মুক্তমনা ও নাস্তিক মিলিট্যান্সি

2512 জন পড়েছেন

আমাদের সমাজে কিছু কিছু লোক নিজেদেরকে ‘মুক্তমনা’ ভাবেন। তাদের দাবি হচ্ছে তারা নাকি মুক্ত চিন্তক, যুক্তিবাদী। তারা ট্র্যাডিশন বা প্রাচীন-প্রাতিষ্ঠানিকতা মুক্ত অথবা এগুলো থেকে মুক্ত হতে কাজ করছেন এবং মানুষকে মুক্ত করতেও চাচ্ছেন।

এখানে ‘মুক্তমনা’ হওয়ার যে দাবি বা বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হচ্ছে আমরা প্রথমে সেটা বুঝার চেষ্টা করব। প্রথমে ‘মুক্ত’ শব্দটি বিবেচনা করি। সরল সহজভাবে বলতে গেলে আমাদের ভাষার সকল শব্দ তাদের বিপরীত ধারণার মোকাবেলায় অর্থলাভ করে। ঠাণ্ডা গরমের মোকাবেলায়, শক্তি দুর্বলের মোকাবেলায়, সত্য মিথ্যার মোকাবেলায় ইত্যাদি। আমরা যখন বলি ‘মুক্ত আকাশের পাখি’, তখন ‘মুক্ত’ কোন জিনিস তা সহজে বুঝতে পারি। আমরা যখন বলি পাখিটি খাঁচায় বন্দি, অথবা লোকটি এখন রাজার বন্দিশালায় আবদ্ধ, তখন আবদ্ধ, বন্ধন আর মুক্ত অবস্থার কথা বুঝি। উদাহরণের পাখিটি নিজ স্বাধীন ইচ্ছায় বা ‘নিজ ইচ্ছায়’ খাঁচায় গিয়ে আবদ্ধ হয়নি আর বন্দিশালার লোকটিও ‘নিজ ইচ্ছায়’ বন্দিদশা গ্রহণ করে নি। এখানে সতত ইচ্ছার স্বাধীনতা ও অধীনতা প্রকাশ পায়। আমরা যদি বন্দিশালার লোকটির ব্যাপারে বলি, সে এখন ‘মুক্ত’, তখন বুঝি যে এখন তার স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছে। সে এখন যথেচ্ছা বিচরণ করতে পারে। তার ইচ্ছার স্বাধীনতা এসেছে। যে যেখানে সেখানে যেতে পারে। অর্থাৎ এখন সে স্বাধীন, সর্বাবস্থায় মুক্ত।

কিন্তু যে ব্যক্তি কোন বন্দিশালায় আবদ্ধ ছিল না, এবং এখনও নয়, সে যদি বলে যে ‘আমি এখন মুক্ত’ তাহলে বুঝতে হবে শব্দের রূপকতা (metaphoricity) ব্যবহার করা হচ্ছে। এই ধরণের রূপক ব্যবহার অনেকভাবে করা যেতে পারে। এক ব্যক্তি বন্দিশালার ভিতরে থেকেও বলতে পারে, ‘আমি মুক্ত আকাশের পাখি’।. এখানে শ্লেষাত্মক অথবা ব্যঙ্গাত্মক অর্থও আসতে পারে। এমন ব্যবহার সব ভাষাতে আছে। আমি গরিব লোক হয়েও বলতে পারি, ‘প্রাচুর্যের মধ্যে ডুবে আছি।’ আপনি ‘বদ্ধমনা’ হয়েও বলতে পারেন মুক্তমনা, মুক্ত-চিন্তক। কেননা আপনি নিজের জন্য যখন শব্দ নির্বাচন করতে পারেন –তখন কোন শব্দটি নির্বাচন করবেন তা একান্ত আপনার ইখতিয়ারে। আপনার কানা ছেলেকেও নাম দিতে পারেন ‘পদ্মলোচন’।. এতে কারো বলার কিছু নেই।

মনে রাখতে হবে যে কোনো শব্দের অর্থ তার শব্দের ‘ভিতরেই’ নিহিত নয়, বরং অর্থ হচ্ছে সামাজিক প্রথা ভিত্তিক, সামাজিক convention এর অংশ, (আমরা সবাই সমাজে প্রতিষ্ঠিত ভাষিক প্রথার ‘ভিতরেই’ থাকি আমাদের অর্থ-বিনিময়, [communication], এই প্রথার বাইরে নয়),  আবার ‘অর্থ’ কোনো একটি শব্দ কেন্দ্রিক নয়, বরং অর্থের-সংযুক্তিতে জড়িত অন্যান্য শব্দের জিঞ্জিরে (chaining with other words), গোটা ভাষা ব্যবস্থার (system of language) মধ্যে পরিব্যাপ্ত। ‘মুক্তমনা’ যদি স্বাধীন চিন্তা ও স্বাধীন প্রত্যয় কেন্দ্রিক হয় এবং এরই প্রেক্ষিতে যদি এক ব্যক্তি বলে, ‘আমি খোদাতে বিশ্বাস করি না’ এবং অন্য ব্যক্তি যদি তার আপন স্বাধীন চিন্তা-চেতনা ও বিবেক অনুযায়ী বলে, ‘আমি খোদাতে বিশ্বাস করি’, তবে উভয়ই মুক্তমনা হওয়া উচিত। কিন্তু প্রথম ব্যক্তি যখন বলবে, ‘না, খোদাকে অস্বীকার না করলে মুক্তমনা হওয়া যাবে না’, তখন বুঝতে হবে সেই লোকটির কোন ‘মতলব’ আছে, সে কুযুক্তি উত্থাপন করছে। তারপর যখন সে জেদি হয়ে ওঠবে এবং তার শেষ কথা হবে, আপনি ‘খোদাকে অস্বীকার করলেই’ মুক্তমনা হবেন, তখন বুঝতে হবে, এই ‘মুক্তমনা’ শব্দটি নিয়ে এখন ‘ধাপ্পাবাজি’ শুরু হয়েছে, ভাষার রাজনীতি শুরু হয়েছে। ধাপ্পাবাজ কোন নির্দিষ্ট কারণে নিজের জন্য ‘মুক্তমনা’ শব্দটি ব্যবহার করছে। সে তার আপন দাবীর বিপক্ষে স্ববিরোধী (inconsistent) হয়ে ভাব ও শব্দের এমন ব্যবহার করছে, কেননা it cannot be empirically proven that there is no God অর্থাৎ কোন বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে খোদা-নাই বলে প্রমাণ করা যাবে না।

তারপর মুক্তমনা হতে হলে পূর্ববর্তী সমাজ সভ্যতা, আচরণ, বিশ্বাস সব কিছুতেই ‘সন্দেহবাদী’ হতে হবে, প্রথাগত বিষয় (tradition) বোঝে না আসলে, বর্জনের জন্য আহবান জানাতে হবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত বর্জিত না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আক্রমণাত্মক হতেই হবে। এই বৈশিষ্ট্য অর্জিত না হলে ‘মুক্তমনা’ হওয়া যাবেনা, তখনই বুঝতে হবে ঐ ব্যক্তি মোটেই মুক্তমনা নয়, সে ‘বক্রমনা’।. সন্দেহবাদী হতে হলে মুক্তমনাকে তার নিজ ঘর থেকেও শুরু করতে হবে। সে তার নিজ মা-বাপের সন্তান কিনা এটাও সন্দেহে আনতে হবে, ব্যক্তির identity-এর মূল স্থান এখানে। তার মা যে কোন পুরুষের সাথে গোপনে মিলিত হয়ে তাকে গর্ভে ধারণ করে থাকতে পারেন। তাকে প্রথমে DNA টেস্ট দিয়ে শুরু করতে হবে। তারপর তার পরিবারের সবার, তার মা-বাপ সহ। পরিবারের সয়-সম্পত্তি দেখতে হবে। তার পিতা-প্রপিতা ঘোষ, চুরি/চামারি বা ধাপ্পাবাজির (প্রতারণার) মাধ্যমে সেটা অর্জন করলো কিনা তা দেখতে হবে। সম্ভাব্য অসত্যের কাছে আত্মসমর্থন করলে সে তার নিজের সাথেই প্রতারণ করবে ্তাই তার জন্য এগুলো জানা চাই, ভাল কাজ ঘর থেকে শুরু হওয়া উচিত। যে পরিবার তাকে সামাজিক সংস্কৃতিতে উপস্থাপন করে, সেই পরিবারের সম্পর্কের ভিত্তি সম্পর্কে সে জ্ঞাত হওয়া দরকার। তার মা-বাপ অসংখ্য অবৈধ সম্পর্কে সম্পর্কিত হয়ে অবশেষে এখন এক জাগায় এসে ‘পরিবার’ তৈরি করে সামাজিক প্রথার অনুসরণ/অনুকরণ করছেন কিনা –এগুলো সন্দেহবাদী, বৈজ্ঞানিক, দৃষ্টিভঙ্গিসহকারে  অনুসন্ধান চালানো দরকার। ধর্ম তো অনেক পরে আসবে।

অতপর ‘নিজ-জ্ঞানের’ প্রেক্ষিতের উপর সন্দেবাদী হতে হবে। সে যা জানে তা কীভাবে জানে -এই’নিশ্চয়তায়’ উপনীত হতে হবে। এটা হচ্ছে দর্শনের মূল স্থান। নিজের ‘জ্ঞানের’ স্থান স্পষ্ট হওয়ার আগেই অপরকে সন্দেহবাদী বানানোর ধৃষ্টতা না দেখালেই ভাল।

মূল কথা হচ্ছে এক ব্যক্তি কোন ব্যাপারে ‘সন্দেহ’ পোষণ করে, কিন্তু অপর আরেক ব্যক্তি সেখানে ‘সন্দেহ’ নাও করতে পারে, উভয়ের পক্ষে/বিপক্ষে যুক্তির এবং অযুক্তির স্থান থাকতে পারে। কেননা উভয়ের দেখার প্রেক্ষাপট, দেখার থিওরি, ভিন্ন হতে পারে। ভাষা-বিজ্ঞান, দর্শন, সমাজ বিজ্ঞান ইত্যাদিতে এভাবে ভিন্নতায় দেখার প্রেক্ষিত উপস্থাপন করে। আপনার কাছে যা সন্দেহজনক, আমার কাছে সেই সন্দেহ নাও থাকতে পারে, কেননা আমি বিষয়টি অন্যভাবে দেখে নিয়ে থাকতে পারি, আপনার মত নয়। কিন্তু আপনার সন্দেহবাদকেই আপনি যখন আমার উপর চাপিয়ে দেবেন এবং আমি তা না মানতে পারলে আপনি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠবেন, এমনটি হচ্ছে অসভ্য লোকের কাজ, ইতর প্রকৃতির কাজ, হিটলারের কাজ। হিটলারের দলও নিজেদেরকে মুক্তমনা ভাবতো, হিটলার নাস্তিক ছিল, যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানবাদের ভিত্তিতে উন্নত সমাজ-সভ্যতার কথা বিবেচনা করত।

অন্ধ বিশ্বাস
মুক্তমনাদের খেলা হচ্ছে ভাষিক ডিগবাজি, প্রতিপক্ষকে নেতিবাচক ব্যাখ্যায় আনা। ধাপ্পাবাজ নিজের জন্য ‘মুক্তমনা’ শব্দ নির্বাচন করে যখন বলে ওঠবে, ‘আমার আস্থা মুক্তবুদ্ধিতে – “অন্ধবিশ্বাসে” নয়’ তখন রাজনৈতিক ধাপ্পাবাজদের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। রাজনৈতিক অঙ্গনে ধাপ্পাবাজি অনেকটা বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বক্তব্যের উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

এখানে এই ক্ষুদ্র phrase, ‘অন্ধ বিশ্বাস’ -এর ভাষিক ব্যবহার কীভাবে সমঝের স্থানকে (place of perceptionকে) এক জাগা থেকে অন্য জাগায় নিয়ে যাচ্ছে (displace করছে) -তার প্রতি লক্ষ্য রাখুন। এখানে ‘অন্ধ’ শব্দটি বিশেষণের বাইরে গিয়ে metaphor হয়ে কাজ করছে এবং এই ব্যবহারের মাধ্যমে ধারণার মূলবস্তুকে লক্ষ্যচ্যুত করা হচ্ছে, যুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। অন্ধ রূপকতা (metaphor of blindness) উত্থাপনে চিন্তার লক্ষ্য রূপক বস্তুর দিকে নিবিষ্ট হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট হচ্ছে এবং এই রূপকতার সাথে জড়িত অর্থ-চিত্র (picturesque meaning) ধারণায় উপস্থিত হচ্ছে। কেউ যখন বলে ‘লোকটা কুত্তা মনা’ তখন প্রবক্তা অপর ব্যক্তির মানবতাকে চূর্ণ করে তার বক্তব্যের স্থান তৈরি করে। কাউকে প্রথমেই অন্ধ-বিশ্বাসী আখ্যায়িত করে তার মানবীয় চিন্তাশক্তিকে বিকলাঙ্গ হিসেবে দেখিয়ে, তার প্রতি আক্রমণাত্মক হয়ে, নিজের বক্তব্যের স্থান তৈরি করা হয়। মুক্তমনার ধাপ্পাবাজ প্রবক্তারা এভাবেই ভাষার ব্যবহারে তাদের নাস্তিক-ধর্মের প্রচারণা চালাবার প্রয়াস পায়। এটা মূলত শাব্দিক অর্থের মুক্তমনা-বৈশিষ্ট্য বহন করে না, ধাপ্পাবাজ মানসিকতা বহন করে।

যে লোকটি প্রথমে নিজের জন্য ‘মুক্তমনা’ শব্দটি নির্বাচন করল, তারপর যখন খোদাতে বিশ্বাসীদের মোকাবেলায় তার অবস্থানকে চাক্ষুষ এবং ওদের অবস্থানকে ‘অন্ধ’ শব্দে আখ্যায়িত করল, তখন তার ভাষিক আচরণ ও ব্যাখ্যার প্রকৃতিও অনেকটা স্পষ্ট। সে তার এই বৈশিষ্ট্য সর্বত্র প্রকাশ করবে, তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে এর রূপায়ন ঘটাবে। এমন লোক বিশ্বাসযোগ্য নয়। যাকে সে অন্ধ বলছে, সে তার নিজ ‘বিশ্বাসের’ আলোকে তা করছে, এটা তার নিজের দেখা ব্যাখ্যা, তার বক্তব্যের বাইরে বাস্তবতা ভিন্ন। সে অপরকে তার মত define করছে, অপরকে হীন করছে। তার বিশ্বাসের প্রচারের জন্য ‘মুক্ত’ শব্দটি বেঁচে নিয়েছে, অপরকে অন্ধ আখ্যায়িত করছে। সে যা করছে, এটা তার ধর্মীয় কাজ। সে আরেক ধরণের ‘ধর্ম-ব্যবসায়ী’। সে মূলত পদ্মলোচন। শাব্দিক ব্যবহারের নব্য-ম্যাজিক দেখিয়ে তার ধাপ্পাবাজি প্রতিষ্ঠা করছে। ভাষার শব্দ সম্ভার থেকে যেগুলো পজিটিভ সেগুলো তার নিজের জন্য এবং যেগুলো নেগেটিভ সেগুলো প্রতিপক্ষের জন্য নির্ধারণ করছে। প্রতিপক্ষের বিশ্বাস “অন্ধ”, আর তার নিজের বিশ্বাস চাক্ষুষ (আলোকিত)! লক্ষ্য রাখতে হবে,সে কিভাবে arbitrarily “অন্ধ” বিশেষণটি ওরের সাথে জোড়ে দিয়েছে। “খোদা নাই” –এটাও তো যুক্তিতে প্রমাণিত নয়, empiricallyও প্রমাণিত নয়, তাহলে নাস্তিক্যবাদও তো সাক্ষাৎ “অন্ধ” হতে পারে।

