পলিটিক্স, ফুটবল ও চাটুকারীতা

1603 জন পড়েছেন

রাজনীতি ও ফুটফল –এই দুটি অঙ্গনে দর্শক ও অনুসারিদের মধ্যে  অনেক সামঞ্জস্য দেখা যায়। আবার এই দু’য়ের সাথে কিছু ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যও মিতালি রাখে। ইউরোপীয়ান সমাজ বিজ্ঞানীদের অনেকেই দ্বিতীয় অঙ্গন অর্থাৎ ফুটবল খেলার বাস্তবতা ও এই পরিসরে ভক্তদের চরম আত্মনিয়োগের তুলনা ধর্মীয় বাস্তবতার সাথে দেখে থাকেন।

প্রথমে এই দুই অঙ্গনের সমর্থক ও ভক্তদেরে নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। তবে দ্বিতীয়টিকে খেলা না বলে ‘ফুটবল লীগ’ বলে উল্লেখ করি। ফুটলীগের সমর্থক আজীবন তাদের লীগকে (টিমকে)সমর্থন দিয়ে যান। প্রশ্ন করা যেতে পারে, কেন? আমি বলব, এখানে ‘কেনোর’ কোনো যুক্তি নেই, স্থানও নেই। এই প্রশ্নের পরিবর্তে এখানে মানব স্বভাব ও তার সামাজিকতার বিষয়টি প্রধান। মানুষ সামাজিক জীব। দল,গোষ্ঠী ও সমাজবদ্ধতায় আমাদের প্রকৃতিগত এক ধরণের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায় – এতটুকুই। তাই দেখা যাবে যারা ফুটবল খেলা দেখতে মাঠে যান বা টিভির সামনে বসেন তারা তাদের দলকে সমর্থন করেই অবস্থান নেন এবং তাদের টিমের বাকী সমর্থকদের সাথে একাত্মতাবোধ করেন। তাদের জিতলে, পরাজিত দলের মোকাবেলায়, বিজয়ের আবেগ অনুভব করেন। খেলার মূহুর্ত্তে তাদের দল যতই খারাপ খেলুক না কেন, কখনও সমর্থন পালটিয়ে প্রতিপক্ষকে সমর্থন দিতে যাননা, ওরা যতই ভাল খেলুক না কেন। এর কারণ কি? কেন মাঠে যারা ভাল খেলছে তাদেরকে সমর্থন দেয়া হবে না? এর উত্তরও আমাদের মানব স্বভাবে, আমাদের সামাজবদ্ধতায়, আমাদের গৌত্রীয় মৈত্রীতে ও দলীয় পরিচিতিতে।
খেলার এই তুলনায়ই দেখতে পাবেন আমাদের দেশের রাজনীতির অঙ্গনে সমর্থকদের অবস্থা একদম এওরূপই। যারা যে দল করেন সেই দল ময়দানে যতই খারাপ খেলুক না কেন তারা তাদের দলকে সমর্থন দিয়েই যাবেন। এই যে প্রকৃতি –এর আলোকে বলা যায় যে আপনি আপনার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কিছু প্রোপাগান্ডা করলেই অথবা তাদেরকে কিছু শক্ত কথা শুনিয়ে দিলেই তারা তাদের দল ছেড়ে আপনার দলে ভীড়বে না, আপনার দলীয় ধারণায় অনুপ্রাণিত হবে না। কক্ষনো না। তবে মতের পরিবর্তন যে একেবারে হয় না তাও নয়। কিন্তু সে পরিবর্তন আসে অত্যন্ত সুপ্তভাবে, যুক্তি-তর্কে পরাজিত হয়ে নয়। (আবার স্বার্থের কারণটাও বিবেচনা আনা যেতে পারে, যুক্তি গঙ্গায় যাক)।
