মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণঃ প্রধানমন্ত্রী হোঁচট খেলেন

1955 জন পড়েছেন

সেপ্টেম্বরের ১৩ তারিখ সবক’টি জাতীয় দৈনিকে একটি খবর অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ছাপা হয়েছিল। মেয়াদের শেষ দিকে এসে সরকার তার মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এবার যোগ হতে যাচ্ছিলেন পাঁচ জন মন্ত্রী এবং দুই জন প্রতিমন্ত্রী। মন্ত্রীদের মধ্যে থাকার কথা ছিল আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য সিনিয়র এমপি তোফায়েল আহমদ, দলের প্রেসিডিয়াম মেম্বার মহীউদ্দীন খান আলমগীর, জাসদ একাংশের সভাপতি হাসানুল হক ইনু, ওয়ার্কার্স পার্টির প্রধান রাশেদ খান মেনন, এবং সরকার দলীয় এমপি ও হুইপ মুজিবুল হক। প্রতিমন্ত্রী হচ্ছিলেন রাজশাহী এবং ঝিনাইদহ থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের সাংসদ যথাক্রমে ওমর ফারুক চেীধুরী এবং আব্দুল হাই। খবর দেখে মনে হয়েছিল এখন নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রী কিছুটা হলে চাপ অনুভব করছেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে ১৮ দলীয় জোটের আন্দোলন মোকাবেলা করার উদ্দেশ্যে তিনি শক্তি সঞ্চয় করার চেষ্টা করছেন। তিনি বাস্তব পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে তা সামাল দেওয়ার জন্য নিজ দল এবং জোটকে সুসংহত করছেন, আরো কিছু লোককে কাছে টেনে নিচ্ছেন। এর আসল উদ্দেশ্য বেশামাল সময়ে দল থেকে অভিজ্ঞ লোকদের অধিক সক্রিয় সহযোগিতা পাওয়া এবং জোটের আরো দু’দলকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে সরকারের ওপর জনগণের হারানো আস্থা পুনরুদ্ধার করা।

পরদিন খবরে দেখা গেল তোফায়েল আহমদ এবং রাশেদ খান মেনন শপথ নেননি। তাদের জায়গায় নেওয়া হয়েছে দিনাজপুর-৪ ও যশোহর-২ আসন থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য যথাক্রমে এ এইচ মাহমুদ আলী, এবং মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদ। এরা দুজনই সাবেক আমলা-কাম-রাজনীতিবিদ। দুঃসময়ে প্রধানমন্ত্রী তাঁর দল ও জোটকে গুছিয়ে আনার লক্ষ্যে এ উদ্যোগ নিয়ে থাকলে বলতেই হয় শুরুতেই তিনি মারাত্মক হোঁচট খেয়েছেন। তের তারিখে প্রকাশিত খবর যদি সঠিক হয় তা হলে তিনি আপন সহকর্মী তোফায়েলের গোস্সা ভাঙাতে পারেননি এবং মেননকেও ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। সরকারের হাতে সময় আছে এক হিসেবে এক বছরের একটু বেশি, আরেক হিসেবে মাত্র ছয় মাস। প্রথম হিসেবমতে সংবিধান অনুযায়ী সরকারের পাঁচ বছর পুর্তির আগে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। দ্বিতীয় হিসেব অনুযায়ী আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনা খুব বেশি (জাতীয় পার্টির প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এই মর্মে ইঙ্গিত দিয়ে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন)। যদি তাঁর কথা ঠিক হয়, তাহলে আগামী বছর মার্চ এপ্রিলেই নির্বাচন হয়ে যেতে পারে। অর্থাত্ বিএনপি আন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে নিতে কৌশল হিসেবে মহাজোট সরকার আগাম নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে বিরোধী জোটকে অপ্রস্তুত রেখে বেকায়দার মধ্যে ফেলতে চায়।
মন্ত্রিসভার বেশ কিছু সদস্যদের অযোগ্যতা, অদক্ষতা, এবং দূর্নীতি নিয়ে মিডিয়ায় অনেক দিন ধরে উত্তপ্ত আলোচনা সমালোচনা হচ্ছিল কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তাতে কান দেননি, রদবদল করার তো প্রশ্নই উঠে না। এখন কী এমন হল, যে এই অবেলা, শেষবেলায় এসে তাঁর ঘুম ভাঙল? এখন কেন তিনি নতুন মন্ত্রী নিতে গেলেন যখন তাঁর সময় প্রায় ফুরিয়ে এসেছে? বিষয়টি বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় সরকারের পৌনে ৪ বছরের শাসনের দিকে। এই সরকার মহাজোটের মহাবিজয়ের ফসল। সরকার প্রথম দিক থেকেই নির্বাচনে দেওয়া তাদের প্রতিশ্র“তি বাস্তবায়নের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে প্রোপাগান্ডার ওপর। তারা বিগত জোট সরকারের জঙিবাদী অপবাদ এবং হাওয়া ভবনের দোহাই দিয়ে বাজি মাত করতে চেয়েছে। চাইলেই তো হল না। সবকিছুরও তো একটি সীমা আছে। জনগণ আজকাল খুব সচেতন, তারা কমবেশি সব খবরই রাখে। এ সরকারের সময়ে যে সব অঘটন ঘটেছে তার তালিকা কিন্তু নেয়ায়েত্ ছোট নয়। ঘটেছে পিলখানা কার্নেজ যেখানে ৫০এর বেশি চৌখস সামরিক অফিসার নৃশংসভাবে প্রাণ হরিয়েছেন। সরকার দলীয় ক্যাডাররা দিনের আলোয় পিটিয়ে হত্যা করেছে বড়াইবাড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান বাবুকে। রচিত হয়েছে চোধুরী আলম ও ইলিয়াস আলীর গুম কাহিনি। বেহাল রাস্তাঘাটের কারণে দূর্ঘটনায় অকালে মারা গেছেন তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনির। হয়েছে পরিবহন শ্রমিকদের নিয়ে নৌমন্ত্রীর কেলেঙ্কারি। হয়েছে শেয়ার বাজাওে লোটপাট যেখানে ৩০ লাখের বেশি ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী হারিয়েছে তাদের সর্বস্ব পুঁজি। ঘটেছে রহস্যজনক খালাফ ও সাগর-রুনি হত্যাকান্ড। অনবরত চলছে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমুহে দলবাজির বাড়াবাড়ি। ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে চলছে ছাত্রলীগের তান্ডব, রাহাজানি, খুনখারাবী, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি। নেমেছে শ্রমবাজারে ধস। ঝালকাঠির নিরিহ ছেলে লিমনকে নিয়ে এখনো চলছে নানান ঢঙ-তামাশা। টরোন্টোর এসএনসি লাভালিনের কথিত দূর্নীতি নিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের সাথে বেঁেধছে সরকারের কাজিয়া, বাতিল হয়েছে পদ্মা সেতুর ঋণ চুক্তি। হয়েছে ডেসটিনি, হলমার্কের মত বড় বড় দূর্নীতির কেলেঙ্কারি। দেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে হাজার হাজার কোটি টাকার তাগড়া পুঁজি। এর ওপর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে বিরোধী দলের সাথে হয়নি কোনো আপোস মীমাংসা।

এক দিকে উপরের অঘটনের লিস্ট লম্বা হচ্ছে আর অন্য দিকে কমছে আওয়ামী লীগের ভোট। এমতাবস্থায় বিএনপির কোমরে জোর থাকুক আর নাই থাকুক, দেশবিদেশের খবরের কাগজে যা দেখছি তাতে মনে হয় আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে গেছে। আর তাই তো নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে সরকারের এত ভয়, এত অনীহা। ২০০৬এ বিএনপিও একই কাজ করেছিল। এ ব্যাপারে এ পর্যন্ত দু’ দলের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। সেদিন বাংলাদেশ প্রতিদিনের একটি রিপোর্টে দেখলাম গোয়েন্দা সংস্থা সরকারকে রিপোর্ট দিয়েছে, নির্বাচন যেভাবেই হোক, বিএনপির বিজয় সুনিশ্চিত্। এই রাজনৈতিক নাজুক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার নতুন মন্ত্রীদের নিয়োগ দিয়েছে। জাতীয় পার্টিকে মন্ত্রিসভায় আরো দুটি পদ দেওয়ার কথাও অনেক দিন ধরে শুনে আসছিলাম, কিন্তু এবার সেরকম কোনো খবর হল না। তার দুটো মানে হতে পারে। এক, প্রধানমন্ত্রী জনাব এরশাদকে অফার করেছিলেন এবং তিনি সসম্মানে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। কারণ তিনি আলাদা নির্বাচন করতে চান। এখন জাতীয় পার্টি থেকে নতুন মন্ত্রী নিয়ে তিনি দূর্নামের ভাগীদার হতে চাননা। দুই, প্রধানমন্ত্রী সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের ওপর সব আশা ছেড়ে দিয়ে মেনন-ইনুকে কাছে টেনে অবস্থা সামাল দেওয়ার শেষ চেষ্টা করছেন, কারণ তাঁরাও ইদানীং হাত-পা নাড়াচাড়া করা শুরু করে দিয়েছেন। খবরে যা দেখলাম তাতে বোঝা যায় দ্বিতীয়টিই সত্য। সরকার জাতীয় পার্টিকে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে একজন প্রতিনিধি দেয়ার অনুরোধ করেছিল। পার্টি প্রেসিডেন্ট সেটা সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই শেষবেলা এসে ক্লান্ত টিমে নতুন খেলোওয়াড় নিয়ে খেলা জেতা যাবে কী না সেটা বলা মুশকিল। তবু চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কী? হতে পারে এটি প্রধানমন্ত্রীর বিবেচনা।

সরকারের এ সিদ্ধান্ত নিঃসন্ধেহে অনেক তাত্পর্যপূর্ণ তাই বিষয়টি সিরিয়াস বিশ্লেষণের দাবি রাখে। মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণকে কেন্দ্র করে একসাথে অনেকগুলো প্রশ্ন উঠতে পারে। প্রথমত, দলীয় নেতৃবৃন্দ জনাব মহীউদ্দীন খান আলমগীর, মুজিবুল হক, এ এইচ মাহমুদ আলী, মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদ, ওমর ফারুক চেীধুরী, এবং আব্দুল হাই – এরা সবাই আওয়ামী লীগের লোক। তাঁদেরকে তাঁদের নেত্রী যে কোনো সময় মন্ত্রিত্বের আহ্বান জানাতেই পারেন এবং তাঁরা সে ডাকে সাড়া দিতে বাধ্য। কিন্তু এই শেষ সময়ে এসে প্রধানমন্ত্রী কেন মেনন-ইনুকে ডাকছেন (স্পষ্টত মেনন ডাকে সাড়া দেননি)? তাঁদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর কী এরকম কোনো চুক্তি ছিল, না কী রাজনৈতিকভাবে বেকায়দায় পড়ায় এই মুহূর্তে তাঁদের গুরুত্ব বেড়েছে। আর ডাকলেইবা কী? এখন তাঁরা সে ডাকে সাড়া দেবেন কেন? এত দিন যাদের কোনো পাত্তা দেননি, এখন তাদের টানাটানি করছেন কেন? কারো মনের কথা আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয়, তবে যতদূর আমার বিশ্বাস দ্বিতীয় কারণটিই ঠিক। কারণ মেনন-ইনু অনেক দিন ধৈর্য ধরলেও শেষ দিকে এসে তাঁরা উল্টাপাল্টা করতে শুরু করেছিলেন। আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে তাঁরা বামপন্থীদের নিয়ে একটি নতুন মোর্চা দাঁড় কারাবার কাজে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছিলেন। এমাসের তৃতীয় সপ্তাহেই প্রেস ক্লাবের সামনে তাঁদের সরকার বিরোধী র‌্যালিতে নামার কথা ছিল। আগেও তাঁরা নড়া চড়া করেছেন। প্রধানমন্ত্রী হয়তবা তাঁদের একদিকে ভয় আরেক দিকে লোভ দেখিয়ে ঠান্ডা করেছেন। এবার বোধ হয় কোনো ওষুধই কাজ করছিল না। তাই অনন্যোপায় হয়ে সরকার প্রধান তাঁদের আশা শেষবারের মত পুরণ করার উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু ইনুর বেলা কাজে লাগলেও মেননের বেলা উদ্যোগটি বেশি দেরিতে এসেছে। মেনন মন্ত্রী হওয়ার জন্য রাজি থাকলেও তাঁর দল তাঁকে এ কাজে এ সময় সায় দেয়নি। তোফায়েল তো অভিমানে সরকারের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি আগে থেকে আঁচ করতে পেরেই হয়ত অপমানের ভয়ে নিজে প্রস্তাবিত মন্ত্রীদের দাওয়াত করেননি। করলে হয়ত ফল অন্য রকম হত। তোফায়েল এবং মেননের নেতিবাচক সিদ্ধান্তের পেছনে এটিও একটি কারণ হিসেবে কাগজে এসেছে। কেউ কেউ বলছেন প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে দিয়ে ফোন করিয়ে তোফায়েল এবং মেননকে অপমান করেছেন।

এখন কথা হল, এই অসময়ে অল্প দিনের জন্য মন্ত্রী হয়ে গায়ে কাদা লাগাতে ইনু কেন এত সহজে রাজি হলেন? এর দুটি উত্তর হতে পারে। প্রথমত, তাঁর মন্ত্রী হওয়ার খায়েস এত বেশি, যে তিনি কোনো অবস্থায়ই এমন মোক্ষম সুযোগ হাত ছাড়া করতে রাজি হননি। দ্বিতীয়ত, ইনু খালেদা জিয়াকে মাইনাস করার মত হটকারী তত্ত্ব দিয়ে আওয়ামী লীগের নৌকায় বাঁধা পড়ে গেছেন। তাঁর আর নৌকা ছাড়ার উপায় নেই। কথাবার্তায় তিনি এখন আওয়ামী লীগারের চেয়ে বড় আওয়ামী লীগার। এতদিন প্রধানমন্ত্রী মেনন-ইনুকে পাত্তা দেননি। এখন কেন দিতে চাচ্ছেন। সেটা এক প্রশ্ন। আরেক প্রশ্ন এতদিন পাত্তা না পেয়ে মেনন-ইনু কেনইবা প্রধানমন্ত্রীর নৌকোর সওয়ার হয়ে রইলেন। দ্বিতীয় প্রশ্নের হতে পারে দুটি উত্তর। প্রথমতঃ পাত্তা না পেলেও তারা যাবেন কোথায়। তারা তো নৌকো মার্কা নিয়েই নির্বাচনে জিতেছিলেন। নৌকো মার্কা নিয়ে নির্বাচন করা না করা নিয়ে মেননের সঙ্গে রোণোর মতবিরোধ দেখা দিল। রোণো দল ছেড়ে চলে গেলেন সিপিবিতে। দ্বিতীয় উত্তর, তাঁরা এতদিন প্রধানমন্ত্রীর কাছে মান-সম্মান না পেলেও হয়তবা অন্য কিছু পেয়েছেন যা আমরা জানি না তবে অনুমান করতে পারি। কিন্তু আমাদের সব অনুমান যে সব সময় সঠিক হয় তাও নিশ্চিত করে বলতে পারি না। তবে সব কথার বড় কথা শেষ পর্যন্ত জনগণেল কাছে কোনোকিছুই অজানা রয় না। শেষবেলা মন্ত্রিসভার কলেবর বাড়াতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজের জন্য হিতে বিপরীত ডেকে আনলেন। যেমনি ঘরের দূর্বলতার কথা জানাজানি হল তেমনি জোটে ভাঙনের সুর আরো জোরে বেজে উঠল।

লেখক: আবু এন. এম. ওয়াহিদ; অধ্যাপক – টেনেসী স্টেইট ইউনিভার্সিটি
এডিটর – জার্নাল অফ ডেভোলাপিং এরিয়াজ;

1955 জন পড়েছেন

Comments are closed.