রমজানের প্রথম চাঁদ বছরে একদিনই উদিত হয়

2574 জন পড়েছেন

এ বছরও উত্তর আমেরিকার সকল মুসলিমরা মিলে আমরা একই দিন রোজা রাখতে পারিনি। সঙ্গত কারনে তাই একই দিন ঈদ অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা কম। অথচ এবার নব্বই শতাংশ সম্ভাবনা ছিল যে, একই দিন রোজা শুরু করা সম্ভব হবে। কিছু লোক রোজা রাখা শুরু করেছে ১৯ জুলাই শুক্রবার বুধবার থেকে। আবার অনেকে রোজা শুরু করেছে ২০ জুলাই শনিবার থেকে। রোজা ঈদ নিয়ে এটা আমাদের জন্য এখন একটি স্থায়ী সমস্যায় পরিনত হয়েছে। গত দুবছর আগে আমরা রোজা শুরু করেছিলাম ১১ আগষ্ট বুধবার আর অন্য গ্র“প যথারীতি শুরু করেছে ১২ আগষ্ট বৃহ¯প্রতিবার থেকে। সিয়াটল উত্তর আমেরিকার সর্ব পশ্চিমে সর্ব শেষ বড় শহর। এখানের রেডমন্ড নামে ছোট্ট জায়গাটিতে মাত্র তিনটি মসজিদ। এই তিনটি মসজিদের মধ্যে সাউথ এশিয়ান ডমিনেন্ট মসজিদে মুসল্লির সংখ্যা বেশী। কিন্তু এই মসজিদের ইমাম সাহেব একটি বিশেষ মতাদর্শের অনুসারী। তিন মসজিদের ইমামগন একত্রে মিলে বৈঠক করেছে; কিন্তু অনেক যুক্তি তর্ক দিয়েও এই বড় মসজিদের ইমাম সাহেবকে বুধবার থেকে রোজা রাখার ব্যাপারে রাজি করাতে পারেনি। এমনকি কিছু লোক চাঁদ দেখেছে বলে কসম কাড়লেও তাদের কথা গ্রাহ্য করা হয়নি। অগত্যা ঐক্যের খাতিরে সবাইকে বৃহস্পতিবার (ভুল দিন) থেকেই রোজা রাখতে হয়েছে। টরন্টোতেও এরকম ঐক্যের প্রচেষ্টা করা হয়েছিল অনেক বার। কিন্তু এই একই গুষ্টির অনমনীয় (আনকম্প্রোমাইজিং) মনোভাবের জন্য ঐক্য ধরে রাখা যায়নি। ফলে মুসলমানদের মধ্যে বিভ্রান্তি পরিহার করার সহজ উপায় হিসাবে আরব কমিউনিটি সহ অন্যান্য অনেকে মক্কা শরীফের সাথে একই দিন ইদ-রোজা পালন করে আসছে। নর্থ আমেরিকা পৃথিবীর সর্ব পশ্চিমে। মক্কা সৌদী আরবে অবস্থিত। সৌদী আরবের অবস্থান পৃথিবীর মাঝখান বরাবর। বিখ্যাত ‘গোল্ডেন রেশিও’ অনুযায়ী মক্কা পৃথিবীর কেন্দ্র বিন্দু। সৌদী আরবের সাথে নর্থ আমেরিকার সময়ের ব্যবধান আট থেকে এগার ঘন্টা। আবার বিপরীত দিকে বাংলাদেশ থেকে অষ্ট্রেলিয়ার পর্যন্ত এই ব্যবধান যথাক্রমে চার থেকে এগার ঘন্টা। মক্কার সাথে পৃথিবীর যে কোন স্থানের সময়ের ব্যবধান বার ঘন্টার নিচে। কোন স্থানের সাথে সময়ের ব্যবধান বার ঘন্টার নিচে থাকলে ঐ স্থান অনুসারে মাস শুরু করা যায়। এই পরিসংখ্যান মক্কা শরিফের সাথে একই দিন রোজা শুরু করার ব্যাপারে একটি উল্যেখযোগ্য তথ্য। অপর দিকে মক্কা ইসলামের কেন্দ্র বিন্ধু। কা’বা মুসলমানদের সর্বোচ্চ সম্মানিত তীর্থস্থান। কা’বা শরীফের ঠিক উপরে বায়তুল মামুর যার নিচ বরাবর আদম আ: কা’বা প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আর বেহেশতের ঠিক উপরে অবস্থিত রয়েছে আল্লাহ্র আরশ ও কুর্সি। আল্লাহ্ সকল সৃষ্টি কর্ম শেষ করে এই আরশ কুর্সিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সারা দুনিয়ার মুসলমান আমরা সবাই আল্লাহ্র দিকে ফিরে নামাজ পড়ে থাকি (ইন্নি অ’য্যাহ্তু অ’যহিয়া লিল্লাজি ফাতারাস্সামা অয়তি অল্ আরদ)। এবং আঠার হাজার মাখ্লুকাতকে সাথে নিয়ে আমরা হজ্জ্ব ওমরাহ্র মাধ্যমে এই কা’বাকে কেন্দ্র করেই আল্লাহ্কে তাওয়াফ করে থাকি প্রতিনিয়ত প্রতিদিন। কা’বা শরীফের অবস্থানও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আগেই বলা হয়েছে, দুনিয়ার কোন জায়গার সাথে কা’বা ও মক্কা শরীফের সময়ের ব্যবধান (টাইম ডিফারেন্স) বার ঘন্টার বেশী নয়। সময়ের ব্যবধান বার ঘন্টার কম থাকলে ইসলামের অনেক অনুষ্ঠানই একই দিন পালন করা সম্ভব। মাসের প্রথম দিনের চাঁদ পশ্চিম আকাশে উদিত হয়। তাই মক্কা শরীফে চাঁদ উদিত হয়েছে বলা হলে, কোন অবস্থাতেই বলা যায় না যে, উত্তর আমরিকায় চাঁদ উদিত হয়নি। মুসলিম একটি উম্মাহ। আর পৃথিবী এখন একটি গ্লোবাল ভিলেজ। কোন ভিলেজে যদি ধর্মপ্রান কোন একজন মুসলমান বলে যে সে চাঁদ দেখেছে, তাহলে সকল মুসলমানের চাঁদ দেখা হয়ে যায়। সিরিয়া মক্কা শরীফ থেকে পশ্চিম দিকে। সিরিয়ায় চাঁদ উঠলে মক্কায় চাঁদ উঠবে এটা স্বাভাবিক। তাই মক্কায় চাঁদ দেখা না গেলেও যখন একজন এসে বললেন যে সিরিয়ায় চাঁদ দেখা গিয়েছে, রাসুল স: মক্কায় রোজা ভাঙ্গার হুকুম দিয়েছিলেন। উত্তর আমেরিকা যেহেতু মক্কা শরীফ থেকে পশ্চিম দিকে, সঙ্গত কারনেই মক্কায় রোজা রাখা হলে উত্তর আমেরিকায় রোজা রাখা বাধ্যতা মূলক হয়ে যায়।

