বিশ্ব মুসলিমে ইয়াহুদী নাসারাদের প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ

340 জন পড়েছেন

প্রাচীন কালের পরিস্থিতি উদ্ভূত ইয়াহুদী-খৃষ্টিয়ান দ্বন্দ্ব-বিদ্বেষ এ যুগে গ্রহণীয় হতে পারে না। এ-নিয়েই এই ব্লগ।

সহিস মুসলিমের হাদিসে এসেছে: “তোমরা ইয়াহুদি নাসাদেরকে প্রথমে সালাম দেবে না। তাদের কাউকে রাস্তায় পেলে তাকে রাস্তার সংকীর্ণ সীমা দিয়ে (রাস্তার সরু কিনারা দিয়ে) যেতে বাধ্য করবে।” (لَا تَبْدَؤُوا اَلْيَهُودَ وَالنَّصَارَى بِالسَّلَامِ, وَإِذَا لَقِيتُمْ أَحَدَهُمْ فِي طَرِيقٍ, فَاضْطَرُّوهُ إِلَى أَضْيَقِهِ) আবু হুরাইরা/সহিহ মুসলিম, তিরমিযি।

আমাদের দৃষ্টিতে এধরনের কাজ ছিল সে যুগের বিষয়। এভাবে আরও অনেক হাদিস আছে যেগুলো একালের বাস্তবতার সাথে মিল খায় না। আমরা এক নতুন সমাজ ও সামাজিক ব্যবস্থায় বাস করছি। কিন্তু মুসলিম বিশ্বের একদল লোক সর্বদাই ইউরোপ-বিদ্বেষ, খৃষ্টিয়ান-বিদ্বেষ, নাসারা-বিদ্বেষ চালিয়েই যাচ্ছেন। অনেক মুসলিম আবার ইউরোপে খান-দান, সুযোগ গ্রহণ করেন, কিন্তু ভিতর থেকে ইউরোপের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করেন যা ঐতিহাসিক-সুত্রতায় প্রোথিত এবং অন্তর্নিহিত। অনেক ওয়াজ নসিহতে সেই বিদ্বেষ “স্পষ্ট ও ঔদ্ধত্ব” ভাষায় বেরিয়ে আসতে দেখা যায়।

অতীত কালে অনেক সাম্রাজ্য তলোয়ারের মাধ্যমে প্রসারিত হয়েছিল। রোমান-খৃষ্টিয়ান সাম্রাজ্যও সেভাবে হয়েছিল। মুসলিম সাম্রাজ্যও তলোয়ারের মাধ্যমে প্রসারিত হয়েছিল। তলোয়ার ছাড়া সাম্রাজ্য প্রসার হয় না। আজকের ইউরোপীয় সেক্যুলার রাষ্ট্রব্যবস্থা খৃষ্টিয়ান বা ইয়াহুদী ধর্মরাজ্য নয়। এই রাজ্যগুলো ধর্ম নিরপেক্ষ। এই রাষ্ট্রীয় চিন্তা ও সমাজ দর্শন এসেছে ইউরোপীয় আলোকায়ন আন্দোলন (European Enlightenment Movement) থেকে। এখানে ধর্মীয় বা জাতীয় ফ্যাসিবাদ অর্থাৎ “আমরা উত্তম তোমরা অধম, আমরাই মানুষ তোমরা অমানুষ’, এমন ধারণা নেই। এই ব্যবস্থা সাম্য ও সুনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে আইন সকলের জন্য সমান। এখানে ব্যক্তির স্বাধীনতা, তার অধিকার –এগুলোই প্রধান ও প্রচ্ছন্ন।

