মুক্তমনা ও নাস্তিক মিলিট্যান্সি

2640 জন পড়েছেন

সূচনা

সমাজের কিছু কিছু লোক  ‘মুক্তমনা’। তাদের দাবি মুক্ত-চিন্তক, যুক্তিবাদী। তারা ট্র্যাডিশন বা প্রাচীন প্রাতিষ্ঠানিকতা-মুক্ত, অথবা এগুলো থেকে মুক্ত হতে কাজ করছেন এবং মানুষকে মুক্ত করতেও চাচ্ছেন।

এখানে ‘মুক্তমনার’ যে দাবি বা বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হচ্ছে আমরা প্রথমে সেটা বুঝার চেষ্টা করব। প্রথমে ‘মুক্ত’ শব্দটি বিবেচনা করি। সরল-সহজভাবে বলতে গেলে আমাদের ভাষার সকল শব্দ তাদের বিপরীত ধারণার মোকাবেলায় অর্থ লাভ করে। ঠাণ্ডা গরমের মোকাবেলায়, শক্ত নরমের মোকাবেলায়, সত্য মিথ্যার মোকাবেলায় ইত্যাদি। আমরা যখন বলি ‘মুক্ত আকাশের পাখি’, তখন ‘মুক্ত’ কোন্‌ জিনিস তা সহজে বুঝতে পারি। আমরা যখন বলি পাখিটি খাঁচায় বন্দী, অথবা লোকটি এখন রাজার বন্দীশালায় আবদ্ধ, তখন আবদ্ধ, বন্ধন আর মুক্ত অবস্থার কথা বুঝি। উদাহরণের পাখিটি ‘নিজ ইচ্ছায়’ খাঁচায় গিয়ে আবদ্ধ হয়নি আর বন্দীশালার লোকটিও ‘নিজ ইচ্ছায়’ বন্দীদশা গ্রহণ করেনি। এখানে সতত ইচ্ছার স্বাধীনতা ও অধীনতা প্রকাশ পায়। আমরা যদি বন্দীশালার লোকটির ব্যাপারে বলি, সে এখন ‘মুক্ত’, তখন বুঝি যে এখন তার স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছে। সে এখন যথেচ্ছ বিচরণ করতে পারে। তার কর্মে ইচ্ছার স্বাধীনতা এসেছে। সে যেখানে সেখানে যেতে পারে। অর্থাৎ এখন সে স্বাধীন, সর্বাবস্থায় মুক্ত।

কিন্তু যে ব্যক্তি কোন বন্দীশালায় আবদ্ধ ছিল না, এবং এখনও নয়, সে যদি বলে যে ‘আমি এখন মুক্ত’ তাহলে বুঝতে হবে শব্দের রূপকতা (metaphoricity) ব্যবহার করা হচ্ছে। এই ধরণের রূপক ব্যবহার অনেক ভাবে করা যেতে পারে। এক ব্যক্তি বন্দীশালার ভিতরে থেকেও বলতে পারে, “আমি মুক্ত আকাশের পাখি।” এখানে শ্লেষাত্মক অথবা ব্যঙ্গাত্মক অর্থও আসতে পারে। এমন ব্যবহার সব ভাষাতে আছে। আমি গরীব লোক হয়েও বলতে পারি, “প্রাচুর্যের মধ্যে ডুবে আছি।” আপনি ‘বদ্ধমনা’ হয়েও বলতে পারেন মুক্তমনা, মুক্ত-চিন্তক। কেননা আপনি নিজের জন্য যখন কোনো শব্দ নির্বাচন করেন, তখন কোন্‌ শব্দটি নির্বাচন করবেন তা একান্ত আপনার ইখতিয়ারে। আপনার কানা ছেলেকেও নাম দিতে পারেন ‘পদ্মলোচন’। এতে কারো বলার কিছু নেই।

মনে রাখতে হবে যে কোনো শব্দের অর্থ তার শব্দের ‘ভিতরেই’ নিহিত নয়, বরং অর্থ হচ্ছে সামাজিক প্রথা-ভিত্তিক, সামাজিক convention এর অংশ, (আমরা সবাই সমাজে প্রতিষ্ঠিত ভাষিক প্রথার ‘ভিতরেই’ থাকি, আমাদের অর্থ-বিনিময় [communication] এই প্রথার বাইরে নয়)। আবার ‘অর্থ’ কোন একটি শব্দ-কেন্দ্রিক নয়, বরং অর্থের-সংযুক্তিতে জড়িত অন্যান্য শব্দের জিঞ্জিরে (chaining with other words) গোটা ভাষা ব্যবস্থার (system of language) মধ্যে পরিব্যপ্ত।