এবছর ১৯ জুলাই শুক্রবার থেকে রমজান রাখা শুরু হয়েছে। মক্কায় রোজা রাখার জন্য সৌদি সরকার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। ইসলামী বিধান অনুযায়ী, ঈদ রোজার ব্যাপারে যদি কোন দেশের, কোন সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, ঐ দেশের মুসলিম জনসাধারন তা মেনে চলতে বাধ্য। এমনকি সরকার যদি অমুসলিমও হয়, তবুও দেশের মুসলমান জনগনকে সরকারের নির্দেশ মেনে চলতে বলা হয়েছে। অবস্থানগত কারনে সৌদ আরব মুসলিম উম্মাহর অভিবাবক। কারন মক্কা মদিনা ইসলামের এই উল্লেখযোগ্য দুটি স্থান সৌদি সরকারের তত্ত্বাবধাধীন। কা’বা মক্কায় অবস্থিত। মুসলিম উম্মাহর সকল ধমীয় কর্ম কান্ড পরিচালিত হয় কাবাকে কেন্দ্র করে। সঙ্গত কারনেই তাই মুসলমানদের বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান গুলোর ব্যাপারে নীতি নির্ধরণী নির্দেষ দেওয়ার দায়িত্ব সেীদি সরকারের রয়েছে। আর সৌদী সরকারও এই দায়িত্ব পালন করার ব্যাপারে যতœবান বলেই আমার বিশ্বাস। তাই প্রতিবারের মত এবারও সৌদি সরকার রোজা শুরুর ব্যাপারে আগে ভাগেই ঘোষনা দিয়ে দিয়েছিল। সৌদী আরব চাঁদ দেখার সাথে সাথে এষ্ট্রনমিক্যাল তথ্যও বিবেচনা করে থাকে। আল্লাহ্ মহা বিজ্ঞানী। আমরা দুনিযাতে আল্লাহ্র প্রতিনিধি। আল্লাহ্ জ্ঞান বিজ্ঞানে পারদর্শী করে আমাদেরকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। এষ্ট্রলজিক্যাল তথ্য এখন সেকেন্ড মিনিটের হিসাবে সত্য হয়। হজ্জ্ব রোজা নামাজ অনেক কিছুই আমরা এই তথ্যের ভিত্তিতে পালন করে থাকি। চাঁদ যে স্থানে অবস্থিত থাকলে চাঁদ উদিত হয়েছে বলে মনে করা যায়, চাঁদ যদি ওখানে অবস্থান করে তাহলে সৌদী সরকারের সিদ্ধান্ত ভূল হয়নি। সৌদি সরকার শুক্রবার থেকে রোজা রাখার ঘোষনা দিয়েছে। সৌদি আরবের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নর্থ আমেরিকায় আরব কমিউনিটি সহ অনেকেই শুক্রবার থেকে রোজা শুরু করেছে। আর অন্যান্যরা, যারা মূলত সাউথ এশিয়ান বেইজড, তারা রমজান শুরু করেছে পরবর্তী দিন ২০ জুলাই শনিবার। বলা হয় যে, স্বচক্ষে চাঁদ দেখার বিষয়টিকে এরা বেশী গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তাদের মতে চোখে দেখে চাঁদের অবস্থান নিশ্চিত হলেই শুধু রমজান শুরু করা সম্ভব। কিন্তু প্রকৃত পরিস্থিতি দেখলে মনে হয় না যে, এই চোখে চাঁদ দেখার বিষয়টিই তাদের কাছে মূখ্য বিবেচ্য বিষয়। গতবছর রমজান মাসের এক দিন আগে বিকাল প্রায় সাতটার দিকে আমাকে টেলিফোনে আফসুস করে একজন জানালেন যে, এ বছরও বুঝি একই দিন রোজা শুরু করা সম্ভব হলো না। ভদ্রলোক সবার সাথে থাকেন এবং সবদিকে ভাল যোগাযোগ রাখেন। তাই বুঝা যায় বুধবার থেকে রোজা না রাখার সিদ্ধান্তটি চাঁদ দেখার আগেই নেওয়া হয়ে গিয়েছিল। বস্তুত: সব সময়েই দেখা যায় যে, আরব কমিউনিটি সহ  অন্যান্যরা যেদিন রোজা শুরু করে, সাউথ এশিয়ান বেইজড এই গ্র“পটি রোজা শুরু করে তার পরের দিন থেকে। ফলে এবছরও যে তারা শুক্র বারের পরির্তে যথারীতি শনিবার থেকে রোজা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এমনটা মনে করা অমুলক নয়। এমতাবস্তায় হেলাল কমিটির সিদ্ধান্তের কথাটি একটি অজুহাত কিনা তা ক্ষতিয়ে দেখা দরকার। হেলাল কমিটি যদি চোখে চাঁদ দেখার বিষয়টির উপর সত্যই বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন তাহলে  বাংলাদেশ ও উত্তর আমেরিকায় একই দিন চাঁদের জন্ম হলেও একই দিন চাঁদ দেখা যেতে পারে না এবং এই দুই দুরবর্তী স্থানে রোজা শুরু হতে পারে না একই সময়। তাই চোখে চাঁদ দেখার অজুহাত দাঁড় করিয়ে তারা এই দুই দুরবর্তী স্থানে একই দিন কিভাবে রোজা শুরু করেছে তা ভেবে দেখা দরকার। বস্তুত: ইসলামী ক্যালেন্ডার অনুযায়ী দিনের হিসাবে একই দিন হওয়াতে এবছর উত্তর আমেরিকায় যারা শনিরার খেকে রোজা রেখেছে তারা রোজা শুরু করেছে বাংলাদেশের চেয়ে এগার থেকে পনর ঘন্টা পর, এবং সৌদি আরব থেকে সাত থেকে এগার ঘন্টা পর। কারন বাংলাদেশ থেকে উত্তর আমরিকার সময়ের ব্যাবধান এগার থেকে পনর ঘন্টা, এবং সৌদি আরব থেকে আট থেকে এগার ঘন্টা। অর্থাৎ এদের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রথম রোজা শেষ করে যখন ইফতার খাওয়ার সময় হয় তখন এখানে প্রথম রোজার সেহরী খাওয়ার সময় হয় মাত্র। ঈদের অবস্থাও এই একই রকম। চাঁদ প্রথম উত্তম আমরিকা থেকে দেখা গেলেও উত্তর আমারিকাবাসী এই গ্র“পটি ঈদ করে থাকেন প্রকৃতপক্ষে শাওয়ালের চাঁদ জন্মের দ্বিতীয় দিন এবং মক্কা শরীফের হিসাব অনুযায়ী তৃতীয় দিন। এদের প্রধান কার্যালয নাকি দিল্লি-নিজামউদ্দীন। দিল্লি-নিজামউদ্দীনের নির্দেশে এই বিভক্তির জন্ম হয়ে থাকলে তা আমাদের জন্য অবশ্যই মঙ্গল জনক নয়। কারন মুসলমাদের জন্য মক্কা-মদিনা বাদ দিয়ে দিল্লি-নিজামউদ্দীন অনুশরন করার মধ্যে কোন বিচক্ষণতা বা উইজ্ডম নেই।

