃতিতে ভাল-মন্দের রূপরেখা টানা হয়েছে, তুমি ভুলের ঊর্ধ্বে থাকতে পারবে না, তোমার আদর্শ ও বিশ্বাসের স্থানে তুমি সর্বদা ‘পাথরের-মত’ শক্ত হয়ে থাকতে পারবে না, তোমার মস্তিষ্ক-যন্ত্র পাথরের  মত (অপরিবর্তীত) নয়। তুমি দুর্বল, তোমার চৈতন্য (সজ্ঞা) দিনে দুপুরে ভিন্ন ভিন্ন মানসিক স্থানে বিচরণ করে, তুমি ভুল করবে কিন্তু শয়তানের মত জেদি হয়ে ওঠবে না। আর প্রত্যেক প্রত্যাবর্তনে (নামাজে, রোজায়, হজ্জে যাকাতে, জিকির আযকারে) বিনয়ী হবে, কেবল আমারই দিকে নিরঙ্কুশভাবে নিবেদিত হবে। অর্থাৎ গাদ্দারি থাকবে না: আমি ব্যাঙ্কের টাকাটা এখন মেরে নেব এবং পরে হজ্জ করে রেহাই পেয়ে যাব, উদ্দেশ্য প্রণোদিত এমন কাজ প্রত্যাবর্তন নয়, এটা শয়তানি। আদমের ঘটনা এমন ছিল না।

আদমের বিবরণে মানবিক যে বৈশিষ্ট্যের সন্ধান পাওয়া যায় সেখানে তাঁর ভুল, তাঁর সংশোধন, তাঁর বিনয়, তাঁর বিশ্বাস ও আনুগত্য রয়েছে –এগুলো ধর্মের যে এহসাস প্রতিষ্ঠা করে সেটাই হচ্ছে আমাদের ধর্ম। আল্লাহ রাসূল (সা.) বলেন, দ্বীন হচ্ছে ‘নাসিহাহ’, অর্থাৎ ধর্ম হচ্ছে বিশুদ্ধ ইচ্ছা, বিনয়, sincerity। এই দ্বীনেই ব্যক্তির মানসিক সুস্থতা, তার নিরাশার মুক্তি, খোদা-নির্ভরশীলতা ও তার আশাবাদ নিহিত। কেবল সেই সমাজই শান্তির সমাজ হতে পারে যে সমাজের ব্যক্তিগুলোর মন সুস্থ, যারা বাবা আদম ও মা হাওয়ার বিনয় ও প্রত্যয়ে নিজেদের জীবন গড়েন -যারা শয়তানের উদ্ধত পথে নয়। মানব জাতির মুক্তি তাই বিশ্বাসে।

 

পরিশিষ্ট:

_______________

এখানে আলাদা আরেকটি বিষয় সংযোগ করতে যাচ্ছি। একটি ধর্মীয় সমাজে অনেক ব্যক্তি ও তাদের পরিবার মূলত সেই ধর্মের সাথে সমন্বিত নাও থাকতে পারেন। কিন্তু সেখানে ধর্মের ‘ছায়াই’ কেবল বাস্তবতা হতে পারে। মুসলিম সমাজের অবস্থা এই দাঁড়িয়েছে যে অনেক মুসলিম দেশের বড় এক অংশ হয়ত নামাজ পড়ে না, অনেকে রোজা রাখে না, হজ্জ করে না, কেউ কেউ মদ খায়, সূদের ব্যবসায় করে। এদের অনেকের জীবনে ধর্ম-কর্মের নাম নিশানাও নাই। এমন মুসলিম সমাজে ইসলাম ধর্মের মূল্যবোধের উপর জরিপ চালিয়ে যে তথ্য পাওয়া তেতে পারে তাতে যে সলামী মূল্যবোধের প্রকৃত ফলন অনেকাংশে নাও থাকতে পারে –এই প্রশ্ন না তুললেও চলবে। সমাজের এমন ধর্মীয় অবস্থা যে কেহই চোখ খুললে দেখতে পাবেন। কিন্তু এই দুর্বল পর্যায়ের জনগোষ্ঠীতে অর্থাৎ নামাজ-রোজাহীন এবং যারা ইসলামী জীবন পদ্ধতি থেকে অনেক দূরে -এমন লোকদের উপরও আত্মহত্যা বিষয়ক চালানো জরিপে অপরাপর অনেক সমাজের তুলনায় তাদের অবস্থান অনেক উন্নত লক্ষ্য করা যায়।

কামাল ও লওয়েন্থাল (রয়্যাল হলোওয়ে ইউনিভারসিটি অফ লন্ডন) কিছু মুসলিম ও হিন্দু যুবক-যুবতীদের মধ্যে একটি জরিপ চালিয়ে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে মুসলিমদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা হিন্দুদের চেয়ে কম। তাদের স্টাডিতে ইনিচেনের (Ineichen, 1998) জরিপ-সিদ্ধান্তের উদ্ধৃতি আনেন এবং উল্লেখ করেন যে হিন্দুদের তুলনায় মুসলমানরা নৈতিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে বেঁচে থাকতে অধিক যুক্তি দেখেন। তারা এক্ষেত্রে আত্মহত্যার প্রতি ইসলামের নিষেধাজ্ঞার প্রতিফলন দেখেন। তারা হাসানের (Hassan, 1983) এর স্টাডি থেকে উল্লেখ করেন যে মুসলমানদের তুলনায় হিন্দুদের পুনর্জন্মবাদের ঐতিহ্য আত্মহত্যার ক্ষেত্রে কম নিবৃত্তিকর। অপর দিকে মুসলিম বিশ্বাসে আত্মহত্যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

তাছাড়া হিন্দুদের ধর্মীয় গ্রন্থাদি মুসলমানদের মত একক নয় (যেমন কোরান)।. তাদের স্টাডিতে উল্লেখ করা হয় যে প্রাথমিক বেদিক-যুগে আত্মহত্যার অনুমোদন ছিল, যা পরবর্তী উপনিষদগুলোতে নিষিদ্ধ করা হয় এবং আত্মহত্যায় মৃত ব্যক্তির পরকালীন নাজাত লাভ অস্বীকার করা হয় (Ladha et al, 1996)।

Reference

Kamal, Z and Loewenthal, K.M. (No Date). Suicide Beliefs and Behaviour among Young Muslims and Hindus in the UK. Available: http://digirep.rhul.ac.uk/items/8f0def71-8625-dffa-6164-020f85f5df5a/3/. Last accessed 20 Oct 2012.

1634 জন পড়েছেন

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতাত্ত্বিক, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক।

Comments are closed.