‘মুক্তমনা’ যদি স্বাধীন চিন্তা ও স্বাধীন প্রত্যয় কেন্দ্রিক হয় এবং এরই প্রেক্ষিতে যদি এক ব্যক্তি বলে, “আমি খোদাতে বিশ্বাস করি না,” এবং অন্য ব্যক্তি যদি তার আপন স্বাধীন চিন্তা-চেতনা ও বিবেক অনুযায়ী বলে, “আমি খোদাতে বিশ্বাস করি”, তবে উভয়ই মুক্তমনা হওয়া উচিত। কিন্তু প্রথম ব্যক্তি যখন বলবে, “না, খোদাকে অস্বীকার না করলে মুক্তমনা হওয়া যাবে না”, তখন বুঝতে হবে সেই লোকটির কোন ‘মতলব’ আছে, সে কুযুক্তি উত্থাপন করছে। তারপর যখন সে জেদি হয়ে উঠবে এবং তার শেষ কথা হবে, আপনি ‘খোদাকে অস্বীকার করলেই’ মুক্তমনা হবেন, তখন বুঝতে হবে, এই ‘মুক্তমনা’ শব্দটি নিয়ে এখন ‘ধাপ্পাবাজি’ শুরু হয়েছে, ভাষার রাজনীতি শুরু হয়েছে। ধাপ্পাবাজ কোন নির্দিষ্ট কারণে নিজের জন্য ‘মুক্তমনা’ শব্দটি ব্যবহার করছে। সে তার আপন দাবীর বিপক্ষে স্ববিরোধী (inconsistent) হয়ে ভাব ও শব্দের এমন ব্যবহার করছে, কেননা it cannot be empirically proven that there is no God অর্থাৎ কোন বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে খোদা-নাই বলে প্রমাণ করা যাবে না, সুতরাং চোখ বন্ধ করে খোদাকে অস্বীকার করলেই মুক্তমনা হওয়া যায় না। বরং এক বিশ্বাস থেকে আরেক্ক বিশ্বাসে যাওয়া হয়।

তারপর মুক্তমনা হতে হলে পূর্ববর্তী সমাজ সভ্যতা, আচরণ, বিশ্বাস সব কিছুতেই ‘সন্দেহবাদী’ হতে হবে, প্রথাগত বিষয় (tradition) সমঝে না এলে বর্জনের জন্য আহবান জানাতে হবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত বর্জিত না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আক্রমণাত্মক হতেই হবে। এই বৈশিষ্ট্য অর্জিত না হলে ‘মুক্তমনা’ হওয়া যাবেনা – এমন যুক্তিবাদী বরং ‘বক্রমনা’ই হতে পারে।

মূল কথা হচ্ছে এক ব্যক্তি যদি কোন ব্যাপারে ‘সন্দেহ’ পোষণ করে, তবে অপর ব্যক্তি সেখানে ‘সন্দেহ’ নাও করতে পারে, উভয়ের পক্ষে/বিপক্ষে যুক্তির এবং অযুক্তির স্থান থাকতে পারে। কেননা উভয়ের দেখার প্রেক্ষাপট, দেখার থিওরি, ভিন্ন হতে পারে। ভাষা-বিজ্ঞান, দর্শন, সমাজ বিজ্ঞান ইত্যাদিতে এভাবে ভিন্নতায় দেখার প্রেক্ষিত উপস্থাপন করে। আপনার কাছে যা সন্দেহজনক, আমার কাছে সেই সন্দেহ নাও থাকতে পারে, কেননা আমি বিষয়টি অন্যভাবে দেখে নিয়ে থাকতে পারি, আপনার মতো নয়। কিন্তু আপনার সন্দেহবাদকেই আপনি যখন আমার উপর চাপিয়ে দেবেন এবং আমি তা না মানতে পারলে আপনি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠবেন, এমনটি হচ্ছে অসভ্য লোকের কাজ, ইতর প্রকৃতির কাজ, হিটলারের কাজ। হিটলারের দলও নিজেদেরকে মুক্তমনা ভাবতো, হিটলার নাস্তিক ছিল, যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানবাদের ভিত্তিতে উন্নত সমাজ-সভ্যতার কথা বিবেচনা করত।

অন্ধ বিশ্বাস

মুক্তমনাগণ সাধারণত ভাষিক ডিগবাজি করে থাকেন। তারা নিজের জন্য ‘মুক্তমনা’ শব্দ নির্বাচন করেন এবং বলেন,  “আমার আস্থা মুক্তবুদ্ধিতে – অন্ধবিশ্বাসে নয়।” কিন্তু এটা রাজনৈতিক ধাপ্পাবাজির মত দেখায়।

এখানে ‘অন্ধ বিশ্বাস’-এর ভাষিক ব্যবহার আমাদের সমঝের স্থানকে (place of perception) এক স্থান থেকে আরেক স্থানে নিয় যায়। ‘অন্ধ’ শব্দটি বিশেষণের বাইরে গিয়ে metaphor হয়ে কাজ করে এবং এই ব্যবহারের মাধ্যমে ধারণার মূলবস্তু লক্ষ্যচ্যুত হয়।  অন্ধ রূপকতা (metaphor of blindness) উত্থাপনে চিন্তার লক্ষ্য রূপক বস্তুর দিকে নিবিষ্ট হয়, এবং এই রূপকতার সাথে জড়িত অর্থ-চিত্র (picturesque meaning) ধারণায় উপস্থিত হয়।  কেউ যখন বলেন ‘লোকটা কুত্তামনা’ তখন প্রবক্তা অপর ব্যক্তির মানবতাকে চূর্ণ করে তার বক্তব্যের স্থান তৈরি করেন। কাউকে প্রথমেই অন্ধ-বিশ্বাসী আখ্যায়িত করে তার মানবীয় চিন্তাশক্তিকে বিকলাঙ্গ হিসেবে দেখিয়ে, তার প্রতি আক্রমণাত্মক হয়ে, নিজের বক্তব্যের স্থান তৈরি করা হয়।

যে লোক প্রথমে নিজের জন্য ‘মুক্তমনা’ শব্দটি নির্বাচন করলেন, তারপর যখন খোদাতে বিশ্বাসীদের মোকাবেলায় তার অবস্থানকে ‘চাক্ষুষ’ এবং ওদের অবস্থানকে ‘অন্ধ’ শব্দে আখ্যায়িত করলেন, তখন তার ভাষিক আচরণ ও ব্যাখ্যার প্রকৃতিও অনেকটা স্পষ্ট হল। তিনি তার এই বৈশিষ্ট্যই সর্বত্র প্রকাশ করবেন, তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে এর রূপায়ন ঘটাবেন।  যাকে তিনি অন্ধ বলছেন, সেই ব্যক্তি তারই নিজ ‘বিশ্বাসের’ আলোকে অন্ধ দেখানো হচ্ছে।  তার বক্তব্যের বাইরে বাস্তবতা ভিন্ন। তার নিজ বিশ্বাসের প্রচারের জন্য তিনি ‘মুক্ত’ শব্দটি বেছে নিয়েছেন, অপরকে ‘অন্ধ’ আখ্যায়িত করছেন।

এভাবে ভাষার শব্দ সম্ভার থেকে যেসব শব্দ পজিটিভ সেগুলো তার নিজের জন্য এবং যেগুলো নেগেটিভ সেগুলো প্রতিপক্ষের জন্য নির্ধারণ করছেন। প্রতিপক্ষের বিশ্বাস “অন্ধ”, আর তার নিজের বিশ্বাস চাক্ষুষ (আলোকিত)! লক্ষ্য রাখতে হবে, কীভাবে arbitrarily “অন্ধ” বিশেষণটি অপরের সাথে জুড়ত হচ্ছে। “খোদা নাই” – এটা তো যুক্তিতে প্রমাণিত নয়, empirically-ও প্রমাণিত নয়, তাহলে নাস্তিক্যবাদও তো সাক্ষাৎ “অন্ধ” হতে পারে।

