নিফাকিকরণ থেকে সামাজিক মুক্তি –একটি আলোচনা

70 জন পড়েছেন

ইসলাম ধর্মে, রাসূলের (সা) মদিনায় হিজরতের পরবর্তী সময় থেকে, যে জিনিসটি ‘নিফাক’ বা কপটতা বলে উল্লেখ হয়ে আসছে, এ আলোচনা সেই বিষয়ের উপর।

Quotes about Blaming self (54 quotes)

ধর্মীয় ও সামাজিক আন্দোলনে এক দল আরেক দলকে কপট বলে থাকে। ব্যক্তি পর্যায়েও একজন অন্যজনকে বলে থাকে। তবে খুব কম লোকই হয়ত ধর্মে, ‘ইচ্ছে করে’, প্রতারণার আশ্রয় নেবে। মানুষ সাধারণত প্রয়োজনের তাগিদে অথবা কোন শক্তির জবরদস্তির প্রেক্ষিতে, যেখানে তার অন্য কোন উপায় থাকে না, তখন সে প্রতারণার আশ্রয় নেয়। সে তার নিজের প্রয়োজন অন্যের চেয়ে বেশি বুঝে – অন্যরা তার প্রয়োজন তার চেয়ে বেশি বুঝে বলে তার উপর কিছু চাপিয়ে দিলে সে তা মনে প্রাণে মানতে পারে না।

মক্কায়, ইসলামের প্রাথমিক অবস্থায়, ধর্মীয় কপট বা মুনাফিক বলে কেউ ছিল না। কারণ মানুষ নবীকে মানবে কী মানবে না, ওহির কথা সত্য, না সত্য নয়, এটা স্বাধীনভাবে গ্রহণ-বর্জন করতে পারত। বিষয়টা এমন ছিল যে মক্কায় কেউ হয়ত ইসলাম গ্রহণ করেছে, তারপর বর্জনও করতে পেরেছে, যেমন মেরাজের ঘটনার পর কিছু লোক ইসলাম ত্যাগ করে, কিন্তু এই শহরে তাদের মনে এই ভয় ছিল না যে কেউ তাদেরকে বিশ্বাসের জন্য মেরে ফেলবে। কিন্তু এই অবস্থা মদিনায় হিজরতের পর ভিন্ন হয়ে যায়।

The Wages of Fear
যুদ্ধের মানসিক, পারিবারিক ও সামাজিক চিন্তা

মদিনায় নবীর অবস্থান ক্ষমতার অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়। অনেক লোক প্রথমে হুজুগে, আবেগে বা অবস্থার প্রেক্ষিতে মুসলমান হয়ে যায়। কিন্তু পরে তারা নবী ও ওহীর বিষয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে, কিন্তু তখন ধর্ম ত্যাগ বিপদের বিষয় ছিল। তারপর মদিনায় যুদ্ধের পর যুদ্ধ ঘটছিল। মদিনার ১০ বছরে ছোট বড় ৮৩টি যুদ্ধ করতে হয়েছিল, এবং সময়ের বিবেচনায় প্রতি মাসেই দুই-একটা যুদ্ধের ব্যাপার ছিল। কিন্তু এসবের উপর তাদের কোন হাত ছিল না। অধিকন্তু ধর্মীয় দিক থেকে তাদের উপর নবীর আনুগত্য একদম নিঃশর্ত ছিল। তখন মুসলিম হওয়া মানি রাসূলের নির্দেশে শর্তহীনভাবে সাড়া দেয়া, রাসূলের গোলামী মানি আল্লাহর গোলামী ভাবা, নিজেদের জান-মাল আল্লাহর কাছে জান্নাতের বিনিময়ে বিক্রি হয়ে যাওয়ায় বিশ্বাস করা, নবীকে নিজেদের প্রাণের চাইতে অধিক ভালবাসা ― স্ত্রী-সন্তান, মা-বাপ, ধন-সম্পদ যাবতীয় কিছুর চাইতে বেশি ভালবাসা, নবীর কাছ থেকে যুদ্ধের ডাক আসলেই জান-মাল, পরিবার, ব্যবসা, ক্ষেত-কৃষি ইত্যাদির মোকাবেলায় সেই ডাকে বেরিয়ে পড়ার গুরুত্ব অধিক ভাবা – এগুলো ছিল সেই মুসলিম হওয়ার দাবী। কিন্তু মানুষ তো মানুষই। এইসব দাবী রাসূলের কথায় ও কোরান নাজিলে এসেছে। এগুলো তাদের ইচ্ছা-প্রণোদিত বা মিটিং-সেমিনার করে সংঘবদ্ধভাবে গৃহীত হয়ে আসেনি।