এখন দেখা যাক কোর’আন ও হাদিসে এই চাঁদের ব্যাপারে কি বলা হয়েছে। সুরা আল বাকারা ২/১৮৯ এ আল্লাহ্ বলেছেন ”লোকে তোমাকে নুতর চাঁদ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে। বলো, তা মানুষের সময় ও হজ্জ্বের সময় নির্দেশ করে”। আর সহী মুসলিম এর, ২৩৬৮ নং হাদিসে আবদল্লাহ বিন্ ওমর থেকে বর্ণিত রসূল স: বলেছেন, ”রমজান মাস ২৯ দিনেও হতে পারে; রমজানের চাঁদ না দেখে রোজা রেখ না, এবং শাওয়ালের চাঁদ না দেখে রোজা শেষ কর না। এবং যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে তখন হিসাব কর (এবং ৩০ দিন পূর্ণ কর)”। এই হাদিস অনুযায়ী কোন কারনে চাঁদ দেখা না গেলে হিসাব করতে বলা হয়েছে। ৩০ দিন পূর্ণ কর কথাটি ব্রাকেটের মধ্যে থাকায় মনে করা যায় যে, এটা হাদিস ব্যাখ্যাকারীর নিজের কথা। তবে এখানে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে হিসাব কর কথাটিই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। হিসাব বা ক্যালকুলেট বলতে বুদ্ধি বিবেচনার কথাই বলা হয়ে থাকে। জ্ঞান বিজ্ঞানের উন্নতি এখন এমন একটি মাত্রায় পৌঁছেছে যে, বুদ্ধি বিবেচনার মাধ্যমে চাঁদের উদয় অস্ত সম্বন্ধে এখন ১০০% নিশ্চিত হওয়া সম্ভব। তাই যদি নিশ্চিত ভাবে জানা যায় যে চাঁদ যেখানে অবস্থান করলে রোজা রাখা ফরজ হয়ে যায়, তখন যদি কম বুদ্ধি সম্পন্ন কোন ব্যক্তি মনে করে যে, যেহেতু সে চাঁদ দেখেনি এবং তার বুদ্ধিতে মনে হয়না যে চাঁদ উদিত হয়েছে; এমন নির্বোধ অন্ধদেরকে অনুসরণ করতে আল্লাহ্ নিষেধ করেছেন। চাঁদ যখন উদিত হয় কেহ না দেখলও চাঁদ তার অবস্থানেই অবস্থান করে। আমরা দৈনন্দিন জীবনের অনেক কাজই আত্মবিশ্বাসের সহিত বৈজ্ঞানিক তথ্যের উপর ভিত্তি করে সম্পন্ন করে থাকি। কোরবানীর কথাই ধরুন, চাঁদ দেখা যাক আর না যাক ‘আরাফাত দিন’ এর পরবর্তী দিন থেকে কোরবানী করা কি বাঞ্চনীয় নয় ? এস্ট্রনমি এখন এতটা উন্নত যে, এস্ট্রলজারগন দিন, ক্ষণ, মিনিট, সেকেন্ড  হিসাব করে অগ্রিম বলে দিতে পারেন চন্দ্রগ্রহন, সূর্যগ্রহনের মত প্রাকৃতিক ঘটনা (ফিনমিনন) গুলো কখন কোথায় ঘটবে। এবং এগুলো সব সময় ঠিক কথিত সময় সংগঠিত হতে দেখা যায়। নামাজের সময় সূচী এবং ইসলামের আরো অনেক কাজ কর্ম আমরা এস্ট্রলজিক্যাল হিসাব অনুযায়ী পালন করে থাকি। এই একই হিসাবের ভিত্তিতে চাঁদের উদয় অস্ত নির্ধারন করতে কোন অসুবিধা আছে বলে আমার মনে হয় না। আর যেহেতু এগুলো নির্ভর যোগ্য তথ্য ’রাসূল স: এর হিসাব করা’ বলতে আমরা এস্ট্রলজারদের এই হিসাবকেও অর্ন্তভূক্ত করতে পারি। ইসলাম জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চার ধর্ম। আল্লাহ্ জ্ঞান বিজ্ঞান দিয়ে পারদর্শী করে আমাদেরকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। মুসলমানদেরকে সর্ব ক্ষেত্রে উইজডম ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। আজকের দিনের মতো তখন যদি কেহ মোহাম্মদ স: কে হিসাব নিকাশ করে বলে দিতে পারতেন যে চাঁদ এখন যেখানে অবস্থান করছে তাতে চাঁদ উদিত হয়েছে বলা যায়, তিনি চাঁদ উদিত হয়েছে বলেই মনে করতেন। প্রাকৃতিক ফিনমিনন মেনে নেওয়ার মতো সামর্থ্য মোহাম্মদ স: এর ছিল। কথিত আছে, তাঁর ছেলের মৃত্যুর দিন সূর্য গ্রহন হয়েছিল, আর লোকজন বলাবলি করছিল যে, মোহাম্মদ স: এর ছেলের মৃত্যুতে সারা ইউনিভার্স শোক প্রকাশ করছে। কিন্তু তিনি বলেছিলেন চন্দ্র সূর্য গ্রহন এগুলো প্রাকৃতিক কর্মকান্ড (ফিনমিনন)। এগুলোর সাথে তাঁর ছেলের মৃত্যুর কোন সম্পর্ক নেই। ত্ই তিনি লোকদেরকে এমন কথা বলতে নিষেধ করেছিলেন। আল্লাহ নিজেও বলেছেন যে, তিনি চাঁদ সূর্যকে আমাদের জন্য নিদর্শন হিসাবে সৃষ্টি করেছেন। এদের গতি প্রকৃতি নির্ধারন করে দিয়েছেন আমাদের দিন, ক্ষণ, বছর গননার সুবিধার্থে। তাই চাঁদ যদি এমন স্থানে অবস্থান করে যেখানে থাকলে চাঁদ উদিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায়, তখন আমরা খালি চোখে না দেখলেও চাঁদ উদিত হয়েছে বলেই মনে করা উচিত। অপরদিকে, চাঁদ দেখে রোজা রাখ এবং চাঁদ দেখে রোজা শেষ কর এই কথার মধ্যেও মনে করার কারন নেই যে, দেখা বলতে শুধু চোখে দেখার কথাই বলা হয়েছে। আসলে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চাঁদের উদয় এর ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া। অপরদিকে, হাদিসে ত্রিশ দিন পূর্ণ করার যে কথা বলা হয়েছে তা যদি সঠিকও হয় তা হলে চোখে চাঁদ দেখার বিষযটি কি গুরুত্বহীন হয়ে যায় না ? এবং এর মধ্যেও কি থেকে যায় না ঈদের দিন রোজা রাখার সম্ভাবনা ? আসলে ধর্মপালনের ক্ষেত্রে ‘অভিপ্রায় বা ইন্টেন্শন’ টাই মুখ্য। আল্লাহ্ কাজের চেয়ে কাজের অভিপ্রায়ের প্রতি বেশী গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। মনে রাখবেন ইসলামকে পরিপূর্ণ করে সর্ব যুগের জন্য প্রযোজ্য করে দেওয়া হয়েছে। চৌদ্দশত বছর আগে আটকিয়ে রাখতে বলা হয়নি। জ্ঞান বিজ্ঞানের উৎকর্ষের সাথে সাথে মানুষের কাজের গতি প্রকৃতি পরিবর্তন হয়ে যায। ইসলাম কাজ হারাম করেনি, হারাম করেছে কাজ সম্পন্ন করার অবৈধ ধরন। আল্লাহ্র হুকুম মত সম্পন্ন করা হলে যে কোন কাজ হালাল হয়ে যায়, আর হুকুম মানা না হলে হালাল কাজও আর হালাল থাকেনা। মনে রাখবেন, বাপ-দাদা কি ভাবে ধর্ম পালন করেছেন তা আমাদের জন্য মূখ্য বিষয় নয়, আমাদের মুখ্য দায়িত্ব কোর’আর-সুনআহ্র অনুশরন করা। বিদায় হজ্জ্বে রসুল (সাঃ) আমাদেরকে বাপ-দাদা, পীর-মুরশাদ, এমনকি সাহাবী (রা’) গনকেও অনুশরনের কথা বলে জাননি; বলেছেন কোর’আন-সুন্নাহ্ অনুশরন করতে। কারন কোর’আন-সুন্নাহ্ অনুশরনের মধ্যেই রাখা হয়েছে মানুষের দুনিয়া-আখেরাতের সকল কামিয়াবী।