কিন্তু কিছু মুসলিম লেখক ও ধর্ম প্রচারক অতীত ইতিহাস টেনে, অতীতের বিদ্বেষকে বর্তমানে এনে, মুসলিম সম্প্রদায়ে অতীত বিদ্বেষ জিয়ে রাখছেন। অতীতের ইউরোপীয় আধিপত্যবাদ নিয়ে আক্রোশ প্রচার করছেন, কিন্তু নিজেদের আধিপত্যবাদ ও তলোয়ারের প্রসার বেমালুম ভুলে যাচ্ছেন। হ্যাঁ, জার্মানে, গত শতাব্দীতে, হিটলার ও তার কিছু লোক আর্য-রক্তের উত্তম ধারণায় ইয়াহুদী হত্যা করেছিল। এই উত্তমের ধারণা ফ্যাসিবাদী ছিল, কিন্তু ইউরোপ এই ফ্যাসিবাদকে অঙ্কুরে বিনাশ করতে পেরেছিল।

সমাজকে বর্তমান নিয়েই বাস করতে হয়। অতীতের হিটলারাইট ঘটনার জন্য গোটা জার্মান জাতি সর্বকালের জন্য নিগৃহীত হয়ে যায় না। ঠিক এভাবে ১৫ শো বছর আগে মদিনা নামক এক শহরে ইয়াদহুীগণ নবীকে নবী হিসেবে মেনে নিতে পারেনি, তারপর সেখানে অনেক কিছুর উদ্ভব হয়েছিল, তারপর এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে কার দোষ বা আগ্রাসনের ফলে কী ঘটেছিল, সেটা প্রাচীন বিষয়। ৩০০০ হাজার বছর আগের কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ নিয়ে কি এই একবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত ঝগড়া হিংসা-বিদ্বেষ চালানো যেতে পারে, বা কোন গিরগিটি ৪০০০ হাজার বছর আগে ইব্রাহীম নবীর আগুণে ফুঁৎকার করেছিল সেই অপরাধে আজও কি গিরগিটি হত্যায় সওয়াব হাসিল হতে হবে? প্রয়োজন ছাড়া কি প্রাণী হত্যা বাদ দেয়া যায় না?

আজকের “ইসলামবাদীরা” আবার মুসলিম সাম্রাজ্য গড়বেন, রাষ্ট্রের মাধ্যমে গোটা বিশ্বে ইসলামায়ন করবেন -এই স্বপ্নে অতীতের ইয়াহুদী-বিদ্বেষ, নাসারা বিদ্বেষ, ইউরোপ বিদ্বেষ, এবং ইউরোপ নিয়ে নানান অভিযোগ ছড়াচ্ছেন, প্রচার করছেন। কিন্তু সকল পক্ষ প্রাচীনকালে যা করেছিল সেটা ছিল প্রাচীন কালের ঘটনা। সেখানে সকল পক্ষেই আগ্রাসন ছিল, দোষত্রুটি ছিল। কিন্তু আজ আর সেই কাল নেই। আজকে মন থেকে বিদ্বেষ দূর করা উচিৎ।

যারা এখন এরদোয়ানকে সামনে রেখে খিলাফতি-স্বপ্নে বিভোর এবং মানুষকে উসকিয়ে সেই আন্দোলনে জড়িত করতে চাচ্ছেন, তারা আরেক নতুন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সাধারণ মানুষ ‘ধর্ম-তলোয়ার-যুদ্ধ-ইতিহাস’ এগুলোর গভীরতা সম্পর্কে অবগত নয়। এই ধরনের আন্দোলন ইখওয়ানুল মুসলিমিন করেছে এবং ব্যর্থ হয়েছে। খোদ সৌদি আরব এখন ইখওয়ানকে সন্ত্রাসী আন্দোলন বলছে, যদিও গত শতাব্দীতে এর পিছনে অর্থায়ন করেছিল। ইখওয়ানের জমজ ভাই পাক-ভারতের ‘জামাতে ইসলামী’। এরাও বিগত ৮০ ব্যাপী আন্দোলন করে এখনো ১০% মুসলমানের ভোট পেতে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু এই উভয় আন্দোলনে অনেক প্রাণহানি হয়েছে, অনেক পরিবার ধ্বংস হয়েছে, অনেক সয়-সম্পত্তির ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে এবং এগুলো হয়েছে ধর্মের নামে, সাধারণ মানুষ ও সেক্যুলার শিক্ষিতদেরকে ভুলভাল বুঝিয়ে।

আজকের যুগে সাম্প্রদায়িক ধর্ম-রাষ্ট্রের স্থান নেই। আজকের সমাজের গঠন প্রণালী ভিন্ন। এখানে একই স্থানে সকল ধর্ম ও জাতির লোক বাস করে। এখানে ‘আমরা উত্তম, তোমরা অধম’ এর ভিত্তি গ্রহণীয় নয়। এযুগে দাসী বাজার থেকে কিনে যৌন সম্পর্ক বৈধ দেখানোর যুগ নয়, এক দিনারের চতুর্থাংশ পরিমাণ মূল্যের কিছু চুরি হলে হাত কাটার বৈধতা মানুষ গ্রহণ করবে না, দুইজন প্রাপ্ত-বয়স্ক লোক যৌন সঙ্গম করলে –এই “অপরাধে” তাদেরকে মাটিতে অর্ধেকাংশ গেড়ে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করা যাবে না। প্রাচীন অতীতের অনেককিছু এমন যে আজকের মানুষ সেগুলোকে অসভ্য, অমানবিক বলেই দেখে। আজকের সমাজ-সভ্যতা অতীতের সমাজ ব্যবস্থার মত নয়। অনেক অনেকভাবে ভিন্ন। কোন অতীতকে কখনো ফিরিয়ে আনা যায় না। অনেক প্রথা এযুগে চালানোও সম্ভব নয়। সুতরাং সেই প্রাচীন অতীতের বিষয় নিয়ে, প্রাচীনতাকে চিরন্তন করতে, ইয়াহুদি-নাসারা বিদ্বেষ জিয়ে রাখা উচিত নয়। ইউরোপের দেশগুলো কোন সাম্প্রদায়িক ধর্ম-রাষ্ট্র নয় তাই ইয়াহুদি খৃষ্টিয়ান উল্লেখ করে ইউরোপ বিশদগার করা বর্জন করতে হবে।

আজ, পারলে, যা করার সেটা করা হোক। নিজেদের দেশে ইউরোপীয় মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা হোক। এই মূল্যবোধ ইয়াহুদী-খৃষ্টিয়ান নয়। এগুলো মানবিক মূল্যবোধ। এগুলো এনলাইটনমেন্ট থেকে উৎসারিত মূল্যবোধ, এবং তাদের এই রাষ্ট্রব্যবস্থা যা অর্জন করেছে, সেটা অতীতের কোন ধর্মীয় রাষ্ট্র কখনো করতে পারে নি। এটা মানুষের ঐতিহ্য, মানুষেরই কৃতিত্ব। তবে এর উদ্দেশ্য যে ১০০ ভাগ হাসিল হয়ে গিয়েছে তা নয়, বরং এর মধ্যে অনেক গ্যাপ রয়েছে, অনেক ত্রুটি-বিচ্ছুতি আছে যেগুলো ক্রমশীলতায় উন্নীত করতে হবে। তারপর মানুষের জীবন ও সমস্যা পরিবর্তনশীল। তাই তাদের রচিত ব্যবস্থাও জীবন-ধারার সাথে মিল রেখে আরও টেকসই করে তুলতে হবে। আজ সামনের দিকে অগ্রসর হতে হবে, পিছনের দিকে নয়। এটা সম্ভব নয়। এরদোয়ানের খেলাফত কায়েম হবে না, নিছক রক্তারক্তির মাধ্যমেই লোকগুলো ধ্বংস হবে এবং পরে বলবে আমরা শহীদী দরজা হাসিল করেছি।

Facebook Comments

340 জন পড়েছেন

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতত্ত্ব, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক।

মন্তব্য দেখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *