আমরা কারা ??

1500 জন পড়েছেন

আমরা কারা ? আমাদের সত্যিকার পরিচয় কি ? আমরা কি গভীরভাবে কখনো তলিয়ে দেখেছি কোথায় আমাদের উৎস ? না ভিনদেশীদের সারিবাদি সালসা খেয়ে, চিলে কান নেবার মত কান নিলো, কান নিলো বলে চিৎকার দিয়ে চলেছি ? আসুন চোখের ঠুলি ফেলে দিয়ে একবার দেখুন ইতিহাসের পাতার গরমিল ! আমাদের পিতা-প্রপিতামহের ইতিহাস অন্বেষণ করে দেখুন, হতভম্ব হয়ে যাবেন, চিন্তাধারা বাধাগ্রস্ত হবে, ইতিহাসের অনেক জোড়াতালি দেখতে পাবেন । স্বাধীনতার এই ৪০ বছরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নিয়ে এত টানাটানি হয়েছে যা আমাদের সব প্রাপ্তিকে ম্লান করে দিচ্ছে । চেতনাকে চিহ্নিত করতে হলে আমরা কারা তা প্রথমতঃ চিহ্নিত করতে হবে, এখানে কোন গোঁজামিল দিলে চলবে না । তাই আসুন দেখি আমরা কারা ? যে ভৌগলিক সীমা রেখায় আমাদের অবস্থান, সেই বিশ্বের সর্ব বৃহৎ বদ্বীপ গাঙ্গেয় এলাকাকে বঙ্গ বলে আর এই বঙ্গ শব্দটি পৃথিবীর প্রাচীনতম একটি শব্দ। বঙ থেকে বঙগ এর উৎপত্তি এর অর্থ জলাশয় অর্থাৎ নদীমাতৃক এলাকা । এই শব্দের প্রাচীনত্ব প্রায় পাঁচ হাজার বছরের । ইতিহাসের চাঞ্চল্যকর উত্থান-পতনের মধ্যদিয়ে কখনো বঙ্গদেশ, বঙ্গীয় এলাকা, বঙ্গ প্রদেশ, বাঙ্গাল সরকার, বাঙ্গাল মুলুক, বাঙ্গালা প্রেসিডেন্সী, পূর্ব বাংলা, পূর্ব পাকিস্তান, আর এখন বাংলাদেশ । জনগোষ্ঠীর কথা-শুরু দ্রাবিড় ও আষ্ট্রিক সভ্যতা থেকে এরপর বৌদ্ধ সভ্যতা । আমাদের এই পূর্ব বঙ্গে আর্যরা কোন সময়ে সমাদৃত হয়নি। বরং আমাদের এই জনগোষ্ঠী বহিরাগত আর্যদের বিরুদ্ধে শতাব্দী পর শতাব্দী যুদ্ধ করেছে । নবদ্বীপ কেন্দ্রিক অবাঙালী, কর্ণাটকিয়,সেন বংশের শাসনকে কিছুতে মেনে নেয়নি । আর এই সন্ধিক্ষণে ঐতিহাসিক প্রয়োজনে এই গাঙ্গেয় বদ্বীপে মুসলিম শাসকদের আগমন, শুধু শাসক বৃন্দ নয় সাথে মুক্তবুদ্ধি সম্পন্ন সূফী সাধকদের আগমন হয় । যুগের পর যুগ এই শত শত সাধকদের অক্লান্ত চেষ্টায় এই অঞ্চলের গণমানুষের বিশাল অংশ সূফীদের প্রচারিত জীবন ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সুফিদের এই বিরাট সাফল্যের একটাই কারণ সুফিরা তাদের মতবাদ প্রচারের সময় স্থানীয় কৃষি ভিত্তিক সংস্কৃতি ও লোকাচার, স্থানীয় ভাষা ও সাহিত্যকে গ্রহণ করেছিলেন বিশাল হৃদয় দিয়ে । আর এর ফলেই পূর্ব বাংলায় স্থানীয় কৃষি ভিত্তিক সংস্কৃতি ও সভ্যতার সঙ্গে সূফী দর্শনের সমন্বয় এবং স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের ভাষা সাহিত্য এবং জাতিয় জীবনে তার প্রতিফলন হয় । ইংরেজদের আগমনের বহু পূর্বে বাংলার মুসলিম সুলতানরা যুগের পর যুগ যে ভাবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করে গেছেন, তা ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় । এর পাশাপাশি শতাব্দীর পর শতাব্দী শত শত সূফীদের নিরলস প্রচেষ্টায় জন্ম সূত্রে মুসলমান, ধর্মান্তরিত মুসলমান এবং স্থানীয় দলিত সম্প্রদায়ের মধ্যে নিবিড় একাত্মতা সৃষ্টি হয় যার ফলে এক নয়া বাঙ্গালী দর্শনের ভ্রূণ সৃষ্টি আর এখান থেকেই সূচনা হয় অপরাপর বাঙ্গালীদের থেকে ভিন্ন এক বাঙ্গালী জাতির । উদারপন্থী সুফীইজমের প্রেমময় দর্শনের প্রভাবে এই নতুন দর্শন দ্রুত প্রসার লাভ করে। ফলে বাংলার বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনেক গভীর আস্থা সৃষ্টি করেছিল । সূফীরা শিখিয়ে ছিলেন, এই দেশ এই মাটি আমার, এই ভাষা এই সাহিত্য আমার,এই লোকাচার এই সংস্কৃতি আমার, আমি এ মাটিরই সন্তান । এ ভূখণ্ডের অধিবাসীরা যেমন আর্যদের অধীনতা মেনে নেয়নি তেমনি মোগলদের বিরুদ্ধে বারবার বিদ্রোহ করেছে । সাতচল্লিশের মধ্য আগস্টে গাঙ্গেয় বদ্বীপ থেকে আর্যদের উত্তরসূরিরাই দেশত্যাগ করেছিলেন । একাত্তরের ঐতিহাসিক পট-পরিবর্তনে শরাফত খানদানী দাবিদার অবাঙ্গালীরাও এদেশ ত্যাগে বাধ্য হন । আমাদের এই জাতীয়তাবাদকে ইসলামী চেতনা বলা যেমনি উচিত হবে না তেমনি মৌলবাদী বলাও উচিত হবে না । আজকে আমরা কারা ? এ প্রশ্ন করতেই বলতে হয় যে স্বাধীনতার পর আমাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকী রয়ে গেছে । সে কাজ হচ্ছে আমাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ছাড়াও আমরা কারা তা নির্ণয় করা । আমাদের জাতীয়তা নানা উপকরণের সমন্বয়ে গড়া, এই সম্পূরক উপকরণের কোনটাই আজ আর বর্জন করা যাবেনা, আর এই চৌহদ্দি থেকেই আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে । বি.দ্র. এম আর আক্তার মুকুলের গয়রহ বই থেকে সংকলিত

1500 জন পড়েছেন

মুনিম সিদ্দিকী

About মুনিম সিদ্দিকী

ব্লগে দেখছি অন্য সহ ব্লগাররা তাদের আত্মপরিচয় তুলে ধরেছেন নিজ নিজ ব্লগে! কুঁজো লোকের যেমন চিৎ হয়ে শোয়ার ইচ্ছা জাগে তেমন করে আমারও ইচ্ছা জাগে আমি আমার আত্মপরিচয় তুলে ধরি! কিন্তু সত্য যে কথা তা হচ্ছে শুধু জন্মদাতা পিতা কর্তৃক আমার নাম আর পরিবারের পদবী ছাড়া আমার পরিচয় দেবার মত কিছু নেই! আমি এক বন্ধ্যা মাটি যেখানে কোন চাষবাস হয় নাই। যাক আমি একটি গান শুনিয়ে আত্মপ্রতারণা বর্ণনা শেষ করছি-
কত শহর বন্দরও পেরিয়ে চলেছি অজানা পথে – কালেরও নিঠুর টানে- আমার চলার শেষ কোন সাগরে তা তো জানা নাই! ধন্যবাদ।

Comments

আমরা কারা ?? — ৯ Comments

  1. আমরা কারা? আমাদের সত্যিকার পরিচয় কি? আমাদের উৎস কোথায়? এই প্রশ্নগুলি প্রত্যেক মানুষের বারবার মনে আশা উচিত। তাহলেই বুঝা যাবে যে বদ্বীপ অঞ্চলের মুসলমান হিসাবে আমরা কি প্রথমতঃ মুসলমান, না বাংলাদেশী, না বাঙ্গালী? কিন্তু কোন perspective এ আমরা এই বিষয়টির উত্তর খুঁজব এটাও একটি বড় প্রশ্ন। মুসলমানরা মনে করে যে, সকল শিশু মুসলমান হিসাবে জন্ম গ্রহন করে এবং পরবর্তীতে যদি এর থেকে বেরিয়ে না যায় তাহলে সে প্রথমত: ‘মুসলমান’। বাংলাদেশে জন্ম গ্রহন করলে ‘বাংলাদেশী’। আর বাংলায় কথা বললে ‘বাঙালী’। যেহেতু জন্মের অনেক পরে শিশুর মুখে কথা ফুটে, তাই বাংলাদেশের মুসলমানদের আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ অনুযায়ী দ্বিতীয় পরিচয় বাংলাদেশী, আর ভাষার ভিত্তিতে তৃতীয় পরিচয় ‘বাঙালী’। কেহ যদি মুসলমানিত্ব থেকে সরে যায় তাহলে তার ধর্মীয় ভিত্তিক পরিচয় প্রথম থেকে তৃতীয় স্থানে চলে যায়।

    অন্যত্র লেখক বঙ্গ, বাংলা, বঙ্গীয় ইত্যাদি কথাগুলির সাথে সুফীমতবাদকে টেনে এনেছেন সম্ভবত: আমাদের বঙ্গীয়, বাঙ্গালী ইত্যাদি পরিচয়ের সাথে মুসলমান পরিচয়টি সংযুক্ত করার জন্য। এ প্রসঙ্গে লেখক “উদারপন্থী সুফীইজমের প্রেমময় দর্শনের” কথা বলেছেন। এখানে প্রশ্ন হলো আমরা বাংলাদেশী মুসলমানগন কি আল্লাহ্ প্রদত্ত ইসলামে বিশ্বাস করে মুসলমান? না উদারপন্থী সুফীইজমের প্রেমময় দর্শনের ভিত্তিতে মুসলমান? আমরা যদি আল্লাহ্ প্রদত্ত ইসলামের ভিত্তিতে মুসলমান হয়ে থাকি তাহলে উদারপন্থী, প্রেমময়, দর্শন এই বিষয়গুলিকে ইসলাম থেকে আলাদা করে আর একটি বিশ্বাসের জন্ম দিয়ে ইসলামকে আলাদা ভাবে উপস্থাপন করার উপায় নেই। ইসলাম কোন দর্শনের নাম নয়। ইসলাম একটি সম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। তাই উদারপন্থী হয়ে আমরা হিন্দুদের ‘যত মত তত পথ’ এই দর্শনে বিশ্বাস করতে পারিনা। আর প্রেমময় বলে ইসলামকে ভেলেন্টাইনে পরিনত করতে চাইলেও ইসলামের মৌলিক শিক্ষা ব্যাহত হয়ে যায়। অপরদিকে লেখার মধ্যে ‘ইসলামী চেতনা আর মৌলবাদী চেতনার’ বিষয়টি লেখক কেন টেনে আনলেন তা বুঝা গেলনা। ইসলাম একটি প্রাকৃতিক ধর্ম। দুনিয়াতে ভিন্ন ভিন্ন সমাজ ব্যবস্থা আল্লাহ্ নিজেই সৃষ্টি করেছেন। মানুষ জীবন পরিচালনার জন্য প্রতিদিন যে যেখানে যে কাজ করে মুসলমানদেরকে তা ই করতে বলা হয়েছে। তবে পার্থক্য শুধু মুসলমানদেরকে কাজ গুলি করতে হয় আল্লাহ্ প্রদত্ত আইন অনুযায়ী। এটাই ইসলামের মৌলিকত্ব। এই মৌলিকত্বের সাথে কম্প্রমাইজ করে মুসলমান থাকা যায় না। আর জাতীয়তাবাদ ঠিক করার জন্য যদি কম্প্রমাইজ করা হয় তাহলে এমন জাতীয়তাবাদের মধ্যে ইসলামকে টেনে আনা উচিত নয়। অমুসলমান সমাজেও মুসলমানগন কিভাবে জীবন যাপন করবে সে বিধানও ইসলামে রয়েছে।

    আর মুক্তি যুদ্ধের কথা বলছেন! মুক্তি যুদ্ধ আমরা শুরু করিনি। আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমরা আত্ম রক্ষার জন্য যুদ্ধ করেছি। এটাই আমাদের মুক্তি যুদ্ধের চেতনা।

    – ওয়াহিদ

  2. আমাডের পোরিচোয় অনাবিসকরিটো ঠেকে যাবে”………ঘাটাঘাটি কোরে লাভ নেই।
    আওআমিলিগের “বাংগালি” আর বি এন পি,র
    “বাংলাডেশি” যুডঢো চোলবেই

  3. এই বিষয়ে একটি বই পড়ছি,” আমাদের জাতি সত্তার বিকাশ ধারা”
    আশা করছি পড়া শেষে একটা লেখা দেব।
    মুনিম ভাইকে ধন্যবাদ আমেন্ত্রণের জন্য

  4. “আমাদের জাতীয়তা নানা উপকরণের সমন্বয়ে গড়া, এই সম্পূরক উপকরণের কোনটাই আজ আর বর্জন করা যাবেনা, আর এই চৌহদ্দি থেকেই আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে ।”

    সহমত ১০০%