আল্লাহ্ সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী। সকল বিজ্ঞানের উৎস আল্লাহ্। আল্লাহ্ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিকল্পিত ভাবে তাঁর সৃষ্টি কার্য পরিচালনা করেন। এবং কোন কিছুই যথেচ্ছা পরিবর্তন করেন না। সকল মানুষের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সেই সৃষ্টির শুরু থেকেই এক। চাঁদ সূর্যের গতি প্রকৃতিও সেই অনাধিকাল থেকে একই রকম। মানুষ আল্লাহ্র প্রতিনিধি। সব প্রতিনিধিকে মালিক নির্দিষ্ট কাজের জন্য তার মত নির্দিষ্ট যোগ্যতা দিয়ে তৈরী করে থাকে। আল্লাহ্ও আমাদেরকে আমাদের দায়িত্ব পালন করার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান বিজ্ঞান দিয়ে পারদর্শী করেছেন। মোহাম্মদ স: জীবিত অবস্থায় আল্লাহর র্আশ পর্যন্ত যেতে পেরেছেন। আদম আ: এর মানুষ হিসাবে বেহেশতে থাকার যোগ্যতা ছিল। ঈসা আ: জীবিত মানুষ হিসাবেই এখনো বেহেশতে অবস্থান করছেন। আর আমাদের মতো সাধারন মানুষও এখন মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার যোগ্যতা রাখে। মুসলমানরাই একদিন দুনিয়াতে বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধন করেছিল। কিন্তু আমাদের দূর্ভাগ্য আজ আমরা বিজ্ঞানকে মেনে নিতে ভয় পাই। ধর্ম যখন রীতিনীতি (রিসুয়াল) এ পরিনত হয়ে যায় তখন অবস্থার এমনি অধ:পতন ঘটে। মহাকাশ গবেষনার হাতে খড়ি হয়েছিল মুসলমানদের হাতে। বিজ্ঞানের এখন এতটা অগ্রগতি হয়েছে যে, মানুষ এখন চাঁদ সূর্যের সঠিক অবস্থান ও সময়ের সুক্ষাতি সুক্ষ অগ্রিম হিসাব দিতে সক্ষম। এই হিসাব মতে যে দিন যে স্থানে যে সময় যা ঘটবে বলা হয়, দিন ক্ষণ সেকেন্ড মিনিটের হিসাবে তা এখন সঠিক হয়ে থাকে। মানুষ এখন প্রায় সকল ক্ষেত্রে এষ্ট্রোলজিকেল টাইম ব্যবহার করে থাকে সর্বোচ্চ আস্থার সহিত। কা’বা, মক্কা মদিনা  মুসলিম উম্মাহর সকল কর্মকান্ডের কেন্দ্র বিন্দু। সৌদী সরকার এই কেন্দ্রটি নিয়ন্ত্রন করে থাকে। তাই উম্মাহর সাথে সংস্লিষ্ট তথ্য সমূহ সকলকে আগেভাগে জানিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব তাদের রয়েছে। আর এই দায়িত্ব পালনের জন্য যদি তারা অথেন্টিক বৈজ্ঞানিক তথ্য ব্যবহার করে থাকে তাহলে মুসলিম একটি উম্মাহ হিসাবে আমাদের দ্বিমত থাকা উচিত নয়। বিজ্ঞান এখন যথেষ্ঠ উন্নত, এবং অনেক ক্ষেত্রেই বৈজ্ঞানিক  তথ্য অনেক বেশী সঠিক বলে প্রমানিত হতে দেখা যায়। বৈঞ্জানিক তথ্য ভিত্তিক সিদ্ধান্তের আর একটি সুবিধা রয়েছে এই যে, এতে ইগো ভিত্তিক জাতীয়তাবাদের উগ্রতা এভয়েড করা সহজ হয়। অধিকন্তু বিজ্ঞান যদি বলে, চাঁদ এমন স্থানে উদিত রয়েছে যে, এতে রোজা শুরু করা যায় অথবা ঈদ উৎযাপন করা যায়, তাহলে গায়ের জোরে তার অবস্থান পরিবর্তন করা সম্বব নয়। আর গায়ের জোরে তা অস্বীকার করলে অবশ্যই এমন সিদ্ধান্ত ভূল প্রতীয়মান হতে বাধ্য। অপরদিকে এটা যদি সত্য বলে প্রতীয়মান হয় যে, সৌদি আরবে চাঁদ ঠিকই উদিত হয়েছে, তাহলে উত্তর আমেরিকাতে চাঁদ যে উদিত হয়েছে তাতে সন্দেহ থাকার অবকাশ থাকেনা। ফলে সৌদি আরবে যেদিন রোজা শুরু করা হয় উত্তর আমেরিকাতে কোন অবস্থাতেই রোজা তার পরের দিন হতে পারেনা। অপরদিকে সৌদি আরবের সাথে বাংলাদেশের সময়ের ব্যবধান (টাইম ডিফারেন্স) মাত্র চার ঘন্টা এবং দুনিয়ার কোন জায়গারই সৌদি  আরবের সাথে সময়ের ব্যাবধান এগার ঘন্টার বেশী নয়। তাই সারা দুনিয়ার সকল মুসলমান আমরা এক উম্মাহ হিসাবে সৌদি আরবের সাথে ঈদ রোজার মতো অনুষ্ঠান গুলো একই দিন পালন করতে পারি।

