কবির সুমনের গান ও একটি প্রশ্ন

1842 জন পড়েছেন

যে সব সহৃদয় পাঠক তাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করে আমার লেখা পড়েন আমি তাদের কাছে আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। এতো দিনে নিশ্চয়ই তারা জেনে গেছেন আমি রাজনীতি নিয়ে যে লিখি না তা নয়, তবে অপেক্ষকৃতভাবে কম লিখি। আমার বেশিরভাগ লেখা দেশ বিদেশের অর্থনীতি, সমাজ, ঘটনা-দূর্ঘটনা, মানুষের জীবন, এবং জীবন ঘনিষ্ট সমস্যা ও তাদের ব্যথা বেদনাকে ঘিরেই ঘুরপাক খায়। আজকের লেখাটা এক অর্থে আলোচ্য কোনো ক্যাটাগরিতেই পড়ে না, আবার অন্য অর্থে এসব কিছুর সংমিশ্রণই অদ্যকার নিবন্ধের বিষয়বস্তু। আগেই বলে রাখছি, শুরুতে আপনাদের মনে একটু খটকা, একটু ধাক্কা লাগতে পারে, তবে শেষ অবধি এই আলোচনার বিষয়বস্তু এবং ঊপসংহারের সঙ্গে আমার শিরোনামের একটি সার্থক মেলবন্ধন খুঁজে পাবেন বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

লেখাটা শুরু করতে চাই দুই বাংলার স্বনামধন্য সঙ্গীত শিল্পী কবির সুমনের গাওয়া অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি গণসঙ্গীতের কথা দিয়ে। গানটি শিল্পীর নিজের লেখা কিনা তা জানি না, তবে এর কথা এবং বাণী এমনভাবে আমার হৃদয় ছুঁয়েছে, যে আমি আজকের পাঠকদের সাথে পুরোটাই শেয়ার করার লোভ সামলাতে পারছি না। আমি আপনাদের গানটি শুধু পড়তেই বলব না, বরং প্রত্যেকের কাছে আবদার জানাব আপনারা গানটি কবির সুমনের কন্ঠে অন্তত একবার হলেও শোনবেন। গানের বাণী যেমন শক্তিশালী তেমনি বাংলদেশের জামাই কবির সুমনের কন্ঠে গানটি শুনিয়েছে চমত্কার। ইউটিউব হোমপেজে গিয়ে সার্চ দিলেই গানটি পেয়ে যাবেন। গানের কথাগুলো এরকম: “একটা থালায় চারটি রুটি, একটু আচার একটু ডাল/ একই থালায় দুজন খেলে যুদ্ধ হইত অস্বীকার।/ একটা মাটি দুজন সেপাই, দেশ বিভাগের সীমান্তে/ দুজন আছে দুই দিকে আর বন্ধু তারা অজান্তে।/ তারা এদেশ ভাগ করেনি, দেয়নি কোথাও খড়ির দাগ/ নেতারা সব ঝগড়া করেন, জলে কুমির ডাঙায় বাঘ।/ ঝগড়া থাকে আড়াল করে, লাভের মাটি লাভের গুড়/ সীমান্তে দুই দেশের সেপাই, দেশপ্রেমের দিনমজুর।/ দুই কাঁধে দুই বন্দুক, আর বুলেট বেশি খাবার কম,/ রাজধানীতে হিসেব কষে, এদের নেতা ওদের যম।/ যমের বাড়ি কাছেই আছে, অনেক দূরে নিজের ঘর,/ দেশপ্রেমের নজির হল, এই চিতা আর ওই কবর।/ক্ষিধের কিন্তু সীমান্ত নেই, নেই চিতা নেই কবরটাও,/ যুদ্ধটাকে চিতায় তুল, যুদ্ধটাকে কবর দাও।”

