রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তির সম্ভাবনা

2219 জন পড়েছেন

অনেক চড়াই-উত্রাই পেরিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি মোটামুটি একটি গণতান্ত্রিক ধারায় এসে পড়ে ১৯৯০এর পট পরিবর্তনের পর। দূর্বল গণতন্ত্রের এ পথ চলা এখনো নিষ্কন্টক এবং নিরাপদ হয়নি। তবু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন তো হচ্ছে, এটা নিশ্চয়ই একটি ভাল দিক, যদিও এটাই গণতন্ত্রের শেষ কথা নয়। গণতন্ত্রে নিছক নির্বাচন এবং নির্বাচিত সরকারের চেয়ে সুশাসন এবং সকল সরকারি সিদ্ধান্তে জনমতের প্রতিফলনই বড় কথা, যা এখনো বাংলাদেশে সোনার পাথরবাটি হয়ে রয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে যে দল বা জোট যখনই ক্ষমতায় যায়, তখন তাঁরা এটাকে জনসেবা ও সুশাসনের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য একটি দূর্লভ সুযোগ মনে করে না। তাঁরা ভাবে পাঁচ বছরের জন্য জনগণ বুঝি তাঁদের কাছে দেশটিকে ইজারা দিয়ে দিয়েছে এবং এই ভেবে যাচ্ছে তাই করতে থাকে। সময় শেষ হলে জনগণ ঠিকই তাদের ছুড়ে ফেলে দিয়ে আরেক দলকে ক্ষমতায় বসায়, কিন্তু তাতে কোনো ফল হয় না, ‘থোড়বড়ি খাড়া আর খাড়াবড়ি থোড়’। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মত বড় দলগুলোও পেয়ে বসেছে – দেশবাসীর যেন যাওয়ার মত তৃতীয় কোনো জায়গা নেই। ক্ষমতায় আসার সাথে সাথে তাঁরা জনগণের অ্যাজেন্ডা বাদ দিয়ে দলীয় অ্যাজেন্ডা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে এবং তারচেয়ে খারাপ যে কাজটি করে সেটা হচ্ছে প্রতিপক্ষের ওপর হামলে পড়ে। তাঁদের ধারণা, ‘ঘুরেফিরে সেই তো আওয়ামী লীগ, নয়তো বিএনপি, ভাবনা কিসের’? নির্বাচনি প্রতিশ্র“তি, জনগণের প্রতি দায়িত্ব, ডেলিভারি অফ গুড গভার্নেন্স, ইত্যাদি নিয়ে মোটেও মাথা ঘামায় না। আস্তে আস্তে জনসমর্থন হারাতে থাকে। সময় অর্ধেক পার হওয়ার পর যখন বুঝতে পারে পরবর্তী নির্বাচনে ভরাডুবি হবে নিশ্চিত, তখন তাদের খাইখাই বেড়ে যায়। ভাবতে থাকে ক্ষমতা যখন ছাড়তেই হবে, তাহলে আখেরটা একটু ভাল করে গুছিয়ে নেই। এই প্রক্রিয়া একইভাবে চক্রাকারে ঘুরতে আছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। এমন গ্যাড়াকলে পড়ে অনেকে ভাবতে শুরু করেছেন, এ দু’দলের কাউকে দিয়ে দেশের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করা যাবে না, রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তির উত্থান চাই।

সেদিন খবরে দেখলাম নাগরিক ঐক্যের আহ্ববায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না ঘোষণা দিয়েছেন, ‘আগামী নির্বাচনে তাঁরা তৃতীয় শক্তির পক্ষ থেকে ৩০০ আসনে মনোনয়ন দেবেন’। এটা অত্যন্ত ভাল কথা। ব্যক্তিগতভাবে আমিও সেটা চাই। কিন্তু নির্বাচনে দাঁড়ালেই তো আর হল না, ভোটও তো পেতে হবে। সাংবাদিক আবু সাঈদ খান দৈনিক সমকালে কলাম লিখেছেন রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তির উত্থানের সম্ভাবনা নিয়ে। তিনি বলতে চেয়েছেন, ‘এক দলকে সরিয়ে আরেক দলকে বসানো মানে ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে ঝাপ দেওয়ারই নামান্তর’। সিপিবির মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম একই কথা বলছেন অনেক দিন ধরে। অন্যান্য কলাম লেখকরাও এ ব্যাপারে তাদের বিজ্ঞ মতামত দিয়ে যাচ্ছেন, কারো কারো মতের সঙ্গে পুরোপুরি না হলেও আংশিকভাবে আমি সজমত পোষণ করি। ছোট দলের রাজনীতিবিদরাও বসে নেই। একই ধারায় নিকট অতীতে কাজ করেছেন এবং এখনো করে যাচ্ছেন ড. কামাল হোসেন, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, বি. চৌধুরী, আসম আব্দুর রব, মনঞ্জুরুল আহসান খান, এবং আরো অনেকে।

তৃতীয় শক্তির সম্ভাবনাকে সামনে রেখে ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিনএর সময় সরকারিভাবে কিছু চেষ্টা, কিছু এক্সপেরিমেন্ট করা হয়েছে, কিন্তু সফল হয়নি। সে কুশিশ এখনো কেউ কেউ অব্যাহত রেখেছেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস এটাও ফেল মারবে, কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তির উত্থানের সময় এখনো হয়নি। কেন হয়নি আমি সংক্ষেপে তার একটি ব্যাখ্যা এ নিবন্ধের মাধ্যমে পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে চাই। আমার বক্তব্য শুরু করছি জাসদের সাধারণ সম্পাদক মঈনুদ্দিন খান বাদলের একটি উক্তি দিয়ে। তিনি জরুরি তত্ত্ববধায়ক সরকারের আমলে এক টিভি টক শোতে বলেছিলেন, ‘এ মুহূর্তে দেশে তৃতীয় শক্তির আবির্ভাব সম্ভব নয়, কারণ রাজনীতির ময়দানে স্পেস খালি নেই’। অর্থাত জনগণের মধ্যে তৃতীয় শক্তির চাহিদা নেই। আমার মতে কথাটা তখন ঠিক ছিল, এখনো ঠিক, এবং সহসা এর ব্যত্যয় হওয়ার নয়, তবে দূর ভবিষ্যতে তৃতীয় শক্তির উত্থান অবশ্যম্ভাবী।

বিবদমান দুই দল বা জোট বারবার একই ভুল করছে, ব্যর্থ হচ্ছে, বেপরোয়া দেশ চালাচ্ছে, একটু শক্ত ভাষায় বলতে গেলে জনগণের সঙ্গে কথা দিয়ে কথা রাখছে না, তবু তাঁরা রাজনীতির ময়দানে বিশাল বিশাল স্পেস দখল করে বসে আছে। এখন প্রশ্ন হল, কেন? কীভাবে? এবং কোন প্রক্রিয়ায়? প্রশ্নগুলোর উত্তর একসাথে দেওয়ার চেষ্টা করছি। পৃথিবীর সব গণতান্ত্রিক দেশেই রাজনৈতিক এবং মানসিকভাবে দু’ধরণের লোক বাস করে – লিবারেল এবং কনজার্ভেটিভ। বাংলাদেশও এর কোনো ব্যতিক্রম নয়। তবে জাতীয় জীবনের এক বিশেষ সময়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে এবং যুদ্ধের সময় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সবাই ঐক্যবদ্ধ ছিল এবং এক হয়েই বিদেশি শত্র“র বিরুদ্ধে সাহসের সঙ্গে লড়েছে এবং অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে দেশমাতৃকাকে স্বাধীন করেছে। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ এবং বাম জোট শুধু লিবারেলদের প্রতিনিধিত্ব করত। দেশে বিশাল কনজার্ভেটিভ জনগোষ্ঠীর মনের কথা বলার মত তখন কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফরম ছিল না। ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিএনপি সৃষ্টির মাধ্যমে সেই শূন্য স্থানটি পুরণ করে একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করে গেছেন। ওই সময় বিএনপির জন্য রাজনীতির ময়দানে একটি বিশাল স্পেস খালি ছিল। জিয়া সে স্পেস সময়মত দখল করেছেন। এর পর এ পর্যন্ত যত ভুল ভ্রান্তি করুক না কেন, আওয়ামী লীগ যেমন লিবারেলদের মূল ধারার আস্থা হারায়নি, বিএনপিও তেমনি মেইন স্ট্রিম কনজার্ভেটিভদের সমর্থন ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। অন্যভাবে বলতে গেলে, ধর্মনিরপেক্ষ ও বামপন্থী ক্ষুদ্র দল সমূহ এবং জাতীয়তাবাদী ও ইসলাম পছন্দ ছোট দলগুলো যথাক্রমে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিকল্প হিসেবে জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। কেন পারেনি সে প্রশ্নের উত্তর আমি খুঁজে পাইনি, পেলে আরেকটি কলাম লিখব।

এখন প্রশ্ন করতে পারেন, ‘তাই যদি হবে, তা হলে দু’দলই পালাক্রমে নির্বাচনে হারে কেন’? উত্তরটি খুব সহজ এবং সরল। উভয় দলই নির্বাচনে হারে সুইং ভোট সুইং করে বলে। তাঁদের কোর সাপোর্ট যেমনি ছিল তেমনি আছে, এবং অদূর ভবিষ্যতেও থাকবে বলেই আমার ধারণা। এবার আমার কথার সপক্ষে কিছু পরিসংখ্যান দিচ্ছি। সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকার গঠন করে তাঁরা, যাঁরা সংসদে অধিকাংশ সিট পায়। আর বিরোধী দলে যায় তাঁরা, যাঁরা সংসদে কম সিট পায়। কিন্তু বাংলাদেশে সংসদীয় সিটের হিসেব এবং ভোটের হিসেবের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। আওয়ামী লীগ এবং তার জোট যখন নির্বাচনে হারে তখনও তাঁরা এক তৃতীয়াংশের অধিক ভোট পায়। বিএনপির ব্যাপারেও কথাটি সমানভাবে প্রযোজ্য। অর্থাত্ দু’দলেরই বাঁধা ভোট প্রায় সমান সমান। সুইং ভোট মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। আর এ ভোটের ব্যবধানেই প্রতিটি নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন হচ্ছে।

তাই বলে কী এ দু’দলীয় দৌরাত্ব চলতে থাকবে চিরকাল? না, তা চলবে না। এবং তৃতীয় শক্তির জন্য হয়তবা একটি আশার আলোও আছে। সঠিক পরিসংখ্যান আমার হাতে নেই, তবে আমার বিশ্বাস, সুইং ভোটের পরিমাণ ধ্র“ব সংখ্যা এবং আনুপাতিক হারে দিনে দিনে বাড়ছে। বড়রা যতটা আগ্রহী, তরুণ প্রজন্ম কারো বাঁধা ভোট ব্যাংক হয়ে থাকতে ততটা ইচ্ছুক নয়। এই সুইং ভোট ব্যাংক আস্তে আস্তে বাড়তে বাড়তে যখন এক-তৃতীংশের থ্রেশোল্ড পার হবে, তখনই বাংলাদেশের রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তির সম্ভাবনা বাস্তব আকার ধারণ করবে। তার আগে নয়। কারণ সুইং ভোট যতটি বাড়বে, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির বাঁধা ভোট প্রায় ততটিই কমবে। নতুন যোগ হওয়া ভোটারদের জন্য হিসেবে অবশ্য একটু হেরফের হবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তির ব্যাপারে যারা খুব উত্সাহী তাদের প্রতি আমার একটি বিনীত সাবধান বাণী বা (নোট অফ কোশন আছে) – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় আড়াই শ’ বছরের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে তৃতীয় শক্তির উত্থান ঘটেনি, ইংল্যান্ডে সাড়ে তিন শ’ বছরেও তা হয়নি। বাংলাদেশে ৪০/৫০, কী ১০০ বছরে কী তা সম্ভব হবে? সম্ভব হলেও রাজনীতিতে তার টিকে থাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিশ্চিত নয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তিকে টিকে থাকতে হলে সঙ্গে সঙ্গে দেশজুড়ে থাকতে হবে তার শক্তিশালী ছাত্র সংগঠন। বর্তমান মডেলিটিতে ব্যাপক ভিত্তিক ছাত্র সংগঠন ছাড়া কোনো রাজনৈতিক দল বা শক্তি বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য এবং তাত্পর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারবে না। কেন সেটা নিয়ে আরেকটি পৃথক নিবন্ধ আগামীতে লেখার ইচ্ছে রইল।

লেখক: আবু এন. এম. ওয়াহিদ; অধ্যাপক – টেনেসী স্টেইট ইউনিভার্সিটি;
এডিটর – জার্নাল অফ ডেভোলাপিং এরিয়াজ;

2219 জন পড়েছেন

Comments are closed.