মক্কা থেকে নবী যখন মদিনায় হিজরত করেন তখন অতি অল্প-সংখ্যক লোক ব্যতীত অন্যরা বুঝতেই পারেনি যে এটা সমাজের অন্যান্য ধর্মীয় প্রকৃতির ধর্ম থাকবে না, বরং এটা ক্রমশ সশস্ত্র যুদ্ধে জড়িয়ে যাবে, গোত্রের পর গোত্রের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে, তাদেরকেও সেই যুদ্ধে যেতে হবে, অর্থ দিতে হবে, সময় দিতে হবে, এবং এসবের মধ্যে তাদের ব্যবসা, কৃষিকার্য, পশু-পালন, জীবন-জীবিকা সবকিছু আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যাবে, এবং অবশেষে এখানে যে রাজ্য কায়েম হবে সেটার কর্তৃত্ব কোরেশ বংশের হাতে থাকবে। তারপর এইসব যুদ্ধে বাদশাহের সিপাহির মত কোন বেতন থাকবে না ― বেতন মৃত্যুর পরে পাবে, তাও যদি সঠিক বিশ্বাসী হয় ― তবে যুদ্ধে জয়ী হলে গণিমতের মাল পাবে। তারপর এটা আগে বুঝতেই পারেনি যে এখানে সুপ্ত গোয়েন্দাগিরি থাকবে: কে কোথায় কী বলছে, কোরানের কোন আয়াত নিয়ে কী মন্তব্য করেছে, সেটা নবীর কানে পৌঁছায়ে দেবার মত কিছু লোক থাকবে, তাদের উপর ধর্মীয় যে দাবীগুলো অর্পিত হয়েছে সেগুলোর প্রতি তারা নির্দ্বিধাচিত্তে একনিষ্ঠ রয়েছে, না তাদের মধ্যে পরিবর্তন আসছে। যুদ্ধের ডাক পড়লে তাদের মধ্যে কে কী বলছে, কারা কারা প্রস্তুতি নিচ্ছে, আর কারা কারা না-যাবার অজুহাত অবলম্বন করছে। তারপর পাঁচবার নামাজ পড়ছে কী না, জামাতে আসছে কিনা, এগুলোর উপর নজরদারী ছিল। মানুষ তো মানুষই, তাদের মধ্যে অনেকে জামাতে আসতে ব্যর্থ হত, বা অলসতা করত, তাই নবীকে বলতে দেখা যেত তিনি বলছেন তার ইচ্ছে হয় তিনি যেন নামাজের সময় অন্য কাউকে নামাজ পড়ানোর দায়িত্ব দেন, আর কিছু লোক নিয়ে ওদের ঘরে আগুণ লাগিয়ে দেন, কিন্তু তিনি তা করছেন না এজন্য যে সেখানে তাদের সন্তান-সন্তিনী রয়েছে। তারপরও অনেক লোক অনিচ্ছা সত্ত্বেও নামাজে আসত, যুদ্ধে যেত, যুদ্ধ-প্রচেষ্টায় অর্থ দান করত, কিন্তু মূলত তাদের অন্তর সেইসব কাজের মধ্যে ছিল না। তারা নানান ভয়ে এগুলো করে যেত, কিন্তু তারা যে এগুলো নিষ্ঠার সাথে করছে না, সেটাও অনেকে বুঝতে পারত। তাই যারা মনে প্রাণে বিশ্বাস করত তাদের দৃষ্টিতে ওরা ছিল কপট বা মুনাফিক। এসব নিয়ে নবীকে কথা বলতে হত।

1917': An explosive and gripping depiction of war - Entertainment - The  Jakarta Post
যুদ্ধের মেজাজ ও পরিণতির চিন্তা সকলের সমান নয়

নবীর হাদিসে এসেছে তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি মরে গেল, কিন্তু যুদ্ধ করল না, অথবা মনে মনে যুদ্ধে যাবার পরিকল্পনাও করল না, তার মৃত্যু যেন জাহেলিয়াতের উপর হল। অন্যান্য হাদিসে তার মৃত্যু যেন নিফাকের অংশের উপর হল। তিনি বলছেন, তোমরা মুশরিকদের সাথে নিজেদের জান-মাল দিয়ে যুদ্ধ কর। তোমাদের জবান দিয়েও যুদ্ধ কর। কোরানে এসেছে, তোমাদের উপর যুদ্ধ ফরজ করা হয়েছে যদিও তোমরা তা অপছন্দ কর। কিন্তু এগুলো তাদের জীবন, পরিবার বা অন্য কথায় তাদের নিজ বিবেচনাধীন ‘স্বার্থের’ সাথে মিল খাচ্ছিল না, তারা মন থেকে মানতে পারছিল না।