সংজ্ঞা ও মুক্তমনা

আমরা প্রচলিত ধর্ম বলতে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ এগুলোই জানি। মুক্তমনাদের সংজ্ঞাতে, “নাস্তিক (atheist), অজ্ঞেয়বাদী (agnostic), সংশয়বাদী (skeptic), মানবতাবাদীদের (humanist) সাধারণভাবে ‘মুক্তমনা সদস্য’ হিসেবে গণ্য করা হয়।” [১]

এখানে যাদেরকে সাধারণভাবে (generally) ‘মুক্তমনার’ সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে তারা (অজ্ঞেয়বাদী/সন্দেহবাদী ও নাস্তিক মহল) ‘সাধারণভাবে’ মুক্তমনার প্রত্যয় ও দাবীতে নেই। মিকায়েল ফুকো (Michel Foucault), জিন ফ্রান্সিস লিয়োটার্ড, (Jean-François Lyotard), মার্টিন হাইডেগার (Martin Heidegger), রিচার্ড রোরটি (Richard Rorty), জ্যাক ডেরিডা (Jack Derrida) এবং এমন আরও অনেক পোস্টমডার্ন দার্শনিক রয়েছেন যাদের কেউ অজ্ঞেয়বাদী, কেউ নাস্তিক, কিন্তু ওরা এনলাইটনম্যান্টের (বিজ্ঞানবাদ ও যুক্তিবাদের মাধ্যমে মানব জাতির সব সমস্যার সমাধানের চিন্তা, বা তাদের যুক্তিতেই মুক্তি, বিশ্বাসীরা যুক্তিহীন, ভাইরাস-মস্তিষ্কসম্পন্ন ইত্যাদি) metanarrative থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ফুঁকো মুক্তিবাদের (emancipation) বক্তব্যে বিশ্বাসই করতেন না, বরং প্রত্যেক মুক্তিবাদী (emancipatory) বক্তব্যকে এক ধরণের শৃঙ্খল থেকে আরেক ধরণের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হওয়ার আহবান মনে করতেন। রোরটি এগুলোকে ভাষার খেলা মনে করতেন (দেখুন Contingency, Irony, and Solidarity)। তার কাছে এগুলো এক শ্রেণীর শব্দমালার মোকাবেলায় আরেক শ্রেণীর শাব্দিক ব্যবহারের যুদ্ধ। সুতরাং এখানে আমভাবে অজ্ঞেয়বাদী ও নাস্তিক্যবাদীদের ‘মুক্তমনা’র দর্শনে টানা সঠিক নয় – সবাই মুক্তমনা-জাত সপ্তদশ/অষ্টাদশ শতাব্দীর এনলাইটনম্যান্টের চিন্তায় নেই, সেই মেটানেরেটিভ এখন মৃত। (তবে এক গোষ্ঠী যে এটাকে ধরে রাখতে চাইবে না, এমনটি তো হয়না)। এখন একদল মস্তিষ্কশুন্য, গোঁড়াপন্থি-নাস্তিক অপরের ধর্ম নিয়ে ক্যাট-ক্যাট, ঘ্যাঁট-ধ্যাঁটেই আবদ্ধ যারা বিশ্বের প্রচলিত ধর্মগুলোকে উড়িয়ে দিয়ে ধরায় মানব-স্বর্গ রচনা করার উদ্দেশ্যে সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব/বিদ্বেষ ছাড়াচ্ছে। এইসব মিলিট্যান্ট কর্মকাণ্ডে সকল নাস্তিক ও অজ্ঞেয়বাদী জড়িত নন। আমাদের অনেক শিক্ষক, সহপাটি ছাত্র, কর্মজীবনে অনেক লোকের মধ্যে নাস্তিক ও অজ্ঞেয়বাদী দেখছি যাদের কাউকে মুক্তমনা প্রত্যয় ও কর্মে দেখিনি। সুতরাং ‘উগ্র-বঙ্গাল-গোঁড়া-নাস্তিকরা’ সকল অজ্ঞেয়বাদী ও নাস্তিককে এক ভাবা সঠিক নয়। সমাজে যতটুকু সাম্প্রদায়িক সু-সম্পর্ক রয়েছে বঙ্গাল গোঁড়ারা সেই অবশিষ্ট শান্তিটুকু নস্যাৎ করতে ধর্ম বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। এরা নাস্তিক মৌলবাদী।

ধার্মিক কি মুক্তমনা হতে পারে?

ধার্মিক কি মুক্তমনা হতে পারেন? মুক্তমনার দৃষ্টিতে যে ব্যক্তি আল্লাহতে বিশ্বাস করবে সে মুক্তমনা হতে পারবে না। কেন? এই প্রশ্নটির উত্তর দিতে মুক্তমনা যে যুক্তির কসরত করে থাকেন সেই কসরত দেখা যাক। এই যুক্তিটি মুক্তমনা সাইটের পরিচিতি থেকে গৃহীত। বিষয়টি স্পষ্ট করতে স্কয়ার বন্ধনীর ভিতরে আমার নিজের কথা সংযোগ করেছি ও আন্ডারলাইনিং ব্যবহার করেছি।

কোন ধার্মিক যদি মুক্তমনে তাঁর ধর্মবিশ্বাসকে বিশ্লেষণ করতে পারেন, তবে তাঁর নিজেকে মুক্তমনা বলতে আপত্তি থাকার কথা নয়। [লক্ষ্য করুন বিশ্বাসকে ‘বিশ্লেষণ করতে পারাকেই’ ‘মুক্তমনা’ বলা হচ্ছে। বিশ্লেষণের ক্ষমতাই কি সঠিক যুক্তি?] কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁরা তা না করে নিজের ধর্মটিকেই আরাধ্য মনে করেন, কোন কিছু চিন্তা না করেই  নিজের  ধর্মগ্রন্থকে ‘ঈশ্বর-প্রেরিত’ বলে ভেবে নেন [এখানে অন্যদের উপর নিজ ধারণা প্রক্ষেপণ করা হচ্ছে। ওপিনিয়ন এবং প্রেজুডিস প্রকাশ পাচ্ছে। তারপর, বলা হচ্ছে বিশ্বাসীরা কোনো চিন্তা ভাবনা ছাড়াই নিজ ধর্মকে ঈশ্বর প্রেরিত মনে করেন?]  স্রেফ ঘটনাচক্রে  [?] পৈত্রিক-সূত্রে পাওয়া যে ধর্মটিকে ‘নিজের’ বলে মনে করেন সেটাকেই ঈশ্বরের মনোনীত একমাত্র ধর্ম বলে বিশ্বাস করেন। আমাদের মতে [স্রেফ? আবার, পৈত্রিক সূত্রে পেলেই কি তা বর্জনীয় হতে হবে? নাস্তিকতাবাদের ধারণা কি মুক্তমনারা প্রবর্তন করেছে, না তারা অন্যের সূত্রে তা প্রাপ্ত? মুক্তমানাদের যুক্তিহীনতা দারুণভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। এখন, বিশ্বাসকে ‘বিশ্লেষণ করতে পারার  পরও তা ত্যাগ করতে হবে!  এখানে তাদের নিজ খোঁড়া যুক্তিই বড় সমস্যা।] কোন ব্যক্তি শুধুমাত্র শোনা [শুধুমাত্র শোনা কথা?] কথার ভিত্তিতে বাইবেল, কোরান বা বেদকে অন্ধভাবে [অন্ধভাবে!] অনুসরণ করে, বা নবী-রসুল-পয়গম্বর-মেসীয়তে বিশ্বাস করে নিজেকে কখনোই ফ্রি থিঙ্কারবা মুক্তমনা বলে দাবি করতে পারেন না [কিন্তু অন্ধভাবে খোদা-নাই বললে সে মুক্তমনাই থেকে যাবে?] মুক্তমনাদের আস্থা তাই বিশ্বাসে নয়, বরং যুক্তিতে [১]। [এখানে যুক্তিহীনতা দারুণভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এই প্রকৃতির লোকই হচ্ছে যুক্তির দাবীদার!]

এই প্যারাগ্রাফটি মুক্তমনাদের যুক্তির একটা নমুনা হিসেবে নেয়া যেতে পারে। প্রথমে “কোন ধার্মিক যদি মুক্তমনে তাঁর ধর্মবিশ্বাসকে বিশ্লেষণ করতে পারেন, তবে তাঁর নিজেকে মুক্তমনা বলতে আপত্তি থাকার কথা নয়” কিন্তু “মুক্তমনাদের আস্থা তাই বিশ্বাসে নয়, বরং যুক্তিতে।” একজন যুক্তিবাদী কিভাবে এই প্যারাগ্রাফ তৈরি করতে পারে এবং নিজের যৌক্তিক দুর্বলতা দেখতে পায়না, সেটাই হয় যৌক্তিক প্রশ্ন। এত ধানাই পানাই কেন? এক ব্যক্তি তার বিশ্বাসের যৌক্তিক justification কার কাছ থেকে গ্রহণ করবে? বড় বড় দার্শনিকদের অনেকে বিশ্বাসী ছিলেন এবং অনেকে ছিলেন না। এই justification এর জন্য কি কোনো স্ট্যান্ডার্ড অথরিটি রয়েছে যে এর মধ্যে arbitration করবেন, না উপরের বাক্যটি যে মুক্তমনা তৈরি করেছেন তার ‘যুক্তিই’ হবে শেষ কথা? এই প্যারাগ্রাফে উগ্র নাস্তিকরা যে অন্ধমনা, মৌলবাদী এবং ধাপ্পাবাজ – তা নিজেরাই প্রমাণ করে।

এই তথাকথিত মুক্তমনাদের দৃষ্টিতে আজন্ম লালিত ধর্মীয় ও সামাজিক বিবর্তনমূলক সকল সংস্কৃতি ‘অপসংস্কৃতি’। তাদের জিহাদও তাদেরই যুক্তিপ্রসূত “অপসংস্কৃতির” বিরুদ্ধে!

এখানেও তারা অপরের সংস্কৃতিকে ‘অপসংস্কৃতি’ বলছে, ইতিবাচক শব্দ তাদের, এবং নেতিবাচক শব্দ ওদের। এবারেই হয়তো স্পষ্ট যে কেন তারা নিজেদের জন্য এক শব্দ-শ্রেণী ব্যবহার করে এবং প্রতিপক্ষের জন্য আরেক ধরণের শব্দ-শ্রেণী (নিজেরা মুক্তমনা, যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানমনষ্ক ইত্যাদি আর প্রতিপক্ষ ধর্মান্ধ, যুক্তিহীন, বিজ্ঞানবিমুখ) ব্যবহার করে। এটাই তাদের নতুন ধর্ম। এই ধর্ম এতই অন্তঃসারশূন্য যে অপরের বিপক্ষে প্রোপাগাণ্ডা ছাড়া নিজের ধর্মে এমন কিছু নেই যা দিয়ে তাদের প্রচারণা কার্য চালাতে পারে।

মুক্ত-মনারা ধর্ম-বিরোধী নয়, বলা যায় অনেক মুক্তমনাই ধর্মের কঠোর সমালোচক। কারণ তাঁরা মনে করেন ধর্ম জিনিসটা পুরোটাই মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত। মুক্তমনারা সর্বদা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির [বরং সপ্ত/অষ্টাদশ শতাব্দীর  selective দৃষ্টিভঙ্গি!] প্রতি আস্থাশীল, আজন্ম লালিত কুসংস্কারে নয়। কুসংস্কারের কাছে আত্মসমর্পণ আসলে নিজের সাথে প্রতারণা ছাড়া কিছু নয়। তবে মুক্তমনাদের ধর্ম-বিরোধী হওয়ার [আগের আন্ডারলাইনিংটা স্মরণ করুন এবং হাসি সামলিয়ে পরের generalised প্রোপাগাণ্ডামূলক বাক্য রচনা দেখুন!] একটা বড় কারণ হল, ধর্মগুলোর মধ্যে বিরাজমান নিষ্ঠুরতা। প্রতিটি ধর্মগ্রন্থের বিভিন্ন আয়াত এবং শ্লোকে বিধর্মীদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করা হয়েছে ঢালাওভাবে, কখনো দেয়া হয়েছে হত্যার নির্দেশ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ধর্ম আসলে জ্বিহাদ, দাসত্ব, জাতিভেদ, সাম্প্রদায়িকতা, হোমোফোবিয়া, অ-সহিষ্ণুতা, সংখ্যালঘু নির্যাতন, নারী নির্যাতন এবং সমঅধিকার হরণের মূল চাবিকাঠি হিসেবে প্রতিটি যুগেই ব্যবহৃত হয়েছে।

‘মুক্ত-মনারা ধর্ম-বিরোধী নয় … তবে মুক্তমনাদের ধর্ম-বিরোধী হওয়ার’ কারণ আছে। কেননা ধর্ম মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত, ধর্ম কুসংস্কার, আর মুক্তমনারা ‘বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির’ অধিকারী! নিজেদের ব্যাপারে সুন্দর সুন্দর বাক্য রচনা, ইতিবাচক শব্দ চয়ন এবং প্রতিপক্ষের ব্যাপারে বিপরীত ধরণের বাক্য ও শব্দ নির্বাচন – এগুলো হচ্ছে এই ধাপ্পাবাজদের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি। যারা একটি প্যারাগ্রাফের সীমানায় যুক্তি টিকিয়ে রাখতে পারে না, তারাই অপরকে যুক্তি শিখাতে চায়, যে নিজেই বিদ্বেষ ছড়ায় সে’ই আবার অপরের বিদ্বেষ নিয়ে সংগীত রচনা করে, নিজের prejudice অন্যের উপর ধারণ করে। এটাই হচ্ছে উগ্র-পন্থি নাস্তিকদের আলোকিত পথ, এনলাইটনম্যান্ট

মানব জাতির ইতিহাসে মানুষ অনেক পথ অতিক্রম করেছে এবং এখনো করছে। অতীতে যেমন মানুষে মানুষে হানাহানি করেছে, তেমনি আজও করছে। আগেও যুদ্ধ হয়েছে, এখনো হয়। সকল দ্বন্দ্ব সংঘাতে অনেক ধরণের উপাদান কাজ করতে দেখা যায়। এসবের মধ্যে স্থানভেদে ধর্মও ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। কিন্তু দ্বন্দ্ব-সংঘাতে মানুষের লোভ-লালসা, তাদের প্রকৃতিজাত হিংস্রতা, আমিত্বের-প্রভাব, সমঝের ভিন্নতা, গোত্রীয় স্বার্থ, রাজকীয় স্বার্থ, রাজ্য বিস্তৃতি, অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব ইত্যাদি অনেক কিছু কাজ করত এবং এখনো করে। কিন্তু ধাপ্পাবাজ অজ্ঞতাবশত অথবা তার নিজ নাস্তিক্যধর্ম প্রচারের জন্য দুনিয়ার (অতীত-বর্তমানের) সব দাঙ্গা-হাঙ্গামাকে ধর্মের সাথে সংযুক্ত করে, এবং জোড়াতালি দিয়ে ধর্মের বিপক্ষে প্রোপাগাণ্ডা করে। মানুষের বিশ্বাস ও আবেগের স্থানে আক্রমণ করে।

কোন নাস্তিক ব্যক্তি যদি ভাবে যে “কুসংস্কারের কাছে আত্মসমর্পণ আসলে নিজের সাথে প্রতারণা ছাড়া কিছু নয়”, তবে এটা তার নিজের বেলায় গ্রহণ করাতে কারও আপত্তি নেই। কিন্তু তার নিজ ব্যাখ্যার আলোকে অপরের বিশ্বাস ও প্রথাকে অপসংস্কৃতি সাব্যস্ত করে, তাদের উপর চড়াও হওয়া সভ্য সমাজের কাজ হতে পারে না, এই অধিকার তার নেই। আবার এক ব্যক্তি যদি তার নিজ অযৌক্তিকতাকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি মনে করে, তবে সে স্বাধীনতা তার আছে, কিন্তু অন্যের উপর চড়াও হওয়ার স্বাধীনতা তার নেই। এটা সভ্য নাগরিক জীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে পারে। উগ্র-নাস্তিকতাকে এক ধরণের হিটলার-মানসিকতার সাথে তুলনা করলে হয়তো অত্যুক্তি হবে না। প্রয়াত মিলিট্যান্ট নাস্তিক হিচেন্স ছিলেন ইরাক আক্রমণের প্রবক্তা, স্যাম হ্যারিস শুধু সে যুদ্ধের পক্ষেরই নন বরং বোমা ফুটিয়ে গোটা আরব-ভূখণ্ডের সকল আরব মুসলমানদেরকে উড়িয়ে দেয়ার পক্ষেও। এই হচ্ছে তাদের মানসিকতা।