নতুন বোতলে আরেক ধর্ম
মুক্তমনারা তাদের নতুন ধর্মকে পুরাতন ধর্মের মোকাবেলায় ভাষার মারপ্যাঁচ ও রূপকতায় নতুন বোতলে ঢালে। মানুষকে এভাবে তাদের নব্য-ধর্মে ‘শিকার’ করতে চায়, অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকে সরিয়ে, নিজেদেরকে সেই আসনে বসাতে চায়। মুক্তমনা হতে হলে নাকি বংশ পরম্পরায় যা আসে তাকে অস্বীকার করতেই হবে। কোথাও যদি কোন আপ্তবাক্য থাকে যেমন, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই, তা অমনি উড়িয়ে দিতে হবে। কেননা এটা বংশ পরম্পরায় চলে এসেছে। কিন্তু কথা হল কোন আপ্তবাক্যিক ধারণা/বিশ্বাস বংশ-পরম্পরায় প্রচলিত হয়ে এসেছে বলেই কি সেটাকে অবলীলায় পরিত্যাগ করতে হবে? [১] এক শ্রেণীর ধারণা ত্যাগ করে অন্য শ্রেণীর ধারণা গ্রহণ করাতে অথবা এক গ্রুপের বিশ্বাস ও আদর্শ বর্জন করে অন্য গ্রুপের বিশ্বাস ও আদর্শ ধারণ করাতে “মুক্ত-ধারণা” আসে কীভাবে? কোনো স্বাধীন ব্যক্তি খোদা আছেন বললেই যদি ‘মুক্তমনা’ বৈশিষ্ট্য হারাতে হয়, তবে এই মুক্ত-ধর্ম মুক্ত হয় কীভাবে? এটা তো নিরেট ধাপ্পাবাজি। এখানে ‘অস্বীকৃতির’ কলেমাই হচ্ছে বড় কলেমা, এই মুক্ত ধর্মে পুরাতন ধর্মের মত আরও কলেমা রয়েছে।

মুক্তমনা কমপিটারের উপমা দিয়ে বলতে চায় বিশ্বাসীদের মাথায় নাকি ভায়ারাস ঢুকেছে, কিন্তু এখানেও সে ‘শব্দ’ নির্বাচন করছে, সে ‘উপমা’ নির্বাচন করছে। ভাইরাস তো বরং তারই মাথায়, কেননা প্রচলিত হাজার হাজার বছরের সামাজিক প্রথার কম্পিটারে সেই ভায়ারাসের কাজ করছে। আবার যারা নিজেদেরকে মুক্তমনা ভাবতে যাবে, তারা নাকি যুক্তিবাদী “বিজ্ঞানমনষ্ক” হয়ে, “সংশয়ী” দৃষ্টিকোণ দিয়ে মিথ ও অথিকথাকে বিশ্লেষণ করতে হবে। কিন্তু বিশ্লেষণের পর, কেউ খোদার বিশ্বাসে উপনীত হতে পারবে না! কেননা সেই সিদ্ধান্তের বিপরীতে গেলেই সর্বনাশ –আপনি মুক্তমনা থাকতে পারবেন না! বলতে হয়, হায়রে ঢেঁকি! তুমিও কি ‘অনার্য’?

যুক্তি বটেমুক্তমনা বটে!
প্রচলিত ধর্মে হিন্দু, মুসলিম, খৃষ্টীয়ান, বৌদ্ধ এগুলোই জানি। মুক্তমনাদের সংজ্ঞাতে তারা কিছু পরিচিতি দেয়। তারা কারা? তাদের সংজ্ঞাতে, “নাস্তিক (atheist), অজ্ঞেয়বাদী (agnostic), সংশয়বাদী (skeptic), মানবতাবাদীদের (humanist) সাধারণভাবে ‘মুক্তমনা সদস্য’ হিসেবে গণ্য করা হয়।” [১]