এই দুনিয়ার যাবতীয় সামাজিক আন্দোলনে কিছু লোক অগ্রগামী থাকে, নেতৃত্বে থাকে, এসব তাদের ধ্যান-ধারণা ও মানসিক প্রকৃতিতে মিলে যায়, এবং কিছু লোক এসব পছন্দ করে না, বা পিছিয়ে থাকে, তাদের ধ্যান ধারণা ভিন্ন হয়। কিন্তু ধর্মে তারা সামাজিক একটি ক্যাটাগরিতে পড়ে যায় ―তারা মুনাফিক। কিন্তু সমাজ-বিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্বের আলোকে ‘নিফাক’ নামক বিষয়টিকে মদিনার সেই সমাজে, অথবা পরবর্তী অন্যত্র স্থানে, অধ্যয়ন চালালে সেখানে একটি ভিন্ন বাস্তবতা বেরিয়ে আসবে। তখন সহজেই দুই পক্ষ ও দুই ধরণের মানবিক অবস্থা ও প্রকৃতি দেখা যাবে, এবং এই প্রশ্নটি বার বার ভিন্নরূপে হাজির হবে: কারা কাদের উপর কেন এই লেভেল বা তকমা আঁটছে? আবার স্থান-কাল অতিক্রম করলে দেখা যাবে সব সময়ই একই কমিউনিটির ভিতর একাধিক শ্রেণী থাকে। এক শ্রেণীর উদ্দেশ্য বা স্বার্থ অন্য শ্রেণীর উদ্দেশ্য বা স্বার্থ থেকে ভিন্ন থাকে এবং এই ভিন্নতাই সেই বাস্ততা হাজির করে। যে শ্রেণীটি তাদের জান-মাল দিয়ে অন্য শ্রেণীর উদ্দেশ্য পূরণে এগিয়ে যেতে ব্যর্থ হবে তারা স্বাভাবিকভাবেই অপর শ্রেণীর দৃষ্টিতে সেই তকমায় আরোপিত হয়।

আধুনিককালের মুসলিম সমাজকে কেউ বস্তুনিষ্ঠভাবে কোরান এবং হাদিসের আলোকে বিবেচনা করতে গেলে হয়ত ৯৫% লোক বা তার চেয়েও বেশি লোককে নিফাকের ক্যাটাগরিতে আওতাভুক্ত করতে পারবে। তাছাড়া প্রত্যেক ব্যক্তি যদি তার নিজেকে কোরান হাদিসের দাবীসমূহের আলোকে বিবেচনা করতে যায় তবে নিজের দৃষ্টিতেই তা প্রতিভাত হয়ে উঠতে পারে।

তবে কোন সমাজে যখন এক শ্রেণী আরেক শ্রেণীকে নিগৃহীত করে, বা পারস্পারিক ‘সন্দেহের’ আওতাভুক্ত করে, তখন এর সামাজিক পরিণতি ভাল হয় না। মুসলিম সমাজে সেদিন আড়ালে-আবড়ালে নিফাকের আওতাভুক্তিতে যে সামাজিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল সেই বাস্তবতা মুসলিম সমাজকে আজও তাড়া-করে বেড়াচ্ছে। কিন্তু নিফাক যদি কারো থাকে তবে তার মনের ভিতরে –যেমন ঈমান মনের ভিতরে থাকে। তাই এই বাস্তবতার ভিত্তিতে তির্যার কোন ক্যাটাগরি তৈরি করা সামাজিকভাবে উত্তম নয় ― বাস্তবতা তা’ই প্রমাণ করে।

Blame High Res Stock Images | Shutterstock
সন্দেহ, দোষারোপ মানুষকে নির্যাতন করতে পারে

মানুষ অন্যান্য প্রাণীর মত এক দুর্বল প্রাণী শ্রেণী। সে হয়ত অবস্থার প্রেক্ষিতে কারও ডাকে সাড়া দিতে পারে নি, বা মিথ্যা বলে ফেলেছে, বা ওয়াদা রাখতে পারে নি, কিন্তু অন্য সময়ে, অন্য প্রেক্ষিতে হয়ত তা পারবে, তার অবস্থার হয়ত উন্নতি হবে। কিন্তু আপনি যদি এসব বৈশিষ্ট্যকে চিরন্তন ধারণায় পাঠ করে অন্য মানুষকে জাজ (judge) করতে থাকেন, তবে সেটা সঠিক হবে না। অধিকন্তু এটা যদি কোন দল বা গ্রুপের পরিসরে বিস্তৃত হয়, তবে সেই পরিবেশ যে কেবল ভীতির পরিবেশ হবে তা নয় বরং অনেকের জন্য সেই পরিবেশ শ্বাসরুদ্ধকর হয়ে উঠতে পারে।

তারপর, নিফাককে সব কালেই একটি রাজনৈতিক ক্যাটাগরি হিসেবে দেখা যেতে পারে। তাই বিষয়টির নাজুকতার বিবেচনায় এবং সামাজিক সুস্থতার জন্য এই ক্যাটাগরির আরোপন বর্জন করাই উত্তম, কেননা কোন লোকটি মুনাফিক, তার বৈশিষ্ট্য কী, তার নিদর্শন কী – এসব অনিশ্চিত বিদ্যার ইন্দ্রজালে যতই জড়িয়ে পড়া হবে, ততই যাদু-সংস্কৃতির ন্যায়, নিজেদের মধ্যে সন্দেহের সূত্রাদি বৃদ্ধি হবে।

Facebook Comments

70 জন পড়েছেন

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতত্ত্ব, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক।

মন্তব্য দেখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *