আমেরিকার জীবনঃ আলো-আঁধারের বয়ান

ছাটবেলা থেকেই আমেরিকা আসার স্বপ্ন দেখতাম। পৃথিবী নামক গ্রহের উল্টো দিকের এদেশ সম্পর্কে তখন বিশেষ কিছু জানতাম না, তবে লোকমুখে শোনে আর পত্রপত্রিকা পড়ে এটুকু বুঝেছিলাম, ‘সম্পদ আর প্রাচুর্যের এক বিশাল দেশ আমেরিকা’। তখনকার সেই জানাটা যে ভুল ছিল না, যারা একবার আমেরিকার মাটিতে পা রেখেছেন তারা বোধ করি কেউই অস্বীকার করবেন না। এদেশে কারো খাওয়াপরার অভাব নেই। আমেরিকার মূদ্রা এতই শক্তিশালী, এখনো সুপারমার্কটে ৫০ ডলারের গ্রোসারি কিনলে দুই ব্যাগ ভরে যায়। দুই হাতে ভরা ব্যাগগুলো বাড়িতে বয়ে আনতে রীতিমত কষ্ট হয়। ‘হোমলেস-হাঙরি’ বলে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে মুষ্টিমেয় যে কয়জন লোক ভিক্ষা করে, তারা হয় অপ্রকৃতিস্ত, মানসিক রোগী, অথবা মাদকাসক্ত। স্বাভাবিক স্বাস্থ্যবান একজন মানুষের পক্ষে এদেশে উপোস করার কোনো কারণ নেই। এখানে, সাবসিডি, ভাউচার, ডিরেক্ট ক্যাশ, ভেটারান্স বেনিফিটস্, ইল্নেস ডিসেবিলিটি, আনএমপ্লোয়মেন্ট বেনিফিটস্, ফুড স্ট্যাম্প, উইক, ইত্যাদি বিভিন্ন ধরণের সরকারি ওয়েলফেয়ার প্রোগ্রাম আছে। তার ওপর আছে চার্চগ্র“পের দাতব্য ব্যবস্থা।

কাপড়চোপড়ের ব্যাপারেও আমেরিকায় কারোরই অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। ধনীরা ‘স্পেশাল্টি স্টোর’ থেকে দাম দিয়ে কাপড় কিনেন বটে, কিন্তু আবার গরিবদের জন্য অতি সূলভ মূল্যের বস্ত্রবিতানেরও অভাব নেই। কিছু কিছু দোকানে নতুনের মত লাগে এরকম ‘ব্যবহৃত পুরোন কাপড়’ বিক্রি হয় একেবারে ছ’কড়া ন’কড়া দামে। যাদের মাথার ওপরে ছাদ নেই, তাদের জন্য বড় বড় শহরে সাবসিডাইজড্ গভর্ণমেন্ট হাউজিং আছে এবং সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সরকারি ও বেসরকারি শেল্টার হোম যেখানে গৃহহীনদের থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা থাকে বারমাস। চিকিত্সা সেবায় মানের দিক থেকে আমেরিকা বিশ্বের সেরা, কিন্তু ব্যয়বহুলতা, সার্বজনীনতা, ও প্রাপ্যতায় অন্যান্য উন্নত দেশের চেয়ে এদেশ বেশ পেছনে, তথাপি প্রাইভেট ইনসুরেন্স, সরকারি মেডিক্যাইড- মেডিকেয়ার, ও অন্যান্য দাতব্য সেবা মিলিয়ে মোটামুটি একটা ব্যবস্থাও আছে অধিকাংশ মানুষের নাগালের ভেতর। দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা এদেশে অবৈতনিক, বাধ্যতামূলক এবং সার্বজনীন। একটি পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় রাষ্ট্র যে এভাবে মানুষের মৌলিক চাহিদা পুরণ করতে পারে সেটা নিজ চোখে দেখার আগে বিশ্বেস করতাম না।

আমি প্রথম যখন এদেশে আসি শহরের আবাসিক এলাকায় মানুষের বাড়িঘর দেখলে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। ছোট হউক বড় হউক, নতুন হউক আর পুরনো হউক, সবগুলো বাড়ি ছিমছাম, সাজানো গোছানো, ছবির মত পরিপাটি। বাড়ির সামনে এক কী দুই চিলতে ফুলের বাগান, সবুজ ঘাস, ঘাসে আগাছা নেই, গাছের ঝরা শুকনো পাতাও নেই, মনে হয় যেন বাড়ির সামনে কেউ বিছিয়ে দিয়েছে একখানা ঘন সবুজ কার্পেট। মোটামুটি ধনী গরিব সবার বাড়িতে শীতে আছে হিটিংএর ব্যবস্থা এবং গরমে অনবরত চলে এসি। ঝড়তুফান না হলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুত্ সরবরাহে কোনো সমস্যা হয় না। হামেশা সবার ঘরের ট্যাপে বিশুদ্ধ গরম ও ঠান্ডা পানির মিশেল পাওয়া যায়। যারই বাড়িতে গ্যারাজ আছে তারই অন্তত একখানা গাড়ি তো আছেই। ইনারসিটিতে যাদের গাড়ি নেই বা যারা গাড়ি রাখেন না, তাদের চলাফেরার জন্য বাস, ট্রেন, সাবওয়ে, মেট্রো, ইত্যাদি পর্যাপ্ত পাবলিক ট্র্যান্সপোর্ট আছে। তার ওপর ট্যাক্সি-ক্যাব তো রয়েছেই। ঘরে নিত্য ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় ইলেকট্রোনিক অ্যাপ্লায়েন্সেজ অর্থাত্ ফ্রিজ, ডিপফ্রিজ, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, ইলেকট্রিক ইস্ত্রি, ইলেকট্রিক অথবা গ্যাসের চুলো, ওভেন, ডিস ওয়াশার, এবং কাপড় কাচার ও ভেজা কাপড় শুকোবার ম্যাশিন, টিভি, ডিভিডি প্লেয়ার, নানা জাতের ভিডিও গেমস, ইত্যাদি আছে সবার আয়ত্বে।

আমেরিকায় আইনের শাসন সত্যি সত্যি কড়া। বিচার বিভাগ বাংলাদেশের মত দলীয়করণে দুষ্ট নয়। পুলিশ সত্যিকারভাবেই মানুষের বন্ধু। এদেশের রাজনীতিতে বাংলাদেশের মত টানাহ্যাঁচড়া– এবং খিস্তিখেউড়ের কোনো অবকাশ নেই। অর্থনীতি সমৃদ্ধ এবং ধীর হলেও গতিশীল, অবশ্য আপাতত সঙ্কটাপন্ন। অবকাঠামো উন্নত ও পরিপূর্ণ যদিও রিপেয়ার এবং মেইন্টিন্যান্স প্রয়োজন। ‘অকুপাই ওয়ালস্ট্রিটে’র মৃদুমন্দ আন্দোলন ধর্তব্যে না নিলে, সমাজে বড় রকমের কোনো অস্থিরতা নেই। বাজারে পণ্যমূল্য স্থিতিশীল। এদেশে কারণে অকারণে লাফিয়ে লাফিয়ে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ে না। মার্কিন সরকার বিদেশিদের জন্য যত নির্মমই হউক স্বদেশের নাগরিকদের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল। তাই এখানকার জীবনযাত্রা নিরাপদ ও আরামদায়ক। ৯/১১ এবং তত্পরবর্তী যুদ্ধ-বিগ্রহে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এদেশের ইমেজ সঙ্কট কিছুটা হয়েছে বটে, তারপরও আমেরিকা সারা পৃথিবীর তরুণ সমাজকে ভীষণভাবে টানে, আকর্ষণ করে। উন্নয়নশীল দেশ থেকে ১০০ জন তরুণ-তরুণীকে যদি স্থায়ীভাবে আমেরিকায় এসে বসবাস করার চয়েস দেওয়া হয়, আমার মনে হয় ৯০ জনই সে সুযোগ হাত ছাড়া করতে চাইবে না। এ সবই আমেরিকার জীবনের আলো ঝলমল দিক।

পৃথিবীর সব দেশের মত বাংলাদেশেও আজকাল দিন বদলেছে, (আওয়ামী লীগের ‘দিন বদল’ অর্থে নয়) যুগ পাল্টেছে। এ যুগ বিশ্বায়নের যুগ, ডিজিট্যাল যুগ। আজকালকার ছেলেমেয়েরা পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকে যে কোনো দেশ সম্পর্কে অনেক বেশি জানে, অনেক বেশি বুঝে, আমাদের কালে আমরা যা চিন্তাও করতে পারতাম না। তিরশ বছর আগে প্রথম যখন আমেরিকাতে আসি তখনকার কিছু অনুভূতি ও উত্তেজনার কথা বলতে গেলে নস্টালজিয়ায় ভুগি। সে সময় আমেরিকা এসে নিজ চোখে সরজমিনে দেখে যা জেনেছি আজকাল ইন্টারনেটের বদৌলতে বাংলাদেশের একটি অজপাঁড়া গাঁয়ের ছেলেমেয়েদের পক্ষে ঘরে বসেই তা জানা সম্ভব। এসবকিছু তাদের কাছে আজকাল আর নতুন নয়, অজানা নয়।

আমিও এসব পুরনো জানা কথা পাঠকদের সামনে নতুন করে পেড়ে বিরক্তির কারণ হতে চাই না। আমি আজ বলতে চাই অন্য এক আমেরিকার গল্প। চাকচিক্যময় আমেরিকার ভেতরে আছে আরেকটি আমেরিকা। সে সম্পুর্ণরূপে ভিন্ন এক আমেরিকা, অন্য এক আমেরিকা, বলা যায় অন্ধকার আমেরিকা। অনেকে এরও খবর রাখেন, তবু বলছি তাদের উদ্দেশ্যে যারা অন্ধকার আমেরিকার ব্যাপারে কিছুটা হলেও গাফেল। পাঠকগণ এবার আসুন উল্টে দেখি অন্ধকার আমেরিকার জীবনের ঝাপসা, ধূসর, কালো পাতা। খোলা চোখে সচরাচর তা দেখা যায় না, গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা না করলে তা অনুভূতও হয় না।

যত বিত্তশালীই হউক না কেন, আমেরিকা জনমানুষেরই দেশ, এদেশের মানুষ ফেরেস্তা নয়। বাংলাদেশের মত এটাও একটা মাটির দেশ, সোনারূপায় মোড়ানো নয়। টাকা এদেশের গাছে ধরে না, রাস্তাঘাটেও কুঁড়িয়ে পাওয়া যায় না। মেহ্নত করেই কামাই করতে হয়। মোটকথা আর দশপাঁচটি দেশের মত আমেরিকাও মর্তের মাটিতে গড়ে ওঠা এক মানবগোষ্ঠি, একটি জাতিরাষ্ট্র, একটি দেশ। এটা কোনো স্বর্গপুরী নয়। পৃথিবীর সব দেশের মত এদেশের মানুষের জীবনেও দুঃখ আছে, ব্যথা-বেদনা আছে, দৈনন্দিন জীবনে আছে হাজারো রকমের টানাপোড়েন ও সমস্যা। এখানেও দুর্নীতি হয়, অন্যায় হয়। এদেশেও অবিচার আছে, আছে অনাচার, অত্যাচার। তারপরও এদেশ অন্য অনেক দেশ থেকে ভাল এবং ভিন্ন। তবে মোটা দাগে এদেশের সমস্যা যতটা না আর্থিক ও রাজনৈতিক তার চেয়ে অনেক বেশি নৈতিক ও সামাজিক।

এদেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক ব্যাধি হল পর্ণোগ্রাফি। এটা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সর্বত্র বি¯তৃত। এথেকে গা বাঁচিয়ে চলা সবার পক্ষেই কষ্টকর। ‘টম্পেটেশন অফ অ্যা জেনারেশন’ ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া ২০০৬ সালের তথ্য অনুযায়ী আমেরিকার মানুষ প্রতি সেকেন্ডে পর্ণোগ্রাফির ওপর খরচ করে ৩ হাজার ৭৫ ডলার। প্রতি সেকেন্ডে ২৮ হাজার ২ শ ৫৮ জন লোক পর্ণোগ্রাফি দেখতে ইন্টারনেটে লগঅন করে। প্রতি ৩৯ মিনিটে এখানে তৈরি হয় একটি পর্ণোভিডিও। এদেশে আছে ৪২ লক্ষ পর্ণোগ্রাফিক ওয়েবসাইট যা কিনা সকল ওয়েবসাইটের ১২ শতাংশ। যারা এসব ওয়েবসাইট ভিজিট করে তাদের অধিকাংশই ১২ থেকে ১৭ বছরের ছেলেমেয়ে। এদেশে ইন্টারনেট থেকে অধিক পর্ণোগ্রাফির ব্যবসা হয়ে থাকে ভিডিও সেল এবং ভিডিও রেন্টালের মাধ্যমে। এই সামাজিক সমস্যায় আমেরিকার অবস্থান চীন, সাউথ কোরিয়া, এবং জাপানের পরেই।

আমেরিকার দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে ‘চাইল্ড মলেস্টেশন’ এবং তার সাথে সম্পর্কিত ‘ইনসেস্ট ক্রাইম’। এটার ব্যাপকতা কম কিন্তু গভীরতার দিক থেকে এটা একটা মারাত্মক সামাজিক সমস্যা। ‘চাইল্ড মলেস্টেশন’ বলতে বোঝায় ছোট ছোট ছেলেমেয়েদেরকে যৌনভাবে ত্যক্ত-বিরক্ত করা। ‘ইনসেস্ট ক্রাইমকে’ বলে অজাচার বা ঘনিষ্ট আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে অবৈধ যৌনসম্মন্ধ। ‘চাইল্ড মলেস্টেশন’
ঘটে থাকে নিজ আবাসগৃহে, স্কুলে, এবং চার্চ-সিনেগগের মত জায়গায়। আর ‘ইনসেস্ট ক্রাইম’ হয়ে থাকে নিজ ঘরে আপন পরিবারের সদস্যদের মাঝে। অনেক সময় ভাই আপন বোনকে এবং বাবা আপন মেয়ের সাথে জোর পূর্বক গড়ে তুলে এধরণের পৈশাচিক অবৈধ সম্পর্ক। ‘ন্যাশন্যাল সেন্টার ফর ভিকটিমস্ অফ ক্রাইম’ এর প্রকাশিত এক তথ্য বিবরণীতে জানা যায়, যেসব শিশুরা ‘চাইল্ড মলেস্টেশন’ এবং ‘ইনসেস্ট ক্রাইম’ এর শিকার হয় তার ৪৩ শতাংশ আপন পরিবারের সদস্য, ৩৩ শতাংশ পরিচিত লোক, এবং অবশিষ্ট ২৪ শতাংশ অপরিচিত লোক কর্তৃক ধর্ষিত হয়। তারপর আছে সমকামীতা। এটার বিস্তৃতিও অনেক গভীর ও ব্যাপক। এর মাধ্যমে সমাজে এইডস সংক্রমিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত দ্রুত গতিতে। মানসিক বিকৃতি, খুনখারাবী, আত্মহত্যা, ইত্যাদি অপরাধের সঙ্গেও অনেক সময় অবৈধ যৌন সম্পর্ক জড়িত। এসব অপরাধের সাথে জড়িয়ে আছে কমার্শিয়াল অ্যাডভার্টাইজিংএ পণ্য হিসেবে নারীর অবারিত নগ্ন ব্যবহার।

এখানে অ্যাডিক্টিভ ড্রাগের কেনাবেচা এবং ব্যবহার আরেকটি বড় সামাজিক উপদ্রব। এটা সব বয়সের লোকজনই করে থাকে। অপরাধীরা দেশিবিদেশি কোকেইন, হেরোইন, মারিওয়ানা, মেথামফেটামাইন, এলএসডি, এমডিএমএ, পিসিপি, জিএইচবি, জিবিএল, স্টেরোয়ড, ফ্লানিটরাজেফাম, ইত্যাদি কেনাবেচা করে এবং ব্যবহার করে। সুঁই দিয়ে যারা শরীরে ড্রাগ নেয় তারা ড্রাগের সাথে আরেকটি মরণব্যাধি ছড়ায় – তা হল এইড্স। মা-বাবারা সময়মত সঠিকভাবে ড্রাগ সম্মন্ধে ছেলেমেয়েদের সচেতন না করলে যে কোনো সময় যে কোনো ছেলেমেয়েই স্কুলকলেজে ড্রাগের খপ্পরে পড়ে যেতে পারে। এসবের ব্যাপারে ছেলেরা অবশ্য মেয়েদের চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে। অন্যান্য সামাজিক ব্যাধি যদিও ইমিগ্র্যান্ট বাংলাদেশিদের থেকে অনেক দূরে থাকে, কিন্তু ড্রাগের থাবা থেকে অনেক বাংলাদেশিদরাও তাদের ছেলেদের বাঁচাতে পারেনি বা পারছে না। আমার জানাশোনা কয়েকটি পরিবারের ছেলেরা রাস্তায় ড্রাগ বেচতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে অভিবাবকদের ফেলেছে জটিল সামাজিক বিড়ম্বনায়। আমেরিকায় প্রতি বছর আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ১২ শ’ মেট্রিক টনের অধিক বিভিন্ন জাতের ড্রাগ অপরাধীদের হাত থেকে জব্দ করে থাকে। বেআইনী বলে এসবের সঠিক তথ্য ও পরিসংখ্যান পাওয়া দুষ্কর। বিশেষজ্ঞরা যেটুকু ধারণা করেন তাতে বোঝা যায়, সারা পৃথিবীর রাস্তাঘাটে প্রতি বছর যে পরিমাণ ড্রাগ বিক্রি হয় তার খুচরা মূল্য প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার কোটি ডলার। তার একটি বৃহত্ অংশ কেনাবেচা হয় আমেরিকার বাজারে।

এদেশে মদ এবং মদ্যপান আরেকটি অন্যতম সামাজিক সমস্যা এর সাথে ডমেস্টিক ভায়োলেন্সও সম্পর্কিত। মদ এবং মদ্যপান আমেরিকার সমাজ ও ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। তবু মদ্যপানকে অনেকে পছন্দ করে না। কারণ, মদে যেহেতু নেশা হয় তাই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মদ্যপায়ীরা মদপানে আসক্ত হওয়ার পর অতি সহজেই মাত্রাজ্ঞান হারিয়ে ফেলে। এটি একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি। এব্যাপরে নারী থেকে পুরুষরা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। মদ, মদ্যপান, এবং মাতলামি করে পুরুষরা অহরহ তাদের স্ত্রীদেরকে পেটায়। অবশেষে মদের কারণে অনেক সুখের সংসার ভেঙ্গে খানখান হয়ে যায়। মদ ও মদ্যপানকে নিয়ন্ত্রিত করার জন্য আমেরিকায় অনেক আইন আছে কিন্তু মদ তাদের সমাজে এমনভাবে প্রোথিত, এটাকে তারা কোনো দিনই বেআইনি ঘোষণা করবে না।

ডিভোর্সও আমেরিকার সামাজিক জীবনের একটি বড় রোগ। ৬০ শতাংশ বিয়েই বিচ্ছেদে সমাপ্ত হয়। এদেশে লক্ষ লক্ষ সন্তান ছোট থাকতেই মা-বাবার ডিভোর্স হয়ে যায় এবং তারা শুধু মা অথবা বাবার সান্যিধ্যে বড় হয়। মা-বাবাকে এক সাথে পায় না। আমি একবার গ্রে হাউন্ড বাসে চার্লস্টন- ইলিনয় থেকে আটলান্টা যাচ্ছিলাম, পথে ইভান্সভিল স্টেশনে বসে এক টিন এজ ছেলের সাথে গল্প করছিলাম। কথায় কথায় ছেলেটি বলছিল, তার বয়স যখন মাত্র কয়েক মাস তখন তার মা-বাবার ডিভোর্স হয়। জীবনে দুজনকে একসাথে কখনো দেখেনি। আফস্ োকরে বলছিল, ‘আই হ্যাভ নো আইডিয়া হাও ইট ইড লাইক টু সি বৌথ পেরেন্টস টুগেদার’। তখন মনে মনে বললাম আমরা কত ভাগ্যবান। একসাথে মা-বাবার আদর পেয়ে বড় হয়েছি।

এবার আমার জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে আরো কয়েকটি ঘটনা দিয়ে আজকের নিবন্ধ শেষ করব। এর মাধ্যমে পাঠকগণ আমেরিকার আলো-আঁধারের জীবনের একটা পূর্ণাঙ্গ ছবি নিজের মনে এঁকে নিতে পারবেন। ঊনিশ শ’ আশির দশকের গোড়ার দিকে আমি আমেরিকার ঐতিহাসিক বস্টন শহরে ছিলাম। নর্থইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম। থাকতাম ক্যাম্পাস থেকে বড়জোর সিকি মাইল দূরে এক অ্যাপার্টমেন্টে। গাড়ি কেনার সাধ থাকলেও সাধ্য ছিল না। রাতদিন স্কুলে যাতায়াত করতাম পায়ে হেঁটে। আমার বাসা থেকে স্কুলের পথে এক আলবেনিয়ান মুসলমান ফুটপাতে দাঁড়িয়ে একটি ছোট্ট খোলা ভ্যানে করে তাজা ফলমূল ও তরিতরকারি বিক্রি করত। তার কাছ থেকে আমি মাঝেমধ্যে আপেল, শশা, টমেটো ইত্যাদি কিনতাম। প্রায়ই যাওয়া-আসার সময় লোকটার সাথে দেখা হত, হাতে সময় থাকলে দাঁড়িয়ে তার সাথে দু’ দন্ড গল্প করতাম। এভাবে তার সঙ্গে আমার একটা ব্যক্তিগত পরিচয় হয়ে গিয়েছিল। একদিন লোকটির ভ্যানের সামনে দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে কথা বলছিলাম, এমন সময় হঠাত্ দেখি কোথা থেকে এক পুলিশ অফিসার (এদেশে পুলিশ কনস্টেবলকে অফিসার বলে সম্বোধন করতে হয়) এসে একটি ঠোঙ্গা হাতে নিয়ে কয়েকটি আপেল এবং টমেটো ভরে হাঁটা দিল। আমি অবাক হয়ে আলবেনিয়ান ভেন্ডারকে বললাম, ‘পুলিশ পয়সা দিল না কেন’? ‘আমার ভেন্ডিং লাইসেন্স এক্সপায়ার করে গেছে তো, তাই’, উত্তর এল আলবেনিয়ান দোকানদারের কাছ থেকে।

বিশ বছর পরের আরেকটি ঘটনা। এটা ঘটেছে আমার বর্তমান বাসস্থান ন্যাসভিলে। আমার ইউনিভার্সিটির পাশে ফার্মারস মার্কেটে আছে একটি ইন্ডিয়ান গ্রোসারি দোকান। একদিন দুপুর বেলা আমি চাল-ডাল কিনতে গিয়েছি সে দোকানে। এক পুলিশ হাতে একটি সেন্ডুইচ নিয়ে দোকানে ঢুকল। শুকনো সেন্ডুইচ খেতে কোমল পানীয় দরকার। এসেই দোকানের কুলার থেকে এক ক্যান ঠান্ডা সোডা বের করে দিব্যি চলে গেল, দাম দিল না দোকানিকে কিছু বললও না। দোকানের মালিককে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ব্যাপারটা কি’? বলল, ‘পেটি করাপ্শন, ইট ইজ হিয়ার অ্যাজ ইট ইজ দেয়ার’। এদুটো হল আমার নিজ চোখে দেখা ছিঁচকে ঘটনা। পুলিশকে ঘিরে বড় বড় দূর্নীতিও যে এদেশে হয় না তা নয়। তবে সেগুলো ভারত, পাকিস্থান, বা বাংলাদেশের মত এত অহরহ নয়, এবং ধরা পড়লে কী বড় গাজী কী ছোট গাজী সহজে কেউ পার পায় না।

এদেশের পুলিশ মানুষের বন্ধু আবার অনেক সময় তারা পশুর মত হিংস্র আচরণও করে থাকে, বিশেষ করে ভিকটিম যদি সংখ্যালঘু কৃষ্ণাঙ্গ হয়। পাঠকদের নিশ্চয়ই মনে আছে ১৯৯১ সালের ২ মার্চ গভীর রাতে সাউথ সেন্ট্র্যাল এলএতে কৃষ্ণাঙ্গ রড্নি কিংকে ধরতে গিয়ে পুলিশ যে অমানবিকভাবে তাকে মারধর করেছিল তার একমাত্র কারণ লোকটি ছিল কালো। এটা কোনো সাদা আমেরিকান হলে পুলিশ কোনোদিন এরকম ব্যবহার করতে সাহস পেত না। ভিডিওতে ধারণ করা পুলিশি হিংস্রতার এ চিত্র কোটি কোটি দর্শক টিভি পর্দায় দেখেছে বারবার। কিন্তু পরের বছর বিচারের রায় যখন বেরোল দেখা গেল কোর্ট সব পুলিশ অফিসারদেরকে বেকসুর খালাস দিয়ে দিল। এ রায়ে কৃষ্ণাঙ্গরা ক্ষেপে গিয়ে শুরু করল রায়টিং। রায়টিংএর ফলে এই অবিচারের রিট্রায়াল হয়েছিল ফেডার‌্যাল কোর্টে। সেই রায় আসে মার্চের ৯ তারিখ ১৯৯৩ সালে। এতে আসামী চার পুলিশের মধ্যে ২ জন খালাস পেয়েছিল এবং বাকি দুজনের আড়াই বছর করে জেল হয়েছিল।

অন্য যে কোনো দেশের মত ভালমন্দ মিলিয়েই আমেরিকার সমাজ জীবন। তবু বলব সার্বিক বিবেচনায় মন্দের চেয়ে এদেশের ভাল অনেক বেশি। এ সমাজের খারাপ রীতিনীতি যদি কেউ বর্জন করে ভাল গুণগুলোকে শক্ত করে চরিত্রে ধারণ করতে পারে, তাহলে আমেরিকার জীবনযাত্রা নন-আমেরিকানদের কাছে এখনো ঈর্ষার বিষয় বলে বিবেচিত হতে পারে।

লেখক: আবু এন. এম. ওয়াহিদ; অধ্যাপক – টেনেসী স্টেইট ইউনিভার্সিটি
এডিটর – জার্নাল অফ ডেভোলাপিং এরিয়াজ।
awahid2569@gmail.com

Comments

আমেরিকার জীবনঃ আলো-আঁধারের বয়ান — ১ Comment

  1. আমেরিকার আলো-আঁধারের বাস্তব দিকটা সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন আপনার লিখায়। ধন্যবাদ।
    বাংলাদেশের তরুণ সমাজও কিন্তু এখন পর্নো আসক্তিতে ডুবে যাচ্ছে!