ওদের যুদ্ধ, ওদের প্রোপাগাণ্ডা, ওদের মিথ্যাচার হচ্ছে ধর্মের বিরুদ্ধে – এটা তাদের নিজ কথাতেই প্রতিষ্ঠিত। তাদের থলের বিড়ালটি তারা বেশিক্ষণ লুকিয়ে রাখতে পারেন না। তাদের প্যারাগ্রাফের শুরুতে এককথা, মধ্যখানে এককথা এবং শেষাংশে আরেক কথা – কিন্তু তবুও বিজ্ঞান-মনস্ক, যুক্তিবাদী!

শেষ কথা

আমাদের শেষ কথা হল এই যে আজকের বিশ্ব সভ্যতার মূলে রয়েছে ধর্মীয় সংস্কৃতির রূপায়ণ। প্রত্যেক ব্যক্তিই তার সমাজের সন্তান। তার সভ্যতা তার ভাষাকে যেভাবে সাজিয়েছে, সে বাল্যকালে ভাষায় প্রবেশ করার সাথে সাথে সেই ভাষাই তার সজ্ঞাকে সচেতন করে, তাকে ‘আমিত্বের’ চেতনায় আনে। সে ভাষা ও সংস্কৃতিতে সৃষ্ট চৈতন্যময়ী সত্তা। তার যুক্তির ব্যবহার ভাষিক, কিন্তু ভাষা বস্তুর আয়না নয়, বস্তুর প্রতিনিধিও নয়, যুক্তির ভাষিক ব্যবহারে সে যে ‘সত্য/অর্থ’ উপস্থাপন করে, সেই সত্যের আয়না হয়ে ব্যবহৃত শব্দমালা কাজ করে না। সে যে বস্তুকে তার যুক্তিতে ‘সত্য’ ভাবে, সঠিকভাবে, তার সত্যের definition-কে পুনরায় যুক্তির scaffolding-এ তুলে ধরলে (এবং পরতে পরতে বিশ্লেষণ শুরু করলে) তার ধারণা তিলে তিলে তিরোহিত হবে। যুক্তি ও বিজ্ঞানবাদের ধর্মীয়রূপ অনেক পুরাতন। [এ বিষয়ে দু’টি লেখা এখানে [২] এবং এখানে [৩] দেখা যেতে পারে]। এই মুক্তমনারা সপ্ত/অষ্টদশ শতাব্দীর এনলাইটনম্যান্টের ‘ধর্মের-মতো’ প্রত্যয়ে নিমজ্জিত।

অনেকক্ষণ যারা লেখাটি পড়েছেন, তারা এই প্রসঙ্গের সাথে মিল-রাখা একটি ভিডিও দেখে শেষ করতে পারেন, যদি সে ধৈর্য্য থেকে গিয়ে থাকে। [৪]

Hedges Vs. Hitchens

________________________

[১] মুক্তমনা এডমিন, (২০০৮) মুক্তমনা কী? মুক্তমনা [অনলাইন] available at: http://mukto-mona.com/bangla_blog/?page_id=519 [Accessed 10 Oct 2012]

[২] এই বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত লেখা (উপরে লিঙ্ক করা) হল, “যুক্তি, বিশ্বাস ও কোরান” লেখাটি দেখা যেতে পারে এবং সাথে করে  মন্তব্য সেকশন – মন্তব্য 4.1, দ্বিতীয় আলোচনাঃ যৌক্তিক সমস্যা

[৩] এই বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত দ্বিতীয় লেখা (উপরে লিঙ্ক করা) ‘Rationality and religion’

[*] এই বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত আরেকটি লিঙ্ক করা লেখা এখানে ‘দ্যা এনলাইটনম্যান্ট’ 

[৪] videonation. (2008). Hedges Vs. Hitchens. [Online Video]. Feb 22, 2008. [Accessed: 13 October 2012]. (URL Address দিলে ভিডিও লিঙ্ক ডবল হয়ে যায়, তাই এখানে repeate করা হল না)

Facebook Comments

2640 জন পড়েছেন

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতত্ত্ব, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক।

মন্তব্য দেখুন