অনেকে রোজার সাথে নামাজের সময় সূচীর তুলনা করে থাকে। বলা হয় সৌদী আরবের সাথে একই দিন রোজা শুরু করা হলে, সৌদি আরবের সময় নামাজ পড়া হয়না কেন। অনেকে আবার তাচ্ছিল্য করে বলে থাকে সৌদি আরবে বৃষ্টি হলে আমরা কি টরন্টোতে ছাতা ধরে থাকি। এটা একটি কথার কথা। কিন্তু আমাদেরকে  মনে রাখতে হবে যে, নামাজ রোজা যাকাত হজ্জ্ব এগুলো সবই আলাদা আলাদা আকিদা। এবং এক এক আকিদা প্রতিপালনের প্রয়োজন ও উদ্দেশ্য এক এক রকম। ইন্নামাল আ’মালা বিন্নিয়্যাত। তাই একটার সাথে আর একটা জড়িয়ে ফেলা ঠিক নয়। হজ্জ্বের দিন ক্ষণ সৌদি সরকারের সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হযে থাকে। নামাজের সময় নির্ধরিত হয় দিন-রাত্রি ও সূর্যের গতি পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে। অপরদিকে রোজা শুরু ও শেষ করা হয় আরবি মাসের হিসাবে চাঁদের গতি বিধির ভিত্তিতে। রোজার শুরু ও শেষের সাথে জড়িয়ে রয়েছে আরও কয়েকটি বিষয় যেমন, ১. রমজানে রোজা শুরুর আগে দু’একদিন নফল রোজা রাখা নিষেধ ২. ঈদের দিন রোজা রাখা হারাম ৩. লাইলাতুল কদর এর সন্ধান । রমজান মাস যদি সঠিক ভাবে শুরু ও শেষ করা না যায় তাহলে সব গুলো দিনই উলট পালট হয়ে যায়। হয়তো দেখা যাবে লাইলাতুল কদর যেদিন পালন করার কথা তা না হয়ে ভূল দিনে পালন করা হয়েছে। আর অবৈধ দিনে রোজা রেখে অযথা গুনতে হচ্ছে ক্ষতির খেসারত। দু’গ্র“প যখন দু’দিন রোজা শুরু করে সম্ভাবনা থাকে যে এক গ্র“প হয়তো শুরুতে নিষিদ্ধ দিনে রোজা রেখে ক্ষতির শীকার হয়ে যায়। আবার এমনও হতে পারে যে অন্য গ্র“প জোর করে ঈদের দিন রোজা রেখে গুনাহগার হয়ে গিয়েছে। আর যারা শুধু ২৭ রমজান লাইলাতুল কদর খোঁজ করে থাকে তাদের অনেকের পক্ষে হয়ত সারা জীবনেও এই মহিমান্নিত রাতটি খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে না। তাই যারা এই বিষয গুলোকে গুরত্বপূর্ণ মনে করে, তাদের রোজা শুরু ও শেষ করার বিষয়টিকে হালকা ভাবে নেওয়া ঠিক নয়। বিষয়টি গুরত্বপূর্ণ বলেই রাসুল স: চাঁদের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে রোজা শুরু ও শেষ করতে বলেছেন। যারা চোখে চাঁদ দেখার ব্যাপারে আপোষহীন, ত্রিশ রোজা পূর্ণ হয়ে গেলে অবশ্যই তারাও মনে করেন না যে চোখে চাঁদ দেখার বিষয়টি আসলেই খুব গুরত্বপুর্ণ। ভূলে যাওয়া ঠিক নয় যে, আল্লাহ্ এক, রাসুল এক, কা’বা এক, কোর’আন এক, চাঁদও মাত্র একটি এবং কদরের জন্যও রয়েছে একটি মাত্র রাত্রি। সর্বোপরি মুসলমান একটি উম্মাহর নাম। মনে রাখবেন দু’টি কন্ট্রাডিকশনের মধ্যে একটি ঠিক হয় এবং অন্যটি বেঠিক হয়; না হয় দু’টিই বেঠিক হয়। অমুসলমানদেরকে মুসলমান বানানোর দায়িত্ব দিয়ে আমাদেরকে দুনিয়ায় পাঠানো হয়েছে। মুসলমানরা আমরা একে অন্যের ভাই। এক ভাই অন্য ভাইকে সাহায্য করাই ভাইয়ের দায়িত্ব। আমাদের মধ্যকার কোন ইগোর কারনে এবাদতের গুরত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অস^ীকার করা ঠিক নয়। ইবলিশের আধিপত্য ছিল, লাখ লাখ বছরের এবাদত ছিল। কিন্তু তার ইগো তাকে জাহান্নাম থেকে বাঁচতে দেয়নি। খেয়াল রাখতে হবে যে, ইবলিশের মতো পর্বত পরিমান সাওয়াব নিয়ে আমাদেরকেও যেন তার সাথে জাহান্নামে যেতে না হয়। মুসলিম উম্মাহ্’র মধ্যে যারা বিভক্তি সৃষ্টি করে তারা উম্মাহ্ থেকে বহি®কৃত হয়ে যায। এবং এদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আল্লাহ্ একান্ত ভাবে নিজের হাতে রেখে দিয়েছেন (সুরা আন’আম ৬/১৫৯)। মনে রাখবেন, চাঁদ দেখা না দেখার উপর ভিত্তি করে কারো জান্নাত জাহান্নাম নির্ধারন করা হবে না। জান্নাত জাহান্নাম নির্ধারিত হবে হেদায়েত মানা না মানার ভিত্তিতে।

2574 জন পড়েছেন

About ওয়াহিদুর রহমান

লেখক একজন কষ্ট এন্ড ম্যানেজমেন্ট একাউন্ট্যান্ট। ইসলামের মৌলিক বিধি-বিধানের উপর গবেষনা মূলক চিন্তা ভাবনা করে থাকেন। কম্পারেটিভ ধর্ম চর্চা লেখকের একটি পুরনো অভ্যাস। লেখকের গবেষনা মুলক গ্রন্থ ‘ইসলাম ও আমাদের দৈনন্দিন জীবন’ সমাপ্তির পথে। বইটি টরন্টস্থ বাংলা সাপ্তাহিক ‘দেশের আলো’ পত্রিকায় অনেকদিন থেকে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। লেখক টরন্টস্থ ’বৃহত্তর নোয়াখালী এসোসিয়েশন ওন্টারিও’ এর বর্তমান প্রেসিডেন্ট।

Comments

রমজানের প্রথম চাঁদ বছরে একদিনই উদিত হয় — ৩ Comments

  1. I have read the article of Mr. Wahidur on moon sighting. Though Wahidur is an accountant by profession his knowledge on Islamic aspects is praise worthy. Yes it is highly desirable to have a common conclusion on important aspects in Islam but Mr. Wahidur forgets that it never happend. Thats why different madhabs and schools of islamic thought evolved.

    I addition he mentioned in this writing that Profet (SAM) did not ask us to follow Sahabah (R) in his speech of last Haj and the way Wahidur mentioned this is questionable and does not go with the respects Sahabah (R) deserve. So, Wahidur should be careful enough before writing something about Sahabah(R). He also tried to mention about a group and it is assumed that he wanted say about Tablig. So, it is not possible that Wahidur does not know about Tablig then also he mentioned only “a group”is not decent. He also should know that there are many scholars in Tablig as well. Hope he will rectify in his future writing.

  2. বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে সমাজে প্রচলিত এলাকা ভিত্তিক আমলকে প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য কিছু সংখ্যক ওলামাই কিরাম হাদিসে কুরাইব (রাঃ) নামে প্রসিদ্ধ একটি হাদীসকে দলীল পেশ করেন। উক্ত হাদিসটি নিম্নরূপঃ
    “কুরাইব তাবেঈ বলেছেন, যে হারিসের কন্যা (লুবা-বা) তাকে শাম প্রদেশে সম্রাট মুআবিয়ার নিকট পাঠিয়ে দিলেন। অতঃপর আমি শামে এসে তাঁর প্রয়োজন সমাপন করলাম এবং আমার শামে থাকা অবস্থায় রামাযানের নতুন চাঁদ উদয় হল এবং আমি বৃহস্পতিবারের দিবাগত সন্ধ্যায় চাঁদ দেখলাম, তারপর মদীনা আসলাম; অতঃপর আমাকে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) জিজ্ঞেসা করলেন যে, তোমরা (রামাযানের) চাঁদ কবে দেখেছ? আমি বললাম, জুমুআ রাত্রিতে; পুনরায় বললেন যে, তুমি নিজে দেখেছ? আমি বললাম, জি হ্যাঁ এবং অন্যান্য লোকেও দেখেছে এবং মুআবিয়া ও শামবাসীরা রোযা রেখেছেন। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বললেন, আমরা কিন্তু শুক্রবারের দিবাগত সন্ধ্যায় চাঁদ দেখেছি, অতএব আমরা রোযা রাখতেই থাকব। ৩০-এ পর্যন্ত কিংবা ৩০শের পূর্বে ২৯শে চাঁদ দেখা পর্যন্ত। আমি বললাম, আপনি কি মুআবিয়ার চাঁদ দেখা ও তাঁর রোযা রাখার উপর নির্ভর করতঃ রোযা ও ঈদ করবেন না? ইবনে আব্বাস (রাঃ) বললেন, না; এটাই আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আদেশ দিয়েছেন যে আমরা আপন দেশের লোকের চাঁদ দেখার উপর নির্ভর করব; অন্যান্য দূর দেশবাসীদের চাঁদ দেখাকে আমরা যথেষ্ট মান্য করব না।”[মুসলিম শরিফ]”
    পবিত্র হাদীসটির জবাব সুবিজ্ঞ মুহাদ্দেসীনে কিরাম এবং হানাফী, হাম্বলী ও মালেকী মাযহাবের ইমামগণ অত্র হাদিসে পাককে দলীল হিসেবে গ্রহণ না করে হাদিসটির নিম্নরূপ জবাব দান করেছেন-

    ১।

    অত্র ফাতওয়ার ১০ পৃষ্ঠায় “রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম-এর নিজ আমল” শিরোনামে পবিত্র মিশকাত শরীফের ১২৭ ও ১৭৪ পৃষ্ঠা থেকে যে তিনটি হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে তার দ্বারা প্রমাণিত যে, রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম একজন মরুচারীর সংবাদকে ভিত্তি করে নিজে রোযা রেখেছেন এবং অন্যদেরকে রোযা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। দূরদূরান্ত থেকে আগত একটি কাফেলার সংবাদের ভিত্তিতে ৩০শে রমযান মনে করে রাখা রোযা নিজে ভঙ্গ করেছেন এবং অন্যদেরকেও ভাঙ্গার নির্দেশ দিয়েছেন।
    তাহলে যেখানে শরীয়ত প্রবর্তক নিজেই অন্যের সংবাদ গ্রহণ করে রোযা রেখেছেন এবং ঈদ করেছেন। সেখানে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু কুরাইব রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর সংবাদ গ্রহণ করলেন, কি করলেন না তা কোন যুক্তিতেই দলীল হতে পারেনা।

    ২।

    রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র আমল বিষয়ক উক্ত হাদীস তিনটি হাদিসে মারফু। (মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথা ও কাজ), আর কুরাইব রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর হাদীস হচ্ছে হাদিসে মাওকুফ। (সাহাবীগণের কথা ও কাজ) অতএব অছুলে হাদীস বা হাদীস ব্যাখ্যার মূলনীতি অনুযায়ী হাদিসে মারফুর মোকাবিলায় হাদিসে মাওকুফ কখনও দলীল হতে পারেনা।

    ৩।

    হাদিসে কুরাইব (রাঃ)-এর মধ্যে هكذا امرنا النبى صلى الله عليه وسلم এবং فلانزال نصوم حتى نكمل ثلثين اونراه বিশেষ উক্তি দু’টি মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম-এর নয় বরং অত্র উক্তিদ্বয় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর নিজস্ব উক্তি। তাই কোন সাহাবীর নিজস্ব উক্তি কখনই কুরআনের সুস্পষ্ট আয়াত এবং মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম-এর নির্দেশ ও আমলের বিপরীতে দলীল হতে পারেনা।

    ৪।

    হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু তার উক্তিদ্বয় দ্বারা মূলত ইঙ্গিত করেছেন রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম-এর বাণী- لاتصوم حتى تروه ولاتفطرو حتى تروه এবং صوموا لرؤيته وافطروا لرؤيته এর দিকে। আর রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম-এর এ বাণীর আমল উম্মতগণ কিভাবে করবেন তা মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম নিজ জীবদ্ধশায়ই আমল করে দেখিয়ে গেছেন। তাহলো সকলকে চাঁদ দেখতে হবে না বরং কিছু সংখ্যকের দেখাই অন্যদের দেখার স্থলাভিষিক্ত হবে। অতএব ইবনু আব্বাস রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর উক্ত উক্তিদ্বয় দ্বারা নিজ নিজ এলাকায় চাঁদ দেখে আমল করতে হবে এ ব্যাখ্যা ঠিক নয়।

    ৫।

    ছহীহ মুসলিম শরীফের বর্ণনায় কুরাইব রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর চাঁদ দেখার স্বীকৃতি মূলক শব্দ نعم رأيته “হ্যা আমি চাঁদ দেখেছি” কথাটির উল্লেখ থাকলেও তিরমীযী সহ অন্যান্য বর্ণনায় কুরাইব (রাঃ) নিজে চাঁদ দেখেছেন এরকম শব্দের উল্লেখ নেই। ফলে অত্র হাদিসটি مضطرب বা মূল ভাষ্য কম-বেশী হওয়ায় স্পষ্ট মারফু হাদিসের বিপরীতে কখনই দলীল হতে পারেনা।

    ৬।

    আল্লামা শাওকানী (রঃ) তার লিখিত “নাইলুল আওতার” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, হযরত কুরাইব রাদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর সংবাদ এবং শামবাসীর চাঁদ দেখাকে গ্রহণ না করা এটা আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর নিজস্ব ইজতিহাদ। যা সার্বজনীন আইন হিসেবে প্রযোজ্য নয়।

    ৭।

    আল্লামা ইবনু হুমাম (রঃ) ফতহুল কাদীরে এবং আল্লামা ইবনু নাজীম (রঃ) বাহরুর রায়েক-এর মধ্যে উল্লেখ করেছেন যে, পরিষ্কার আকাশে পবিত্র রমযানের চাঁদ দেখা প্রমাণিত হওয়ার জন্য শরয়ী পদ্ধতি হচ্ছে ৪টি। একঃ দু’জন আকেল, বালেগ ও স্বাধীন মুসলিম সাক্ষ্য দিবে, দুইঃ উক্ত গুণে গুণান্বিত দু’জন, অনুরূপ দু’জনের চাঁদ দেখার প্রতি সাক্ষ্য দিবে। তিনঃ অনুরূপ গুণে গুণান্বিত দু’ ব্যক্তি চাঁদ দেখায় কাজীর ফয়সালার প্রতি সাক্ষ্য দিবে। চারঃ চাঁদ দেখার খবর মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রচার পেয়ে দৃঢ়তার পর্যায়ে এমন ভাবে পৌঁছে যাবে যাকে মিথ্যা বলে ধারণা করা যায়না।

    কিন্তু শামবাসীর চাঁদ দেখার সংবাদ কুরাইব রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু কর্তৃক অত্র চার পদ্ধতির কোন পদ্ধতিতেই ইবনু আব্বাস রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর নিকট উপস্থাপিত হয়নি। তাই শরয়ী বিচারে তিনি উক্ত সংবাদ গ্রহণ করেননি।

    ৮।

    আল্লামা ইবনু ক্বুদামাহ্‌ (রঃ) তার মুগণী কিতাবে এবং শাইখুল হিন্দ হোসাইন আহমদ মাদানী মায়ারিফুল মাদানিয়া-এর মধ্যে উল্লেখ করেছেন যে, যদিও ইবনু আব্বাস রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর সাথে কুরাইব রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর আলোচনা হয়েছিল রমজানের চাঁদ দেখা নিয়ে কিন্তু এর প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া পড়ছিল অত্যাসন্ন ঈদুল ফিতরের উপর। কারণ উক্ত হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কুরাইব রাদি আল্লাহু তায়ালা আনহু রমযানের শেষের দিকে শাম থেকে মাদিনায় এসে ছিলেন। আর শরীয়তের সিদ্ধান্ত মোতাবেক কমপক্ষে দু’জনের সাক্ষী ছাড়া রোযা ছেড়ে ঈদ করা যায়না। তাই ইবনু আব্বাস রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু একজনের সাক্ষ্য গ্রহণ না করে বলেছিলেন- هكذا امرنا النبى صلى الله عليه وسلم এবং فلانزال -نصوم حتى نكمل ثلثين اونرا

    —– (দেখুনঃ তানযীমুল আশতাত, খন্ড-২, পৃঃ-৪১, মিফতাহুন্নাজ্জাহ, খন্ড-১, পৃঃ-৪৩২,মায়ারিফুল মাদানিয়া, খন্ড-৩, পৃঃ-৩২-৩৫)

    ৯।

    হযরত ইবনু আব্বাস রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর আমলকে দলীল গ্রহণ করে, যে সকল পূর্ববর্তী আলেমগণ এলাকা ভিত্তিক আমলের সপক্ষে মতামত দিয়েছেন তারা প্রায় সকলেই একথা বলেছেন যে, নিকটবর্তী দেশ বা অঞ্চলে চাঁদের উদয় স্থলের ভিন্নতা গ্রহণীয় হবে না। এক স্থানের দেখা দ্বারাই সকল স্থানে আমল করতে হবে। আর যদি চাঁদ দেখার দেশটি চাঁদ না দেখার দেশ থেকে অনেক দূরে হয় তাহলে সে ক্ষেত্রে যার যার দেখা অনুযায়ী আমল করতে হবে। একটু গভীর ভাবে লক্ষ্য করলে সকলের নিকটই একথা সূর্যালোকের মত পরিষ্কার যে, এক দেশের চাঁদ দেখার সংবাদ অন্য দেশ থেকে গ্রহণ করা না করার দিক থেকে ঐ সকল সম্মানিত ওলামাই কিরাম পৃথিবীকে নিকটবর্তী ও দূরবর্তী এ দু’ভাগে ভাগ করার কারণ হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থার সমস্যা। তাদের যুগে যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে তাদের এ মতামত ঐ যুগের জন্য যুক্তিযুক্ত এবং যথার্থ ছিল। কিন্তু পূর্ববর্তী সম্মানিত ওলামাই কিরামের ঐ মতামত বর্তমানে দু’টি, কারণে গ্রহণ যোগ্য নয়।

    এক: যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির কারণে বর্তমান পৃথিবীর বিপরীত মেরুর দেশ দু’টিও তাদের যুগের পাশাপাশি অবস্থিত দু’টি জেলা শহরের চেয়েও অধিক নিকটবর্তী। সুতরাং আজকের যোগাযোগ ব্যবস্থায় দূরবর্তী দেশ বলতে আর কোন কথা নেই।

    দুই: তারা যে ওজর বা বাধ্যবাধকতার কারণে এ মতামত দিয়েছেন আজকের বিশ্ব ব্যবস্থায় সে ওজর সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।

    ১০।

    চার মাযহাবের সুবিজ্ঞ ইমামগণের প্রত্যেকেই হাদীস শাস্ত্রে গভীর পান্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। অতএব কুরাইব রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর বর্ণিত হাদীস তাদের জানা ছিলনা এমনটা ভাবা যায়না। তাই তারা জেনে বুঝেই রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম-এর আমলমূলক হাদীসের উপর ফাতওয়া দিয়েছেন যা সার্বজনীন আইন হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। আর তারা কুরাইব রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর হাদীসকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে গণ্যকরে পবিত্র কুরআন, হাদীস এবং রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম-এর নিজ আমলের ভিত্তিতে ফাতওয়া দিয়েছেন যে, “চাঁদের উদয় স্থলের ভিন্নতা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। বরং পৃথিবীর যে কোন স্থানে প্রথম চাঁদ দেখার ভিত্তিতে সমগ্র পৃথিবীতে এক কেন্দ্রিক তারিখ গণনা করতে হবে এবং একই দিনে সকলের উপর আমল করা জরুরী হবে।”

    প্রসংগত উল্লেখ্য যে, ইমাম যায়লায়ী (রহঃ) ৬ষ্ঠ স্তরের ফকীহ। তাই তিনি মুজতাহিদ ফিদ্‌ দ্বীন নন বরং একজন মুকাল্লিদ। অতএব একজন মুকাল্লিদ হিসেবে নিজ ইমামের সিদ্ধান্তের অনুসরণই তার জন্য যুক্তিযুক্ত। তিনি নিজেই وهو قول اكثر المشائخ বলে স্বীকার করেছেন যে বেশীর ভাগ ফকীহ উক্তমত গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তার সমসাময়ীক সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে চাঁদ উদয়ের সংবাদ দেয়া-নেয়ার সমস্যার সমাধান কল্পেই তিনি নিকটবর্তী দেশ এবং দূরবর্তী দেশ অনুসরণের ফাতওয়া দিয়েছিলেন। বর্তমানে যোগাযোগ ব্যবস্থার কোন অসুবিধা না থাকায় সম্মানিত ইমামগণের কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক মূল সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমলের কোন বিকল্প নেই।

    ১১।

    যদি সমস্ত বাহাছ তর্ক পরিহার করে হাদিসে কুরাইব-এর ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন দিনে রোযা ও ঈদ মেনে নেওয়া হয় এবং কুরআন, সুন্নাহ ও ফিকহের উল্লেখিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রোযা, ঈদ, কুরবানীসহ চাঁদের তারিখ সংশ্লিষ্ট ইবাদাত সমূহ সমগ্র বিশ্বে একই দিনে অনুষ্ঠিত না হয় তাহলে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এমন সব জটিল সমস্যার সৃষ্টি হবে যার কোন সমাধান নেই। নিম্নে এরকম প্রধান প্রধান কিছু সমস্যা তুলে ধরা হল-

    এক: বাংলাদেশে বর্তমান প্রচলিত আমলের কারণে পবিত্র রমযানের প্রথম দিকের এক বা দুই দিনের রোযা আমরা কখনই পাইনা। কারণ মাসয়ালা মতে আমাদের এক বা দু’দিন পূর্বেই পবিত্র রমযান মাস শুরু হয়ে যায়। এটা জেনেও আমরা ঐ এক বা দু’দিন ফরয রোযা রাখিনা।

    দুই: মাসয়ালা অনুযায়ী সমগ্র পৃথিবীতে যেদিন পহেলা শাওয়াল হিসেবে ঈদ পালন হয় আমরা সেদিন ২৯ বা ৩০ রমযান হিসেবে রোযা রাখি। অথচ সর্ব সম্মত মতে ঈদের দিনে রোযা রাখা হারাম। জেনে শুনে ঐ দিন রোযা রাখা জায়েজ মনে করলে ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী ঐ ব্যক্তির ঈমান চলে যাবে। কারণ সে হারামকে হালাল মনে করে কার্য সম্পাদন করেছে।

    তিন: বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় প্রতিদিনই এক দেশ থেকে অন্য দেশে বহু লোক যাতায়াত করছে। এ ধারাবাহিকতায় মধ্য প্রাচ্যসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশে রোযা শুরু করে বাংলাদেশে এসে ঈদ করলে ঐ ব্যক্তির রোযা হবে ৩১ বা ৩২টি। আবার বাংলাদেশে রোযা শুরু করে অন্য দেশে গিয়ে ঈদ করলে ঐ ব্যক্তির রোযা হবে ২৭ বা ২৮টি। অথচ হাদীস শরীফে বলা হয়েছে আরবী মাস ২৯-এর কম হবেনা এবং ৩০-এর বেশী হবেনা। তাই পবিত্র ইসলাম ধর্মে ২৭, ২৮ অথবা ৩১, ৩২টি রোযার কোন বিধান নেই। বাংলাদেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদ সাহেব কোরিয়াতে ঈদের নামায পড়ে এসে দেখেন বাংলাদেশে আরও একদিন রোযা বাকী। এধরনের সমস্যার সমাধান কখনই সম্ভব নয়।

    চার: হাদীস শরীফের ভাষ্য অনুযায়ী তাকবীরে তাশরীক বলা শুরু করতে হবে আরাফার দিনের ফজর নামায থেকে। কিন্তু আমাদের দেশে উক্ত তাকবীর বলা শুরু করা হয় এখানকার স্থানীয় ৯ই জিল-হাজ্জ। যে দিন সারা পৃথিবীতে ১০ বা ১১ জিল-হাজ্জ। ফলে ঐ দিনটি আরাফার দিনতো নয়ই বরং আরাফার দিনের পরের দিন বা তৎপরবর্তী দিন। তাহলে ফলাফল দাড়ালো বাংলাদেশের স্থানীয় তারিখ অনুসরণের কারণে আমাদের পাঁচ বা দশ ওয়াক্ত নামাজের ওয়াজিব তাকবীর ছুটে যাচ্ছে। আবার শেষ দিকে গিয়ে এমন এক বা দু’দিন তাকবীর বলছি যখন আমলটির ওয়াজিব আর বাকী নেই।

    পাঁচ: যে সকল সম্মানিত ভাইয়েরা একাধিক পশু কুরবানী দেন, তাদের অনেকেই বাংলাদেশের স্থানীয় ১১ ও ১২ জিল-হাজ্জ তারিখে কুরবানী দিয়ে থাকেন। কিন্তু কুরআন, সুন্নাহর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঐ সময় সারা বিশ্বে ১৩ বা ১৪ জিল-হাজ্জ। (যদি চাঁদ দেখায় ২দিনের তারতম্য হয়)। তাহলে ফলাফল দাঁড়ালো তাদের দু’দিনের কুরবানী-ই বিফলে যাচ্ছে। কারণ কুরবানী করার সময় ১০ থেকে ১২ জিল-হাজ্জ। ১৩ ও ১৪ জিল-হাজ্জ কুরবানী করা যায়না।

    ছয়: রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন যে, আরাফার দিনে রোযার ব্যাপারে আমি আল্লাহর উপর এ বিশ্বাস রাখি, ঐ দিনের রোযার বিনিময়ে আল্লাহ পাক রোযাদারের পূর্ববর্তী এক বছর এবং পরবর্তী এক বছরের গুনাহ্‌ ক্ষমা করে দেন।

    —– (মুসলিম শরীফ, খন্ড-১, পৃঃ-৩৬৭)

    পবিত্র হাদীস ঘোষিত এ মহান পূন্য লাভের আশায় অগণিত মুসলিম নর-নারী বাংলাদেশের স্থানীয় ৯ জিল-হাজ্জ রোযা রাখেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল ঐ দিন মক্কা মোয়াজ্জেমা সহ সারা বিশ্বে ১০ বা ১১ জিল-হাজ্জ। অর্থাৎ কোন ভাবেই ঐ দিনটি আরাফার দিনতো নয়ই বরং কুরবানীর দিন বা তাশরীকের প্রথম দিন। যে দিন গুলোতে রোযা রাখা চার মাযহাবের সকল ইমাম ও আলেমের ঐক্যমতে হারাম। তাহলে ফল হল স্থানীয় চাঁদ দেখার হিসেবে একটি নফল রোযা রেখে হারামে নিমজ্জিত হচ্ছেন অগণিত মুসলিম নারী-পুরুষ।

    সাত: পবিত্র লাইলাতুল ক্বদর, লাইলাতুল মি’রাজ এবং লাইলাতুল বারায়াত আল্লাহর নিকট এক একটি সুনির্দিষ্ট রাত। যা সমগ্র বিশ্বের সকল মানুষের জন্য একই রাতে সংগঠিত হয়। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন দিন এ রাত গুলো নির্ধারণ করার ফলে এসকল রাতের ফযীলত থেকে দেশবাসীকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। যখন সংবাদ পৌঁছেনি তখন স্থানীয় চাঁদ দেখার ভিত্তিতে এসব পর্ব পালন ওজর হিসেবে যুক্তিযুক্ত ছিল। কিন্তু বর্তমানে সে ওজর নেই।

    আট: আল্লাহ পাক এরশাদ করেন “নিশ্চয়ই আমি এ কুরআনকে নাযিল করেছি ক্বদরের রাতে।”—– (সুরাহ আল ক্বদর)

    পবিত্র লাইলাতুল ক্বদর আল কুরআন ঘোষিত একটি মর্যাদাপূর্ণ রাত। যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। আমরা যারা একদিন পরে রোযা শুরু করি আমরাতো কখনই ঐ রাত পাইনা। কারণ আরব বিশ্বে যেদিন বেজোড় রাত আমাদের দেশে সেদিন জোড় রাত। তাদের বেজোড় রাত হিসাবে ক্বদর হলে আমরা কখনই ক্বদর রাত পেতে পারিনা। কারণ এ রাত তো একটিই। যা অঞ্চলের ভিন্নতায় কয়েক রাত মেনে নেয়া হাস্যকর বৈকি?

  3. আপনার সুচিন্তিত লেখাটি পড়লাম। বিজ্ঞান সম্মত ভাবে ইসলামিক সব অনুষ্ঠানের দিন তারিখ নির্দিষ্ট করে দেয়া গেলে সেটা ইয়ার প্ল্যানিং এর জন্য খুব ভালো হয়। কিন্তু পবিত্র কোরানে বলা হয়েছে চাঁদ দেখে রোজা রাখতে এবং আমাদের নবী (সাঃ) ও চোখে চাঁদ দেখেই রোজা রাখা ও ঈদ পালন করেছেন।তিনি কখনো কোনো জ্যোতির্বিদ, গণক বা অন্য কনো পন্থা অবলম্বন করেননি, এমনকি এ বিষয়ে কখনো তাঁর মোজেজা ও ব্যবহার করেননি। এ বিষয়ে আপনার সুচিন্তিত মতামত জানালে উপকৃত হবো।