কবির সুমন এই গানের বাণীতে ইতিহাস, ভূগোল, রাজনীতি, যুদ্ধ, ধর্ম, শান্তি, সমাজ, সভ্যতা,
বাস্তবতা, এবং মানবিক আবেদনের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। গানের সবগুলো চরণের সাথে আমি পুরোপুরি একমত নই, তবে শেষের দুটি লাইনের মর্মার্থ আমাকে দারুণভাবে টানে, ভীষণভাবে অভিভূত করে। আজকের নিবন্ধে এ প্রসঙ্গে আমি পাঠকদের বিবেচনার জন্য একটি প্রশ্ন তুলে ধরতে চাই। ইতিহাসের আদি কাল থেকে আজ পর্যন্ত আমরা দেখতে পাই কোনো কোনো দেশে সম্পদের প্রাচুর্য, আবার কোথাওবা দারিদ্রের দারুণ কষাঘাত, অভাবের অপশাসন। কোনো দেশে মানুষ না খেয়ে মরছে, আবার কোনো দেশে হচ্ছে খাদ্যের অপচয়, সাধিত হচ্ছে ইচ্ছাকৃত খাদ্যের বিনাশ। কিন্তু এটা তো এরকম হওয়ার কথা ছিল না। কারণ পৃথিবীতে মানুষকে পাঠানোর আগেই তার জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিটি উপাদান মাপাঝোপা পরিমাণে সৃষ্টি করা হয়েছে। এখানে কোনো কিছুরই কোনো ঘাটতি হওয়ার কথা নয়।

বৈশ্বিক মাপজোকে কথটি ষোলো আনা সঠিক। পৃথিবীর জনসংখ্যা আজ ৭০০ শ’ কোটি পেরিয়ে গেছে, তবু হিসেব করলে দেখা যাবে সারা দুনিয়ায় এখন যা খাদ্য উত্পাদিত হয় এবং বিশ্বে অন্যান্য যত সম্পদ আছে তা পৃথিবীর তাবত্ মানুষের জন্য পর্যাপ্ত। তার ওপর মানব সন্তান শুধু একখানা মুখ নিয়েই পৃথিবীতে জন্মায় না, সে সঙ্গে করে নিয়ে আসে মগজভর্তি একটি মাথা এবং কাজের যোগ্য একজোড়া হাত। আল্লাহর দেওয়া সম্পদ এবং জীবনের উপাদানে তার জন্মগত সমঅধিকার নিশ্চিত করা থাকলে যে কোনো মানুষ নিজের আহার নিজেই যোগাড় করে নিতে পারে। সম্পদের ওপর মানুষের সমঅধিকারটাই আসল সমস্যা। আল্লাহ মানুষকে পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দিয়েছেন এবং সম্পদে সমান অধিকারও দিয়েছেন। কিন্তু মানুষই ডেকে এনেছে তার নিজের সর্বনাশ। প্রশ্ন করতে পারেন, কিভাবে? মানুষ তার ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় কৃত্রিম সীমান্ত দিয়ে পৃথিবীকে ভাগ করেছে বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন জাতিতে। তারপর জাতিসংঘ সনদ বানিয়ে সেটাকে করেছে ঐশীগ্রন্থের মত পবিত্র, অলঙ্ঘনীয়। আর সমস্যাটা সৃষ্টি হয়েছে এখান থেকেই। এর ফলে কিছু কিছু দেশ শক্তি ও কুটকৌশল, কিংবা নিছক ঐতিহাসিক কারণে অসমভাবে সব মানুষের জন্য নির্দিষ্ট সম্পদের একটি বড় অংশকে নিজেদের সুবিধামত কুক্ষিগত করে ফেলেছে। এবং বাকিরা সম্পদের অভাবে হা হুতাশ করছে। এটা হচ্ছে তথাকথিত সভ্য যুগের একটি অসভ্য আইনি ব্যবস্থা।

তার আগে, প্রাচিন কালে অবশ্য পুথিবীতে চালু ছিল যতসব জংলি নিয়ম। আইন কানুন কিছুই ছিল না। ‘জোর যার মুল্লুক তার’ সেটাই ছিল সে সময়কার নিয়ম নীতি। তখন আধুনিক সমাজ এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থাও ছিল না। যুদ্ধবাজ রাজা বাদশা এবং সেনাপতিরা গায়ের জোরে পৃথিবীব্যাপী যত্রতত্র মানুষের সম্পদ লুঠপাঠ করত। যুদ্ধ জিতে আল্লাহর দেওয়া সম্পদের ওপর বিস্তার করত নিজেদের অন্যায্য একচেটিয়া আধিপত্য। অন্যকে অনৈতিকভাবে বঞ্চিত করে অপচয় করত সেই সম্পদের। তথাকথিত জাতিসংঘের আবরণে আজকেও চলছে সেই একই খেলা, একই লুঠপাঠ, তবে একটু অন্যভাবে, আড়ালে আবডালে।

সব মানুষের একই তো উত্স। তারপরও তারা সাদা কালো, ধনী গরিব, এবং ভিন্ন ভিন্ন জাতিতে বিভক্ত হল কিভাবে? প্রশ্নটির উত্তর খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন নয়। মানুষকে আল্লাহ্ ভিন্নরূপে সৃষ্টি করেছেন যাতে তারা পরষ্পরকে আরো ঘনিষ্ঠভাবে, আরো ভাল করে চিনতে পারে, জানতে পারে। ঝগড়া ফ্যাসাদ করার জন্য নয়, কিংবা তাদের মধ্যে কেউ উত্তম কেউ অধম একারণেও নয়। কিন্তু মানুষ তার কুবুদ্ধি দিয়ে সেই্ ভিন্নতার সম্পূর্ণ উল্টো অর্থ বের করেছে। এই ভিন্নতার অজুহাত দেখিয়ে নিজেদের মধ্যে শুরু করেছে বিদ্বেষমূলক প্রতিযোগিতা, মারামারি, হানাহানি, যুদ্ধবিগ্রহ, ও স্বার্থের খেলা। সে যা-ই হোক, এ প্রসঙ্গে কবির সুমন তাঁর ওই গানে ঠিকই বলেছেন, ‘ক্ষিধের কিন্তু সীমান্ত নেই, নেই চিতা নেই কবরটাও,/ যুদ্ধটাকে চিতায় তুলো, যুদ্ধটাকে কবর দাও।’

যে দেশে দারিদ্র আছে, অভাব আছে, ক্ষিধে আছে, সেদেশের মানুষকে কৃত্রিম রাষ্ট্রীয় সীমান্ত দিয়ে আটকে রাখা যায় না। সেটা কোনো যুগে কোনো কালেই সম্ভব হয়নি, এখনো সম্ভব না। ক্ষিধের জ্বালায়, উন্নত জীবনের অন্বেষণে মানুষ আজ মরক্কো থেকে জিব্রাল্টার সাঁতরে স্পেনে যাচ্ছে। তিউনিসিয়া থেকে ছোট ছোট নৌকো করে চলে যাচ্ছে ইটালীর সিসিলিতে। মেক্সিকো থেকে দূর্গম সীমান্ত পাড়ি দিয়ে জান হাতে নিয়ে চলে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। বাংলাদেশ থেকে অভিনব পন্থায় নিত্যদিন যাচ্ছে, পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য সহ ইউরোপ, আমেরিকা, ও অন্যান্য দেশে। যাওয়ার পথে কেউ ঠগ বাটপারের পাল্লায় পড়ে সর্বশান্ত হচ্ছে। দূর্গম পথ পাড়ি দিতে গিয়ে কেউ বাক্সবন্দি লাশ হয়ে দেশে ফিরছে, আবার কেউ কেউ পেট ভরে খেতে গিয়ে সাগরের নোনা পানিতে নিজেই কুমির আর হাঙ্গরের খাবার হয়ে ভাসছে।

তবু তারা দমবার পাত্র নয়। জীবিকার অন্বেষণে অনবরত এলোপাথাড়ি ছুটছে দেশ থেকে
দেশান্তরে। এই চলাফেরায়, এই যাওয়া আসায় সবচেয়ে বড় বাধা আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রসীমার নিয়ম কানুন ও বাধ্যবাধকতা। মানুষের সৃষ্ট কৃত্রিম সীমান্তের কারণে মানুষ সহজে চলাফেরা করতে পারে না। রোজি রোজগারের জন্য স্বাভাবিকভাবে সহজে এক দেশ থেকে আরেক দেশে যেতে পারে না। সীমান্ত না থাকলে মানুষের এ অসুবিধা হত না। ইদানীং এ অসুবিধা দূর হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নে। কিন্তু ইউরোপের এই ২৫/২৬টি দেশই তো পৃথিবী নয়, পৃথিবীটা আরো অনেক বড় এবং এর সমস্যাও অনেক বেশি, জটিল, ও গভীর। যে সব দেশ অঢেল প্রাকৃতিক সম্পদ এবং তুলনামূলকভাবে অল্প লোকসংখ্যা সহ বিশাল ভূখন্ডের মালিক হয়ে বসে আছে তারাই আজ জাতিসংঘ সনদের সবচেয়ে বড় পাবন্দ। তারা পুঁজিকে যত সহজে সীমান্ত পেরুতে দিতে চায় শ্রমশক্তি বা গণমানুষকে তত সহজে এক দেশ থেক আরেক দেশে যেতে দিতে চায় না।
আন্তর্জাতিক কমিউনিটি ও আইন বিশারদ ও আজকের পাঠকদের কাছে আমার প্রশ্ন, দারিদ্রের সীমান্ত নেই, ক্ষিধের সীমান্ত নেই, বলতে গেলে পুঁজিরও সীমান্ত নেই, সেখানে শ্রমশক্তি বা মানুষের চলাফেরায় রাষ্ট্রীয় সীমানা বাধা হয়ে দাঁড়াবে কেন? কতটুকু সফল হলাম জানি না, কবির সুমনের একটি গানের চরণের সূত্র ধরে প্রশ্নটি উত্থাপন করলাম। উত্তর আমার জানা নেই। এ নিয়ে যে কেউ ভাবতে পারেন, লিখতে পারেন, বলতে পারেন, আলাপ আলোচনা করতে পারেন, তর্ক বিতর্ক করতে পারেন। প্রশ্নটি সবার জন্য উন্মুক্ত রইল।

লেখক: ড. আবু এন. এম. ওয়াহিদ; অধ্যাপক – টেনেসী স্টেইট ইউনিভার্সিটি
এডিটর – জার্নাল অফ ডেভোলাপিং এরিয়াজ;

1842 জন পড়েছেন

Comments

কবির সুমনের গান ও একটি প্রশ্ন — ৪ Comments

  1. “যে দেশে দারিদ্র আছে, অভাব আছে, ক্ষিধে আছে, সেদেশের মানুষকে কৃত্রিম রাষ্ট্রীয় সীমান্ত দিয়ে আটকে রাখা যায় না। সেটা কোনও যুগে কোনও কালেই সম্ভব হয়নি, এখনো সম্ভব না।”
    সহ মত।
    আমি মনে করি বাংলাদেশের মত এত অধিক জনসংখ্যার দরিদ্র দেশ থেকে যার বিদেশে পাড়ি জমান তারা পুণ্যের কাজ করেন এ জন্য যে তারা চলে যাওয়াতে জায়গা কিছুটা খালি হল। বিশ্বের সব দেশই তো আল্লাহর।

  2. ভাল প্রশ্ন তোলেছেন! আসলেই সত্য আল্লাহর দেয়া পৃথিবীকে আমরাই ভাগ বাটোয়ারা করে খান কান করে দিয়েছি। আমরা শুধু ভাঙ্গছি, দেশ যেমন ভাঙ্গছি তেমন অতীত দিনের গড়া মূল্যবোধও এই ভাবে ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে আমারা বোধহয় যে মায়ের গর্ভে থেকে এসেছি সেই যায়গায় চলে না যাওয়া পর্যন্ত এই ভাংগনের খেলা বন্ধ হবেনা। ধন্যবাদ।