ফুটবলের সাথে আরেকটি তুলনা আনি। আমাদের সমাজে,  না বরং সকল সমাজের কথাই বলুন, সেখানে সেলেব্রিটি নামক কিছু প্রাণী থাকেন। তারা যেমন থাকেন সংস্কৃতির অঙ্গনে তেমনি রাজনৈতিক ও অন্যান্য অঙ্গনে। সামাজিকভাবে পরিচিত ব্যক্তির সাথে কথা বলতে, বরং বলুন সেলেব্রটির সাথে কথা বলতে, তার সাথে ফটো তুলতে, তার প্রশংসা করতে আমাদের মানসিকতায় এক ধরনের স্ফীতি কাজ করতে দেখা যায়। এতে আত্মকেন্দ্রিক ‘কিছু একটা’ প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ ‘আমি’ ঐ ব্যক্তি যে ব্যক্তি অমুক সেলেব্রিটিকে চিনি। এখানে আত্মার সুগভীরে যা লুকিয়ে থাকে তা হল ‘আমিত্ব’।
তাছাড়া কোন একটা বিশেষ দলের হয়ে মিটিং মাটিং করাতেও সেই ‘আমিত্ব’ অতি সহজে ধরা দেয়। ধরুন আমি একটি সভার আহবান করলাম এবং তার প্রচারণার কাজ শুরু করলাম। এই কাজে বিজ্ঞাপনী লিফলেটে বা অন্য মিডিয়ায় প্রথমেই আমার নাম (কখনও ফটোসহ) ছাপানো হতে পারে। তারপর আসল দিনটিতে যখন সভার কাজ শুরু হবে তখন ‘আমি’ হয়ত টেবিলের সামনের কাতারের প্রথম সারিতে একটি প্রধান আসন গ্রহণ করে আছি।  তারপর এক সময় ‘আমার পরিচিতি’সহ নাম ঘোষণার পর ‘আমি’ যখন বক্তৃতা দিতে শুরু করব,তখন মাশাল্লাহ ‘আমার আমিত্ব’ যেন ষোল কলায় পরিণত। এতকিছুর সুযোগ না পেলেও দ্বিতীয় শ্রেণীর মর্যাদায় থাকলেও ‘আমিত্বের’ তেমন কোনো কমতি নেই। আমি যদি সভাপতির পাশে বসার সৌভাগ্য অর্জন করি তাহলেও দ্বিতীয় শ্রেণীর ‘আমিত্বানুভূতি’ মোটামুটি লাভবানই হয়।
আগেই বলেছি মানুষ সামাজিক জীব এবং সামাজিকতাতেই তার সত্তার এক বৈশিষ্ট্য রূপায়িত হয়, সে আনন্দ পায়। কেউ একটা সভা-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আমাদেরকে দাওয়াত দিলে আমরা কী করি? আমরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে, সুন্দর কাপড়-চোপড় পরে, সেজে গুজে, সেখানে গিয়ে হাজির হই। আনন্দ লাভ করি। সেখানে অনেকের বক্তৃতা দারুণ বিরক্তিকর হলেও শেষ বেলায় ভূয়সী প্রশংসা করতেও কুণ্ঠিত হই না। এগুলোর সবই সামাজিক, ভদ্রতা ও শিষ্টাচারিতার অংশ।
এবারে ব্যক্তি পূজা। ব্যক্তিপূজা মানবসত্তার রন্ধ্র ভেদ করে আছে। যেমন ফুটবলে,তেমন ধর্মে আবার সেই একই রূপ রাজনীতিতে – সর্বত্রই যেন জুড়ে আছে এই ‘মহান সত্তা’। মনে রাখতে হবে, পূজারীর কাছে কোন দোষই দোষ নয়। কোন দোষ প্রকাশিত হয়ে পড়লেও পূজারী সেই দোষকে পুষিয়ে নেয়ার মত যুক্তি খুঁজে পাবে। তাই অমুক দলের নেতা, তমুক দলের নেতা বা তাদের সন্তান-সন্তিনী ও চেলা-চামুণ্ডাদের বিপক্ষে হাজারও কিছু প্রকাশিত হলেও পূজারীর বিশ্বাসে কোন ভাঁটা পড়বেনা। আর দলীয় চাটুকার? আহা, সে যে কী সত্তা! যে জ্ঞান তার নেই, যে যুক্তির মূল ধারা সে বুঝেনি, সেই জ্ঞান, সেই যুক্তির অবতারণা করে যখন নিজেদের মহাত্ত্ব/তাৎপর্য আর প্রতিপক্ষের কদর্য/ব্যর্থ চিত্রের গুঞ্জরন তুলে তখন তার আপন সত্তা যেন বিমূর্ত হয়ে ওঠে, না বরং বলুন উলঙ্গ হয়ে পড়ে। এক চাটুকারের দল ধীরে ধীরে বৃদ্ধ হয়ে নিঃশেষ হয় বটে কিন্তু তাতে কি চাটুকারিতা জাতীয় পরিমণ্ডল থেকে উধাও হয়ে যায়? মোটেই না। আস্তে আস্তে তাদের স্থান দখল করে নেয় আরেক নব্য চাটুকারের দল। আর এভাবেই কালান্তরিত হয় অতি মূল্যবান এই জাতীয় বৈশিষ্ট্য, এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে।
রাজনীতিতে নিজ দলের দোষ খুবই কম থাকে। পূজারীরা সংবাদ মিডিয়া থেকে কেবলমাত্র নিজ পক্ষের সংবাদাদি স্মৃতির আঙ্গিনায় সংরক্ষণ করে রাখেন। সামাজিকভাবে দেখাসাক্ষাৎ হলে এগুলো কোরান হাদিসের মত একে অন্যের সাথে আওড়িয়ে যান। প্রোপাগান্ডায় বিশ্বাসী এই দলীয় ভক্তরা, বলুন ভণ্ডরা, যখন নিজেদের দলের মহিমা কীর্তন করেন এবং তাতে মানব সত্তার যে দুর্বল বৈশিষ্ট্যগুলো প্রকাশ লাভ করে তা দেখে অনেক সময় আশ্চর্য হতে হয়।  যে একটি সংবাদ সত্য না মিথ্যা -তা জানার কোন কুদরত সর্বোসাধারণের নেই, সে সংবাদটি নিয়ে দারুণ প্রত্যয়ে যখন কেহ কথা বলে বেড়ায় বা লিখে যেতে থাকে,তখন আমাদেরকে কী বুঝতে হয়? বুঝতে হয় আমাদের সার্বিক মানবিক দুর্বলতার কথা। আমরা মানুষ। বিশ্বাস দিয়েই আমাদের মনের খেলা-নেলা -সে সত্য হোক অথবা মিথ্যা। মৌলবাদী অনেক নাস্তিক বিশ্বাসের স্থান কেবল ধর্মেই মনে করে থাকেন, অথচ বিশ্বাস জোড়ে আছে আমাদের জীবনের সকল ক্ষেত্র। এন্ত্রোপলজিকেলি, আমরা সামাজিক ও বিশ্বাসী প্রাণী।
ইদানীং [২০১০], বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীকে কিছু ইস্যু উত্তপ্ত করে দিয়েছে। এসব বিষয়ে বেশি কথা না বলে, মনোযোগ দিয়ে শুনতে থাকলে সহজেই দেখতে পাওয়া যাবে ফুটবল, রাজনীতি ও ধর্মে কোন ধরনের বিশ্বাস ও বৈশিষ্ট্য মানুষকে আবেগের রঙে অনুপ্রাণিত করতে পারে, মানুষকে কীভাবে এমনসব বিষয়ে অভিমত ব্যক্ত করতে নির্দ্বিধায় উদ্বুদ্ধ করতে পারে যে সম্পর্কে অনেক সময় তার ক্ষীণতম জ্ঞান থাকে না।

 

1603 জন পড়েছেন

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতাত্ত্বিক, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক। বসবাস: বার্মিংহাম, ইউকে। দেশের বাড়ী: দেউলগ্রাম (উত্তর), বিয়ানী বাজার।
Monawwarahmed@aol.com

Comments

পলিটিক্স, ফুটবল ও চাটুকারীতা — ৪ Comments

  1. The interpretation of politics, sports and religion is the perfect reflection of emotional Bengalis about whom Rabindranath Tagore had once scholarly observed, ‘O Virtuous Mother of seventy millions [ruffians]/ Thou hath cherished them as Bengalis, but not as humans.’
    In healthy politics and in the practice of religion the rational-knowledge and voice of inner conscience are the driven forces. Blindly support is completely prohibited in proper politics and religion.
    However, we are waiting for the time when Bengalis will be among the best of human beings.

    Thank you