এখানে সাধারণভাবে (generally) যাদেরকে ‘মুক্তমনা’  (free-thinker, process of thinking as being free from tradition, faith, ideology etc.) ধারণার সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে, তারা কি সত্যিই এই সাধারণী (generalised) সংজ্ঞায় সামিল? ফুকো (Foucault), লিয়োটার্ড, (Lyotard), হাইডেগার (Heidegger), রোরটি (Rorty), ডেরিডা (Derrida) এবং এমন আরও অনেক পোস্টমডার্ন দার্শনিক রয়েছেন যাদের কেউ অজ্ঞেয়বাদী, কেউ নাস্তিক কিন্তু ওরা এনলাইটনম্যান্টের (বিজ্ঞানবাদ ও যুক্তিবাদের মাধ্যমে মানব জাতির সব সমস্যার সমাধানের চিন্তা-ধারা, বা তাদের যুক্তিতেই মুক্তি, বিশ্বাসীরা যুক্তিহীন, ভারারাস-মস্তিস্কসম্পন্ন ইত্যাদি) metanarrative থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ফুকো মুক্তিবাদের (emancipation) বক্তব্যে বিশ্বাসই করতেন না, বরং প্রত্যেক emancipatory বক্তব্যকে এক ধরণের শৃঙ্খল থেকে আরেক ধরণের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হওয়ার আহবান মনে করতেন। রোরটি এগুলোকে ভাষার খেলা মনে করতেন (দেখুন Contingency, Irony, and Solidarity)। তার কাছে এগুলো এক শ্রেণীর শব্দমালার মোকাবেলায় একশ্রেণীর শাব্দিক ব্যবহারের যুদ্ধ। সুতরাং এখানে আমভাবে অজ্ঞেয়বাদী ও নাস্তিক্যবাদীদেরে ‘মুক্তমনার’ দর্শনে টানা সঠিক ছিল না -সবাই মুক্তমনা-জাত সপ্তদশ/অষ্টাদশ শতাব্দীর এনলাইটনম্যান্টের চিন্তায় নেই, সেই মেটানেরেটিভ  এখন মৃত। (তবে এক গোষ্ঠী যে এটাকে ধরে রাখতে চাইবে না, এমনটি তো হয়না)।. এখন একদল মস্তিষ্কশুন্য, গোঁড়াপন্থি-নাস্তিক অপরের ধর্ম নিয়ে ক্যাট-ক্যাট, ঘ্যাঁট-ধ্যাঁটেই আবদ্ধ যারা বিশ্বের প্রচলিত ধর্মগুলোকে উড়িয়ে দিয়ে ধরায় মানব-স্বর্গ রচনা করার উদ্দেশ্যে সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব/বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। এইসব মিলিটেন্ট কর্মকাণ্ডে সকল নাস্তিক ও অজ্ঞেয়বাদী জড়িত নন। আমাদের অনেক শিক্ষক, সহপার্টি ছাত্র, এবং কর্মজীবনে অনেক লোকের মধ্যে নাস্তিক ও অজ্ঞেয়বাদী দেখেছি যাদেরকে মুক্তমনার প্রত্যয় ও কর্মে দেখিনি। সুতরাং ‘উগ্র-বঙ্গাল-গোঁড়া-নাস্তিকরা’ সকল অজ্ঞেয়বাদী ও নাস্তিককে এক ভাবা বা সাধারণী কথায় টানা সঠিক নয়। সমাজে যতটুকু সাম্প্রদায়িক সুসম্পর্ক রয়েছে বঙ্গাল গোঁড়ারা সেই অবশিষ্ট শান্তিটুকু নস্যাৎ করতে ধর্ম বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। এরা নাস্তিক মৌলবাদী।

মুক্তমনা বলে, “মুক্তমনাদের আস্থা তাই বিশ্বাসে নয়, বরং যুক্তিতে’, তাহলে ‘খোদা-নাই বা আছেন’, এটা বিশ্বাস না যুক্তি? এই প্রশ্ন নিরসন না করে প্রবক্তা যখন ‘মুক্তমনাদের আস্থা তাই বিশ্বাসে নয়, বরং যুক্তিতে’ তখন সে কি বলছে তা বুঝে বলছে, না নির্বোধের মত, সেটাই হয়ে পড়ে মূল প্রশ্ন।

ধার্মীক কি মুক্তমনা হতে পারে?
ধার্মিক কি মুক্তমনা হতে পারে? না। মুক্তমনার দৃষ্টিতে যে আল্লাহতে বিশ্বাস করবে সে মুক্তমনা হতে পারবে না। কেন? এই প্রশ্নটির উত্তর দিতে মুক্তমনা যে যুক্তির কসরত করে, (হাসি সংবরণ করে) সেই কসরত দেখা যাক। এই “যুক্তি” মুক্তমনার সাইটের পরিচিতি থেকে গৃহীত। বিষয়টি স্পষ্ট করতে স্কয়ার বন্ধনীর ভিতরে আমার নিজের কথা সংযোগ করেছি ও আন্ডারলাইনিং ব্যবহার করেছি।

 “কোন ধার্মিক যদি মুক্তমনে তাঁর ধর্মবিশ্বাসকে বিশ্লেষণ করতে পারেনতবে তাঁর নিজেকে মুক্তমনা বলতে আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু [‘কিন্তুর’ প্রতি লক্ষ্য রাখা জরুরি, ‘কিন্তু’ দিয়েই সব ভাষায় যুক্তির deviation আনা হয়, এখান থেকে বিপরীত কথা শুরু হবে] অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁরা তা না করে [অপরের উপর নিজ ধারণার প্রক্ষেপণ হচ্ছে, এটা তার নিজ অপিনিয়ন] নিজের ধর্মটিকেই আরাধ্য মনে করেন, কোন কিছু চিন্তা না করেই [কোন চিন্তা ভাবনা না করেই? কীরে পণ্ডিত! আর কোন কিছুকে আরাধ্য ভাবতে সমস্যা কোন যুক্তিতে?] নিজের ধর্মগ্রন্থকে ‘ঈশ্বর-প্রেরিত’ বলে ভেবে নেন [তার এই ভেবে নেয়াতে কোন চিন্তা-ভাবনা নেই? সে যে যৌক্তিক, ভাষিক ও দার্শনিক চিন্তা-ভাবনা অতিক্রম করে আসেনি –এই বাস্তবতা সে উড়িয়ে দেয় কীভাবে? আবার সবাই কি তথাকথিত মুক্তমনার পথ ধরেই হাঁটতে হবে, এটা কীসের যুক্তি, এটা কার মস্তিষ্কের উর্বরতার কারণে ‘ফরজ’ হয়?]।. স্রেফ [স্রেফ?] ঘটনাচক্রে পৈত্রিক-সূত্রে পাওয়া [পৈত্রিক সূত্রে পেলেই কি তা বর্জনীয় হতে হবে?] যে ধর্মটিকে ‘নিজের’ বলে মনে করেন সেটাকেই ঈশ্বরের মনোনীত একমাত্র ধর্ম বলে বিশ্বাস করেন। আমাদের মতে [অর্থাৎ এই নাস্তিক-গ্রুপের মতে] কোন ব্যক্তি শুধুমাত্র শোনা [শুধু মাত্র শোনা কথা? আরোপিত ধারণা] কথার ভিত্তিতে বাইবেল, কোরান বা বেদকে অন্ধভাবে [অন্ধভাবে!!] অনুসরণ করে, বা নবী-রসুল-পয়গম্বর-মেসীয়তে বিশ্বাস করে নিজেকে কখনোই ‘ফ্রি থিঙ্কার’ বা মুক্তমনা বলে দাবি করতে পারেন না। [কিন্তু অন্ধভাবে খোদা-নাই বললে সে মুক্তমনাই থেকে যাবে?]  মুক্তমনাদের আস্থা তাই বিশ্বাসে নয়, বরং যুক্তিতে।” [১]

এই প্যারাগ্রাফটি মুক্তমনাদের যুক্তির এক বড় ‘নমুনা’।.  প্রথমে “কোন ধার্মিক যদি মুক্তমনে তাঁর ধর্মবিশ্বাসকে বিশ্লেষণ করতে পারেন, তবে তাঁর নিজেকে মুক্তমনা বলতে আপত্তি থাকার কথা নয়” কিন্তু “মুক্তমনাদের আস্থা তাই বিশ্বাসে নয়, বরং যুক্তিতে।” একজন যুক্তিবাদী কিভাবে এই প্যারাগ্রাফ তৈরি করতে পারে এবং নিজের যৌক্তিক দুর্বলতা দেখতে পায়না, সেটাই হয় যৌক্তিক প্রশ্ন। এত ধানাই পানাই কেন? এক ব্যক্তি তার বিশ্বাসের যৌক্তিক justification কার কাছ থেকে গ্রহণ করবে? (প্রোপাগান্ডিস্ট ইসলাম বিদ্বেষী নাস্তিকদের কাছ থেকে?) বড় বড় দার্শনিকদের অনেকে বিশ্বাসী ছিলেন এবং অনেকে ছিলেন না। এই justification এর জন্য কি কোনো স্ট্যান্ডার্ড অথোরিটি রয়েছে যে এর মধ্যে arbitration করবেন, না উপরের বাক্যটি যে মুক্তমনা তৈরি করেছেন তার ‘যুক্তিই’ হবে শেষ কথা? এই প্যারাগ্রাফে উগ্র নাস্তিকরা যে অন্ধমনা, মৌলবাদী এবং ধাপ্পাবাজ –তা নিজেরাই প্রমাণ করে।

এই তথাকথিত মুক্তমনাদের দৃষ্টিতে আজন্ম লালিত ধর্মীয় ও সামাজিক নিবর্তনমূলক সকল সংস্কৃতি  “অপসংস্কৃতি”। তাদের জিহাদও তাদেরই যুক্তপ্রসূত “অপসংস্কৃতির” বিরুদ্ধে!

এখানেও তারা অপরের সংস্কৃতিকে ‘অপসংস্কৃতি’ বলছে, ইতিবাচক শব্দ তাদের, এবং নেতিবাচক শব্দ ওদের। এবারেই হয়ত স্পষ্ট যে কেন তারা নিজেদের জন্য এক শব্দ-শ্রেণীর ব্যবহার করে এবং প্রতিপক্ষের জন্য আরেক ধরনের শব্দ-শ্রেণী (নিজেরা মুক্তমনা, যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানমনষ্ক ইত্যাদি আর প্রতিপক্ষ ধর্মান্ধ, যুক্তিহীন, বিজ্ঞানবিমুখ) ব্যবহার করে। এটাই তাদের নতুন ধর্ম। এই ধর্ম এতই অন্তঃসারশূন্য যে অপরের বিপক্ষে প্রোপাগান্ডা ছাড়া নিজের ধর্মে এমন কিছু নেই যা দিয়ে তাদের প্রচারণা কার্য চালাতে পারে।

 

মুক্তমনারা কি ধর্ম বিরোধী?

মুক্তমনাদের ধাপ্পাবাজির নমুনা আরেকটি প্যারাগ্রাফ থেকে নেয়া যাক। এখানেও তাদের শব্দ চয়ন, বাক্যে গঠন ও প্যারাগ্রাফের প্রথমাংশ, মধ্যাংশ এবং শেষাংশের দিকে কী হচ্ছে তা খেয়ালে রাখবেন। আগের মত, স্কয়ার বন্ধনীর ভিতরের কথা এবং বোল্ডিং/আন্ডারলাইনিং হবে আমার।

মুক্ত-মনারা ধর্ম-বিরোধী নয়, বলা যায় অনেক মুক্তমনাই ধর্মের কঠোর সমালোচক। কারণ তাঁরা মনে করেন ধর্ম জিনিসটা পুরোটাই মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত। মুক্তমনারা সর্বদা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির [বরং selected সপ্ত/অষ্টাদশ শতাব্দীর দৃষ্টিভঙ্গি!] প্রতি আস্থাশীল, আজন্ম লালিত কুসংস্কারে নয়। কুসংস্কারের কাছে আত্মসমর্পণ আসলে নিজের সাথে প্রতারণা ছাড়া কিছু নয়। তবে মুক্তমনাদের ধর্ম-বিরোধী হওয়ার [আগের আন্ডারলানিংটা স্মরণ করুন এবং হাসি সামলিয়ে পরের generalised প্রোপাগাণ্ডামূলক বাক্য রচনা দেখুন!] একটা বড় কারণ হল, ধর্মগুলোর মধ্যে বিরাজমান নিষ্ঠুরতা। প্রতিটি ধর্মগ্রন্থের বিভিন্ন আয়াত এবং শ্লোকে বিধর্মীদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করা হয়েছে ঢালাওভাবে, কখনো দেয়া হয়েছে হত্যার নির্দেশ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ধর্ম আসলে জ্বিহাদ, দাসত্ব, জাতিভেদ, সাম্প্রদায়িকতা, হোমোফোবিয়া, অ-সহিষ্ণুতা, সংখ্যালঘু নির্যাতন, নারী নির্যাতন এবং সমঅধিকার হরণের মূল চাবিকাঠি হিসেবে প্রতিটি যুগেই ব্যবহৃত হয়েছে। [১]

‘মুক্ত-মনারা ধর্ম-বিরোধী নয় … তবে মুক্তমনাদের ধর্ম-বিরোধী হওয়ার’ কারণ আছে। কেননা ধর্ম মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত, ধর্ম কুসংস্কার, আর মুক্তমনারা ‘বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির’ অধিকারী! নিজেদের ব্যাপারে সুন্দর সুন্দর বাক্য রচনা, ইতিবাচক শব্দ চয়ন এবং প্রতিপক্ষের ব্যাপারের বিপরীত ধরণের বাক্য ও শব্দ নির্বাচন –এগুলো হচ্ছে এই ধাপ্পাবাজদের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি। যারা একটি প্যারাগ্রাফের সীমানায় যুক্তি টিকিয়ে রাখতে পারে না, তারাই অপরকে যুক্তি শিখাতে চায়, যে নিজেই বিদ্বেষ ছড়ায় সে’ই আবার অপরের বিদ্বেষ নিয়ে সংগীত রচনা করে, নিজের prejudice অন্যের উপর ধারণ করে। এটাই হচ্ছে উগ্র-পন্থি নাস্তিকদের আলোকিত পথ, এনলাইটনম্যান্ট।

মানব জাতির ইতিহাসে মানুষ অনেক পথ অতিক্রম করেছে এবং এখনো করছে। অতীতে যেমন মানুষে মানুষে দানাদানি হানাহানি করেছে, তেমনি আজও করছে। আগেও যুদ্ধ হয়েছে এখনো হয়।  সকল দ্বন্দ্ব সংঘাতে অনেক ধরনের ভিন্নজাত উপাদান কাজ করত এবং এখনো করে। এসবের মধ্যে স্থানভেদে ধর্মও ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। তবে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ফিরিস্তিতে মানুষের লোভ-লালসা, তাদের প্রকৃতিজাত হিংস্রতা, ‘আমিত্বের-প্রভাব’, সমঝের ভিন্নতা, গোত্রীয় স্বার্থ, রাজকীয় স্বার্থ, রাজ্য বিস্তৃতি, অর্থনীতিক দ্বন্দ্ব ইত্যাদি অনেক কিছু কাজ করত এবং এখনো করে। কিন্তু ধাপ্পাবাজ অজ্ঞতাবশত অথবা তার নিজ নাস্তিকধর্ম প্রচারের জন্য দুনিয়ার (অতীত-বর্তমানের) সব দাঙ্গা-হাঙ্গামাকে ধর্মের সাথে সংযুক্ত করে, এবং জোড়াতালি দিয়ে ধর্মের বিপক্ষে প্রোপাগান্ডা করে। মানুষের বিশ্বাস ও আবেগের স্থানে আক্রমণ করে।

কোনো নাস্তিক ব্যক্তি যদি ভাবে যে “কুসংস্কারের কাছে আত্মসমর্পণ আসলে নিজের সাথে প্রতারণা ছাড়া কিছু নয়”, তবে এটা তার নিজের বেলায় গ্রহণ করাতে কারও আপত্তি নেই, কিন্তু তার নিজ ব্যাখ্যার আলোকে অপরের বিশ্বাস ও প্রথাকে অপসংস্কৃতি সাব্যস্ত করে, তাদের উপর চড়াও হওয়া সভ্য সমাজের কাজ হতে পারে না, এই অধিকার তার নেই। আবার এক ব্যক্তি যদি তার নিজ অযৌক্তিকতাকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি মনে করে, তবে সে স্বাধীনতা তার আছে, কিন্তু অন্যের উপর চড়াও হওয়ার স্বাধীনতা নেই, এটা সভ্য নাগরিক জীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে পারে। উগ্র-নাস্তিকদেরে  হিটলার-মানসিকতার সাথে তুলনা করলে হয়ত অত্যুক্তি হবে না। প্রয়াত নাস্তিক হিটচিন ছিলেন ইরাক আক্রমণের প্রবক্তা, সাম হারিস শুধু সে যুদ্ধের পক্ষেরই নন বরং বোমা ফুটিয়ে গোটা আরব-ভূখণ্ডের সকল আরব মুসলমানদেরকে উড়িয়ে দেয়ার পক্ষেও। এই হচ্ছে ওদের মানসিকতা।

ওদের যুদ্ধ, ওদের প্রোপাগান্ডা, ওদের মিথ্যাচার হচ্ছে ধর্মের বিরুদ্ধে –এটা তাদের নিজ কথাতেই প্রতিষ্ঠিত। তাদের থলের বিড়ালটি তারা বেশিক্ষণ লুকিতে রাখতে পারে নি। তাদের প্যারাগ্রাফের শুরুতে একথা, মধ্যখানে এককথা এবং শেষাংশে আরেক কথা –কিন্তু তবুও তারা বিজ্ঞান-মনস্ক, যুক্তিবাদী!

শেষ কথা
আমাদের শেষ কথা হল এই যে আজকের বিশ্ব সভ্যতার মূলে রয়েছে ধর্মীয় সংস্কৃতির রূপায়ণ। প্রত্যেক ব্যক্তিই তার সমাজের সন্তান। তার সভ্যতা তার ভাষাকে যেভাবে সাজিয়েছে, সে বাল্যকালে ভাষায় প্রবেশ করার সাথে সাথে সেই ভাষাই তার সজ্ঞাকে সচেতন করে, তাকে ‘আমিত্বের’ চেতনায় আনে। সে ভাষা ও সংস্কৃতিতে সৃষ্ট চৈতন্যময়ী সত্তা। তার যুক্তির ব্যবহার ভাষিক, কিন্তু ভাষা বস্তুর আয়না নয়, বস্তুর প্রতিনিধিও (representative) নয়, যুক্তির ভাষিক ব্যবহারে সে যে ‘সত্য/অর্থ’ উপস্থাপন করে, সেই সত্যের আয়না হয়ে ব্যবহৃত শব্দমালা কাজ করে না। সে যে বস্তুকে তার যুক্তিতে ‘সত্য’ ভাবে, সঠিক ভাবে, সত্যের definition-কে পুনরায় যুক্তির scaffolding –এ তুলে ধরলে (এবং পরতে পরতে এনাইলাইজ শুরু করলে ) তার ধারণা তিলে তিলে তিরোহিত হবে। যুক্তি ও বিজ্ঞানবাদের ধর্মীয়রূপ অনেক পুরাতন। (এ বিষয়ে আমার দু’টি লেখা একটি এখানে [২] এবং অন্যটি এখানে দেখা [৩]  দেখা যেতে পারে)  এই মুক্তমনারা সপ্তদশ শতাব্দীর এনলাইটনম্যান্টের ‘ধর্মের-মত’ প্রত্যয়ে নিমজ্জিত।

অনেকক্ষণ যারা লেখাটি পড়েছেন, তারা এই প্রসংগের সাথে মিল-রাখা একটি ভিডিও দেখে শেষ করতে পারেন, যদি সে ধৈর্য্য থেকে গিয়ে থাকে। [৪] http://www.youtube.com/watch?v=HH67M7lUtO4.

[youtube]http://www.youtube.com/watch?v=HH67M7lUtO4[/youtube]

________________________

[১] মুক্তমনা এডমিন, (২০০৮) মুক্তমনা কী? মুক্তমনা [অনলাইন] available at: http://mukto-mona.com/bangla_blog/?page_id=519 [Accessed 10 Oct 2012]

[২] এই বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত লেখা (উপরে লিঙ্ক করা) হল, “যুক্তি, বিশ্বাস ও কোরান” লেখাটি দেখা যেতে পারে এবং সাথে করে মন্তব্য সেকশন – মন্তব্য 4.1, দ্বিতীয় আলোচনাঃ যৌক্তিক সমস্যা

[৩] এই বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত দ্বিতীয় লেখা (উপরে লিঙ্ক করা) ‘Rationality and religion’

[*] এই বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত আরেকটি লিঙ্ক করা লেখা এখানে ‘দ্যা এনলাইটনম্যান্ট’

[৪] videonation. (2008). Hedges Vs. Hitchens. [Online Video]. Feb 22, 2008. [Accessed: 13 October 2012]. (URL Address দিলে ভিডিও লিঙ্ক ডবল হয়ে যায়, তাই এখানে repeate করা হল না)

Facebook Comments

2512 জন পড়েছেন

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতাত্ত্বিক, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক।